সুনীল সন্ন্যাস

আগের সংবাদ

আলসে দুপুরের ডায়রি

পরের সংবাদ

ভ্যালেন্টিনা

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ২, ২০১৯ , ৫:৪৮ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুন ৩, ২০১৯, ১১:৪৩ পূর্বাহ্ণ

Avatar

১.
“আপনার নাম?”
মেয়েটি চোখ তুলে তাকালো। বাদামি চোখের উজ্জ্বল তারায় বিস্ময় চিলিক দিচ্ছে। উনিশ বিশ বছরের এক তরুণী।
সাহির আবারো জিজ্ঞেস করলো,
‘আপনি কিন্তু আর্ট গ্যালারিতে ঢোকার সময় আপনার নাম এন্ট্রি করেননি। এখানে একটা নিয়ম আছে। আর্ট গ্যালারিতে ঢুকতে হলে সবাইকে তার নাম এন্ট্রেন্স বুকে লিখিয়ে ঢুকতে হয়।’
মেয়েটি অবাক হলো। সে আগে কখনো এমন উদ্ভট নিয়মের কথা শোনেনি। তবে বুঝতে দিলো না যে তার অবাক হওয়ার বিষয়টা। চোখ মুখ কুঁচকে তাকিয়ে রইলো সাহিরের দিকে। মৃদু বাতাসে তার বাদামি কোঁকড়ানো চুলগুলো উড়ছে। অক্টোবর মাস এটা। মস্কোতে আবহাওয়া অনেকটাই আর্দ্র। এ সময় স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস প্রায়। তাপমাত্রা বাড়লে বড়জোর ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে। মেয়েটির কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম তারপরেও। সে রাশিয়া ভাষায় কিছু বলে যাচ্ছে নিজের মনে। যদিও সে দেখতে কিছুটা বাঙালি গোছের। প্রথম দেখাতে কেউ চট করে তাকে রাশিয়ান ভেবে নেবে না। আবার হুট করে তাকে বাঙালিও ভাবা যায় না। সাহির এতোক্ষণে ইংলিশে কথা বলছিল। কারণ একমাত্র ইংলিশই এমন ল্যাংগুয়েজ যা কমবেশি সব দেশের মানুষ একটু আধটু বোঝে।

মেয়েটি তাকিয়ে আছে রাস্তার দিকে। সে কি কারো অপেক্ষায় আছে?
সাহির আর কিছু না বলে চলে গেলো ভেতরে। কিন্তু বাইরে মেয়েটির গতিবিধি লক্ষ রাখছে।
কিছুক্ষণ পর একটি ছেলে দৌড়ে দৌড়ে এলো। বয়স পঁচিশ ছাব্বিশের মতো। বেশিও হতে পারে। পরনের ব্লু জ্যাকেট, ব্লু জিন্স আর সাথে ব্লু স্নিকার্স ছেলেটাকে হ্যান্ডসামভাবে উপস্থাপন করলেও তার চোখ গেলো ছেলেটির নীল চোখে। সাহির মনে মনে ছেলেটিকে ‘নীলাভ্র’ নাম দিলো। এখন এরকম নীল সর্বস্ব একজনকে আর কিই বা নাম দেয়া যায়! হতে পারে ছেলেটির প্রিয় রং নীল।
কিংবা মেয়েটিরও পছন্দের রঙ হতে পারে। মেয়েদের একটা অদ্ভুত স্বভাব আছে। এরা নিজেদের প্রিয় জিনিসটি শুধুমাত্র প্রিয় মানুষটির উপরেই দেখতে ভালোবাসে। যেমন একটি মেয়ে যদি নীল রঙ বড্ড ভালোবাসে তাহলে সে তার প্রেমিককে বাধ্য করবে প্রতিবার নীল জামা বা জুতো পরতে। কিন্তু দেখা যাবে সে নিজেই খুব কমই নীল রঙের পোশাক পরবে।
আচ্ছা মেয়েটির প্রিয় রঙ যদি পিংক হতো? তাহলে?
কল্পনায় ছেলেটিকে পিংক ড্রেসে ভাবতে গিয়েই হেসে ফেললো সাহির। কি অদ্ভুত! অবশ্য এসব সবই তার বানোয়াট ভাবনা। মেয়েটি একটা নীল রঙা কার্ডিগান পরা। একটা ছোট নীল স্কার্ফে তার মাথা ঢাকা এখন। একমাত্র প্রেমিক প্রেমিকারাই রঙ ম্যাচ করে জামা পরে।
ছেলেটি এসে বললো, ‘প্রিভয়েত ভ্যালেন্টিনা!’
মেয়েটি স্মিত হেসে ছেলেটিকে জড়িয়ে ধরে বললো, ‘কাখ দিল্যা?’
ছেলেটি সহাস্য ভঙ্গিতে জানালো, ‘স্পাছিবা, খারাশোও।’
কুশল বিনিময় শেষে তারপর একে অপরের হাত ধরে হাঁটতে লাগলো। সাহির তাকিয়ে রইলো তাদের গমন পথের দিকে। তাদের মধ্যকার কনভার্শনই বলে দিচ্ছে তার দুজনই রাশিয়ান বংশোদ্ভ‚ত। তবে একটা নামই তার মনে ঢুকে গেলো। সে নিজেও বুঝতে পারছে না কেন ঢুকলো।
মেয়েটির নাম ‘ভ্যালেন্টিনা’। আচ্ছা ‘ভ্যালেন্টিনা’ নামটার অর্থ কি?

২.
ভ্যালেন্টিনার চুলে বিন্দু বিন্দু তুষার জমে আছে। পরনের ওভারকোটটা আরেকটু টেনে নিলো ও।
পাশে নিল বসে আছে। হাতে ধরে রাখে ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে নাড়াচাড়া করছে। নামের জায়গায় লেখা নিল প্যাট্রিক হ্যারিস। ভ্যালেন্টিনা জানে তার নাম, তবুও তাকিয়ে আছে নামটির দিকে। হয়তো কিছু করার নেই বলেই ওভাবে তাকিয়ে থাকা। নিল তাকিয়ে আছে তুষারের কণাগুলোর দিকে। মুক্তোদানার মতো দেখতে তারা। ছোটবেলা স্নো ফ্লেইক্স নিয়ে গাওয়া রাইমগুলো মনে পড়ে যাচ্ছে।
ভ্যালেন্টিনাই নীরবতা ভাঙলো।
‘দেরি হয়ে গেছে আজ তোমার।’
নিল রাশিয়ান ভাষায় জবাব দিলো,
‘ছিলাম কাজে।’
ভ্যালেন্টিনা সহাস্য ভঙ্গি আনার চেষ্টা করলো।
‘হ্যাঁ, যতোটুকু ব্যস্ত হলে ভ্যালেন্টিনাকে এভয়েড করা যায়, ততোটুকুই আর কি!’
নিল একরাশ বিরক্তি নিয়ে তাকালো ওর দিকে। ব্যঙ্গ করছে নাকি ও?
ভ্যালেন্টিনা আবারও বললো,
‘জানো, আজ আর্ট গ্যালারির বাইরে একজন আগন্তুকের সাথে কথা হয়েছিল। যখন আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।’
নিল অন্যমনস্ক হয়ে ভাবনায় মত্ত। মস্কোর মতো শহরে একাকী মেয়েদের সাথে এমন অনেক আগন্তুকই আগ বাড়িয়ে যেচে আলাপ করতে আসে। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
ভ্যালেন্টিনা হয়তো কথা খুঁজে পাচ্ছে না বলেই এ প্রসঙ্গটি টেনে আনলো।

দুজন পাশাপাশি বসে রইলো নীরব হয়ে। মৃদু হাওয়ায় ভ্যালেন্টিনার চোখে ঠোঁটে তার চুলগুলো ছুঁয়ে যাচ্ছিল। একাকী সময়গুলোতে এসব ছোটখাটো অনুভ‚তিগুলোও বেশ উপভোগ্য হয়ে উঠে। এ মুহূর্তে পাশে বসে থাকা নিল নামের এ ছেলেটিকে ভ্যালেন্টিনা চেনে না। এ ছেলেটিকে সে হয়তো কখনও ভালোই বাসেনি।

৩.
সাহির বসে আছে তার বেডরুমের সাথে লাগোয়া বারান্দাটায়। হাতে ধোঁয়া ওঠা কফির মগ। পাশে আধখোলা একটা ইংরেজি বই যার কভারে লেখা,
‘আ পেয়ার অফ ব্লু আইস’। নামটির দিকে যতোবার চোখ পড়ছে ততোবারই মেয়েটার মুখ ভেসে উঠছে। কি যেন নাম মেয়েটার? ভ্যালেন্টিনা বোধহয়। এটুকুতেই ভুলে গেছে। কিন্তু মেয়েটার কথা মনে পরবে কেন? মেয়েটার সাথে এই বইয়ের নামের কোনো মিল নেই। তাহলে? মেয়েটির চোখ গাড় বাদামি। নীল চোখ প্রেম জাগায়, আর বাদামি চোখ এক ধরনের বিষাদ জাগায় মনে। তাহলে মিলটা কোথায় ভেবে পেল না সাহির। মেয়েটি কি আর কখনো আসবে আর্ট গ্যালারিতে? একাকী কোনো এক সন্ধ্যায়?
রাত বাড়ছে। ক্যান্ডেলগুলো পাল্টে দিলো সাহির। ইলেকট্রিসিটির আলো সবসময় ভালো লাগে না সাহিরের। মোমের ম্লান আলো যতোটটুকু প্রাণ সঞ্চার করে পোর্ট্রেটগুলোতে, তা অন্য কোনো আলো পারবে না। মোমের আলো আর মধ্যরাতের জোছনার আলো মিশে গেলে কি হয় তা দেখতে ইচ্ছে করে সাহিরের। হয়তো এ নিয়ে একদিন একটি পোর্ট্রেটও এঁকে ফেলবে ও।
সাহির এগিয়ে ক্যানভাসের দিকে। তুলি হাতে নিলো। চোখে তার এখন একটিই ছবি।
সাহির মনে মনে বললো,
‘আ পেয়ার অফ ব্রাউন আইস! ডিপ ব্রাউন মিস্ট্রিয়াস আইস!’
দূর থেকে সাহিরকে দেখলে এখন মনে হবে সে এখন ধ্যানমগ্ন এক সাধক। চোখ বুজে যে স্বপ্নের মাঝে খুঁজে বেড়ায় একটি ছবি।
৪.
আর্ট গ্যালারিতে আজ অনেক দর্শক। ঘুরে ঘুরে পোর্ট্রেটগুলো দেখছে তারা। ভ্যালেন্টিনা আর নিল দাঁড়িয়ে আছে একটি পোর্ট্রেটের সামনে। দুজনের চোখেই শূন্যতার দৃষ্টি। এই পোর্ট্রেটের ভাষা বোঝার সাধ্য তাদের নেই। যদিও পোর্ট্রেটটি সাদামাটা গোছের। একজন রাখাল বাঁশি বাজাচ্ছে আর তার কিছু দূরে দুজন ছেলেমেয়ে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। সূ² হাসি, কিংবা তিক্ত কান্না, কিছু একটা তো অবশ্যই লুকিয়ে আছে পোর্ট্রেটটির ভেতর। ভ্যালেন্টিনার মন খারাপ হয়ে গেল। নিল ততোক্ষণে ঘুরে ঘুরে বাকি পোর্ট্রেটগুলো দেখছে ভাবলেশহীনভাবে।

‘কি দেখছেন?’
ভ্যালেন্টিনা চমকে উঠলো। সেদিনের সেই ছেলেটি। এক মাথা কোঁকড়ান চুল, ঘন কালো মায়াবী চোখ, শ্যামলা গায়ের রঙ, প্রায় ছফুট লম্বা। পরনে পাঞ্জাবি, পাজামা আর গায়ে জড়ানো একটি চাদর। তবুও কি সুন্দর মানিয়ে গেছে তাকে এই আউটফিটে।
সাহির লক্ষ করলো ভ্যালেন্টিনা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। অস্বস্তি কাটানোর জন্য সাহির হাসলো। তারপর বললো,
‘দেখুন এই বাঁশিবাদক রাখালটির দিকে। কোনো গান শুনতে পাচ্ছেন কি?’
ভ্যালেন্টিনা নীরবে মাথা নেড়ে না বললো।
সাহির বললো,
‘শুনতে পাবেন। আচ্ছা, রাখালের বাঁশির সুরটি কেমন হতে পারে? বেদনার সুর নাকি আনন্দের সুর? ভেবে বলুন তো! আপনাকে তিন সেকেন্ড সময় দিচ্ছি উত্তর দেয়ার জন্য। যা মনে আসে তাই বলুন।’

ভ্যালেন্টিনা উত্তর দিতে দেরি করলো না। গম্ভীর গলায় উত্তর দিলো,
‘বেদনার সুরই হয়তো। যতোবারই তাকাচ্ছি ততোবারই এক অদ্ভুত যন্ত্রণা আমাকে ঘিরে ধরছে।’

সাহির হাসলো। ভ্যালেন্টিনা অবাক হয়ে গেল।
হাসতে হাসতেই বলল,
‘আপনার যখন মন ভালো থাকবে, যেদিন আনন্দময় কিছু ঘটবে জীবনে সেদিন একবার হলেও এই পোর্ট্রেটটির সামনে দাঁড়াবেন। কিংবা যেদিন প্রচণ্ড কষ্ট পাবেন, সেদিন এই পোর্ট্রেটটির সামনেও আসতে পারেন। আনন্দের সময় আনন্দের গান গাইবে এই পোর্ট্রেট। আর কষ্টের সময় কান্নার গান। এটা হচ্ছে এই পোর্ট্রেটের সাইকোলজি। বুঝলেন?’

ভ্যালেন্টিনা কিছু বললো না। সাহিরও আর কোনো উত্তরের আশা করলো না। দীর্ঘক্ষণ নীরবতা ভেঙে ভ্যালেন্টিনা জিজ্ঞেস করলো,
‘আর ওই ছেলেমেয়ে দুটো? ওদের গল্পটা কি?’

সাহির তাকালো। কপালে ভাঁজ তার। এই প্রশ্নটি এই মেয়ের করার কথা নয়। তবুও সাহির উত্তরটা দিলো।

-‘এদের আমি নাম দিয়েছি ভালোবাসার উষ্ণতা। চেয়ে দেখুন, ওরা কিন্তু কাছাকাছিও নয়, আবার দূরেও নয়। ওরা আটকে আছে কাছে আসার মুহূর্তটুকোয়। প্রেমে পড়ার মুহূর্ত একেই বলে হয়তো। এই কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে গোটা জীবনকে সুন্দর মনে হতে থাকে। প্রেমে পড়তে থাকার মুহূর্তগুলো সত্যিই অসাধারণ। সেই মুহূর্তটুকুই বন্দি করার চেষ্টা করেছি আমি রঙতুলিতে। কিন্তু এটা তো আপনার জানার কথা। আপনার তো…… ’
বলেই থেমে গেল সাহির। ভ্যালেন্টিনা মুখ ঘুরিয়ে নিলের দিকে তাকালো এবং তাকিয়েই থাকলো একরাশ শূন্য দৃষ্টিতে। তাদের ভালোবাসার উষ্ণতা আজ কোথায় ফুরিয়ে গেছে?

৫.
সাহির আর ভ্যালেন্টিনা মুখোমুখি বসে আছে। ওয়েস্ট ফোর-এর কফি সাহিরের খুব প্রিয়। ভ্যালেন্টিনা চুপচাপ বসে আছে। কাচ ভেদ করে বাইরে দেখছে। ইভনিং বলে ক্যান্ডেল জ্বলছে টেবিলে টেবিলে। সব মিলিয়ে অদ্ভুত সৌন্দর্য ভর করেছে ভ্যালেন্টিনার চোখেমুখে। বিষাদময় একটি অপরূপ মুখ। নাকে জমে আছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। ঈশ্বর আসলেই একজন শ্রেষ্ঠ পেইন্টার। কি নিখুঁত তুলিতেই না জীবন্ত পোর্ট্রেট এঁকে যাচ্ছেন। যেমন আজকের সন্ধ্যাটি। ভ্যালেন্টিনা হঠাৎ বললো,
‘আপনি কিন্তু আমার গল্পটি শুনতে চেয়েছিলেন।’

সাহির হাসলো। তারপর বললো,
‘কি করবো শুনে? আমি তো কোন লেখক নই যে আপনার গল্পের ভিত্তিতে উপন্যাস লিখে ফেলবো।’

ভ্যালেন্টিনার চোখ ছলছল করছে। কিন্তু মুখটি কঠিন করে রেখেছে ও। শান্ত গলায় বললো,
‘আমি নিলকে অনেক ভালোবাসি জানেন?’

সাহির তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ ভ্যালেন্টিনার চোখে। ভ্যালেন্টিনা চোখ নামিয়ে নিল। সাহির হালকা স্বরে বলল,
‘আমাকে শোনাচ্ছেন নাকি নিজেকে?’
ভ্যালেন্টিনা কিছু বলল না, চোখ সরিয়ে নিল। আস্তে আস্তে মুখের কাঠিন্য কেটে যাচ্ছে তার। এখন মোমের আলোয় এক কোমল মুখ কেঁদে ফেলার অপেক্ষায় আছে। কোনো সন্দেহ নেই এই চিত্রটিই হতে যাচ্ছে সাহিরের আগামী পোর্ট্রেট। চমকে দেবে ভ্যালেন্টিনাকে সে। এই সৌন্দর্যের বর্ণনা পৃথিবীর কোনো আয়নাই পারবে না। সাহির ঠিক করলো তার সবটুকু অনুভ‚তি ঢেলে সাজাবে পোর্ট্রেটটিকে। তার ত্রিশ বছরের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এক পোর্ট্রেট। তারপর ভ্যালেন্টিনাকে দাঁড় করাবে সেই পোর্ট্রেটটির মুখোমুখি। কার হাতের তুলির ছোঁয়ায় জীবন্ত হয়ে উঠবে পোর্ট্রেটটি তা দেখতে চায় সাহির।
আর এক্ষেত্রে ঈশ্বরকে সে কিছুতেই জিততে দেবে না। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি সৃষ্টি করেছিলেন সম্পূর্ণ নব এক মোনালিসাকে।
সাহিরও ভ্যালেন্টিনাকে সৃষ্টি করবে নতুনরূপে। হারিয়ে দেবে ঈশ্বরকে।
চারপাশের মৃদু কোলাহলে ঢাকা পরে যায় এই দুজনের মৌনতা। কেউ জানে না এই গল্প। জানবেও না কোনোদিন।

৬.
পরদিন ভ্যালেন্টিনা এলো সাহিরের ফ্ল্যাটে। ৩০০ স্কোয়ার ফুটের আকর্ষণীয় ফ্ল্যাটটির পেইন্টিং রুমটিই ভ্যালেন্টিনাকে আকর্ষণ করেছে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পেইন্টিংগুলো। রঙতুলিতে ছড়াছড়ি প্রতিটি দেয়াল। ক্যানভাসগুলো হয়তো ক্ষুদ্র ছিল সাহিরের কল্পনার জগতকে ধারণের জন্য। তাই দেয়ালেও তুলির ছোঁয়া লেগে আছে। অসম্পূর্ণ পোর্ট্রেট, সম্পূর্ণ পোর্ট্রেট সবকিছুই আছে। কয়েকটা আবার সাদা চাদরে ঢাকা। সাহির একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ভ্যালেন্টিনার দিকে। বিকেলের পড়ন্ত রোদে বাদামি চুলগুলো ঝলমলিয়ে উঠেছে মেয়েটির। এ মুহূর্তে ভ্যালেন্টিনাকে আস্ত এক পাথরের ভাস্কর্য মনে হচ্ছে। নিথর, স্বপ্নহীন এক মানবী। কাল নিল মস্কো ছেড়ে চলে গেছে হুট করেই। উইদাউট নোটিশে এভাবে চলে যাওয়াকে এক অর্থে বিচ্ছেদই বলা যায়। হয়তো বলে যাওয়ার মতো ভাষা ছেলেটির ছিল না। ভ্যালেন্টিনা খুব সহজভাবেই মেনে নিলো নিলের চলে যাওয়াটাকে। ফায়ারপ্লেসের সামনে বসে ছিল সারারাত। হাতে ধরা ছিল ভ্যালেন্টিনার প্রিয় ডায়েরিটি। আজ সেই ডায়েরিটিই নিয়ে এসেছে সে সাহিরের কাছে। কফি হাতে দুজনেই বারান্দায় চলে এলো। এখান থেকে মস্কো শহরটা খুব সুন্দর দেখায়। যতো সন্ধ্যা গড়ায়, একে একে জ্বলে ওঠে আলো। সাহির এক ফাঁকে ক্যান্ডেল জ্বালিয়ে দিলো সারা ঘরে। তারপর পোর্ট্রেটে চাকু ঘষতে শুরু করলো। একবার তুলি ছোঁয়ায়, আবার রঙ পছন্দ না হলে চাকু দিয়ে ঘষে ঘষে তুলে ফেলে। ভ্যালেন্টিনা ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। ভাবলেশহীন, সেই নিথর মুখ। কাঁদতে ভুলে গেছে মেয়েটি সেই কবেই। নয়তো সন্ধ্যার মৃদু হাওয়ায় মস্কোর এই অপরূপ দৃশ্য তার চোখে একবার হলেও জল আনতো। সে তাকালো সাহিরের দিকে। ছেলেটি কি যতেœই না একে চলেছে পোর্ট্রেটটি। ভ্যালেন্টিনা জানে ওটা কার পোর্ট্রেট। না বোঝার কোনো কারণ নেই। সৃষ্টিকর্তা মেয়েদের মনে প্রেম বোঝার অগাধ ক্ষমতা দিয়েই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। ভ্যালেন্টিনা ধীরে ধীরে বারান্দা থেকে সাহিরের কাছে এলো। আলতো করে জড়িয়ে ধরলো সাহিরকে। তারপর মুখ তুলে সাহিরের কানে ফিসফিস করে বললো,
‘ছবি আঁকো সাহির। ড্র মি। তাকাও আমার চোখে, আর বানাও একটি পোর্ট্রেট।’

সাহির চমকে ওঠে। তুলি পরে যায় হাত থেকে। তাকিয়ে থাকে অনিমেষে চোখদুটির দিকে। কোথায় লুকানো ছিল এতো প্রণয় এই চোখজোড়ার আড়ালে? সাহির আলতো চুম্বন আকে ভ্যালেন্টিনার চোখের পাতায়। তারপর নাকে, গালে। ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়াতেই কেঁপে উঠলো ভ্যালেন্টিনা। দুহাতে সাহিরের মুখটি ধরে সাহিরকে বুকে জড়িয়ে নেয়। সাহিরের মনে হচ্ছিল এতদিনে সে আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে একটি জীবন্ত ক্যানভাসে। মোমের ¤øান আলোয় ভ্যালেন্টিনার ফুলের পেলবের মতো শরীর ছুঁয়ে সাহির অনুভব করে এতোদিনে সে একজন প্রেমিক হতে পেরেছে। এ মুহূর্তে এই সাহির কোনো পেইন্টার না, সে একজন প্রেমিক।
মধ্যরাতে চাঁদের আলোয় উদ্ভাসিত হয় মস্কো শহর। সেই জোছনায় সাহির দেখতে পায় একটি মেয়ে তার বুকে লুটিয়ে আছে। তার দুচোখের কোণে শুকিয়ে যাওয়া জলের দাগ। আজ ভ্যালেন্টিনা কেঁদেছে এ বুকে মাথা রেখে। সাহিরের ইচ্ছে ছিল সে ছবি আঁকবে জোছনা আর মোমের আলো মিশে যাওয়া এমন একটি ছবি আঁকবে। কিন্তু আজ সে কিংকর্তব্যবিমূঢ়! কোন ছবি আঁকবে সে? এই প্রেয়সীর অপরূপ আলিঙ্গনের নাকি জোছনা আর মোমের আলোয় উদ্ভাসিত একটি মধ্যরাত? এ মুহূর্তে এই উত্তর সাহির জানে না।

৭.
কেটে গেছে তিন বছর। উষ্কোখুষ্কো এলোমেলো চুলের সাহির আজ একজন নামকরা পেইন্টার। তার আঁকা পোর্ট্রেট ‘দ্য ভ্যালেন্টিনা’ আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছে। লুভর মিউজিয়ামে শোভা পাচ্ছে এই পোর্ট্রেটটি। সাহির রোজ রাতে আজো ক্লান্তহীনভাবে এঁকে যায় ছবি। একটি মানবীর ছবি সে নানারূপে আকে। সেই মানবী, যে সেই রাতের পর চুপিচুপি বেরিয়ে গিয়েছিল সাহিরের ফ্ল্যাট ছেড়ে। পরদিন বিষ খেয়ে সুইসাইড করে। হেরে যায় জীবনের কাছে। হারিয়ে দেয় সাহিরকে, খুব সহজেই। ঈশ্বর জিতে যায় আরেকবার। তাই সাহির নিরন্তর পোর্ট্রেটে রঙ ঘষতে থাকে। পছন্দ না হলে চাকু দিয়ে ঘষে তুলে ফেলে। পাশেই খোলা পড়ে থাকে ভ্যালেন্টিনার নীল ডায়েরিটি। ওদিকে মধ্যরাত আবারও সাজে একরাশ জোছনা আর মোমের আলোয়, ঐশ্বরিক মায়ায়। সাহির ভুলে যায় তার স্বপ্নের কথা। সে একে চলে এক নীল বিষাদ সমুদ্র, যার কোনো এক তীরঘেঁষে ভ্যালেন্টিনা বসে আছে একাকী। তুলিতে জীবন্ত হয়ে ওঠে আবারও তার মৃদু হাওয়ায় উড়তে থাকা চুলগুলো কিংবা,
আ পেয়ার অফ ব্রাউন আইস। হ

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা