অভিন্নতা

আগের সংবাদ

আঞ্চলিক গানে ভাষা আন্দোলন

পরের সংবাদ

বাংলা ভাষার লেখক ও পাঠকদের উদ্দেশে

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ২, ২০১৯ , ২:৩০ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুন ৩, ২০১৯, ১:১৭ অপরাহ্ণ

Avatar

বাংলা সমৃদ্ধ ভাষা। মধুসূদন ও বঙ্কিমচন্দ্রের কালে এঁদের সমকক্ষ কোনো লেখক জাপান, চীন, ইন্দোচীন, ইন্দোনেশিয়া, বাংলার বাইরে ভারতের অন্যান্য প্রদেশ, আফগানিস্তান, ইরান, ইরাক, আরব, সিরিয়া, মিসর, লিবিয়া ও আবিসিনিয়ার ভাষায় ছিল না। রামমোহন, অক্ষয়কুমার, বিদ্যাসাগর কালীপ্রসন্ন ঘোষ, বিবেকানন্দ, রামেন্দ্রসুন্দর প্রমুখ মনীষী চিন্তা প্রকাশের ও সমাজসংস্কারের প্রয়োজনে পরম ভালোবাসায় বাংলা ভাষাকে গড়ে তুলেছেন। বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতিকে তাঁরা অভিন্ন সত্তা রূপে দেখেছিলেন। একটা বাদ দিয়ে অন্যটার অস্তিত্ব তাঁরা কল্পনা করতে পারতেন না। রবীন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রলাল, শরৎচন্দ্র, নজরুল, জীবনানন্দ যে সাহিত্য রচনা করেছেন, তা পৃথিবীর যে কোনো উন্নত জাতির সাহিত্যের সমতুল্য। বেগম রোকেয়া, ইসমাইল হোসেন সিরাজী, এম ওয়াজেদ আলি, মোহাম্মদ লুৎফর রহমান, মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ, কাজী আবদুল ওদুদ, আবুল হুসেন, কাজী মোতাহার হোসেন, মোতাহের হোসেন চৌধুরী, আবুল ফজল, আহমদ শরীফ, শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান ও আরো অনেক মনীষী চিন্তা ও অনুভ‚তি প্রকাশের এবং সমাজপ্রগতির প্রয়োজনে বাংলা ভাষায় লিখেছেন এবং ভাষাটিকে ক্রমাগত সমৃদ্ধ থেকে সমৃদ্ধতর করেছেন। জগদীশচন্দ্র বসু, প্রফল্লচন্দ্র রায়, প্রশান্ত চন্দ্র মহলানবিস, মেঘনাদ সাহা, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, কাজী মোতাহার হোসেন প্রমুখ মনীষী বিজ্ঞানচর্চা ও আবিষ্কার উদ্ভাবন দ্বারা বাংলার তো বটেই, বিশ্বের জ্ঞানভাণ্ডারকেও সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁরা প্রত্যেকেই বাংলা ভাষায়ও লিখেছেন এবং দেশবাসীকে বাংলা ভাষা অবলম্বন করে চিন্তা ও কাজ করার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন যে, বিজ্ঞানচর্চায় ও আবিষ্কার উদ্ভাবনের বেলায় তাঁরা বাংলা ভাষায়ই চিন্তা করেছেন এবং বিশ্ববাসীকে জানার প্রয়োজনে তাঁরা তাঁদের চিন্তা ও আবিষ্কার উদ্ভাবনকে মনে মনে তর্জমা করে ইংরেজিতে প্রকাশ করেছেন। বাংলা ভাষার প্রকাশসামর্থ্য ও সম্ভাবনা নিয়ে তাঁরা আশান্বিত ছিলেন। তাঁরা আশা করতেন যে, বাংলা ভাষা একদিন ইংরেজির সমকক্ষ এমনকি ইংরেজির চেয়েও উন্নত হবে। বাংলা ভাষায় রচিত হয়েছে বিস্ময়কর রকম সুন্দর সুর ও গান। বাঙালির চিন্তাশক্তির ও সৃষ্টিসামর্থ্যরে অত্যন্ত বলিষ্ঠ ও অত্যন্ত সুন্দর অভিব্যক্তি আছে আধুনিক যুগের বাংলা ভাষায়। মধ্যযুগেও বাংলা ভাষায় বাঙালির অতুলনীয় সব সৃষ্টি আছে। মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব সাহিত্য, অনুবাদ সাহিত্য ও লোকসাহিত্যে রয়েছে বাঙলির অত্যন্ত সমৃদ্ধ অনুভ‚তি ও বিস্তার অভিব্যক্তি। এসব লক্ষ করেই বলছি, বাংলা সমৃদ্ধ ভাষা অত্যন্ত সমৃদ্ধ।
বাংলা ভাষার ইতিহাস লক্ষ করলে দেখা যায়, গোটা ইতিহাস জুড়েই প্রতিকূল বাস্তবতার মধ্য দিয়ে প্রতিবন্ধকতার পর প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে এই ভাষা টিকে থেকেছে এবং বিকশিত ও সমৃদ্ধ হয়েছে। এক সময় ধর্মীয় বিধান ছিল যে, রামায়ণ-মহাভারত ও অষ্টাদশ পুরাণের চর্চা যে ব্যক্তি মানব ভাষায় করবে, সে রৌরব নরকে যাবে। মানবভাষা বলে বোঝানো হতো সংস্কৃতের বাইরে সব ভাষাকে। আর সংস্কৃত ভাষাকে বলা হতো দেবভাষা। তুর্কি, পাঠান, মোগল শাসকদের কালে ফারসি ভাষার মাধ্যমে রাজকার্য চালানো হতো। চাকরির ও ব্যবসায়ের প্রয়োজনে সেকালে ধর্মনির্বিশেষে লোকে ফারসি ভাষা শিখত। সেই প্রতিক‚ল পরিবেশেও বাংলা ভাষা হারিয়ে যায়নি। ধর্মচর্চায় ও রাষ্ট্রীয় কাজে সংস্কৃত ও ফারসি ভাষার প্রবল প্রতাপের মধ্যেও বাঙালি বাংলা ভাষায় চিন্তা করেছে এবং চিন্তা ও অনুভ‚তি বাংলা ভাষায় প্রকাশ করেছে। সব সময় বাঙালির প্রতিদিনের জীবনযাত্রার ভাষা ছিল বাংলা। সেকালে আলাউদ্দিন হোসেন শাহ ও আরো দু’একজন পাঠান সুলতান বাংলা ভাষার উন্নতির জন্য সহায়তা করেছেন। শ্রীচৈতন্য প্রবর্তিত গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্ম বাংলা ভাষার বিকাশে বিস্ময়কর রকম সুফল ফলিয়েছে। একদিকে চৈতন্যচরিতামৃত, চৈতন্যভাগবৎ, চৈতন্যমঙ্গল, চৈতন্যপ্রদীপ ইত্যাদি তত্ত¡গ্রন্থ, অপরদিকে পদাবলি। এমন উৎকর্ষ মধ্যযুগের কোন ভাষার সাহিত্যে আছে? ফারসি যখন রাজভাষা, তখনো বাঙালির দ্বারা সম্ভব হয়েছে এই সৃষ্টি। ব্রিটিশ আমলে পরাধীনতার মধ্যে ইংরেজি ভাষার কর্তৃত্বের মধ্যে, জ্ঞান-বিজ্ঞানের ও সাহিত্যের সব শাখায় বাঙালি সাধন করেছে অসাধারণ উন্নতি। সেই ধারাবাহিকতায় পাকিস্তানকালেও বাংলা ভাষার উন্নতি অব্যাহত থাকে। এর মধ্যে দেখা দেয় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ও বাঙালি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষা। বাঙালি জাতীয়তাবাদ অবলম্বন করে ১৯৬০, ’৭০ ও ’৮০-র দশকে ঘটে বাংলা ভাষার বিরাট উন্নতি। আরবি-ফারসি ও ইংরেজ ভাষা থেকে অনূদিত হয় কালজয়ী অনেক গ্রন্থ। শিক্ষা ব্যবস্থায় ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় সম্ভবপর সব কাজে বাংলা প্রচলনের লক্ষ্য নিয়ে বিরাট উদ্দীপনা দেখা দেয় জাতির জীবনে। ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষা থেকে মানবজাতির শ্রেষ্ঠ জ্ঞানসম্পদ ও সাহিত্যসম্পদ আহরণ করে বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করার প্রবল আকাক্সক্ষা দেখা দিয়েছিল শিক্ষিত লোকদের ও জ্ঞানানুরাগীদের বৃহত্তম অংশে। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর বছর বিশেকের মধ্যে বিশ^বিদ্যালয়গুলোতে বাংলা চালু হয়ে গিয়েছিল। বিজ্ঞান প্রকৌশল ও প্রযুক্তি, কৃষিবিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান ইত্যাদিতেও বাংলায় গ্রন্থ রচনার বিরাট আগ্রহ ও আয়োজন লক্ষ করা গিয়েছিল। বাঙালির হাজার বছরের লিখিত ইতিহাসে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর, প্রথমবারের মতো মাত্র বছর দশেক সময়ের মধ্যে সরকারি অফিসে বাংলা ভাষা ভালোভাবেই চালু হয়ে গিয়েছিল। এতে বাঙালির অসাধারণ যোগ্যতা প্রমাণিত হয়েছে। বিচার ব্যবস্থায়ও বাংলা চালুর তাগিদ দেখা দিয়েছিল। এ অবস্থায় ১৯৯১ সাল থেকে পশ্চিমা বৃহৎ শক্তিবর্গের অংশীদারিত্বে চলছে আমাদের ‘নির্বাচনী গণতন্ত্রে’র কাল এবং বাংলা ভাষার গতিধারায় দেখা দিয়েছে দারুণ ভাটা। ইংরেজির পালে লেগেছে প্রবল হাওয়া। ইংরেজির প্রতি সৃষ্টি করা হয়েছে অন্ধ অনুরাগ। এর মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি ও জীবপ্রযুক্তিতে বিপ্লব ঘটেছে, সোভিয়েত ইউনিয়ন লোপ পেয়েছে।
বাংলা ভাষায় যাঁরা লেখক ও শিক্ষক, তাঁদের জাতীয় কর্তব্য, ঐতিহাসিক কর্তব্য। বাংলাদেশের বাংলা ও ইংরেজি ভাষার স্থান কী হওয়া উচিত তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেয়া। আজ জাতির সামনে প্রশ্ন : (১) বাংলাদেশ কি সংবিধানে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা’ কথাটা রেখে কার্যক্ষেত্রে রাষ্ট্র তার কর্মকাণ্ডে, প্রশাসনে, বিচার ব্যবস্থায়, শিক্ষাব্যবস্থায় ইংরেজি মাধ্যম নিয়ে চলবে? (২) না কি সে নিজের সত্তায় থেকে, ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষা থেকে জ্ঞানসম্পদ আহরণ করে, বাংলা ভাষাকে বিকাশশীল ও সমৃদ্ধ রেখে, বাংলা ভাষাকে কার্যকর রাষ্ট্রভাষা করে নিয়ে চলবে? ইংরেজি অবশ্যই শিখতে হবে। কেবল কাণ্ডজ্ঞানহীনরাই ইংরেজির প্রয়োজন অস্বীকার করতে পারে। আরো কোনো কোনো বিদেশি ভাষা আমাদের শিখতে হবে। কিন্তু যেভাবে আমরা ইংরেজি শিখছি, সেভাবে শিখলে চলবে না, আরো উৎকৃষ্ট রূপে শিখতে হবে। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের ব্যবসায়িক ও সাম্রাজ্যবাদী প্রয়োজনে সেট, টোফেল, আইইএলটিএস ইত্যাদি প্রবর্তন করে ইংরেজি শেখানোর যে ব্যবস্থা করেছে, তাতে মজে গিয়ে ইংরেজি ভালোভাবে না শিখে আমরা নিজেদের ক্ষতি করছি। প্রকৃত জাতীয় প্রয়োজন বিচার করে ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষা শেখার উৎকৃষ্ট ব্যবস্থা বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। আমাদের দেখা দরকার ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, রাশিয়া, চীন, জাপান প্রভৃতি রাষ্ট্রের ভাষানীতি। তারা তাদের জাতীয় ভাষা ত্যাগ করে ইংরেজি গ্রহণ করছে না? তাদের দেশে তারা ইংরেজির সমস্যার সমাধান কিভাবে করছে? বাংলাদেশে শিক্ষার মাধ্যম ইংরেজি করা কি ঠিক হচ্ছে? মানবজগত কি অদূর ভবিষ্যতে সব ভাষা ছেড়ে ইংরেজি ভাষী হয়ে যাবে?
গত তিন দশকে বৃহৎশক্তিবর্গ এদেশে তাদের শ্রেষ্ঠতাবোধ প্রচারে এবং আমাদের মধ্যে জাতীয় হীনতাবোধ জাগানোতে ভীষণভাবে সক্রিয় থেকেছে। তার ফলে এদেশে ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবার মনে প্রবল জাতীয় হীনতাবোধ দেখা দিয়েছে। তার ফলে এদেশের হীনচেতা সুশীল সমাজ থেকে জবাব আসবে, আমরা ফরাসি, জার্মান, রুশ, জাপানি ও চীনাদের মতো পারব না, আমরা অনেক হীন অবস্থায় আছি। আমরা উঠতে পারব না। এই হীনতাবোধ নিয়ে চলতে চলতে আমরা কোন গন্তব্যে গিয়ে পৌঁছাব? হীনচেতা সুশীল-সুজনরা ও বিশিষ্ট নাগরিকরা তো রাতদিন নানা কৌশলে এমন সব কথাই বলছেন এবং এমন সব কাজই করছেন যাতে আমাদের হীনতাবোধ বাড়ে এবং আমাদের মনে পরাধীনতাকে বরণ করে চলার আগ্রহ মনোভাব বজায় থাকে। বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে, নির্বাচন নিয়ে, বৃহৎ শক্তিবর্গের স্থানীয় দূতাবাসগুলোতে ছোটাছুটি করার রেওয়াজের সূচনা করেছেন সুশীল-সুজনেরা। পরে তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। আমি বিস্মিত ও শঙ্কিত হই যখন দেখতে পাই গত ত্রিশ বছরের মধ্যে ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রফ্রন্ট, ছাত্রফেডারশনও কোনোদিন দূতাবাসমুখী রাজনীতির সামান্য প্রতিবাদও করেনি। যাঁরা বাংলা প্রচলের কার্যক্রম ত্যাগ করে, ইংরেজি গ্রহণে উদগ্রীব, ইংরেজির প্রতি অন্ধভাবে আকৃষ্ট, তাঁদেরকে তো বাংলাদেশের রাষ্ট্রজয় স্বাধীনতার ব্যাপারেও আগ্রহী দেখা যায় না। দূতাবাসমুখী রাজনীতির প্রতি তারা কি কখনো বিরক্তি প্রকাশ করেছেন? বাংলা ভাষার প্রতি অনুরাগ হারালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের প্রতিও আর অনুরাগ থাকে না। বাংলা রাষ্ট্রভাষা রূপে রক্ষা না করে যাঁরা ইংরেজি বলে আসছেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা তাঁদের দ্বারা রক্ষা পাবে না। ১৯৮০-র দশক থেকে তখনকার আট দলীয় জোট, সাত দলীয় জোট, পাঁচ দলীয় জোট ও নাগরিক কমিটি রাজনীতি নিয়ে যে সব কর্মকাণ্ড করে আসছে এবং পরে ‘নির্বাচনী গণতন্ত্রের’ নামে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও সুশীল-সুজনরা যে কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন, তাতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা কি বিপন্ন হয়নি? বাংলাদেশ স্বাধীনভাবে নিজের উপর নির্ভর করে কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজটা করতে পারে?
বাংলা ভাষার অর্থনৈতিক ভিত্তি সামান্য নয়। বাংলাদেশের অর্থনীতি বাংলা ভাষা অবলম্বন করে প্রতিষ্ঠিত আছে। বিদেশি যেসব আয় সেগুলোরও মূলে আছে বাংলা ভাষা। বাংলাদেশে স্বাধীন জাতীয় অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব। কিন্তু বাংলা ভাষার অর্থনৈতিক ভিত্তিকে ক্রমেই ছোট করে ফেলা হচ্ছে। আর স্বাধীন জাতীয় অর্থনীতি গড়ে তোলার বদলে ক্রমাগত অর্থনৈতিক পরনির্ভরতা বাড়ানো হচ্ছে। বাংলাদেশে যেসব কাজ বাংলায় সম্পন্ন করা সম্ভব সেগুলোতে যতই ইংরেজি কায়েম করা হবে, ততই বাংলাদেশ পরাধীনতার দিকে যাবে। চাইলে ইন্টারনেটে ইংরেজির মতোই বাংলাও ব্যবহার করা সম্ভব। এর জন্য দরকার জাতীয় আকাক্সক্ষা।

বাংলাদেশকে রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে এখানে উন্নত রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে, স্বাধীন জাতীয় অর্থনীতি ও স্বাধীন জাতীয় সংস্কৃতি অবলম্বন করতে হলে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করতে হলে, অবশ্যই বাংলাভাষাকে যথাযথ রাষ্ট্রভাষারূপে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। গবেষণার ক্ষেত্রে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কে যেখানে অপরিহার্য, সেখানে ইংরেজি ও অন্য ভাষা গ্রহণ করতে হবে। সর্বস্তরে শিক্ষার মাধ্যম হবে বাংলা। বাংলা ভাষার প্রতিষ্ঠার জন্য পাকিস্তানকালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের চেয়েও বড় রাষ্ট্রভাষা রক্ষার আন্দোলন করতে হবে। অন্যথায় আমাদের রাজনীতিবিদরা আমাদেরকে ‘পরাধীনতার সুখ’ ভোগের দিকে নিয়ে যাবেন। বাংলাদেশকে গড়ে তোলার জন্যও অত্যন্ত শক্তিশালী আন্দোলন দরকার।
বাংলাদেশে বাংলা ভাষা, ৪৫টি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ৪৫টি মাতৃভাষা, ইংরেজি, আরবি, সংস্কৃত, পালি প্রভৃতি ভাষা, চীনা, জাপানি, রুশ, জার্মান, ফরাসি প্রভৃতি ভাষার গুরুত্ব বিবেচনা করে অবিলম্বে একটি জাতীয় ভাষানীতি প্রণয়ন করতে হবে। সরকার যে এটা করবে, তা এখন আশা করা যায় না। বিবেকবান চিন্তাশীল ব্যক্তিরা কোনো সংগঠন তৈরি করে তা থেকে জাতীয় ভাষানীতি প্রণয়ন করতে পারেন। মনে রাখতে হবে যে, বাংলাদেশের ৪৫টি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর মোট লোকসংখ্যা বাংলাদেশের মোট লোকসংখ্যার এক শতাংশের সামান্য বেশি। তাদেরকে তাদের প্রাপ্য অধিকার দিতে হবে। তবে তারা বাংলা ভাষার প্রতি আকৃষ্ট হলে তাদের জন্য বাংলা ভাষা শেখার এবং বাংলা মাধ্যমে শেখাতে ব্যবস্থাও উন্নত করতে হবে। ৪৫টি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী তাদের ভাষায় শিক্ষা লাভ করলে তারা কি উন্নতি করতে পারবে? তাদের প্রতিটি ভাষাই তো জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার উপযোগী হয়নি। এখন এই ভাষাগুলোকে কি অল্প সময়ে উন্নত করে তোলা যাবে?

যাঁরা বাঙালি জাতীয়তাবাদ বলেন তাঁদের মধ্যে জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা নেই। যাঁরা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ বলেন, তাঁদের মধ্যেও তা নেই। নানা বিভক্তির মধ্যেও শিক্ষা ব্যবস্থায় যে ধারাটি মূলধারা বলে পরিচিত ছিল, সেই ধারায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাকে এখন বাংলা মাধ্যম ও ইংলিশ ভার্সনে বিভক্ত করে ফেলা হয়েছে। এই বিভাগ বাংলাদেশে জাতি ও রাষ্ট্র গঠনের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। জাতীয় চেতনা ও জাতি না থাকলে রাষ্ট্রও টিকতে পারে না। ইংরেজি দিয়ে এদেশে জাতিগঠন, রাষ্ট্র গঠন সম্ভব হবে না।
অত্যুন্নত নতুন নতুন প্রযুক্তি, এই যুগে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থে দেশের জনসাধারণকে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে। কখনো কখনো মনে হতে পারে যে, জনজীবনে এনেসথেসিয়া প্রয়োগ করতে সবাইকে অচেতন করে রেখেছে। জনগণের মহৎ সব বোধ নিষ্ক্রিয়। সুশীল-সুজনরা জনসচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম যত চালায়, জনগণের অচেতন অবস্থা ততই গভীর হয়। এই বাস্তবতায় কী করে জনসাধারণকে জাগানো যাবে? গণজাগরণ মানে জনগণের ভেতর থেকে মহৎ চেতনার ও গুণাবলীর জাগরণ। মারামারি খুনাখুনি করার জাগরণ নয়, জুলুম-জবরদস্তির জাগরণ নয়। কলেজ-বিশ^বিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগগুলোকেও সম্পূর্ণ অচেতন দেখা যায়। ব্রিটিশ আমলে ও পাকিস্তান আমলে এসব বিভাগ, জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের এক একটি যুগ হিসেবে কাজ করত। শিক্ষা ও গবেষণার নিয়মিত কাজ বজায় রেখেই আন্দোলন করা হতো। তখনকার গবেষণা ও শিক্ষাদীক্ষার খোঁজ নিতে গেলে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়। লেখাপড়াও তখন জাগ্রত ও সক্রিয় ছিলেন। জনজীবনের এই দুর্দিনে কলেজ-বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এনেসথেসিয়ার ক্রিয়া কাটিয়ে উঠতে চেষ্টা করতে পারেন। তাঁরা জেগে উঠলে জাতীয় জাগরণের সূচনা করার জন্য তাঁরা ঐতিহাসিক গৌরবের অধিকারী হতে পারেন। কেবল বাংলার শিক্ষক কেন? বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশকে ভালোবাসেন এমন সকল শিক্ষকই জাগ্রত ও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারেন। বাংলা ভাষার লোকদের অবশ্য সংগ্রামী ভূমিকার অন্ত নেই। ১৯৮০-র দশকে তাঁরা গণতন্ত্রের দাবিতে কবিতা উৎসবের মঞ্চ থেকে চার বছরব্যাপী অতুলনীয় এক আন্দোলন করেছেন। এখন রাষ্ট্রভাষা বাংলা রক্ষার জন্য এবং শিক্ষা ব্যবস্থা ও বিচার ব্যবস্থা পর্যন্ত রাষ্ট্রব্যবস্থার সব পর্যায়ে বাংলা প্রচলনের জন্য তাঁরা কি আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেন না? তারা কি বাংলা ছেড়ে ইংরেজি গ্রহণের পক্ষে আছেন। আজ প্রথমে দরকার বৌদ্ধিক আন্দোলন, শিক্ষিত লোকদের মত গঠনের আন্দোলন, তারপর গণআন্দোলন। লক্ষ্য স্থির করে গণআন্দোলনে যাওয়া সমীচীন।
ইংলিশ ভার্সন জাতির জন্য, জনগণের জন্য ক্ষতিকর। খোঁজ নিতে গেলে দেখা যায়, ইংলিশ ভার্সনে শিক্ষা বাংলা মধ্যমের শিক্ষার চেয়ে খারাপ হচ্ছে। ইংলিশ ভার্সনকে সফল করতে হলে আমেরিকা থেকে শিক্ষক ও বিশেষজ্ঞ আনতে হবে। তার জন্য বড় অংকের তহবিলের ব্যবস্থা করতে হবে। যাঁরা ছেলেমেয়েদের ইংরেজি মাধ্যমে শেখাতে চান, তাঁদের জন্য তো ব্রিটিশ সরকার বাংলাদেশে ব্রিটিশ কাউন্সিলের মাধ্যমে এ-লেভেল, ও-লেভেল ভালোভবেই চালিয়ে যাচ্ছে। ভালো শিক্ষার জন্য ছেলেমেয়েদের বিদেশে ভর্তি করারও সুযোগ আছে। তার অতিরিক্ত ইংলিশ ভার্সন আবার কেন? ইংলিশ ভার্সন তো ভালো চলছে না। ইলিশ ভার্সনের জন্য আমেরিকা থেকে শিক্ষক ও বিশেষজ্ঞ আনার ব্যবস্থা কি সরকার করতে যাচ্ছে? তা যদি সরকার না করে তাহলে ইংলিশ ভার্সনে ছেলেমেয়েদের পড়িয়ে তাদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করা হবে মাত্র। বাংলাদেশের জন্যও ইংলিশ ভার্সন ক্ষতিকর। যাঁরা ইংলিশ ভার্সন প্রবর্তন করেছেন, তাঁরা শুভ বুদ্ধির পরিচয় দেননি।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা