সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় বাস-লেগুনা সংঘর্ষে নিহত ৮

আগের সংবাদ

সারাদেশের সঙ্গে সিলেটের রেল যোগাযোগ বন্ধ

পরের সংবাদ

মায়াময় ছায়াছবি

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ২, ২০১৯ , ২:৪৫ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুন ১০, ২০১৯, ৭:০৩ অপরাহ্ণ

Avatar

বৃষ্টিজলে হলুদডাঙায় নিজের মুখোমুখি
ট্রেনের শেষ কামরাটা স্টেশন ছেড়ে না যাওয়া পর্যন্ত বসে থাকল অঞ্জন। প্রতিদিন তাই থাকে। সকালে মুক্ত হাওয়ায় হাঁটাহাঁটি করার কথা বলেছেন ডাক্তারবাবু। রোজ ভোরবেলা নিয়ম করে বেরিয়ে পড়াটা এখন এক অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। গেস্টহাউসের সামনে ছোটদের স্কুলের পাশ দিয়ে যে রাস্তাটা ঘুরতে ঘুরতে সমতলের দিকে নেমেছে সেটা দিয়েই প্রতিদিন নেমে হাঁটতে হাঁটতে স্টেশনের মধ্যে এই বেঞ্চে এসে বসে।

পাহাড়ি জায়গায় এই ট্রেন, যাত্রীদের ওঠানামা, হুইসিল, ধোঁয়া সব মিলিয়ে বেশ মজা লাগে অঞ্জনের। খুব ছোটবেলার আবছা কিছু স্মৃতি উড়ে আসে মাঝে মাঝে।
ফেরার পথে দেখা হয় আরো দুজনের সঙ্গে। নীলাঞ্জন সেন আর হরেন চক্রবর্তী। এখানেই আলাপ। হাওয়াবদল করতে এসেছেন তাঁরাও। স্টেশন ছাড়িয়ে একটু এগোলেই একটা শিবমন্দির আছে। সেখানে মন্দিরের চাতালে ওরা বসে। ফেরার পথে দেখা হয়। দুএকটা কথা। কখনো কখনো রাস্তার পাশের দোকান থেকে একসঙ্গে একটু চা।
গেস্টহাউসে ঢোকার আগে স্কুলের সামনে একটু দাঁড়ায়। নামার সময় অসুবিধা হয় না, ওঠার সময় একটু হাঁফ ধরে। এক চিলতে ফাঁক দিয়ে নিচের স্টেশনটা দ্যাখে। এই জায়গাটা নিয়ে মেয়ে জামাইয়ের মধ্যে সামান্য তর্ক হয়নি তা নয়। ওঠানামায় অঞ্জনের অসুবিধে হবে বলে আপত্তি করেছিল রঞ্জনা। পিনাকী ওকে বুঝিয়েছিল। ওর অফিসের অতিথিশালা, লোকজন সবাই ওর চেনা, তাছাড়া এমন কিছু উঁচুতেও নয় বাড়িটা। মেয়ে কিছু বলেনি। কিন্তু সঙ্গে এসেছিল। কয়েকদিন থেকে সব দেখেশুনে গিয়েছে। নাতনির স্কুল, তাই থাকার উপায় নেই। ফেরার সময় অঞ্জনকে নিতে আসবে।
প্রতিদিন সকালে ফিরে এসে রিসেপশনের দেওয়ালে টাঙানো একটা ছবির সামনে দাঁড়ায় সে। উত্তাল সমুদ্রের ছবি। এই পাহাড়ি জায়গায় সমুদ্রের ছবি দেখে একটু অবাক হয়েছিল প্রথমদিন। সমুদ্র তার খুব প্রিয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সমুদ্রের সামনে বসে থেকেছে একসময়। কখনো একা, কখনো আরতির সঙ্গে।

অসীম আনন্দে অনন্তের দিকে স্মৃতিহীন ছুটে যাওয়া সমুদ্রের স্বভাব। এই চঞ্চল গতিময়তা খুব ভালো লাগতো অঞ্জনের। আরতির পছন্দ ছিল পাহাড়। বলতো
-সমুদ্র শুধু পালিয়ে বেড়ায়। গতরাতের ঢেউ আর ফেরে না। পাহাড় কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকে। মনে হয় আমার জন্য অপেক্ষা করছে সারাজীবন।
অঞ্জন হাসতো… ঠিক আছে, এবার থেকে আমিও তোমার সামনে স্থবির হয়ে বসে থাকবো। ভালো লাগবে তো?
-তা কেন? পাগলের মতো ছুটতে ছুটতে আমাকে নিয়ে নিত্যনতুন খেলা খেলবে তুমি, এমনটাই তো চেয়েছি চিরকাল। কখনো বর্ণময় পাহাড় কখনো বা গতিময় সমুদ্র। আমার স্বর্গের সিঁড়ি।
মনে আছে, একটু অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল অঞ্জন। আরতির আঙুলগুলো নাড়াচাড়া করতে করতে বলেছিল—- তোমার স্বর্গের রঙ তো আবার সবুজ। শুনেছি মনের রঙও নাকি সবুজ। তা’হলে স্বর্গের সুষমা সব গড়ে ওঠে মনের ভেতরে? মনের মধ্যেই তার ভাঙাগড়া? জানো চোখ বুজলেই আমি দেখতে পাই আমাদের বন্দি ছেলেবেলার দিনগুলো। গায়ে তোমার ফ্রিল দেওয়া সবুজ ফ্রক, হাতে সবুজ কাচের চুড়ি, কানে সবুজ দুল। ছোটবেলা থেকে সবুজের নেশা পেয়ে বসেছিল তোমায়। আস্তে আস্তে ওই গাছগাছালির জঙ্গলের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে একদিন তুমিই হয়ে উঠলে আর এক প্রকৃতি।
-সবুজ ভালোবাসতাম বলেই তো এই চিরসবুজ মানুষটাকে দূরে যেতে দিইনি কখনো।
একটা আওয়াজে ঘুরে দাঁড়ালো অঞ্জন। এখানকার অতিথিদের দেখাশোনা করেন যে ভদ্রলোক, তিনি দাঁড়িয়ে। ব্রেকফাস্টটা ঘরে দেবেন কিনা জানতে চাইছেন। অন্যদিন ঘুরে এসে ঘরেই খেয়ে নেয়, কিন্তু আজ ডাইনিং হলেই বসতে ইচ্ছে হলো। মেয়ে জামাইয়ের ঠিক করে দেওয়া মেন্যু। কোনোরকম নড়চড় হয় না এদের। রঞ্জনাও তদারকি করে ফোনে। দিনে তিনবার তো বটেই। সকাল, দুপুর, রাতে খোঁজখবর নিয়ে ওষুধের কথা মনে করিয়ে দেয়। রঞ্জনার স্বভাবটাও ওর মার মতো হয়েছে। অকারণ উদ্বেগে অস্থির হয়। এখানে আসার পর তেমন কোনো অসুস্থতা বোধ করেনি, এই কথাটা যেন বিশ্বাসই হয় না রঞ্জনার। ভাবে, ওদের অস্বস্তিতে ফেলতে চাই না বলে অনেক কিছু গোপন করছে সে। হাসি পায়। একটু ভালোও লাগে।
মাঝে কলকাতায় একটু শরীর খারাপ হয়েছিল ঠিকই, এখন সে বেশ ভালোই আছে। ডাক্তারবাবু তো বলেছেন তার হার্টের কোনো সমস্যা নেই। সেজন্যই তো সাহস করে এখানে চলে আসা। সকাল বিকেল একটু ঘোরাঘুরি, ইচ্ছেমতো বই পড়া ছাড়া কোনো কাজ নেই। বসার ঘরে একটা টিভি আছে, কিন্তু ওই ঘরে প্রায় ঢোকেই না সে। যে বিষণ্ণ অস্থিরতা তাকে প্রায় গ্রাস করে ফেলেছিল একসময়, এখন ওসবের চিহ্ন নেই। এটা হাওয়াবদলের জন্য না নিজের সঙ্গে বোঝাপড়ার জন্য কে জানে!
সেইদিনগুলোর কথা মনে পড়লে অঞ্জনের এখনও খুব কষ্ট হয় নিজের জন্য। সারাক্ষণ এক অজানা টেনশন আর ভয় কাজ করতো মনের মধ্যে। এক অকারণ অস্থিরতা। সমুদ্রের ছবি দেখলেই সুনামির কথা, পাহাড়ের কথা উঠলেই ল্যান্ড স্লাইড, শহর মানেই দুর্ঘটনা, চুরি ডাকাতি, গুণ্ডামি, গ্রাম বলতেই সাপ, বন্যা এসব মনে করলেই ভয় হতো। রাতে শুতে যাবার সময় মনে হতো কেউ লুকিয়ে আছে ঘরের মধ্যে। কোথাও শব্দ হলেই ভাবতো হয়ত খিলান ভেঙে পড়ছে কোথাও। ফোন বাজলেই ভয় পেতো, মনে হতো কোনো খারাপ খবর।
ডাক্তারবাবু বলেছিলেন আচমকা একজন প্রিয় মানুষকে হারানোর আঘাত থেকে এমন হয়। আবার কিছু হারানোর আশঙ্কা পেয়ে বসে। অঞ্জনও যে বুঝতো না, তা নয়। তবু কী যে হতো কে জানে, অকারণ ভয়ে সিটিয়ে থাকতো সবসময়। এ ভাবে কয়েকদিন যাবার পর একদিন দুপুরবেলা সে ঠিক করলো নিজের মুখোমুখি একবার বসা দরকার। অধ্যাপকের চাকরি সে করেনি। কিন্তু চাকরি করার সময় অফিসের ট্রেনিং কলেজে ক্লাস নিতে হতো। সেখানে একটি বিষয় পড়াতে পড়াতে এ,বি,সি থিয়োরির শেষ কথায় এসে বলতো ‘আমরা কিভাবে নিজের সঙ্গে কথা বলি তার ওপর নির্ভর করে আমাদের সুখ ও দুঃখ। যে মানুষ যত সুন্দরভাবে নিজের সঙ্গে কথা বলতে পারে সে তত সুখী হয়।’
প্রায় নাটকীয়ভাবেই সেদিন দুপুরবেলা টিভি সিরিয়ালের বা যাত্রাপালার বিবেকের মতো আয়নার স্যামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রশ্ন করেছিল অঞ্জন দুর্ঘটনায় আহত একজন মানুষকে দেখে কিসের কথা মনে আসা উচিত আমাদের? ডাক্তার না শ্মশান? চতুর্দিকের এতো ভালোবাসার মানুষ, এতো সুন্দর এক পৃথিবী, উজ্জ্বলতা, সুখ, সমস্ত অবজ্ঞা করে সারাক্ষণ সর্বনাশ আর অন্ধকারের কথা ভাবাটা কি ঠিক? নিজের সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বলার পর অদ্ভুত এক শান্তি পেয়েছিল সেদিন। আর কোনো ভয় তাকে ছোঁয়নি কখনো।
মনে আছে, সেদিন সন্ধ্যেবেলা ঘরে ঢুকেই একটু অবাক হয়ে গিয়েছিল রঞ্জনা। আরতির ছবির সামনে কিছু ফুল আর জ্বলন্ত ধূপকাঠি দেখে কিছু বলার আগেই তার চোখ পড়েছিল খাবার টেবিলে। সযত্নে ঢাকা দেওয়া বেশ কিছু খাবার। বসার ঘরে জানলা খোলা, পর্দা সরানো। চারটে ডার্ক চকোলেট।
-কী ব্যাপার বলো তো, এ সময়ে জানলা খোলা? মশার ভয় নেই আজ?
-শোবার আগে স্প্রে করে নেবো
-টেবিলে ওসব-এখানে চকোলেট
-তোর ফেভারিট বিরিয়ানি, পিনাকীর মটন রেজালা আর পিঙ্কির জন্য-
-মানে? এসব আনালে কেন হঠাৎ?
-এমনি। অনেকদিন পর মনে হলো
আর কিছু বললো না রঞ্জনা। শুধু পিনাকীকে ফোন করে বলে দিল আসার সময় সে যেন পিঙ্কিকে নিয়ে আসে টিউশন থেকে। রান্নাঘরে ঢুকে চা করতে যাবে, অঞ্জন বলেছিল-
-নীল ফ্লাস্কে চা করা আছে। নিয়ে আয়।
চা নিয়ে সামনে বসে রঞ্জনা বলেছিল এবার বলো
-কিছু না রে, খুব ভালো ঘুম হয়েছে দুপুরে। সেই অস্থিরতাটাও আর নেই। তুই আসবি তাই মনে হলো তোর জন্য একটু বিরিয়ানি আনাই। আমার ভালোমন্দ নিয়ে সব সময় এত উদ্বিগ্ন থাকিস তোরা
-পিনাকী তো বলছিল ওর পরিচিত এক মনোবিদের কাছে-
-না না আর দরকার হবে না বোধহয়। দেখি না কয়েকদিন
কথা বাড়ায়নি রঞ্জনা। পিনাকীও সব শুনে খুব একটা কিছু বলেনি। পিঙ্কির সঙ্গে অঞ্জনের কথাবার্তা শুনতে শুনতে বলেছিল…‘সামনে পিঙ্কির স্কুল ছুটি আছে কয়েকদিন। কোথাও ঘুরে এলে মন্দ হয় না’
ডাইনিং হলের জানলার পাশের এই টেবিলটা খুব পছন্দ অঞ্জনের। দূরে টিলার ওপর হালকা মেঘ, আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে নেমে আসা কিছু মানুষ, কখনো বা এক পাল গরু ছাগল। সামনের মাঠগুলো ফাঁকা, কোনো চাষের চিহ্ন নেই। ছড়ানো ছিটানো কিছু গাছপালা। ইচ্ছে আছে একবার ওদিকে যাবার। এখানে যে লোকটি খাবার টাবার দেয় তাকে জিজ্ঞাসা করেছিল। ওদিকে ওই পাহাড়ের ওপারে নাকি একটা মাঠ আছে। হলুদ ডাঙার মাঠ বলে চেনে সবাই। লাগোয়া একটা ছোট জলাজমি। এমন শুকনো জায়গায় জলাজমি কোথা থেকে এল কে জানে! সাহস করে একদিন বেরিয়ে পড়ার ইচ্ছে ছিল অঞ্জনের। কিন্তু লোকটি বলছিল আসা যাওয়ায় নাকি সময় লাগবে অনেকটা। রাস্তায় বিশ্রাম করার জায়গাও তেমন নেই। দোকানপাটও না। অঞ্জন ঠিক করেছিল, এখনই না হোক, হলুদডাঙার মাঠে, একদিন না একদিন সে যাবেই।
একটু দূরে স্টেশনটা দেখা যাচ্ছে। ফাঁকা। সারাদিনে খুব বেশি ট্রেন চলে না। রাতের দিকে মালগাড়ির আওয়াজ পাওয়া যায় মাঝেমাঝে। এখানে আসার পরদিনই, সকালবেলা পিঙ্কিকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে গিয়েছিল স্টেশনে। চা বিস্কুট খেয়ে ফেরার সময় দেখা করেছিল স্টেশনমাস্টারের সঙ্গে। পিঙ্কির কাছে গল্প শুনে হেসেছিল রঞ্জনা। বলেছিল
– স্টেশনে বা বাস টারমিনাসে গিয়ে বসে থাকা বাবার পুরনো অভ্যাস।
পিঙ্কি কিছুই বুঝতে না পেরে জানতে চেয়েছিল- মানে?
অঞ্জনই ওকে কাছে টেনে নিয়ে বলেছিল ‘-শোন দিদুন, আমার চাকরিটা ছিল অন্যরকম। বদলির চাকরি। ২/৩ বছর অন্তর এক জায়গা থেকে আরেক নতুন জায়গায় চলে যেতে হতো। প্রায় সময়ই আমি একা যেতাম। তোমার মার স্কুল, পড়াশোনা ছিল কলকাতায়। বারবার নতুন জায়গায় নতুন স্কুলে ভর্তি হলে মা’র লেখাপড়ার ক্ষতি হবে বলে ওদের নিয়ে যাইনি কখনো -তোমার দিদা আর মা থাকতেন কলকাতায়।’
পিঙ্কি গম্ভীর হয়ে বললো বুঝলাম, কিন্তু তুমি রোজ স্টেশনে বা বাসের ওখানে যেতে কেন? এবার উত্তর দিয়েছিল রঞ্জনা… ‘দাদুর খুব মন কেমন করতো আমাদের জন্য। একা একা থাকতে কষ্ট হতো। স্টেশনে গিয়ে কলকাতা থেকে আসা-যাওয়ার ট্রেনগুলো দেখে শান্তি পেতেন। যেখানে ট্রেন থাকতো না সেখানে বাস টারমিনাসে গিয়ে বসে থাকতেন ঐ একই কারণে।
– আর যেখানে স্টেশন বা বাসের জায়গা দূরে থাকতো সেখানে?
রঞ্জনা হেসেছিল সেখানে রোজ নয়, সুযোগ পেলেই চলে যেতেন দাদু।
– আচ্ছা মা, তোমাদের মন খারাপ হতো না?
– হতো বৈ কি।
এরপর যে কদিন পিঙ্কিরা ছিল, রোজ এক একটা নতুন জায়গার গল্প শোনাতে হয়েছে অঞ্জনকে। বাড়ি ঘরদোর, অফিস, রান্নাবান্না, দোকানবাজার, স্টেশন বন্ধুবান্ধব সবকিছুর গল্প।

বহুদিন পর পুরনো অনেক কথাই আজ সামনে এসে দাঁড়াতে চাইছে। অঞ্জন না চাইলেও। আসলে স্মৃতি আর স্বপ্ন কারও কেনা গোলাম বা পোষা বাঁদর নয়। তার আসা কিংবা যাওয়া অন্য কারো ইচ্ছাধীনও নয়। সমস্তই অঞ্জন জানে। স্মৃতির দু’হাত ধরে মধ্যরাতে অতীত না খুঁজে, সময় প্রবাহে তাকে ভাসিয়ে দেবার চেষ্টাই করেছে সে। তবু কখনো কখনো পাহাড়ি নদীর কাছে ফেলে আসা পুরনো শপথ, অন্ধকার জোয়ারভাটায় শব্দহীন লুকোচুরি খেলা, শিউলি ফুলের গন্ধ এসে পথ আটকাবার চেষ্টা করে। কোথাও যেন ঝড় ওঠে, বুকের মধ্যে গর্জন করে সমুদ্রের ঢেউ, আকাশ থেকে সুন্দরী তারার দল নেমে আসে মাটিতে কিন্তু অঞ্জন এখন লুকিয়ে নিজের মধ্যে হারিয়ে যেতে শিখেছে। সে এখন কেবলই নিজের মুখোমুখি। নিজের আশ্রয়েই তার বেঁচে থাকা। ডান হাত বাঁ কাঁধে রেখে নিজেকে সান্ত¡না দিতে শিখেছে সে। একাকীত্ব নিয়ে রাজকীয় দুঃখবিলাসে আর বিশ্বাস নেই। প্রয়োজনে নিজেকে ধমক দিতেও অসুবিধা হয় না তার।

দুপুরবেলা ঘুমোনোর অভ্যাস ছিল না কোনোদিন। আরতি যখন ছিল, তখনও না। ও একটু ঘুমোতো। বিকেলের চা বানিয়ে অঞ্জনই ডাকতো ওকে। এখানে এসে দুপুরবেলা একটু শুতে ইচ্ছে করে। ঘুমিয়েও পড়ে কোনো কোনো দিন। বিকেলে চা দিতে এসে ডেকে দেয় মইদুল বা আর কেউ।
আজ ঘুম ভাঙালো এক অদ্ভুত স্বপ্ন।…. হলুদডাঙার মাঠে যাবার জন্যে দুপুর দুপুর বেরিয়েছিল অঞ্জন। হঠাৎ মাঝ রাস্তায় ঝম ঝম করে বৃষ্টি। যেমন বিদ্যুৎ তেমন বজ্রপাত। ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে একটা ভাঙা ছাউনির দিকে হাঁটছে, দ্যাখে একটা ছোট্ট ছাগলছানার দিকে ফণা তুলে রয়েছে একটা সাপ। কি করে ওকে বাঁচাবো ভাবছে, এমন সময় মাঠের আল ভেঙে জল এলো রাস্তার ওপর আর সেই জলের তোড়ে ভেসে গেল সাপটা। ছুটতে ছুটতে একটা বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সজোরে কড়া নাড়ছিল অঞ্জন… ঘরের ভেতরে একটা ফোন বাজছিল বোধহয় … কিন্তু…
রঞ্জনার ফোন। কলকাতায় নাকি খুব বৃষ্টি হচ্ছে। জানতে চাইছিল এখানে এখন আবহাওয়া কেমন। কলকাতা নয়, তার স্বপ্নের ওই বৃষ্টি আর সাপ নিয়ে ভাবছিল সে। খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল। অবশ্য এমন অদ্ভুত সব স্বপ্ন দেখা নতুন নয়। হলুদডাঙার মাঠ বোধহয় তার অবচেতনে কোথাও … এই তো সেদিন আবার ভোরবেলার স্বপ্নে শেষবার যেখানে পাক খেয়েছে পথ, সেখানেই কাঁঠাল গাছের ওপর এক অদ্ভুত রঙিন পাখি দেখে আর পা সরেনি। কী জলুস, কী চোখ, কেমন অদ্ভুত চেয়ে থাকা! আর নড়েনি অঞ্জন। কী হবে হলুদডাঙার মাঠ দেখে- এমন সুন্দর পাখি সাতজন্মেও কী আর দেখতে পাবে? ভাঙা কুয়োর পাশ থেকে উড়ে আসা অদ্ভুত রঙের সব প্রজাপতি, লাল রাস্তায় পড়ে থাকা রঙিন পাথর এ সব দেখতেই বোধহয় এই মাঠে আসে মানুষ, কিন্তু আর এগোয়নি অঞ্জন।
আরও একদিন ঘুমের মধ্যে ওই মাঠে প্রায় পৌঁছে গিয়েছিল সে। হঠাৎ রাস্তার একপাশে এক বৃদ্ধাকে দেখে থমকে দাঁড়িয়েছিল। বসে বসে তেঁতুল গুনছেন আর ভাগ ভাগ করে রেখে দিচ্ছেন। বোধহয় হিসেব মিলছে না তাই আবার গুনছেন। পাশে বসে জিজ্ঞাসা করেছিল অঞ্জন- কি করছেন?
মুখ না তুলেই উত্তর দিয়েছিলেন- কি আবার…। বয়স গুনছিলাম
– তেঁতুল দিয়ে বয়স গুনছেন?
– যা হোক দিয়ে গুনলেই হয়। সব কাজ সবাইকে একভাবে করতে হবে নাকি?
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে অঞ্জন জানতে চেয়েছিল ঐ মাঠে কি দেখতে যায় সবাই?
-জানি না, যাইনি কখনো
– এত কাছে তবু যাননি? কেন?
– যে রাস্তা দিয়ে যেতে হয় সেটাই তো আবার ফিরে আসে আমার বাগানে। যে রাস্তা ফিরিয়ে দেয় সে রাস্তায় আর হাঁটতে ভালো লাগে না।……
সেদিন ঘুম ভেঙে তেষ্টা পেয়েছিল খুব। জলের গ্লাসটার দিকে হাত বাড়াতে গিয়ে কেন জানি না মনটা খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল। জানলার ধারে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল কিছুক্ষণ। স্বপ্নে দেখা ওই বৃদ্ধার কথাগুলো কানে বাজছিল।
পরদিন সকালে মইদুল চা দিতে এসে বলেছিল ও নাকি একদিন ছুটি নেবে। একটা ভ্যান রিকশা ঠিক করে নিয়ে যাবে হলুদডাঙায়। কোনো উৎসাহ না দেখিয়ে অন্য কথায় চলে গিয়েছিল অঞ্জন। মইদুল হয়তো বুঝেছিল। কথা বাড়ায়নি।

গোলাপবনে স্মৃতির পালক একলা ওড়ে
আসার পর থেকেই এখানের বাজারটা দেখার খুব ইচ্ছে ছিল। আজ সকালে স্টেশনের দিকে না গিয়ে বাজারে গিয়েছিল সে। মইদুল নিয়ে গিয়েছিল। টাটকা সবজি দেখে মন ভরে গিয়েছিল অঞ্জনের। প্রায় সব রকমের আনাজপত্র পাওয়া যায়। দামও কলকাতার তুলনায় অনেক কম। মাছ অবশ্য তেমন নেই। অন্ধ্র থেকে আসা রুই মাছই বেশি। এ ছাড়া চারাপোনা। শোল-মাগুর এইসব। বড়ো বড়ো গোল বেগুন দেখে খুব লোভ হয়েছিল অঞ্জনের। আরতি দেখলে লাফিয়ে উঠতো। কতো রকমের রান্না যে ও করতো বেগুন দিয়ে। ফেরার পথে দেখল একজনের কাছে বিক্রি হচ্ছে পলতা পাতা। পটলের এই পাতার বড়া খুব প্রিয় ছিল আরতির। মইদুলও কিনলো। হেসে বললো, আমার বউ খুব ভালোবাসে। বেসন দিয়ে বড়া বানায়।
মইদুল ছেলেটিকে বেশ লাগে অঞ্জনের। কাশ্মিরের ছেলে। কিশোর বয়সে বাবার সঙ্গে শাল বেচতে এসেছিল কলকাতায়। এক হিন্দু পরিবারের বাড়িতে একটা ঘর মাস তিনেকের জন্য ভাড়া নিয়ে থাকতো খিদিরপুরে, গরম পড়লে ফিরে যেতো কাশ্মিরে। এভাবেই চলছিল। কয়েকবছর পর ঐ বাড়িতেই হঠাৎ দুদিনের জ্বরে চলে গেলেন ওর বাবা। ঐ পাড়ার ছেলেরা সবাই মিলে বাবার দাফন এবং অন্য সবকিছুর ব্যবস্থা করেছিল। আকস্মিক এই ঘটনায় দিশেহারা মইদুল কী করবে বোঝার আগেই বাড়ির মালকিন তরু মাসিই তাকে সামলেছিলেন। চেনাশোনা অনেক বাড়িতেই ধারে শাল বিক্রি করতেন বাবা, লিখে রাখতেন একটা খাতায়। তরু মাসি ঠিকানা দেখে সব জায়গায় নিয়ে গিয়েছিলেন মইদুলকে। দুয়েকটি বাড়ি ছাড়া প্রায় সকলেই সঙ্গে সঙ্গে দিয়ে দিয়েছিলেন টাকা। তরু মাসি ওর দেশে ফেরার ব্যবস্থাও করেছিলেন। সে সময়ই খবরটা আসে। বাবার মৃত্যুর খবর শুনে অন্নজল ত্যাগ করেছিলেন ওর মা। কয়েকদিনের মধ্যে তিনিও চলে যান। মইদুলকে খবর দেবার চেষ্টা করেছিলেন চাচারা। পারেননি।
তরু মাসি তাকে ছাড়েননি। ওর একটা কাজের জন্য অনেক লোকের কাছে যেতেন। শেষ পর্যন্ত পাড়ার এক কাকু যিনি এই অতিথিশালার ম্যানেজার ছিলেন এক সময়, তিনিই এই কাজের ব্যবস্থাটা করে দেন।
এখানে আসার বছর তিনেক পর একটি অনাথ হিন্দু মেয়েকে পছন্দ হয়। তরু মাসি নিজে এসে দাঁড়িয়ে বিয়ে দিয়েছেন ওদের। সামান্য যা গোলমাল হয়েছিল সব সামলিয়ে, ওদের সংসার গুছিয়ে দিয়ে ফিরে গিয়েছেন কলকাতায়। মইদুলের বৌ মালতীর কেউ নেই দুনিয়ায়। তরু মাসিই এখন দুজনের মা।
এ সব গল্প মইদুলের কাছেই শুনেছে অঞ্জন। কাজকর্ম সেরে ছেলে অমর কে নিয়ে মাঝেমধ্যে চলে আসে। কলকাতার গল্প শুনতে চায়। কখনো কখনো অদ্ভুত সব প্রশ্ন করে। নিজের কথা বলে। চারপাশের মানুষদের কঠিন জীবনযাপনের গল্প শোনায়। বৌ ছেলে নিয়ে পাহাড়ি নাচগান, যাত্রাপালা সার্কাস দেখার কাহিনিও শুনিয়েছে। এসবের মধ্যেও একটা ব্যাপার খেয়াল করেছে অঞ্জন। মইদুল কিন্তু ঘোর নামাজি। পাঁচবার নামাজ পড়ার অন্যথা হয় না কখনো।
জানলার সামনে দাঁড়িয়েছিল অঞ্জন। শেষ বিকেলের আলোয় কেমন যেন মায়াময় লাগছে চারপাশ। এই ঘরটা বিশেষ করে এই জানলাটা তার খুব প্রিয়। মাঝরাতে যখন ঘুম আসে না তখনও এই জানলার সামনে দাঁড়ায়। কেমন যেন মায়াবী হয়ে ওঠে চরাচর। কখনো কখনো শেষরাতেও এখানে দাঁড়িয়ে নিচের রাস্তাটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছে অঞ্জন। রাস্তাটাকে কেমন সুন্দর উজ্জ্বল রহস্যময় মনে হয়েছে। যেন এই রাস্তাটাই গিয়ে মিশেছে সেই স্বপ্ননগরীর মাঠে যেখানে ছড়ানো আছে সুখ, যেখানে ছোটাছুটি করে নিষ্পাপ শিশুরা, যেখানে বেড়াতে আসে অপ্সরার দল, শুধু পূর্ণিমায় নয়, যেখানে সমস্তক্ষণ জ্যোৎস্না খেলা করে।
এখানে তবু চাঁদের আলোর স্নিগ্ধ অহংকারী চেহারাটা বোঝা যায়। কোনো বড়ো শহরে জ্যোৎস্নার অস্তিত্ব ঠিক নজরে পড়ে না সহজে। চতুর্দিকের আলোর বাহারে কোথায় যেন হারিয়ে যায় বেচারা উদাসীন চাঁদ।
… জ্যোৎস্নার প্রসঙ্গ এলেই সামনে এসে দাঁড়ায় আরতি। ছাদে ওঠে চাঁদের আলোয় অন্য মানুষ হয়ে যেতো সে। আপন মনে একের পর এক গান গাইতো। মুগ্ধ হয়ে শুনতো অঞ্জন। একেকদিন ছাদে না এসে নিচের এই ছোট্ট বাগানটায় চলে যেতো, যাবার আগে নিভিয়ে দিতো ঘরের সব আলো। কিছু বললেই হাসতো, বলতো ‘এতো আলোর মধ্যে মুখ লুকিয়ে থাকে জ্যোৎস্না, তাই ভাবলাম, আজ এই আলো না হয় নাই থাকুক’।
অঞ্জনও হাসতো ‘যা বলেছো, অন্ধকারের অবস্থাটা ভাবো। হাজার আলোর রোশনাইয়ে তার জায়গা হয় না, তাই মানুষের চোখমুখ জুড়ে বসে থাকার চেষ্টা করে বেচারা। দ্যাখো এই শহরের সবাই কী ব্যস্ত সারাদিন। কিন্তু বেশিরভাগ লোকের মুখ কেমন অন্ধকার।’
আরতি মানতে চাইতো না। বলতো, ‘আমার তো ঠিক উল্টো মনে হয়। খুব প্রাণবন্ত এ শহরের মানুষেরা। কিছুতেই হার মানে না। চোখমুখ, শরীরে মেখে নিলেও এরা বোধহয় মাথার ভেতরে কোনো অন্ধকারকে ঢুকতে দেয় না। বোধি ও মননে তাই কোনো মালিন্য পাবে না।’
আবার রাস্তার দিকে তাকালো অঞ্জন। দমকা হাওয়ায় উড়ে এল আরেকটা শহর। … চৌদ্দ তলার ওপরে দাঁড়িয়ে আছে তারা। নিচে সাত রাস্তার মোড়। কোথায় যে যায় এই সব রাস্তা। আনমনা হয়ে যেতো অঞ্জন। মানুষের জীবনেও তো কতো রাস্তা। কখনো কখনো আমাদেরও তো দাঁড়াতে হয় চৌমাথায় বা পাঁচ মাথার মোড়ে। সব সময় কি আমরা পারি সঠিক রাস্তাটা চিনে নিতে? না, বোধহয়।
বৃষ্টি খুব ভালোবাসতো আরতি। আচমকা বৃষ্টিতে লোকজনদের ছোটাছুটি দেখতে আর বৃষ্টি ভিজতে খুব ভালো লাগতো তার। অঞ্জনকেও অনেকবার ছাদে নিয়ে যেতে চেয়েছে বৃষ্টির সময়, কিন্তু যে কোনো কারণেই হোক দু’জনের একসঙ্গে ভেজা আর হয়ে ওঠেনি। একবার শুধু কোনো এক সমুদ্রের পাড়ে হঠাৎ ঝমঝম… তার পড়িমরি ছুট, আর আরতির ছন্দোময় নাচের কথা মনে আছে অঞ্জনের। মনে আছে সেদিন হোটেলের ঘরে ফিরে ‘উদাসী হাওয়ার পথে পথে।’ গানটি গেয়েছিল আরতি। একের পর গানে ভরিয়ে রেখেছিল সেদিনের বাদলঝরা উদাসী বিকেল।
কোথায় যেন ফুটে উঠেছে বাগানবিলাস। রুপোর ঘুঙুর পরা কোনো এক কিশোরীর কাঁধে কারা যেন রেখে যায় স্বাধীন বেহালা। পরিপূর্ণ ভালোবাসা নিয়ে নিঃসঙ্গ জোনাকি নয়, ছুটে আসছে অন্ধকার ঘুম। আঁধার প্রতিমা আজ নিয়ে আসছে সুখের পরশ। আরতিকে দেখতে পাচ্ছে অঞ্জন। অঝোর বৃষ্টির মধ্যে বসে আছে বর্ষাতি মাথায়। চরাচর ঢেকে আছে স্মৃতির চাদরে।
…আরতির প্রিয় গাছ ছিল পাইন। আমার ইউক্যালিপটাস। শিলঙের পাইন গাছগুলো একেবারে অন্যরকম। জ্যোৎস্নায় কিংবা অন্ধকারে হাওয়ায় যখন দোল খেতো ডালগুলো, শোঁ শোঁ করে শব্দ হতো, এই পাতার মর্মরে সারা গায়ে জেগে উঠত এক মায়াবী শিহরণ। এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ। ছোট ছোট স্মৃতির কল্লোলে ভরে আছে আমাদের শিলঙের দিনগুলি। আমাদের প্রকৃতি ভ্রমণ, ‘প্রকৃত ভ্রমণ’ বলাও ভুল হবে না। সারাজীবনে দেশে-বিদেশে অনেক ঘোরাঘুরি হয়েছে তারপর। কিন্তু শিলঙের স্মৃতি এখনো সবুজ। আসলে বিয়ের ঠিক পরপর ওখানেই পরস্পরকে একান্তে পাওয়া। কলকাতা ছেড়ে আসার দুঃখ অঞ্জনকে প্রায় গ্রাস করতে বসেছিল তখন। সারাক্ষণ অন্যমনস্ক থাকতো। আরতি কষ্ট পেতো। কিছু বলতো না। একদিন শুধু বিছানা গোছাতে গোছাতে বলেছিল নিজের ভুলটা এখন বুঝতে পারছো তো?
অঞ্জন একটু অবাক হয়ে প্রশ্ন করেছিল- মানে?

-এই যে আমায় বিয়ে করে কি ভুল করেছো … বেচারা সবসময় মুখভার করে বসে থাকো, কথা বলতে ইচ্ছে করে না… আপনমনে কত কি ভাবো। খুব অপরাধী মনে হয় নিজেকে।
অঞ্জন উঠে গিয়ে ওর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলেছিল- কি বলছো এ সব? তুমি না থাকলে আমি তো তলিয়ে যেতাম অন্ধকারে। তুমিই তো আমার জিয়নকাঠি, শেষ মোমবাতি।
একটু হেসে আরতি বলেছিল… আসলে দুজনের মধ্যে একজন দিনরাত আনমনা থাকলে অন্যজনের কষ্ট হয় তো নিজের অস্তিত্ব নিয়ে…
অঞ্জন তাকিয়েছিল ওর মুখের দিকে। আরতি দুধের গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে বলেছিল- কলকাতা ছেড়ে আসার দুঃখ আমারও আছে। অমন সুন্দর চাকরি, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব ছেড়ে আমিও তো এসেছি। তোমার কাছাকাছি থেকে তোমায় নতুন করে পাবো বলে …’
… ঠিকই বলেছো …
অঞ্জনের চোখের শূন্যতা বোধহয় ছুঁয়ে গিয়েছিল আরতিকে। অঞ্জনের হাতে হাত রেখে বলেছিল- তোমার কষ্টটা আমি বুঝি। কবিতার জগত ছেড়ে এসেছো, বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আড্ডাও মিস করছো। সামনে পড়ে থাকা জীবন নয়, ফেলে আসা সবকিছু তোমায় ভাবাচ্ছে …চুপ করে বসেছিল অঞ্জন। আরতি থামেনি। আরো কাছে এসে বলেছিল… ভুলে যেও না অঞ্জন, কবিতার আড্ডা ফেলে এলেও কবিতা তুমি ফেলে আসোনি। সে তোমার সঙ্গেই আছে। অবহেলায়, অপমানে।
আরতিকে কাছে টেনে নিয়ে মৃদুস্বরে উচ্চারণ করেছিল অঞ্জন… তুমিই ঠিক আরতি। কবিতার পরিবেশ আর কবিতার সাহচর্য ছাড়া কলকাতার জীবনে তুচ্ছতাই ছিল বেশি। তবু কেন যে ওই শহর ছাড়ার দুঃখটা …।
……আমায় আর কবিতাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছো, তাই…
হেসেছিল অঞ্জন …… কবিতা ও তুমি একে অপরের পরিপূরক যে …
আর কথা না বাড়িয়ে ঘরের আলোটা নিভিয়ে দিয়েছিল আরতি।
……আমাদের বাড়ি থেকে একটু দূরে একটা ফাঁকা জায়গা ছিল, যেখান থেকে দেখা যেতো নিচের বসতি, আঁকাবাঁকা রাস্তা আর রঙবেরঙের ফুলবাগিচা। প্রায়দিনই সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতো দুজনে। মনে হতো কেউ যেন ডাকছে আমায়। কোনো এক নীলবর্ণ পরী। উদাসী মেঘের ডানায় চেপে দূরে অনেক দূরে মেঘনগরীর মধ্যে ঘুরে বেড়াবার ইচ্ছে হতো খুব। ফেলে আসা মলিন জীবনের তুচ্ছতার কথা ভেবে কষ্ট হতো খুব। হাসিও পেতো। তুচ্ছের মধ্যে অতুচ্ছকে আবিষ্কার করাই নাকি রোমান্টিক কবিতার অন্যতম শিল্পতত্ত¡।
খুব ছোটবেলা থেকেই প্রায়ই কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে যায় অঞ্জন। স্কুল, কলেজ, বাড়ি, অফিস সব জায়গায় এ নিয়ে নানান অনুযোগ শুনেছে সে। কিন্তু…।
….. মনে পড়ছে, সেদিনও আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফিরছিল দু’জন। কী যেন একটা ভাবতে ভাবতে আপন মনে হাঁটছিল অঞ্জন। আরতি পেছন থেকে ডেকেছিল।
– কী এত ভাবছো বলো তো
অঞ্জন হেসেছিল- কিছু নয় গো। ক্যামেলিয়া অ্যাজেলিয়া, জিরেনিয়াম, সুন্দর এই ফুলগুলো দেখতে দেখতে দুটো লাইন মনে এলো, কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারছি না কার লেখা—
-কি লাইন
-‘সেই ফুল তুমি কেমনে বহিবে তারে
ফুল তো কখনো ফুলেরে বহিতে নারে ‘
কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে আরতি বলেছিল- কবিতাটা আমারও পড়া। মনে হচ্ছে কবির নাম ‘জসীমউদ্দীন’
শিশুদের মতো লাফিয়ে উঠেছিল অঞ্জন। -ঠিক ঠিক, মনে পড়েছে – কবিতার নাম ‘ফুল নেয়া ভালো নয়’।…
ওই শৈলশহরের জীবনের সঙ্গে অভ্যস্ত হতে বোধহয় সময় লাগছিল আরতিরও। কখনো কখনো তার উচ্চারণেও এক উদাসী যন্ত্রণার আভাস পেতো অঞ্জন। নির্জন প্রকৃতির মধ্যে থাকতে থাকতে দুজনেই হয়তো শিখে নিয়েছিল স্তব্ধতার ভাষা। কখনো দুরন্ত হরিণ, কখনো বা সুখী রাজহাঁসের মতো বাঁচার কৌশল শেখাতো আরতি।
…দূরে খাসিয়াদের গ্রামের দিকে যে সরু রাস্তাটা নেমে গিয়েছিল তার পাশেই ছিল একটা ক্ষীণ জলধারা। সেখানেই নাকি ‘শেষের কবিতা’র অমিত-লাবণ্যের মুগ্ধ অভিসার শুরু হয়েছিল। সেখানেই ছিল তাদের শেষ সন্ধ্যা। মনে আছে, পরম মুগ্ধতায় আরতি তাকিয়েছিল ঐ ছোট্ট জলের ধারাটির দিকে। জানতে চেয়েছিল—- ‘ঠিক বলছো এটাই?’ অঞ্জন হেসেছিল-‘অমিত লাবণ্যকে কেউ তো এখানে বসে থাকতে দেখেনি। পুরোটাই কবির কল্পনা।’
…শিলঙ শহরজুড়ে রবীন্দ্রনাথ। তাঁর বাড়ি ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে তিনি যে যে বাড়িতে থেকেছেন, কোথায় কি কি লিখেছেন সব মুখস্থ ছিল আরতির। এক একদিন সকালে উঠে বলত; আজ কিন্তু আমাদের রবীন্দ্র-ভ্রমণ। কবি সম্পর্কে জানা অজানা নানান তথ্য যখন বলে যেতো অবলীলায়, অবাক হয়ে যেতো অঞ্জন। একজন মানুষকে জানতে গেলে তার পছন্দের খাওয়া-দাওয়া, পোশাক, রুচি-অরুচি, প্রিয় রং, প্রিয় বই এ সব জানাই বোধহয় যথেষ্ট নয়। তার বিশ্বাস, তার মনন এমনকি তার অকাজের হিসেব রাখাটাও খুব জরুরি। কোনো মানুষের অন্তর্জগতে কী ভাঙাগড়া চলে তা অন্যদের পক্ষে বোঝা সহজ নয়। অঞ্জনও পারতো না। কিন্তু আরতির মনের গহন থেকে, পবিত্র স্নিগ্ধ এক আলো যেন তাকে দীপ্ত করে রাখতো সব সময়।
ওই শহরেই সন্তানসম্ভবা হয়েছিল আরতি। সেদিনের কথা ভাবলেই কেমন যেন আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে অঞ্জন। আলো নিভিয়ে বিছানায়, কাছে এসে বলেছিল ‘এই যে মশাই, ছোট্ট একটা অমিত বা লাবণ্য আসছে আমাদের ঘরে। সে খবর রাখেন?’ সে রাত্রের প্রতিটি মুহূর্ত এখনও চোখের সামনে ভাসছে অঞ্জনের..

নিস্তব্ধ রাতের কাছে নতজানু বসে থাকা অঞ্জনের পুরনো অভ্যাস। স্মৃতিঘরে প্রদীপ জ্বালিয়ে অনাবিল আত্মনিবেদনে, আলো অন্ধকারে সে উড়িয়ে দেয় ভাঁজ করা হলুদ কাগজ, খুঁজে ফেরে স্বপ্নময় চোখের গহন। অদৃশ্য মায়ার কাছে নিতে চায় শুদ্ধতার পাঠ। অক্ষমের ঈর্ষা আর জাগতিক লোভে কেউ যখন জিভের দীনতা নিয়ে মুখোমুখি হয়, সম্ভ্রম জানিয়ে অঞ্জন তাকে ছায়াময় জীবনের কাছাকাছি নিয়ে যেতে চায়। কখনো পারে কখনো পারে না। যারা একসময় নানান প্রয়োজনে হাত পেতে দাঁড়াতো তারা যে আড়ালে নিন্দে করবে এই অঙ্কটা সবার জানা। কিন্তু অজানা, অচেনা লোকের কট‚ক্তি তাকে কষ্ট দেয়। নীচতার কারণ খোঁজার চেষ্টা করে। বুঝতে পারে মনেপ্রাণে অসৎ লোকেরাই অন্যের সততা নিয়ে প্রশ্ন করে বেশি। এখন তাই এ সব নিয়ে আর ভাবে না। নিজের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতায়।
আরতি যখন ছিল তখন এত কষ্ট হতো না। প্রকৃত বন্ধুর মতো পাশে দাঁড়াতো। মাঝে মাঝে হাত বুলিয়ে দিতো মাথায়। বলতো ‘ব্যবহৃত হওয়াটা আমাদের নিয়তি। তুমি সহজেই বিশ্বাস করো সবাইকে, তাই তারা সুযোগ নেয়, বোকা ভাবে তোমায়। এদের নিয়ে এত ভেবো না। অযোগ্য মানুষদের নিয়ে ভাবনাচিন্তা ঈশ্বরকে করতে দাও।’
ভুল মানুষের সঙ্গে মেলামেশা, ভুল স্বপ্নের জাল বোনা, ভুল পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেবার চেষ্টা, সবই বোধহয় নিয়তি। জন্ম থেকে আজ অবধি আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, সহকর্মী কাউকে এমন পায়নি যার দীনতা তাকে বিদ্ধ করেনি। তবু হারেনি অঞ্জন। সরিয়ে নিয়েছে নিজেকে। স্বপ্নের দিকবদল করেছে। অস্তিত্বের সংকটে ভোগা মানুষগুলোর কাছ থেকে কোনো প্রত্যাশা না করে তাদের ভালোবাসতে শিখেছে। শুদ্ধতম শিল্পের ছোঁয়ায় জীবনটাকে সাজিয়ে নিয়ে আরতির সঙ্গে অলৌকিক আনন্দের মুখোমুখি হয়েছে নিরন্তর। এখন এক অনির্বাণ স্মৃতিময়তায় সেই সব মুহূর্তের মধ্যেই বসবাস করে সে।
হাতের ওপর হাত রেখেছি বিষণ্ণতায়
সকালবেলা স্টেশন থেকে ফেরার সময় আজ আবার দেখা হলো হরেনবাবুদের সঙ্গে। চায়ের জন্য দাঁড়াবার আগেই নীলাঞ্জন সেন বললেন ‘আজ আর রাস্তায় নয়, অঞ্জনবাবু, চলুন আজ আমাদের গেস্টহাউসে চা খাবেন।’ হরেনবাবুও জোর করলেন ‘চলুন না! ওদিকটা তো যাননি আপনি।’ অঞ্জন হাসলো, ‘আপনারা তো পাহাড়ে চড়ার ভয়ে এলেন না আমার কাছে।’ অঞ্জনদের অতিথিনিবাসের মতো সাজানো না হলেও বাড়িটা মন্দ নয়। পেছন দিকে একটা খেলার মাঠ। সামনে রাস্তার ওপারে কয়েকটা জামাকাপড়ের দোকান। দরোজার উল্টোদিকে একটা সোফায় অঞ্জনকে বসিয়ে ওরা দুজনই ভেতরে গিয়েছিলেন। নীলাঞ্জনবাবু বেরিয়ে এলেন আগে। সঙ্গের মহিলাকে দেখিয়ে বললেন, আমার স্ত্রী বন্দনা। দু’হাত তুলে নমস্কার করতে গিয়ে ভদ্রমহিলার মুখটা ভালো করে দেখলো অঞ্জন।
…চিনতে পারলেন না? বন্দনার প্রশ্নের জবাব দেবার আগেই নীলাঞ্জনবাবু বললেন একসময় শিলঙে থাকতো ওরা।
এবার হেসে ফেললো অঞ্জন, বন্দনা? এমন গোলগাল গিন্নির চেহারা দেখে একটু কনফিউশন, বন্দনাও হাসলো -ওর কাছে নামটা শুনে আমারও মনে হয়েছিল হয়ত আপনি। তাই ওকে বলেছিলাম-
-বুঝলাম। বাবা-মা কি এখনো ওখানে?
-না দুজনেই চলে গেছেন। বিয়ের পরে আমি কলকাতায় চলে আসি। ভালোই ছিলেন ওরা, গতবছর তিনমাসের মধ্যে দুজনেই…
কী বলবে বুঝতে না পেরে চুপ করে থাকল অঞ্জন। হরেনবাবু এসে বসলেন। একা। নীলাঞ্জনের সঙ্গে একটি ছেলে ঢুকল। চা, চানাচুর আর কিছু তেলেভাজা সাজিয়ে এনেছে। চায়ের কাপটা এগিয়ে দিতে দিতে বন্দনা বললো- ‘বৌদি এসেছেন এখানে?’ অঞ্জন হেসে বললো- ‘আরতি তো নেই। তিন বছর হয়ে গেল।’
কথাবার্তা আর বেশিদূর এগোল না। রঞ্জনা, পিঙ্কি এবং বন্দনার দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে দুয়েকটা কথার পর ফিরে এসেছিল অঞ্জন।
কখন, কী ভাবে যে হামাগুড়ি দিয়ে অতীত ঢুকে পড়ে জীবনে, কে জানে! বন্দনার সঙ্গে কয়েক মিনিট উড়িয়ে নিয়ে এলো অনেক বছর আগেকার স্মৃতি। শিলঙে একইপাড়ায় থাকতো ওরা। খুব কাছাকাছি। আলাপ হয়েছিল অঞ্জনের অফিসে। কোনো একটা অ্যাকাউন্ট নিয়ে সমস্যা হয়েছিল। তারপর একদিন সকালবেলা হাঁটতে বেরিয়েছিল, হঠাৎ দেখা ওদের সঙ্গে। বাবা, মা আর বন্দনা। ওরাও প্রাতঃভ্রমণে।
এরপর থেকে ওর বাড়িতে আসা-যাওয়া বন্দনার। কখনো কাজের ছুতোয় কখনো অকাজে। অঞ্জন তখন একা থাকতো। অফিসের কোয়ার্টার পেতে দেরি হচ্ছিল তাই আরতিকে আনতে পারেনি।
কয়েকদিন পর বন্দনার মার নিমন্ত্রণে ওদের বাড়ি গিয়েছিল অঞ্জন। মন্দ লাগেনি পরিবারটিকে। এরপর ভালোমন্দ রান্না হলেই বন্দনার হাতে পাঠিয়ে দিতেন তিনি। বন্দনাও মাঝেমধ্যে চা বানিয়ে দিতো অঞ্জনকে। কিন্তু এ সবের বাইরে কখনো কোনো বাড়তি আগ্রহ দেখায়নি সে।
তারপর হঠাৎই একটা অদ্ভুত ঘটনা অবাক করে দিয়েছিল অঞ্জনকে। বন্দনার মার নিমন্ত্রণে ওদের বাড়ি যাবে বলে তৈরি হচ্ছে, বন্দনার বাবা এসে হাজির। কোনো ভ‚মিকা না করেই বলেছিলেন- আমাদের ওখানে যাচ্ছো? অঞ্জন মাথা নেড়েছিল।
– যাবার দরকার নেই। শুধু আজ নয়…আর কোনোদিনই না।
অঞ্জন কিছু একটা বলতে গিয়েছিল। ওকে থামিয়ে বলেছিলেন–আর হ্যাঁ, আমি যে এসেছিলাম আমার বাড়ির কেউ যেন না জানে। বলে দিও শরীর খারাপ ..
উনি চলে যাবার পর কিছুক্ষণ চুপ করে বসেছিল অঞ্জন। বোঝার চেষ্টা করেছিল ব্যাপারটা। কিন্তু …এই বিশ্রী ঘটনার কোনো সূত্রই তার মাথায় আসেনি। আরতি সব শুনে বলেছিল, তুমি বিবাহিত, তোমার সঙ্গে মেয়ের মেলামেশা ভালো না লাগতেই পারে বাবার। কিন্তু বাড়ি বয়ে এসে তোমায় কেন, নিজের মেয়েকে তো বারণ করতে পারতেন।
পরের দিন সকালে বন্দনা এসেছিল কেন যাইনি তার খোঁজ নিতে। শরীর খারাপ শুনে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। দরোজা পর্যন্ত ওকে এগিয়ে দিয়ে অঞ্জন বলেছিল- ‘খুব দরকার মনে হলে অফিসে দেখা করো। বাড়িতে আমার অনেক কাজ থাকে তো ……’
হঠাৎ এই কথাগুলো শুনে একটু অবাক হয়েছিল বন্দনা। কষ্টও পেয়েছিল খুব। ওর দিকে না তাকিয়ে দরোজাটা বন্ধ করে দিয়েছিল অঞ্জন। কয়েকদিনের মধ্যেই অন্য পাড়ায় নতুন বাড়িতে চলে যাওয়ায় অস্বস্তিটা কমেছিল একটু। আরতিও এসে শুরু করেছিল সংসার।
আজ বন্দনাকে দেখে সেদিনের খারাপ লাগাটা ফিরে এলো নতুন করে। বেচারা আজও হয়ত অঞ্জনের ওই দুর্ব্যবহারের কারণ খুঁজে পায়নি।
খুব সকালে উঠেছে অঞ্জন। রাতে ঘুম হয়নি ঠিকমতো। অদ্ভুত এক অস্থিরতায় ছটফট করেছে বিছানায়। জানলার ধারে দাঁড়িয়ে নিচের রাস্তা দেখতে দেখতে ঘড়িটার দিকে তাকালো। বেশি রোদ ওঠার আগে বেরোতে হবে।
স্টেশনের চেনা বেঞ্চে বসে ফোন করলো মেয়েকে। ফেরার সময় হয়ে গেল। এখান থেকে যাবার আগে ওরা এসে ক’দিন থাকবে বলেছিল। পিঙ্কির স্কুলের ব্যাপারটা দেখে পিনাকীর সঙ্গে কথা বলে, রাতে জানাবে ওদের প্রোগ্রাম। এমনই বললো রঞ্জনা। যাবার সময় এগিয়ে আসছে, এটা ভাবতেই খারাপ লাগছে বেশ। একটু অন্যমনস্ক ছিল অঞ্জন। হঠাৎ সামনে তাকিয়ে খুব অবাক হয়ে গেল সে। নীলাঞ্জন ও বন্দনা।
– কী খবর আজ মন্দিরের আড্ডায় যাননি?
– যাবো। আসলে বন্দনা আপনার সঙ্গে দেখা করবে বলে জোর করে বেরিয়ে পড়ল সঙ্গে।
বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ওদের বসতে দিল অঞ্জন। নীলাঞ্জন বললো-
-আপনারা কথা বলুন। আমি ঘুরে আসি। ফেরার পথে একসঙ্গে চা খাবো।
বন্দনা বসলো না। সামনে দাঁড়িয়ে থাকলো চুপচাপ। অঞ্জনও উঠে দাঁড়ালো।
বন্দনার দিকে ফিরে জানতে চাইল……‘হঠাৎ আজ বেরোলে যে’
-আপনার কাছে একটা কথা জানার ছিল
-বলো …
একটু থেমে আবার শুরু করল বন্দনা।
– সেদিন আমার অপরাধটা কী ছিল? মুখের ওপর দরোজা
-ওসব কথা থাক না
-না অঞ্জনদা, এত বছর ধরে আপনার ওই ঘৃণা বয়ে বেড়িয়েছি আমি। যন্ত্রণায় জর্জরিত হয়েছি। কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে আজ এসেছি আপনার সঙ্গে দেখা করে উত্তরটা জানতে,
– একই যন্ত্রণা, একই প্রশ্ন তো আমারও … প্রায় আপনমনে বললো অঞ্জন।
– মানে?
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে, কথাটা বলবে কি বলবে না ভাবল সে। তারপর খুব শান্ত গলায় সেদিনের ঘটনার কথা জানালো সবিস্তারে। বন্দনাকে দেখে আবার খুব কষ্ট হলো অঞ্জনের। মনে হচ্ছে একটা দুঃস্বপ্ন দেখে উঠেছে এইমাত্র। শুকনো মুখে অঞ্জনের হাতটা ধরে বললো,
-বিশ্বাসই করতে পারছি না। সেদিন আপনি না যাওয়ায় মা খুব কষ্ট পেয়েছিলেন। আমিও। তখন তো আর এ সব জানতাম না। আমায় ক্ষমা করবেন অঞ্জনদা।
-তুমি ক্ষমা চাইছো কেন? তাহলে তো আমাকেও চাইতে হয়।
-আপনার তো কোনো দোষ নেই
-আসলে তোমার বাবা বলতে বারণ করেছিলেন। কেন উনি এ সব করেছিলেন জানি না। আজ উনি নেই। মনে হলো এই ভুল বোঝাবুঝিটা শেষ হওয়া দরকার।
বাবার এ রকম অনেক কার্যকলাপ বন্দনা জানে। বিয়ের আগে নীলাঞ্জনের সঙ্গেও… সে সব আর ভাবতে চায় না সে।
তাই অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকার পর বন্দনা বললো,
– ‘আরেকটি কথা বলেই ফেলি আজ।… আমি কিন্তু খুব ভালোবাসতাম তোমায়।
অঞ্জন হেসেছিল। বন্দনার উচ্চারণে ‘তোমায়’ শব্দটি খেয়াল করেছে সে। …-আমারও খুব পছন্দের মানুষ ছিলে তুমি।
উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল বন্দনার মুখ। কাঁপছিল ওর ঠোঁট। অনেক দ্বিধা নিয়ে অঞ্জনের চোখের দিকে তাকিয়ে বললো……‘ভালো থেকো অঞ্জনদা। আজ সার্থক হলো আমার জীবন। মুক্তি পেলাম এক অলীক যন্ত্রণা থেকে।’
একটু পরেই হরেনবাবু আর নীলাঞ্জন ফিরে এলেন। বন্দনাও উঠে দাঁড়ালো।
-চলুন চা খেতে হবে তো!
হরেনবাবুর কথায় প্রায় ছেলেমানুষের মতো হাসলো অঞ্জন। বললো ট্রেনটা আসেনি। লেট করছে। ওটা চলে না যাওয়া পর্যন্ত বসে থাকাটা অভ্যাস হয়ে গেছে যে।
সবাই হেসে উঠতেই লজ্জা পেল অঞ্জন। বললো …চলুন যাই।

ফিরে এসে ঘরেতেই ব্রেকফাস্ট আনিয়ে নিল। আসলে আরতির গাওয়া একটা গান খুব শুনতে ইচ্ছে করছে এখন। ‘আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ।’ অসাধারণ গাইতো আরতি। একসময় ওর গাওয়া বেশ কিছু গান রেকর্ড করা হয়েছিল। সেখান থেকে বেছে বেছে রঞ্জনা রেখে দিয়েছে অঞ্জনের মোবাইলে।
‘আজ যেমন করে গাইছে আকাশ তেমনি করে গাও গো’ শুনতে শুনতে জলে ভরে গেল চোখ। রবীন্দ্রসাগরে ডুব দিয়ে থাকা ওই দিনগুলি ছিল আমাদের তীব্র বেঁচে থাকা। সমস্ত রকম দ্বেষ, ঈর্ষা, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের জটিলতায় পার্থিব দেওয়া নেওয়ার সংকট থেকে পালিয়ে মুক্তির নিঃশ্বাস নেবার একটাই জায়গা ছিল আমাদের। রবিঠাকুরের গান। প্রেম-বিরহ হাসি ঠাট্টা মান অভিমান, সব কিছুর মধ্যে মিশে থাকতেন তিনি।
আরতির গলায় এখন ‘বড়ো বেদনার মতো বেজেছো তুমি হে আমার প্রাণে’..
বালিশের তলা থেকে ওর ছবিটি বার করে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলো অঞ্জন।

ঝড়ো হাওয়ায় শুকনো পাতা টুকরো জীবন
কথায় কথায় একদিন কোনো একটা প্রসঙ্গে উত্তেজিত হয়ে আরতি বলেছিল, ‘নীতিহীন হতে চাই না বলেই আমাদের কোনো ‘অপশন’ নেই। একটাই রাস্তা। ঠিক সে কারণেই হয়ত কোনো ভবিষ্যৎ নেই আমাদের। কিন্তু সামাজিক বন্ধন, শিক্ষা সংস্কারের ঘেরাটোপে বাঁচারও একটা আনন্দ আছে। নিজেদের প্রমাণ করার কোনো দায়িত্ব আমাদের নেই। হাজার হাজার ইঁদুর খাওয়ার পর যে সব বেড়ালেরা সবাইকে কাশীবাসের কথা শোনায় আমরা সে দলে পড়ি না। সে কারণেই হয়ত যোগ্য মর্যাদা পাই না। অন্যের আক্রমণের শিকার হই, কিন্তু বিচলিত হই না। এইটুকু তো জীবন।’
বন্ধুদের আড্ডায় আরতিকে এমন উত্তেজিত হতে দেখা যায়নি কখনো। অন্যদের মতো অঞ্জনও বেশ অবাক হয়েছিল সেদিন। আড্ডা শেষ হয়েছিল আরতির গানে। প্রতিদিনই তাই হতো। মনে আছে একজনের অনুরোধে অঞ্জনের প্রিয় একটি গান গেয়েছিল, ‘অল্প লইয়া থাকি তাই মোর যাহা যায় তাহা যায়’। অসাধারণ সেই গানের পর এসেছিল মুড়ি আর বেগুনি। এক মুঠো মুড়ি হাতে নিয়ে বিপ্লব বলেছিল রবিঠাকুরের এই গানটি একটু বদলে নিয়ে ভিখিরিবাবুরা মহানন্দে গায়…‘অল্প লইয়া থাকি তাই যাহা পাই তাহা পাই’। আরতির দিকে তাকিয়েছিল অঞ্জন। কেমন যেন পাল্টে গিয়েছে সবকিছু। বোধ, বুদ্ধি, ভালোবাসা, আবেগ সমস্ত কিছুর মধ্যে এক অন্যমাত্রা জুড়ে আরতি বুঝিয়ে দিয়েছে কতোটা অপূর্ণ ছিল তার জীবন। প্রকৃত সুখের সন্ধান পেয়েছে অঞ্জন।
কিন্তু সুখ বোধহয় এক মায়াবী কল্পনা। প্রতীকী উঠোন, মায়াময় প্রেম কিংবা ব্যাকুল সন্ন্যাস। সুখ এক গোপন অহংকার, নিঃশব্দ মাদল। পরিমিত সুখের হাত ছেড়ে অনন্ত সুখের দিকে হাঁটতে হাঁটতে অঞ্জন সেটা বুঝেছে ভালো করেই। জাগতিক কিছু স্বাচ্ছন্দ্য সুখের ছদ্মবেশে নিয়ে যায় নির্জন নতুন কোনো পৃথিবীতে। যেখানে শুধুই রক্তক্ষরণের সুখ খেলা করে।
রঞ্জনার জন্মের পর থেকে স্বাভাবিকভাবেই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল আরতি। আদরের মেয়েকে নিয়েই ছিল তার গর্বিত দিনযাপন। শিলঙ থেকে বিহার চলে গিয়েছিল অঞ্জন। সেখানে বিভিন্ন শহরে বছর সাতেক কাটিয়ে কলকাতায় যখন ফেরে রঞ্জনা তখন স্কুলে। বিহার থেকে অবশ্য প্রতি সপ্তাহে শনি-রবিবার মূলত মেয়ের টানেই কলকাতায় ঘুরে যেত সে। আরতি ও মেয়েকে নিয়ে বেরোত এদিক ওদিক। জীবন শুরুর দিনগুলোর আবেগ, আনন্দ, অমল মুগ্ধতা সরিয়ে তারপরই শুরু হলো নতুন অধ্যায়।
জীবনের এই নাগরদোলায় ওঠানামা করতে করতে কখন যে কোথায় কিসের মুখোমুখি হতে হয় কে জানে! প্রায় দশ বছর পর এই শহরটায় থাকতে এসে একটু অস্বস্তি হয়েছিল অঞ্জনের। প্রথম কয়েকদিন এত মানুষের ভিড়ে নিঃসঙ্গ মনে হয়েছিল নিজেকে। এত কোলাহলের মধ্যেও কেমন যেন নির্জনতা। এ সব শুনে আরতি হাসতো। বলতো- ‘সবুর করো বাবু, খবর পেলে বন্ধুরা এমন ঘিরে ধরবে, আমাদের কথা আর মনেই থাকবে না।’
অফিসে কাজের চাপ খুব। পদমর্যাদা বাড়ায়, দায়িত্বও বেড়েছে। সব কিছু ঠিকঠাক বুঝে নিতে সময় লাগছিল। কাজ শেষ করে বাড়িতেই চলে যেতো রোজ। আরতিই জোর করেছিল, কফি হাউস যাবার জন্য। গিয়েছিল, দেখাও হয়েছিল অনেকের সঙ্গে। ভালো লাগেনি অঞ্জনের। মনে হয়েছিল কেমন যেন পাল্টে গিয়েছে সবাই। সম্পর্কের উষ্ণতাটাই যেন আর নেই।
আস্তে আস্তে অফিসেও আসা-যাওয়া শুরু করলো বন্ধুরা। কবিতা নিয়ে কোনো কথা নয়, ব্যক্তিগত সমস্যা, সুখ-দুঃখের গল্পই শোনাতো সবাই। বান্ধবী নিয়েও আসতো কেউ কেউ। রাস্তায় রোদে দাঁড়িয়ে না থেকে ওর অফিসের চেম্বারটাকে মিটিং পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করতো বোধহয়। এভাবে চলতে চলতে কিছু মানুষের কাছাকাছি এলেও, কবিতা থেকে দূরে চলে যাচ্ছিল অঞ্জন। সামান্য দু’একজন যারা কবিতায় সমর্পিত, তাদের সঙ্গে দেখা করতো ছুটির পরে, অন্য কোথাও। কারো মুখের ওপর ‘না’ বলতে কোনোদিনই শেখেনি অঞ্জন। এই না-শেখার মাসুল তাকে দিতে হলো পুরোমাত্রায়। নানান অভাবের গল্প বলে টাকা ধার নিতে শুরু করলো বেশ কয়েকজন। স্বাভাবিকভাবেই কমে গিয়েছিল তাদের যাতায়াত। সেখানেই শেষ নয়। চিরকালীন রীতি অনুযায়ী তারাই আড়ালে নিন্দা করতে শুরু করেছিল।
এ সব নিয়ে কোনোদিনই মাথা ঘামায়নি অঞ্জন। সমস্তই চেনা অঙ্ক। এর বাইরে কিছু হলেই বরং অবাক হতো সে। সারাজীবন মানুষের দীনতার কাছেই হারতে হয়েছে তাকে। দীন অক্ষম লোকজনের ষড়যন্ত্র, প্ররোচনায় পরাজিত হতে হতে নিজেকে সামলে নিয়েছে। জেনে গিয়েছে, জয় নয় পরাজয়েই এলোমেলো বাঁচতে হয় কবিদের।
এই সামান্য জীবনটায় মানুষ দেখা কম হয়নি। চেনা হয়ত হয়নি তেমন। সুন্দর হাসির পেছনে নিষ্ঠুর দাঁতের কামড়ে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে প্রায়শই। তবু জীবনের ওপর বিশ্বাস হারায়নি অঞ্জন। বুকের মধ্যে কিছু শুকনো বারুদ নিয়ে সরে এসেছে। অপূর্ণতা নিয়ে বিলাপ করেনি কখনো। চোরাপথে নয়, সারিবদ্ধ মানুষের পাশাপাশি হাঁটতে শিখেছে সে। অন্যকে অবজ্ঞা করে, মূর্খ ভেবে অপমান করে যারা নিজেকে মহান প্রমাণ করতে চান, তাদের সম্পর্কে সতর্ক থাকে। চাকরিজীবনে বা কবিতাজগতে অনেক স্বঘোষিত মহারাজ দেখেছে সে। এদের থেকে দূরে থাকারই চেষ্টা করেছে। সমস্ত দহন তুচ্ছ করে নিজেকে নিজের শাসনে রাখার চেষ্টা করেছে সবসময়। খুঁটে খুঁটে সুখের স্মৃতিকণা জমিয়ে রাখার অভ্যাস করেছে সে। পবিত্র গোপন এইসব স্মৃতির হাত ধরে নতুন যুদ্ধের মুখোমুখি হয়েছে।
প্রতিটি যুদ্ধ, প্রতিটি পরাজয়ে পাশে থেকেছে আরতি। অঞ্জনের শরীর থেকে অদৃশ্য অপমানের যন্ত্রণা মুছিয়ে দিতে দিতে বলতো ‘দুঃখী মানুষেরা অন্যকে আঘাত করে আনন্দ পায়। যে মানুষ এমনিতেই দুঃখী তার সঙ্গে লড়াই করে লাভ নেই।’ কখনো কখনো বলতো ‘প্রতিপক্ষকে সম্মান করতে না পারলে, কিংবা কোনো সমর্পিত বিষয় না থাকলে লড়তে যাওয়া বোকামি।’ ঠিকই বলতো বোধহয়। অযোগ্য মানুষের সঙ্গে অসম যুদ্ধে তাই কোনো আগ্রহ ছিল না অঞ্জনের। অফিসে বা বন্ধুমহলে নিজেকে সরিয়ে রাখতো অঞ্জন। কিন্তু সবসময় যে তাতে ঝামেলা এড়ানো যেতো তা নয়।

…মালবিকার পাগলামি কি ঠিকঠাক সামলাতে পেরেছিল অঞ্জন? আরতি না থাকলে শেষ পর্যন্ত কী যে হতো কে জানে! বিজন আর ওর স্ত্রী মালবিকা ওদের পারিবারিক বন্ধু। একসময় দেখাসাক্ষাৎ হতো প্রায়ই। কখনো ওদের বাসায় আবার কখনো অঞ্জনের বাড়িতে আড্ডার আসর বসতো। কলকাতা ছেড়ে যাবার পর যোগাযোগ ছিল না বললেই চলে। ফেরার পর একদিন হঠাৎ এসেছিল বিজন। আগের মতোই চঞ্চল, বাঁধনছাড়া। কয়েকদিন পর এক কমবয়সী মহিলাকে নিয়ে হাজির। আলাপ করিয়ে দিয়ে বলেছিল, ‘আমার প্রেমিকা। সুরঞ্জনা। আমার প্রেরণাও বলতে পারিস।’ একটু অবাক হয়ে হেসেছিল অঞ্জন। পরে একদিন পুরো গল্পটা শুনিয়েছিল বিজন। কফিহাউসে আলাপ। কবিতা নিয়ে গল্প। এদিক ওদিক বেড়ানো, ঘনিষ্ঠতা এবং প্রেম। তার সমস্ত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নাকি জড়িয়ে পড়েছে মেয়েটি। সব শেষে বলেছিল, ‘ভাবছি বিয়ে করবো।’ চমকে উঠেছিল অঞ্জন। জানতে চেয়েছিল,
-মালবিকা জানে?
– না, এই ব্যাপারে তোর আর আরতির একটু সাহায্য চাই।
-ক্ষমা করিস ভাই, আমরা নেই এ সবের মধ্যে। মালবিকাও আমাদের বন্ধু।
সেদিন আর কথা বাড়ায়নি বিজন। আরতিও খুব অবাক হয়েছিল। কষ্টও পেয়েছিল বেশ। পরের দিন দুপুরে এসেছিল মালবিকা। আসার আগে বোধহয় ঘুরেছে অনেক। ক্লান্ত, বিপর্যস্ত লাগছিল ওকে। অঞ্জন কিছু বলার আগেই মালবিকা বলেছিল,
-তুমি নাকি বিজনের নতুন প্রেমে মদদ দিচ্ছো?
– মানে?
-তোমার এখানেই নাকি বসে গল্পগুজব করে …।
-মাঝেমাঝে আসে ঠিকই। যেমন তুমি আজ এলে। এমনভাবে কেউ এলে …
কথা বাড়ালো না মালবিকা। আরতি, রঞ্জনার খোঁজ নিয়ে যাবার সময় বললো,
– তোমার সঙ্গে কিছু কথা, মানে আলোচনা ছিল। এখানে হবে না। বাইরে কোথাও বসা যায়?
-বাড়িতে এসো না! আরতির সঙ্গেও দেখা হবে…
রাজি হয়নি মালবিকা। ওর প্রয়োজন নাকি শুধু অঞ্জনের সঙ্গে। আর কেউ থাকলে চলবে না। অফিসের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল অঞ্জন। কয়েকদিন পর ফোন এসেছিল মালবিকার,
……তুমি তো আর সময় দিলে না। আজ আমি আসছি। বিকেলে ছুটির পর যাবো কোথাও,
তাড়াতাড়ি ফিরবে বলে এসেছিল বাড়িতে। কিন্তু কোনো কথাই শুনলো না মালবিকা।
কফিতে চুমুক দিতে দিতে মালবিকা শুরু করেছিল তার কথা। বেশ কিছুদিন ধরেই নাকি বিজন অসভ্যতা করছে ওর সঙ্গে। প্রায়ই টাকাপয়সা চাইছে, না পারলে গহনা খুলে দিতে বলছে। রেগে গিয়ে মারধরও করছে কখনো কখনো। পরশু নাকি লকার থেকে বের করে নিয়েছে সব গহনা। এ রকম প্রায় অবিশ্বাস্য কথাবার্তা শোনার জন্য প্রস্তুত ছিল না অঞ্জন। কোনো কিছু না বলে মালবিকার চোখের দিকে তাকিয়ে ছিল চুপচাপ। শুনছিল ওর কথা।
-এত কিছুর পরও আমি ভাবতেই পারিনি ওই মেয়েটিকে নিয়ে এমন পাগল হয়ে যাবে বিজন। নেশার খরচের জন্যই ওর টাকার দরকার, এটাই মনে হতো। কাল শুনলাম উকিলের কাছে গিয়েছিল ডিভোর্সের জন্য কথা বলতে …
অবাক হয়ে তাকালো অঞ্জন। কি বলবে বুঝতে পারছিল না কিছুতেই। আরতি সঙ্গে থাকলে ভালো হতো। মালবিকার চোখমুখের দিকে তাকাতে পারছিল না। অনেক কষ্টে বললো,
-কি বলি বলো তো … বিজন বরাবরই একটু চঞ্চল। কিন্তু যা শুনলাম … মেলাতে পারছি না। যাকগে তুমি এখন কী করবে ভাবছো …।
– তেমন করে ভাবিনি কিছু। কিন্তু ওকে খুব সহজে ছেড়েও দেবো না।
মালবিকাদের বাড়ি একটু দূরে, তবু অঞ্জন তাকে ছেড়ে দিয়েছিল ওদের বাড়ির কাছে। নামার সময় হঠাৎ ওর হাত ধরে মালবিকা বলেছিল, ‘এই অসময়ে একটু পাশে থেকো প্লিজ’।
সমস্ত শুনে আরতিও অবাক হয়ে গিয়েছিল। বন্ধুদের মধ্যে বিজন-মালবিকাই ছিল খুব হাসিখুশি, হৈ- হুল্লোড় করা দম্পতি। বিজনের এই পরিবর্তন কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না সহজে। হাতের কাজ সেরে আরতি বললো,
– বিজনের সঙ্গে একবার কথা বলবে নাকি? ওকি সত্যি সত্যি ওই সুরঞ্জনাকে নিয়ে সিরিয়াস?
-বুঝতে পারছি না, কি করা উচিত… তুমি একটু ভাবো না-
-একটা কথা বলবো?
আরতির গলায় একটা অস্বস্তি বা দ্বিধা, বুঝতে পারলো অঞ্জন। ওর হাতটা ধরে বললো
-বলো।
-মালবিকাকে খুব বেশি প্রশ্রয় দিও না। সত্যি মিথ্যে কিছুই তো জানি না আমরা। হঠাৎ করে ওর সেই হারিয়ে যাওয়া, বাউলদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো, তোমায় নিয়ে নিত্যনতুন পাগলামি, মনে আছে তো?
ঠিকই বলেছিল আরতি। ওরা দুজনেই বন্ধু। ওদের ব্যক্তিগত সমস্যার মধ্যে নাক গলানোর দরকার কী! অঞ্জন তাই নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিল নিজেকে। মালবিকা প্রায়ই ফোন করতো, দেখা করতে চাইতো। ব্যস্ত থাকার কথা বলে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করলেও অঞ্জন জানতো যে কোনোদিন এসে হাজির হবে মালবিকা। হলোও তাই। একদিন বিকেলে এসে বলেছিল-‘ সময় আছে আজ? খুব জরুরি কিছু কথা ছিল।’ হেড অফিসে মিটিং ছিল অঞ্জনের। সে কথা শুনে চলে গিয়েছিল সেদিন। দরোজার কাছে গিয়ে বলেছিল, ‘কাল আসছি। ফ্রি রেখো নিজেকে’।
পরের দিনের কথাবার্তায় বিজনের প্রসঙ্গ প্রায় ছিলই না। কোন জরুরি কথা বলার জন্য তাকে ডেকেছিল মালবিকা, সেটা বুঝতে না পেরে সামান্য বিরক্তি নিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল অঞ্জন
-তোমার জরুরি কথাটা কী?
– জরুরি কথা নয়, কাজ,
– মানে?
– তোমার সঙ্গে সময় কাটানো …
উঠে দাঁড়িয়েছিল অঞ্জন। ওর হাতটা ধরে মিনতি করেছিল মালবিকা।
– নতুন কী বললাম অঞ্জন? আমার এই ভালোলাগার কথা তুমি জানতে না? আগেও তো বহুবার বলেছি।
সেদিন একটা ট্যাক্সি ডেকে ওকে উঠিয়ে দিয়ে আরতিকে ফোন করে রাতের রান্না করতে বারণ করেছিল অঞ্জন। ডিনার করতে যাবে। রঞ্জনার পছন্দের সেই চাইনিজ রেস্তোরাঁয়। আরতি একটু অবাক হয়েছিল বোধহয়।

বিজনকে অনেকবার ফোন করেও পায়নি আরতি। ওর সঙ্গে কথা বলার জন্য অস্থির হয়েছিল অঞ্জনও। ওর অফিসে খোঁজ নিয়েছিল। বেশ কিছুদিন ধরেই সে যায়নি অফিসে। কোনো খবরও দেয়নি। অন্য বন্ধুরাও কিছু বলতে পারেনি। কোথায় গেল বিজন? মালবিকার কাছে খোঁজ নিয়েও কোনো লাভ হয়নি। এক বাড়িতেই থাকে ওরা। অথচ ‘জানি না’ ছাড়া কোনো শব্দই উচ্চারণ করলো না। আশ্চর্য জীবন। এতগুলো বছর একসঙ্গে কাটানোর পর একজন তার জীবনসঙ্গীর জন্য এত উদ্বেগহীন, আবেগহীন হতে পারে? সাময়িক মতান্তর বা সম্পর্কের টানাপড়েন কী সম্পূর্ণভাবে ভুলিয়ে দেয় সোনালি অতীত? মুছে দিতে পারে সবকিছু?
কয়েকদিন পর একটা ছুটির দিনে ছাদের ফুলগাছগুলোর পরিচর্যা করছিল অঞ্জন। আরতির ডাকে নিচে এসে দেখে সামনের সোফায় বিজন। ক্লান্ত, বিধ্বস্ত চেহারা।
-কী খবর তোর… আরতি কতো ফোন করেছিল তোকে …
একটু ম্লান হাসি হেসে চুপ করেই বসেছিল বিজন। আরতি চা জলখাবার এনে সামনে রেখে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘মালবিকা ভালো আছে তো?’ উত্তর নেই এবারেও। বেশ কিছুক্ষণ পরে আস্তে আস্তে কথা বলতে শুরু করেছিল বিজন। কোনো প্রশ্ন না করে চুপচাপ সব কিছু শুনেছিল ওরা।
-‘সুরঞ্জনা চলে গিয়েছে; বেশ কয়েকদিন না আসার পর খোঁজ নিতে গিয়েছিলাম। বললো নতুন এক ব্যবসায়ী বন্ধুর সঙ্গে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখছে সে।’ নিজেকে সামলে নিয়ে আবার শুরু করেছিল বিজন -‘ঘর তো সে আমার সঙ্গেই বাঁধতে চেয়েছিল। আস্তে আস্তে টাকাপয়সা জোগাড় করে ওর অ্যাকাউন্টেই রাখছিলাম। হঠাৎ কী যে হলো …’
আর চুপ করে থাকতে পারেনি অঞ্জন। জিজ্ঞাসা করলো-‘গহনাগাটি, সে সব কোথায়?’ একটু অবাক হয়ে তাকিয়েছিল বিজন। বলেছিল, ‘সেগুলোও তো সুরঞ্জনার কাছে।’
আরতি বোধহয় বুঝতে পেরেছিল অঞ্জনের মেজাজ। শান্ত গলায় জানতে চেয়েছিল, ওই সব টাকা, গহনার কী হবে এখন?
– কী আর হবে? টাকার কথায় বললো একটা ফ্ল্যাট বুক করতে চায় নিজের নামে। অনেক ধন্যবাদ দিলো আমায়। আর গহনাগুলো নাকি বিক্রি করে ওই ফ্ল্যাটের কাজেই লাগাবে। নিজের ভবিষ্যতের কথা ভেবে এই ফ্ল্যাটটা তার দরকার।
মনে আছে, প্রচণ্ড রেগে গিয়েছিল অঞ্জন।
– মালবিকার সব কিছু তুই এভাবে নষ্ট করলি? বুঝতে পারলি না পুরোটাই একটা চক্র। ঐ ব্যবসায়ী বন্ধুটা, আমি নিশ্চিত ওর পুরনো বন্ধু। সেও আছে এসবের মধ্যে। সুন্দর ফাঁদ পেতে তোকে ঠকালো।
বিজন কিছু বলার আগেই আরতি প্রশ্ন করেছিল, তুমি এত নিশ্চিত হচ্ছো কি করে?
-সময়টা দ্যাখো। এত তাড়াতাড়ি তার বিজনের ওপর মোহভঙ্গ হয়ে গেল। একজন নতুন বন্ধু এলো। তার সঙ্গে ঘর বাঁধার স্বপ্নও দেখে ফেললো। এমন হয় বাস্তবে?
খুব আস্তে আস্তে বিজন বলেছিল -আমি তো বিশ্বাসই করতে পারছি না। গত তিনমাস আমায় এক অন্য জগতে নিয়ে গিয়েছিল সুরঞ্জনা। কোথা দিয়ে কী যে হলো -এ লজ্জা নিয়ে আমি কোথায় দাঁড়াবো?
-প্রথম কাজ হলো সব কিছু উদ্ধার করা। বিভিন্ন সোর্স লাগিয়ে ধরতেই হবে ওদের।
অঞ্জনের কথায় মাথা নেড়েছিল আরতি। বিজনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল-
-মালবিকা জানে?
-না, ওকে এখনই সব বলার দরকার নেই। কষ্ট পাবে খুব।
আরতি হাসলো- ‘ওর কষ্টের পরোয়া করো তুমি?’ কিছু না বলে মাথা নিচু করে বসেছিল বিজন। অঞ্জন উঠে তার পাশে গিয়ে বসতেই ওর কাঁধে মাথা রেখে কেঁদে ফেলেছিল বিজন। তার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে অঞ্জন বলেছিল, ‘কাঁদিস না। তোর চোখের জলের যোগ্য নয় সুরঞ্জনা।’
বিজনকে যেতে দেয়নি আরতি। মালবিকাকেও ডাকতে চেয়েছিল। অঞ্জন রাজি হয়নি। তার মনে হয়েছিল, নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে বিজনের একটু সময় দরকার। একটু একা থাকা দরকার।
আরতি মেনে নিয়েছিল। অঞ্জনকে এ জন্যই এত শ্রদ্ধা করে সে। যে কোনো সমস্যায় মাথা ঠাণ্ডা রেখে, সব দিক বিচার করে, সমাধানের সূত্র খুঁজতে পারে অঞ্জন।
শেষ পর্যন্ত অঞ্জনের ফাঁদে পা দিয়েই বিপদে পড়ে গিয়েছিল সুরঞ্জনা। কয়েকজন বন্ধু মিলে প্ল্যান করে নিখিলকে সাজানো হয় প্রোমোটার। সে ছিল তুখোড় প্রেমিক। সুরঞ্জনার ফোন নাম্বার, ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্ট নাম্বার ছিল বিজনের কাছে। ব্যাঙ্ক থেকে লকারের খবরাখবরও নেওয়া ছিল। প্রথম দুয়েকদিন সুরঞ্জনার সঙ্গে ফোনেই কথা হয়েছিল নিখিলের। তারপর একদিন গঙ্গার পাড়ে দেখা করেছিল তারা। এরপরই শুরু হয় নিখিলের কৌশল আর সুরঞ্জনার লোভের প্রতিযোগিতা। চাতুর্যের মায়াখেলা। গোয়েন্দা এক বন্ধুর বলে দেওয়া পথেই এগোচ্ছিল নিখিল। প্রয়োজনমতো ভয়েস রেকর্ড ব্যবহারের কথাও সে জানতো। তা ছাড়াও একজন নিখিলদের পিছু নিতো রোজ। সুরঞ্জনার একার গতিবিধির ওপর নজর রাখছিল আরেকজন। প্রায়দিনই সে এক অবাঙালি তরুণের সঙ্গে দেখা করতো। তার পেছনেও লাগানো হয়েছিল আর একজনকে। বিজনকে নিঃস্ব করতে সুরঞ্জনা সময় নিয়েছিল তিন মাস। এবারে একটু বোধহয় বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল সে। দু’মাসের মধ্যেই নিখিলের কাছ থেকে টাকা চাইবার সময়ে কথাবার্তার রেকর্ড, ওদের ঘনিষ্ঠতার ছবি সবই এসে গিয়েছিল হাতে। বিজন যে সুরঞ্জনার অ্যাকাউন্টে টাকা জমা করেছিল তার প্রমাণ হিসেবে ওর সই করা ডিপোজিট স্লিপের ফটোকপিও সংগ্রহ করেছিল বিজন। কী কী গহনা দিয়েছিল তার লিস্ট, অ্যাপ্রক্সিমেট ওজনও তৈরি রেখেছিল সে। ……

সে দিনটার কথা মনে পড়লেই কেমন যেন উত্তেজিত হয়ে পড়ে অঞ্জন। প্ল্যান মতো নিখিল সুরঞ্জনাকে নিয়ে গিয়েছিল সকলের পরিচিত একটা কফি-শপে। চারপাশের ভিড়ের মধ্যে অন্য বন্ধুদের সঙ্গে অঞ্জনও বসেছিল সেখানে। কিছুক্ষণ পরে বিজনও সেখানে গিয়ে সুরঞ্জনাকে দেখে এগিয়ে গিয়েছিল ওদের টেবিলের দিকে।
– কেমন আছো?
প্রায় ভূত দেখার মতো চমকে উঠেছিল সুরঞ্জনা। নিখিল বোধহয় হাসছিল মনে মনে। চেয়ার টেনে বসে পড়েছিল বিজন।
-ইনি তোমার ব্যবসায়ী বন্ধু? হবু স্বামী?
সুরঞ্জনা কিছু বলার আগেই নিখিল প্রশ্ন করেছিল—- আপনি? আপনাকে তো ঠিক-
-আমিও ওর বন্ধু ছিলাম একসময়। বিয়ে হবার কথাও ছিল… আমারই একটা ভুলে হয়নি।
অবাক হবার ভান করেছিল নিখিল। -কেন? কি এমন ভুল…
……না তেমন কিছু নয়। আমি আমার টাকাপয়সা কিছু গহনা ওকে বিশ্বাস করে আগেই দিয়ে দিয়েছিলাম। সেটাই ভুল।
চোখ মুছে উঠে দাঁড়িয়েছিল সুরঞ্জনা। অঞ্জনরাও গিয়ে দাঁড়িয়েছিল ওর পেছনে।
– বসো বসো, যাবে কোথায় …নিখিলের গলার স্বরে অবাক হয়ে সুরঞ্জনা কিছু বলার আগেই
ও বলেছিল… ম্যাডাম আমি বিজনের বন্ধু। কোনো প্রোমোটার নই।
সুরঞ্জনাকে কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখে অন্য টেবিলে গিয়ে বসেছিল বিজন। বাকি কাজগুলো করেছিল অন্যরা। ওকে নিয়ে গিয়ে ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তোলা, লকার থেকে গহনা নিয়ে আসা এ সবের মধ্যে আর থাকেনি অঞ্জন। আরতি আর মালবিকার সঙ্গে রোজ কি কথা হতো না জানলেও বুঝতে পারতো অদৃশ্য কোনো ওঝার মতো মালবিকার মাথা থেকে ভূত তাড়াবার চেষ্টা চলছিল। মনে আছে, বিজনের হারিয়ে যাওয়া সব কিছু উদ্ধারের আনন্দে দেওয়া পার্টি ঘিরে সব বন্ধুরা বহুদিন পর খুব আনন্দে মেতে উঠেছিল। আরতির অপূর্ব গানের সঙ্গে মালবিকার নাচও ছিল অনবদ্য।
আগুনে ধোঁয়ায় মেঘে নীল শূন্যতায় অনায়াস আগুনের মধ্যে হেঁটে যাওয়ার অভ্যাস কোনোদিনই ছিল না অঞ্জনের। স্মৃতিময় ঘনিষ্ঠ স্বপ্নের পাশে, নীল শূন্যতায় বসে থাকতেই সে অভ্যস্ত। পরমায়ু ভাসানো এক শীতল স্রোত যখন খেলা করে সমস্ত শিরায়, আর্তনাদ কিংবা আর্তি নয়, নিজের মধ্যে চুপচাপ ডুবতে থাকতে সে। স্মৃতিকোষ মুক্ত করে হাওয়ায় উড়িয়ে দেয় সমস্ত দহন। খুঁজতে থাকে ছায়াময় স্বর্গের সিঁড়ি। ছিন্নভিন্ন শিকড় বেয়ে কখনো কখনো উঠে আসে স্মৃতিময় হলুদ পোকারা।
…… দুবাই শহরের মাঝখানে একটা খাড়ি। এই আব্রার দুপাশে শহর। একদিকে ডেইরা, অন্যদিকে দুবাই। মোটরবোটে এপার ওপারে যাতায়াত করে মানুষ। এই পারাপারের লোভেই শারজা থেকে সুযোগ পেলেই দুবাই বেড়াতে চলে যেতো অঞ্জন। দোকানপাট, কেনাকাটার আগ্রহ খুব একটা ছিল না আরতির। পুরো একটা নৌকা ভাড়া করে ওই উজ্জ্বল শহরের রোশনাই দেখতে দেখতে অলস ঘোরাঘুরিই পছন্দ ছিল আরতির। বিদেশে আসার পর সব কিছু গুছিয়ে দেবার জন্য কিছুদিনের জন্য একাই গিয়েছিল সেবার।
এই স্বপ্নের সময়টুকু খুব উপভোগ করতো আরতি। কিছুদূর গিয়ে মোটরটা বন্ধ করে দিতো মাঝিভাই। দূরের আলো আঁধারির দিকে তাকিয়ে আরতি বলতো ..‘কী কপাল আমাদের। খণ্ড খণ্ড জীবন সাজাতে সাজাতে কেটে যাচ্ছে সময়। পরিপূর্ণভাবে একে অপরের সঙ্গে থাকার সুযোগই হলো না। বেশিরভাগ সময় অনাবিল শূন্যতায় ডুবে থাকি দুজনেই।’
-আমি তা মানি না। পরিপূর্ণভাবেই তোমাকে পাই আমি। আমার সব নিঃসঙ্গতায় তুমি আছো। শারীরিক দূরত্ব হয়তো কষ্টের। নির্মল আনন্দেরও। যে কাছে নেই, যাকে চোখের সামনে পাই না, প্রতিটি মুহূর্ত তার কথা ভাবার মধ্যেও এক ধরনের –
– জানি, তাই তো লিখেছিলে-‘যাত্রীহীন নৌকা পাঠিয়েছি / যদি না আসতে পারো/জমে থাকা দুঃখগুলো পাঠিও আমায়’ অপূর্ব। জানো – তোমার এই সৎ উচ্চারণে কেঁদে ফেলেছিলাম আমি। খুব গর্বও হয়েছিল।
… কোনো কোনোদিন জল ছুঁয়ে আপন মনে গান গাইতো আরতি। মাঝেমাঝে জানতে চাইতো অঞ্জনের পছন্দ। যদিও ওর সব পছন্দই আরতির জানা। রঞ্জনার জন্মের পর থেকে একান্তে সময় কাটানো হয়ত তেমন হয় না, কিন্তু অভ্যাস বা পছন্দ পাল্টায়নি কারোরই। সেদিন যেমন আপনমনে গাইছিল ‘খেলাঘর বাঁধতে লেগেছি, আমার মনের ভিতরে …’ বলতে গিয়েও যে কথাটা বলা হয়ে ওঠে না অঞ্জনের, সেদিনও তা বলতে পারলো না। কেন জানি না আজকাল প্রায়ই তার বুকের মধ্যে কেউ গেয়ে ওঠে ‘আমার সকল নিয়ে বসে আছি সর্বনাশের আশায়…আমি তার লাগি পথ চেয়ে আছি, পথে যে জন ভাসায়… ’। আরতি শুনলেই মন খারাপ করতো ঠিক।
……রঞ্জনার পড়াশোনা আর কিছু সাংসারিক কারণে ওই মরুশহরে দীর্ঘ সময় একাই থেকেছে অঞ্জন। শেষের দু’বছর সবাই একসঙ্গে। সহকর্মীরা তো ছিলেনই, বন্ধুবান্ধবও ছিল অনেক। স্বপ্নমাখা সব দিন। মালিন্যবিহীন। স্মৃতিপোড়া গন্ধ আর ধ্বনিময় ফেলে আসা মুহূর্ত থেকে কখনো কখনো উড়ে আসে না-বলা-কাহিনি। বৃষ্টিভেজা বিকেলের ছবি।
প্রথমদিন একটু অবাক হয়েছিল অঞ্জন। অন্যসব চিঠিপত্রের মধ্যে একটা হলুদ খাম। খুলতেই সাদা কাগজে টাইপ করা একটা লাইন …‘আজ তোমায় খুব ক্লান্ত লাগছে’। একটু অবাক হয়েছিল, হাসিও পেয়েছিল খুব। কিন্তু এমন অদ্ভুতভাবে কে পাঠাতে পারে এই চিরকুট? কোনো পুরুষ না মহিলা? অফিসের কেউ? অথবা… না কিছুই মাথায় আসেনি। অফিসের কেউ তো বাংলা জানে না। ব্যাপারটা নিয়ে একটা কৌতূহল থাকলেও, মাথা থেকে সরিয়ে দেবার চেষ্টা করেছিল সে। কিন্তু পরদিন সকালে আবার একটা সবুজ খাম … ভেতরে লেখা ‘আজ কিন্তু একেবারে রাজপুত্তুর’। খামটা উল্টে দেখেছিল। কোনো পোস্টাল ছাপ। তাহলে কী বাইরে ‘লেটার বক্সে’ … যা লিখছে তাতে তো মনে হয় কাছাকাছি কেউ… অনেক ভেবেও কোনো সূত্র না পাওয়ায় এ ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দেয়নি অঞ্জন। প্রতিদিন বিভিন্ন রঙের খাম আসতো। একদিন লেখা ছিল। ‘তোমার হাত দুটো ছুঁতে চাই।’ পরেরদিন লিখলো… ‘চোখের পাতায় স্বপ্ন অনেক।’ এবার একটু সাবধান হলো অঞ্জন। সকালের দিকে অফিসের বাইরে একটু নজরদারি করতে শুরু করলো। ওর মহিলা সেক্রেটারি কেরালার মেয়ে। সে খুব মজা পেতো। হাসতো মুখ টিপে। সেও বাইরে ঘুরে আসতো মাঝেমাঝে। কিন্তু সমস্যার সমাধান হলো না।
এখানে এসে একটা স্কুলে জয়েন করেছিল আরতি। অনেকটা অনিচ্ছায়। বাংলার টিচার দেশে ফিরে যাওয়ায়, অন্য কাউকে না পেয়ে ওকেই জোর করেছিল সবাই। রাজি হয়েছিল শেষ পর্যন্ত। সেদিন বোধহয় ওর ছুটি ছিল। ‘চল, গোয়েন্দাগিরি করে আসি’ বলে এসেছিল অঞ্জনের অফিসে। একটু পরেই পিওন এসে দিয়ে যাওয়া সাদা খামটা খুলেই আরতির দিকে শুকনো মুখে তাকিয়েছিল অঞ্জন। এগিয়ে দিয়েছিল কাগজটি। লেখা ছিল ‘আর পারছি না। আসছি।’
কিছুক্ষণ পরে এক ভদ্রমহিলা ঢুকেছিলেন ঘরে। সাদাসিধে সাজগোজ। মুখ ঢাকা।
বলেছিল… বেশ কয়েকটা চিঠি দিয়ে উত্তর পাইনি, তাই আসতে হলো-
সেক্রেটারিকে ডাকতে যাচ্ছিল অঞ্জন। উনি বললেন …থাক উত্তর পরে নেবো। আজ একটু আপনার স্ত্রী আরতির সঙ্গে… বলতে বলতে মুখ থেকে কাপড়টা সরাতেই, অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল আরতি- মন্দিরা? তুই এখানে?
মন্দিরা হেসে বলেছিল..-পনেরো দিনের ভিজিট ভিসায় দাদার কাছে এসেছি। পরশু চলে যাবো। উল্টো দিকে দাদার বাড়ি। সকালবেলায় এই চত্বরে ঘুরতে ঘুরতে অঞ্জনদাকে দেখি একদিন। এই অফিসে ঢুকছেন।
-আশ্চর্য, এসে দেখা করলেন না …
-এসেছিলাম দু’দিন। সারাক্ষণ লোকজন ঘিরে থাকে আপনাকে। তবে আরতি এসেছে জানলে আপনার পেছন পেছন বাড়ি গিয়ে হাজির হতাম। আমি শুনেছিলাম রঞ্জনার জন্য ও কলকাতাতেই …।
– না রে রঞ্জনা এখন এখানে পড়ছে। আমিও একটা স্কুলে… শোন তুই কি চিঠিপত্রের কাজ আছে সেরে নিয়ে আমাদের বাড়িতে চল। কতদিন পর দেখা বলতো!
মন্দিরা হেসে উঠলো। …কাজ আর কী! তোর বরটাকে নিয়ে মজা করার জন্য রোজ একটা খাম পাঠাতাম। কেমন ভয় ভয় পেতো বেচারা।
হাসতে হাসতে আরতি বলেছিল-ওটা তাহলে তোর দুষ্টুমি? আমিও একটু চিন্তায়…
– না রে তোর বর সারাক্ষণ আরতিময় হয়ে থাকে। অঞ্জনের দিকে হাত বাড়ালো মন্দিরা-কিছু মনে করো না গো অঞ্জনদা। আমি ঐ রকমই।
-তোমাকে তো চিনি। কিন্তু ওই চিরকুটগুলো-
– মন্দিরা তো এমনই কাণ্ড-কারখানা করতো- মনে নেই তোমার?
অনেক কিছুই মনে ছিল অঞ্জনের। কিন্তু সব কথা সবসময় মনে না পড়াই মঙ্গল। সেদিন যেমন মন্দিরাকে ঘিরে অনেক কথাই দূরে সরিয়ে রেখেছিল সে। ভুলে যেতে চেয়েছিল এমন কিছু মুহূর্ত যা আপন মাধুর্যে উজ্জ্বল হয়ে আছে মনের মণিকোঠায়। অঞ্জনকে ভালোবেসে সারাজীবন কাটিয়ে দিলো মন্দিরা, বিয়েও করলো না কোথাও। আরতি একবার জানতে চেয়েছিল। মন্দিরা বলেছিল- মনে একজন, ঘরে আরেকজন নিয়ে থাকা যায়?
একতরফা এই সম্পর্কের কথা জানত না আরতি। অঞ্জনও বোঝেনি তেমন। আরতির প্রিয় বান্ধবীর তার প্রতি যে দুর্বলতা থাকতে পারে, এটা বুঝতে সময় লেগেছিল অনেক। দুবাইতে আসার আগে একদিন সব বন্ধুদের ডেকেছিল আরতি। সেদিনই এক ফাঁকে কাছে এসেছিল মন্দিরা।
– একই শহরে ছিলাম, চাইলেই দেখা হবে এমন আশা নিয়ে বাঁচতাম। এখন তো-
ওর প্রতি কোনো মানসিক টান না থাকলেও, খারাপ লেগেছিল অঞ্জনের।

শৃঙ্খলাবিহীন স্মৃতি চলমান মেঘের উড়াল

এখন অনেক কিছুই সরিয়ে রাখতে শিখেছে অঞ্জন। তার নিঃসঙ্গ জীবনযাপন, রঙিন স্বপ্নের সঙ্গে লুকোচুরি কিংবা টানাপড়েন এ সমস্ত কথা সে ভাবে না। বলেও না কাউকে। কেননা কথায় কথা বাড়ে। একটা প্রসঙ্গের পাশাপাশি আরেকটা এসে দাঁড়ায়। ধূসর, বিবর্ণ হলুদ এবং নানা রঙের মিছিল। রঙ খুঁজলেই রঙ্গমঞ্চ। অর্থাৎ সাজঘর-মুখের মেলা-আলো আঁধারি। এবং হয়তোবা শেষ পর্যন্ত একজন নারী।
বর্তমানে কোনো বিশেষত্ব না থাকলেই মানুষ অতীত নিয়ে পড়ে থাকে। বিষণ্ন চেয়ে থাকে ফেলে আসা দিনগুলোর দিকে। অঞ্জন কিন্তু বেশ আনন্দেই থাকে তার পেরিয়ে আসা সময়ের খণ্ড খণ্ড স্মৃতি নিয়ে। শুধু মাঝে মাঝে মনে হয় কোনো নাম্বার দিয়ে অথবা কোনো ক্যাপশন দিয়ে যদি চিহ্নিত করা যেতো, আলাদা করা যেতো প্রতিটি স্মৃতিকে, রেখে দেওয়া যেতো মনের ডেস্কটপে, খুব ভালো হতো। ঐ নাম্বার টিপে যখন তখন ইচ্ছেমতো সামনে আনা যেতো প্রিয়তম স্মৃতি। প্রয়োজনে ডিলিট করে মুছে ফেলা যেতো কিছু অবাঞ্ছিত মুহূর্ত।
সে সুযোগ নেই বলেই স্মৃতি কোনো শৃঙ্খলা মানে না। পরম্পরাহীন যার যখন খুশি, এসে উঁকি মারে। গল্প বা উপন্যাসের মতো ঠাসবুনন নয়, পেঁজা তুলো বা পুরনো হলুদ কাগজের মতো উড়ে আসে। মিলিয়ে যায়। সূত্রবিহীন এই আসা-যাওয়ায় কোনো কাহিনীর বিস্তার নেই, আছে ভ্রমরের মায়াবী গুঞ্জন, বিচ্ছিন্ন স্বপ্নের আভাস। জীবনের স্থিরচিত্র নয়, চলমান মেঘের উড়াল।
… সেদিন ছিল ওদের বিবাহবার্ষিকী। আটাশ তলার ওপরে রিভলভিং রেস্তোরাঁয় আরতির চোখের দিকে তাকিয়ে বসেছিল অঞ্জন। যেন এক আনন্দময় সমুদ্রের মুখোমুখি। ওর সঙ্গে আলাপ না হলে জীবনের অনেক রহস্যই বোধহয় জানা হতো না। প্রতিটি ঋতুর সঙ্গে সত্যিকারের পরিচয় হয়েছে আরতির হাত ধরেই। ভেজা ঘাসের গন্ধে হাঁটতে হাঁটতে কথায় কথায় পৃথিবীটাকে স্বর্গের মতো লোভনীয় করে তুলতে শিখিয়েছে আরতি।
-কী দেখছো?
রঞ্জনা এতক্ষণ নিচের দুবাই শহর আর জ্যোৎস্না দেখছিল। মা’র কথা শুনে বাবার দিকে তাকিয়ে হাসলো। -বাবার চোখ দুটো খুব রোমান্টিক, তাই না মা?
-ঠিক বলেছিস। অঞ্জনের চোখে চোখ রেখে বলেছিল—- বড়ো হচ্ছে আপনার মেয়ে খেয়াল রাখবেন।
রঞ্জনা উঠে দাঁড়িয়েছিল- তোমরা গল্প করো, আমি একটু উল্টোদিকের ভিউটা দেখে আসি।
আরতির মুখ থেকে চোখ ফেরাতে পারছিল না অঞ্জন। মনে পড়ছিল সেদিনের কথা। ওদের ঘনিষ্ঠতার কথা জানতে পেরে আরতির এক আত্মীয় অপমান করেছিল অঞ্জনকে। সে কথা শুনে এককথায় বাড়ি ছেড়ে এক কাপড়ে বেরিয়ে এসেছিল অত্যন্ত ধনী পরিবারের এই মেয়ে। অঞ্জন তখন সবে চাকরিতে ঢুকেছে। শুরুর দিনগুলোর আর্থিক অনটন, আত্মীয়দের অসহযোগিতা এবং নানান দুর্বিপাক কাটিয়ে আজ তারা যে এখানে বসে আছে তা আরতির জন্যই। কোনো এক অদৃশ্য স্বপ্নময় জাদুছড়ির সাহায্যে শুকনো নদীতে জোয়ার এনে দিতে পারতো সে। বাতাসে ছড়িয়ে দিতো চন্দনের ঘ্রাণ, রংবেরঙের স্বপ্ন। অঞ্জনের জীর্ণ মলিন দিনলিপিকে ধ্বনিময় করে তোলার পেছনেও আরতি।
…… এই দিনটির অনুষঙ্গে সামনে এসে দাঁড়ায় একটি বিদেশি শহরের হোটেলঘর, বিশাল কেক, আর সদ্যপরিচিত কিছু মানুষজন। অঞ্জন-আরতির বিবাহের কুড়ি বছর পূর্ণ হয়েছিল সেদিন। কোনো একটা ট্যুর কোম্পানির সঙ্গে ইউরোপের কয়েকটা শহরে বেড়াতে গিয়েছিল তারা। বেলজিয়ামের ব্রাসেলস তার খুব প্রিয়। সারাদিন অন্য একটা শহরে ঘোরাঘুরির পর ব্রাসেলসে পৌঁছতে প্রায় মাঝরাত। ঘরে এসে বসবার কয়েক মিনিটের মধ্যেই বেল বেজেছিল। কেক নিয়ে হোটেলের ম্যানেজার আর সঙ্গে বাসের সহযাত্রী বন্ধুরা। সব থেকে বেশি অবাক হয়েছিল রঞ্জনা। অঞ্জন আর আরতি হাসিহাসি মুখ করে কেক কেটে দিয়েছিল সবাইকে। কিছুক্ষণ হৈচৈ, যে যার ভাষায় গান। সবাই চলে গেলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আরতি ওর হাতটা ধরেছিল। কিছু বলার আগেই ওদের মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছিল রঞ্জনা।

…আরব সাগরের তীরে এই অফিসটা অঞ্জনের পছন্দ হয়নি প্রথমে। প্রায় সাত বছর বিদেশের বিভিন্ন শাখায় কাজ করার পর কেমন যেন অদ্ভুত লাগতো এই পরিবেশ। কেন্দ্রীয় অফিসের ঠাটবাট, সাহেবি কেতা, সবই ছিল। কিন্তু তবু কোনো অজ্ঞাত কারণে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেনি সে। কোন সাহেবের সঙ্গে কোন সাহেবের প্রচ্ছন্ন বিবাদ, কোন পক্ষে থাকলে উন্নতির পথ খোলা, কিংবা কোন মহিলার প্রেমে কোন সাহেব হাবুডুবু, এ সব রুচিহীন আলোচনায় কোনোদিনই যোগ দেয়নি অঞ্জন। নিজের কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকতো সব সময়। সহকর্মীরা তাকে অহংকারী ভাবলেও, বড়োসাহেবদের কাছে তার কদর ছিল খুব। যে কোনো সমস্যায়, গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় তার ডাক পড়তো। কখনো কখনো সমাধানের দায়িত্বও পড়তো তার ওপর। স্বাভাবিকভাবেই সহকর্মীদের সঙ্গে দূরত্ব বেড়ে গিয়েছিল অজান্তে, অনিচ্ছায়। সারাক্ষণ কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতো বলে কেউই খুব পছন্দ করতো না তাকে। অঞ্জনের নিজের সাপোর্ট স্টাফদের মধ্যেও দু’একজন কাজের চাপ বেড়ে যাচ্ছে বলে অসন্তোষ প্রকাশ করতো আড়ালে। বড়কর্তাদের চোখে তাদের ডিপার্টমেন্টের গুরুত্ব বাড়ায় খুশিও হতো কেউ কেউ। রাশভারি একজন মানুষ, যাকে সবাই হিংসে করে তার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়ে নিজেদেরও বেশ ওজনদার মনে করতো দুএকজন। আরও একটা কথা জেনে গিয়েছিল সবাই… উঁচু গলায় বকাবকি করা বা অকারণে কারো সঙ্গে তর্ক করা তার স্বভাবে ছিল না। সবই বুঝতো অঞ্জন। কিন্তু নিজের কাজের বাইরে অন্য কিছু নিয়ে মাথা ঘামাতো না সে।
…অফিস থেকে বেরিয়ে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়ালেই যতো ক্লান্তি। নিঃসঙ্গ নির্জন দিনলিপি। বাড়ি ফিরে রান্না করা, খাওয়া, সামান্য গান শোনা, জরুরি কাজ থাকলে ফাইল নিয়ে বসা, কিছু না থাকলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আরতির সঙ্গে ফেলে আসা মুহূর্ত নিয়ে স্বগতোক্তি, মৃদু উচ্চারণ, কখনো বা স্মৃতি থেকে কবিতার দুএকটি লাইন।
চাকরিজীবনে বেশিরভাগ সময়ই একা থাকতে হয়েছে তাকে। বিভিন্ন কারণে। রঞ্জনার পড়াশোনা, আরতির মা-বাবা, অঞ্জনের অসুস্থ মা, কিছু না কিছু সামনে এসে যেতোই। একা থাকাই তাই অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। সব কিছুকেই সদর্থক দৃষ্টিতে দেখতে শিখেছে অঞ্জন। আরতিই শিখিয়েছে। সে কারণেই রঞ্জনা-আরতি যখন আসে বা অঞ্জন কলকাতায় যায় তখন উৎসবের আনন্দ ঘিরে ধরে তাকে। ওই দিনগুলোর প্রতিটি মুহূর্ত সে উদযাপন করতো নিজের মতো করে। প্রতিটি সকাল যেন মায়াবী, অলস দুপুরগুলো গঙ্গার জাহাজ আর প্রতিটি রাত অহংকারী সমুদ্রের ঢেউ। আসলে বিবর্ণ, ভুল, কষ্টের স্মৃতিগুলো, সময়ের কবরখানায় রেখে দেওয়া তার পুরনো স্বভাব। সুখের স্মৃতিরাই তার স্মৃতিঘর আলো করে থাকে।
… রোজ সকালে চায়ের কাপ নিয়ে বসলেই একটা কাক মিহি স্বরে ডাকতে ডাকতে ঢুকে পড়তো ঘরে। অন্য সময় বারান্দার কার্নিশে বসে থাকলেও সকালে বিস্কুট খাবার জন্য একেবারে সামনে। অঞ্জন অফিস না যাওয়া পর্যন্ত ঘরেই থাকতো সে। রঞ্জনা একবার একা এসেছিল। বাবা অসুস্থ বলে আরতি আসতে পারেনি। তখন রঞ্জনার হাত থেকে মুড়ি খেতেও আপত্তি করেনি ‘ঝোড়ো’। এই নামটা রঞ্জনার দেওয়া। মাঝে মাঝে বেল বাজে। পাশের ফ্ল্যাটের সেনবাবু আসেন। এ কথা সে কথার পর একটা নজরুলগীতি শুরু করেন। গান শেষ করে বসে থাকেন একটু। তারপর অফিসের জন্য বেরিয়ে যান। উনিও একা, তাই অঞ্জন যথাসম্ভব সময় দেবার চেষ্টা করতো সেনবাবুকে।
…বিদেশ যাবার আগে, প্রায় দশ বছর কলকাতার বাইরে থাকতে হয়েছিল অঞ্জনকে। খুব দূরে নয়, তাই সপ্তাহের শেষে আসা যাওয়ার সুযোগ ছিল। কবিতাচর্চাও বন্ধ হয়নি তখন। নিজের মনে লিখতো। ইচ্ছে হলে কোনো পত্রিকায় পাঠাতো। সম্পাদক বন্ধুরা চেয়েও নিতো মাঝেমাঝে। কলকাতায় বদলি হবার পর তাদের অনেকেরই অন্যরূপ দেখেছে অঞ্জন। কথাবার্তা আর দীর্ঘশ্বাসের বহর দেখে মনে হতো অঞ্জনকে বন্ধুর থেকেও তারা প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবতো বেশি। এ সব নিয়ে কোনোদিনই মাথা ঘামায়নি সে। নিজের আনন্দে লেখা কবিতা কোথাও ছাপা হলে বা বই হয়ে বেরোলে ভালো লাগে ঠিকই, কিন্তু কোনোরকম ইঁদুর দৌড়ে সে কোনোদিন ছিল না। এখনও নেই। … দেখতে দেখতে ছ’বছর হয়ে গেল একটা লাইনও লেখেনি সে। স্বেচ্ছা নির্বাসনে থাকতে খারাপ লাগছে না। তবে মাঝেমাঝে যে নিজের অজান্তেই কবিতারা শব্দহীন বাসা বাঁধার চেষ্টা করে না তা নয়। পারে না। সচেতনভাবে নিজেকে সরিয়ে রাখে অঞ্জন। কাজে বা অকাজের মধ্যে ডুবে থাকার চেষ্টা করে।
… সকাল থেকে মনটা খুব ভালো ছিল সেদিন। অফিসে ঢোকামাত্র বড়সাহেবের ঘরে ডাক এসেছিল। আগেরদিন বোর্ড মিটিংয়ে অঞ্জনের তৈরি একটা নোটের খুব নাকি প্রশংসা করেছেন চেয়ারম্যান। দেখতে চেয়েছেন ওকে। বড়সাহেবও খুব খুশি।
নিজের চেম্বারে ফিরে এক কাপ কফি চেয়েছিল টেলিফোনে। খুব ইচ্ছে করছিল একটা সিগারেট… সঙ্গে সঙ্গে চোয়াল শক্ত করে ভীষণ ধমক দিয়েছিল নিজেকে। পাঁচ বছর এসবের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই তার।
…‘আসতে পারি?’ দরোজায় মুখভর্তি হাসি নিয়ে এক মহিলা। অঞ্জনের অনুমতির অপেক্ষা না করেই সামনের চেয়ারে বসে বলেছিলেন, ‘আপনার হাসি দেখে বুঝেছিলাম ঢুকতে বারণ করবেন না।’
…. আরে না না, বারণ করব কেন?
……শুনেছি আপনি খুব রাশভারি আর কাজপাগল লোক…
একটু অবাক হয়েছিল অঞ্জন। সেটা বুঝেই ভদ্রমহিলা হেসে বলেছিলেন,
-আমি নন্দিনী রায়। একসময় আপনার ঐ চেয়ারটায় বসতাম। এখন অন্য অফিসে,
উঠে দাঁড়িয়েছিল অঞ্জন। -স্যরি ম্যাডাম, চিনতে পারিনি আপনাকে।
…… বসুন, বসুন চিনবেন কী করে …এই তো ক’দিন এসেছেন।
…আপনার নাম তো শুনেছি।
… সে কী… কোথায় শুনলেন…
……ওপরমহলে তো প্রায়ই শুনি। এই অফিসেও…
মিসেস রায় হাসলেন … তবে যে শুনলাম আপনি কারো সাথে বেশি কথা বলেন না।
অঞ্জন লজ্জা পেয়ে বলেছিল …না তা ঠিক নয় …আমি একটু অন্তর্মুখী। বেশি মেলামেশা করতে পারি না।
কফি নিয়ে এসেছিল ক্যান্টিনের ছেলেটি। ওঁকে দেখেই প্রণাম করেছিল পায়ে হাত দিয়ে। বলেছিল …। আপনার কফি আনছি। অঞ্জনের দিকে তাকিয়ে হেসেছিল …ওনার ব্ল্যাক কফি।
কফি শেষ করে উঠে দাঁড়িয়ে যাবার সময় বলেছিলেন.. ‘বাংলায় কথা বলার ইচ্ছে হলে ফোন করবেন। আমিও যোগাযোগ রাখবো। আর এদিকে এলে তো আমি সকলের সঙ্গে দেখা করে যাই’।
উনি চলে যাবার পর কিছুক্ষণ চুপ করে বসেছিল অঞ্জন। নন্দিনী রায় সম্পর্কে অনেক কথাই জানা ছিল। ওঁর কর্মদক্ষতা, স্মার্টনেস, প্রশাসনিক ক্ষমতা, নিয়ে তো ওপরমহলের অনেকেই প্রশংসায় পঞ্চমুখ। সুবক্তা হিসেবেও খুব নাম। যে কোনো সমস্যা মোকাবিলা করার অসাধারণ ক্ষমতা তাঁর। গত পাঁচ বছরে তিনটি প্রমোশন পেয়েছেন। এ সমস্ত শুনে ওঁকে খুব গম্ভীর এবং জাঁদরেল অফিসার মনে হয়েছিল। সামনাসামনি দেখে তো তেমন মনে হলো না। চেহারায় প্রচ্ছন্ন এক ব্যক্তিত্বের ছাপ থাকলেও কথাবার্তা খুবই সহজ, সরল, আন্তরিক। বয়সও তেমন নয়। এই অফিসে যে ক’জন বাঙালি আছে, তাঁরা বাংলা বলেনই না। ইনি কেমন সারাক্ষণ …
ঘুমোতে যাবার আগে আরতির সঙ্গে কথা বলা তার পুরনো অভ্যাস। সারাদিনের খুঁটিনাটি সব গল্প। নন্দিনী রায়ের কথা শুনে খুব খুশি হয়েছিল আরতি। একজন বাঙালি মহিলার এমন উন্নতি ও সম্মানে নারী হিসেবে গর্ব হয়েছিল তার। বলেছিল- ‘যখন যাবো আলাপ করিয়ে দিও।’
কাজের চাপে ক’দিন খুব ব্যস্ত ছিল অঞ্জন। বাড়ি ফিরতেও দেরি হচ্ছিল বেশ। একা থাকার ক্লান্তিটাও জমছিল শরীরে। তাড়াতাড়ি অফিস থেকে বেরোবার জন্য হাতের সব কাজ সেরে রাখছিল, তখনই বেজে উঠেছিল ফোন।
-কি খবর? কেমন আছেন? নন্দিনী রায়ের গলা। একটু অবাক হয়েছিল অঞ্জন।
– নমস্কার ম্যাডাম।
-ম্যাডাম নয়। সবাই আমায় নাম ধরে বা মিসেস রায় বলে ডাকে।
-আসলে আপনি আমার সিনিয়র। তাই-
–এইসব বলে আমায় বুড়ি বানিয়ে দিতে চাইছেন নাকি! হেসেছিলেন নন্দিনী। পরে বলেছিলেন— দুদিনের ট্যুরে নাগপুর গিয়েছিলাম। ওখানে বাঙালিদের বসন্ত উৎসব দেখে এলাম। আমাদেরও একটা ছোট ক্লাব আছে বাঙালিদের। খুব ছোট।
অঞ্জন চুপ করে শুনছিল সব। উনি থামতেই বলেছিল- তাই? জানতাম না তো-
-আসুন না একদিন। দেখে যান আমাদের, ভয় নেই অফিসের বাঙালি কর্তারা কেউ নেই এই ক্লাবে … ..ভাবছি আমরাও বসন্ত নিয়ে কিছু একটা…
কর্পোরেট অফিসে কাজ করা অনেকটা তারের ওপর দিয়ে হাঁটার মতো। একটু অমনোযোগী হলেই মাটিতে। কার সঙ্গে কার ভাব, কে কার সঙ্গে টিফিন করে, এক গাড়িতে বাড়ি ফেরে, কার চেম্বারে কে কতক্ষণ বসে থাকে, সব খবর জায়গামতো পৌঁছে দেবার লোকের অভাব নেই। এসব অঞ্জনের জানা আছে বলেই সে কোনোরকম সাতে-পাঁচে থাকতে চায় না। একেবারে নিজের তৈরি একটা জগতেই থাকতে ভালোবাসে। কাজ, আরতি, রঞ্জনা এই তার পৃথিবী।
এই ঘেরাটোপের মধ্যে প্রায় হৈ হৈ করে ঢুকে পড়েছিলেন নন্দিনী রায়। একদিন ছুটির পরে এসে বাঙালিদের ক্লাবে নিয়ে গেলেন। আলাপ হলো অনেকের সঙ্গে। বেশিরভাগই সরকারি উচ্চপদে আছেন। দুএকজন সদ্য অবসরপ্রাপ্ত। একজনই শুধু ব্যবসায়ী। বিজ্ঞাপন এজেন্সির মালিক। স্ত্রী কন্যাদের নিয়ে এসেছিলেন অনেকে, বসন্ত-বন্দনার আলোচনায় যোগ দিতে। ভালোই লেগেছিল সেদিন। নিঃসঙ্গ দিনলিপির মধ্যে একটু অন্যরকম সময় কাটানো।
শেষ মুহূর্তে একটা কাজ এসে যাওয়ায়, অনুষ্ঠানের দিন যেতে একটু দেরিই হয়েছিল। সামান্য বক্তৃতার পরেই শুরু হয়েছিল গানের অনুষ্ঠান। সঙ্গে নাচ। বেশ কয়েকটি গান গেয়েছিলেন নন্দিনী। আরতির কথা মনে পড়েছিল অঞ্জনের। ওর কাছে গান মানেই আরতি।
মনে আছে, পরের দিন অফিসে ঢোকার সময় মল্লিক সাহেব তাকে থামিয়ে বলেছিলেন- কেমন হলো অনুষ্ঠান?
বেশ অবাক হয়েই অঞ্জন বলেছিল- ভালো।
-আমাকেও যেতে বলেছিল নন্দিনী। যাইনি। কাজকর্ম ফেলে এ সব করার সময় কোথায়?
অল্প হেসে এগিয়ে গিয়েছিল অঞ্জন।
…অফিসের কাজ ছাড়া সব কিছু থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখার সঙ্কল্প নিয়েই এই শহরে আসা। এমনকি কবিতা থেকেও। বিদেশে থাকার সময় নতুন একটা অভ্যাস তৈরি করেছিল সে। আরতিকে চিঠি লেখার। না, সে সব চিঠি কখনো পাঠায়নি আরতিকে। সুন্দর ডায়েরিতে লেখা চিঠিগুলোই তার মান-অভিমান, পরাজয় বা অপমানের সাক্ষী। পাশাপাশি প্রেমের প্রকাশ এবং হয়তবা সমর্পিত অলৌকিক আত্মনিবেদনও।
ঘুমোতে যাবার আগে আজ সেই নীল ডায়েরিটা নিয়ে বসেছিল অঞ্জন। চোখ আটকে গিয়েছিল একটা চিঠিতে। বিদেশ থেকে লেখা। পড়ে মনে হলো যেন একটু আগেই লিখেছে।
‘-আমার ভেঙে পড়ার সময়গুলোয় আমি তোমার কাছে থাকতে চাই। চারপাশে যখন অন্ধকার ঘনিয়ে আসে, তখন এক আলোকবিন্দুর মতো পেতে চাই তোমায়। যন্ত্রণায় যখন নীল হয়ে যায় আমার শরীর, মুখোশপরা মানুষগুলোর বিষাক্ত দাঁত যখন ক্ষতবিক্ষত করে আমায়, তখন আমি এক ছুটে মধ্যিখানের সমস্ত মাঠ পেরিয়ে একমুঠো শান্তির জন্য যেতে চাই তোমার কাছে, মগ্ন পাশাপাশি হাঁটতে চাই তোমার হাত ধরে। ভালোবাসা দিয়ে আমার চারপাশে একটা প্রোটেকটিভ রিং তৈরি করে দিয়েছো তুমি। এমন রক্ষাকবচ হয়েই থেকো সারাজীবন।’
অন্য একটা পাতা পড়তে পড়তে কেমন যেন উদাসী হাওয়ার গন্ধ পেয়েছিল অঞ্জন।
‘আমাদের জীবনযাপন এত সাদামাটা, এত বৈচিত্র্যহীন, বড়ো কোনো বিস্ময়, বড়ো কোনো খুশির সঙ্গে আমাদের দেখা হয় খুব কম। মনে আছে, তুমি একদিন বলেছিলে, দুঃখগুলো বড়ো করে না দেখে ভেঙে ভেঙে ছোট করে নিতে হয় আর ছোট ছোট সুখগুলোকে মালা গেঁথে বড়ো করে রাখতে হয় নিজের কাছে। তোমার এই সুন্দর কথাগুলো মেনে চলি বলেই এই একাকীত্ব, এই নিঃসঙ্গতা আমাকে ভাঙতে পারে না,পুরোপুরি …’
মন খারাপ থাকলে, মাঝেমাঝে এই চিঠিগুলো নিয়ে বসতো অঞ্জন। স্মৃতির হাত ধরে পুরনো দিন, পুরনো প্রসঙ্গ এসে সামনে দাঁড়াতো। আরতিকে তখন দেখতে ইচ্ছে করতো খুব।
কবিতাকে দূরে সরিয়ে রাখলেও কখনো কখনো অনায়াস উচ্চারণে তারা যে ভিড় করে না তা নয়। পাতা ওলটাতে ওলটাতে চোখে পড়েছিল, না লেখা কবিতার ‘দু’টি লাইন’-
‘উজান গঙ্গা নিয়ে এলো বহুদূর / নির্মাণ কম বেশি হলো ভাঙচুর।’
সত্যিই তো ভাঙাচোরা এই জীবনে কতোটুকু আর নির্মাণ আমাদের?
সে সময় নিঃসঙ্গতার আগুনে পুড়তে পুড়তে খুব একলা মনে হলেই নিজেকে প্রশ্ন করতো অঞ্জন-…. সাবধানী সুখের খেলা আর ছায়াযুদ্ধেই কেটে গেল জীবন। যে মায়াবন্দরের খোঁজে এই পর্যন্ত এসেছে অঞ্জন, তার অস্তিত্ব নিয়েই সন্দেহ জাগত মনে। রাগ হতো নিজের ওপর। স্মৃতির গায়ে আতর মাখিয়ে, বুকের মধ্যে নিঃশব্দ স্পন্দন নিয়ে বেঁচে থাকার অর্থ খুঁজে পেতো না কিছুতেই। এই পৃথিবীতে পরিপাটি সুখের ঠিকানা একমাত্র আরতিই জানতো। অথচ তাকে দূরে দূরেই থাকতে হয়েছে নিরন্তর। রঞ্জনা, জন্মানোর পর থেকে অঞ্জনকে কাছেই পেলো না, আরতির হাত ধরে কৈশোরও পেরিয়ে গেল প্রায়।
এইসব কথা ভাবতে ভাবতে আয়নার সামনে দাঁড়ালেই নিজের ওপর খুব বিরক্ত হতো অঞ্জন। এই জীবন কী সত্যিই সে চেয়েছিল? চাকরিতে উন্নতি, আর্থিক সচ্ছলতা, সুন্দর ফ্ল্যাট, গাড়ি, এ সমস্ত পাবার জন্যই, মা, আরতি, রঞ্জনা, নিজের ভিটেমাটি, এমনকি নিজের সৃষ্টির জগৎ ছেড়ে এক অদ্ভুত ইঁদুর দৌড়ের মধ্যে পড়ে থাকা? মা’র বয়স হচ্ছিল, আরতির শরীরও ভালো থাকতো না প্রায়শই। রঞ্জনা বড়ো হচ্ছে, দেখতে দেখতে একদিন পরের বাড়ি চলে যাবে। তখন কোন কাজে লাগবে এই সব অর্জন? যে সুখ, যে স্বাচ্ছন্দ্য আপনজনদের সঙ্গে একসাথে ভোগ করা যায় না, তা থাকা না থাকা সমান। এই মায়াবী উড়ানের স্বপ্নই কী দেখেছিল অঞ্জন?

… শরীরটা ভালো ছিল না সেদিন। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়বে বলে তৈরি হচ্ছিল অঞ্জন। বড়োসাহেব যতোক্ষণ থাকেন, ততোক্ষণ সে বেরোয় না। অন্যরাও থাকে সাধারণত। এটাই অলিখিত নিয়ম। বিশেষ কোনো কাজে তিনি আজ আগে চলে গিয়েছেন। সেই সুযোগ নিতে নয়, শরীরের জন্যই অফিসের বাইরে খোলা হাওয়ায় একটু দাঁড়াতে ইচ্ছে করেছিল। ঠিক সে সময়ে এসেছিল ফোনটা।
– কী করছেন?
– বাড়ি যাবার জন্য বেরোচ্ছিলাম-
– বাঃ, বাড়ি নয়, জাহাঙ্গীর আর্ট গ্যালারিতে চলে আসুন। কন্টেম্পোরারি আর্টের একটা এগজিবিশন হচ্ছে। আমার পরিচিত দু’একজন শিল্পীর ছবিও আছে …।
-আসলে ম্যাডাম, শরীরটা আজ ভালো নেই, তাই …
-তাই… কী? কে দেখবে বাড়িতে? আসুন, দরকার হলে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে তো –
কথা বাড়ায়নি অঞ্জন। নন্দিনী রায়ের স্বরে কী যেন একটা থাকে, এড়িয়ে যাওয়া কঠিন। ছবিগুলো দেখতে দেখতে পুরনো কিছু মুহূর্ত ছুঁয়ে গিয়েছিল তাকে। এক সময় আরতির সঙ্গে প্রায় প্রতিটি প্রদর্শনী দেখতে যেতো। তারপর একাডেমি থেকে হাঁটতে হাঁটতে ভিক্টোরিয়া।
বেরিয়ে লাগোয়া একটা রেস্টুরেন্টে কফি খেতে খেতে অনেক কথা হয়েছিল সেদিন। চিত্রকরদের নিয়ে নানান কথা বলেছিলেন নন্দিনী। অঞ্জনও তার অল্প অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছিল। কথায় কথায় জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসানের প্রসঙ্গ এসেছিল। ময়মনসিংহ শহরের দোতলা সেই সংগ্রহশালা যেখানে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের চিত্রাবলী সংরক্ষণ করা আছে, সেখানে যাবার ইচ্ছে প্রকাশ করে নন্দিনী বলেছিলেন,
-আমি ওঁর ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের ওপর দুয়েকটি ছবি দেখেছি। অসাধারণ। আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে একবার যেতেই হবে।
কেন জানি না সেদিন অনেক কথাই বলেছিলেন নন্দিনী। স্বামী ও একমাত্র পুত্রের কথা, নিউইয়র্ক অফিসে থাকাকালীন বিচিত্র সব অভিজ্ঞতার কথা, অফিসের রাজনীতি, ওই শহরের যান্ত্রিকতার পেছনে লুকিয়ে থাকা সংস্কৃতি এবং আরও অনেক গল্প হয়েছিল। আরতি, রঞ্জনা এবং অন্য সকলের কথা শুনে বলেছিলেন, ‘মেয়েকে এখানে কোন কলেজে দেওয়া যেতো না?’ -‘সমস্ত দায়িত্ব ফেলে মেয়েকে নিয়ে আরতির চলে আসা সম্ভব নয়’ অঞ্জনের কথায় মাথা নেড়ে ফিরে গিয়েছিলেন নিজের সংসারের গল্পে। স্বামীর এক্সপোর্টের ব্যবসা। প্রায়ই বিদেশ যেতে হয়। বাড়িতে আর কোনো আত্মীয় নেই, তাই ছেলে শহরের বাইরে কোনো স্কুলের হোস্টেলে। অফিসের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন দুটি কারণে- নিজেকে ব্যস্ত রাখা আর কয়েকজনের কাছে নিজেকে প্রমাণ করে কিছু অপমানের জবাব দেওয়া।
অঞ্জন কোনো কথা না বলে শুধু শুনেছিল। এমনিতেই কারো কথার মধ্যে কথা বলা তার পছন্দ নয়। আর নন্দিনী তো একজন সিনিয়র সহকর্মী। অফিসে নামডাকও খুব। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন বা সংসার নিয়ে কোনো কৌতূহল বা প্রশ্ন থাকার কথাও নয়। শুধু ভাবছিল, প্রতিটি সফল মানুষের উদ্যমের পেছনে হয়তো কোনো অপমান কাজ করে, কখনো কখনো।
সেদিন রাতের খাওয়া সেরেই ফিরেছিল অঞ্জন। নন্দিনী ম্যাডাম জোর করেছিলেন। ডাক্তারের কাছে যাবার কথাও বলেছিলেন। রাজি হয়নি সে।
বাড়ি ফিরে সন্ধ্যেবেলার কথাই ভাবছিল অঞ্জন। নানান অস্থিরতার মধ্যে, সেই অর্থে নিজের ভালোলাগার কথা ভাবার অবকাশই থাকে না। আজ একটু অন্যরকম। ম্যাডামের কথা বলার ভঙ্গিতে এক অনুপম মাধুর্য আছে। গলার স্বরেও এক অলৌকিক খেলা। ওঁর বলার গুণে সাধারণ কথাগুলোও কেমন যেন অসাধারণ হয়ে উঠেছিল, আর মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনেছিল সে।
রাতে ফোনটা পেয়ে তাই বেশ অবাক লেগেছিল। বাড়িতে ঠিকঠাক পৌঁছেছি কিনা খবর নিচ্ছিলেন। ওঁর মতো এক মহিলার এক অসুস্থ সহকর্মীর জন্য এমন উদ্বেগ খুব ভালো লেগেছিল। ফোনটা ছাড়ার আগে হঠাৎ বলেছিলেন—- আপনার কেমন লেগেছে জানি না, কিন্তু কাজের বাইরে এই সময়টুকু খুব ভালো লেগেছে আমার। অনাবিল আড্ডা। আমি কিন্তু এখন থেকে ‘তুমি’ বলবো। আপত্তি নেই তো?
-না না কত ওপরের মানুষ আপনি। আপনার মুখে ‘আপনি’ শুনতে লজ্জাই করে।
-আবার? আমি কিন্তু বলেছিলাম এ ধরনের কথা আমি পছন্দ করি না। আমরা এখন বন্ধু।

…… ফেলে আসা স্মৃতির শহরে বেড়াতে বেড়াতে কখন যে বেলা গড়িয়ে গিয়েছে খেয়াল করেনি অঞ্জন। মইদুলের ডাকে বুঝতে পারলো দুপুরের খাওয়ার সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। ডাইনিং হলে কেউ নেই। সকলের খাওয়া বোধহয় শেষ। কিন্তু রঞ্জনা তো প্রতিদিন একটা ফোন করে এ সময়। ভালো আছে তো সবাই?
খাবার নিয়ে এলো মইদুল। এক গাল হাসি নিয়ে বললো, ‘গরম গরম বেগুনি ভাজতে একটু দেরি হলো। নিন খেয়ে নিন।‘
-বেগুনি? কোন খুশিতে?
মইদুলের মুখে লাজুক হাসি জানেন বাবু, মনে হচ্ছে এবার একটা মেয়ের বাবা হবো
অঞ্জন হেসে ওর দিকে তাকালো -‘বাবা হবে বুঝলাম, কিন্তু মেয়েই যে হবে …’
-মন বলছে বাবু। আমি তো নামও ঠিক করে রেখেছি, ‘আমিনা’। অমরের বোন আমিনা। ভালো হবে না?
মাথা নেড়ে উঠে পড়েছিল অঞ্জন। রঞ্জনার ফোন এসেছে।
দুপুরবেলা ঘুমের মধ্যে আবার মাকে দেখেছিল অঞ্জন। শৈশবের চাঁদ থেকে কিশোরী মেয়ের মতো লাফিয়ে নেমে একছুটে বিছানার কাছে এসে ওর ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে কি যেন দেখছিলেন তিনি। অঞ্জন ওঁকে ছোঁয়ার চেষ্টা করতেই তিনি আপন মনে কিছু বলতে বলতে সরে গিয়েছিলেন একটু। পৃথিবীতে ওঁর শেষ মুহূর্তগুলোয় অঞ্জন থাকতে পারেনি বলেই হয়তো তিনি স্বপ্নে আসেন, কিছু বলতে চান। অঞ্জনেরও তো কিছু না বলা কথা ছিল, যা বলাই হলো না কোনোদিন।

বিষাদপুরে ভালোবাসার অন্ধ জোয়ার

প্রকৃত ভালোবাসায় বোধহয় নিঃস্ব হয়ে যায় মানুষ। তবু জীবন থামে না। আবার কোনো ভুল করে নতুন ভালোবাসায় জড়িয়ে পড়ে। বারবার। অনন্ত বিরহের হাত ধরে স্বপ্ন দেখে। বেঁচে থাকে স্মৃতির সহবাসে। নির্জন ছায়া ঘেরা স্বপ্নসাগরের তীরে হাঁটতে হাঁটতে কুড়িয়ে নেয় সুখের অসুখমাখা রঙিন ঝিনুক। নির্জনতার আগুনে জ্বলতে জ্বলতে একসময় আবার হয়তো স্বপ্নহীন শীতলতা।
…… মানচিত্রে ছোট ছোট মেঘ এঁকে বৃষ্টির অপেক্ষা করা অঞ্জনের কিশোরবেলার অভ্যাস। পেখম মেলা ময়ূরের ছবি সে আঁকেনি কখনো। সব পেখম গুটানো। আরতিকে দেখাবার জন্য এই সব ছবি খুব যত্ন করে লুকিয়ে রাখতো সে। অনেকদিন পর হয়তো সুযোগ পেতো আরতিকে দেখানোর।
একই গ্রামে, একই পাড়ায় বাড়ি হলেও কৈশোর থেকেই তাদের ছাড়াছাড়ি। আরতির বাবা কমল কাকু চাকরি করতেন অন্য শহরে। একটু বড় হয়ে সেখানেই স্কুলে ভর্তি হয়েছিল ও আর ওর ভাই। গরমের ছুটিতে যখন আসতো, তখন দেখাতো ওই সব ছবি। আরতি হাসতো, বলতো -‘বৃষ্টি চেয়ে মেঘের ছবি না এঁকে বৃষ্টির ছবি আঁকলেই তো হয়।’
‘-কিন্তু বৃষ্টি বড়ো স্বেচ্ছাচারী, সোহাগ নূপুর, কখন আসে, কখন যায় কেউ বোঝে না।’
এই মেঘবৃষ্টির টানাপড়েনে দিন যায়, বছর ঘোরে। কৈশোর পেরিয়ে যৌবন আসে। বাড়ে দূরত্ব। পড়াশোনা করতে অঞ্জন ভিনরাজ্যে আর আরতি কলকাতার কলেজে। তারপর কোনো একদিন মহাশূন্যের অঙ্কে কাচের আড়াল ভেঙে ছুটে আসে সোনার হরিণ, সাহসী রোদ্দুর আনে উষ্ণতার ছোঁয়া। কোন এক ছুটির বিকেলে পড়ন্ত রোদের ছায়া মেখে আরতি জানতে চায়—- ‘বৃষ্টির খোঁজ পেলে? নাকি এখনো মেঘই আঁকছো মনে মনে? ‘অঞ্জন হেসেছিল। একটু পরে বলেছিল, ‘বৃষ্টি কি আর ইচ্ছেকুসুম? দিনের শেষে মগ্ন আঁধার? যখন আসার ঠিক আসবে’, কথা ঘুরিয়ে নিয়েছিল আরতি -‘কবিতা লিখছো না?’ অঞ্জন ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছিল -‘লিখি মাঝেমাঝে। কাল রাতে লিখেছি একটা। পুরোটা মনে নেই, শেষ দুটো লাইন মনে আছে, শুনবে?’
‘তোমার দু’হাত ধরবো বলে
শূন্য আকাশ সঙ্গী করে দাঁড়িয়ে আছি’
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আরতি জানতে চেয়েছিল… এই হাতের মালিকের কথা। অঞ্জন বলেছিল … ‘তুমি চেনো বোধহয়। ঐ যে ছোটবেলায় ফ্রিল দেওয়া সবুজ ফ্রক পরে ঘুরে বেড়াতো। একা একা হারিয়ে যেতো জঙ্গলে…’। -তুমি একটা যা তা… লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল আরতি।
……কমলকাকু ওঁর অফিসের একটি ছেলের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে ঠিক করে রেখেছিলেন। অঞ্জনকে ভালোবাসলেও আরতির সঙ্গে তার মেলামেশা পছন্দ করতেন না খুব। এই নিয়ে বেশ অশান্তি হতো ওদের বাড়িতে। কাকিমা ও মেয়ের সঙ্গে কথা বন্ধ করে দিয়েছিলেন কাকু। একদিন রাস্তায় তাকে ডেকে নিয়ে গিয়ে বলেছিলেন… ‘আরতির ছেলেবেলার বন্ধু তুমি। আশা করছি ওর জীবনটা নষ্ট হোক সেটা চাও না।’ .. অঞ্জনের উত্তরের অপেক্ষা করেননি কাকু। পরদিন ভোরে পুরো পরিবার নিয়ে চলে গিয়েছিলেন কাজের জায়গায়।
দিন পনেরো পরে হঠাৎ আরতির একটা ফোন পেয়ে অবাক হয়েছিল অঞ্জন।
– তোমার কাছে আসছি। সারাজীবনের জন্য।
বাবার পছন্দ করা পাত্রকে অঞ্জনের সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা জানিয়ে, মার অনুমতি নিয়ে চলে এসেছিল আরতি। আর যায়নি। শাস্ত্র মতে, ওদের বিয়ে দিয়েছিলেন অঞ্জনের মা।……
….. সকাল থেকে আজ আরতির কথা মনে পড়ছে খুব। পুরনো দিনগুলো সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে কেবলই। সদ্য যৌবনের স্বরলিপি যেন উড়ে বেড়াচ্ছে হাওয়ায়। শুনতে পাচ্ছে নিজের অপটু, অস্পষ্ট উচ্চারণ ……জানলা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলেছিল …
-তুমি এক চাঁদের বিকল্প, অনিবার্য চন্দনতিলক, নীলরঙা সমুদ্রের ঢেউ …
আরতি হাসতো। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলতো- আস্ত পাগল একটা।
অঞ্জন মজা করতো- ‘ঠিক বলেছো, আমি একটা পাগল আর তুমি এই ‘পাগলা উটের ভ্রমণবিলাস।’
এইসব উজ্জ্বল মুহূর্তগুলোই বোধহয় বাঁচিয়ে রাখে মানুষকে। বাঁধনছাড়া এইসব শিহরণের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে গোপন গুহার কোনো চাবি। যেখানে বিমুগ্ধ স্মৃতির সঙ্গে খেলা করে শব্দহীন সুখী মৌমাছিরা।

… মনে আছে, ওই নতুন শহরের নতুন অফিসে যেদিন প্রথম যোগ দিয়েছিল, সেদিন একটা মন্দিরে গিয়েছিল অঞ্জন। আরতিই জোর করেছিল। মন্দিরের ভেতরে বিগ্রহকে প্রণাম করে বেরিয়ে সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েছিল অদৃশ্য সেই ভুবনমোহিনী নারীর সামনে, যার নাম আরতি। যার হৃদয়ের সূক্ষ্ম তারগুলো মূর্ছনায় মধুর করে দিয়েছিল ওদের সম্পর্ক। আনন্দে, বিষাদে স্বপ্নে, স্বপ্নহীনতায়, জোয়ারে, ভাটায়, জয়ে পরাজয়ে যে সততই ঠিক সুরে বেজে উঠে বলে উঠতো …‘আমি আছি’।
যাতায়াতের রাস্তায় পড়লেও গাড়ি থামিয়ে আর কোনোদিন মন্দিরে ঢোকেনি সে। বাইরে থেকেই মাথায় হাত ঠেকিয়েছে অভ্যাসে।

…. বেশ কিছুদিন পর ফোন করেছিলেন নন্দিনী রায়। কুশল বিনিময়ের পর জানতে চেয়েছিলেন….. কাজের চাপ কেমন? বিকেলে আমাদের ক্লাবে যেতে পারবে?
– বিশেষ কিছু? আমি তো-
-জানি, বড়সাহেব না গেলে বেরোতে পারবে না। হেসেছিলেন ম্যাডাম। -কিন্তু উনি সাধারণত সাড়ে ছটায় বেরিয়ে যান রোজ। তারপরেই যাবো না হয়।
ক্লাবের পরিবেশটা বেশ ভালো লেগেছিল অঞ্জনের। এই কংক্রিটের জঙ্গলের মধ্যে যে এমন সুন্দর সবুজ একটা জায়গা থাকতে পারে ভাবেইনি সে। বড়ো লাউঞ্জে ক্রিকেট দেখার ভিড় বেশি। ভারত-পাকিস্তান। একা থাকলে ওখানেই বসে যেতো। একসময় ক্রিকেটের পোকা ছিল অঞ্জন। স্টেডিয়ামে বসে খেলা না দেখলে মন ভরতো না। আরতি রোদ সহ্য করতে পারতো না। তবু একসঙ্গে অনেক খেলাই দেখেছে তারা।
সামনের লনটা একটু ফাঁকা। কোণের দিকে একটা টেবিল বেছে নিয়েছিলেন নন্দিনী। এদিকটায় আলো একটু কম। বসতে বসতে বললেন- ‘এখানে অনেকেই পরিচিত। দেখা হলেই হাসিঠাট্টা …ভালো লাগে না সব সময়।’ অঞ্জন হেসেছিল। সুন্দরী মহিলা দেখলে সকলেরই কথা বলতে ইচ্ছে করে। পরিচিত আর উচ্চপদস্থ হলে তো কথাই নেই।
-কী খাবে? আমি সাজেস্ট করি?
– সাজেস্ট নয় ডিসাইডও আপনি করুন। আমি এসব বুঝি না। যা পাই তাই খাই।
-অভ্যাসটা ভালো না। হেসেছিলেন নন্দিনী। চোখে দুষ্টুমি।
পরিবেশটা খারাপ লাগেনি অঞ্জনের। বহুদিন পরে মুক্ত হাওয়ায় বসার অবকাশ হয়েছিল সেদিন। কলকাতা ছাড়ার পর থেকে এমন অলস সন্ধ্যা কাটানো হয়নি কখনো। বিদেশে বেশির ভাগ সন্ধ্যা কাটতো অফিসে। ছুটির দিনগুলোয় ঘুম আর বড়জোর বোকাবাক্সের সামনে বসে সিনেমা বা সিরিয়াল দেখা। গাছগাছালির মধ্যে দিয়ে উঁকি দেওয়া আকাশটাকে দেখতে দেখতে গঙ্গার ঘাট আর একটা ডিঙি নৌকোর কথা মনে পড়েছিল অঞ্জনের। আলতো করে সে সব ভাবনা সরিয়ে নন্দিনীর দিকে তাকাতেই চোখে পড়েছিল এক মহিলা। এগিয়ে আসছেন আমাদের টেবিলের দিকে। তিনি এসে পৌঁছবার আগেই নন্দিনী উঠে গিয়ে কথা বলেছিলেন তাঁর সঙ্গে। ফিরে এসে বলেছিলেন-
-আমার স্বামীর বন্ধুর স্ত্রী। খুব গসিপ করতে ভালোবাসেন। তাই এখানে আনলাম না। অঞ্জন হেসেছিল। -সেটা বুঝতে অসুবিধা হয়নি।
নন্দিনীকে একটু আনমনা লেগেছিল সেদিন। একটু এলোমেলো, খাপছাড়া। অঞ্জন কোনো কৌতূহল দেখায়নি। সাধারণ দুয়েকটি কথার পরে নিজেই সামলে নিয়েছিলেন নিজেকে। খুব আস্তে আস্তে বলেছিলেন, ‘সরি। ঐ ভদ্রমহিলাকে দেখে কিছু কথা মনে পড়ে গেল। যন্ত্রণার কথা, বেদনারও। আমার স্বামীর সঙ্গে কিছুটা হলেও মানসিক দূরত্ব তৈরি করে দিয়েছেন ইনি। মানুষের সুখ শান্তি নষ্ট করা এঁদের কাজ।’
নন্দিনীর মুখের দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে বসেছিল অঞ্জন। তারপর বলেছিল-
-এমন মানুষদের এড়িয়ে চলাই মঙ্গল।
– একদম ঠিক। কিন্তু সবাই কি তা পারে? পারলে পৃথিবীটা অনেক সুখের হতো। এতদিন একসঙ্গে ঘর করে যে বিশ্বাস আমরা অর্জন করতে পারি না, কয়েকটা মিথ্যে কথায় কত সহজেই তা অর্জন করে নেয় এরা।
– সেটা ভাবলেই অবাক লাগে। কিছু মানুষ কেন যে নিজের বোধ বুদ্ধি বিসর্জন দিয়ে এদের চোখ দিয়ে দুনিয়া দ্যাখে কে জানে!
-একদিন সময় করে বলবো সে সব গল্প। আজ বরং কলকাতার গল্প শুনি। কফি-হাউস, গঙ্গার পাড়, একাডেমি অফ ফাইন আর্টস,…এইসব।
অঞ্জন হেসেছিল – মা’র কাছে মাসির গল্প হয়ে যাবে না? আপনি তো,
– ভুল করছো আমি কলকাতার নয়। প্রবাসী বাঙালি। কানপুরে জন্ম আমার। লেখাপড়াও অনেকটা কানপুরে। বাবা ওখানে চাকরি করতেন।
– সরি! বাবা- মা এখনো ওখানেই?
– তারা কেউ নেই আর। আমি যখন ক্লাস নাইনে তখনই মা চলে গিয়েছিলেন। কয়েক বছর পর বাবা আবার বিয়ে করে কলকাতায় চলে গিয়েছিলেন। আমায় নিয়ে যেতে চাইলেও আমি যাইনি। হোস্টেলে ছিলাম। বাবাই সব ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।
-আপনি তাহলে কলকাতায় যাননি কখনো?
চুপ করে গিয়েছিলেন নন্দিনী। তারপর আস্তে আস্তে বলেছিলেন-
-গিয়েছিলাম বার দুয়েক। বাবার অসুস্থতার খবর পেয়ে, প্রথমবার। ছিলাম কিছুদিন। বাবার চিকিৎসা, হাসপাতাল, ছুটোছুটি এ সব মিথ্যে হয়ে যাবার পর ওঁর শেষকৃত্য পর্যন্ত ছিলাম। সব মিলিয়ে বেশ কয়েকদিন।
-তারপর আর যাননি?
– ঐ বাড়িতে আর যাইনি। …কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর নন্দিনী বলেছিলেন…‘আসলে নতুন মা বোধহয় ভেবেছিলেন আমি হয়তো বাবার রেখে যাওয়া টাকায় ভাগ বসাতে চাই। নিয়ে নিতে চাই সবকিছু। খুব খারাপ ব্যবহার করতেন আমার সঙ্গে। আমার মা’র সম্পর্কেও অনেক আপত্তিকর কথা বলতেন। যদিও তাঁকে দেখেননি কখনো। কাজ শেষ হবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই চলে এসেছিলাম। খারাপ লেগেছিল ভাইটার জন্য। ওই সামান্য কদিনেই খুব মায়া পড়ে গিয়েছিল তার ওপর। সেও ছিল দিদি বলতে অজ্ঞান। …লুকিয়ে উকিলের সঙ্গে যোগাযোগ করে সম্পত্তিতে নিজের সব অংশ ভাইয়ের নামে লিখে দিয়ে এসেছিলাম। বলে এসেছিলাম আমি ফিরে আসার পর যেন জানায় মা ও ভাইকে।’
-এখন আর যোগাযোগ নেই?
-ভাই চিঠি লেখে মাঝেমাঝে। মা নাকি খুব যেতে বলেন আমায়। আমি আর যাইনি।
অঞ্জন আর কথা বাড়ায়নি। আপনমনে নন্দিনী বলেছিলেন …‘পরেরবার গিয়েছিলাম… না আজ থাক, আমার কথা পরে আবার কখন… এখন তোমার কথা শুনি। তোমার ফেলে আসা শহরের ইতিকথা…’
– না না আজ আপনার কথাই শুনতে ইচ্ছে করছে। পরেরবার কি যেন বলছিলেন…
– বলিনি কাউকে। তোমাকেই বলার ইচ্ছে হলো হঠাৎ। জানি না কেন …
অঞ্জনের মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে প্রায় অস্ফুট স্বরে বলেছিল … সেবারও একজনের চিকিৎসা করাতে যেতে হয়েছিল। শেষ সময়ে।
-আপনার মা?
-না, এক বন্ধুর, খুব প্রিয় বন্ধুর মা। দীপঙ্করের কথা শুনেছো? বলেনি কেউ অফিসে?
– না তো, শুনিনি কারো কাছে-
– দীপঙ্কর আমার খুব প্রিয় বন্ধু… বরং বলা ভালো সেই ছিল আমার প্রথম প্রেমিক। এই অফিসে ঢোকার কিছুদিনের মধ্যেই ও এসেছিল আমার জীবনে। একই ডিপার্টমেন্টে কাজ করতাম আমরা। কাজের দক্ষতার জন্য দীপঙ্কর ছিল সাহেবদের চোখের মণি। আমার কাজকর্ম সব ওর কাছেই শেখা। কাজের সময়ে অর্থাৎ অফিস টাইমে তার কাছে খুব একটা যেতাম না আমি। তখন একেবারে অন্য মানুষ সে। অফিসের পরে দেড় দু’ঘণ্টা ছিল আমাদের। একটু এদিক ওদিক ঘোরা, কফি বা অন্য কিছু খাওয়া, কখনো বা সিনেমা দেখা তারপর বাড়ি ফেরা। এই ছিল আমাদের রুটিন। আমার কোনো গাড়ি ছিল না তখন। দীপঙ্করই আমায় পৌঁছে দিতো রোজ। কাজের চাপে ওর বেরোতে দেরি হলে আমিও বসে থাকতাম। সবাই জানতো আমাদের মেলামেশার কথা। কিন্তু কেউ মুখ ফুটে কোনোকিছু বলেনি কখনো। জীবনের ওই কিছুটা সময়ই আমি বেঁচে থাকার আনন্দ উপভোগ করেছিলাম।
নন্দিনীর উদাসীন কণ্ঠস্বরের মধ্যে লুকোনো যন্ত্রণা মূর্ত হয়ে উঠছিল মাঝে মাঝেই। চুপ করে শুনতে শুনতে একটি মাত্র প্রশ্ন করেছিল অঞ্জন।
-উনি কি এখন দেশের বাইরে?
– তিনি এখন সমস্ত ধরাছোঁয়ার বাইরে। আমাদের মায়া কাটিয়ে চলে গিয়েছেন।
অঞ্জনের বিস্মিত চোখের দিকে তাকিয়ে নন্দিনী বলেছিলেন… ‘অফিসের কাজে দিল্লি গিয়েছিল। বিমানবন্দর থেকে ফেরার সময় গাড়ির মধ্যেই এক অচেনা বন্দরের দিকে চলে গিয়েছিল দীপঙ্কর। ড্রাইভারও বুঝতে পারেনি। ভেবেছিল ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। বাড়ি আসার পর ডাকাডাকিতেও যখন ওঠেনি তখন সবাইকে খবর দিয়েছিল। সবাই বলতে ওর মা আর এক বোন। আমি পৌঁছানোর আগেই ওঁরা নিয়ে গিয়েছিলেন হাসপাতালে। কিন্তু… দু’ সপ্তাহ পরে আমাদের বিয়ের দিন ঠিক করা ছিল, কার্ডও ছাপা হয়ে গিয়েছিল। অথচ… আকস্মিক একটা ঝড় তছনছ করে দিলো সবকিছু। শব্দহীন এই চলে যাওয়ার কথা প্রায়ই বলতো দীপঙ্কর। মাঝেমাঝে কী যে হতো ওর কে জানে! মনে আছে, একদিন সন্ধ্যেবেলা সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিল …‘মানুষের কত স্বপ্ন, কত চাহিদা; কিন্তু জানো নন্দিনী আমার একটাই শুধু চাওয়া- শব্দহীন, রক্তপাতহীন, ধূসর বিকেলে যেন মৃদু পায়ে শান্তিতে পেরোতে পারি মায়াবী চৌকাঠ।’ আমার অভিমানভরা মুখ দেখে হেসে উঠে বলেছিল … আরে বাবা তুমি তো জানো, তোমায় ছেড়ে আমি স্বর্গেও থাকতে পারবো না …কিন্তু কেমন নীরবে, একা একা চলে গেল…
ডিনারের অর্ডার নিতে সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল একটি ছেলে। অঞ্জন কিছু খেতে না চাওয়ায় লজ্জা পেয়েছিল নন্দিনী …।
– দ্যাখো তো পুরনো সব কথায় পরিবেশটা নষ্ট করে দিলাম আমি।
– না না তা কেন? ওঁর মা-বোন সবাই এখানেই?
-বোনের একটা ভালো বিয়ে হয়েছে। ওরই পছন্দ করা ছেলের সঙ্গে আমি নিজে দাঁড়িয়ে বিয়ে দিয়েছি। মা ছিলেন কলকাতায়। অসুস্থতার খবর পেয়ে গিয়েছিলাম। আমি আর বোন অনেক চেষ্টা করেও তাঁকে বাঁচাতে পারিনি। কলকাতায় আমার দু’বার যাওয়া দু’টো মৃত্যুর সঙ্গে জড়িয়ে। কোথা থেকে কি যে হয়ে গেল জীবনটা!
সেদিন আর কথা বাড়ায়নি অঞ্জন। নন্দিনীর মতো এমন সপ্রতিভ, সাবলীল মহিলার অতীত যে এত যন্ত্রণাময় নিষ্ঠুর হতে পারে তা ভাবতেই পারেনি সে।
…ঘুম আসছিল না কিছুতেই। ঘুরে ফিরে নন্দিনীর কথাগুলোই কানে বাজছিল অঞ্জনের। স্বামী পুত্র নিয়ে সুখের সংসার এখন… তবু স্মৃতির হাত থেকে রেহাই নেই। সেদিন ওঁর গলার স্বর শুনে মনে হয়েছিল অদ্ভুত এক নোনা বাতাস খেলা করছিল ওর বুকের মধ্যে। স্বপ্ন ও আবির দিয়ে যে দেওয়াল সাজায় মানুষ, যে পথের চারপাশে মোরম ছড়ায়, মেঘময় স্মৃতির আড়ালে যে স্বপ্নময় বীজ তাকে আচ্ছন্ন করে রাখে, সব কিছু কি ভুলতে পারে সবাই? বোধহয় না। নন্দিনীও পারেনি। দমকা হাওয়ায় কখনো কখনো তাই স্মৃতিকোষ থেকে ঝরে পড়ে বিষণ্ন অতীত। নন্দিনীর জন্য খুব খারাপ লেগেছিল সেদিন। বুঝতে পেরেছিল এক অদৃশ্য রক্তক্ষরণ কষ্ট দিচ্ছিল তাকে। অতর্কিতে অন্ধকার নেমেছিল তার ভুবনজুড়ে। সেই ভয়ঙ্কর অন্ধকারের কথা বলার সময়ও নিজেকে শান্ত, নিরাসক্ত রাখতে পেরেছিল নন্দিনী। কোথাও কোনো ভাঙচুরের, হাহাকারের শব্দ ছিল না। ছিল না কোনো অশালীন দুঃখবিলাস।
…উজ্জ্বল মেঘের মতো টুকরো টুকরো কিছু স্মৃতি ভিড় করে চারপাশে। প্রায় সারাক্ষণ। তার মতো সাধারণ মানুষের জীবনে স্বপ্ন আর স্মৃতি ছাড়া আর কী ই বা থাকতে পারে! সাদামাটা এই যাপনের মধ্যে কোনো নিটোল নাটকীয়তা নেই। আঁটসাঁট কাহিনীও না। তার জীবনের গল্প কাউকে খুশি করতে পারে না, অঞ্জন সে সব ভালো করেই জানে। নিজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বসবাসেই সে অভ্যস্ত। নিজের তৈরি এক ঘেরাটোপের মধ্যে থাকতেই পছন্দ করে বেশি। বিবর্ণ এই দিনলিপির মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ ঢুকে পড়তো নন্দিনী। অফিসের বাইরে কখনো কখনো দেখাসাক্ষাৎ ঠিক ছিল, কিন্তু …
…… সেদিন আরতির সঙ্গে কথা বলে একটু চিন্তিত ছিল অঞ্জন। রঞ্জনার শরীরটা ভালো নয়। কিছুদিন ধরে আরতি নিজেও ভুগছিল বেশ। কয়েকদিন ছুটি নিয়ে যেতে পারলে খুব ভালো হতো। কিন্তু কাজের চাপে, মনে হয় না সেটা সম্ভব হবে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশ দেখতে দেখতে আরতির সঙ্গে মনে মনে কথা বলছিল অঞ্জন। তখনই বেজে উঠেছিল ফোনটা। এ সময়ে আরতি ছাড়া আর কেউ তো ফোন করে না। একটু আগেই তো কথা হলো ওর সঙ্গে। তবে? প্রায় দৌড়ে গিয়েই ফোনটা তুলেছিল অঞ্জন। নন্দিনীর গলা শুনে অবাক হয়েছিল একটু।
-কি করছো? বিরক্ত করলাম না তো?
কথা বলার মুডে ছিল না অঞ্জন। তার মাথায় এখন আরতি আর রঞ্জনা। তবু বলেছিল- না না বলুন। কোনো প্রব্লেম ম্যাডাম?
– আরে সেসব কিছু না। পরশু বাইরে যেতে হবে। তিন চারদিন থাকবো না। ভাবলাম কাল একটু আড্ডা হলে মন্দ হয় না। আরও একটা কথা, ‘ম্যাডাম’ ‘আপনি’ এসব এবার ছাড়ো।
– সেটা হয় না। আপনি আমার অনেক সিনিয়র … ওটা আমি পারবো না।
নন্দিনী হেসেছিল। -আচ্ছা এটা তোমার কোনো ওপরওলার নির্দেশ ধরে নাও। ‘অঞ্জনও হেসেছিল …। -কিন্তু কাল একটু চাপ আছে কাজের। বড়সাহেব বিদেশ যাবেন। অনেক কিছু …।’
– জানি সব জানি। কাজ ফাঁকি দিয়ে কিছু করার উপদেশ আমি দেবো না কখনো। নিজেও তা করি না।

এরপর থেকে প্রায় রোজই ফোন আসতো নন্দিনীর। কাজ নয় অকাজের কথাই হতো বেশি। অফিসের রাজনীতি, দুজনের সংসারের বাইরে হাবিজাবি সব কথা। আরব দেশের অভিজ্ঞতা, মরুভূমি ভ্রমণ, উটেদের দৌড় প্রতিযোগিতা এইসব জানতে চাইতেন তিনি। শোনাতেন তাঁর বিদেশের অভিজ্ঞতার কথা। … এসব কথার মধ্যেও অঞ্জন শুনতে পেতো জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ। বুঝতে পারতো নন্দিনীর মনের রহস্যময় গতিপথ। ঠিক সে বেরিয়ে আসা নন্দিনীকে দেখতে চায়নি অঞ্জন। দেখতে চায়নি ওর ভেঙে পড়ার মুহূর্তগুলো। কথাবার্তার মাঝখানে মেঘের আভাস দেখলেই প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলার চেষ্টা করতো। সব সময়ে সফল হতো তা নয়।
…… স্নায়ু ও শিরায় অন্ধকার নিয়ে আলোয় দাঁড়ালে কাঙাল হয় মানুষ। নিজের মধ্যে লুকিয়ে থাকা নিঃস্ব মানুষ নির্জন মুগ্ধতা নিয়ে ভেসে যায় ধ্বনিময় কথোপকথনে। জলকে কোনোদিন ভয় করেনি অঞ্জন। ভাসতেও কোনোদিন অনীহা ছিল না। আরতির প্রেমে স্বপ্নময় ভেসে যেতে যেতে অনেক মুহূর্তই সে একা কাটিয়েছে। গ্রন্থিহীন মালার মতো তাদের সংসার। অদৃশ্য এক বন্ধনে বাঁধা। সুন্দর, সমৃদ্ধ কিছু স্মৃতিকণার গায়ে আতর মাখিয়ে পরিপূর্ণ সুখের ঠিকানা খুঁজতে খুঁজতেই কেটে গিয়েছিল তাদের অর্ধেক জীবন। স্বপ্নের সুবাস, শব্দহীন আবেগ আর প্রতীকী আঙুল দিয়ে আরতিকে ছুঁয়ে থাকতো অঞ্জন।
……বহুবর্ণ এই জীবন বড় অদ্ভুত। প্রথম প্রথম নন্দিনীর ফোন নিয়ে কোনো আগ্রহ না থাকলেও কিছুদিন যেতে না যেতেই এই ফোনের জন্য অপেক্ষা করতো অঞ্জন। একদিন রাতে কথা না হলে কেমন যেন অস্থির হয়ে যেতো। আসলে নন্দিনীর কথাবার্তা, আন্তরিকতা এবং সব কিছুর মধ্যে তার প্রখর আভিজাত্য স্পর্শ করতো তাকে। যে কোনো বিষয়েই কথা হোক না কেন, মুগ্ধ হয়ে শুনতো অঞ্জন। এই বাঁধনছাড়া মুগ্ধতাই তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল ক্রমশ। বুঝতে পারছিল, নন্দিনীও ক্রমশ আঁকড়ে ধরতে চাইছিল তাকে। ভাগ করে নিতে চাইছিল নিজের নিঃসঙ্গতা। ওদের কথাবার্তায় প্রায়ই দীপঙ্করের প্রসঙ্গ আসতো, কখনো বা আরতির কথাও বলতো অঞ্জন। দীপঙ্করের কথা এলে নন্দিনীর গলার স্বর পাল্টে যেতো, বলতো, ‘আমার জীবনটাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছিল দীপঙ্কর। আমার বোধ বুদ্ধি ভালোবাসা আবেগ সমস্ত কিছুর মধ্যে একটা অন্যমাত্রা জুড়ে দিয়ে ও আমায় যেন দেখিয়ে দিয়েছিল কতোটা অপূর্ণ ছিল আমার জীবন।’ অঞ্জনের মনে হতো একই কথা সে আরতি সম্পর্কে বলতে চায়। কিন্তু বলেনি কখনো। নন্দিনীর গল্প শুনেছে।
…… দীপঙ্কর চলে যাবার পর দীর্ঘদিন নিজের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়িয়েছে সে। ডুবে থেকেছে অফিসের কাজে। দিনরাত মুখ গুঁজে কাজ করতে করতে সময়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে ভুলতে চেয়েছে দুঃস্বপ্নের দিনগুলো। বড়সাহেবরা জোর করে প্রমোশনের জন্য ইন্টারভিউ দিতে রাজি করিয়েছিলেন। প্রমোশনও দিয়েছেন। চাকরিতে উন্নতির জন্য নয়, দায়িত্বের সঙ্গে সঙ্গে কাজ বেড়ে যাওয়ায় খুশি হয়েছিল সে। কেননা তার মনে হতো এই কাজের মধ্য দিয়েই দীপঙ্করের আত্মাকে খুশি করতে পারবে।
…… এমনিভাবেই কাটছিল দিন। আত্মীয়স্বজনরা বিয়ে করে জীবনে স্থিতু হবার উপদেশ দিচ্ছিলেন। বাবাও চাইছিলেন। নন্দিনী সেসব কথায় কান দেয়নি। এই সময়েই একদিন চেয়ারম্যান সাহেব তাকে ডেকেছিলেন। এ কথা ও কথার পর বলেছিলেন- তোমায় যদি বিদেশে কোথাও পোস্টিং দিই, যাবে? নন্দিনী উত্তর দেয়নি।
কিছুদিনের মধ্যেই নিউইয়র্কে যাবার চিঠি পেয়েছিল নন্দিনী। দীপঙ্করের স্মৃতি জড়ানো এই শহর ছেড়ে যেতে মন চায়নি তেমন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যেতেই হয়েছিল তাকে। যাবার আগে সমস্ত দায়িত্বপালনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে নিজেকে নিশ্চিন্ত করেছিল সে।
রূপকথার গল্প শোনার মতো সব কিছু শুনতো অঞ্জন। নন্দিনীর কথা বলার মধ্যে এক অনুপম মাধুর্য ছিল যা মুগ্ধ করতো অঞ্জনকে। মাঝেমাঝে একআধটা প্রশ্ন মাথায় এলেও চুপ করে থাকতো সে। নন্দিনীর গতিময় কথাবার্তায় এক ধরনের ভালো লাগা গ্রাস করত তাকে। প্রথমদিকে নন্দিনীর সঙ্গে ফোনে কথাবার্তার সব কিছুই জানাতো আরতিকে। পরের দিকে আর কিছু বলতো না। কেন জানি না মনে হতো কষ্ট পেতে পারে আরতি। রঞ্জনাকে মানুষ করার জন্য নিজের শখ-আহ্লাদ সবই ভুলেছিল সে। নতুন করে তার মনে অস্বস্তি ঢুকিয়ে দেওয়ার কোনো অর্থ নেই। প্রতিদিন রাতে এক মহিলার সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্বামীর গল্প করাটাকে কোন স্ত্রীই বা সহজভাবে নিতে পারে?
….নন্দিনীর বিয়ে নিয়ে যে প্রশ্নটা অঞ্জনের মাথায় ঘুরেছিল অনেকদিন, একদিন রাতের গল্পে তার উত্তর পেয়ে গিয়েছিল অঞ্জন। আমেরিকায় অফিসের একটি পার্টিতে আলাপ। প্রথম দর্শনে খারাপ লাগেনি ভদ্রলোককে। পরে দু’একবার নিজের ব্যবসার কাজে গিয়েছিলেন ওদের অফিসে, কিন্তু কথাবার্তা হয়নি বেশি। কিছুদিন পরে কোনো এক শনিবারে তিনি নাকি ফোন করে লাঞ্চে যাবার নিমন্ত্রণ করেছিলেন। আপত্তি করেনি নন্দিনী।
মনে আছে এই গল্পটা বলার সময় খুব সুন্দর করে নন্দিনী বলেছিল ‘জানো অঞ্জন সেদিনের প্রতিটি কথা মনে পড়ছে আমার। একটা বেশ অভিজাত রেস্তোরাঁয় নিয়ে গিয়েছিল অনিমেষ। সৌজন্যমূলক কিছু কথাবার্তার পর হঠাৎ বলেছিল, আপনার সঙ্গে খুব জরুরি একটা কথা আছে।’
আমি কী বলবো ভাবছি, তখন নিচু গলায় উচ্চারণ করেছিল ‘আপনাকে আমার খুব ভালো লাগে। বিয়ে করবেন আমায়? আমি তো অবাক। লোকটা বলে কী! পরে শুনলাম আমাদের মুম্বাই অফিসে আমায় দেখে ভালো লেগেছিল তাঁর। কথায় কথায় এও জানিয়েছিলেন তিনি দীপঙ্করের দুর্ঘটনার কথা জানেন। এবং সবকিছু জেনেশুনেই এই প্রস্তাব রেখেছিলেন তিনি।’
অঞ্জন চুপ করে সব শুনছিল। নন্দিনী জিজ্ঞাসা করেছিল,
– কিছু বলছো না যে,
-ভাবছিলাম তুমি কী উত্তর দিলে?
-কিছুই না। অবাক হয়ে হাঁদার মতো বসেছিলাম।
-তারপর?
-তারপর আর কী…..উত্তর না পেয়ে বললেন অপেক্ষা করবেন।
– তা কতদিন অপেক্ষা করতে হলো তাঁকে?
-বেশিদিন নয়। তিন-চার মাস পরে ছুটিতে এই শহরে এসে বিয়ে হয়ে গেলো।
এইরকমই ছিল রাতের টেলিফোনে তাদের আড্ডা। আজ বিয়ের গল্প তো কাল বনিবনা না হওয়ার কাহিনী। কাছাকাছি আসার মাধ্যম।
বিয়ের দু’বছরের মধ্যেই নন্দিনীর ছেলে শুভাশিসের জন্ম। তারপরও কয়েকটি বসন্ত বেশ ভালোই কেটেছিল তাদের। অনিমেষের ব্যবসাটা খুব বড়ো ছিল না তখন। মাঝেমাঝে বিদেশ যেতে হলেও এখানেই থাকতো বেশিটা সময়। এখন তো প্রায় থাকেই না। সারাক্ষণ ঘুরে বেড়ায়। ক্লাবে কেউ কেউ কিছু ইঙ্গিত দেবার চেষ্টা করেছে, কান দেয়নি নন্দিনী। তবে নিজে একজন মেয়ে হিসেবে যা বোঝার সে বোঝে। কিন্তু এ বিষয়ে একটি কথাও বলেনি অনিমেষকে। শুধু বাবা-মা’র এই ঠাণ্ডা সম্পর্ক থেকে ছেলেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে, কষ্ট হলেও।
…একটু একটু করে অনেক কথাই বলতো নন্দিনী। অঞ্জনের মন্দ লাগতো না। মন খুলে কথা বলা যায় এমন মানুষ পাওয়া যায় না সহজে। মাথা রেখে কান্নার মতো কাঁধও তো দুর্লভ। নন্দিনী যে বিশ্বাস করে তাকে সব কিছু বলে, কিছুটা হলেও তার ওপর নির্ভর করে, সঙ্গ চায়, এ সব ভেবেই খুব ভালো লাগতো অঞ্জনের। কেন কে জানে? মাঝেমাঝে খুব ভেঙে পড়তো নন্দিনী। বলতো,
– ‘ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন দেখতাম দূরের কোনো মগ্ন বেলাভূমি থেকে অফুরান ভালোবাসা নিয়ে আসবে এক রাজকুমার, যার দুর্নিবার টানে, এক অজানা সম্মোহনে কেঁপে উঠবে আমার জীবন আমার অস্তিত্ব। সে রাজকুমার এসেও চলে গেল নিঃশব্দে। ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল আমার জীবন।’
কী বলবে বুঝতে না পেরে চুপ করে থাকতো অঞ্জন। অন্তর্মুখী মানুষ সে। উচ্ছ্বাস নেই একেবারেই। সব কথা গুছিয়ে বলতে পারে না। এইসব মুহূর্তগুলোয় নন্দিনীর পাশে আন্তরিকভাবে থাকতে চাইতো, বলতো- নিজেকে শান্ত করো নন্দিনী। পিছনে নয়, সামনে এগিয়ে যাওয়াই জীবন।
– যতবার এগোতে চাইলাম ততবারই তো বিদ্রুপের হাসি হেসে আমায় থামিয়ে দিল জীবন। এখন আমার সামনে শুধু অন্ধকার।
কোনো উত্তর খুঁজে না পেয়ে অঞ্জন বলেছিল- কয়েকদিন ঘুরে এসো কোথাও। না হয় ছেলের কাছেই…
– আমায় কোথাও নিয়ে যাবে অঞ্জন?
এমন একটা কিছু শোনার জন্য তৈরি ছিল না সে। যদিও মনে মনে এমন আশঙ্কা যে করেনি তা নয়। নন্দিনীকে খুশি করার জন্য যা কিছু করা সম্ভব সে করেছিল। ওর অনুরোধে ‘আপনি’ নয় তুমি’ বলা শুরু করা, মাঝেমধ্যে দু-চার লাইন গান শোনানো, রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দের কবিতা আবৃত্তি করা সবই করেছিল। কিন্তু প্রতিটি মুহূর্তে মনে হতো নন্দিনীর বোধহয় আরও অনেক কিছু প্রয়োজন। একজন সত্যিকারের মানসিক সঙ্গী, একজন প্রকৃত বন্ধু। কিন্তু অঞ্জন জানতো তার সে ক্ষমতা নেই।
আরতি, রঞ্জনাকে ফেলে এতদূরে থাকাটাই অসহ্য হয়ে উঠত প্রায়ই। জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া সবকিছু নিয়ে নন্দিনীর দুঃখের কথা শুনতে শুনতে নিজের জীবনের দিকে তাকাতো অঞ্জন। সবকিছু থেকেও যেন নেই! আপন মানুষগুলোর কোনো সমস্যাতেই পাশে দাঁড়াতে পারেনি সে। মানসিকভাবে কাছাকাছি থাকলেই কী সব হয়? নন্দিনী তার জীবনে আসার পর আরতির সঙ্গে কথাও হতো না বেশি। আগের মতো তেমন গল্পও নয়। নিজের ওপর খুব রেগে যেতো অঞ্জন। হৃদয়ের অন্তর্লীন আবেগ মাঝেমাঝেই আমাদের যুক্তিতর্ক, বুদ্ধিকে থামিয়ে রাখে, ভালোবাসা আমাদের বেহিসেবি হতে প্ররোচনা দেয়, এ সমস্তই জানা ছিল অঞ্জনের। তবু কেন যে নন্দিনীকে সঙ্গ দিতে গিয়ে, নিজের মানুষদের অজান্তে একটু অবহেলা করে এক মানসিক মালিন্য তৈরি করে ফেলেছিল কে জানে!
…… বড়সাহেবের সঙ্গে কিছু জরুরি কথাবার্তা সেরে কেবিনে ঢুকতেই নন্দিনীকে দেখে একটু অবাক হয়েছিল অঞ্জন।
– একটা খবর দিতে এলাম। চেয়ারম্যান সাহেব ডেকেছিলেন আমায়। ব্যাঙ্গালোরে একটা সেমিনার অরগানাইজ করতে বললেন, তিনদিনের জন্য। কুড়িজন এগজিকিউটিভকে নিয়ে।
– বাহ, কী বিষয়ে?
– সে সব পরে জানাবো। ঐ কুড়ি জনের মধ্যে তুমিও আছো।
-আমি?
-হ্যাঁ, আমিই দিয়েছি নামটা।
– কিন্তু…
-বাকি যা করার বড়কর্তা করবেন। আসি, অনেক কাজ আছে আজ।

… ব্যাঙ্গালোরের হোস্টেলে ওদের দু’জনের ঘর ছিল পাশাপাশি। কো-অর্ডিনেটর হিসেবে নন্দিনীই হয়তো ব্যবস্থা করেছিল সবকিছু। এর আগে ওর কর্মদক্ষতার কথা অনেক শুনেছে, কিন্তু সরাসরি কাজের মধ্যে কখনো দ্যাখেনি। সেমিনার চলাকালীন তাঁর কথাবার্তা মুগ্ধ করেছিল অঞ্জনকে। মনে হয়েছিল ইনি অন্য কেউ। লাবণ্য, আভিজাত্য ও বাগ্মিতার এমন সুষম সংমিশ্রণ যে হতে পারে তা কোনোদিন ভাবতেই পারেনি সে। শুধু অঞ্জন নয়, অনেকেই তাঁর ভক্ত হয়ে পড়েছিল। নন্দিনী যে তার প্রিয় বন্ধু এই ভেবে মনে মনে খুশি হয়েছিল সে। সেমিনার রুমের বাইরে নন্দিনীর কাছাকাছি যাবার চেষ্টা করেনি অঞ্জন। ওকে ঘিরে ভিড় করেছিল অনেকেই। রুমের মধ্যেও বাড়তি কথা বলে ওর মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করেছিল কেউ কেউ। এ সব থেকে দূরে থাকা অঞ্জনের স্বভাব। প্রভাবশালী কর্তাদের চারপাশে ভিড় করে থাকা, তার আসে না। এখানেও প্রতিটি বক্তার বক্তব্য মন দিয়ে শুনে পক্ষে বা বিপক্ষে নিজের যুক্তি তৈরি রেখেছিল, কিন্তু তার বাইরে কোনো উৎসাহ দেখায়নি। সন্ধ্যেবেলা কয়েকজনের সঙ্গে শহর দেখতে বেরিয়েছিল, ফিরে এসেছিল রাতের খাবার দেবার আগেই।
বাইরের টেলিফোন বুথ থেকে আরতিকে ফোন করে ঘরে ফিরেছিল অঞ্জন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ইন্টারকম এ ফোন। নন্দিনীর গলা।
– ফিরেছো?
– এই ফিরলাম। শহরে গিয়েছিলাম।
– জানি। খেয়েছো?
-কী করে জানলে? খাবার টেবিলে দেখলাম না তো
– দেখলাম সবাই মিলে বাইরে চলে গেলে, আমায় না নিয়ে…
অঞ্জন হেসে বলেছিল, তুমি যেতে?
– তুমি একলা হলে যেতাম।
– মাথা খারাপ? তোমার সঙ্গে যাবো? তোমার ভক্তরা আমায় ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিতো।
– মোটেই না। আচ্ছা ছাড়ো, আজ আলোচনা কেমন লাগলো?
– সত্যি বলবো? তুমি এক কথায় অনবদ্য। অসাধারণ। আগে তো কখনো শুনিনি তোমার ভাষণ-… খুব খুব ভালো লেগেছে।
অঞ্জনের কথায় হেসে নন্দিনী বলেছিল-
– তোমার বক্তব্যও খুব ভালো ছিল। মেদহীন এবং জরুরি
কোনো উত্তর না দিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল অঞ্জন।
– কী ঘুম পাচ্ছে নাকি
-না, ভাবছিলাম …
– কী ভাবছিলে?
– ভাবছিলাম তোমার কাছে অনেক কিছু শেখার আছে। অনেক …
– তোমায় একটা কথা বলবো? তুমি যখন তোমার মতামত জানাচ্ছিলে, আমার দীপঙ্করের কথা মনে পড়ছিল। ও ঠিক তোমার মতো কথা বলতো। জানো, চাকরিতে ঢোকার বছর দুয়েক পরে এখানে প্রথম এসেছিলাম। সে বার এই পাশাপাশি ঘর দুটোয় আমি আর দীপঙ্কর ছিলাম।
অঞ্জন শুনছিল, আর ভাবছিল নন্দিনী কী তাহলে দীপঙ্করকেই খুঁজে বেড়ায় তার মধ্যে? নন্দিনী বোধহয় আন্দাজ করেছিল কিছু, প্রসঙ্গ পাল্টাতেই হয়তো একটা গান শুনতে চেয়েছিল তার কাছে।
অবাক হয়েছিল অঞ্জন- গান? এই মাঝরাতে?
– আস্তে আস্তে শোনাও না …শ্যামল মিত্রের যে কোনো একটা গান।
– আস্তে গাইলে শুনতে পাবে? মাঝখানের দেওয়ালটা না হয় …
– ইচ্ছে করছে এই দেওয়াল ভেঙে চলে আসি। ফোনে নয়, মুখোমুখি বসে শুনি তোমার গান …
একটা নয়, পরপর বেশ কয়েকটা গান শুনিয়েছিল অঞ্জন। নন্দিনীও কেমন যেন গানপাগল হয়ে উঠেছিল সেদিন।

…… ব্যাঙ্গালোর ছেড়ে আসার আগের দিন একটু রাত হয়েছিল হোস্টেলে ফিরতে। করিডোরে একা দাঁড়িয়েছিল নন্দিনী।
– কী ব্যাপার, এতো দেরি? দরোজায় তালা দেখে চিন্তা হচ্ছিল খুব।
– শপিংয়ে গিয়ে একটু দেরি হয়ে গেল।
– আরতির জন্য শাড়ি নিশ্চয় …আমার জন্য কিছু কেননি?
অঞ্জন হেসেছিল – আপনাকে কিছু দেবার ক্ষমতা কোথায়?
ঠোঁটে ম্লান হাসি নিয়ে নন্দিনী বলেছিল- সে কথা পরে হবে। এখন বিশ্রাম নাও একটু।

সেই রাতটার কথা কোনোদিন ভুলবে না অঞ্জন। টেলিফোনে কেমন যেন শোনাচ্ছিল নন্দিনীর গলা। খুব কান্নাকাটি করেছিল বোধহয়। সারাদিন রানীর মতো ঘোরাফেরা করা মহিলার কণ্ঠস্বরে, এমন ঝড়ে বিধ্বস্ত মানুষের মতো উচ্চারণ কেন বুঝতে পারেনি সেদিন। খারাপ লেগেছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিজেকে সামলে নিয়েছিল নন্দিনী। বলেছিল,
– ক’টা দিন অনেকটা সময় কাছাকাছি থাকলাম আমরা। ভালো লাগলো খুব। কিন্তু আমার ওপর কারো একটা অভিশাপ আছে। ভালোলাগা সবকিছু কেমন হারিয়ে যায়। ভয় হচ্ছে, তুমিও হারিয়ে যাবে না তো একদিন?
এমন পরিস্থিতিতে ঠিক কী বলতে হয় জানা ছিল না অঞ্জনের। সান্ত্বনা দেবার ভঙ্গিতে বলেছিল- আজ তো তোমার আনন্দ করার দিন। এমন সফল একটা সেমিনার একা হাতে সামলালে … কতো মানুষের প্রশংসা ভরিয়ে দিলো তোমায় …
– এ সব কোনোকিছুই তো নতুন নয় আমার কাছে। এবার নতুন শুধু তুমি। তোমায় কাছে পাওয়া।
নন্দিনীর এই ধরনের কথাগুলো একটু অবাক করে দিতো অঞ্জনকে। কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ শুনেছিল সব। অদ্ভুত এক নিরাসক্তি নিয়ে নন্দিনী বলেছিল,
– আমার জীবনযাপনের গ্লানি, নিরন্তর একা পথচলা, ধ্বংসের হাত ধরে ক্রমশ নিঃস্ব হয়ে যাওয়া এ সব কোনোকিছুই তুমি পুরোপুরি জানো না। জীবন নিয়ে তোমার দৃষ্টিকোণও হয়ত আলাদা। তাই সামান্য একটু আশ্রয়, একটু ছায়া, প্রিয় মানুষদের কাছে পাওয়ার আকুতি আমায় কীভাবে যে আলোড়িত করে সারাক্ষণ, তুমি বুঝবে না। বুঝবে না কখনো কখনো আমার কথাবার্তা কেন নিঃশব্দ আর্তনাদের মতো শোনায়। কেন জানি না তোমায় আমি খুব নিজের মানুষ ভাবি … ভয় পেয়ো না অঞ্জন। তোমার সুখী আনন্দের সংসার থেকে তোমাকে সরিয়ে আনার কোনো বাসনা নেই আমার। অদৃশ্য জ্যোৎস্না, চন্দনের ঘ্রাণ আর তুমুল জোয়ারে ভরে উঠুক তোমার পৃথিবী। রঙবেরঙের স্বপ্ন খেলা করুক তোমার চোখে। যাকে ভালোবাসি তাকে সুখী দেখতে আমিও চাই।
কোনো কথা বলেনি অঞ্জন। একটু থেমে নন্দিনী বলেছিল—-
– আমাদের সম্পর্কে কোনো শরীর নেই, আইন নেই, ধর্ম নেই। আছে কিছু শূন্যতার স্বপ্নময় সাজানো মিছিল। পরিপূর্ণতায় নয়, অন্ধকারের হাত ধরে আলোর দিকে মানসিক ভ্রমণে আমাদের শান্তি। আমাদের দুজনকেই জড়িয়ে আছে অনেক মানুষ। তাদের অবজ্ঞা করে নিজেদের সুখের পরোয়া তো কোনোদিন করিনি কেউ। তোমার আমার শরীরে আত্মায় কোনো উদ্দাম বিরোধ নেই। সে ব্যাপারে আমরা নিষ্ঠুরভাবে নির্মল। তাহলে আমার এই ভেঙে পড়ার মুহূর্তগুলোয় তোমায় পাশে চাওয়া কী অপরাধ?’
পুরনো কোনো যন্ত্রণার ক্ষতমুখ বোধহয় রক্তাক্ত করে দিচ্ছিল নন্দিনীকে, বুঝতে পেরে অঞ্জন বলেছিল- কষ্ট পেও না। দুজনেই দুজনের খুব কাছাকাছিই তো আছি। থাকবোও।
খুব ক্লান্ত গলায় নন্দিনী বলেছিল- এয়ারপোর্টে আমরা কিন্তু এক গাড়িতেই যাবো।
… কী যে হয়েছিল সেদিন কে জানে! কিছুতেই কাজে মন বসছিল না অঞ্জনের। দু’দিন পর আরতির সঙ্গে কথা বলেও মনের মধ্যে অজানা অস্বস্তিটা থেকেই গিয়েছিল। নন্দিনীর কথাগুলো উড়ে বেড়াচ্ছিল চারপাশে। ওর কথা ভেবে কষ্ট পাচ্ছিল অঞ্জন। পাশাপাশি আরতির কথা ভেবেও খারাপ লাগতো তার। কাল রাত্তিরে ঘুমিয়ে পড়ার আগে নিজের সঙ্গে কথা বলেছিল অনেকক্ষণ। নন্দিনীর সঙ্গে এই শর্তহীন বন্ধুত্বে আরতিকে কোনোভাবে ঠকানো হচ্ছে না তো? হয়তো এই সম্পর্কের ভেতরে কোনো মালিন্য নেই, সংস্কারহীন আবেগে কলুষিত হয়নি তাদের মেলামেশা, তবু একটা পাপবোধ কাজ করতো তার মধ্যে। প্রতিদিন গভীর রাত পর্যন্ত দীর্ঘ ফোনালাপের কথা সে বলেনি আরতিকে। অথচ আরতি কিন্তু কখনোই কিছু লুকোয়নি তার কাছে। অমন ভদ্র আকর্ষণীয় চেহারার প্রেমে তো পড়বেই মানুষ। একজন তো ওকে না পেলে আত্মহত্যা করবে বলে শাসিয়েছিল। অকপটে সব কিছুই সে জানাতো অঞ্জনকে।
…… কাছাকাছি একটা ইরানি রেস্তোরাঁ থেকে লাঞ্চ সেরে ফেরার পথে দেখা হয়েছিল কয়েকজন সহকর্মীর সঙ্গে। ওদের মধ্যে একজন এগিয়ে এসে প্রশ্ন করেছিল, ‘আজ নাকি প্রমোশনের লিস্ট বেরোবে…… কিছু জানো?’
বিকেলের দিকে বড়সাহেব নিজে ডেকে জানিয়েছিলেন প্রমোশনের কথা। বলেছিলেন- তুমি আমাদের গর্ব … এত অল্প সময়ে দু’দুটো প্রমোশন, ভাবতেই পারি না।’ অঞ্জন কোনো ভাষা খুঁজে পায়নি। শুধু বলেছিল, স্যার, আপনারা ভালোবেসে ভালো রিপোর্ট দেন বলেই আমি… কথা শেষ করতে পারেনি। ফুল আর মিষ্টি নিয়ে ঢুকেছিল সাহেবের খাস পিওন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই শুভেচ্ছা জানাতে ঢুকেছিল অনেকেই। ওকে পছন্দ করে না এমন লোকেরাও ছিল। সবাইকেই মিষ্টিমুখ করিয়েছিলেন বড়সাহেব মিস্টার তানেজা। কিছুক্ষণ পর সবাই চলে গেলে বলেছিলেন- কলকাতার বাড়িতে ফোন করে স্ত্রীকে খবরটা দাও। অঞ্জন লজ্জা পেয়ে বলেছিল- হ্যাঁ স্যার করবো।
– না না বাইরে গেলে সবাই ঘিরে ধরবে তোমায়। সুযোগই পাবে না। আমার ফোন থেকে করো। খবরটা দাও। তানেজা সাহেবের কথা শুনেছিল অঞ্জন। খুব খুশি হয়েছিল আরতি। বলেছিল, খুব আনন্দ হচ্ছে। এক ছুটে যেতে ইচ্ছে করছে তোমার কাছে। কাল সকালে মন্দিরে যেও কিন্তু …আমি আজই যাবো পুজো দিতে।
একটু দেরি করেই ফোন করেছিল নন্দিনী।
– কি সাহেব, এই আনন্দের দিনে এক কাপ কফিও কি জুটবে না আমার?
……ফুলের তোড়া আর একটি কার্ড নিয়ে অপেক্ষা করছিল নন্দিনী। অঞ্জন হেসেছিল-
– এইসব ফুলটুল কেন?
– বা রে, ফুল আনবো না? এমন একটা সুখবর.. খুব খুশি হয়েছি।
সেদিন আর বেশিক্ষণ থাকেনি অঞ্জন। অস্থির ছিল মনটা। প্রমোশন মানেই বদলি… নতুন পরিবেশ। নতুন চিন্তা। এই অফিসের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ পড়েছিল, সেগুলো শেষ না করে যেতে চাইছিল না সে। কিন্তু সে সময়টুকুও যদি না পায়! এইসব সাতপাঁচ ভাবনা নিয়েই বাড়ি ফিরেছিল সেদিন।
…… রাত্তিরবেলা ফোনে একই কথা বলেছিল নন্দিনী – খুব ভয় করছে অঞ্জন। তোমায় এ শহরের বাইরে কোথাও পাঠিয়ে দেবে না তো?
– সেই ভয় তো আমারও। কলকাতা থেকে আর দূরে যেতে চাই না আমি।
– তোমায় ছেড়ে থাকতে খুব কষ্ট হবে আমার। তবু যেতেই যদি হয় তোমার কলকাতায় যাওয়াই ভালো। কিন্তু সে সব তো আর আমাদের ইচ্ছে অনুযায়ী হবে না। প্রার্থনাই করতে পারি শুধু …

…… কোথা থেকে কি হয়েছিল জানে না অঞ্জন। দিন সাতেক পরে বিদায় জানাতে এয়ারপোর্টে এসেছিল নন্দিনী। একটা প্যাকেট হাতে দিয়ে বলেছিল…… আরতির জন্য একটা নীল শাড়ি আর রঞ্জনার জন্য সামান্য… তোমার জন্য শুভেচ্ছা। শেষ পর্যন্ত কলকাতায় যাচ্ছো এটাই সুখের … এটা অন্তত শুনেছেন ঈশ্বর …
আর কিছু বলতে পারেনি নন্দিনী। অঞ্জনও অনেক কষ্টে উচ্চারণ করেছিল… দেখা হবে। কলকাতায় এসো একবার।

আকাশজুড়ে তারার মেলা শব্দ-খেলা

…… অঞ্জনের কলকাতায় ফেরায় সব থেকে বেশি খুশি হয়েছিল রঞ্জনা। হাসিমুখে বাবার চারপাশে ঘোরাঘুরি করতো সে। আরতি ঠিক আগের মতোই। ভেতরের সব আবেগ লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিল সারাক্ষণ। শুধু অঞ্জন যেদিন আবার ফিরে এসেছিল কলকাতায়, সেদিন ছাদে দাঁড়িয়ে পাশাপাশি পড়ে থাকা দুখানা চেয়ার দেখিয়ে বলেছিল- কতোদিন কতোরাত ধরে তোমার জন্য অপেক্ষা করছে ওরা। এক মিনিট অন্তত বসো ওখানে। সারাদিনের ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে পড়ছিল অঞ্জনের, কিন্তু কী যেন এক জাদু ছিল ঐ চেয়ারে। পাশে বসা আরতির হাতটা নিজের হাতে নিয়ে বলেছিল -‘কতদিন মনে মনে অপেক্ষা করেছি এই মুহূর্তটার, কিন্তু এতো তাড়াতাড়ি যে সেটা আসবে স্বপ্নেও ভাবিনি।’
…… ওই বাড়িতে আসার পরই ঐ চেয়ার দুটো কেনা হয়েছিল, মনে আছে অঞ্জনের। প্রতিদিন ঘুমোতে যাবার আগে, খোলা আকাশের নিচে পাশাপাশি বসে থাকা তাদের অনেকদিনের অভ্যাস। আরতি বলতো, রাগ দুঃখ অভিমান যাই হোক না কেন এই সময়টুকু আমরা একসাথে কাটাবোই। এ বাড়ির বাইরে না থাকলে, কিংবা অসুস্থ না হলে অলিখিত এই নিয়মের অন্যথা হয়নি কখনো।
…দীর্ঘদিনের পরিচিত মানুষদের সঙ্গে কাজ করার অসুবিধার কথা জানতো অঞ্জন। জানতো মাথার ওপর বড়কর্তা হিসেবে মেনে নিতে সময় লাগবে তাদের। দীর্ঘশ্বাস মেশানো কথাবার্তায়, ব্যবহারে, অসহযোগিতায় তা স্পষ্ট ছিল প্রথমদিকে। পরোয়া করেনি অঞ্জন। অনেকদিন অচেনা লোকজনদের আপন করে নিয়ে কাজ করতে হয়েছিল তাকে। নতুন পরিস্থিতিতেও নিজের সঙ্গে কথা বলতে বলতে অসুবিধাগুলো পেরিয়ে যাবার চেষ্টা করেছিল সে। সময় লাগলেও শেষ পর্যন্ত সমস্ত কিছুই আয়ত্তের মধ্যে আনতে পেরেছিল। মানসিক চাপে অস্থিরতা বাড়লেই ফোনে কথা বলতো আরতির সঙ্গে। খুব সাধারণ এলোমেলো কথাবার্তা। মন ভালো হয়ে যেতো …।
…… শোবার ঘরের লাগোয়া ওই ছাদ এবং পাশাপাশি দুখানা চেয়ারই বন্ধু হয়ে গিয়েছিল তাদের। একা একা কতদিন এই চেয়ারে বসে দূরের অঞ্জনের সঙ্গে কথা বলেছে আরতি, কতো না- পাঠানো চিঠি পড়ে শুনিয়েছে আকাশকে সেই সব গল্পই করছিল সে। অনেকদিন পর আপনমনে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিল আরতি। অঞ্জনের হাত্তে হাত রেখে বলেছিল-
-তোমার কথা ভাবতে ভাবতে বুকের মধ্যে গরম হাওয়া / তোমার কথা ভাবতে ভাবতে ভুবন জুড়ে উড়তে চাওয়া …
একটু অবাক হয়ে আরতির দিকে তাকাতেই হেসে জিজ্ঞাসা করেছিল আরতি- মনে পড়ে? উত্তর না দিয়ে খুব আস্তে আস্তে উচ্চারণ করেছিল অঞ্জন-
… তোমার কথা ভাবতে ভাবতে শঙ্খচূড়ের বিষের জ্বালা
তোমার কথা ভাবতে ভাবতে কুরচিফুলের শুকনো মালা
খুব খুশি হয়েছিল আরতি। বলেছিল- কী অসাধারণ সব কবিতা তোমার …। আবার লিখতে হবে তোমায়…। অন্তত আমার জন্য …
কিছু না বলে আরতির কপাল থেকে চুলগুলো সরিয়ে দিতে দিতে হেসেছিল অঞ্জন।

…… ঐ ছাদে, নক্ষত্রমালার নিচে আকাশকে সাক্ষী করে অনেক গল্পই করতো দুজনে। নন্দিনীর সঙ্গে রাত্তিরবেলা ফোনের গল্প শুনে আরতি বলেছিল… জানি।
– মানে? কি করে জানলে?
– রঞ্জনা খুব অসুস্থ হয়েছিল একদিন। সেদিন ফোন করেছিলাম। সাত-আটবার। ব্যস্ত ছিল ফোন। আর একদিন কী একটা দরকারে কয়েকবার চেষ্টা করেও পাইনি। বুঝেছিলাম ওই সময়টা তুমি ব্যস্ত থাকো।
……আমায় কিছু বলোনি তো …।
……প্রয়োজনে কারোর সঙ্গে কথা বলছো, সেখানে খবরদারি করবো নাকি? তুমি তো চেনো আমায়…। ও সব আমার আসে না।
বালুকণায় মিশে থাকা গুঁড়ো গুঁড়ো স্মৃতিগুলো ভেসে বেড়াচ্ছে চোখের সামনে। উদাসীন মুগ্ধ সন্ন্যাসীর মতো বসে বসে এই ওড়াউড়ি দেখছিল অঞ্জন।
…… সেদিন রঞ্জনাকে নিয়ে কথা হচ্ছিল। ওর শৈশব, কৈশোর, পড়াশোনা, বড় হয়ে ওঠা নিয়ে কথা বলছিল আরতি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার নিঃসঙ্গতার কথাও এসেছিল। ওকে সময় দিতে না পারায় অঞ্জনের খারাপ লাগা, ওর বেড়ে ওঠার দিনগুলিতে পাশে থাকতে না পারার দুঃখের কথা জানিয়েছিল অঞ্জন।
হঠাৎ কেমন যেন উদাসীন হয়ে গিয়েছিল আরতি।
-একটা কথা বলবো অঞ্জন? হাসবে না তো…।
…হাসবো কেন, বলো
একটু চুপ করে থেকে আরতি বলেছিল-
… আমি খুব মনেপ্রাণে চেয়েছিলাম রঞ্জনার একটা ভাই বা বোন হোক। কিন্তু তোমার বদলির চাকরি, ক্যারিয়ার, বিদেশ যাওয়ার টানাপড়েনের মধ্যে আর সাহস করে তোমায় বলিনি।
আরতির হাতটা ধরে অঞ্জন বলেছিল- জানো আরতি, আমারও খুব ইচ্ছে হতো মাঝে মাঝে। তোমায় বলতে গিয়েও বলিনি। রঞ্জনার সব কিছু সামলাতে সামলাতে অস্থির হয়ে থাকতে তুমি। আমি তো কিছুই করতে পারিনি। তাই আর বলতে পারিনি।
ঠোঁটে ম্লান হাসি নিয়ে আরতি বলেছিল- আসলে এই বিশাল পৃথিবীতে, আমাদের অবর্তমানে বড্ড একা হয়ে যাবে রঞ্জনা। এই ভাবনাটাই কষ্ট দেয় বেশি।
……আরও একদিনের কথা মনে পড়ছে খুব। নিজের একলা থাকার গল্প করতে করতে আরতি বলেছিল- এই আকাশটা আমার খুব বন্ধু। আমার মান অভিমান ভালোবাসা সব কিছুর সাক্ষী। কতদিন না ঘুমিয়ে এই চেয়ারে বসে কাটিয়েছি সারারাত। গল্প করেছি ওই তারাদের সঙ্গে। খুব প্রয়োজনের মুহূর্তে যখন তোমায় পাইনি, তখন তোমার কবিতা দিয়েই উড়িয়ে দিতাম আমার অভিমান।
– কোন কবিতা?
– চেম্বুর থেকে উড়ে এলো ঝোড়ো হাওয়া /মেরিন ড্রাইভে আছড়ে পড়েছে ঢেউ
কালো মেঘ জানে ঘুমিয়ে পড়েছো তুমি /এমন প্লাবনে সঙ্গে থাকে না কেউ
অসাধারণ কবিতা।
আরতিকে কাছে টেনে নিয়েছিল অঞ্জন। -অনেক জল ঝড় প্লাবন সামলাতে হয়েছে তোমায়, আমার জন্য। এখন তোমার বিশ্রাম। আমি আছি তো। মায়াপুর যাবে?
অঞ্জনের বলার ভঙ্গিতে অবাক হয়েছিল আরতি….. হঠাৎ?
চোখে দুষ্টুমি নিয়ে হেসেছিল অঞ্জন- বুঝলে না? কবিতার শেষ লাইনে আছে না…। ‘বেড়াতে বেড়াতে চলে যাবো মায়াপুর’। তাছাড়া বিয়ের পর প্রথম তো আমরা ওখানেই..
… মায়াপুরে খুব আনন্দ করেছিল রঞ্জনা। সারাক্ষণ আপনমনে এদিক ওদিক ঘুরেছিল। আর বাচ্চাদের মতো যেখানে যা পেয়েছিল, খেয়েছিল। সেই রঞ্জনা এখন কেমন গিন্নিবান্নি হয়েছে, স্বামী, সন্তান নিয়ে সংসার করছে। ভাবলেও হাসি পায় অঞ্জনের। আরতি তেমন করে ঘুরতে পারেনি সেদিন। হঠাৎ খারাপ হয়েছিল শরীর। কাউকে বিব্রত না করে চুপচাপ বসেছিল এক জায়গায়। কলকাতায় ফিরে পরদিনই ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিল অঞ্জন। রক্ত পরীক্ষা করতে বলেছিলেন উনি।
…… মনে আছে, রিপোর্ট নিয়ে অঞ্জনই গিয়েছিল। রক্তে শর্করার, অর্থাৎ চিনির পরিমাণ ছিল খুব বেশি। ডাক্তারবাবু বলেছিলেন, বেশ কিছুদিন ধরেই এই রোগ চুপিচুপি বাসা বেঁধেছে শরীরে। আরতি হয়ত খেয়াল করেনি কিংবা ক্লান্তি বলে উড়িয়ে দিয়েছে। আরতি শুনে হেসেছিল। বলেছিল এই রোগ নাকি তার উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। অঞ্জন আর রঞ্জনার চাপে ওষুধপত্র খাওয়া শুরু করলেও খাওয়াদাওয়ায় কোনো বিধিনিষেধ সে মানতে চায়নি একেবারেই।
……দুএকদিন পরে রাতের খাওয়ার টেবিলে একটু গম্ভীর ছিল আরতি। খাওয়া শেষ হলে বলেছিল- তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে অঞ্জন। ঘুমিয়ে পড়ো না বা অফিসের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থেকো না।
ছাদে একাই বসেছিল অঞ্জন। কাজকর্ম সেরে আরতি এসে বসেছিল পাশের চেয়ারে। একটু পরেই কোনো ভণিতা না করে বলেছিল- রঞ্জনার বিয়েটা তাড়াতাড়ি দিতে চাই আমি।
চমকে উঠেছিল অঞ্জন- মানে? লেখাপড়াটাই তো শেষ হয়নি…।
-এমএ পরীক্ষার আর পাঁচ মাস বাকি। এখন থেকে উদ্যোগ নিলে কিছু সময় তো লাগবেই। সত্যি কথা বলতে কি আমি অকেজো হয়ে পড়ার আগে আমি এই দায়িত্বটা…।
-কিচ্ছু হয়নি তোমার। একটু নিয়ম মেনে চললেই ঠিক হয়ে যাবে সবকিছু।
– রঞ্জনা আমাদের একমাত্র সন্তান। ধুমধাম করে ওর বিয়েটা দেবার খুব ইচ্ছে আমার। তুমি আপত্তি করো না প্লিজ। তুমি রাজি হলে রঞ্জনার সঙ্গে কথা বলবো আমি। বিশেষ কাউকে ওর পছন্দ কিনা জানতে হবে তো…
– ওকে একদিন না হয় ছাদেই ডাকো। আড্ডা হোক জমিয়ে।
কয়েকদিন ওদের সঙ্গে খুব হইচই করেছিল রঞ্জনা। মা’র সঙ্গে গলা মিলিয়ে গান গেয়েছে।, অক্ষর নয়, শব্দ নিয়ে গানের লড়াই শিখিয়েছে, জোকস শুনিয়েছে, রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করেছে, কলেজের গল্প, পিনাকীর গল্প, সিনেমার গল্প শুনিয়েছে। বাবা মা’র মাঝখানে বসে আনন্দ মেখেছে প্রাণভরে। তিনজনের এই মিলিত স্বর্গের কথা কোনোদিন ভুলবে না অঞ্জন।
…… আরতির ইচ্ছেকে সম্মান জানানো ছাড়া আরও একটা কারণে রাজি হয়েছিল অঞ্জন। কলকাতায় থাকতে থাকতেই এই বিয়েটা দিতে চেয়েছিল সে। অফিসের কিছু বিশ্বাস নেই। আগের অফিসে মাত্র এক বছর ছিল। এখানেও কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। নন্দিনীকে আবার বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছিল। মরিশাসে। ক’দিনই বা থাকলো নিজের শহরে!
….. পরীক্ষার ফলাফল বেরোবার আগেই ধুমধাম করে বিয়ে হয়ে গিয়েছিল রঞ্জনার। নিজের পছন্দ করা ছেলের সঙ্গেই। এত তাড়াতাড়ি বিয়ে করতে প্রথমে রাজি হয়নি সে। কিন্তু পরে মা’র ইচ্ছের বিরুদ্ধে যেতে চায়নি তেমন। রঞ্জনার স্বামী পিনাকীকে বেশ পছন্দ হয়েছিল আরতির। অঞ্জনেরও। ওরা দুজন যেমন চেয়েছিল তেমনই সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন হয়েছিল সব অনুষ্ঠান। রঞ্জনা চলে যাবার পর ফাঁকা ঘরে শুয়ে কয়েকদিন কান্নাকাটি করলেও মনে মনে খুব খুশি হয়েছিল আরতি।

গ্রহণ লাগা চাঁদের হাসি

পাহাড়ের ওপর এই অতিথিশালায় নির্জনতায়, স্মৃতির হাত ধরে ঘুরে বেড়ানো অঞ্জনের অভ্যাস হয়ে গিয়েছে। এতদিন পরে, অতীতের কিছু মুহূর্তকে উদাসীন নির্লিপ্ততায় পরখ করে নিতে খারাপ লাগছে না। এটা হয়তো ঠিক, দীর্ঘশ্বাসের জীর্ণ মোড়কে রাখা কিছু স্মৃতি নিয়ে যায় শূন্য আকাশের কাছে। খোলা আকাশ সঙ্গী করে দাঁড়িয়ে থাকতেই ভালো লাগে তখন। ঘূর্ণিঝড়ের মতো কিংবা গহীন অরণ্যে দাবানলের মতো দৌড়ে বেড়ায় যে স্মৃতি অঞ্জন সেগুলোকে সরিয়ে রাখতেই চায়। কখনো পারে, কখনো পারে না। কলকাতা থেকে দূরে এই সৌন্দর্যময় প্রকৃতির সান্নিধ্যে এসে বুঝেছে জীবনের কিছু কিছু মুহূর্ত অস্তিত্বের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি জড়িয়ে থাকে। প্রাণবায়ুর মতোই। সারাজীবনের ছোটাছুটি, সম্পর্কের উষ্ণতা, কর্মজীবনে উন্নতির মই বেয়ে ওঠানামা, প্রেম-বিরহ, সুখ-দুঃখ, লোভ হিংসা, আনন্দ শোক, সমস্ত কিছুই শেষ পর্যন্ত বোধহয় অজান্তে এক স্মৃতিফলকের কাছে নিয়ে যায়।
……… বেশ কিছুদিন অসুস্থ ছিল আরতি। চিকিৎসাও চলছিল নিয়মিত। কয়েকবার নার্সিং হোমে ভর্তি হয়েছিল। কাজ হয়নি। বরং আরও অসুস্থ হয়ে ফিরতো প্রতিবার। জীবনের শেষ একটি বছর সারাক্ষণ তার যুদ্ধ ছিল শরীরের সঙ্গে। সারাজীবন শক্ত হাতে সমস্ত কিছুর হাল ধরেছিল সে। তখন থাকতে পারেনি অঞ্জন। এই অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই এ কিন্তু সঙ্গে থেকেছে। প্রায় সারাক্ষণ সঙ্গ দিয়েছে, দেখাশোনা করেছে নিয়মিত। আরতি হেসে বলতো- বুড়ো বয়সে এত ভালোবাসা ভালো নয়। নিজের খেয়াল রাখো -আমায় দেখার জন্য লোক তো রেখেছো- অঞ্জন শুনতো না।
আরতি খুব ম্লান হাসি হেসে বলতো- ভাগ্যিস অসুখটা হলো তোমার এই রূপটা দেখতে পেলাম। বিশ্বাস করো অঞ্জন আমি কোনোদিন ভাবিনি তুমি এভাবে চব্বিশ ঘণ্টা আমার সেবা করবে। যাবার আগে নতুন করে পেলাম তোমায়।
…… আরতির শুকিয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে চোখে জল আসতো অঞ্জনের। প্রতিদিন রাতে ওর মাথার কাছে বসে কপালে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে দেখেছে কী ভীষণ যন্ত্রণা সহ্য করতো আরতি। অথচ জিজ্ঞাসা করলে এক গাল হেসে বলতো, ‘ভালো আছি’। যন্ত্রণা বা অস্বস্তি নিয়ে কোনো অভিযোগ করতো না কখনো।
…… সেদিন শরীরটা সকাল থেকেই খারাপ ছিল। ডাক্তার এসে একটা ওষুধ লিখে দিয়েছিলেন। আপত্তি করেছিল অঞ্জন। এই ওষুধটা আরতির সহ্য হয় না তাও জানিয়েছিল। কিন্তু ডাক্তারবাবু প্রায় জোর করেই সেই ট্যাবলেটগুলো খাইয়েছিলেন আরতিকে। রাত্তিরবেলা ওর মাথার কাছে বসে বুঝতে পেরেছিলাম কষ্ট বাড়ছে, কিন্তু তখনও হেসে বলেছিল, ভালো আছি। মুখে সেই হাসি নিয়েই রঞ্জনাকে জড়িয়ে ঘুমের মধ্যে ভোরবেলা চলে গিয়েছিল আরতি। সেই মুহূর্তে ঘরে ছিল না অঞ্জন। রঞ্জনার চেঁচামেচিতে হাতটা ধরেই বুঝতে পেরেছিল সব শেষ……প্রকৃতির আনন্দমেলায় বিশেষ অতিথি হয়ে চলে গিয়েছিল আরতি।
মুহূর্তের মধ্যে অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল ত্রিভুবন। আরতির অসুস্থতা, সেরে ওঠা, আবার একটু দুর্বল হয়ে পড়া এ সবের মধ্যেই কাটছিল দিন। কিন্তু কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবেনি অঞ্জন, অতর্কিতে ঘরদুয়ার আকাশপাতাল সব ভাসিয়ে আরতি উল্কার মতো মিলিয়ে যাবে চরাচরে। দিশেহারা হয়ে গিয়েছিল সে। মনে হতো তার চারপাশে জমে উঠছে বরফ। এক অন্ধকার গুহায় তলিয়ে যাচ্ছে তার শরীর। সামাজিক লালন পালনে শোক কাটিয়ে ওঠার একটি প্রক্রিয়া হয়ত আছে, আছে কিছু ধর্মীয় আচার। সে সমস্ত ভালোভাবে মিটে যাবার পরই শুরু হয়েছিল আসল যন্ত্রণা। বুকের মধ্যে অবিরাম রক্তক্ষরণ। স্নায়ুতে শিরায় খেলা করতো শোক। প্রতীকী পাথর এসে ভেঙে দিতো কড়িকাঠ, সমস্ত শরীর জুড়ে সেই ভাঙচুরের শব্দে কেঁপে উঠত অঞ্জন। কেমন যেন এক অস্থির অসুখ তাকে গ্রাস করছিল ধীরে ধীরে। রক্তের ভেতর থেকে এক শূন্যতা তাকে ডাকতো এক ধ্বংসস্তূপের দিকে। কুয়াশায় ঢেকে থাকা স্মৃতির আড়াল থেকে কারা যেন হাতছানি দিয়ে ডাকতো। নিশি-পাওয়া মানুষের মতো এক শূন্যতা থেকে আরেক শূন্যতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল অঞ্জন। রঞ্জনাই তখন সামলেছিল সবকিছু।
পিঠের বাঁদিকে এক অসহ্য যন্ত্রণা মাঝেমাঝেই খুব কষ্ট দেয় অঞ্জনকে। প্রথম প্রথম মনে হতো বেমক্কা কোথাও লেগে গিয়েছে, পেইন-কিলার খেলে কমে যাবে, কিন্তু না, হঠাৎ হঠাৎ এক তীব্র যন্ত্রণায় অসাড় হয়ে যায় শরীর। রঞ্জনাকে কিছু বলেনি। অকারণেই অস্থির হয়ে পড়বে। এবার কলকাতায় ফিরে নিজেই যাবে ডাক্তারের কাছে।
ট্রেনটা আসতে দেরি আছে এখনও। পিঠের ব্যথায় চোখ বন্ধ করতেই আরতির ঘুমন্ত, নিষ্পাপ মুখটার কথা মনে পড়লো আজ। মনে আছে, ঐ মুখের দিকে তাকিয়ে অঞ্জন আপনমনে বলতো…‘সেরে ওঠো খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠো। অলৌকিক চোখের সুষমা দিয়ে পূর্ণ করো আমায় …সুখের চাদরে মুড়ে রাখো আমাদের সংসার। তোমাকে ঘিরেই সুখেরা মাতাল হোক। তোমাকে ঘিরেই হোক আমাদের নন্দনকানন’। আসলে কেন জানি না সেদিনই অঞ্জনের মনে হয়েছিল কোথাও যেন ঝড় উঠেছে সর্বনাশের। অন্ধকার গোপন গুহায় একাকী নিঃশব্দে যারা কান্না চেপেছিল তারাই যেন ছায়ার মিছিল নিয়ে কাঁপিয়ে বেড়াচ্ছিল চরাচর। দুঃখের নদীর কাছে নিঃশব্দ ভাসানে যাবে বলে কারা যেন দরোজার কড়া নেড়ে ডাকতে এসেছিল …।
যন্ত্রণার কথা ভেবেই আজ ব্যথা কমানোর ওষুধ সঙ্গে এনেছে অঞ্জন। তেমন দরকার পড়লে খেয়ে নেবে। রঞ্জনারা আজ বিকেলে আসবে। একসঙ্গে কলকাতায় ফিরবে সবাই। এখন অসুস্থ হলে চলবে না। স্মৃতিকোষে মেঘের মিছিল আর বাতিদানে নেভা মোমবাতি নিয়েই তার জীবন। নিজের পরিচর্যা নিজেই করার সময় এখন। চিরায়ত স্বপ্নের ছায়াছবি নয়, অনুগত যোদ্ধার মতো জীবনকে কুর্নিশ করার সময় এখন।
কেমন যেন মায়া পড়ে গিয়েছিল এই অতিথিশালা আর ঐ রেল স্টেশনের ওপর। পরম প্রশান্তিতে কেটেছে অনেকগুলো দিন। মইদুলের জন্যও খারাপ লেগেছিল খুব। একটা খামের মধ্যে কিছু টাকা আর তার ঠিকানাটা দিয়ে এসেছে অঞ্জন। যে কোনো প্রয়োজনে যোগাযোগ করার কথা বলে এসেছে। রঞ্জনা আজ রাত্তিরটা ওদের ওখানেই থাকতে বলেছিল। অঞ্জন রাজি হয়নি। কলকাতায় ফিরে নিজের বাড়িঘর ছেড়ে কোথাও থাকতে পারবে না সে। এখনো সবকিছুতেই আরতির স্পর্শ লেগে আছে, এখনও সমস্তকিছু আরতিময়। রঞ্জনা বুঝেছিল। সকাল থেকে লোক লাগিয়ে ঘরদোর পরিষ্কার করে রেখেছিল পিনাকী।
অদ্ভুত এক ধরনের কষ্ট নিয়ে ঘুমোতে যাবার আগে ছাদের এক কোণে চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল অঞ্জন। অন্তহীন দিগন্তরেখা থেকে ঠিকরে আসা জ্যোৎস্নার আলোর মধ্যে স্বপ্নের ঈশ্বরী হয়ে বসে আছে আরতি। দেখতে পায় না, কিন্তু বুঝতে পারে অঞ্জন।
ফেলে আসা দিনের স্মৃতি যেন তাকে ধরে বসিয়ে দিলো চেয়ারে। পাশের চেয়ারে হাত রেখে চোখ বুজল অঞ্জন। কত দুঃখ, কত সুখের, কত আনন্দের সাক্ষী এই চেয়ার। কর্মজীবনের নানান টানাপড়েন, কাছের মানুষের প্রতারণা, বদলে যাওয়া মানুষের অকারণ অবহেলার যন্ত্রণায় ভালোবেসে প্রলেপ লাগিয়ে দিতো আরতি। অনেক ছোট ছোট আঘাতকে ভুলে যাওয়ার ম্যাজিকটাও তার শেখানো। চাকরি থেকে অবসর নেবার পর তাকে আবার কবিতার কাছে ফিরিয়ে দেবার কৃতিত্বও আরতির। অথচ তার জন্য প্রায় কিছুই করতে পারেনি অঞ্জন। এমন কী ওর বাবা-মা চলে যাবার সময়ও বেশিদিন ছুটি নিতে পারেনি। নিজের কর্মজীবন, উন্নতি এ সব নিয়ে ব্যস্ত থাকতে গিয়ে ওর প্রয়োজনের দিকটায় নজর দিতে পারেনি তেমন। সুন্দর একটা ফ্ল্যাটের শখ ছিল আরতির। নানান কারণে সেটা হয়ে ওঠেনি। এ সব ভাবলে নিজের ওপর খুব ঘৃণা হয় অঞ্জনের। কিছুদিন আগেই একটা সুন্দর ফ্ল্যাটের খবর এনেছিল রঞ্জনা। রাজি হয়নি অঞ্জন। আরতি থাকতে যা করতে পারেনি নিজের জন্য তা আর করতে চায়নি অঞ্জন। পিনাকী বিরক্ত হয়েছিল হয়তো, কিন্তু রঞ্জনা বুঝেছিল।
উন্মত্ত বিভোর এই জ্যোৎস্নায় স্বপ্নহীন নক্ষত্রমালার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কেমন যেন কান্না পেল অঞ্জনের। মুক্ত আকাশের ঠিক মাঝখানে এক উজ্জ্বল তারার দিকে চেয়ে অনুযোগের সুরে বলেছিল- সময়ের অনন্ত প্রবাহে আপন আনন্দে দৌড়ে বেড়ানোর কথা ছিল আমাদের। পালতোলা নৌকার পাটাতনে উল্টোমুখী হাওয়ার সঙ্গে যুদ্ধ করে নিস্তরঙ্গ জলের ভেতর লুকিয়ে থাকার কথা ছিল…..ছায়ার ভেতরে আরো সূক্ষ্মতম ছায়া হয়ে তোমার সঙ্গে থাকার অঙ্গীকার ছিল আমার। .. তোমার হাতেই রেখেছিলাম মুগ্ধ চরাচর। অথচ নিঃশব্দে চিহ্নবিহীন কোথায় যে একা একা ……
ছিন্নমূল স্মৃতির পালক নিয়ে এই চেয়ারে বসেই আরতির সঙ্গে কথা বলে অঞ্জন। প্রতিদিন। কখনো কখনো সারারাত।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা