গভীর রাতে মোবাইল ফোন

আগের সংবাদ

ভ্যালেন্টিনা

পরের সংবাদ

সুনীল সন্ন্যাস

মুহম্মদ নূরুল হুদা

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ২, ২০১৯ , ৫:৪২ অপরাহ্ণ

সুনীল সন্ন্যাসী : শূন্য
বিমানে উড়ে চলেছি ঢাকা থেকে কলকাতা হয়ে নয়াদিল্লি। ঢুকে গেছি আকাশের গর্ভে। শূন্যের ভিতরে শূন্য, তার ভিতরে শূন্য, তার ভিতরে শূন্য, শূন্য আর শূন্য। এখন যেতে পারি শূন্যের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত।
এই শূন্যই কি তোমার আমার জননী, তোমার আমার জনক? শূন্য কি স্বসঙ্গমে স্বসংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে মুহূর্তকে নবায়ন করে প্রতিটি মুহূর্তে? মুহূর্ত কি শূন্যের আধার? না, কখনো সমাধান মেলেনি এই ধাঁধার?
নাই-বা মিললো। চলো, উড়ে যাই মুহূর্তের ডানায় মুহূর্ত থেকে মুহূর্তে। এই মরলোকে মুহূর্তে মুহূর্তে সেতু বেঁধে গড়ে তুলি অমরলোক। মর্ত্যরে মানুষ আমি, আমি ভালোবাসি এই মরলোক। হে সুনীল সন্ন্যাসী, মরলোকে বাজাও সেই অমরতার বাঁশি।

সুনীল সন্ন্যাসী ১
এবার নয়াদিল্লিতে দক্ষিণ এশীয় সাহিত্য সম্মেলনের বিষয় ছিল সুফিজম ও বুদ্ধিজম। সাধারণত কোনো গভীর আলোচনা শুনতে শুনতে আমি চোখ বন্ধ করে মন খুলে রাখি। লোকে ভাবে আমি ঘুমাচ্ছি। তেমনি এক মনোদৃষ্টির মুহূর্তে আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন এক কৃশকায় ঋষি। বললেন, আমি আসিনি কপিলাবস্তু বা বলখ থেকে। আমার গন্তব্য না-নির্বাণ না-ফানা। যেখানে যার মন খোলা পাই সেখানেই আমি পদ্মাসনে বসি। আমার একটুক্ষণ বন্ধু হবে তুমি? আমি কোথাও যাই না, কেবল আসি। আমাকে নাম দিতে পারো সুনীল সন্ন্যাসী। আমি নীল থেকে নীলে ডানা মেলি আর বাঁশি বাজাই, বাঁশি।
আমি কিছু বলার আগে দূরতমা এক সুহাসিনী আমাকে কী যেন বলেলন কানে কানে। আমি বাধ্য হয়ে মন ছেড়ে কানে এলাম। তারপর চোখ খুললাম।
কেউ নেই কোথাও। না মঞ্চ, না বক্তা, না শ্রোতা। না বুদ্ধ, না রুমি। না সুহাসিনী না সন্ন্যাসী। শুধু শিরায় শিরায় বেজে চলেছে এক অনিকেত বাঁশি।

সুনীল সন্ন্যাসী ২
ভালোবেসে হয়েছি বিব্রত। ভালোবাসা যার ব্রত সে কেন অগ্রাহ্য করবে সত্যব্রত? না সক্রেটিস না প্লেটো না সফিস্ট, ওরা কেউ খোঁজে না ভালোবাসার ধ্যানতত্ত¡; কিংবা বোঝেও বোঝে না। আপাতত যাকে মনে হয় প্রশান্ত মন, একসময় তাই হয়ে যায় ভ্রান্তদর্শন। এমন হৃৎজমিনে হলকর্ষণ নাই তো ফসলও নাই। সোনালি শস্যের মাঠে হাঁটে সুনীল সন্ন্যাসী; মুখে বাঁশপাতার বাঁশি; বলে সামান্য কথা; অধিক বলে না। শর্তহীন ভালোবাসা শিকড় থেকে শিকড়ে চলে; না, টলেও টলে না।

সুনীল সন্ন্যাসী ৩
যে কর্ষক সে-ই দর্শক। ভালোবাসা উর্বরতার প্রথম সবক। ত্রিভুবনে নেই কোনো খরা। ঋষি জানে ধ্যানের ধান ও কৃষির পরম্পরা। মনখামারের দশপাশে সেবাদাস আর সেবাদাসি। নহলি মনের পাশাপাশি প্রাজ্ঞমন অবিনাশী। লোক থেকে লোকান্তরে এই মন ভালোবাসার অনুঘটক। যে দর্শক সে-ই কর্ষক। ভালোবাসা মনোভাষা। অলিখিত পত্র সর্বনাশা। নাই মৃত্যু নাই জরা। সুনীল সন্ন্যাসী ভালোবাসার ডাক হরকরা।

সুনীল সন্ন্যাসী ৪
সুহাসিনী হে প্রিয়দর্শিনী। তোমাকে কি চিনি? তুমিও কি চর্যার হিরণ্য হরিণী? আছে সুখ, আছে দুঃখ, আছে মিলন-বিরহ; আছে বিকিকিনি। পথে পথে পসরা সাজায় স্রোতস্বিনী; পাহারা বসায় ধরিত্রী ধমনি। সতীর সতীত্ব সত্য; তটস্থ তটিনী। সুনীল সন্ন্যাসী চেনে মোহনা মোহিনী।
যাই, তবে যাই; মোহনায় যাই। বিরহে মিলন পাই, মিলনে বিরহ। এই দাহ সত্যদাহ, দাহ অহরহ। সতীদাহ পতিদাহ প্রকৃতি প্রদাহ। দহনে দহনে শুদ্ধ প্রাণের প্রবাহ। প্রাণ থেকে প্রাণে যাই, প্রাণে-প্রাণে যাই। প্রাণেই প্রাণের ঘ্রাণ, অন্য ঘ্রাণ নাই।

সুনীল সন্ন্যাসী ৫
দেখা যায় শুধু একবার। তারপর অনেক মুখের ভিড়ে হারিয়ে যায় মুখটি। শুধু তরঙ্গিত হতে থাকে তার গমনভঙ্গি।
শরীর যেদিকে যায় মন যায় ঠিক উল্টো দিকে। নাগালে আসে কিন্তু দখলে থাকে না। ধ্বনি হয় তো অর্থ হয় না। অর্থময় শব্দ হয় তো বাক্য হয় না। বাক্য হয় তো বাণী হয় না। কেবল কানাকানি করে দুই শত্রু দুই মিত্র। অগত্যা মধ্যস্থতা করেন মহামতি হেগেল। উদয়াচলের কিরণের স্পর্শে সত্তান্তরিত হয় অস্তাচলের আলো। জন্ম হয় উদয়াস্তের মিলিত প্রতিমা। তাকে বুকে তুলে নেয় সুনীল সন্ন্যাসী। এই তো তার ধ্যানের অসীমা। পরিমেয় ও অপরিমেয় তার রূপ।
তাকে দেখে দশদিগন্ত চুপ। শুধু চুপ থাকে না অঙ্গে ও অনঙ্গে উড্ডীন এক নীলরঙা চিল। মধ্যদুপুরে তার বুকের ছায়ায় গুটিশুটি ঘুমিয়ে পড়েছে অনন্ত নিখিল।

সুনীল সন্ন্যাসী ৬
রোদে জঙ্গলে গৈরিক পথে সহজে চলে না তার পা। মাটিতে কয়েদি আলোছায়ার আলপনা। পাখি ডানা গুটিয়ে লুকিয়ে আছে পাতার আড়ালে। তার অথৈ চোখ জরিপ করছে ব্রহ্মাণ্ডের সীমা। ঝড় আসছে ঝড়। বুকে বুকে উছলে পড়ছে মহাজাগতিক মনোঝড়।
ধ্যানগিরি ছেড়ে আরেকটু এগোলেই জ্ঞানগিরি। ধাপে ধাপে উঠে গেছে গৈরিক সিঁড়ি। মধ্যপথে থেমে আছে সন্ন্যাসীর মনোডানা।
মাটি ছাড়িয়ে আকাশ ছাড়িয়ে দিগন্ত ছাড়িয়ে যেখানে সে যাবে, সেই ঠিকানা এখনো অজানা।

সুনীল সন্ন্যাসী ৭
সামনে অনন্ত; চলন্ত সে তন্দ্রাচ্ছন্ন; দশপাশে দূরবেদূরের হাতছানি। মানুষ পশুপাখি রূপ-অরূপের কানাকানি। খুব কাছে যুবতির বুক উত্তাল। অদূরে হাসছে লুসিফার। ‘তুমি কার, তুমি কার?’
নিজের বুকে খুন্তি চালায় সন্ন্যাসী। স্নায়ুতে স্নায়ুতে বাজে শোণিতের বাঁশি। আত্মা আর অনাত্মার বিবাদে সন্ন্যাসী রায়হীন। তার গগনবিদরী চিৎকার : ‘না, তুমি নও কেবল তোমার’।

সুনীল সন্ন্যাসী ৮
কবিতার ডাকে নিশি-পাওয়া পথিকের পায়ে চড়ে বসেছি উপবন ট্রেন। গন্তব্য শ্রীমঙ্গলের চা-বাগান। পৌঁছেই দীর্ঘ ঘুম। তারপর দুপুরের রোদ মাথায় নিয়ে রাজপথ ছেড়ে ধরেছি পায়ে হাঁটা পথ। সমতল থেকে টিলায় উঠে এই পথ চলে গেছে অনেক দূর। এই পথে হেঁটে গেছে কত শ্রমিক কত বণিক কত প্রেমিক। ছড়িয়ে রেখেছে শ্রম আর প্রেম আর ঘূর্ণিধূলি। হাঁটতে হাঁটতে আমিও টিলার উপরে পেয়ে গলাম পত্রপুষ্পহীন এক বৃক্ষ। তার গায়ে গা মিলিয়ে বললাম, জয় গুরু। তারপর চোখ বন্ধ করলাম। পরক্ষণেই সামনে এসে দাঁড়ালো নাছোড়সঙ্গী সুনীল সন্ন্যাসী। হেসে বললো, জয় গুরু। আমি দ্রুত চোখ খুললাম। আমার দৃষ্টিকে আড়াল করে উড়ে যাচ্ছে হলুদ ডানার রাশি রাশি প্রজাপতি।

সুনীল সন্ন্যাসী ৯
সবুজ পাতার পাশে ঝরা পাতা, তার মাঝে ফুটে আছে রকমারি ফুল। লাকড়ি মাথায় ঢেউ তুলে সারি বেঁধে হেঁটে যাচ্ছে পাহাড়ি রমণী। এক পাহাড়ের সঙ্গে আরেক পাহাড়ের গলাগলি। দুই পাহাড়ের মাঝখানে নেচে যায় ছলোচ্ছল ঝিরি। স্বচ্ছ খরতোয়া জলের প্রবাহ, বুকে তার দাহ। তার আড়ালে গড়াগড়ি খায় বালির পর বালি। হঠাৎ কখনো ঝিলিক মারে পুঁটি ডানকানা টাকি বা ডানকানার চোখ।
একবার আকাশের দিকে, একবার মাটির বুকে তাকায় সুনীল সন্ন্যাসী; তারপর গাছের শেকড়ে কান পাতে। তারপর চোখ বন্ধ করে প্রাণায়াম সারে। চলে যায় পারাপার থেকে পারাপারে। ওড়ে প্রজাপতির ডানায় ডানায়। শীর্ষানন্দে ভেঙে যায় ঈশ্বরকণা। ভাঙে অণু পরমাণু। মুহূর্তে মুহূর্তে জন্ম নেয় কুসুম-শুক্রাণু।

সুনীল সন্ন্যাসী ১০
পাতা আছে পাতা নেই, শাখা আছে শাখা নেই, কাণ্ড আছে কাণ্ড নেই, মূল আছে মূল নেই। মৃত্তিকার গহিনে গহিন, এই বৃক্ষ আকাশে উড্ডীন। হে উড়াল মনীষী, তুমিও শিখে নাও ব্রহ্মাণ্ডের কৃষি। নীলে নীলে শূন্যে শূন্যে চাষ করো জলস্থল। সন্ন্যাসী হে, এই ব্রহ্মতল তোমারই সুনীল করতল। তাতেই ফলে চলেছে জগতের সকল ফসল। বৃষ্টি আসছে বৃষ্টি। তোমার দুই চোখে অশ্রু টলমল।

সুনীল সন্ন্যাসী ১১
ধীরপ্রবাহিনী এক পাহাড়িয়া ঝিরি। জলের নিচে গড়িয়ে চলছে নুড়ি। নুড়ি ভেঙে ভেঙে বালি। বালি জমে জমে চর। চর ঘেঁষে দোঁয়াশ মাটির ভাঙা পাড়। সেই পাড়ে লতিয়ে উঠছে নাম-না জানা লতা। লতায় ফুটছে কলি, কলি থেকে ফুল। নাম দেয়া যাক বুনোফুল।
রাত যখন আঁধার হয়ে নামে, সেই বুনোফুল তাকায় নক্ষত্রপুঞ্জের দিকে। তখন বুনোফুল আর সপ্তর্ষির মধ্যে বিনিময় হয় রশ্মি। সেই রশ্মিপথে মুহূর্তেই ত্রিভুবন ঘুরে আসে সুনীল সন্ন্যাসী।
ততক্ষণে আদি হয় অন্ত, অন্ত হয় আদি। তুমি আমি তখন অনাদি।

সুনীল সন্ন্যাসী ১২
বয়ে চলেছে ঝিরির জল। সেই জলে পড়েছে রাঙা বাছুরের ছায়া। সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। থাকলেও সে ছুটে আসছে তার মা-বাবা আর সঙ্গীসাথীদের দিকে। ওরা সন্ধান পেয়েছে সবুজ ঘাসের।
কে আগে কে পরে এখন সেটিই বড় কথা। এ নিয়ে কোনো গুঁতোগুঁতি নেই, হুড়োহুড়ি নেই। আছে শুধু জঠর জ্বালার তাড়া।
গবাদি প্রাণী কি অবোধ প্রাণী? সবুজ ঘাস কি আত্মরক্ষাহীন? একজন খাদক, অন্যজন খাদ্য। না, ওরা বাজায়নি কোনো যুদ্ধ বাদ্য। কিন্তু চলছে নীরব দানপ্রতিদান। পরস্পরের বিনিময় নির্বাণ। এইতো প্রকৃতির অকাতর সম্প্রদান।
ঝিরির বহতা জল আজলা ভরে পান করে সটান দাঁড়ায় জাগতিক ঋষি। এই তো চরাচরে তার জগৎ সংসার। এই তো জলমাটি আলোহাওয়ার কৃষি।
এই বিশ্বভবনে কে বলো কার পরদেশী?

সুনীল সন্ন্যাসী ১৩
পাতা আর আকাশ, বৃক্ষ আর ঘাট, পুকুর আর জল, ছায়া আর আবছায়া … সব মিলিয়ে কেমন যেন মায়া মায়া। মনে পড়ে যায় কবেকার মায়া সভ্যতার কথা। কোথাও জনমনিষ্যি নেই, নেই ছলনাসঙ্গী, আছে শুধু প্রকৃতির অনঙ্গ অঙ্গভঙ্গি।
যখন ওরা ডাকে, তখন কেমন যেন লাজুক তাকায়। এড়াতে গিয়েও এড়াতে পারি না। একসময়ে শিকারি পানকৌড়ি হয়ে যায় এই মন। ডুবে ডুবে সাঁতরায় জলে ও কাদায়। অনন্তর ভেসে ওঠার আগে এলো কুন্তলে জড়িয়ে ফেলে মৎস্যগন্ধা নারী। নেশা জাগায় তার নধর অধর আর ভারি পয়োধর। তখন জগৎসংসারে কারা যেন অরক্ষিত থাকে পরস্পর। তারপর কিছুই জানি না, কিছুই মানি না। অকস্মাৎ অদূরে শোনা যায় জলাঙ্গীর বাঁশি।
ততক্ষণে নীলাকাশ কাঁপিয়ে ঠা-ঠা হেসে ওঠে সুনীল সন্ন্যাসী। সেই হাসিতে ভেসে ওঠে নবীনূহের নৌকা। প্লাবনে প্লাবনে ভাসে এক‚ল-ওক‚ল। হাশর ঘনায়।
আয় ওরে আয়, কে কে তোরা যাবি বল্ জোড়ায় জোড়ায়! সন্ন্যাসীর পাল ওড়ে ভুবন আখড়ায়।

সুনীল সন্ন্যাসী ১৪
‘দাবায়া রাখতে পারবা না।’
না, পারেনি কেউ; পারবে না কেউ কোনোদিন।
যে ইতিহাস জানে সে মানে। মানে না সেই মূঢ়, ইতিহাস যে পড়েনি; পড়লেও বোঝেনি। একজন স্বাধীন বাঙালি ঘোষণা করলেন নিজের অনিবার্য স্বাধীনতা, তারপর জাতিবাঙালি হয়ে গেলো অনন্তস্বাধীন।
সাতই মার্চের সেই অনন্ত রোদ্দুর আজ বাঙালির অনন্ত বসন্ত। মুহূর্ত হয়ে গেলো মহাকাল। জাতির জনক হয়ে গেলেন মহাকালের মহত্তম বাঙালি।
বাঙালি মানে মানুষ,
বাঙালি মানে স্বাধীনতা।
যে প্রকৃত বাঙালি সে মুক্তিযোদ্ধা,
সে যুক্তিযোদ্ধা, সে চিরনির্ভয়।
জয় বাংলা, বাংলার জয়।
সেই থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভের পাশেই জ্বলছে শিখা অনির্বাণ। সেই চিরপ্রজ্বলিত শিখার পাশে দাঁড়িয়ে অগ্নিদর্পণে মুখ দেখলো সুনীল সন্ন্যাসী। দেখলো, আকাশে মাথা ঠেকিয়ে পুরো জাতিকে বুকে আগলে দাঁড়িয়ে আছে এক আলোকশরীর।
সন্ন্যাসী তার চোখে চোখ রেখে বুকে বুক মিলিয়ে মহাশূন্যে উঁচিয়ে ধরলো তার নির্বিকল্প তর্জনী। বললো, ‘শির নেহারি’ আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির।’
এই দৃশ্যে ত্রিভুবন চুপ।
অনন্তকাল ধরে এক ফোঁটা শিশিরে
টলমল করছে সেই রূপের অরূপ।

সুনীল সন্ন্যাসী ১৫
একদিন এই মাঠেরই নাম ছিল রেসকোর্স।
এখানে লেফট-রাইট করেছে শাদা-কালো রঙবেরঙের কত-কত হানাদার ফোর্স।
হাট বসেছিল, ক্ষমতার হাট। এই ঘোড়দৌড়ের মাঠেই ছিল তাদের আকাশকাঁপানো ঠাটবাট।

তারপর ভাগ্যশিকারিদের লোভের ঘোড়ার ঊর্ধ্বশ্বাস দৌড়, আর লোভী জুয়াড়িদের মুখে মুখে জুয়ার জিকির। মুহূর্তেই কেউ বনে যায় রাজা, কেউ-বা ফকির। হে স্বাধীন জাতির স্বাধীন শিশু, তোমরা দেখোনি সেই দৌড় জুয়াড়ির ফিকির।

তারা এসেছিল মধ্যযুগে চেঙ্গিশ-হালাকুর বাহন হয়ে এই দেশে; তারপর অষ্টাদশ শতকে বেনিয়াপ্রভুর অশ্বারোহীর বেশে। তাদের সঙ্গে করমর্দন করে ঘরে তুলেছিল ষড়যন্ত্রী মীরজাফর। তাদেরই বশংবদ পাকহানাদার সমরশাসক। যুগে যুগে তারা সব বর্গীর বাহন। শেষ করা যায় না তমসার সেই সাতকাহন। এমনকি একদিন বাঙালির বাকতীর্থ বাংলা একাডেমির পুকুরপাড়েও ছিল সেই অশ্বের আস্তাবল।

তারপর?
তারপর তারা আঘাত করলো বাঙালির ভাষাকে। না, সেই জুয়াড়িরা তখনো বুঝতে পারেনি তারা আঘাত করেছে কাকে। রক্তে রক্তে রক্তের প্রতিশোধ নিলো সমর বাঙালি। বাঙালি হয়ে উঠলো শোণিতশরীর। বাঙালি হয়ে উঠলো সংশপ্তক। বেজে উঠলো মুক্তির মাদল।
‘চল্ চল্ চল্, ঊর্ধ্বগগনে বাজে মাদল, নিম্নে উতলা ধরনীতল’।

উতল-চেতন বাঙালির সেই সমরযাত্রা বাঙালিকে করেছে চিরপ্রমুক্ত, চিরস্বাধীন। আজ সেই স্বাধীনতা-উদ্যান জুড়ে ষড়ঋতুতে ঘূর্ণি-নৃত্যে নেচে চলেছে বাঙালির জয়যাত্রা রাত্রিদিন। হে সুনীল সন্ন্যাসী, মানুষ কখনো নয় মানুষের অধীন।

সুনীল সন্ন্যাসী ১৬
মুহূর্তেই লসঅ্যাঞ্জেলেস থেকে হিউস্টন, আর নিউইয়র্ক থেকে শ্রীমঙ্গল হয়ে পোকখালিতে আমার বাবার বাড়িতে পৌঁছে গেলাম।
বাবার শোবার ঘরে প্রায় শতবর্ষী শূন্যখাটে শুয়ে পড়ার আনজাম শুরু করলাম। কারা থাকে এই ঘরে? এই মুহূর্তে এখানে আমার প্রতিবেশী হতে পারে বড়জোর একজোড়া সঙ্গমরত টিকটিকি আর সরু-লম্বা পায়ের ভয়ঙ্কর মাকড়সা। ওদের দিকে সতর্ক চোখ রেখে ঠায় বসে আছে বাবার দীর্ঘদিন তালাবদ্ধ লোহার সিন্দুকটি।
আমরা, তাঁর স্বনামধন্য পুত্রকন্যারা, এখন ডায়াসপোরা চর্চা করি। গোটা ভূমণ্ডল এখন আমাদের পায়ের তলায়। পুরো মহাবিশ্ব এখন আমাদের হাতের মুঠোয়। আমি খাই-দাই, নিশ্চিন্তে ঘুমাই আর ঝিমুতে ঝিমুতে কবিতার পদ মিলাই। অসুখবিসুখ হলে বিনা দ্বিধায় হোমিও বড়ি আর পঞ্চাশসহস্রতমিক ফোঁটা খাই।
আমার ছোট বোন খুশি অবশ্য জাঁদরেল সমুদ্রবিজ্ঞানী। স্বামী আর দুই সন্তানসহ এখন মার্কিন নাগরিক। যুক্তরাষ্ট্রের এক খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ে বসে বঙ্গোপসাগরের মাছেদের প্যারাসাইট নিয়ে গবেষণা করছে সে।
“বাবা, তুমি নিশ্চয়ই খুব সুখী। তোমার ফাঁদা-জালে ধরা-পড়া কোনো চিংড়ি বা কোরাল, পোঁয়া বা বিছাতারা, বাটা বা ঘুইজ্জা তথা অন্যকোনো কোনো মাছ আর রোগাক্রান্ত থাকবে না। অপমৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাবে তোমার নাতিপুতি। খুশি আমার আর তোমার বড় পুত্রবধূর জন্য উড়োজাহাজের টিকিট পাঠাচ্ছে। আমরাও ঘুরে আসবো পুরো পৃথিবী। লসঅ্যাঞ্জেলেসে কবিতা উৎসবে দাঁড়িয়ে বলবো, ‘যতদূর বাংলা ভাষা, ততদূর এই বাংলাদেশ।’
শুনেই সামনে এসে ফিক করে হেসে মুখ ঢাকলো আমার নাছোড়সঙ্গী সুনীল সন্ন্যাসী। “কী সব্বোনাশ, আমার কী হবে কবি? আমি যাবো না কেন? আমি কি তোমাদের বাড়ির জলহীন মজা পুকুরে ডুবে গলায় দড়ি দেবো?”
আমি কপট রাগে চিৎকার করে বললাম, “বাহ! তুমি তো দেখছি ভাজা মাছটি উল্টে খেতেও জানো না। তোমার লেজ ধরে তোমার পেটে বসেই তো আমরা চরাচরে চরকি উড়াল উড়বো। তুমি তো মীনকুমারী নাম্নী এই আন্তঃমহাদেশীয় বিমান-হংসীর প্রধান পাইলট। যাও, নিজের কাজ করো।”
আমার দিকে এক ফালি রহস্য হাসি ছুড়ে দিলো সন্ন্যাসী। তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে বললো, “তাইতো। যাই তবে ককপিটে যাই”।
“দাঁড়াও”। হুঙ্কার ছুড়লাম আমি। একখানা খেলনা পিস্তল তার বুকে বাগিয়ে ধরে বল্লাম, “না, আর কোনো উপায় নাই। আমার হাতে তুমি এখন তোমার এই মীনকুমারীসহ ছিনতাই”।
চোখের পলকে সন্ন্যাসী তার প্যারাস্যুট খুললো।
তারপর ঝাঁপ দিলো সুনীল শূন্যে।
অপরূপ সেই চিত্র।
বিশ্ববিহারী সন্ন্যাসী এখন ঝুলন্ত ত্রিশঙ্কুর বিশ্বস্ত মিত্র।

সুনীল সন্ন্যাসী ১৭
হু হু করে হাওয়া। কতদিন যাওয়া হয় না পুকুরঘাটে।
দেখা হয় না দুলে-ওঠা বেণী। লাউডগা সাপের মতো আর কোনো ধারালো দৃষ্টি উড়ে এসে ছোবল মারে না এই বুকে। তুমি কি এখনো সেই শ্যামাঙ্গী কিশোরী?
আমার কেশে পাক ধরেছে ধরুক।
আমি সরুবাঁশের চিকন পাতার আড়বাঁশিতে ফুঁ দেবো আর তোমাকে দেখবো। সন্ধ্যেবেলা পুকুরঘাটে চাল ধুতে এসে তুমি জলে পা দোলাবে। আমি বেহায়ার মতো হাসবো। তুমি চালের ঝুড়ি হাতে কোমর বাঁকাতে বাঁকাতে রান্নাঘরে যাবে; তারপর কেরোসিনের কুপিতে সলতে জ্বালবে। আর আমি নিজেই নিজের কুপি হয়ে জ্বলবো বাঁশঝাড়ে। যুগযুগান্তরের বৈদিক অন্ধকারে।
আমাকে জ্বলতে দেখে মগডাল থেকে উড়ে যাবে এইমাত্র নীড়ে ফেরা এক পাখি। পাখিটি উড়ছে সন্ধ্যাতারার দিকে। আমি অবাক হয়ে দেখি, সেই তারাও জ্বেলে রেখেছে এক অনন্ত কুপি। সেই কুপির আলোয় পথ দেখতে দেখতে সৌরজগৎ পার হয়ে যাচ্ছে উপনিষদের ঋষি। তাঁর মুখে নেই বাঁশপাতার বাঁশি।

সুনীল সন্ন্যাসী ১৮
সাঁকো পার হয়ে সিঁড়ি। তারপর মাটিঘাস, লতাপাতা, আকাশ-উদাস। লামা থেকে ধ্যানরথে উধাও আরোহী। নিজের ভিতর ঢুকে ঘুরে এসে পরাণভুবন, শুঁকে দেখো আপনার ঘ্রাণ। আমিও পরাণী, যদি তুমিও পরাণী। লাঠি হাতে ঘুরে আসি মাটির পৃথিবী। শীতলপাটির বুক মেলে রাখে সুখ। রোদ্দুর উড়ালডানায় হানা দেয় ঘরে। ধ্যানী হও ধ্যানী হও ধ্যানী। পরাণে পরাণ রেখে ধরণী পরাণী। লামা থেকে ধ্যানরথে তুমিও উধাও। চরাচরে, নিজের ভিতরে তুমি নিজ ঘরে যাও। সেতু পার হয়ে সিঁড়ি বেয়ে যাও।
যাবে যদি, আমাকেও সঙ্গে নিয়ে যাও।

সুনীল সন্ন্যাসী ১৯
ফুটে আছে তারায় তারায়। ঝরে যেতে যেতে ফুটে ওঠে নহলি ডগায়। ঘুমেল কুড়ির বুকে দল হয়ে ফুল হয়ে চোখ মেলে সন্ধ্যামালতী। ধরো, গৃহস্থের পঞ্চম তলায়, সরু এক বারান্দায়, ব্রহ্মাণ্ডের মতো ছোট এক টব। সেই টবে পাখি সব করে কলরব। আলো নিভে গেলে ওরা উড়ে যায় অধরা ডানায়। মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে; মানুষের দিকে ওরা ফিরে ফিরে চায়।
তাকায় না কেবল মানুষ। নতুন ফুলের খোঁজে ঘোরে-ফেরে পুরনো মানুষ। তখন ফুলেরা হাসে। তখন পাখিরা হাসে। ওরা বারবার ফিরে আসে পাখি হয়ে ফুল হয়ে আলোর ডানায়। মানুষেরা সব দেখে, সহজে বোঝে না। নতুন পুরনো হয়ে পুরনো খোঁজে না। যেই ফুল সেই পাখি সেই তো মানুষ। এটা নিয়ে সেটা নিয়ে মানুষের শুধু উসখুস।
কলিকাল নয় সত্যকাল। সুনীল সন্ন্যাসী দেখে ঘুরে ঘুরে একাল সেকাল। দেখে আর হাসে। সব কালে আছে মহাকাল। মহাকালে মহাজগতের পাখি উড়ে উড়ে আসে।

সুনীল সন্ন্যাসী ২০
কাছে থাকলে মনে হয় ঘুরে আসি। দূরে থাকলে মনে হয় কাছে আসবোই। সুনীল সন্ন্যাসী ঘোরে গিলগামেশের দেহ নিয়ে অমরাবতীর তীরে তীরে। তুমি সম্রাজ্ঞীর মতো গ্রীবা বাঁকিয়ে সমাসীন শঙ্খশাদা রূপের শরীরে।
এই দেহ নিয়েই আমাদের তাবৎ সন্দেহ। মাটি, জল, আগুন আর বায়ুর সঙ্গে আর কি আছে? কেন আমাদের পুতুলশরীর তৈরি করে না আরেক পুতুল? খনন করতে করতে আমরা খুঁজে ফিরি অন্য এক অধরা। সে কোন প্রত্ন রত্ন? তুমি যাকে খনন বলো আমি তাকে বলি বয়ন। এসো আমরা শয়নে শয়নে বয়ন করি যুগল নয়ন।
অনন্তকাল আমরা ঘর বাঁধবো সেই নয়নেই।
না, আমাদের অন্য ঘর নেই।

সুনীল সন্ন্যাসী ২১
– এতদিন কোথায় ছিলেন?
– কোথাও না। আমি নই বনলতা সেন।
– জানি। তুমি নও বিদিশার নারী।
– কে গো তুমি নাটোরের প্রেমিক আনাড়ি!
– বটে! তুমি কুন্তলে কুন্তলে জটাধারী।
– আজ্ঞে, ঠিক বলেছন।
– তা এই মধ্যনিশীথে কোথায় চলেছেন?
– চলেছি নানাবাড়ি অজন্তার গুহা।
– বড় বিচিত্র তোমার গুহা উহা।
– আজ্ঞে, আমি ঈহার গুহা অজন্তার আদিবাসী।
– কি করো সেই গুহায় বসে? কে তোমার সেবাদাসি?
– আমি আর জায়মান শকুন্তলা তার অধিবাসী।
– জায়মান? এখনো কি জন্ম হয়নি তার?
– না। আমিই আঁকছি তার আকার সাকার।
– আঁকছো? তা কি কি আঁকছো আগে-পিছে?
– চুল-ভুরু-ঠোঁট-বাহু-বুক-নিতম্ব-নাভি, তার নিচে ,,,
– বাহ! তা এই আঁকিবুঁকি শেষ হবে কবে?
– কণ্বকন্যা সেই অনঙ্গযৌবনার মন পাবো যবে।
– কোথায় তার মন? পাবে কখন?
– খুঁজে চলেছি তপোবন থেকে ত্রিভুবন।
– পাবে ঋষি পাবে। চালাও এই কৃষি।
– ঘুরছি তো ঘুরছি। হালে ফালে দিবানিশি।
– চড়কের চরকিতে ঘোরো ত্রিভুবন।
– কবি, কবে পাবো তার দরশন?
– পাবে না ঋষি, সহজে পাবে না।
– তা পাবো না কতক্ষণ?
– যতক্ষণ শকুন্তলার মনে
জন্ম নেবে না তোমার মন।

সুনীল সন্ন্যাসী ২২
মর্ত্যলোকে সব মানুষ ও প্রাণী মূর্ত ও পরিমেয়। লোকে বলে, শুধু তার অন্তরাত্মা অপরিমেয়। তবে তারা সতত ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত। মূর্ত চায় মূর্তকে, পরিমেয় খায় পরিমেয়কে। কেউ কাউকে ছাড় দেয় না। পুঁটি যায় শোলের পেটে, শোল যায় বোয়ালের পেটে, বোয়াল যায় মানুষের; মানুষ যায় কার পেটে? এসব না ভেবেই পিঁপড়ের দল সারি বেঁধে পথ চলে হেঁটে হেঁটে। তারা নির্ভাবনায় মরা আর অমরাকে খায়; খেতে খেতে বেমালুম পিষ্ট হয় ক্ষমতান্ধ মানুষপ্রাণীর পায়ের তলায়। তারপর এই বিশ্বব্রহ্মাÐের বিছানায় ঘুমায়।
মানুষ তা করে না। মানুষ নিজেই নিজের আইন করে, নিজেই তা ভাঙে। দ্বিতীয় কারুর তোয়াক্কা করে না। মানুষ শুধু ক্ষমতা ও অমরতার লোভে আমৃত্যু তড়পায়।
সক্রেটিস একজন জ্ঞানী পিঁপড়ে।
সক্রেটিস জেনেশুনে ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়।
সক্রেটিস জেনেশুনে চুমুক দেয় হেমলকের পেয়ালায়।

সুনীল সন্ন্যাসী ২৩
শৈশবের সেই নদী; নদীর উপরে সেই সাঁকো। পেরোতে চাই না নদী, তবু কেন ফিরে ফিরে ডাকো! অনন্তনদীতে কোনো সাঁকো নেই; পারো যদি, সে নদীর সাঁতারুকে আঁকো। উড়ে যায় শাদা বক, বাঁকে বাঁকে তাকে ধরে রাখো। উড়ালু পালকে তার সাঁতারের জলগন্ধ মাখো।
যেতে যেতে ডেকে যাও, যেতে যেতে জলেস্থলে নীলিমাকে রাখো। জলেস্থলে অথৈ আঁধারে আর বায়ুতে আলোতে নীলিমার সাঁকোধনু আঁকো।

সুনীল সন্ন্যাসী ২৪
রাত এলেই আমি জেগে থাকি নিদ্রায় নিদ্রায়। মুহূর্তেই অনিদ্রা আমার চোখের পাতায় পাতায় পাক খায়। বলে, চলো আমার ঘরে চলো। আমি তোমাকে নিয়ে শিবনৃত্যে মেতে উঠবো। এই চরাচরজুড়ে এই অ্যাম্ফিথিয়েটারে। সাত দিন সাত রাত নাচবো বিরামবিহীন। তারপর আমরা হবো পরস্পরাধীন।
নগ্নতনু ঝাঁকিয়ে বাঁকিয়ে ফণা তোলে সফেন অহিফেন। আমি তার মুখোমুখি হই প্রতি-নৃত্যে। আমি চন্দ্রিমার কোলে স্বয়ম্ভূ শয়নে প্রশান্ত পরিতৃপ্ত। হাত গুটিয়ে পা ভাঁজ করে হাঁটুমুড়ি। নই আমি মোটেও অধীর। আমি বিকশিত ভ্রুণের শরীর। আমার কোনো তাড়াহুড়া নেই। আমি নিদ্রাজননীর গর্ভে ধীরস্থির।
তারপর?
তারপর যখন চোখ মেলে তাকাই, আমার চারপাশে নেচে ওঠে আলোকিত অন্ধকার। আমার দশপাশে জ্ঞান ও নির্জ্ঞানের যুযুধান হুঙ্কার। আমি তখন না মানুষ না লুসিফার।

সুনীল সন্ন্যাসী ২৫
দিন কয়েক কোথায় যেন বেমালুম উধাও হয়ে গেছে সুনীল সন্ন্যাসী। তিনভুবনের কোথাও তার হদিস নেই। দরিয়ানগরে যাবার নাম করে সেই কবে ডুব দিয়েছে প্রতিবিশ্বের আয়নামহলে। যেখানে এখন চিরজীবিত মহামতি হকিংস ও তাঁর সাঙ্গপাঙ্গদের রাজত্ব। নিজেই সে নিজের গণনাযন্ত্র। স্বচালিত স্বয়ম্ভূ বাহনে চড়ে স্বেচ্ছাবন্দি স্বচ্ছতম দেয়ালঘেরা পদ্মভবনে। শুরু আর শেষ যেখানে অভিন্ন বিস্ফোরণে বিলীন। তবু দিন আসবেই, দিন।
ফাটাও, তাহলে ফাটাও। ফাটাতে ফাটাতে সামনে আগাও। কোটি কোটি পারমাণবিক বোমা ফাটিয়েও আর ঘুম ভাঙানো যাবে না সেই সচেতন নিদ্রাদেবতার। সেই অনন্ত-কুম্ভকর্ণের।
এখন কাজ বটে কবির। অন্য কারুর কাজ এখানে তেমন নেই। যেহেতু বস্তুর সঙ্গে বস্তুর সংঘর্ষ এখানে সর্বাংশে অকার্যকর। এখানেই ঘর বেঁধেছেন হাছন-লালন। এখানে কোনো রাজা বাজার বসায়নি শূন্যেরই মাঝার।
তবে সাবধান! মধ্যনিশীথে যে কোনো অপুষ্ট ভ্রুণের জন্মমুহূর্তেই হঠাৎ তাকে দেখা যেতে পারে ত্রাণকর্তার ভ‚মিকায়। যদিও নিজেই সে এক অবিকশিত ভ্রুণ। উড়তে চায়, অথচ এখনো হাঁটাই তো শেখা হলো না তার।

সুনীল সন্ন্যাসী ২৬
কবিতার খোঁজে প্রথম বেরিয়েছিল বনমানুষ। কেননা বনেই তার জন্ম। যে বনে তার জন্ম তার নাম ইডেন। তার মা ছিল না, বাবা ছিল না।
অনাথ শিশু জন্মেই চিৎকার করে কেঁদে উঠেছিল ওঁয়া বলে। ওঁয়া থেকে মা। তারই প্রথম অশ্রুর ফোঁটা থেকে জন্ম নিলো তার মা। অতঃপর জাতকঅশ্রুর দ্বিতীয় ফোঁটায় মুখ বাড়ালো বাবা। অর্থাৎ যে জাতক সেই জনক সেই জননী।
অনাদিকালের
তাবৎ মানুষ
সুপ্ত-ধৃত সেই
প্রথম বনমানুষে।
সেই আদি উপত্যকার যুগল জলঝর্নার স্রোতে তার প্রথম অবগাহন। নিজে নারী নিজে পুরুষ, সে হয়ে উঠলো পরম বীর্যের আদি কারবারি। ক্ষুধা ও তৃষ্ণা তার আদি ভাষা; তার আদি আহার আশা ও হতাশা।
শূন্য থেকে এক,
এক থেকে দুই,
দুই থেকে অসংখ্য।
না, খুব কঠিন নয় এই অঙ্ক।
এই অঙ্ক করেছেন জাতক স্বয়ং।
যখন বুদ্ধিকে পাশে ফেলে তার বনে জন্ম নিলো মন। বনেই উঠলো চাঁদ, বনেই ঘটলো পরমাদ।
বন থেকে মন।
বনমানুষ থেকে মনমানুষ।
এই বনেই আদি রাম
হারালো আদি সীতা।
এই বনেই জন্ম নিলো
ব্রহ্মাণে।ডর স্বয়ম্ভূ আদি কবিতা।

সুনীল সন্ন্যাসী ২৭
হঠাৎ নীলিমা থেকে
লাফাতে লাফাতে
মাটির পৃথিবীতে নেমে এলো
আমাদের উধাও সন্ন্যাসী।
– বাপু, লাফাচ্ছো কেন?
– আজ্ঞে, ওপরে ওঠার
হাওয়াই দাওয়াই লাফ।
নিচে নামারও তাই সই।
তারপর মই।
– তারপর?
– তারপর অচল বা সচল সিঁড়ি।
তবে এখন হচ্ছে সুপারসনিক ইনজিন।
কালে হালে আরো অত্যাধুনিক ব্যবস্থা
বিবর্তিত হবে নিঃসন্দেহে। তবে সব
ব্যবস্থার সেরা ব্যবস্থার নাম
যথাসময়ে যথাস্থানে ধ্যানজ্ঞান
আর খাঁটি সরিষার তৈলপ্রদান।
– বাহ, বেশ বলেছো!
– তৈল পেলে চারকুড়ি বছর
বয়সী নতমুখী জননযন্ত্রও
চকিতে সপুংষক হয়ে ওঠে।
– আজ্ঞে, ল্যাঙড়াও পাহাড়ে ছোটে।
– বটে, খোজা নফরও দিল্লির সম্রাট হয়ে যায়।
– অতএব তৈল তৈরি ও প্রদান শ্রেয়;
আর মর্দনরীতি রপ্ত করাও বিধেয়।
– এই কলিকালে অধমের উত্তম
হওয়ার এ হচ্ছে অব্যর্থ মন্ত্র।
বলতে বলতে জোছনারাতে
একবাটি খাঁটি সরিষার তৈল হাতে
আকাশ থেকে মাটিতে নেমে আবার পাতালবাসী
আমাদের শ্বেতশুভ্র শ্মশ্রুধর সুনীল সুন্ন্যাসী।
তার মুখে সে-কি মধুরেণ মেহেদি হাসি!

সুনীল সন্ন্যাসী ২৮
পতঙ্গগুলো মারা যাচ্ছে, কীটেদের অন্তরাত্মা খাঁচা ছাড়া হচ্ছে। প্রকৃতি তার প্রাণপ্রাচুর্য হারাচ্ছে। কীটপতঙ্গহীন জীবজগতে শেষমেশ কি শুধু মানুষই বেঁচে থাকবে?
কতদিন বেঁচে থাকবে মানুষ? কীটপতঙ্গ উজাড় করে মানুষ উজাড় করছে আপন উদ্যান। রচনা করছে পত্রপল্লবহীন মরুভ‚মি। তাতে নেই একটিও মরুদ্যান। কেননা ফুল ছাড়া উদ্যান হয় না। আবার কীটপতঙ্গ ছাড়া ফুল হয় না।
ফুল থেকে ফল। ফুলফল ছাড়া ধরনী অসফল। শরীরের কোষে কোষে ফুল ফুটিয়ে এই মানব শরীরটাকেই জীবন্ত বাগান বানায় ব্যাকটেরিয়া।
ওরাই সচল হিয়া। যে হিয়ার মাঝে লুকায়, সে অনশ্বর। এই চন্দ্রসূর্য এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তার ঘর। সে সরে যায়, মরে যায় না। এক ঘর থেকে আরেক ঘরে হিজরত করে।
সে কি খুব ছোট? মানুষের চেয়ে কত ছোট? মানুষ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের চেয়ে কত ছোট? কোষ নেই তো জীব নেই, জীবন নেই, মানুষ নেই। মানুষের কোষে কোষে পতঙ্গপ্রাণ। অঙ্গে অঙ্গে পতঙ্গ অমর। ঘ্রাণ নাও, সেই অমরার অণুঘ্রাণ।

সুনীল সন্ন্যাসী ২৯
পথ একটা ছিল না, পথ ছিল বহু। যেদিকে কেউ হাঁটেনি সেদিকে কোনো পথ যায়নি। পায়ের পাতা বা গাড়ির চাকা বা মনের বাসনা ছাড়া কোনো পথ তৈরি হয় না। আমি সেই পথহীনতার মধ্যেই তৈরি করেছি আমার পথ। কেননা পথের দূরতম গন্তব্যে ছিলে তুমি। যেখানে আর কেউ কোনোদিন যায়নি। তোমার ডাকে আমার মন সেদিকে পা ফেললো অনন্তকাল। আর তুমি অনন্তকালের গন্তব্যে দাঁড়িয়ে আমাকেই শুধু ডাকতে থাকলে। সেই থেকে আমি শুধু তোমার দিকেই হেঁটে-উড়ে ঘুরে-ঘুরে যাচ্ছি। জগতের তাবৎ পথ আমার পায়ের তলায়। সব পথ মিলে এক পথ। সে পথের শেষে আমার গন্তব্য শুধু তুমি। না, আমার নেই দ্বিতীয় কোনো মনভ‚মি।

সুনীল সন্ন্যাসী ৩০
না, আমার মানবচোখ তোমাকে দেখে না।
আমি অতিমানব হয়ে নীলিমার নীলে বিছিয়ে রাখি আমার দৃষ্টিজাল। না, তুমি ধরা পড়ো না। আমি নিরুপায় হয়ে যাই। না, তোমার আর কি কোনো চোখ নাই?
আমাকে বিপর্যস্ত দেখে আমার সামনে এসে দাঁড়ায় আমারই ভিন্নরূপ সুনীল সন্ন্যাসী। বলে, দাও, আমাকে তোমার ক্যামেরাটা দাও।
আমি বললাম, কেন?
সে বলল, আমি তুলে আনবো তার আলোকরূপ।
আমি বললাম, আমি তো চাই আসল রূপ।
ও বলল, ঠিক আছে, আগে আলোকরূপটাই দেখো, তারপর আসল রূপ পেলেও পেতে পারো।
কিছুটা নিমরাজি হয়ে আমি তার হাতে তুলে দিলাম আমার অভিন্নতম মনক্যামেরাটাই। বললাম, যাও, ঘুরে আসো তিনভুবনের ভিতরবাহির। তুলে আনো সব খÐ সত্তা ও একমাত্র অখণ্ড রূপ।
মুহূর্তেই জগতের বৃহত্তম ডানা হয়ে সে উধাও হলো ভুবনে ভুবনে। আমি অবাক বিস্ময়ে দাঁড়িয়ে রইলাম এক অনড় বিন্দু।
অতিবাহিত হলো দ্রুততম তিন মুহূর্ত। তৎক্ষণাৎ প্রচণ্ডতম সৌরঝড়ের বুক থেকে বেরিয়ে এলো সশরীরী সুনীল সন্ন্যাসী। মাথা নিচু করে আমার হাতে তুলে দিলো আমার মনক্যামেরা ও একটি ক্ষুদ্রতম আলো-এলবাম।
আমি বললাম, ধন্যবাদ বন্ধু, ধন্যবাদ।
সে বললো অবনত মস্তকেই, না, আমার প্রাপ্য অর্ধ-ধন্যবাদ; পুরো ধন্যবাদ নয়।
– কেন?
– আমি তুলতে পেরেছি তিনভুবনের সব খণ্ড বস্তু ও অবস্তুর আলো-রূপ। আমি দেখিনি কোনো অখণ্ড অভঙ্গ সত্তারূপ। তাই তার কোনো একক রূপ তুলতে আমি ব্যর্থ হয়েছি।
হঠাৎ আমার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়লো এক বিষণ্ণতম প্রসন্নতা। আমি বললাম, তুমি তোমার কাজ করেছো, এবার আমার কাজ আমার।
আমি সেই ক্যামেরা ও এলবাম ফিরিয়ে দিলাম আমার মনের ঘরে। তারপর শুরু করলাম কাজ। শুরু থেকে শেষ তক এখন আমিই একমাত্র আমার সূত্রধর।
এলবাম খুলে আমি প্রসারিত করলাম আমার আত্মার তীব্রতম দ্রুততম পবিত্রতম বুনন-দৃষ্টি।
সে এক অবিশ্বাস্য সৃষ্টিকাণ্ড। সব খণ্ড বস্তু ও অবস্তুর সত্তারূপ ঘূর্ণিবলয়ে অন্বিত হতে হতে মুহূর্তেই আবিভর্‚ত হলো এক অখণ্ড সত্তারূপ। তারপর গ্রাস করলো আমার শরীরমন ও অভঙ্গ ত্রিভুবন।
বলল, যে আমাকে বুনতে জানে না সে আমাকে দেখে না। যার বুনন, দেখার ক্ষমতাও শুধু তার। তুমি বুনেছো, তুমি দেখেছো।
আমি বললাম, আমি দেখলাম। আমি তোমারই সমগ্রতায় সমর্পিত হলাম।
কানে কানে কি যেন বলল আমার মন।
সঙ্গে সঙ্গে হেসে উঠলো অভঙ্গ ভুবন।

সুনীল সন্ন্যাসী ৩১
বন্ধ যখন লেফট-রাইট-লেফট, শুরু তখন অস্ত্রসমর্পণ।
তখন রেসকোর্সে বারুদজীবীদের নিশর্ত বস্ত্রসমর্পণ।
তখন ক্ষমতাধর দখলরাজেরও নির্লজ্জ নগ্ন সন্তরণ।
তারপর অস্তরাগের গগনে গগনে অরুণোদয়ের অগ্নিধ্বনি।
বঙপ্রজাতির মুখে মুখে পঙ্খিজনতার বংশীধ্বনি।
হায় রে হায়! হাত-বাঁধা হানাদার জেনারেল যায়!
ঘোড়ার আস্তাবলে মুখোমুখি বিজেতা ও বিজিত।
ইতিহাসে এভাবেই কি জয়পরাজয় অভিনীত?
কেউ পাতি নেতা, কেউ জাঁদরেল সামরিক অভিনেতা।
এই মরলোকে মৃত্যুভয়ে কেউ কেউ স্ব-সত্তা বিক্রেতা।
কেউ কাউকে দেখে না, শুধু বন্ধচোখে স্বাক্ষর রাখে।
জনতা সুনীল আকাশে লালসবুজের পতাকা আঁকে।
শিখা অনির্বাণ থেকে উদ্যানময় ছড়িয়ে পড়ে অগ্নিবৃষ্টি।
দৃষ্টিতে দৃষ্টিতে বংশপরম্পরায় পুনরায় গোলাপের সৃষ্টি।
বীরবাঙালি তখন জাতিকবিময়, জাতিযোদ্ধা জাতিপিতাময়; যদিও সময় কখনো অসময়, অসময় শেষমেশ সুসময়। নদীমাতৃক এই দেশ ঋতু পরম্পরায় অনন্তর নবান্নময়। পদ্মা মেঘনা যমুনার ঢেউয়ে ঢেউয়ে ইতিহাস কথা কয়। পলাশে ও কৃষ্ণচ‚ড়ায় জ্বলে ওঠে বিজেয়ের আতশবাজি। শুধু বিজিতের চোখ ডানে বামে কোনোপাশে তাকাতে নিমরাজি।
স্বেচ্ছা-অন্ধের সামনে যখন এভাবে দাঁড়িয়ে পড়ো চোখ খোলা রেখে, তখন খুব তড়িঘড়ি সুনীল সন্ন্যাসী নেমে আসে নক্ষত্রলোক থেকে; প্রশ্নে প্রশ্নে বিস্ফারিত তার নেত্র : “আমি তো দেখেছি কত কুরুক্ষেত্র কত পানিপথ কত লেনিনগ্রাদ কত পলাশী …তবু এখনো মানুষ কেন মানুষেরই সেবাদাস কিংবা সেবাদাসি?”
সদুত্তর জানে যারা তারা দুর্গ গড়ে ঘবে ঘরে; জনতারা জাতিস্মর, জন্মের অনতি পরে মায়ের কোলেই তারা স্বজাতির পোশাক পরিধান করে; যৌবনে তারাই স্বাধীনতার জন্য আমৃত্যু অস্ত্র ধরে।
মানুষ মূলত মুক্ত; আশৈশব বস্ত্রময় অস্ত্রময় সম্ভ্রমময়;
নির্বস্ত্র নিরস্ত্র ছাড়া মানুষ কখনো মানুষের দাস নয়।

সুনীল সন্ন্যাসী ৩২
এই বুক থেকে বের করে ছড়িয়ে দিলে বুকে বুকে। যা ছড়িয়ে দিলে তা কি হয়?
না, তা শোণিত নয়, মাংস নয়, স্নায়ু নয়, হৃৎপিণ্ড নয়, বোধ নয়, বোধি নয়, অনুভ‚তি নয়, আশা নয়, হতাশা নয়, মিলন নয়, বিরহ নয়, ভালোবাসা নয়, পাওয়া-না-পাওয়া নয়, চাওয়া-না-চাওয়া নয়, নাওয়া নয়, খাওয়া নয়, হাওয়া নয়।
যা ছড়িয়ে দিলাম তা আমার আমি, তা তোমার তুমি। এই হৃৎপিণ্ডে একবার এক সশব্দ মৃদু ওঙ্কার, তারপর ত্রিভুবনজুড়ে প্রলয় হুঙ্কার; ওঙ্কারে-হুঙ্কারে দ্রিমিকি দিমিকি দ্রাক দ্রাক; জীবনমৃত্যুর ঢুলী মুহূর্তে মুহূর্তে বাজায় তার ঢাক।
শিবনৃত্যে ভুবন মাথায় তোলে উদ্বাহু সুনীল সন্ন্যাসী। ম্ফুলিঙ্গ ফোটায় রাশি রাশি আতশবাজি। ধ্বনি নেই তো ওঙ্কার নেই, হুঙ্কার নেই; মানুষপ্রাণীর হৃৎপিণ্ডে কোনো বাজনা নেই।
নেই তো নেই; হে মহাবিশ্বরাজ, তোমার জন্যে আমার আর তার আর কোনো খাজনা নেই।
মিনতি করি ওগো রাজাধিরাজ, “দাও, দাও; আমার বাজনা আমাকে ফিরিয়ে দাও; আমার বাজনা কেবল আমাকেই বাজাতে দাও; তুমিও তোমার খাজনা পুরোপুরি বুঝে নাও।
তুমি আমার করের রাজা, আমি তোমার করের প্রজা; তুমি করগ্রহীতা, আমি করদাতা। দাও কর নাও কর; হে জগৎস্বামী, আমি তোমারই অনুগামী। তুমি তো অনন্ত অমর। তুমি অমর হলে আমারো নেই মরণের ডর। এক ভুবনে এক ভবনে আমাদের চির-ঘর।”

সুনীল সন্ন্যাসী ৩৩
– এতো কি ভাবছো?
– অনেক কিছু।
– কখন শেষ হবে সব ভাবনা?
– যখন তুমি নিজেই কিছু ভাববে না।
– কেন ভাববো না?
– সেদিন সব ভাবনার ঊর্ধ্বে থাকবে তুমি।
– তাহলে কে ভাববে?
– যারা থাকবে তারাই ভাববে।
– তারা কারা?
– যারা শত্রু, যারা মিত্র।
– যারা শত্রু নয়, যারা মিত্র নয়?
– তারা তোমার আমার কেউ নয়।
– কেন নয়?
– তোমার অস্তিত্ব তাদের কাছে অপাঙ্ক্তেয়।
– তাহলে কে কার পাঙ্ক্তেয়?
– যে যার সহযোগী, যে যার প্রতিযোগী।
– যে আমার শত্রু সে আমার মিত্র,
কেননা আমরাই তো আদিগুরুর সতীর্থ।
– বাহ্! তাহলে তীর্থ থেকে তীর্থে যাও, আমাকেও নাও।
– দাও, হাতে হাত দাও,
একা তুমি একা আমি মুহূর্তে উধাও।

সুনীল সন্ন্যাসী ৩৪
পাথরে রেখেছি পা, নীলিমায় ডানা;
আমার ডোবায় আমি আজো ডানকানা।
আজো আমি কাদার শরীরে খুঁজি পলির পরাগ।
ফুলে ফুলে রেখে যাই অলি অনুরাগ।
যদিও সুচালো হুল বিষের বাহন;
ফুরায় না এই বুকে তোমার দাহন।
শামুকের খোলে আমি ঢেকেছি শরীর;
লতায় পাতায় বন্দি মন অনধীর।
আমাকে পাবে না তুমি সাজানো বাগানে।
তুমি যদি বামে যাও আমি যাই ডানে।
আমার এমন রীতি, এমন পীরিতি;
শুরুর উড়াল আছে নেই তার ইতি।
আমার ডোবায় আমি আছি ডানকানা;
ডোবাও যে ত্রিভুবন সে সত্য জানো না?
জানে এই সত্যমিথ্যা আমার হৃদয়;
আমার হৃদয়ে তুমি : সে কি সত্য নয়?

সুনীল সন্ন্যাসী ৩৫
আমিও
জোনাকি
যদি
তুমিও
জোনাকি;
আজ
রাতে
জোনাকিই
জোনাকি
আহার;
পাহাড়ি ঝর্নার স্রোতে
জোনাকির উজান সাঁতার;
উপত্যকা, বনহরিণীর সিনা,
বাঘিনীর ঘাড়;
আজ রাতে জোনাকিই
জোনাকি আহার;
আমরা চলেছি ভেসে
অনঙ্গবালার দেশে বনে;
যুগলাঙ্গে শৃঙ্গারোহী
নীলিমায় নীল শীর্ষাসনে;
পাখিরা শৃঙ্গারসুখী নীড়ে;
আঁধারে তারার বাতি
আমাদের ঘিরে;
ছায়ার মায়ারা হাসে
মন চিরে চিরে;
এসব দেখেছি শুধু
জোনাকির ভিড়ে;
ত্রিভুবন
জ্বলন্ত
জোনাকি;
আমিও
জোনাকি
যদি
তুমিও
জোনাকি।

সুনীল সন্ন্যাসী ৩৬
নিশিরাতে আবার আমাদের বাড়ির পুকুরের উত্তর-পশ্চিম কোনার বাঁশঝাড়ে এসে নামলো সুনীল সন্ন্যাসী। এমনভাবে নামলো টের পেল না কাকপক্ষীও। তারপর বড়শি ফেললো পুকুরে। রাতবিরেতে ছোটবড় সব মাছ ঘুমিয়ে থাকে। ঝাঁকি জাল বা টানা জাল বা লুই দিয়ে ধরা সহজ। বড়শি সহজে কাজে আসে না?
– কী মাছ ধরতে চাও তুমি?
– না, আমি তো মাছ ধরতে চাই না!
– তাহলে বড়শি ফেললে কেন?
– বড়শি কিভাবে ফেলতে হয় শেখার জন্য।
– শিখে কী করবে?
– আকাশেও বড়শি ফেলবো।
– কি করবে আকাশে?
– নানা জাতের নক্ষত্র ধরবো।
– আকাশে কি পুকুরের মতো জল আছে?
– সব জল তো আকাশ থেকেই নামে।
– নক্ষত্র কি করে আকাশজলে?
– শোল-বোয়াল-পুঁটির মতো তড়পায়?
– তাতে তোমার ক্ষতি কি?
– আমার কোনো ক্ষতি নেই। ক্ষতি নক্ষত্রেরই।
– কিভাবে?
– তড়পাত তড়পাতে ওরা মারা যায়।
– বেশ তো, যাক।
– না না। এভাবে আকাশ নক্ষত্রশূন্য হতে দেওয়া যায় না। তাতে মানুষেরই ক্ষতি।
বলতে না বলতেই আকাশ রঞ্জিত করে একটি নক্ষত্র জ্বলে-পুড়ে ছাই হয়ে গেলো। সকরুণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইলো সন্ন্যাসী। তারপর বললো, “চলো, আমরা মাটির পুকুরেই নক্ষত্রের চাষ করি। পুড়ে ছাই হওয়ার আগে সবজাতের পোনা সংগ্রহ করি।”
আমি বললাম, “এই প্রথম তোমাকে শতভাগ আবোল-তাবোল বকতে শুনলাম। আসলে তোমার কথার কোনো মানে নেই।’’
– সেটাই তো মানে। যা কিছু অর্থহীন তাকে অর্থময় করে তোলাই আমার কাজ। এটিই উদ্ভাবন।
– কিভাবে?
– শূন্য থেকে সৃষ্টি করেন স্রষ্টা। সেটাই সৃষ্টি।
অন্যসব কিছু নকল। স্রেফ অনাসৃষ্টি।
মুহূর্তেই বন্ধ হলো আমাদের তর্ক-ধাঁধা।
ততক্ষণে সন্ন্যাসীর সমর্থনে আকাশ থেকে
নেমে এসেছে অঝোর ধারার বৃষ্টি।
সেদিকেই নিবদ্ধ আমাদের দৃষ্টি।

সুনীল সন্ন্যাসী ৩৭
বহুদিন পর ঢাকার ন্যুমার্কেটে ঢুকলাম। গন্তব্য অকালপ্রয়াত কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর অনুজ একালের খ্যাতিমান চক্ষুচিকিৎসক প্রফেসর সাইফুল্লাহর চেম্বার। আমার বর্তমান সমস্যা দৃষ্টিভ্রম। ডান চোখে অস্ত্র হয়ে গেছে, বাম চোখেও হবে। অহেতুক দেরি করছি আমি নিজেই। সব কিছু এখনো দেখতে পাই। মাঝে মাঝে কেমন ভেঙে ভেঙে যায়, ছায়া হয়ে যায়। চেনা আর অচেনা গুলিয়ে যায়। চিকিৎসক কি আমার এই দৃষ্টিভ্রম সারাতে পারবেন?
সেই কবে উনিশশ পঁয়ষট্টি সালে প্রথম এই মার্কেটে পা রেখেছি। সেদিনের নলেজ হোম বা কাদের খান নেই। তার ছোটভাই প্রগিতর কবীর খানও এখন গৃহবন্দি। মনিকো-র আড্ডা নেই; সেই আড্ডার প্রাণ সেকালের কবিতার পাদ্রী শহীদ কাদরীও নেই। ষাটের বাঙালি রাঁবো আবুল হাসানও মহাকালনিবাসী। হাড়ের পাহাড়ের কবি মনিকো-র কর্মী রফিক উধাও। না, একালের কোনো তরুণ তুর্কীর সঙ্গেও দেখা হলো না।
তবু অকারণে দুবার পাক খেলাম বইয়ের দোকানে দোকানে। নিউ লাইফ ফার্মেসিতে গিয়ে চোখের হোমিও ড্রপ কিনলাম। তারপর ফিরে আসার পথে বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ সোসাইটির বইয়ের দোকানে গেলাম। কথা বলিছিলাম প্রকাশক জাহাঙ্গীরের সঙ্গে।
হঠাৎ ষাটোর্ধ্ব এক শ্যামাঙ্গিনী আমার দিকে এগিয়ে এলেন। তাঁর হাতে মৎপ্রণীত গদ্যগ্রন্থ ‘আমার মাটির কায়া।’
– কেমন আছেন কবি? আমি মেঘলা। আপনার ডাকনাম যেন কি? রোদ্দুর, তাই না?
– জি, রোদ্দুর। তবে আপনাকে আমি ঠিক …
– সাড়ে চারদশক পর তো। মনে থাকার কথা নয়।
– চোখ ভালো নেই। কিছুটা আবছা দেখি।
– বিশে জানুয়ারি, উনিশশ উনসত্তর, মেডিকেলের পাশে রশিদ বিল্ডিংয়ের সামনে ছাত্রজনতার মিছিল, পুলিশের গুলিতে ছাত্রজনতার বুক রক্তাক্ত … মনে পড়ে আর কিছু …
– হ্যাঁ, মনে পড়ে। রায়ট কারের লালপানিতে আমার জামাকাপড় লাল। ভীষণ জ্বালা করছিল চোখ। আমি প্রায় কিছুই দেখছিলাম না।
– আমি সেই মেঘলা। আপনাকে হাত ধরে মেডিকেলের গেটে ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম আমি আর আমার সহপাঠী সাগর।
[দুই]
আরো দুএকবার দেখা হয়েছিল মেঘলার সঙ্গে। পাঠাগারের সামনে, সিঁড়িতে বা মিছিলে। শ্যামলা মেঘলা অবলা নয়, বরং সরলা ও সংগ্রামশীলা। আপসহীনা। ভার্সিটির অনেক তরুণ কবির মতো তখন তাকে নিয়ে আমিও দুএকটা চরণ ফেঁদেছি। সেগুলো মেঘলারও দৃষ্টি এড়ায়নি।
এক দুপুরে ঠা ঠা রোদে কলাভবন থেকে লাইব্রেরি যাওয়ার পথে হঠাৎ দেখা। মৃদু হেসে বললো, কথা আছে আপনার সঙ্গে। তবে অন্যদিন বলবো। এখন মিছিল যাচ্ছি। আপনি যাবেন না?
হেসে বললাম, যাবো।

[তিন]
মিছিলের মেয়ে মেঘলার সঙ্গে তারপর থেকে আর দেখা হয়নি। কিন্তু কী বলার ছিল তার, যা আজো বলা হয়নি? মেঘলার মনে যাই থাক, কবির মন চেয়েছিল এক দ্ব›দ্ববিধুর সংলাপ।
একটি নমুনা :
– সবাই আমাকে দেখে, আপনি দেখেন না কেন?
– আপনার দিকে তাকালে আমি যে অন্ধ হয়ে যাই!
– আর কতদিন মিথ্যে বলবেন?
– যতদিন আপনাকে দেখবো ততদিন।
– আমি তো সর্বক্ষণ আপনারই মুখোমুখি।
– সরে যান, আমার দৃষ্টি থেকে সরে যান।
– সরে গেলাম। এখন?
– জলেস্থলে অন্তরীক্ষে এখন শুধু আপনি আর আপনি।
[চার]
না, মেঘলা আর আমার সম্বোধন কখনো আপনি থেকে তুমি-তে নামেনি।
[পাঁচ]
মেঘলা চলে গেলো।
কানে কানে কে যেন শুরু করলো ফিসফিস।
আমি চোখ বন্ধ কর বললাম, ‘কে তুমি হে মন্ত্রণাদাতা? তুমি কি সুনীল সন্ন্যাসী, নাকি মেফিস্টোফিলিস?’
উত্তর এলো, ‘আমি না কায়া না ছায়া। আমার বয়স এখনো একুশ।’

সুনীল সন্ন্যাসী ৩৮
যেমন কালবোশেখি ঝড়ের জন্য অপেক্ষা করে আকাশ-ধরণী আর শতবর্ষী অশ্বত্থের ডানা, তেমনি আমার অপেক্ষা শুধু তোমার জন্য। তুমিও কি অপেক্ষা করছো অন্য ঘরে অন্য কোনো অতিথির জন্য?
ভালোবাসার আঁচল ধরে টান মারে ঈর্ষা।
তাই এই প্রশ্নটা মনের ভিতর হাঁ করে দাঁত দেখায় হাঙরের মতো। তবে সেই দেঁতোটাকে সেভাবেই ঠেকিয়ে রাখি, কোনো কিছু উচ্চারণ করি না। বরং মুখে অমলিন হাসি ফুটিয়ে কালিদাসের মতো নিজের বসা ডালটা নিজেই কাটি আর বলি, ‘কখন আসবে তুমি?’
তখনি কেমন যেন বন্য হয়ে ওঠে সুনীল সন্ন্যাসী।
হঠাৎ হাওয়া থেকে বের হয়ে আসে তার চণ্ডমূর্তি, চোখেমুখে আগুনের হল্কা, হাতে দুধারী কৃপাণ।
সে-ই উত্তর দেয়, ‘না, আসবে না’।
আমি সবিস্ময়ে জিজ্ঞেস করি, ‘কে আসবে না’?
– যাকে আসতে বলছো সে আসবে না।
– সে কে? তাকে কি তুমি চেনো?
– জানি না সে কে। তবে তাকে দেখেছি।
– কিভাবে দেখলে?
– তোমার প্রশ্ন শুনে তাকে দেখার সাধ হলো। তাই মন খুললাম আর দেখলাম।
– বাহ্! তাকে কোথায় দেখলে?
– বোকা! সে তো বসে আছে আমারই মনের সিংহাসনে!
– বেশ তো। তা হলে তো নিরাপদেই আছে।
– তা তো থাকবেই।
– তার সঙ্গে কোনো কথা হয়েছে?
– না, এখনো হয়নি। তবে হবে।
তার মুখে ঝিলিক দিলো বিজয়ীর হাসি।
হাসি তো নয়, যেন চোখ ধাঁধানো চাবুক, যেন কালবোশেখির আকাশচেরা বজ্রবল্লম।
আমারও কম হাসি পেলো না। তাহলে আমার মূল প্রতিদ্বন্দ্বী আসলে সে, যে আমার অনঙ্গ থেকে বের হয়ে ত্রিভুবন ঘুরে এসে আমারই অঙ্গে অঙ্গে রাজপ্রাসাদ গড়ে। প্রজা সেজে পুণ্যাহে খাজনা দেয়, চৈত্রসংক্রান্তি এলে হালখাতা খোলে, কিংবা খুব ভোরে হালের জমিতে গিয়ে মাটির সানকিতে পুঁটি ও পান্তা মিশিয়ে আমানি খায়।
ভাবতে ভাবতেই পুবের আকাশ রাঙিয়ে উদিত হলো ভাতের গোল থালার সমান সকালের লাল সূর্য।
আমি অস্ফুট স্বরে বললাম, শুভসময়।
সন্ন্যাসী নির্লিপ্ত স্বরে বললো, শুভসময়।
আমরা ভুলে গেলাম আমাদের নাম।
আমরা তখন মুখোমুখি একজোড়া সূর্যপ্রণাম।

সুনীল সন্ন্যাসী ৩৯
দিনটা ছিল এগারো এপ্রিল দুহাজার উনিশ।
সকালে ঘুম থেকে উঠে যথারীতি হাঁটছি আর আত্মবিবরে অনঙ্গ সাঁতার কাটছি। তখনি দরোজার ওপারে খসখস শব্দ শোনা গেল। হকার নিশ্চয়ই ‘শেষ আলো’ পত্রিকাটির আজকের সংখ্যাটি দিয়ে গেল। ঠিক আছে, সাঁতার শেষ করেই তার ওপর চোখ ফেলবো।
কিন্তু বিধি বাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই দরোজায় সারস পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ পাওয়া গেল। তারপর মৃদু টোকা। এই ধরনের টোকার অর্থ হলো, অতি জরুরি কোনো সংবাদ আছে। দরোজা খুলতেই সুনীল বাবাজি আমাকে ঠেলে সোজা ড্রয়িং রুমে ঢুকে পড়লো। তার হাতেই পত্রিকাটি। সেই পত্রিকার প্রথম পাতায় একটি ছোট্ট সংবাদ। শিরোনাম ‘কৃষ্ণগহ্বরের প্রথম ছবি’। বলা হচ্ছে, এটিই মানুষের ক্যামেরায় ধরা এ-যাবৎ কালের বৃহত্তম কৃষ্ণবিবর।
– বাহ্! বেশ তো।
– না জেনে না শুনে বেশ বেশ করতে যেও না।
– ঠিক আছে, যাবো না।
– কৃষ্ণগহ্বরের প্রথম ছবি আমি তুলেছি। তা-ও কয়েকশ কোটি আলোকবর্ষ আগে। অতএব এটি প্রথম ছবি হতে যাবে কেন?
প্রশ্নটা করেই যথারীতি তার চোখজোড়া চকচক করত লাগলো।
আমি খানিকটি অবিশ্বাসের হাসি হাসলাম। বিদ্রুপের সুরে বললাম, ‘তাই নাকি?’
সুনীল বললো, ‘বিশ্বাস করো আর না করো, ওরা কিন্তু এখনো কৃষ্ণবাবাজির কালো-কঠিন দানব রূপটার বহিরঙ্গ দেখেছে মাত্র, ভিতরটা দেখেনি।’
– তাই বা দেখলো কিভাবে?
– অধ্যাপক হেইনো ফালকে যে স্বপ্ন দেখেছিলেন তা বাস্তবায়ন করে।
– হেঁয়ালি করো না। বিজ্ঞান হেঁয়ালি নয়।
– তারাও হেঁয়ালি করেনি। উনিশশ তিরানব্বই থেকে গবেষণার শুরু। চ‚ড়ান্ত স্তরে এসে দুইশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী টানা দশ দিন ধরে আটটি দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে এই ছবি তুলেছেন।
– খুব ভালো করেছেন।
– পৃথিবী থেকে পাঁচ কোটি আলোকবর্ষ দূরে এক ছায়াপথ। নাম মেসিয়ে ৮৭ (গ৮৭ ). তার কেন্দ্রে আছে এই কৃষ্ণগহ্বর। নাম ‘কৃষ্ণ’।
– কত বড়?
– পৃথিবী থেকে তিরিশ লাখ গুণ বড়। যা পায় তাই খায় এই কৃষ্ণদানব। এমনকি এখানে ঢুকে ফিরে আসতে পারে না অপরিমেয় আলোকণাও।
– কেন? আলো তো বস্তু নয়।
– তবে আলোও বস্তুর শক্তিরূপ বিশেষ। তাই সর্বাংশে অবস্তু নয়।
– দেখতে কেমন এই কৃষ্ণবাবাজি?
– কালো। কালোর কালো। অর্থাৎ কালোতম। তবে তাকে ঘিরে আছে অত্যুজ্জ্বল এক আগুনের আংটি। সেই তার সুরক্ষা। এক পাশে নীলসবুজের আভা। আর ভিতর মহলে কৃষ্ণবাবা।
– তো, তুমি কিভাবে দেখলে তাকে? তার ছবিই বা তুললে কিভাবে।
– খুব সহজেই। আমি তো বস্তু-বিজ্ঞানী নই, বরং অবস্তু- নির্জ্ঞানী। আমার বাহন না বস্তু না নির্বস্তু।
– কী তবে তোমার বাহন?
– আমার বাহন আমারই আত্মা। আমার আত্মাই আমার দূরবীণ, আমার সর্বাস্ত্র। আমি সেই অবিনাশী অস্ত্রধর।
– তোমাকে বুঝি না হে জটিল সুনীল।
– আমি জটিল নই, আমি নীলিমার নীল। আমি তোমার নিখিল। এই বস্তুদৃষ্টি বন্ধ করে খুলে রাখো আত্মাদৃষ্টি। কি দেখছো?
– দেখছি গণনাতীত বিন্দু বিন্দু কৃষ্ণগহ্বর, যাকে ঘিরে আছে গণনাতীত আলোর আংটি।
– সেই আংটিই তো সেই আলো, তোমার আমার অবিনাশী সুরক্ষা। আর বেশি বকবক অবান্তর। বুদ্ধিমানের জন্য ইশারাই যথেষ্ট। আজ আসি। আবার দেখা হবে।
সুনীল আর কোনো কথা না বলে নিজের বাহনে চড়ে বসলো। আমিও একান্ত একা, আর নীরব হয়ে গেলাম।
মনে হলো, আর কিছু নয়, এই নির্বাক নীরবতাই আমার আসল আশ্রয়।

সুনীল সন্ন্যাসী ৪০
চার বৈশাখ চৌদ্দশ ছাব্বিশ, সতেরো এপ্রিল দুহাজার উনিশ। ঠিক বিকেল সাড়ে তিনটায় চড়ে বসলাম সিলেটগামী ‘কালনি এক্সপ্রসে’। আমার গাইড নজরুলশিল্পী শহীদ খান, এখন কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের সঙ্গীত প্রশিক্ষক। তার পাশে প্রখ্যাত নজরুলশিল্পী রেবেকা সুলতানা। আমরা যাচ্ছি মৌলভীবাজারে নজরুল সম্মেলনে। কাঁটায় কাঁটায় চারটায় ট্রেন ছেড়ে দিলে দেখলাম আমার পাশের সিট খালি। অন্যপাশে পাশাপাশি সিটে বসে আছে শহীদ ও রেবেকা। প্রথম শ্রেণির কম্পার্টমেন্ট, কিন্তু শীতাতপহীন। প্রচণ্ড গরম, ট্রেন চলছে ঝড়ের গতিতে। আমি খালি সিটে আমার ব্যাগটা বসিয়ে দিয়ে নিজের সিটে পা তুলে বসার কসরৎ করলাম। এমন সময় য়ুনিফর্ম পরিহিত টিটি এলো।
– পাশের যাত্রী কি এয়ারপোর্ট স্টেশন থেকে উঠবেন?
আমি কোনো উত্তর না দিয়ে রহস্যময় হাসি হাসলাম। শহীদও আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো। তারপর শহীদের সঙ্গে কি-কি যেন বললো। যাওয়ার সময় একটা সালাম ঠুকে হাসি মুখে বিদায় নিলো।
– নিজেকে বেশ কেউকেটা মনে হচ্ছে, তাই না?
দেখি পাশের সিটে বসে পা দোলাতে আরম্ভ করেছে সুনীল সন্ন্যাসী।
– কখন এলে?
– টিটি গেল, আর আমি এলাম।
– কিভাবে এলে?
– ঝড়ের ডানায় চড়ে।
– কোথায় যাবে?
– কোথাও যাবো না। একটুক্ষণ বসবো।
– বেশ বসো। আমিও একটু ঘুমিয়ে নেবো।
সুনীল কিছু বললো না। সেও হাসলো। বললো, “আমিও কেমন ক্লান্ত। তোমার পাশে একটু ঘুমাতে এসেছি।” তারপর আমার ব্যাগটা মাথার নিচে দিয়ে মুহূর্তেই সে নাক ডাকতে শুরু করলো। আশ্চর্য! সুনীল পারে না এমন কোনো কাজ নেই। আমার কিন্তু ঘুম হলো না। জানালার বাইরে ঝড়ের গর্জন, পাশের সিটে সন্ন্যাসীর নাসিকা গর্জন। তার ভিতরে নির্বিঘঘ্নে ঘুমাচ্ছে সুনীল। আমার মনে পড়লো নজরুলের গজল, “ঘুমিয়ে গেছে শ্রান্ত হয়ে আমার গানের বুলবুলি”। সঙ্গে সঙ্গে তড়িৎ প্রতিক্রিয়া হলো সুনীলেরও। ঘুম থেকে পুরোপুরি না জেগে তন্দ্রার ঘোরে নজরুলের বাবরি চুল আর মুখে মুরলিবাঁশি বাগিয়ে দরিরামপুরের বটতলায় গিয়ে বসলো।
আমি আর কী করবো। আমিও দ্রুত তাকে অনুসরণ করে মানসভ্রমণে বের হলাম। সুনীল ততক্ষণে বটতলা ছেড়ে দরিরামপুরে নজরুলের লজিং-মাস্টার বিচুতিয়া ব্যাপারী মহোদয়ের বাড়িতে রক্ষিত কাঠের খাটে এসে বসেছে। এই খাটে নাকি মাঝে মাঝে নজরুলও ঘুমাতেন। সুনীল স্থানকালপাত্র ভুলে কেমন গুটিশুটি মেরে ঘুমিয়ে গেলো। ততক্ষণে ঘুমন্ত সন্ন্যাসীকে দেখার জন্য ছোটখাটো একটা ভিড় জমেছে সেখানে। সেই ভিড় ঠেলে আম আঁটির ভেঁপু বাজাতে বাজাতে এগিয়ে এলো এক তামাটে শিশু। শিশুটি নিরীহ, নির্বস্ত্র ও জন্ম-অনাথ।
কাছে আসতেই জিগ্যেস করলাম, “কি নাম তোমার?”
– আমাকেও সবাই দুখু বলে ডাকে।
– তাহলে তুমিও এক নজরুল।
– সবাই তাই বলে।
– কি বাজাতে পারো তুমি?
– কেন? সব পারি।
– দেখি, বাজাও তো একটা কিছু।
দুখু আম-আঁটিতে মুখ লাগিয়ে বাজাতে লাগলো নজরুলের বাণীহীন সুর, ‘খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে বিরাট শিশু আনমনে।’
তৎমুহূর্তে তাবৎ কালের তাবৎ সুতোহীন সদ্যজাত জন্মনৃত্যে মেতে উঠলো মাতৃগর্ভে, গগন গগনে..

সুনীল সন্ন্যাসী ৪১
এতদ্বারা অমার ফেসবুক বন্ধু ও সর্বসাধারণের অবগতির জন্যে জানানো যাচ্ছে যে, আমার ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত ও আপন-বনাম-গোপন-বনাম-প্রকাশ্য গোয়েন্দা-আত্মা সুনীল সন্ন্যাসী বেশ কিছুদিন যাবৎ নিরুদ্দিষ্ট। তার কোনো পরিমেয় ও অপরিমেয় অবিভ্যক্তি সহজলভ্য বা বিরললভ্য নয়। তিনভুবনের কোনো অপ্রবেশ্য গুহায় সে স্বেচ্ছাবন্দি তা-ও অজ্ঞেয়। যতবার তাকে স্মরণ করি, ততবার শুধু আঁধার দেখি। শেষ দেখার সময় মহাশয়কে বড় বশি অস্থির ও উদ্বিগ্ন দেখেছিলাম। সে বলেছিল, সে এবার সোনাগাজী যাবে, নুসরাতের খবরাখবর নেবে, তারপর ফিরে আসবে। না, তারপর সে ফিরে আসেনি। এলেই তার কাছ থেকে কিছু সাচ্চা খবর পাওয়া যেতো। সুনীল কি সেখানে কোনো ষড়যন্ত্রের জালে আটকা পড়েছে? তাকে আটকাতে পারে এমন কি কেউ আছে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে? আসলে অপরিমেয় এই সত্তাকে কোনো পরিমেয় শক্তিধরের আটকানোর কোনো সুযোগ নেই। মনে হচ্ছে, এই নির্বাসন স্বেচ্ছাপ্রণোদিত।
তাহলে অনন্ত একটা মনোসংলাপ শুরু করা যাক।

– বাবা সুনীল, তুমি কোথায়?
– যেখানে থাকার কথা সেখানে?
– আমাকে কি ঠিকানাটা দেয়া যায়?
– দিয়ে লাভ নেই।
– কেন?
– এখানে কোনো পরিমেয় মানবের আসার কোনো উপায় নেই।
– কথা বলা যাবে?
– যাবে। বলছোই তো!
– আচ্ছা, বলতো নুসরাত হত্যার বিচার কি শেষ হবে?
– হবে। না হওয়ার কোনো উপায় নেই।
– কারা শাস্তি পাবে? কি শাস্তি পাবে?
– প্রকৃত অপরাধীরাই শাস্তি পাবে। এমন শাস্তি পাবে যে এরপর এমন ঘটনার আর কোনো পুনরাবৃত্তি হবে না।
– তনু হত্যার বিচার হয়নি।
– হবে।
-ইয়াসমিন হত্যার সুবিচার হয়েছে কি?
-হতেই হবে।
– কবে?
– সময় হলেই হবে। সময় সম্পর্কে তোমাদের ধারণা ভুল।
– আমরা আর কতদিন অপেক্ষায় করবো?
– দিন নয়, বলো, কাল।
– মানে?
– সময় লাগবে। কেননা শতভাগ সুবিচার করা ছাড়া এই অপরাধের মূলোৎপাটন করা যাবে না।
– সেটা কিভাবে?
-প্রত্যেক মানুষের মধ্যে একটা অমানুষ আছে। তারা দুজন সর্বক্ষণ পরস্পরের সঙ্গে কুস্তি লড়ছে।
– কে জেতে হে হারে?
– বেশিরভাগ সময় অমানুষটাই জিতে যায়।
– শেষমেশ কে জিতবে?
– অবশ্যই মানুষ। সে তখন নিজের হাতেই নিজের অমানুষটাকে বলি দেবে। অর্থাৎ তোমাদের পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ নিজের ভেতরকার অমানুষটাকে উপড়ে ফেলবে চিরতরে।
– কবে? কবে?
– আহ্ অতো তড়পাচ্ছো কেন! একটু সবুর করো। সবুর না করে কে কবে স্বর্গ পেয়েছে?
– মানুষের তো সবুর করা ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর নেই। তা, তুমি এখন কোথায় যাবে?
– আমাকে এবার লঙ্কাদ্বীপটা সফর করতে হবে।
– কেন?
– এই দ্বীপে নেমেছিলেন আদম-হাওয়া। আমাদের আদিমাতা আদিপিতা।
– তাদের বংশধরেরা এখন কেমন আছে জানো তো?
– জানি। জানি তোমাদের দুনিয়ার সব ঘরের সব পর-অপরের কথা।
– কি জানো?
-আফসোস! ধর্ম নয় বর্ণ নয় কর্ম অন্য কিছু নয়, একালের সাদ াকালো বাদামি তথা সর্ববর্ণের নরনারী কেবল একটিই বিষয়েই তৎপর : তারা পুরোপুরি স্বকামী, স্বগামী তথা আত্মপর।
-খুলে বলো, কে আত্মপর?
– যে অপরকে চেনে না, যে বর্বর।
– কে বর্বর?
– যে সবশেষে নিজেই খোঁড়ে নিজের কবর।

কথা তো নয় যেন বজ্রধ্বনি। আমি কি শুনলাম?
আমি কি শুনলাম স্মরণকালের ভয়াবহতম দানবিক বিস্ফোরণের ধ্বনি ও প্রতিধ্বনি?
না, আমি মুহূর্তেই ভুলে গেলাম এই পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম ও বৃহত্তম প্রত্যেক ব্যক্তিমানুষের নাম।