জিৎ-কোয়েলের ‘শেষ থেকে শুরু’

আগের সংবাদ

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী

পরের সংবাদ

দুই বঙ্গ

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ২, ২০১৯ , ৩:৫৯ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুন ৩, ২০১৯, ৩:০৯ অপরাহ্ণ

Avatar

এক.

আঙিনার মাঝামাঝি জায়গায় তুলসীতলাটা ভিজে আছে। একটু আগেই এক পশলা বৃষ্টি হওয়ায় পাতা বেয়ে পানি ঝরছে তখনো। কাঠের পুরনো চেয়ারটায় বসে, ধুতি পায়ের উপরের দিকে তুলে, ফোঁটা পড়ার দৃশ্য দেখতে থাকে শুভেন্দু দেবনাথ। অনেককাল আগের তুলসীতলা। মা অচল হবার পর থেকে তার স্ত্রী অমলাই পরিচর্চা করে আসছে।
একটু আগেই সূর্য ডুবেছে। সব সড়কে কর্পোরেশনের বাতি জ্বলেনি। এরই মধ্যে পড়িমরি করে লোকজন বাস-ট্রামে চেপে যার যার বাড়ি ফিরতে শুরু করেছে। ওপারের যুদ্ধ এপারে এসে হানা দিয়েছে। দিন কয়েক আগে দৈনিক যুগান্তরের একটি হেডলাইন সকলের দৃষ্টি কেড়েছে। পত্রিকাটি মোটা অক্ষরে হেডলাইন দিয়েছে ‘ওপারের লড়াই, এপারের সমর্থন’। অতএব পরিস্থিতি ভালো নয়। কে জানে, কখন কী ঘটে? অতএব তড়িঘড়ি বাড়ি ফেরার দৌড় শুরু হয়েছে সন্ধ্যার আগে থেকেই।

হরিহরের মা ললিতাবালা অন্ধ। গ্লুকোমার সমস্যায় তার দুটো চোখই গেছে একেএকে। ছিয়াত্তরের বুড়ি হাতে লাঠি ঠেকিয়ে এখনো দক্ষিণ কলকাতার কাঁচাপাকা বাড়িতে পুত্রের সংসারে জীবন কাটান। কলকাতায় দিন কয়েক হলো নিষ্প্রদীপ মহড়া শুরু হয়েছে। সম্ভাব্য পাকিস্তানি বিমান হামলার প্রস্তুতি নিতে পশ্চিমবঙ্গ সিভিল ডিফেন্স নোটিশ জারি করেছে। আনন্দবাজার, যুগান্তর, স্টেটসম্যান, বসুমতিতে বিজ্ঞাপন ছাপিয়ে নগরবাসীকে সম্ভাব্য বিপদে করণীয় বাতলে দেয়া হয়েছে। পত্রিকা থেকে বিজ্ঞাপনটি কেটে ঘরের দেয়ালে সেঁটে রেখেছেন বেশির ভাগ গৃহিণী, ছোট-বড়সহ সকলে ওতে চোখ বুলিয়ে নেয় যাতে সাইরেন বেজে ওঠা মাত্রই আত্মরক্ষা করা যায়।

নদীর স্রোতের মতো ভীতসন্ত্রস্ত, সহায়সম্বলহীন লাখো মানুষ বর্ডার পাড়ি দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও মেঘালয় আসামের মাটিতে ঢুকছে। খোলামাঠ, পাহাড়-জঙ্গল যে যেখানে পারছে সেখানেই আশ্রয় নিচ্ছে। পাকিস্তানের স্যাবর জেটগুলো এরই মধ্যে ত্রিপুরার আকাশসীমা পেরিয়ে আগরতলাসহ কয়েকটি রিফ্যুজি ক্যাম্পে বোমা ফেলেছে। জঙ্গি শাসকদের মনোভাব পরিষ্কার। তারা ভোটের ফলাফল মানবে না, বাঙালির গণজাগরণকে তারা বন্দুক-বোমার জোরে দমাবে এবং ধর্ম ও রাষ্ট্রের ঐক্যের নামে দেশের ৫৬ শতাংশ মানুষকে পায়ের তলায় পিষ্ট করবে।

কলকাতার জাপানি বোমা পড়েছিল অনেককাল আগে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। প্রবীণদের মনে এখনো ভয়টা আছে। কিন্তু এবারের ভয়টা বেশি এ কারণে যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানি মিলিটারির হাতে গ্রেফতার হবার আগে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করে গেছেন। পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক লড়াইয়ের ডাক দিয়েছেন। দেশের সেনাবাহিনী তাঁকে পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার করলেও পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার লক্ষণ নেই। সরকারি বাহিনী যত্রতত্র বাঙালি যুবাতারুণ্যকে হত্যা করে চলেছে। আশার কথা সৈন্যদের এই বর্বরতার বিরুদ্ধে দেশের বহু জায়গায় বিচ্ছিন্নভাবে হলেও ছাত্র-জনতার প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হয়েছে। ভারতের মাটিতে আশ্রয় নেওয়া আওয়ামী লীগের জনপ্রতিনিধিরা এই পরিস্থিতিতেও স্বাধীন দেশের সরকার গঠন করেছেন। সে সরকারের কর্মকাণ্ডও পরিচালিত হচ্ছে কলকাতা থেকে।

ললিতাবালা আগে সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বালাতেন। পুজো দিতেন। চোখ নষ্ট হবার পর থেকে পুত্রবধূই কাজটি সম্পন্ন করে। আরতিবালা আজও কাজটা সম্পন্ন করছিল। ঠিক সে সময়েই হঠাৎ ব্ল্যাক আউটের সাইরেন বেজে ওঠে। বৃদ্ধা বোঝেন, বাইরের বাতিগুলো এখন নিভবে। অফিস ফেরত শুভেন্দু হালদার এতক্ষণ আনন্দবাজারের পাতা উল্টে পুরোন ঢাকার শাঁখারীবাজার হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত একটি খবর পড়ছিলেন। সকালে কাজে যাবার সময় পুরো খবরটা তার পড়া হয়নি। সাইরেন বাজতেই মাকে ডেকে বললেন, মা, তুমি এবার ঘরে ঢুকো, লাইট নিভবে এখন।

ললিতাবালার জীবনে আলো থাকা বা না থাকার পার্থক্যটা অনেক আগে ঘুচে গেছে। তবু কোনো রকমে চলতেই পারেন। অতএব ছেলের কথায় তিনি বিচলিত হন না। বরং খানিকটা গলা চড়িয়ে বলেন, খোকা, আমাকে একবার শিয়ালদা’য় নিয়ে যাবি রে?

শুভেন্দু অবাক হয়। পুলকিতও হয় মায়ের আবদারে। কলকাতার এই দুর্দিনে শিয়ালদা যাবেন কেন মা! হেসে বলে, কী এমন কাজ পড়লো তোমার সেখানে মা?

দেখতে দেখতে কলকাতার স্ট্রিটলাইটগুলো ঝটপট নিভে যায়। নিত্যকার নিষ্প্রদীপ মহড়া শুরু হয়। আরতিবালা দ্রুত ভেতরের কামরায় গিয়ে হারিকেন জ্বালায় আলো যেন না ছড়ায় সে ব্যবস্থাও করা হলো চিমনিতে পুরনো দৈনিক পত্রিকার ছিন্ন পৃষ্ঠা সেঁটে দিয়ে। হারিকেনের লালচে রঙে পত্রিকার মোটা হেডলাইনটা বেশ দূর থেকেও দেখা যায় পূর্ববাংলা জ্বলছে।

ললিতাবালা এদিকে লাঠি ঠুকে, দেয়াল ছুঁয়ে বারান্দার দিকে এগোন। ছেলের কাছাকাছি এসে বলেন, খোকা, একবার নিয়ে যানা রে; নিজের দেশের মানুষ রেলস্টেশনে পড়ে আছে, আমাদের ফরিদপুরের লোকজনও নিশ্চয়ই আছে, যদি দেখা হয়।

মায়ের আকুতি ছেলের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও বিশেষ গুরুত্ব দেয়ার প্রয়োজন বোধ করে না শুভেন্দু দেবনাথ। তেইশ বছর আগে হিন্দু ও মুসলমান নেতাদের হাতে দুই স্বাধীন দেশের ক্ষমতা ছেড়ে দিয়েছে ভারতের ব্রিটিশ শাসকেরা। ভাগ হয়ে গেছে বঙ্গভ‚মি। পূর্ব ও পশ্চিমের দেয়াল উঠেছে। লাখো মানুষ দেশান্তরিত হয়েছে পূর্ববঙ্গ থেকে। দেশভাগের শোক সহ্য করতে পারেননি শুভেন্দুর বাবা। পগোজ স্কুলের বাংলার শিক্ষক সিতাংশু দেবনাথ একদিন ক্লাসরুমেই হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে দেহত্যাগ করলেন। দেশভাগের যন্ত্রণা ক্রমশই হিন্দু জনগোষ্ঠীকে পিষ্ট করতে থাকলো। সর্বগ্রাসী আতঙ্ক, ঘরে ক্লাস টেনের মেয়ে, ছেলেটা ঢাকার জগন্নাথ কলেজে সবে ভর্তি হয়েছে। নতুন পূর্ব পাকিস্তানের বহু জায়গা থেকেই হিন্দু পরিবারগুলো সবকিছু ফেলে বর্ডার পাড়ি দিতে থাকলো। ললিতাবালারও উপায় থাকলো না। এক মেয়ে ও ছেলে নিয়ে ফরিদপুরের সাতপুরুষের বসতভিটে ছেড়ে একদিন তাকেও রাতারাতি পাড়ি দিতে হলো অনিশ্চিতের পথে। প্রথমে ২৪ পরগনার রিফ্যুজি ক্যাম্পে, তারপর কলকাতায়। আর একবারও যাওয়া হয়নি তার ফরিদপুর।

শুভেন্দু বিলক্ষণ জানে ফরিদপুরের লোকজন দেখার ব্যপারটা তার মায়ের ন্যায্য আবেগ। শুধু শিয়ালদা বা হাওড়া রেলস্টেশন কেন পুরো কলকাতাই পূর্ববঙ্গের ছিন্নমূল মানুষে ভরে উঠছে। পশ্চিমবঙ্গের জেলাগুলোতে বাঁধভাঙা স্রোতের মতো মানুষ ঢুকছে; বয়ে আনছে ভয়ঙ্কর সব খবর : হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও নারী উৎপীড়ন। এই অত্যাচার থেকে বাঁচতে বিপন্ন মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের মাটিতে প্রবেশ না করে যাবে কোথায়?
ঠিক সে সময়েই বাড়ির সামনে একটি জিপ গাড়ি থামার শব্দ হলো। শুভেন্দু দেখলেন তার মেয়ে সুনন্দা তারই বয়েসি কয়েকজন মেয়ে ও ছেলেসহ বাড়িতে ঢুকলো। সাথে একটা করে ব্যাগসহ সুঠাম শরীরের কয়েকজন যুবক। কাপড়চোপড় দেখে ওদের কলকাতার মানুষ বলে মনে হয়। যুবকদের দিকে তাকিয়ে সুনন্দা বলে, এরা ওপারের লোক বাবা, মুক্তিবাহিনীর লোক। আজই পরিচয় হলো। রাতে এখানেই থাকবে। আর বাকিরা আমার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু; আমরা সবাই ভলান্টিয়ার, রিলিফের কাজ শুরু করেছি।

সুনন্দার কথা শেষ হতেই ওর বাবাকে সালাম জানায় নবীন মুক্তিবাহিনীর ছেলেরা। বলে, রাতটা স্টেশনেই কাটাতাম কিন্তু ওনি—- (সুনন্দার দিকে তাকায়)। আপনাদের কোনো অসুবিধা হলে চলে যাব। বাইরে আমাদের জিপ আছে।

শুভেন্দু তাকিয়ে দেখছিলেন তরুণদের দিকে। মা আর ছোট বোনটাকে নিয়ে প্রায় এ রকম বয়সেই তিনিও দেশত্যাগ করেছিলেন দুই যুগ আগে। কিন্তু এরা ঠিক তাদের মতো দেশত্যাগী ভীতসন্ত্রস্ত নয়, প্রতিরোধের আগুনে দীপ্যমান। বললেন তোমরা জিপ পেলে কোথায়? কয়জন আছো তোমরা?
আমাদের দলে সাতজন। আরও অনেকে আছে এদিক-সেদিক গেছে। যে যেদিক দিয়ে পারে। সরকারি জিপটা আমরা নিয়েই বর্ডার ক্রস করেছি। আপনাদের বিএসএফ যেন না দেখে তাই জলজঙ্গল পাড়ি দিয়ে এসেছি। তারপর বনগাঁ হয়ে সোজা কলকাতায়। বলেই ছেলেগুলো হাসতে থাকে।

সুনন্দার বাবা কি বলবেন বুঝতে পারেন না। তিনি চিন্তিত হন। একেবারে সরকারের জিপ গাড়ি নিয়ে আসাটা তার ভালো লাগে না!

নবীন মুক্তিবাহিনীর ছেলেগুলো শুভেন্দু হালদারের সংকট বুঝতে পারে। কাজেই আশ^স্ত করে বলে আপনি ভাববেন না কাকা, ভারত সরকার আমাদের সাথে আছে? রাতটা কাটিয়েই নেতাদের খুঁজতে বেরবো আমরা। ওরা কলকাতাতেই আছে। জিপ চালাবারও পারমিশন পেয়ে যাবো।

সুনন্দা এবার হনহন করে এগিয়ে ললিতাবালার কাছে যায়, বলে, ঠাকুরমা, তোমাদের ফরিদপুরের লোকজনও অনেক দেখলাম, হাজারে হাজারে। মাইলের পর মাইল হেঁটে বর্ডার ক্রস করেছে। শিশু, মা ও মেয়েদের দিকে তাকানো যায় না। অনেক মেয়েই রেপ্ড হয়েছে।

নাতনির কথায় ললিতাবালা কেঁপে ওঠেন। লাঠি ঠেকিয়ে দাঁড়ান। এ কষ্ট যেন তার নিজের। চোখ দুটো জলে ভরে ওঠে। দুই যুগ আগের স্মৃতি মনে পড়ে। ব্রিটিশরা ভারত ছাড়বে। পাকিস্তান ও ভারত স্বাধীন হবে। ভারত ভেঙে মুসলমান ও হিন্দুর দুই দেশ হবে। সাতচল্লিশে কলকাতা, বিহার, নোয়াখালীসহ নানা জায়গায় জোর দাঙ্গা হলো। কলকাতা থেকে হাজার হাজার মুসলমান পড়ালেখা, চাকুরি আর ব্যবসা ফেলে রাতারাতি পূর্ববঙ্গে পাড়ি দিল। দাঙ্গায় মারা গেল হাজার নিরপরাধ মানুষ। গান্ধীজি এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছুটলেন। সত্যাগ্রহ করলেন। কিন্তু হিন্দু-মুসলমানের অবিশ্বাস কমলো না। গ্রামের বেশির ভাগ হিন্দুরা সবকিছু ফেলে রাতারাতি বর্ডার পাড়ি দিতে থাকলো। ছেলে ও মেয়ের হাত ধরে তিনিও এসে পৌঁছলেন অচেনা কলকাতায়।
প্রায় অন্ধকারের মধ্যেও হাত নেড়ে ললিতাবালা নাতনির হাত ধরলেন। বললেন, বর্ডার না খুলে দিলে কী যে হতো রে? গুলি খেয়ে, আগুনে পুড়ে মানুষগুলো তো ওপারেই শেষ হয়ে যেত! ইন্দিরা গান্ধীকে আমি আশীর্বাদ করি! ভগবান তাঁর মঙ্গল করুন।

মুক্তিবাহিনীর ছেলেরা এরই মধ্যে এগিয়ে এসে ললিতাবালাকে প্রণাম জানালো। বৃদ্ধা ওদের মাথায় হাত রাখলেন। চুল বুলিয়ে দিলেন। বৃদ্ধার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে থাকলো। বললেন, পূর্ব-পশ্চিম আজ একাকার। দুই বঙ্গ আজ একাকার। একদিন আমরা এসেছিলাম পালিয়ে, ভয়ে, তোরা এলি সাহস নিয়ে। ভগবান তোদের আরও সাহসী করুক। তোদের আমি আশীর্বাদ করি।

উৎকণ্ঠার সীমা নেই কলকাতায়। কী হবে কেউ জানে না। যুদ্ধ পূর্ববঙ্গের, সে যুদ্ধে শামিল পশ্চিমবঙ্গ। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস, পুলিশের বাঙালি সদস্যরা বেশির ভাগ বিদ্রোহ করে ভারতীয় সীমান্ত রাজ্যগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে। ছাত্র যুবতারুণ্য, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, কৃষক, মাস্টার, শ্রমিক জনতার প্রতিরোধে ব্যাপক জনযুদ্ধ শুরু হয়েছে। বর্ডার অঞ্চলের স্কুল-কলেজগুলো রিফ্যুজিদের থাকবার জায়গা হয়েছে। তেইশ বছরের বাদে ভাষা ও সংস্কৃতির অভিভাজ্য অস্তিত্ব বাঙালিকে নতুন করে বাঙালি করে তুলেছে। সব আতঙ্ক-উৎকণ্ঠা আর অনিশ্চয়তা ছাপিয়ে জেগে উঠেছে মনুষত্ব্যের শক্তি। স্পষ্ট বোঝা যায়, সাতচল্লিশের পাপ মোচনের দায়ভার নিয়েছে উনিশ’ একাত্তর। ললিতাবালা মুক্তিবাহিনীর ছেলেদের চুলে-মুখে হাত বুলিয়ে দিতে থাকলেন। জোরে জোরে বললেন, বৌমা, ওরা আমার দেশের ছেলে, আমার ঘরেই থাকবে। যদ্দিন সম্ভব থাকবে। আজ একটু ভালো খাবারের ব্যবস্থা কর দেখি মা।

দুই.
রাজ্যের রাজনীতিতে টালমাটাল সময় চলছে। বাংলা কংগ্রেস ও কংগ্রেস মিলে নড়বড়ে সরকার হয়েছে। প্রধান বিরোধী দল সিপিএম রাজনীতিতে পাকা আসন নিয়ে সামনে এগুচ্ছে। আরেক দল শ্রেণিশত্রু খতমের মহড়া দিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতেও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যজুড়ে পূর্ববঙ্গের গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় বইতে শুরু করেছে। ছাত্র, শ্রমিক-কর্মচারী সবাই মিছিলে নেমেছে। ১ এপ্রিল বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামকে সহায়তা করতে তিনটি শক্তিশালী রাজনৈতিক কমিটি গঠিত হলো। ‘বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রাম সহায়ক সমিতি’র সভাপতি হলেন মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখার্জী, কার্যকরী সভাপতি উপমুখ্যমন্ত্রী বিজয় সিং নাহার। সহসভাপতি অধ্যাপক সমর গুহ। পাঁচ সম্পাদক যথাক্রমে হরিদাশ মিত্র, অমিয় দাশগুপ্ত, নির্মল বোস, অরুন কুমার মৈত্র ও ড. জয়নাল আবেদিন। ‘বাংলাদেশ সংহতি ও সাহায্য কমিটি’র সভাপতি হলেন মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির নেতা শ্রী জ্যোতি বসু, সাধারণ সম্পাদক সুধীন কুমার এবং কোষাধ্যক্ষ কৃষ্ণপদ ঘোষ। সিপিআই-এর উদ্যোগে গঠিত হলো ‘বাংলাদেশ মুক্তিসংগ্রাম সহায়ক কমিটি’। এর বাইরেও কাজ শুরু কললো কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক সহায়ক কমিটি। খোলা হলো আর্ত ও বিপন্নদের সাহায্যে সাহায্য ভাণ্ডার।
১১ এপ্রিল শহীদ মিনারের এক বড় জনসভায় মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখার্জী বললেন : আমাদের ভাইবোনেরা লড়ছেন, সবকিছু নিয়ে আমরা তাদের পাশে দাঁড়াব। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী কর্পূরী ঠাকুর বললেন, পাকি সামরিক চক্রের পৈশাচিক তাণ্ডব দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালের কুখ্যাত নাৎসি অত্যাচারের বীভৎসতাকেও হার মানিয়েছে। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী গণহত্যা চালাতে থাকলে ভারত সরকার চুপ করে থাকতে পারে না। সভার প্রস্তাবে দৃঢ় আস্থায় বলা হলো : বাংলাদেশের বীর সংগ্রামীরা জয়লাভ করবেন। স্বৈরাচারী সামরিক শাসক পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য হবে।
১০ এপ্রিল ভারতের মাটিতে আশ্রয় নেয়া জনপ্রতিনিধিরা বৈধ আইনি প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রথম সরকার গঠন করলেন। পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁরা নতুন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করলেন। ১৭ এপ্রিল তৈরি হলো আরেক ইতিহাস। কলকাতা প্রেসক্লাব থেকে ডজন ডজন গাড়ি ছুটে চললো অজানার গন্তব্যে। সকাল গড়াতেই সাংবাদিক বোঝাই গাড়িগুলো বর্ডারপোস্ট পেরিয়ে পৌঁছে গেল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায়। নতুন সরকারের শপথ হলো দেশের মাটিতে। সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দীন আহমদ শপথ নিলেন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর। সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়লো খবর। আকাশবাণীতে খবরটা প্রচারের সঙ্গে সঙ্গেই শুভেন্দু দেবনাথের বাড়িতে আনন্দের বন্যা বয়ে যেতে থাকলো। রেডিওতে খবরটা শুনেই আরতিবালা শাশুড়ির কাছে এসে বললো, সরকার হয়েছে মা, বাংলাদেশের সরকার হয়েছে। কি যে আনন্দ লাগছে মা।
ললিতাবালার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। তিনি বাকরুদ্ধ হন। বাড়ির ভেতর থেকেই গলির মুখে শোরগোল শুনলেন তিনি। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না। লাঠিটা এদিক-সেদিক ঠেকিয়ে বাড়ির বাইরে বেরোলেন। গলা উঁচিয়ে পাশের দোকানে জড়ো হওয়া লোকজনের উদ্দেশ্যে বললেন, তোরা কী জানিস, শুনেছিস, আমার দেশের সরকার হয়েছে? এইমাত্র রেডিওতে জানালো। বুড়ির কথায় দোকানের সামনে জড়ো হওয়া লোকজনের কেউ কেউ উত্তর দিল, মাসিমা, এইতো এইমাত্র শুনলাম। কী দারুণ খবর বলুন। পাকিস্তান শেষ। আর চিন্তা নেই। বলেই গলা মোটা করে কয়েকজনে একত্রে স্লোগান ধরলো জয়বাংলা।
সরকারের শপথ গ্রহণের পর থেকে রাজ্যের সাধারণ মানষের সমর্থন আরও ব্যাপক হয়ে ওঠে। কলকাতা ক্রমান্বয়েই মুক্তিযুদ্ধের কেন্দ্রভ‚মিতে পরিণত হতে থাকে। সাধারণ মানুষ, রাজনীতিবিদ, সবাই এগিয়ে আসেন। এগিয়ে আসেন শিল্পী-সাহিত্যিকরা। কলকাতাজুড়ে তাঁরা পালাক্রমিক জনসভা করেন, জনমত গঠন করেন। বাংলাদেশকে অবিলম্বে স্বীকৃতি দিতে তাঁরা ভারত সরকারের প্রতি দাবি জানান।
শিল্পী-সাহিত্যিক-চিত্রশিল্পীদের প্রথম সভাটি হয় শহীদ মিনারের পদদেশে। অপরটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলে। তৃতীয়টি হাওরা জেলার নাগরিক সমিতির ডাকে। প্রতিটি সভায় শত সহস্র নরনারী স্বাধীনতা সংগ্রামরত পূর্ববাংলার মানুষের উদ্দেশ্যে অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা জানায়। বাস-ট্রাম-রিকশা-ঠেলাগাড়ির আওয়াজ, কোটি নগরবাসীর ব্যস্ততা ছাপিয়ে ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি সয়লাব করে দিতে থাকে নগরী কলকাতাকে। শহীদ মিনারের এক সমাবেশে শ্রী জ্যোতি বসু বলেন, শুধু ফাঁকা বক্তৃতা নয়, সমস্ত বাধা অতিক্রম করে ওদের সাহায্য দিতে হবে। পূর্ববঙ্গের মানুষের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আমরা আপনাদের পাশে আছি, এ লড়াই আমাদেরও।
কলকাতা ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলে লেখক, কবি, চিত্র ও চলচ্চিত্রশিল্পীরা এক বাক্যে ধ্বনি তোলেন ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’। কালোব্যাজ, বুকে জয়বাংলার পতাকা। সভাপতিত্ব করলেন নাট্যকার শ্রীমন্মথ রায়। মৈত্রয়ী দেবী উত্থাপিত প্রস্তাবে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের সংগ্রাম এগিয়ে নেয়ার শপথ করা হলো। বক্তৃতা দিলেন সর্বশ্রী ড. রমা চৌধুরী, বিচারপতি এম এ মাসুদ, পান্নালাল দাশগুপ্ত, অম্লান গুপ্ত, বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়, ইলা মিত্র, দক্ষিণারঞ্জন বসু, গৌরকিশোর ঘোষ, বাগী রায়, নিরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী প্রমুখ।
হাওরা জেলা নাগরিক সমিতির উদ্যোগে স্থানীয় টাউন হলে আয়োজিত সভায় বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাদের সাহায্যে একটি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো। হরেকৃষ্ণ দত্তের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় অমর মজুমদার, শঙ্কর ব্যানার্জি, আমজাদ আলি, অরবিন্দ ঘোষাল প্রমুখ বক্তৃতা দিলেন।
৭ এপ্রিল ১৯৭১ কলকাতার শিল্পী সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে গঠিত হলো ‘বাংলাদেশ সহায়ক সমিতি’। সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় সভাপতি, সম্পাদক শ্রী মনীন্দ্র রায়, সহসভাপতি নিরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ও দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। সভাপতিমণ্ডলীতে অন্তর্ভুক্ত হলেন অজিত দত্ত, অন্নদাশঙ্কর রায়, অম্লান শঙ্কর, উদয়শঙ্কর, জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ, গোবিন্দ হালদার, জ্যোতি দাস গুপ্ত, দক্ষিণারঞ্জন বসু, ডা. নীহারকুমার মুন্সী, প্রেমেন্দ্র মিত্র, সন্তোস কুমার ঘোষ, সরযা বালা দেবী, সুচিত্রা মিত্র, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সুশোভন সরকার এবং হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। শিল্পী-সাহিত্যিকদের পক্ষ থেকে দ্রুত একটি বিবৃতিও প্রচার করা হলো : “ ইয়াহিয়া খা ও তার বর্বর সামরিক চক্র বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চেতনা স্বাধিকারবোধ ও মানবিক মর্যাদার পবিত্র অনুভবকে ট্যাঙ্কের চাকায় পিষে ফেলতে চাইছে। প্রকৃতির আশীর্বাদ, কবির স্পন্দ, নদীর-মেখলা-শোভিত এই শ্যামল ভূখণ্ড ও তার সাড়ে সাত কোটি মানবসন্তানকে আধুনিকতর মরণাস্ত্রের সাহায্যে একদল নরপিশাচ ঝলসে মারতে চায়। — পশ্চিমবঙ্গের শিল্পী সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবী আমরা, রবীন্দ্রনাথের উত্তরপুরুষ আমরা, এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে নীরব থাকতে পারি না। আমরা ভুলিনি স্পেনের গৃহযুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ এবং ভারতবর্ষের ভ‚মিকা। আমরা আমাদের মহান ঐতিহ্যকে কিছুতেই ভুলতে পারি না।”
৭ মে, ১৯৭১। বাংলাদেশ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় সরকার ও বিরোধী দলের সর্বসম্মত প্রস্তাব পাস হলো। যে রাজনীতিবিদেরা একে অপরের ঘোরতর শত্রু, কোথাও মিল নেই, তারা সবাই এক হলেন বাংলাদেশ প্রশ্নে। প্রস্তাবে বলা হলো, অনতিবিলম্বে বাংলাদেশের সরকারকে স্বীকৃতি এবং অস্ত্রশস্ত্রসহ সকল কার্যকরী সাহায্য দিতে হবে। মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্যায় উত্থাপিত এবং বিরোধী দলের নেতা জ্যোতি বসু সমর্থিত প্রস্তাবের ওপর আলোচনার আগে স্পিকার অপূর্বলাল মজুমদারের আহ্বানে বিধান সভার সদস্যরা সকলে দাঁড়িয়ে দুই মিনিট নীরবতা পালন করলেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সকল শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা নিবেদন করলেন।
প্রস্তাবটি এ রকম : “……ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত আওয়ামী লীগের অসামান্য ও ঐতিহাসিক সাফল্যের মধ্যে প্রকাশিত জনগণের সুস্পষ্ট রায়কে পদদলিত করে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি জনগণের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সামরিক শাসকচক্র যে প্রকার গণহত্যাভিযান চালাইতেছে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা তাকে তীব্র ধিক্কার জানাইতেছে এবং বাংলাদেশের জনগণ পূর্ণ জাতীয় স্বাধীনতার জন্য যে মরণপণ সশস্ত্র সংগ্রাম চালাইতেছেন তার অকুণ্ঠ সমর্থন ও সেই সঙ্গে সংগ্রামী জনগণকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাইতেছে।— পাকিস্তানের সামরিক শাসকচক্র যাহাতে অবিলম্বে এই বর্বর গণহত্যা বন্ধ করিতে এবং বাংলাদেশ হইতে তাহার সমস্ত সামরিক বাহিনী তুলিয়া লইতে বাধ্য হয় তাহার জন্য উপযুক্ত সরকারি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য এই বিধানসভা ভারত সরকারসহ অন্যান্য দেশের সরকারের নিকট আবেদন করিতেছে।—পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা এই বিশ্বাস রাখে যে, তাহাদের সংগ্রাম যতই কঠোর ও প্রতিক‚ল অবস্থার সম্মুখীন হউক না কেন বাংলাদেশের সংগ্রামী জনগণ শেষ পর্যন্ত জয়লাভ করিবেনই। এবং তারা আরও আশা রাখেন যে, যেহেতু এই রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম সর্বপ্রকার আধুনিক মারণাস্ত্রে পরিচালিত পাকিস্তানের সামরিক শাসকচক্র কর্তৃক বাংলাদেশের নিরস্ত্র জনগণের উপর চাপাইয়া দেওয়া হইয়াছে এবং ইহা জাতীয় স্বাধীনতার জন্য অত্যান্ত ন্যায়সঙ্গত সংগ্রাম, সেই হেতু ইহা শুধু ভারতীয় জনগণের নিকট হইতে নহে, পৃথিবীর অন্যান্য দেশের এমন কি পাকিস্তানের বিভিন্ন রাজ্যের জনগণের নিকট হইতেও ক্রমবর্ধমান সক্রিয় সমর্থন লাভ করিবে।— বাংলাদেশের জনগণের জাতীয় স্বাধীনতার জন্য মরণপণ সংগ্রামের প্রতি ভারতের আশু ও সর্বোপরি কর্তব্যের কথা বিবেচনা করিয়া এই বিধানসভা ভারত সরকারের নিকট দাবি জানাইতেছে যে, অনতিবিলম্বে বাংলাদেশের সার্বভৌম গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র ও তাহার সরকারকে স্বীকৃতি এবং সর্বপ্রকার প্রয়োজনীয় কার্যকরী সাহায্য দিতে হইবে। বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মুক্তিবাহিনী যখন বুকের রক্ত দিতেছেন তখন পশ্চিমবঙ্গের জনগণ ইহার কমে কিছুতেই রাজি হইতে পারে না। — এই ব্যবস্থাগুলি গ্রহণ করিতে যতই দেরি হইতেছে ততই বাংলাদেশের জনগণের দুঃখ যন্ত্রণা লাঞ্ছনা বৃদ্ধি পাইতেছে। ইহাতে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ও জনগণ গভীর উদ্ধেগ প্রকাশ করিতেছে। এই অবস্থায় যাহাতে অবিলম্বে উক্ত দাবিগুলি স্বীকৃত হয় তাহার জন্য সরকারের উপর প্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি করার জন্য বিধানসভা, পশ্চিমবঙ্গের জনগণ ও সরকারের নিকট আহ্বান জানাইতেছে।— নৃশংস নরহত্যার মুখে বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ সীমান্ত পার হইয়া পশ্চিম বাংলায় চলিয়া আসিতে বাধ্য হইতেছেন। সৌভ্রাত্রের ও মানবতার অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে তাহাদের জন্য সর্বরকম প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা একান্ত দরকার। ইহা পশ্চিমবঙ্গের ও মধ্যবর্তী সীমান্ত রাজ্যগুলির আর্থিক ক্ষমতার বাহিরে। এই কঠিন সত্য বিবেচনা করে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভারত সরকারের নিকট এই বিষয়ে যাবতীয় ব্যয়ভার বহনের আবেদন জানাইতেছে।”
বাংলাদেশকে স্বীকৃতির দাবিতে সর্বভারতীয় জনমত দ্রুত জোরদার হতে থাকে। শরণার্থীদের জন্য দমদম বিমান ঘাঁটিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ত্রাণ সামগ্রী আসতে থাকে। এসবের বেশির ভাগে আসে ভারতীয় রেডক্রসের পশ্চিমবঙ্গের শাখার কাছে। কিছু আসে মাদার তেরেসার নামে। এক সাক্ষাৎকারে মাদার তেরেসা বললেন, বিশ্ববিবেক জেগে উঠেছে দেরিতে হলেও। সর্বদয় নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণ বারানসীতে বাংলাদেশকে অবিলম্বে স্বীকৃতি এবং অস্ত্র সাহায্য দিতে ভারত সরকারের আশু কর্তব্য বলে মন্তব্য করলেন।

তিন.
কলকাতার নানাপ্রান্তের মতোই শুভেন্দু দেবনাথের বাড়িটা বাংলাদেশের উদ্বাস্তু নারীপুরুষে ভরে ওঠে। সকলের ব্যবস্থা না হওয়ায় আঙিনায় তাঁবু টানিয়ে অস্থায়ী বিছানা করা হয়। মোটামুটি অস্থায়ী ঠিকানা। কয়েক দিন থেকে কেউ কেউ অন্যত্র চলে যাচ্ছে। ললিতাবালা তার ফরিদপুরের কিছু লোককেও আশ্রয় দিয়েছেন। বাড়ির মধ্যিখানে বাঁশের খুঁটি পুঁতে জয়বাংলার পাতাকা টানানো হয়েছে। অনেক দূর থেকেও দেখা যায়। কয়েক সপ্তাহ হলো সল্ট লেক ও কল্যাণীতে রিফ্যুজিদের জন্যে বড় বড় ক্যাম্প তৈরি হয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা উদ্বাস্তুদের সেসব ক্যাম্পে তোলা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ কলকাতার চাপ কমানোর চেষ্টা করে চলেছেন। কিন্তু খুব একটা লাভ হচ্ছে না। ট্রাকে তুলে দূরের ক্যাম্পে নিতে নিতেই হাজার ছিন্নমূল নারীপুরুষ এসে ভিড় করছে। এরই মধ্যে শুরু হয়েছে নানা রোগের হামলা। শিশু ও বৃদ্ধেরাই শিকার বেশি হচ্ছে। রাজ্য ও কেন্দ্রের ডাক্তারেরা দিনেরাতে সেবা দিচ্ছে। ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক রেডক্রস প্রতিটি ক্যাম্পে ভলান্টিয়ার পাঠিয়েছে। এরপরও মৃত্যু ঠেকানো যাচ্ছে না।
নবীন মুক্তিবাহিনীর যে সাত যুবক আগে এ বাড়িতে এসেছিল তাদের সবাই অস্ত্র প্রশিক্ষণ নিতে কলকাতার বাইরে চলে গেছে। দুই সপ্তাহ আগে ওদেরই কয়েকজন একবার এসেছিল। বলেছে, মাত্র একরাত কলকাতায় আছি, ভোরে কৃষ্ণনগরের দিকে যাবো, দেখা করে গেলাম।
বর্ডার পেরিয়ে আসা ওদের জিপটা কলকাতাতেই আছে। নতুন সরকারের সরকারের লোকজন ব্যবহার করছে।
এরই মধ্যে নাটকীয়ভাবে শুভেন্দুর সাথে দেখা হলো ওর এক পুরনো সহপাঠীর। মফিজ অর্থাৎ মফিজুল্লাহর আর শুভেন্দু ঢাকার জগন্নাথ কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে একসাথে পড়েছে। আটচল্লিশে দেশ ছাড়ার পর আর দেখা হয়নি। এমএতে ভালো রেজাল্ট করায় জগন্নাথেই ফিলোসফির লেকচারার হয় মফিজ। একসময় ভালো কবিতা লিখতো, এখন লেখে কিনা কে জানে। পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজার, ইংলিশ রোড ধ্বংস হবার পর জগন্নাথ কলেজ বন্ধ হয়ে যায়। ছাত্র-শিক্ষকরা যে যেদিকে পারে নিরাপদ আশ্রয়ে যায়। কলেজের পাশেই একটা ছোট বাড়ি নিয়ে বসবাস করতো মফিজউল্লাহ। বিয়ে-থা করেনি। সৈন্যরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জিসি দেবকে হত্যা করেছে, এ খবর শুনে মফিজ অসহায় হয়ে পড়ে। কী করবে ভেবে পায় না। এরই মধ্যে বংশাল রোডের সংবাদ পত্রিকার অফিস পুড়িয়ে দিয়েছে সৈন্যরা। অফিসেই পুড়ে মারা গেছে লেখক ও সাংবাদিক শহীদ সাবের। সরকারি হত্যাকারীরা অস্ত্র হাতে ঢাকা নগরী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। যাকে যেখানে পাচ্ছে হয় ধরে নিয়ে যাচ্ছে নয় গুলি করছে। সম্ভাব্য প্রতিরোধকারীকে তারা রাখতে চায় না। সেনাদের বারকয়েক হামলার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহিলা হোস্টেলগুলো বিরান হয়েছে। উপায়হীন মেয়েরা এদিক-ওদিক পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করছে।
এমন পরিস্থিতিতে একদিন গভীর রাতে হাজারো বিপন্ন মানুষের সাথে মফিজউল্লাহ বুড়িগঙ্গা পাড়ি দেয়। অসংখ্য মৃত মানুষের শরীর ছুঁয়ে সন্তর্পণে এগুতে থাকে পলাতক বোঝাই ছোট ছোট নৌকা। গুলিবিদ্ধ লাশ দেখে শিশুরা ডুকরে কেঁদে উঠলে মা-বারা ওদের চোখ-মুখ চেপে ধরে। যে মফিজউল্লাহ সংঘাত অস্বীকার করে গেছে সারাজীবন, তাকেও ভাবতে হয় যুদ্ধ ছাড়া উপায় কই! দানবেরা যুক্তি মানছে কোথায়? বুড়িগঙ্গার ওপারে পৌঁছার পর তেকে শুরু গ্রাম-প্রান্তর-নদীনালা পেরিয়ে হাজরো মানুষের সীমান্ত যাত্রা। দিন কয়েক বা সপ্তাহ পর বর্ডার পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গে।
পার্ক সার্কাসের পাকিস্তান ডিপুটি হাই কমিশনের অফিস এরই মধ্যে বাংলাদেশ দূতাবাস হয়েছে। ক‚টনীতিক হোসেন আলীর নেতৃত্বে বাঙালি কর্মকর্তা কর্মচারীরা প্রত্যেকেই পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে নতুন বাংলাদেশের প্রতি প্রকাশ্য আনুগত্য জানিয়েছে। আকাশবাণীসহ কলকাতার বড় বড় পত্রিকার সাংবাদিকরা প্রতিদিন বাংলাদেশ মিশনে এসে বিদ্রোহী অফিসারদের সাক্ষাৎকার নিচ্ছে। শুভেন্দু হালদার পত্রিকায় সে সব সাক্ষাৎকার পড়েছে। পড়তে পড়তে ভেবেছে, বাংলাদেশ আর ঠেকানো যাবে না। পাকিস্তান যে ধসে পড়বে এ তারই লক্ষণ।
শুভেন্দু বিলক্ষণ জানে সে ভারতের নাগরিক। কিন্তু দেশ তার পূর্ববঙ্গ। অনেকদিন ধরেই তার ইচ্ছে খোদ কলকাতার বুকে স্বাধীন বাংলাদেশের মিশনটা সে দেখবে। একদিন বিকেলে আরও দুজন অবাঙালি সহকর্মী মিলে পার্ক সার্কাসের নির্দিষ্ট বাড়িটার কাছে গিয়ে দাঁড়ায় তারা। তিনজন মিলে অনেকক্ষণ ধরে উড্ডীয়মান পতাকাটার দিকে তাকিয়ে থাকে। মাথা নুইয়ে শ্রদ্ধা জানায়।
মিশনের চারপাশে প্রচণ্ড ভিড়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কলকাতার মানুষেরা বাংলাদেশ মিশন দেখতে আসে। ভিড় ঠেলে এগুতেই শুভেন্দু ও তার সহকর্মীরা লক্ষ করলেন আকাশবাণীর রিপোর্টার উপেন তরফদার টেপ রেকর্ডার কাঁধে নিয়ে সামনের দিকে যাচ্ছে। তথ্য সম্প্রচার বিভাগের কর্মচারী হিসেবে তার সাথে ওদের কিছুটা জানাশোনা ছিল। সাহায্য চাইতেই উপেন বাবু তাদের মিশন চত্বরে প্রবেশ করতে সাহায্য করলেন। ভেতরের একটা রুমে গিয়ে উপেন বাবু মাইক্রোফোনটা খুললেন। শুভেন্দুরা দেখলেন, সতেরো-আঠারো বছরের একটা মেয়ে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে কেঁদে চলেছে। পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে নির্যাতিত মেয়েটি সীমান্ত পেরিয়ে কলকাতায় এসেছে। উপেনবাবুর দরকার মেয়েটির সাক্ষাৎকার, আকাশবাণীর সংবাদ বিচিত্রা প্রোগ্রামের জন্যে। কিন্তু মেয়েটির কান্না থামানো যাচ্ছে না। অনেক বোঝানোর পর উপেনবাবু যখন রেকর্ড করতে যাবেন মেয়েটি তখন জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। জলের ঝাপটা দেওয়ায় কিছুটা সুস্থ হয়।
উপেন তরফদার : দেখ, তুমি এখন কলকাতায়, আর কোনো ভয় নেই। এটা ভারতবর্ষ! পাকিস্তানি সৈন্যরা এখানে আসতে পারবে না। বলেই দ্রুত টেপ রেকর্ডার খুলে উপেনবাবু মেয়েটিকে জিগ্যেস করে : নাম কি তোমার?
আয়েশা।
বাড়ি কোথায়?
সাতক্ষীরা।
কি হয়েছিল?
অনেকটা সময় নিয়ে আয়েশা এবার তার দুর্গতির কথা বলে। কিভাবে ওর বাবা আর মাকে কুপিয়ে কুপিয়ে খুন করেছে পাকিস্তানি সৈন্যরা। কিভাবে ছোট বোনটাকে আছড়ে মেরেছে। কিভাবে বাবাকে খুন করেছে। কিভাবে তাকে —— ; এসব সব বলে গিয়ে আবারও সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ পরে ওকে সুস্থ করে তোলা হয়। উপেনবাবু আবারও টেপ রেকর্ডার খোলেন।
এসব কিছুই ঘটে শুভেন্দু ও তার সহকর্মীদের সামনে। এ দৃশ্য দেখা যায় না, সইতে পারা যায় না। শুভেন্দুর অবাঙালি সহকর্মীদের একজন আবেগে কেঁদে ফেলেন। শুভেন্দুর হাত শক্ত করে ধরে বলেন, এদের পাশে দাঁড়াতে হবে। পশুদের বিচার হতে হবে। এখানে কোনো সম্প্রদায় নেই, কোনো ধর্ম নেই। এই বিপন্ন মানুষের পাশে আমাদের দাঁড়াতে হবে।
হঠাৎ সেই ভিড়ের মধ্যে মধ্যবয়স্ক একজনের দিকে দৃষ্টি যায় শুভেন্দুর। এতক্ষণ তিনিও ছিলেন উপেন তরফদারের সঙ্গে। জানা গেল, বিপন্ন মেয়েটিকে বাংলাদেশ মিশনে তিনিই নিয়ে এসেছেন। ওর সাক্ষৎকারের ব্যবস্থা করেছেন। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর শুভেন্দু ভাবলেন, অনেককিছুই মিলে যাচ্ছে। কিন্তু সে নিশ্চিত হতে পারে না। শুভেন্দু দেবনাথ দুই যুগ আগের ঢাকা শহরে ফিরে যায়। চুল, কথা বলার ধরন, ভাবগম্ভীর চরিত্র, সবকিছু মিলিয়ে সে নিশ্চিত হয় লোকটা তার পূর্ব পরিচিত। ভিড় কমলে দ্বিধাদ্ব›দ্ব সত্তে¡ও সে ভদ্রলোকের দিকে এগিয়ে যায়, শরীরে হাত রেখে জিগ্যেস করে, আপনি মফিজ, মফিজউল্লাহ তো? জগন্নাথ কলেজের মফিজ না?
কলতাকায় তাকে কে চিনবে? অধ্যাপক মফিজউল্লাহ চমকে উঠেন। বেশ খানিকক্ষণ ধরে প্রশ্নকর্তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন। তারও পুরনো দিনের কথা মনে পড়ে। চোখের পাতা ভিজে ওঠে। তিনিও আবিষ্কার করতে পারেন তার কলেজের বন্ধুকে। চেয়ার থেকে উঠে শুভেন্দুকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরেন অধ্যাপক। বলেন যদি ভুল না করি, তুই শুভেন্দু দেবনাথ না? আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক সিতাংশু দেবনাথের ছেলে? আমি তো ভুল করছি না? কেমন আছিস শুভ, মাসিমা কি আছেন? কেমন আছিস তোরা?
ভারত ও পূর্ব পাকিস্তানের মোট ৪,০৯৬ কিলোমিটার সীমান্তের মধ্যে ২,২১৭ কিলোমিটারই পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে। সে কারণেই এ রাজ্যে পাকিস্তানি সেনা-অভিযানে দেশত্যাগীদের সিংহভাগ ঢুকে পড়ে। বাকিরা যায় ত্রিপুরা, আসাম ও মেঘালয়ে। কয়েক মাসেই পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি শহর-বন্দর-গঞ্জ বাংলাদেশের মানুষে ঠাসা হয়েছে। কলকাতার রাস্তাঘাট, অলিগলি রেল-বাস স্টেশনের চিরচেনা চেহারা বদলে গেছে। চব্বিশ পরগনা, পশ্চিম দিনাজপুর, বালুরঘাট, মুর্শিদাবাদ, নদীয়া এবং কোচ বিহারের স্থানীয় অধিবাসী ও উদ্বাস্তু জনসংখ্যা প্রায় সমান হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রধানমন্ত্রী গান্ধী প্রথম পশ্চিমবঙ্গ সফরে আসেন ১৫ মে। ১৬ মে সকালে আগরতলা থেকে বিমানে রওনা হয়ে প্রথমে নামেন বাগডোগরা, সেখান থেকে হেলিকপ্টারে হলদিবাড়ি, এরপর বনগা। তিনি উদ্বিগ্ন। কি করে সামলাবেন এই উদ্বাস্তু সংকট! সীমান্ত বন্ধ করে এদের কি আবারও মৃত্যুর মুখে নিক্ষেপ করবেন, নাকি নিরাপদে ঘরে ফেরাবেন?
ইন্দিরা চিন্তিত, কিন্তু দৃঢ়চিত্ত। শরণার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি বললেন : আমাদের দেশ গরিব; তবুও ভারত সাধ্যমতো আপনাদের সেবা করবে। আপনারা যাতে স্বসম্মানে, স্বঅধিকারে নিজের ঘরবাড়িতে ফিরতে পারেন, আমরা সে ব্যবস্থাই করবো।
নয় মাসে সর্বমোট ৯৮ লক্ষ ৯৯ হাজার ৩০৫ জন শরণার্থী প্রবেশ করে ভারতের মাটিতে। একমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই আশ্রয় নেয় ৭৪,৯৩,৪৭৪ জন। কেন্দ্রীয় সরকারের ৪৮৬ ও কেন্দ্রের ৬টি সহ শত শত শরণার্থী শিবির খোলা হয়। বিপুলসংখ্যক শরণার্থীকে ঠাঁই দেওয়া হয় ৯৮৬টি স্কুল ও কলেজে। আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের বাড়িতেও আশ্রয় পায় অনেকে।
আগস্ট মাসে পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার রিফ্যুজি ক্যাম্পগুলি ঘুরে যান মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি। এ সংকটকে তিনি বিরাট এক মানবিক বিপর্যয় বলে অবিহিত করেন। দেশে ফিরে ‘শরণার্থী সংক্রান্ত সাব কমিটি’র চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁর মূল্যায়ন প্রকাশ করেন কেনেডি। বলেন, ভারতের শরণার্থী শিবিরগুলিতে প্রতিদিন প্রায় ৪৩০০ শিশু মারা যাচ্ছে। তাঁর আশঙ্কা, এ ছাড়া অন্যান্য কারণেও মারা যেতে পারে আরও দুই লক্ষের মতো নরনারী। প্রেসিডেন্ট নিক্সনের কড়া সমালোচনা করেন সিনেটর কেনেডি।
অধ্যাপক মফিজউল্লাহর হাত ধরে শুভেন্দু দেবনাথ বাংলাদেশ মিশন থেকে বেরিয়ে আসে। আরও কয়েকজনের সঙ্গে অধ্যাপকের স্কটিশ চার্চ কলেজেন হোস্টেলে থাকবার ব্যবস্থা হয়েছে। কলেজের অধ্যাপত তরুণ সান্যালসহ কয়েকজনের সহযোগিতায় ব্যবস্থাটা সম্পন্ন হয়েছে। এরই মধ্যে দুই বন্ধু পাশের এক রেস্তোরাঁয় গিয়ে চা খেল। পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজার, রথখোলার রেস্তোরাঁয় ২৩ বছর আগে যেভাবে চা খেয়েছে, ঠিক সে রকম। শুভেন্দু বন্ধুকে বলে, ইচ্ছে করলে তুই কিন্তু আমাদের বাড়িতেই থাকতে পারিস। আরও কিছু মানুষ উঠেছেন। তুই গেলে মা খুব খুশি হবেন।
নিশ্চয়ই তোদের বাড়ি যাবো, থাকবোও শুভ। সে বাড়ি তো আমারও। কিন্তু আজ থাক। অধ্যাপক তরুণ সান্যাল আসবেন। কিছু আলোচনা আছে। শুভেন্দু বলে, ঠিক আছে, তোর সময় নিয়ে আসিস। আরও কিছু কথাবার্তার পর মফিজউল্লাহ স্কটিশ চার্চ কলেজের দিকে পা বাড়ালেন। যাবার আগে শুভেন্দু তার বাড়ির ঠিকানাটা লিখে মফিজের শার্টের পকেটে ঢুকিয়ে দিলেন। বললেন, মা কিন্তু তোর জন্যে অপেক্ষা করবেন মফিজ।
এরপর দুই বন্ধুর দুই পথ। শুভেন্দু যাত্রা করলো দক্ষিণ কলকাতার দিকে। অধ্যাপক মফিজউল্লাহ হেঁটে চলেছেন স্কটিশ চার্চ কলেজের দিকে। কিছুটা এগিয়ে একটা ট্যাক্সি নিয়ে তিনি এগুতে থাকলেন। ভাবতে থাকলেন, কী বিচিত্র জীবন দুই বঙ্গের! মাত্র দুই যুগ আগে, ১৬ আগস্ট ১৯৪৬, কী ভয়ঙ্কর রক্তপাত ঘটে গেছে এই কলকাতায়! পাকিস্তান আন্দোলন চাঙ্গা করতে সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ এক ঢিলে দুই পাখি মারার ফন্দি আঁটলো। একই সঙ্গে কংগ্রেস ও ইংরেজকে তাদের শক্তি বোঝাবার কৌশল নিলো।
জুলাই ১৯৪৬।
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ তাঁর বম্বের বাসভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখলেন। পাকিস্তান দাবিতে তিনি তাঁর দলের অনঢ় অবস্থানের কথা ঘোষণা করলেন। জানালেন, ভারতে আর কোনো অস্থায়ী বা কোয়ালিশন সরকার তারা মানবেন না। প্রয়োজনে মুসলিম লীগ সারা ভারতে সর্বাত্মক সংগ্রাম শুরু করবে। একই সঙ্গে কঠোর ভাষায় ঘোষণা দিলেন পাকিস্তান রাষ্ট্রের দাবি যদি দ্রুত না মানা হয় তাহলে ভারতের মুসলমানরা ‘ডাইরেক্ট একশন’ শুরু করবে।।
ঠিক তার পরদিনই তিনি ‘ডাইরেক্ট একশন ডে’র ঘোষণা দিলেন মি. জিন্নাহ।
এই ঘোষণায় বঙ্গীয় রাজনীতি আরেক দফা ঘোলাটে হলো, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তুঙ্গে উঠলো; হিন্দু ও মুসলমান আরেক দফা বিভাজিত হলো। ঘোলাটে অবস্থাটা ঠিক তখনোই ঘটলো যখন ব্রিটিশ রাজ ‘দ্রুত এবং নিরাপদে’ তাদের উপনিবেশ গুটাতে ব্যস্ত। কারণ তারা বুঝে নিয়েছে সামনের দিনগুলি ইংল্যান্ডের রানীর ভারত শাসনের জন্যে মোটেও সুখবর বয়ে আনবে না।
একদিকে কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভা এবং অন্যদিকে মুসলিম লীগ। কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি নয়। একে অপরের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে। রাজনীতিবিদদের অপরিণামদর্শী আচরণে মানুষ মানুষের বিরুদ্ধে পশুশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। ফলশ্রুতিতে নগরী কলকাতা ভাসলো রক্তের হোলিতে। ধর্মের নামে এমন মানব নিধন ভারত উপমহাদেশে কখনো ঘটেনি আগে!
বঙ্গীয় রাজনীতিতে এমনিতেই সংকট। মুসলমানরা ৫৬ শতাংশ; হিন্দু ৪২ শতাংশ। ইউরোপীয় ও অন্যদের সহায়তা নিয়ে মুসলিম লীগ সরকার গঠন করতে পারলেও পরিস্থিতির খুব একটা উত্তরণ ঘটলো না। প্রদেশ কংগ্রেস, হিন্দু মহাসভা ও আরএসএস তাদের প্রভাব বাড়াতে থাকলো। ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির আবেদন পশ্চিমবঙ্গের জনমনে কিছুটা জায়গা করে নিলেও পূর্ববঙ্গে তারা তেমন সফল হলো না। টানটান রাজনৈতিক অপতৎপরতায় দ্রæত হিন্দু-মাসলমান একে অপরের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ালো। ইসলামিয়া কলেজ, বেকার হোস্টেল থেকে বেশির ভাগ মুসলমান ছাত্র মুসলিম লীগের পতাকা তলে ঠাঁই নিল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রেসিডেন্সিসহ বেশির ভাগ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রেরা কংগ্রেস মিছিল-মিটিংয়ে যেতে শুরু করলো।
এই উত্তেজনার মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী ১৬ আগস্টকে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণার আহ্বান জানালেন। অফিস-আদালত বা দোকানপাট বন্ধ থাকলে সহিংসতা কম হবে ভেবে ব্রিটিশ গভর্নর রাজি হলেন। কিন্তু বেঁকে বসলো কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভা। তারা সোহরাওয়ার্দীর বিরুদ্ধে সরাসরি সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির অভিযোগ তুললো। অতএব ছুটির বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হলো।
দৈনিক আজাদসহ মুসলমান মালিকানাধীন পত্রিকাগুলি সাধারণ মুসলমানদের উত্তেজিত করার কৌশল অবলম্বন করলো। রাগীব হাসানের সম্পাদনায় ‘দি স্টার অব ইন্ডিয়া’ পত্রিকাটি ‘ডাইরেক্ট একশন ডে’র বিস্তারিত কর্মসূচি ছাপিয়ে উত্তেজনাকে আরেক দফা বাড়িয়ে দিল। এই কর্মসূচিতে বলা হলো, সভার পর মিছিলের শুরু হবে কলকাতা, হাওড়া, হুগলি, মেটিয়াবুরুজ ও ২৪ পরগনার সব এলাকা থেকে। মিছিল এসে মিশবে ‘অকটারলনি মনুমেন্টে’, সেখানে সভাপতিত্ব করবেন মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। মসজিদে মসজিদে কর্মসূচির জন্যে বিশেষ মোনাজাতের ব্যবস্থাও বাদ থাকলো না।
পার্ক সার্কাস মসজিদে নামাজ শেষে হুজুররা উত্তেজক বক্তব্য দিলেন। কলকাতা অচল করে দিতে হবে। অন্যদিকে হিন্দু জনগোষ্ঠীর উত্তেজনাকেও চাঙ্গা করার চেষ্টা বাদ থাকলো না। আনন্দবাজারসহ হিন্দু মালিকানাধীন পত্রিকাগুলি একের পর এক উত্তেজক খবর ছাপতে থাকলো। হিন্দু মহাসভার কর্মীরা ‘অখণ্ড ভারত’ এর স্লোগান দিয়ে মাঠে নামলো। এমন সব বক্তৃতা-বিবৃতি প্রচারিত হতে থাকলো যা গোটা পরিস্থিতিকে সম্ভাব্য ধর্মযুদ্ধের দিকে ধাবিত করলো।
যা ঘটবার তাই ঘটলো।
সকাল ১০টার দিকে লালাবাজারে খবর এলো সংঘাত শুরু হয়েছে বিভিন্ন এলাকায়। দোকান খোলা বা বন্ধ রাখা নিয়ে নগরীর নানা জায়গায় তর্কবিতর্ক ও মারামারি শুরু হয়েছে। ঢিল ছুড়তে শুরু করেছে এক পক্ষ আরেক পক্ষের দিকে। ছুরিকাঘাতেরও খবর পাওয়া গেল কিছু জায়গা থেকে। দাঙ্গার সূত্রপাত ঘটলো রাজাবাজার, কলাবাগান, কলেজ স্ট্রিট, ক্যারিসন রোড, কুলুটোলা, বড়বাজারে। হাতে লাঠি ও লোহার রড নিয়ে মিছিলে নামলো মুসলিম লীগের জঙ্গি সমর্থকরা। ১২টার দিকে সভা শুরু হলো মূল সভাস্থলে। বক্তা খাজা নাজিমুদ্দিন ও সোহরাওয়ার্দী।
কিন্তু পরিস্থিতি কিছুতেই শান্তিপূর্ণ থাকলো না। মিলিটারি-পুলিশ নামিয়েও বর্বরতা রোখা গেলো না। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চলতে থাকলো অভাবিত ভাতৃঘাতী বর্বরতা। যে সব এলাকায় মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ সেখানে প্রাণ দিতে ও জখম হতে থাকলো নিরীহ হিন্দু ধর্মাবলম্বী। পুড়তে থাকলো মানুষের শরীর, লুট হতে থাকলো ঘরবাড়ি, দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা গুলিতে নির্বিচারে আক্রান্ত হতে থাকলো মুসলমান। তাদের ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও দোকানপাট লুট হতে থাকলো, আগুনে পুড়তে থাকলো মানুষের শরীর। হাজার হাজার ক্ষতবিক্ষত মানুষ ক্যাম্পে আশ্রয় নিতে বাধ্য হলো। বিশেষ ব্যবস্থায় ট্রেনে চেপে পশ্চিম থেকে পুবের পথে পালাতে থাকলো ভয়ার্ত মানুষ। হাওড়া ব্রিজ ও হুগলি নদী দিয়ে হাজার মানুষ পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করলো।
মুসলিম লীগের ‘ডাইরেক্ট একশন ডে’ ধ্বংসস্তূপে পরিণত করলো নগরী কলকাতাকে। কলকাতা পরিণত হলো কলঙ্কিত নগরীতে, যেখানে বন্ধু বন্ধুর ঘাতক, মানুষ মানুষের ঘাতক। মাত্র ৭২ ঘণ্টার সহিংসতায় মারা গেল ৪ হাজারেও বেশি মানুষ। গৃহহীন হলো ১ লাখেরও বেশি নরনারী। এই বর্বরতায় চ‚ড়ান্তভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হলো স্বাধীন যুক্ত বঙ্গের অনুসারীরা। হিন্দু ও মুসলিম নেতৃত্ব সাধারণ মানুষকে চ‚ড়ান্তভাবে বোঝাতে সক্ষম হলো হিন্দু ও মুসলমান দুই জাতি, তারা কেন একত্রে থাকবে? কৌশলে সফল হলেন পাকিস্তান রাষ্ট্রের জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ।
কলাকাতার দাঙ্গার প্রভাব পড়লো পূর্ববঙ্গে। অক্টোবর মাসে রক্তপাত ঘটলো নোয়াখালী ও টিপারা জেলার বিভিন্ন এলাকায়। কলকাতা থেকে গান্ধীজি ছুটলেন নোয়াখালীতে শান্তি মিশন নিয়ে। রায়পুর, লক্ষ্মীপুর, বেগমগঞ্জ, হাজিগঞ্জ, সন্দ্বীপ ও লাকসাম-চৌদ্দগ্রামের মাটি ইতোমধ্যেই রক্তাক্ত। পদব্রজে নোয়াখালীর আক্রান্ত অঞ্চলগুলো ঘুরতে থাকলেন গান্ধীজি তাঁর অহিংস বাণী নিয়ে।
নোয়াখালীর শান্তি মিশন শেষ হতে না হতেই নভেম্বরের ৭ তারিখে দাঙ্গা শুরু হলো বিহারে। ছাপড়া, পাটনা, মুঙ্গের, ভাগলপুরের মাটি কয়েক দফা রক্তাক্ত হলো। রক্তপাত ঘটলো যুক্ত প্রদেশ, উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হবার পর হিন্দু-মুসলমান নেতৃত্ব সম্মিলিতভাবে যুক্ত বঙ্গের দাবি তুললো। কিন্তু লাভ হলো না। ধর্মের ভিত্তিতে ভারত বিভাগের অপচেষ্টা ঠেকানো গেলো না।
অধ্যাপক মফিজউল্লাহ ভাবলেন, কী সব বিস্ময়কর উত্থান ও পতন এই কলকাতা নগরীর! শুভেন্দু দেবনাথ অনেকক্ষণ আগেই বাসে চেপে দক্ষিণ কলকাতার দিকে যাত্রা করেছে। স্কটিশ চার্চ কলেজের ডরমিটরিতে শুয়ে শুয়ে তবু তার বন্ধুকে উদ্দেশ্য করে বললেন মফিজউল্লাহ : শুভ রে, আমার মনে হয় ১৯৭১ আমাদের দুই পাপের মোচন ঘটাবে। বাঙালি আবারও মানুষ হবে, হয়তো হবে।

চার.
বাংলাদেশ পরিস্থিতি পশ্চিমবঙ্গে সমাজ ও রাজনীতিতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্যায় রাজ্যপাল শান্তিস্বরূপ ধাওয়ানকে জুন মাসে বিধানসভা ভেঙে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে নতুন নির্বাচনের আবেদন করেন। তার সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে, তারপরও বিধানসভা ভেঙে দেওয়ার সুপারিশ করেন অজয় বাবু। এর কারণ বাংলাদেশের পরিস্থিতি ও রাজ্যের জঙ্গিবাদী সমস্যার সার্থক মোকাবিলা করা।
২৯ জুন রাষ্ট্রপতির শাসন বলবৎ হয় পশ্চিমবঙ্গে। ইন্দিরা গান্ধীর আস্থাভাজন শিক্ষা, সমাজকল্যাণ ও সংস্কৃতি দপ্তরের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় রাজ্য পরিচালনার বাড়তি দায়িত্ব লাভ করেন।
এ সময় নকশালী তৎপরতায় গোটা রাজ্য কম্পিত হতে থাকে। একদিকে চলে শোকসভা অন্যদিকে বাংলাদেশের সমর্থনে মিছিল। নকশাল দমনে শক্ত পদক্ষেপ এবং একই সঙ্গে রিফ্যুজি সংকট মোকাবিলা, দুই-ই চলে সমানতালে। কিছু কিছু মহল থেকে এই আশঙ্কাও করা হয় যে, যেভাবে রিফ্যুজি স্রোত বেড়ে চলেছে, তাতে নকশালী তৎপরতা সীমা অতিক্রম করে আয়ত্তের বাইরে চলে যেতে পারে। এ অবস্থাতেও পশ্চিমবঙ্গের পত্রপত্রিকা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়। বাংলাদেশ সংক্রান্ত খবর ছাপে তারা গুরুত্বের সাথে, আবেগের সাথে।
ললিতাবালা চোখে দেখেন না বলে লাঠির সাথে একটি রেডিও সারাক্ষণের সঙ্গী হয়েছে তাঁর। ‘আকাশবাণী’ ও ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ এর অনুষ্ঠানগুলি তিনি যথাসময়ে শুনেন এবং বাড়িশুদ্ধ সবাইকে শোনান। কখনো রেডিওটা নিয়ে বাইরের টুলে রাখেন এবং ভলিউম বাড়িয়ে আশেপাশের লোকজনকে শোনান। আশ্রিত উদ্বাস্তুরা সে সব খবর শুনে কখনো দীর্ঘশ্বাষ ছাড়ে, কখনো উত্তেজিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে।
যুদ্ধকালীন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ও সাপ্তাহিক ‘জয়বাংলা’ পত্রিকা এরই মধ্যে কলকাতাবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রের প্রাত্যহিক খবর ও সংবাদ পর্যালোচনাগুলি যুদ্ধরত বাংলাদেশকে উজ্জীবিত করে চলেছে। আনন্দবাজার, যুগান্তর, বসুমতি, কালান্তর, স্টেটসম্যান ও অমৃত বাজার পত্রিকার পরিবেশনাগুলো দেখলে বোঝা যায় কতটা হৃদয় থেকে তারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে নিজেদের যুদ্ধ বলে গ্রহণ করেছে।
সুনন্দা দেবনাথ ইতিহাস নিয়ে পড়ে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তার ইচ্ছে অধ্যাপনা করবে, বাংলা ও বাঙালির ইতিহাস ঘাঁটবে। দাদি-বাবার জীবনের মতো না হলেও ১৯৪৭-এর দেশভাগ তার মনে ক্ষত সৃষ্টি করেছে। অনেক প্রশ্নের উত্তর আজও তার কাছে ধোঁয়াশা। সুনন্দা পত্রিকার পুরনো কপিগুলো সযতনে রাখে। দাদির অনুরোধেও বিশেষ বিশেষ খবরও পড়ে শোনাতে হয় তাকে মাঝেমধ্যে।
ঢাকা বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণটি প্রচার করা হলে আনন্দবাজার বিশাল খবর প্রকাশ করে। শব্দ করে হেডলাইনটা পড়তেই ললিতাবালা বলে, আরও একবার পড় না দিদিভাই, কি লিখলো? খবরটা পড়তে গিয়ে পত্রিকার আবেগি ভাষার সাথে সুনন্দার আবেগও মিশে যায়। “ময়দানের (রমনা রেসকোর্স) অদূরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ববঙ্গে রক্ততীর্থ। সেখানে ‘৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের শহীদদের রক্তের দাগ। আরও আছে অখণ্ড ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের একাধিক শহীদ সেখানেই করেছেন আত্মদান। আজ আবার সেখানে তাজা রক্ত। সেই রক্তচিহ্নের দিকে তাকিয়ে বিদ্রোহী নায়ক জানতে চাইলেন আমার ওপর আপনাদের বিশ্বাস আছে? জনকণ্ঠে উত্তর দেয় আছে আছে আছে। —এই ইতিহাস বাংলার মানুষের রক্তের ইতিহাস। —আমার সঙ্গে পরামর্শ না করে ইয়াহিয়া গোলটেবিল বৈঠক ডেকেছিলেন, ২৫ তারিখ এসমবলি ডেকেছেন। তিনি যে বক্তৃতা করেছেন তাতে সমস্ত দোষ আমার ওপরে, বাংলার মানুষের উপরে চাপিয়ে দিয়েছেন।—ভাইগণ, মনে রাখবেন এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেব এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ।”
পড়া শেষ করে সুনন্দা বলে, নেতাজির পর এমন নেতা কি বাঙালি পেয়েছিল দিদিমা? এবার কিছু একটা হবেই, বাঙালি মেনে নেবে না দেখে নিও।
হলেই ভালো, সবাই ভালো থাকুক, মরণকালে এই তো দেখে যেতে চাই দিদিভাই। এরপর মাথা ঘুরিয়ে বললেন, আজ কলেজ স্ট্রিটের দিকে যাবি নাকি?
যাবো, কফি হাউজে বসবো। যাবে নাকি তুমি? চল আমার বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেবে?
নাতনির রসিকতায় দাদি হাসেন, বলেন, তুই নিয়ে গেলে যাবো? একটু থেমে আবারও বলেন, সুনন্দা, তুই তো ইতিহাস পড়িস, মাস্টারও হবি। বলতে পারিস, আমাদের বঙ্গভ‚মিতে এত কান্না কেন? বলতে পারিস, বাংলা ও পাঞ্জাবই কেন ভাগ করা হলো?
কেন দিদিমা, ব্রিটিশের বিরুদ্ধে পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গ যেভাবে জেগে উঠেছিল, পাঞ্জাব যেভাবে প্রতিবাদী হয়েছিল, অন্যেরা তো তা পারেনি। অতএব —।
দিদিমাকে না শুনিয়ে পুরনো পত্রিকা ঘেঁটে সুনন্দা দেবনাথ এরপর একটি সম্পাদকীয় নিবন্ধ বের করে। মনোযোগ সহকারে পড়তে থাকে : “তেইশ বছর পর এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে পাকিস্তান নিজেই। না, ধর্ম শেষ কথা নয়। তার চেয়ে অনেক অনেক প্রবল স্বাধীনতা, জাতীয়তা। পূর্ব পাকিস্তানের নাম আজ বাংলাদেশ। মুখে তার ধ্বনি জয়বাংলা। আর কবির গান আমার মায়ের সোনার নোলক হারিয়ে গেল শেষে সেথায় খুঁজিছো আয় খুঁজি বাংলাদেশে।”
কাগজ হাতড়ে দৈনিক যুগান্তরেরও কয়েকটি কপি বের করে সুনন্দা। ‘আমরাও তাদের পাশে’ শিরোনামে পত্রিকাটি লেখে : “নিজেদের দেশে গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থা প্রবর্তনের দাবি আদায়ের জন্য বাংলাদেশের মানুষরা যে লড়াই চালাচ্ছে, যে আত্মত্যাগ তারা করছে তার প্রতি সর্বান্তকরণে সমর্থন ও সমবেদনা জানিয়ে সংসদের উভয় সভায় আজ যে প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে তাতে বিশ্বের সমস্ত মানুষ ও সরকারগুলোর কাছে অবিলম্বে এই গণহত্যা বন্ধ করার জন্য কার্যকরী ব্যবস্থা অবলম্বন করতে অনুরোধ জানানো হয়েছে। প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি। মানবিক অধিকার রক্ষার জন্য বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের এই ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানকে ভারত সরকারের সমর্থন জানিয়ে প্রস্তাবটি যখন সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয় তখন উভয় সভায় প্রশংসার উচ্চরোল ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।”
আরেকদিনের খবর : “বাংলাদেশের মানুষের আন্দোলনের প্রতি সমর্থন, সহানুভ‚তি এবং একাত্মতা জানিয়ে পশ্চিম বাংলার মানুষ আজ স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে সাধারণ ধর্মঘট ও হরতাল পালন করেছেন। জীবন-মরণ যুদ্ধে লিপ্ত ও বাঙলার আট কোটি মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন এ বাংলার পাঁচ কোটি বাঙালি। তাঁদের ব্যথায় উদ্ব্যেগ ও উৎকণ্ঠায় ভাগিদার। বাঙলা বিভক্ত হবার পর এই প্রথম এ ব্যাপারে বাংলার মানুষ ও বাঙলার বাঙালির প্রতি প্রকাশ্যে এবং সোচ্চার সহানুভ‚তি ও সমর্থন জানালেন। দোকানপাট বাজারহাট বলো কারখানা বন্ধ রেখে যানবাহন তুলে রেখে সমস্ত আনন্দানুষ্ঠান বাতিল করে দিয়ে মানুষ শোক দিবস পালন করে বর্বরতার বিরুদ্ধে তার অধিকার ও ঘৃণ্য প্রকাশ করেছে। পরম আত্মীয়ের বিয়োগ ব্যথায় মহানগরীর সর্বত্র কালো পতাকা। পথের মোড়ে মোড়ে শহীদ বেদি ফুলে ফুলে সাজান।”
দাদির আবদারে ১৮ এপ্রিলের পত্রিকার পুরনো কপি সামনে আনে সুনন্দা। ললিতাবালা বললেন, রেডিওতে খবরটা শুনেছি কিন্তু পত্রিকায় কি লিখলো, পড়তো। মুজিবনগর (মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলা) ডেটলাইনে যুগান্তর প্রতিনিধি লিখেছে : “জাতি হিসেবে বাঙালি জেগে উঠেছে। পৃথিবীর কোনো শক্তি নেই বাঙালির এই জয়যাত্রায় বাধা দিতে পারে।” Ñ স্বাধীন বাঙলা সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এখানে দশ হাজার মানুষের এক প্রকাশ্য জমায়েতে এ কথা ঘোষণা করেন। স্বাধীন বাংলাদেশের সদস্য সৈনিক দেশতন্ত্র নাগরিক আর বিভিন্ন দেশের শতাধিক সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘প্রান্তরে প্রান্তরে, হাটে-বাজারে, শহরে-বন্দরে, বাঙালি লড়ছে। অকাতরে আমরা রক্ত দিচ্ছি পরাজিত হবার জন্যে নয়। এ যুদ্ধ আমাদের স্বাধীনতার, আমাদের অস্তিত্বের যুদ্ধ এ যুদ্ধে আমরা জিতবই।’ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি জানালেন, গত ২৫ শে মার্চ তাঁদের সরকার গঠিত হয়। গঠন করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সাড়ে সাত কোটি বাঙালি যাঁকে এক বাক্যে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মেনে নিয়েছে। —এতদিন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে কিংবা খবরের কাগজের পাতায় মুজিব সরকারের ঘোষণা প্রচারিত হয়েছে। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও তার মন্ত্রিসভার সদস্যরা নতুন রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের শপথ নিয়েছেন লোকচক্ষুর অন্তরালে। জনপ্রতিনিধিদের আনুষ্ঠানিক সভাতেও বাইরের কাউকে ডাকা হয়নি। আজ সর্বপ্রথম বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রপ্রধান ও মন্ত্রীরা আত্মপ্রকাশ করলেন। শতাধিক সাংবাদিক এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। কলকাতার প্রেসক্লাব থেকে সাংবাদিকদের গাড়ির মিছিল চার ঘণ্টা পরে মুজিবনগরে যখন পৌঁছাল তখন বেলা এগারটা। বিরাট আমবাগান, কিন্তু সভা যেখানে বসেছে সেখানে মঞ্চের মাথার উপর বিরাট কয়েকটা মেহগনি গাছ। ঘন সবুজ আর কাঁচা সবুজের সমারোহ। হালকা মেঘে ঢাকা আকাশের ছায়া পড়েছে চারদিকে। সভা মঞ্চে তিনটি সোফা লাল আর সাদা কাপড় মোড়া। দুই পাশে তিনটি কাঠের চেয়ার। সামনে ছোট একটি সাইড টেবিল। তার এক পাশে দুটো মাইক্রোফোন। মঞ্চের দুপাশে দুটো কাঠের ছোট ছোট চেয়ার পাতা হয়েছে মাটিতে বিছানো ত্রিপলের উপরে। ওখানে অতিথিরা বসেছেন। আর একদিকের চেয়ারগুলো দখল করলেন সাংবাদিকরা। আর একটু ঘুরে আমগাছ আর বাঁশের খুঁটির উপর মোটা দড়ি চাপিয়ে একটি বৃত্ত রচনা করা হয়েছে। এই বৃত্তের মধ্যে সদস্য সৈনিকেরা দাঁড়িয়ে আছেন। বৃত্তের ওপারে দেশতন্ত্র নাগরিকদের ভিড়।”
খবরটা পড়তে পড়তে সুনন্দার আক্ষেপটা মুখ ফসকে বেরিয়ে যায়, কী সব অসাধারণ ঘটনা, আগে জানলে আমরাও যেতাম। ইতিহাস প্রত্যক্ষ করার সাক্ষী হয়ে থাকতাম।
ঠিক এ সময়েই বাইরের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ পাওয়া গেল। সুনন্দা গলা বাড়িয়ে দেখে দুজন মধ্য বয়স্ক লোক দাঁড়িয়ে আছেন। সে দরজা খুলে দেয়। সামনে এগিয়ে আসেন তরুণ সান্যাল, কলকাতার বুদ্ধিজীবী মহলের পরিচিত মুখ, খ্যাতিমান পত্রিকা ‘পরিচয়’-এর সম্পাদক, একই সঙ্গে স্কটিশ চার্চ কলেজের অর্থনীতির নামকরা অধ্যাপক। অন্যজনকে সে চিনতে পারে না। নমস্কার জানিয়ে দুজনকেই ভেতরে নিয়ে আসে।
অধ্যাপক সান্যাল বললেন, এটা তো শুভেন্দু দেবনাথের বাড়ি, ওনি কি আছেন?
বাবা অফিসে। বিকেল-সন্ধ্যার দিকে ফেরেন। আপনারা বসুন। বলেই সুনন্দা দুজনকে নিয়ে ভেতর বাড়িতে প্রবেশ করে। ললিতাবালা নিঃশব্দে কথাবার্তাগুলো শুনছিলেন। অধ্যাপক সান্যাল এবার সাথের লোকটির পরিচয় জানালেন, বললেন, ওনি অধ্যাপক মফিজউল্লাহ, ঢাকার জগন্নাথ কলেজে পড়ান। তোমার বাবার ছোটবেলাকার বন্ধু। সুনন্দা আরেকবার সালাম জানায় বাবার বন্ধুকে।
মফিজউল্লাহ দেখতে পান, তার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক সিতাংশু দেবনাথের বিধবা স্ত্রী অনেকগুলো পত্রিকার পাতা ব্যষ্টিত হয়ে বসে আছেন। জোরে বলেন, মাসিমা, আমি মফিজ, শুভেন্দু ও আমি জগন্নাথ কলেজে এক ক্লাসে পড়তাম। মনে আছে আপনার?
কলকাতার বুকে এত বছর পর ঢাকার মফিজকে খুঁজে পাওয়ার গল্পটা মাকে জানিয়েছে শুভেন্দু। অতএব আগন্তুকের পরিচয় নিয়ে সমস্যা হলো না। ললিতাবালা বললেন, তোর সাথে নাকি হঠাৎই দেখা, আমায় বলেছে শুভেন্দু। আরও বলেছে, তুই নাকি বড় অধ্যাপক হয়েছিস? অনেক বড় হয়েছিস? আমি যে আবার চোখে দেখি না, আয় কাছে আয়?
একটু সময় নিয়ে বৃদ্ধা আবারও বলেন, আয়, কাছে আয়, বাবা। থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা কি হয়েছে, নাকি?
না মা, স্কটিশ চার্চ কলেজের হোস্টেলে ভালোই আছি, ছেলেরা বাংলাদেশের লোকদের জন্যে নিজেদের থাকবার জায়গা ছেড়ে দিয়েছে। অধ্যাপক সান্যাল সব ব্যবস্থা করেছেন, তেমন অসুবিধে হচ্ছে না।
খানিক পর ললিতাবালা তাঁর পায়ের উপরে কারও আঙুল ছোঁয়ার ষ্পর্শ অনুভব করলেন। মাথায় হাত ঠেকিয়ে তিনি আশীর্বাদ করলেন। বললেন, তোরা বোস, আমি দিদিভাইকে জলখাবার দিতে বলি।
জলখাবার থাক মাসিমা। আমরা বরং একটু বসিই, কথা বলি আপনার সাথে। শুনলাম বিকেলেই ফিরবে শুভেন্দু। অধ্যাপক তরুণ সান্যাল ব্যস্ত মানুষ, তবু তিনি সাথে এলেন ঠিকানাটা যেন খুঁজে পাই।
স্বামীর সাথে ঢাকা শহরে মাত্র কয়েক বছর ছিলেন ললিতাবালা। অসুস্থ শ্বশুর-শাশুড়িকে দেখাশোনার প্রয়োজনে বেশির ভাগই তাঁকে ফরিদপুরে থাকতে হয়েছে। সবকিছু মনে করতে পারেন। ছেলের বন্ধু বলে বাড়িতে নিয়মিত যাতায়াত ছিল মফিজের। পুরান ঢাকায় দুজনে একসাথে বড় হয়েছে।
পুরনো স্মৃতি হাতড়ে মফিজউল্লাহও চুপ করে থাকেন। ঋষিকেশ দাস লেনের দোতলা বাড়ি, পগোজ স্কুলের দপ্তরির বেল, ঘোড়া গাড়িতে সদরঘাট, পল্টনের খোলা মাঠ, শাঁখারীবাজারের পুজো, বুড়িগঙ্গার পানিতে সাঁতার, নবাববাড়ির দেয়াল ডিঙিয়ে ভেতরে ঢোকা বেশ মনে পড়ে মফিজের। নিঃশব্দে কখনো ফেলে আসা রাজ্য পরিভ্রমণ করা যায়, অনেক পেছনে চলে যাওয়া যায়। এতোই পেছনে, এতোই বড় ক্যানভাসে ছবি আঁকা যায় যা স্বশব্দে পারা যায় না। মফিজউল্লাহও তাই করলো, এরপর বললেন, অধ্যাপক সান্যাল, শুভেন্দুর বাবা, মানে আমাদের মাস্টার মশাই, কিছুতেই বর্ডার পেরিয়ে এপারে আসতে চাননি। শেষ পর্যন্তও আসেননি তিনি। দেশভাগ তাঁর আত্মাকে ক্ষতবিক্ষত করেছিল। সেই যন্ত্রণার কথা বলেছেনও তিনি ছাত্রদের। আঘাত শেষ পর্যন্ত তিনি নিতে পারেননি। একদিন ক্লাসরুমেই চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন মাস্টার মশাই।
দক্ষিণ কলকাতার বাড়িটা সে সময়টায় বেশ ফাঁকা। রাতের মতো নয়। কয়েকজন মহিলা আছেন ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে। পুরুষেরা সবাই বাড়ির বাইরে। এরই মধ্যে সুনন্দা জলখাবারের আয়োজন করেছে। সুনন্দাকে দেখে অধ্যাপক সান্যাল বললেন, শোন, তোমার দিদা-বাবার মতো আমিও জন্মেছি অবিভক্ত বঙ্গদেশে। পাবনায়। দেশ ভাগের পর ভারতে চলে এলেও, রক্তটা আজও ওপার বাংলার। এই তো কিছুদিন আগে ‘পরিচয়’ অফিসে এলেন শওকত ওসমান, আনিসুজ্জামান। ওদের নাম জানো? বেশ বড় মাপের মানুষ ওরা। বর্ডার পাড়ি দিয়ে কলকাতায় এসেছেন, আশ্রয় দরকার। স্কটিশ চার্চ কলেজের বড় ছাত্রাবাসটা আমার তদারকিতে। এদিকে আবার নকশাল আন্দোলন। ছাত্রছাত্রীরা অনেকেই কার্যত নকশাল হয়ে গেছে। আমি ছেলেমেয়েদের ডাকলাম, বোঝালাম, দেখ, এখানে যাঁরা এসেছেন তাঁরা শ্রদ্ধেয় মানুষ, তাঁদের থাকবার ব্যবস্থা করতে হবে। এটা আমাদের দায়িত্ব। এরপর নকশালের ছেলেরা সব ঘর ছেড়ে দিয়ে কমনরুমে চলে গেল। সব ঘর ফাঁকা করে দিল।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস নিয়ে পড়ে সুনন্দা। নিজেদের কাজের কথা নিজের থেকেই সে তরুণ সান্যালকে জানালো। বললো, দশটি টিমে ভাগ হয়ে বিভিন্ন রিফ্যুজি শিবিরে ওরা কাজ করি আমরা। রিলিফ জোগাড় করি, উদ্বাস্তুদের মাঝে বিতরণ করি। কিন্তু স্যার, বেশি দরকার হয়ে পড়েছে ওষুধ, চিকিৎসার। কলেরাও শুরু হয়েছে কিছু কিছু ক্যাম্প।
খুবই ভালো করছো মা, এই যে নিজের থেকে তোমরা মাঠে নেমেছো, এর চেয়ে বড় শান্তি আর কি আছে? তবে তোমরা তো দেশভাগ দেখোনি, কী সব ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটানো হয়েছে দুই বঙ্গে! অতএব চোখকান খোলা রেখো, যাতে হিন্দু-মুসলিমের সম্পর্কে আর চিড় না ধরে। বাস্তবতা হচ্ছে, যারা এখানকার হিন্দি বা উর্দুবাসী মুসলমান তারা অনেকেই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। ফলে তোমাদের দায়িত্বটা বড়। আমিও যাচ্ছি, বিভিন্ন জায়গায়,বিভিন্ন সভা-সমিতিতে। শ্রীযুক্ত অন্নদা শংকর রায়ের মতো মানুষও মাঠে ময়দানে কাজ করছেন। কবি সুভাস মুখোপাধ্যায়ও আছেন সঙ্গে।
শোন, এই যে বাংলাদেশ থেকে শত শত বুদ্ধিজীবী এলেন এঁদের থাকবার জায়গা দিলেই তো চলে না, খাবারের দরকার, পোশাকের দরকার। কোথা থেকে পাব? আমার স্ত্রী কেয়া ছিলেন ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার এক বড় পরিবারের দৌহিত্র। মহারাজ সূর্যকান্ত বংশের। ওদের সম্পদ-সম্পত্তি ছিল খুব। বিয়েতে পাওয়া এবং নিজস্ব উত্তরাধিকার থেকে পাওয়া সমস্ত গয়না কেয়া বিক্রি করে দিলেন, কিছু বন্ধক রাখলেন। সেই টাকা দিয়ে বেশ কিছুদিন এসব অতিথিদের সেবা করা হয়েছে, বাচ্চা ও মহিলাদের পোশাক কেনা হয়েছে।
আরও অবাক কাণ্ড দেখ, আমি বিনা অনুমতিতে এত লোকজনকে কলেজ হোস্টেলে রাখতে শুরু করলাম, কিন্তু কোনোদিন এক মুহূর্তের জন্যেও কলেজ কর্তৃপক্ষ কোনো কথা বলেনি। খ্রিস্টান কলেজ হলেও কোনো বাধা সৃষ্টি করেনি। —-আমাদের অধ্যাপকদের বেতন খুবই কম। তো কিছু কিছু রাজনৈতিক দলের লোক আমাকে তখন গম জোগাড় করে দিয়েছে। বিখ্যাত উর্দু কবি কায়েফি আজমীও কলকাতায় এসেছিলেন। আসানসোল থেকে শুরু করে চন্দননগর রাজার এবং এখানে যত উর্দু ভাষাভাষী অঞ্চল আছে, সমস্ত জায়গাতে তিনি বাংলাদেশের উপর তাঁর লেখা কবিতা পড়ে শুনিয়েছেন। সিটি কলেজের অধ্যাপক শান্তিময় রায় চষে দিনরাত বেড়াচ্ছেন কলকাতা।
ললিতাবালা তরুণ সান্যালের কথাগুলো মনযোগ দিয়ে শুনছিলেন। বললেন, বাবারা, সাধারণ মানুষ যুক্তি বোঝে, মনুষ্যত্ব বোঝে, বোঝেনা কেবল পলিটিশিয়ারা। ওরাই মানুষকে ভাগ করে।
মফিজউল্লাহর তাঁর মাসিমার কথায় সম্মতি প্রদান করলেন। কয়েক সপ্তাহে তরুণ সান্যালের একটা সম্পর্ক গড়ে উঠলেও এতোটা জানা ছিল না তার। নিজের আগ্রহ থেকে বললেন, ভারতের অন্য প্রান্তের মানুষ কীভাবে নিচ্ছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে?
শুনুন তাহলে। এইতো তিন সপ্তাহ আগে কেরালার কোচিতে যেতে হয়েছিল একটা কনফারেন্সে। আমি সেখানে বক্তৃতা দিয়েছিলাম, ভিক্ষা করেছিলাম বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে বাংলাদেশকে সাহায্য করার জন্য। কোনোদিনও আমি ভুলব না যে, একাধিক বাড়ি থেকে গৃহিণী তরুণী মেয়েরা, যেমন বাঙালি হিন্দু মেয়েদের বিয়ের চিহ্ন হিসেবে গলায় একটা সোনার মালা থাকে, মঙ্গলসূত্র বলে, আমাকে কোচির একাধিক পরিবার গলার সেই মঙ্গলসূত্র খুলে দিয়েছেন। বলেছেন, বাংলাদেশের বোনদের জন্য এটা আপনার হাতে দিলাম। আমরা জানি আপনি পৌঁছে দেবেন। এই তো সেদিন পাটনাতে যখন শান্তি সম্মেলন নাম করে বাংলাদেশের পক্ষে মিটিং করেছিলাম, সেখানে একটা ছবির এক্সিবিশন হচ্ছিল, ছবি আঁকিয়েরা ছিল মহিলা, সেই মহিলারা হাতের সোনার চুড়ি-বালা আমায় খুলে দিয়েছিল বাংলাদেশের জন্য আমাদের সামান্য উপহার। তাই বলছি, লোকজন কিভাবে সাড়া দিয়েছে তা কল্পনা করা যায় না। উড়িষ্যার কটকে বাংলাদেশ নিয়ে বক্তৃতা করছিলাম, বক্তৃতার শেষে তরুণীরা এসে জড়িয়ে ধরে আমাকে যেভাবে চুমু খাচ্ছিল, কি বলব।
কথা বলতে বলতেই দুই অধ্যাপক চা-নাস্তা শেষ করেছেন। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হতে চলেছে। শুভেন্দু দেবনাথ তখনো বাড়ি ফেরেনি। সুনন্দা পুরনো পত্রিকার কপিগুলো গুছিয়ে রাখছিল। একটা খবর দেখিয়ে সুনন্দা অধ্যাপক সান্যালকে প্রশ্ন করলো, স্যার, একটু আগে দিদিমাকে বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহণের খবরটা পড়ে শুনাচ্ছিলাম। আনন্দবাজার, যুগান্তর দুটোই পড়েছিলাম। আপনি বা আপনারা কি সেখানে উপস্থিত থাকতে পেরেছিলেন?
তরুণ সান্যাল উত্তর দিল, না মা, আমারা যাওয়া হয়নি। বোধকরি মফিজ সাহেবেরও ছিলেন না। কিন্তু মা, একবার ভেবে দেখ, সেই যে ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে বাংলার স্বাধীনতা অস্তমিত হয়েছিল, নবাব সিরাজের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে, ভাবতে ভালো লাগে, সেই পলাশী রণাঙ্গনের মাত্র ৫০ মাইল দূরে বৈদ্যনাথতলার আমবাগানে আবারও নতুন সূর্যের উদয় হলো। আমরা বাঙালিরা যেমন দুর্ভাগা, সৌভাগ্যও কিন্তু কম নেই আমাদের।

পাঁচ.
৮ নম্বর থিয়েটার রোডের (শেক্সপিয়র সরণি) বাড়িটা আগে ছিল ভারতীয় সীমান্তরক্ষীর অফিস। দালানটি এখন বাংলাদেশের সরকারের কেন্দ্রীয় কার্যালয়। আশপাশের সড়ক দিয়ে চলাচল করতে সবাই তৃষ্ণার্ত চোখে তাকিয়ে দেখে সেই ভবনকে। ওই তাকানোর মধ্যে একটা আশা আছে, ভরসা আছে, আস্থা আছে। ওখানেই বসেন বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদসহ মুজিবনগর মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দ। গোটা দেশের যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রিত হয় এই ভবন থেকে। কাজেই নিরাপত্তার স্বার্থে অপরিচিতরা সহজে ভেতরে ঢুকতে পারে না।

এরই মধ্যে সুসংগঠিত হয়েছে মুক্তিবাহিনী। গেরিলা পদ্ধতিতে আক্রমণ পরিচালনার ফলে পাকিস্তানি সৈন্যরা ক্রমশই কোণঠাসা হয়ে পড়ে। সরকার গোটা দেশকে বিভিন্ন সেক্টর বা যুদ্ধ-অঞ্চলে ভাগ করা, বিভিন্ন সেক্টরের অধিনায়ক নিয়োগ করার বিষয়গুলি সময়ের দাবি বলে মনে করে। এ উদ্দেশ্যে যুদ্ধরত সামরিক কমান্ডারদের গুরুত্বপূর্ণ একটি সম্মেলন আহ্বান করা হয় ৮ থিয়েটার রোডে। জুলাই ১১ থেকে ১৭ তারিখ। প্রথম দিনের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন। সম্মেলনে সেক্টরগুলির সীমানা নির্ধারণ, গেরিলা যোদ্ধাদের সংগঠিত করা ও ‘নিয়মিত বাহিনী’ সংগঠিত করাসহ বেশকিছু সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কৌশলগত কারণে বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে (১০টি ভৌগোলিক অঞ্চল এবং একটি অঞ্চলবিহীন বিশেষ সেক্টর) ভাগ করা হয়। তিনটি ‘রেগুলার আর্মি ব্রিগেড’ গঠনেরও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ১৫ জুলাই সন্ধ্যায় নতুন সেক্টর কমান্ডার ও ফোর্স কমান্ডারগণ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ ছাড়াও ‘বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স’ বা ‘মুজিব বাহিনী’ নামে আরও একটি বাহিনী গড়ে তোলা হয়।

বালুহক্কাক লেন ও বালিগঞ্জে আরও দুটি জমজমাট অফিস চালু করা হয়েছে। সরকারের তথ্য, বেতার ও ফিল্ম বিভাগের কলাকুশলীরা সেখানে রাতদিন কাজ করেন। দেশত্যাগী সাংবাদিক, লেখক, চলচ্চিত্রকার, অভিনেতা ও শিল্পীরা সবাই মুক্তিযুদ্ধের প্রচার কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। যুদ্ধটা সকল অর্থেই জনযুদ্ধ।

একদিন থিয়েটার রোড দিয়ে যেতে সুনন্দার চোখে পড়ে একটা জিপ গাড়ি, ঠিক সে রকমই গাড়িটা, যার গায়ে রংতুলি দিয়ে আঁকা বাংলাদেশের তিনরঙা পতাকা, যাতে চেপে নবীন মুক্তি বাহিনীর কয়েকজন যুবক একদিন তাদের দক্ষিণ কলকাতার বাড়িতে গিয়েছিল। সুনন্দা দেখে, গাড়িটা দ্রæতবেগে ভেতরে প্রবেশ করে এবং ফটক বন্ধ হয়ে যায়। অতএব বাইরেই অপেক্ষা করতে থাকে সুনন্দা ও তার বন্ধুরা। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় না, গাড়িটা আবারও ফটক পেরিয়ে বাইরে আসে। সুনন্দা হাত তুলে সামনের দিকে এগিয়ে যেতেই পল্লব, আবু রায়হান ও নৃপেন লাফ দিয়ে নামে। বলে, আরে দিদি, আপনারা! এখানে কেন?

চেহারা ও পোশাকের আমূল পরিবর্তন ঘটেছে পল্লব, আবু রায়হান ও নৃপেনের। অনেকদিন চুল কাটছাঁট হয়নি। ট্রেনিংয়ের পর অনেকগুলো গেরিলা ‘অপারেশন’ এ অংশ নিয়েছে ওরা। কেউ কেউ আবার উচ্চতর ট্রেনিংয়েও গেছে। ওদের ওপর আরও বড় বড় অপারেশনের দায়িত্ব পড়বে। এক্সপ্লুসিভ ট্রিনিং, লাইট মেশিনগান ও এসএলআরসহ নানা ধরনের অস্ত্র চালাতে জানে ওরা। দেখতে হাসিখুশি, আগের মতো মনে হলেও ঠিক আগের মানুষ নেই ওরা। অনেক বেশি আস্থাবান। কিন্তু কলকাতায় প্রথম কয়টা দিন ওরা ভুলতে পারেনি। জিপটার কথা তো নয়ই। ওই গাড়িটা তাদের কাছে বাংলাদেশ। অনেক অনুরোধ-তদবিরের পরই কেবল জিপটা চালাবার অধিকার পায় ওরা। কয়েকজন নেতার সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় থাকাতেই ব্যাপারটা সম্ভব হয়।

সুনন্দার বয়স ওদের সমান বা কাছাকাছি হলেও সেই প্রথম থেকে ওকে দিদি বলে ডাকে ওরা। আবু রায়হান বলেন, দিদি উঠুন, আজ সারাদিন আমরা কলকাতা ঘুরে বেড়াবো, আপনাদের বড়িতেও যাবো। নৃপেন বলে, মাসিমা, দিদিমা কেমন আছেন?

সড়কের মধ্যিখানে গাড়ি দাঁড়িয়ে কথাবার্তা চলায় কিছুটা যানজট তৈরি হয় বৈকি! জট পরিষ্কার করতে এগিয়ে আসে ট্রাফিক পুলিশ। সুনন্দা, স্নেহলতা মৈত্র, অম্লান চক্রবর্তী, পলাশ অধিকারী ও নবনীতা দেবরায় লাফিয়ে জিপটায় বসে। ওরা সকলেই জয়বাংলা যাত্রী। মুহূর্তে জয়বাংলা কোরাসে আশপাশ কাঁপিয়ে চলতে শুরু করে জিপ। হাজারো মানুষ সে দৃশ্য দেখে। অপেক্ষারত প্রেস ফটোগ্রাফাররা ছুটে এসে ক্লিক ক্লিক শব্দে সে দৃশ্য ধরে রাখে।
আমরা ওপারের, এপার তো আপনাদের। কলকাতার দিদি ও দাদারা, কাজেই আপনারাই বলে দেন কোনদিকে যাবো? যেইদিকে বলবেন সেইদিকেই যামু, জয়বাংলার এই গাড়ি আইজ কলিকাতা সিটি চইস্যা বেড়াইবো। স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে হাসতে হাসতে কল্লোল কথাগুলো চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলে।

গাড়িটা পার্ক সার্কাসের বাংলাদেশ মিশনের দিকে ছুটে চলে। অম্লান ও স্নেহলতা প্রস্তাব দেয়, চলুন, এই স্মরণীয় দিনে সবাই মিলে গান ধরি বাংলার গান। প্রস্তাবটা সাথে সাথেই গৃহীত হয়। মুহূর্তের মধ্যে আট জনের দলটা সমবেত কণ্ঠে গান গাইতে শুরু করে। গৌরী প্রসন্ন মজুমদারের গানটা এরই মধ্যে আকাশবাণী ও স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে প্রচারিত হয়ে সাড়া ফেলেছে। আবু রায়হান ও নৃপেন গেয়ে ওঠে ‘শোন একটি মুজিবুরের থেকে লক্ষ মুজিবুরের ধ্বনি প্রতিধ্বনি আকাশে বাতাসে ওঠে রণী’-।

প্রথম কলিটা শেষ হতেই সুনন্দা, অম্লান, স্নেহলতা, পলাশ অধিকারী, কল্লোল, আবু রায়হান ও নবনীতা একযোগে কণ্ঠ মেলায় ‘বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ’।

একদল তরুণ-তরুণীর আবেগি কোরাস ছড়িয়ে পড়তে থাকে কলকাতার সড়ক অলিগলিতে। দুই বাংলার সম্মিলিত কণ্ঠস্বরে উজ্জ্বল থেকে উজ্জ¦লতর হয়ে ওঠে মাটি, সে মাটি পূর্ব কি পশ্চিমের জানার প্রয়োজন বোধ করে না কেউ। জয়বাংলার গাড়ি এগিয়ে চলে। পথচারী, মন্থর হেঁটে চলা উদ্বাস্তু, দোকানদার, ট্যাক্সিওলা, রিকশাওলা, যুবা-বৃদ্ধ, শ্রমজীবী কলকাতাবাসী এমন দৃশ্য আগে দেখেনি। আহা কী যে তৃপ্তি, সবাই উৎসুকে দেখে, বলে, দেখ দেখ বাংলাদেশ দেখ।

পার্ক সার্কাসের বাংলাদেশ মিশনের সামনে এসে জয়বাংলার গাড়িটা যাত্রা বিরতি নেয়। সামনেই নতুন দেশের বিশাল পতাকা। বাতাসে পতপত করে উড়ছে। গাড়ি থেকে ঝটপট নামে যুবক-যুবতিরা। কে পূর্বের কে পশ্চিমের তফাৎ থাকে না। মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানায় পতাকাকে। তারপর শুরু হয় নতুন যাত্রা।

এবার গাড়ি চলতে শুরু করে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির দিকে। দৃশ্যের হেরফের নেই। একই দৃশ্য। সড়ক ধরে এগিয়ে চলেছে জয়বাংলার গাড়ি, গান ধরেছে আট তরুণ-তরুণী। অজস্র মানুষ তাকিয়ে আছে ছুটন্ত গাড়িটার দিকে। তার চেয়েও যা বেশি চোখে পড়ে মুখ নেড়ে ওরা ছন্দ মেলাচ্ছে যুদ্ধদিনে রচিত কবি গোবিন্দ হালদারের গীতের সাে ‘তীরহারা এই ঠেউয়ের সাগর পাড়ি দেবো রে, আমরা সবাই নবীন মাঝি হাল ধরেছি শক্ত করে রে । আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে, যানজট-ভিড় ঠেলে গাড়িটা এক সময় রবিঠাকুরের পৈতৃক বাড়ির মূল ফটকে দাঁড়িয়ে যায়। জয়বাংলার অভিযাত্রীরা কবিগুরুকে মাথা নুইয়ে সালাম জানায়।

এরপর সবাই একযোগে গাইতে থাকে ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’; চিরদিন তোমার আকাশ তোমার বাতাস আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি।’ চালকের আসনে বসা কল্লোল খানিকটা হেঁটে বাড়ির ফটক দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে। মাথা নত করে প্রণাম জানায় সে কবিগুরুর উদ্দেশ্যে। গুরুদেব, প্রণাম জানবেন। এই গান বঙ্গভঙ্গ ঠেকিয়েছে, পঁয়ষট্টি বছর পর একই সঙ্গীত জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে বাঙালি গ্রহণ করেছে আপনার বলে, বাঙালির ইতিহাসে প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্রের জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা পেয়েছে। আশীর্বাদ করবেন গুরুদেব, আমরা যেন সার্থক হই, মানুষ হই, বাঙালি হই।

দুপুর গড়িয়ে বিকেলের শুরু। কল্লোল জিপটা হঠাৎ করেই দাঁড় করার একটা রেস্তোরাঁর পাশে। বলে, আমরা এবার যাত্রা বিরতি নেবো, চা-কফি চলবে, নেমে পড়–ন কলকাতার দিদি-দাদারা। চায়ে চমুক দিতে দিতে ঠিক করুন কোন দিকে এরপর। আজ আমরা ছুুটবো, চলবো। আজ আমাদের আনন্দের দিন, বিদ্রোহের দিন, মুক্তির দিন, বন্ধুত্বের দিন, ভালোবাসার দিন।

অবাক করার ব্যাপার যে এতোটা কম সময়ের মধ্যে ওরা সকলে সকলের বন্ধু হয়ে যায়। স্নেহলতা মৈত্র ও অম্লান চক্রবর্তী এগিয়ে যায় কল্লোরের কাছে, বলে, ঠিক বলেছো দাদা, আজ আমাদের আনন্দের দিন, বিদ্রোহের দিন, মুক্তির দিন, বন্ধুত্বের দিন, ভালোবাসার দিন।

নবনীতা দেবসেনের পরিবার হাওরা থেকে মূল কলকাতার উঠে এসেছে। ওর দাদা স্বদেশী ছিলেন জেল খেটেছেন। পূর্ববঙ্গের সাথে ওদের পরিবারের সম্পর্ক তেমন নেই। তবু বাংলাদেশের যুদ্ধ ওকে আর সবার সাথে মিলিয়েছে। সদ্য পাস করা নবনীতা কল্যাণীর একটা কলেজে যোগ দিয়েছে। আজ সকলে যখন হইহুল্লোড় করে সবাই জলপান করছিল সে তখন নিঃশব্দে বাংলাদেশের তিন যুবকের দিকে তাকিয়ে থাকে। কী বিস্ময়কর উদ্দাম, কী স্বাধীন ওরা! যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে না পড়লে এমন স্বাধীন হওয়া যায় না। চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে ধীরস্থির নবনীতা বলে, আমরা এবার নগরী ছেড়ে বাইরে যাবো, কলকাতার বাইরে। রাজি?

কোথায়, কোনদিকে দিদি? যেদিকে বলবেন, জয়বাংলার গাড়ি চলবে। বলেই হো হো হো করে তিনজনই হেসে ওঠে।

নবনীতা উত্তর দেয়, প্রথমে চঁচুড়া তারপর কল্যাণী, ওপারেই কিন্তু সাতক্ষীরা, আপনাদের। খোলা প্রান্তরের মাঝ দিয়ে আঁকাবাঁকা পথ, মসৃণ নয়, বন্ধুর। মাইল চল্লিশেক যেতে হবে। দেখবেন কত অসংখ্য শিবির, একটার একটা। হাজারো উদ্বাস্তু জায়গা নিয়েছে।

কল্লোল, রায়হান ও নৃপেন নিজেদের মধ্যে কথা বলে রাজি হয় যায়, বলে, নিশ্চয়ই, আগে গাড়িটাতে কিছু পেট্রল ঢুকিয়ে নেই। তা না হলে যে ওটা থেমে যাবে।

দ্রুত চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে কল্লোল স্টিয়ারিংয়ে বসে। এরই মধ্যে আকাশে মেঘ দেখা যায়, গুড়গুড় ডাক শোনা যায়, বিদ্যুৎ চমকায়। বৃষ্টির সাথে ঝড়ো হাওয়া যুবক-যুবতিদের চুল এলোমেলো করে দেয়। মেঘের সেই ডাকের মধ্যেই প্রায় সবাই গাড়িতে গিয়ে বসে। এবারেও চালাবে কল্লোল, বলে, বন্ধুরা, কলকাতা থেকে এবার আমরা কল্যাণের পথে, কল্যাণীর পথে, উদ্বাস্তু মথিত বেদনার পথে, বিদ্রোহের পথে, মুক্তির পথে।

নবনীতার মনে হয় এমন পাগল করা মানুষ জীবনে সে কম দেখেছে। আসন নেয়ার আগে কল্লোলের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। কি বলবে বুঝতে পারে না। বাতাস ক্রমেই ঝড়ো হয়ে উঠছে। উড়ন্ত চুল, কথার ছন্দ, শরীরের গঠন সব মিলিয়ে অসাধারণ লাগতে থাকে কল্লোলকে। বলে, সুনন্দা ও ওর বন্ধুরা আগেই চেনে আপনাকে, আমি তেমন ভাগ্যবান নই। আজই প্রথম দেখা, বলুন তো, আপনি কি কবিতা লেখেন?

লিখি বৈকি, লিখবোও। একটা ভালো কবিতা লিখবো। একটা ভালো কবিতা লেখা হবেই হবে এবার।

হেসে হেসে কথাগুলো বলতে বলতেই ইঞ্জিন চালু করে কল্লোল। ঘড়ঘড় শব্দে জয়বাংলার জিপটা কেঁপে উঠে। জিপটা যেন তাদেরই মতন, একসাথে চলতে চায়, যখন যেখানে ছুটতে চায়! এই গ্রুপটার মধ্যে কল্লোলই বয়োজ্যেষ্ঠ যদিও যুদ্ধদিনের আবাহনে সকলেই এক বয়সে এসে দাঁড়িয়েছে।। আর সবাই যেখানে আইএ-বিএ পড়ে, কেউ আবার তাও নয়, সে সেখানে সদ্য ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করা। বাবা-মা চাইছিলেন তাদের একমাত্র ছেলে বড় সরকারি অফিসার হোক, সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা দিক। হয়তো দেওয়াও হতো। কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্র তাকে বিদ্রোহী বানিয়েছে, যুদ্ধে নামিয়েছে। নবনীতার দিকে তাকিয়ে, খানিকটা সময় নিয়ে কল্লোল বলে, শ্রীমতি দেবরায়, আমার কিন্তু মনে হয় আমি অনেককাল ধরেই আপনাকে চিনি, কথা হয়নি এই যা। থাক সে কথা, আসল কথা বলি। দেখুন, এই যে ঝড় ঠেলে সহিংস যাত্রাপথের অহিংস যাত্রা, তারই তো যাত্রী আমরা, আপনারা ক’জনেও। এর চেয়ে ভালো কবিতা আর কি হয়?
গাড়ি চলতে শুরু করে কল্যাণীর পথে। হয়তো ঘণ্টা তিনেক লাগবে। কলকাতা থেকে উন্মুক্ত সড়কে বেরোতেই নৃপেন গান ধরে ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি, মোরা একটি হাসির জন্য অস্ত্র ধরি; যে মাটির চির মমতা আমার অঙ্গে মাখা’

সর্বস্তরের মানুষের আবেগ ও ভালোবাসায় ওপার বঙ্গের মাটিতে এপার বঙ্গের মুক্তিযুদ্ধ অবিস্মরণীয় এক উপাখ্যানের সৃষ্টি করে, যা ভারতীয় ভূখণ্ডকে একীভূত করে। এই আন্দোলনে বড় গতি আনে বাংলার সৃজনশীল মানুষেরা, যাদের সিংহভাগ কলকাতাকেন্দ্রিক। প্রায় নয়মাস ধরে মিছিলে মিছিলে, স্লোগানে স্লোগানে ভরে থাকে কলকাতার অলিগলি, সড়ক, রচিত হয় নিত্যনতুন গান ও কবিতা। বালিগঞ্জ ও বালুহক্কাক লেনের বাড়ি দুটো সৃষ্টিসুখের উল্লাসে মেতে ওঠে। এই পর্যায়েই জন্ম নেয় একগুচ্ছ অমর সঙ্গীত যা বাঙালি জীবনের চিরস্থায়ী সঙ্গী হয়ে যায়।

অসামান্য সেই গান, শোন একটি মুজিবুরের কণ্ঠে- রচিত হয় গীতিকার গৌরী প্রসন্ন মজুমদারের কলমে। বিস্ময়কর গানটির জন্ম হয় গড়িয়ার একটা চায়ের স্টলে। কয়েক বন্ধু মিলে আড্ডা মারছিলেন। ধীরেন চৌধুরী, অংশুমান রায়, গৌরী প্রসন্ন মজুমদার এবং আকাশবাণীর ‘সংবাদ পরিক্রমার’র লেখক প্রণবেশ সেন। দেখা গেল, চা খেতে খেতে গৌরী বাবু কাগজে কি যেন লিখছেন। কয়েক প্রস্থ চা চলার পর লেখাটা শেষ করেই অংশুমানের দিকে তাকিয়ে গৌরী বললেন অংশু, দেখ তো লেখাটা কি হয়েছে? অংশুমান রায় লাফিয়ে উঠে, বলে, কী অসাধারণ দাদা, আমি গাইবো, গানটা তুমি আমাকে দাও। তারপর একদিন দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের বড়িতে বাংলাদেশের পটুয়া কামরুল হাসান এলেন। গেলেন অংশুমান, উপেন তরফদারও। উপেন বাবু আকাশবাণীর লোক, সব সময়ই ক্যাসেট রেকর্ডার কাঁধে থাকে। অংশুমান এরই মধ্যে সুর করেছেন গানটার, গেয়ে শোনালেন কামরুল হাসানকে।

শেখ মুজিব পাকিস্তানের জেলে বন্দি, অথচ তাঁরই নির্দেশে চলছে মুক্তিযুদ্ধ! ইয়াহিয়া খান বলে দিয়েছে মুজিবের শাস্তি হবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার অপরাধে। ঠিক সে মুহূর্তে সৃষ্টি হলো গানটা! আকাশবাণীর অফিস কক্ষে বসে গানটার প্রবল জনপ্রিয়তা নিয়ে ভাবতে থাকেন উপেন তরফদার। মনে করার চেষ্টা করেন, এইতো সেদিন, হঠাৎ দেবু ফোন করল, বাংলাদেশের বিখ্যাত শিল্পী কামরুল হাসান এসেছেন, তুই কি আসবি?

বললাম, নিশ্চয়ই। সঙ্গে সঙ্গে অফিসে এসে টেপ রেকর্ডার নিয়ে ঢুকলাম ওর বাড়িতে। ও থাকতো পূর্ণদাশ রোডে। তো সেখানে গিয়ে দেখি, হাসান সাহেব ছাড়াও গীতিকার গৌরী প্রসন্ন মজুমদার, গায়ক অংশুমান রায়সহ আরও কয়েকজন। হাসানের সঙ্গে দেবু আমায় পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পরে আমি ইন্টারভিউ নিলাম। টেপ রেকর্ডার বন্ধ করে কাঁধে তুলতে তুলতেই গৌরীদা কামরুলকে বললেন, মুজিবুরকে নিয়ে একটা গান লিখেছি, অংশু আপনাকে একটু শুনিয়ে দেবে। আবার বসে পড়লাম। কেননা শুধু বক্তৃতা-ভাষণ হলেই চলে না, একটু গানটান না থাকলে প্রোগামের বৈচিত্র্য থাকে না। টেপ রেকর্ডার ছেড়ে দিলাম। তা গান তো হবে ঠিক হলো কিন্তু হারমোনিয়াম কই?
দেবু ছোট্ট ‘সিগেল রিড’ এর একটা হারমোনিয়াম নিয়ে এল তাও পুরোনো। তো হারমোনিয়াম তো পাওয়া গেল, কিন্তু তবলা? দীনেশ তখন পাশের র‌্যাক থেকে মোটা সাইজ একটা বই নিয়ে এসে বললো, কুছ পরোয়া নেহি দোস্ত, চালিয়ে দেব।

এভাবেই প্রথম রেকর্ড করা হয় গানটা, প্রচারিতও হয় আকাশবাণীতে। অনেক ইন্সট্রুমেন্ট দিয়ে পরবর্তীকালে রেকর্ড করা হয়েছে, জনপ্রিয়ও হয়েছে। কিন্তু ওই খালি গলায় ইন্সট্রুমেন্ট ছাড়া শুধু হারমোনিয়ামের ওপর যে গানটা তার আবেগটা অনেক বেশি। ওই গানের যে ভাষা আর অংশুমানের ওই গলা মিলিয়ে আমরা সবাই যেন চুপ হয়ে, মনে হয় মিনিটখানেক চুপচাপ থাকলাম। তারপর ধীরে ধীরে ফিরছি আকাশবাণীতে, ভাবছি, এই গান আর কামরুল হাসানের ইন্টারভিউটা সংবাদ বিচিত্রায় পাঞ্জ করে ব্যবহার করবো। কিন্তু পরিস্থিতি পালটে গেল। আগের দিন রমনার ময়দানে মুজিবের সেই বিখ্যাত ভাষণ পাকিস্তান সরকার প্রচার করতে দেয়নি। পরদিন সকালে ওরা এটা প্রচার হয়েছিল। মুজিবের ভাষণ তখনও আমি শুনিনি। স্টুডিওতে বসে রেকর্ডটা শুনতে লাগলাম। শুনেই আমার গা শিহরিত হলো। ওই ভাষা, ওই রক্ত গরম করা ভাষণ, আগে কেউ শুনিনি। অনেক ভাবলাম, স্ক্রিপ্ট লেখার কোনো দরকার নেই। ঠিক করলাম, অংশুমানের ওই গান এক পঙ্ক্তি নেব পরে মুজিবের ভাষণের কিছু অংশ। এভাবেই প্রোগ্রামটা করলাম।

গীতিকার গোবিন্দ হালদার রচনা করেন অসামান্য কয়েকটি গান যার একটি ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’।

এ গানটি লেখা হয় এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে। হালদার নিজেই জানালেন, স্বাধীন বাংলা বেতারের কামাল লোহানীর সঙ্গে আমার পূর্বপরিচিত কামালউদ্দিনের ছিল ঘনিষ্ঠতা। ফলে লোহানী সাহেব কলকাতায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই কামাল ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপিত হলো এবং স্বাধীন বাংলা বেতারের গোপন কেন্দ্রে নানা কর্মসূত্রে যাতায়াত শুরু হলো। ভালো গানের অভাবের কথা শুনে, একদিন কামাল ভাই আমার গানের একটি খাতা লোহানী সাহেবের হাতে তুলে দিলেন। লোহানী খাতাটি বেতারের সংশ্লিষ্ট সুরকারদের দিলেন গান বাছাই শেষে সুর করতে। খাতার ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’ গানটির কথা লোহানী সাহেবের বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। যাতে ভালো সুর হয় এজন্য দুই বন্ধুতে পরামর্শ করে গানের খাতাটি লোহানী সাহেব দিলেন অভিজ্ঞ সুরকার ও সঙ্গীত ¯্রষ্টা সমর দাসকে। কিন্তু তরুণ সঙ্গীতশিল্পী আপেল মাহমুদ গানটি পছন্দ করলেন, বেছে নিয়ে সুর করতে আরম্ভ করলেন। যাই হোক, আপেল অল্প সময়ের মধ্যে গানটিতে সুরারোপ করলেন এবং তা স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে তাঁর কণ্ঠে প্রচার শুরু হলো। প্রচারিত হবার সঙ্গে সঙ্গে বিরাট সাড়া পড়লো। বাংলার পথ ঘাট মাঠ, প্রতিটি ঘরবাড়ি, মুক্তিযোদ্ধা ও উদ্বাস্তু শিবির সর্বত্র অনুরণিত হয়ে ফিরতে থাকলো ওই গানের বাণী ও সুর।

ছয়.
কল্যাণী থেকে জয়বাংলা গাড়িটার কলকাতায় ফিরতে ফিরতে রাত তিনটে বেজে গেল। এত রাতে না খোলা পাওয়া যাবে বাংলাদেশ মিশন না থিয়েটার রোড। পেলেও লাভ নেই, নিরাপত্তার স্বার্থে প্রবেশের অনুমতি মিলবে না। অতএব ঠিক হলো প্রথমে দক্ষিণ কলকাতায় সুনন্দাদের বাড়িতে গিয়ে ওদের কয়েকজনকে নামাতে হবে, এরপর বাকিদের। বাকি রাত তিনজনে গাড়িতেই শুয়েই কাটিয়ে দেবে।
শেষ রাতের কলকাতা, খোলা রাস্তা, বাধাহীন উন্মুক্ত বাতাস; একমাত্র শিয়ালদা ও হাওরার রেল স্টেশন ছাড়া শব্দের সব উৎসগুলো একসাথে ঘুমিয়ে পড়ায় এক অচেনা নগরীতে পরিণত হয়েছে কলকাতা। কিন্তু সেই বিচিত্র শব্দহীনতার মাঝেও চোখ মেলে আছে কলকাতা। তাকিয়ে তাকিয়ে জয়বাংলার গাড়িটাকে দেখছে যেন পাহাড়া দেবে, যেন আগলে রাখবে। আগের রাতের মেঘ কেটে গিয়ে আকাশে অজ তারা ফুটেছে। সেপ্টেম্বর-নভেম্বরের দিকে যুদ্ধের গতিপথ সর্বত্র হয়। মুক্তি বাহিনী ছেলেরা দলে দলে দেশের সবপ্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগকারী বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআরের সেনারা তরুণদের দলে দলে অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে চলেছে। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বিএসএফ ও সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত প্রশিক্ষণ শিবিরগুলো থেকে প্রতি পনেরদিনে কয়েক হাজার মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধে যোগ দিচ্ছে। পাকিস্তান বাহিনী আগে যতটা সহজ ভেবেছিল এখন মোটেও তা ভাবছে না। বহু জায়গাতেই তারা বর্ডার অঞ্চল থেকে দূরে সরে গেছে। পরিস্থিতি দ্রুত তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে এগিয়ে চলেছে।
শুভেন্দু দেবনাথ ও তার স্ত্রী আরতিবালা মেয়ে ফেরেনি বলে ঘুমাতে পারেননি। বাড়িতে কড়া নাড়ার শব্দ হতেই বেরিয়ে দরজা খুলে দিলেন শুভেন্দু, বললেন, এত রাত হলো যে? এত রাত তো তুই করিস না মা?
সুনন্দা ‘হ্যাঁ দেরি হলো, কল্যাণী গিয়েছিলাম’ বলেই কয়েকজনকে নিয়ে বাড়িতে ঢুকে। মা আরতিবালা সুনন্দার সহকর্মীদের প্রায় সবাইকেই চেনে। বলে, কিছু খেয়ে এসেছিস নাকি খাবি?
থাকলে দাও, পাঁচজন কিন্তু হবে?
এরই মধ্যে ললিতাবালা জেগে উঠেন, নাতনিতে জিগ্যেস করেন, দিদিভাই, তোদের ক্যাম্পে আর নতুন কেউ মরেনি তো?
সহকর্মীদের থাকবার ব্যবস্থা করতে করতে সুনন্দা উত্তর দেয়, আমরা চঁচুড়া-কল্যাণীর দিকে ছিলাম দিদিমা, হয়তো মরেনি, মরলেও সঠিক বলতে পারবো না। প্রতিদিনই তো মারা যাচ্ছে, বিশেষ করে শিশু ও অসুস্থরা।
একটু বাদেই বাড়ির সামনে জিপের স্টার্ট দেয়ার শব্দ পাওয়া গেল। বিদায় নিয়ে নবনীতা ও অম্লান চক্রবর্তী বাড়ি থেকে বেরুলো, বললো, আগে অম্লানকে নামাবো, তারপর আমি। কাল আবার দেখা হবে।
আরতিবালা মেয়েকে বললেন, জয়বাংলার ছেলেগুলো তো চলে যাচ্ছে, আটকা ওদের, ছেলেগুলো কিছু মুখে দিয়ে যাক।
কিন্তু গাড়ি ছেড়ে দিল। সুনন্দা ওদের আটকাতে চেষ্টা করে না, গাড়িটা কয়েক মুহূর্তেই দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যায়।
এদিকে সন্ধ্যা রাতেই বাড়িতে তিন বছরের একটা শিশু বমি ও পায়খানা করতে থাকলে টুটকা ওষুধ দিয়ে তাকে সারাবার চেষ্টা করা হয়েছে। অবস্থা খারাপের দিক গেলে যতটা দ্রুত সম্ভব তাকে জাদবপুরের এক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শিশুটার আত্মীয়স্বজন ফিরে আসে ঘণ্টা তিনেক পর, মা-বাবা থেকেই যায়, ওকে বাঁচানো যায়নি।
সুনন্দা খবরটা জানে না। দিদিমাকে বলে, বাড়ির লোকজনের খবর ভালো তো?
ওই যে ফরিদপুরের পরিবারটা একটা বাচ্চা নিয়ে এসেছিল, অ তুই তো আনলি, সে হাসপাতালে আছে।
আগে বলোনি কেন, গাড়ি ছিল, দেখে আসতাম?
আর গিয়ে লাভ নেই, ভগবান ওকে তুলে নিয়েছেন। ওর বাপ-মা এখনো হাসপাতালেই আছে।
সীমান্ত লাগোয়া রিফ্যুজি ক্যাম্পগুলিতে শিশুমৃত্যুর ঘটনা প্রায় প্রতিদিনই পত্রিকার খবর তৈরি করে চলেছে। এ মৃত্যুর কোনো হিসেব নেই, পরিসংখ্যান নেই। পাঁচজনের যে পরিবারটি তিন শিশু আর মা-বাবা মিলে লাইনে দাঁড়িয়ে এই সেদিনও রেশন নিয়েছে, সুনন্দা জানে, সপ্তাহ যেতে না যেতেই সে পরিবারের সংখ্যা তিনে দাঁড়িয়েছে। অতএব দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া তার করার কিছু থাকে না। ভাবে, সকাল হলেই হাসপাতালটায় যাবে, লাশ দাফনের ব্যবস্থা নেবে।

এদিকে দক্ষিণ কলকাতা থেকে ফিরতে ফিরতেই আরও আধা ঘণ্টা পেরিয়ে যায়। আকাশের তারাগুলো আগের চাইতেও জ্বলজ্বলে হয়েছে। জয়বাংলার গাড়িটা দ্রুত সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। নবনীতা বলে, কি বলেন, আগে অম্লানকে পৌঁছে দেই, তারপর দেখা যাবে।
কেন আপনি? গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে আবু রায়হান। চালাতে চালাতেই সে ব্রেক চাপে, বলে, কেন দিদি, আপনি নামবেন না?
নামবো, সবার নামার পরে।
আরও আধা ঘণ্টা পর জয়বাংলার গাড়িতে মোট চারজন যাত্রী। স্টিয়ারিং বসা আবু রায়হান, পাশের আসনে ঘুমের মধ্যে নৃপেন বসাক, পেছনে কল্লোল হাসান ও নবনীতা দেবসেন। গাড়ি চালাতে চালাতেই সামান্য রসিকতা করে বসে আবু রায়হান। কি ভেবে সে একটি নতুন প্রসঙ্গের অবতারণা করে। বলে দিদি, এই যে আমরা, এপার-ওপারের আমরা, এক ভাষায় কথা বলি, এক সংস্কৃতি লালন করি, সাতচল্লিশের সীমানা ডিঙিয়ে একাত্তরের রক্ত মেখে দাঁড়িয়ে আছি রবীন্দ্র-নজরুলের ছায়াতলে, এই কলকাতা শহরে, আমাদের কী সৌভাগ্য তাই না?
সৌভাগ্য তো বটেই, তোমরা জন্মভ‚মির স্বাধীনতার যুদ্ধে শরিক হতে পেরেছো।
কেন, এ যুদ্ধ তো আপনারও দিদি?
ঠিক তোমাদের মতো নয়। তোমরা জীবন দিচ্ছো, অকাতরে জীবন দিচ্ছো, আমরা তোমাদের পাশে দাঁড়াবার চেষ্টা করছি মাত্র।
চোখ বুজে নীরবে শুনে যাচ্ছিল কল্লোল, হয়তো শুনছিল না। নবনীতা চাইছিল ও ক্লান্ত, একটু ঘুমোক, না জেগে উঠুক। কিন্তু সে ঘুমায়নি, গাড়ির আসনে দেহ ঠেকিয়ে কল্লোল হাতের আঙুল দিয়ে মাথার চুল টানছিল।
হঠাৎ গাড়িটা দাঁড় করায় আবু রায়হান। অনেকক্ষণ ধরেই সে কল্লোলের নীরবতায় ভয় পাচ্ছিল, অসুস্থ হলো কি! এরই মধ্যে ড্রাইভারের সিট থেকে হাত বাড়িয়ে কল্লোলের মাথায় আঙুল ছোঁয়ায় রায়হান। সাথে সাথে বলে ওঠে, এ কি ওস্তাদ, আপনার গায়ে তো জ্বর!
জ্বরটর কিছু না রে, থামলি কেন, চালা। চল আগে এই ম্যাডামকে নামিয়ে দেই? তারপর দেখা যাবে।
অস্বীকার করলেও পরিস্থিতি অন্যরকম মনে হলো। আবু রায়হান নবনীতাকে চোখের ভাষায় সংকটটা বোঝালো। সারাদিনের গাড়ি চালানো। এর মধ্যে বৃষ্টিতে ভিজেছে। পাশাপাশি বসেও নবনীতা এতক্ষণ ওর শরীর ছুঁয়ে দেখেনি। তবে লক্ষ করেছে মাথাটা বারবার হেলান দিচ্ছে কল্লোল, শরীরটা ধরে রাখতে পারছে না।
আপনি ভাববেন না ম্যাডাম, জ্বরটর কিছু নয়, এই একটু গরম হয়েছে আর কি। কিন্তু কল্লোলের অস্বীকার কোনো কাজে লাগে না। নবনীতার হাত ওর মাথা ও চুল ছুঁয়ে যেতে থাকে। জ্বরটা একেবারে কম নয়। ওর পা থেকে মিলিটারি বুটগুলা খুলে দেয়। মুক্তি বাহিনীর সদস্যরা প্রায় প্রত্যেকেই ও রকম জুতো পেয়েছে। নবনীতা দেখে বুটদুটো ভেজা। সারাদিন খোলা হয়নি। এরপর পাশের একটা কলতলা দেকে দাঁড়িয়ে পড়ে গাড়িটা। নিজের শাড়ির আঁচল ভিজিয়ে নবনীতা অসুস্থ কল্লোলের চোখমুখ মুছে দিতে থাকে।
আর কোনো কথা নয়, গা পুড়ে যাচ্ছে, আপনি আমার পায়ে মাথা রেখে পা সোজা করে শুয়ে পড়–ন। রায়হান জল এনে দিক, আমি গা মুছে দিচ্ছি।
হঠাৎই অদ্ভুত এক অনুভ‚তিতে জড়িয়ে পড়ে কল্লোল। শান্ত শিশুর মতো পা দুটো সোজা করে নবনীতার কোলে মাথা ছেড়ে দেয়। গাড়ির বনেট খুলে আবু রায়হান একটা পাত্র বের করে কলতলা থেকে বেশি করে পানি আনতে। সেই পানিতে আঁচল ভিজিয়ে অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধাকে সারিয়ে তোলার চেষ্টা করে চলে নবনীতা দেবসেন।
আরও আধ ঘণ্টা খানেক বাদে কলকাতার কয়েকটি মসজিদ থেকে ভোরের আজান কানে আসে। কল্লোল কিছুটা সুস্থ বোধ করতে থাকে তখন। বলে, ম্যাডাম, একটু জল খাওয়াবেন?
পানির বোতল এগিয়ে দেয় দলের কনিষ্ঠ নৃপেন বসাক, ঘুমিয়ে পড়ায় এতক্ষণ সে বেশিকিছু জানতে পারেনি। বোতলটা কল্লোলের মুখে ধরে নবনীতা বলে, ভাগ্যিস রায়হান আপনার মাথায় হাত দিয়েছিল, নয়তো বোঝাই যেতো না এতটা জ্বর আপনার শরীরে!
কলকাতার স্ট্রিটলাইটগুলো তখনো জ্বলে আছে। কদাচিৎ কিছু গাড়ি এদিক-সেদিক হেডলাইট জ্বালিয়ে চলে যাচ্ছে। আরও দেখা গেল পাশের ফোর্ট উইলিয়াম থেকে বেরিয়ে কয়েকটা সামরিক জিপ ও ট্রাক দ্রুত বেগে সীমানার বাইরে চলে গেল।
নৃপেন ও আবু রায়হান ভোরের কলকাতার দৃশ্য দেখতে থাকে। এক পা দু পা করে ওরা দুজন গাড়ি থেকে সামান্য সামনে এগিয়ে যায়। সামনেই গড়ে মাঠ, কলকাতার সুবিশাল ময়দান। চারদিকে বড় বড় গাছ। ওদের গায়ে ভোরের কলকাতার বাতাস লাগে। এর আগে কেউই ওরা কলকাতা দেখেনি। দেখেনি পার্ক সার্কাস, বালিগঞ্জ, দক্ষিণ কলকাতার দেবনাথ পরিবারের সুনন্দাকে, দিদিমা ললিতাবালাকে, আরতি মাসিমাকে, এমন কি নবনীতা দেবসেনকে।
আরও খানিকটা এগিয়ে ঘাসের মধ্যে বসে পড়ে নৃপেন ও আবু রায়হান। রাতের শিশিরে ভেজা ঘাস, অনেকদিন কাটছাঁট হয়নি। বসতেই পেন্টের একটা অংশ ভিজে যায়। তবু ওরা বসে থাকে।
নৃপেন বলে, রায়হান দাদা, কিছু কি ভাবছো?
তেমন কিছু না। তুই?
দাদা, আমি ভাবছি, বরিশালের আগৈলঝরায় মা-বাবা, বোনরা কেমন আছে, খবরটাও তো জানা হলো না। কতদিন হয়ে গেল! বর্বর সেনারা তো সারাদেশেই খুনখারাপি করছে। কে জানে কি হয়েছে!
ভাগ্যে থাকলে দেখা হবে। আমারও তো তোর মতোই অবস্থা নৃপেন। কারও খোঁজ নেই। কেউই জানে না আমি কোথায়। একবার মনে হয় মাকে যদি একটা খবর পৌঁছে দিতে পারতাম, ভালো আছি আমি।
আবু রায়হানের কথা শেষ হতেই সে লক্ষ করে নৃপেন বসাক ময়দানের ভেজা ঘাসে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে হাত পা ছড়িয়ে দিয়েছে। ওরও ইচ্ছে হলো শুয়ে পড়তে। খোলা গলায় হঠাৎ গান ধরে নৃপেন, ‘মাগো ভাবনা কেন আমরা তোমার শান্তিপ্রিয় শান্ত ছেলে, তবু শত্রু এলে অস্ত্র হাতে ধরতে জানি, তোমার ভয় নেই মা আমরা, প্রতিবাদ করতে জানি।’
একটু বাদে রায়হানও কণ্ঠ মেলায় নৃপেনের সাথে। নবনীতার কোলে এতক্ষণে কল্লোল যেন ঘুমিয়েই পড়েছিল। কিন্তু ভোরের ময়দানের মৃদুমন্দ বাতাস সে গানকে কল্লোলের কানে পৌঁছে দেয়।
দেখা যায়, নবনীতার কাঁধে হাত রেখে কল্লোল হাসান এগিয়ে আসছে। কাছে গিয়ে বলে, তোরা দুজন এত নিষ্ঠুর কেন রে?
মানে! বিস্মিত হয় সহযোদ্ধারা।
পেছনেই তাদের ওস্তাদ ও কলকাতার নবনীতা দেবসেন।

সাত.
দীপক কুমার ঘোষ যখন জেলা প্রশাসক হয়ে নদীয়ায় এলেন তখন পরিস্থিতি ঘোরতর। তখনো ঘরবাড়ি ফেলে প্রতিদিন ওপার থেকে এপারে আসছে মানুষ। ঢুকছে কুচবিহার, শিলিগুড়ি, মালদা, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর, মুর্শিদাবাদ, চব্বিশ পরগনা, বনগাঁ, নদীয়া, বাগদা সব এলাকা দিয়ে। মানুষ আসছে পায়ে হেঁটে। গাড়ি চলাচল নেই। ট্রেন চলাচল বন্ধ। অনেকে আসছে দশ-বারোদিন পনেরোদিন পায়ে হেঁটে। কেউ আসছে পরিবারের সঙ্গে, কেউ অর্ধেক পরিবার নিয়ে। শরণার্থীদের আসাটা যখন বাড়তে শুরু করল পাকিস্তান সরকার তখন সীমান্ত বন্ধ করলো। তখন রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে আসা ছাড়া উপায় থাকলো না।
জয়বাংলার জিপটা নিয়ে সেদিন ওরা কল্যাণী কয়েকটি ক্যাম্প ঘুরে দেখে। ঠাসা উদ্বাস্তু মানুষ। এর বাইরে কিছু জানা সম্ভব হয়নি ওদের। নদীয়া জেলার মূল লোকসংখ্যা ১৮ লক্ষ। নভেম্বরে সেই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াল ২২ লক্ষ। ঘরবাড়ি ছেড়ে আসা মানুষেরা ক্রমশ স্থানীয় মানুষের সংখ্যা ছাপিয়ে যেতে লাগল। কল্যাণীতে ক্যাম্প তৈরি হলো বাইশ। কৃষ্ণনগর থেকে কল্যাণী পর্যন্ত ৫০ কি.মি.। ৪০,০০০ মানুষ দিনে পাড়ি দিচ্ছে বর্ডার। প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ বার্ডার। করিমপুর উত্তর থেকে হরিণঘাটা দক্ষিণ পর্যন্ত। দুটো নদী। সব নদীই আবার পারাপার যোগ্য। অতএব পালিয়ে আসা বন্ধ হলো না।
দীপক কুমার ঘোষ জানালেন, এমন অনেক পরিবার আসছে যাদের পুরুষদের মেরে ফেলা হয়েছে, শুধু মহিলারা, বাকিরা বিচ্ছিন্ন শিশু। এসব শিশুকে দেখাশোনা করতে থাকেন মৈত্রেয়ী দেবী ও তাঁর খেলাঘর।
পলাশীতে তৈরি হয়েছে জলযোদ্ধাদের ট্রেনিং ক্যাম্প। জায়গাটা ঠিক হয়েছে ১৯৫৭ সালের সেই ‘ওয়ার মেমোরিয়াল’টার পাশের নদীতে। ক্যাম্প দেখাশুনা করেন একজন ভাইস অ্যাডমিরাল। সাউথ ইন্ডিয়ান।
কৃষ্ণনগরের বেশিরভাগ পুরনো বাড়িগুলো ব্রিটিশ নীলকর সাহেবদের। সার্কিট হাউসটা এককালে ছিল মেদিনীপুর জমিদারি স্টেটের বাড়ি। এর পাশ দিয়েই ছিল জলঙ্গী নদী। কোনো রাস্তাঘাট নেই, তারপরও ৪টা নীলকর সাহেবের বাড়ি। প্রথমে কৃষ্ণনগর সার্কিট হাউসে একটা অফিস খোলা হলো। যদিও বেশিরভাগ সময় কলকাতাতেই থাকতেন, যুদ্ধকালীন বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, মনসুর আলী ও কামরুজ্জামান মাঝেমধ্যেই কৃষ্ণনগরে রাত কাটাতেন। অবশ্য নিরাপত্তার কারণে তা বাইরের লোকদের কাছে একেবারে অজ্ঞাত।
নভেম্বরের দিকে যুদ্ধ পরিস্থিতি পাকিস্তানের আয়ত্তের বাইরে যেতে থাকে। সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোর বেশিরভাগ মুক্তি বাহিনী করায়ত্ব করে ফেলে। আগস্টে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে ভারতের মৈত্রী চুক্তি সই হওয়ায় পাকিস্তানের বন্ধু যুক্তরাষ্ট্র ও চীন রীতিমতো সংকটে পড়ে। বাংলাদেশের পাশে ইন্দিরা গান্ধী ও তাঁর ভারত আর একা নয়। যে কোনো আগ্রাসন প্রতিরোধ করতে মস্কো দিল্লির পাশে দাঁড়াবে। অতএব কয়েক মাসের একপেশে বিশ্ব পরিস্থিতি পাল্টে যেতে থাকে। ইন্দিরা গান্ধী পূর্ণগতিতে তাঁর আন্তর্জাতিক ক‚টনৈতিক যুদ্ধ শুরু করলেন। পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো পাকিস্তানের গণহত্যা ও হিং¯্র আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হলো। পশ্চিমা বড় গণমাধ্যমগুলো এরই মধ্যে আরও ইতিবাচক কারণ ঘটালো। তারা বাংলাদেশের গণহত্যা ও মুক্তি বাহিনীর সাফল্য কাহিনী ছাপাতে থাকলো। প্যারিস থেকে আঁদ্রে মালরো কলকাতায় ছুটে এলেন। বাংলাদেশের সমর্থণে আন্তর্জাতিক ব্রিগেড গঠনের প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন। লন্ডন থেকে কলকাতায় ছুটে এলেন ব্রিটিশ পার্লামেন্টের প্রভাবশালী নেতা জন স্টোনসাউস।
শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী বার কয়েক পশ্চিমবঙ্গের শরণার্থী শিবিরগুলো ঘুরে যান এরই মধ্যে। গোটা পশ্চিমবঙ্গ যেন একটা উদ্বাস্তু শিবির। মাতৃসুলভ আচরণ শ্রীমতি গান্ধীর; রিফ্যুজি ক্যাম্প ঘুরে বেড়াচ্ছেন, কাদার মধ্যে খালি পায়ে ঘুরছেন, বৃষ্টি পড়ছে, ক্যাম্পে পা কাদায় ডুবে গেছে, ছাতা সরিয়ে দিচ্ছেন, বলছেন আমার দরকার নেই। ছোট ছোট বাচ্চাদের সাথে কথা বলছেন বাংলায়, কেমন আছো খেয়েছো? কি খেলে? খিচুরি খেতে ভালো লাগে না তাই না? এর মধ্যেও সরকার বিরোধীদের সমালোচনা থেমে নেই যদিও তা প্রশংসার তুলনায় যৎকিঞ্চিৎ। এমন কি জনসংঘ নেতা অটল বিহারী বাজপেয়ী পর্যন্ত ইন্দিরাকে বাংলাদেশ প্রশ্নে ‘মা দুর্গার’ প্রতিরূপ বলে অভিহিত করলেন।
নভেম্বরের শেষে কলকাতার সাংবাদিকরা মুক্ত অঞ্চলগুলি ঘুরে সচিত্র প্রতিবেদন ছাপতে থাকে। কেউ যায় গেদে-দর্শনা হয়ে চুয়াডাঙ্গা, কেউ আবার চুয়াডাঙ্গা থেকে ঈশ্বরদী। হিলি-পশ্চিম দিনাজপুর হয়ে রাজশাহী-নওগাঁ যাওয়াটাও খুব একটা ঝামেলার হয় না। এরই মধ্যে কেউ কেউ আবার পাবনা পর্যন্ত ঘুরে আসে। বোঝা যায় পাকিস্তান রাষ্ট্র পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে, সময়ের অপেক্ষা মাত্র।
ক’দিন আগেই বর্ষকাল গেছে। বন্যাও বেশ হয়েছে। নদীয়ার শরণার্থী ক্যাম্প ঘুরতে ঘুরতেই একজন রিপোর্টার ইন্দিরাকে প্রশ্ন করলেন: ম্যাডাম, আপনি কি মনে করেন বাংলাদেশের যুদ্ধ পরিস্থিতি অভীষ্ট লক্ষ্যেই এগুচ্ছে? মুচকি হাসলেন প্রিয়দর্শনী, উত্তর দিলেন, নিশ্চয়ই, আমি আশাবাদী। তারপরও বলি বাংলাদেশ প্রশ্নে ভারত যে রাজনৈতিক মীমাংসা দাবি করেছে, সেটা হচ্ছে বঙ্গবন্ধু মুজিবুর রহমান ও তাঁর আওয়ামী লীগ সহকর্মীদের সঙ্গে চুক্তি, যারা নির্বাচনে জয়যুক্ত হয়েছেন, তারা কী চান সেটাই বড় কথা।
যুগান্তর, আনন্দবাজার, বসুমতি ও অমৃতবাজারের প্রথম পাতায় ইন্দিরার কথাগুলো বড় বড় করে ছাপা হচ্ছে : অস্বীকারের উপায় নেই অগণিত শরণার্থী চলে আসায় ভারতের ওপর এক প্রচণ্ড বোঝা চেপেছে। এত অল্প সময়ে এত ব্যাপক আকারে বিশ্বের কোনো দেশকেই শরণার্থী বোঝা বইতে হয়নি। তবে এ সমস্যা কেবল ভারতের নয় সারা বিশ্বের।
ঠিক এ সময়েই পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা ঘুরে গেলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জগজীবন রাম। তিনি সুস্পষ্ট বললেন, বাংলাদেশের জনগণের ওপর যে অমানুষিক অত্যাচার চলেছে তা যদি অব্যাহত থাকে তা হলে ভারত কেবল দর্শক হয়ে থাকবে না। জানালেন, শরণার্থীরা যাতে স্বল্পতম সময়ে দেশে ফিরতে পারেন ভারত সে ব্যবস্থা করবে। তবে ফিরে যাওয়ার উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি না হলে শরণার্থীদের কিছুতেই ফেরত পাঠানো হবে না। প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, এটা অত্যন্ত দুঃখজনক যে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের অস্ত্র বাংলাদেশের নিরস্ত্র মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। এটিও বললেন, মুক্তি বাহিনী যেভাবে জীবনপণ লড়াই করছেন তা অকুণ্ঠ প্রশংসার দাবিদার।
কলকাতা তখন অনেকটাই সুস্থির। সুধী সমাজ তখনো রাজ্যজুড়ে সভা-সমাবেশ করে চলেছেন। সাম্প্রদায়িক ঐক্য যেন কিছুতেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। এমনি এক সমাবেশে অধ্যাপক শান্তিময় রায় বললেন, দেখুন, বাংলাদেশ যুদ্ধ একটা ‘ইডিওলজিক্যাল এফিনিটি’ তৈরি করেছে, একটা গণতান্ত্রিক চেতনা, ধর্মনিরপেক্ষ ‘আউটলুক’ তৈরি করেছে। মানুষ হিসেবে, বাঙালি হিসেবে, ভারতবাসী হিসেবে আমরা সেটাই চাই। আবারও ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষ মানুষ হতে শিখুক এর চাইতে বড় প্রাপ্তি আর কি হতে পারে?
প্রণবেশ সেন ও দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় আকাশবাণীর সংবাদ পরিক্রমা অনুষ্ঠানের কল্যাণে ব্যাপক পরিচিত হয়ে উঠেছেন। প্রণবেশ লিখতেন আর দেবদুলাল তাঁর মাধুর্যমণণ্ডিত কণ্ঠে সেই স্ক্রিপ্ট পড়তেন। সেই প্রণবেশ আড্ডা দিতে দিতে বললেন, দেখুন, এই ‘পাবলিক এফিনিটি’র ব্যাপারটা কেবল সরকার করেনি। ভারতবর্ষে সরকারি ও পাবলিক, প্রায়ই দেখা গেছে, দুই পথে চলে। কিন্তু এই একটি ক্ষেত্রে সরকারি নীতি এবং পাবলিক দুটোই এক বিন্দুতে। সে ক্ষেত্র হচ্ছে বাংলাদেশ। প্রণবেশ সেন আরও বললেন, সাতচল্লিশের দেশ ভাগ পশ্চিমবঙ্গের ‘ন্যাচারালি ইকোনোমি’তে একটা প্রচণ্ড ঘা দিয়েছে। অনেকের অনেক রকম অসুবিধা হয়েছে। বর্ডার রিজনের মানুষের ক্যারেক্টারগুলো ‘কমপ্লিটলি স্যাটার্ড’ হয়েছে। ‘ক্রিমিনাল ব্যাশ’ও তৈরি হয়ে গেছে কিছুটা। কিন্তু তার মধ্যেও একটা প্রচণ্ড ‘পজিটিভ’ ব্যাপার হয়েছে পূর্ববঙ্গের বাংলা ভাষা আন্দোলন। যে মানুষ এই মাত্র কয়েক বছর আগে হিন্দু ও মুসলমানে ভাগ হয়ে দেশটাকেই ভাগ করে দিল, বাঙালি হয়ে বাঙালি খুন করলো, সেই মানুষই, যদি ‘কারেক্ট এসেসমেন্ট’ করা যায়, দেখবেন, ভাষা জাতীয়তার জন্যে, বাংলা সংস্কৃতির জন্যে প্রাণপাত করতে ঝাঁপিয়ে পড়লো। আর তারপর এল একাত্তরের মহা মিলনযজ্ঞ।
স্বাধীন গুহ নিবেদিতপ্রাণ কমিউনিস্ট, বাংলাদেশ সহায়ক সমিতির অন্যতম বড় নেতা। মুজিবনগর সরকারের অনেকের সাথেই তাঁর প্রাত্যহিক যোগাযোগ। বললেন, বিশ্বাস করুন, মুক্তিযোদ্ধাদের ‘পলিটিক্যাল মোটিভেশন’ এর দিকে যতটা গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল তা হচ্ছে না। সে কারণেই আমরা ইতিহাসের ক্লাস নেওয়ার ব্যবস্থা করেছি। ইতিহাস পড়াচ্ছেন অধ্যাপক গৌতম চট্টোপাধ্যায়। বাংলাদেশের একটা পরিবার যারা বিদ্যাসাগর এবং রবীন্দ্রনাথ দুদিক থেকেই তাদের পূর্বপুরুষের সঙ্গে যুক্ত, অর্থাৎ মা সুরেন ঠাকুরের সঙ্গে, বাবা বিদ্যাসাগরের নাতি, ইতিহাস পড়ান। ভূগোল পড়ান অধ্যাপক সুনীল মুনসী। কিন্তু আক্ষেপের ব্যাপার যে, ভুল বোঝাবুঝির কারণে ‘মোটিভেশন’ ঠিকমতো চলতে পারলো না।
‘ভুল বোঝাবুঝি, কেন?’ স্বাধীন গুহ বললেন, আর বলবেন না, কেউ কেউ ভাবলো আমরা কমিউনিজম প্রচার করছি! আসলে তা নয়। ‘পলিটিক্যাল মোটিভেশন’ না থাকলে একটা ‘হাফ হার্টেড ওয়ার’ হবে, ‘কমপ্লিট ওয়ার’ হবে না, যা বেশি দরকার।
বাংলাদেশ যুদ্ধে কমিউনিস্ট বিভাজনের টানাপড়েনের মধ্যেও পশ্চিমবঙ্গে একটা দৃঢ় ঐক্য দেখা যায়। কংগ্রেস তো রয়েছেই, সিপিআই, সিপিএম ও ফরওয়ার্ড ব্লকও এক সাথে চলে। এমন কি প্রথমদিকে তীর্যক দৃষ্টিতে তাকালেও নকশালিরাও সহযোগিতার হাত বাড়ায়। এরপরও সবাই সবকিছু মেনে চলতে পারে না। মালদার কংগ্রেস নেতা গনি খান চৌধুরী হেসে হেসে বললেন, তা দাদা যেটাই বলুন, যুদ্ধটা আমাদের না বাংলাদেশের। ‘পলিটিক্যাল মোটিভেশন’ না থাকলে কোনো মানুষ এভাবে প্রায় খালি হাতে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে নাকি? গেল বছরের ভোটে কি ঘটলো দেখলেন না, ওরা পাকিস্তানপন্থিদের ধরাশায়ী করে দিল! এসব কি ‘পলিটিকাল মোটিভেশন’ ছাড়া হয়?
সপ্তাহ কয়েক ধরেই প্রচার হচ্ছে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল প্রীতি ম্যাচ খেলবে মোহন বাগান গ্রাউন্ডে। দিনক্ষণ ঠিক হয়ে যেদিন খেলা শুরু হবে সেদিন প্রচণ্ড বৃষ্টি এল। ত্র্রাণমন্ত্রী এ এইচ এম কামরুজ্জামানসহ মুজিবনগর সরকারের অনেকেই ম্যাচ দেখতে উপস্থিত। তাঁদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা থাকলেও মাঠে কোনো বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেই। সেই সুযোগে মুক্তি বাহিনীর সদস্যরা অনেকেই অস্ত্র লুকিয়ে খেলা দেখতে এল। অঝোর ধারায় বৃষ্টি। এ যেন প্রকৃতির পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ, আশীর্বাদ। মাঠ কর্দমাক্ত। এরই মধ্যে হাজারো কলকাতাবাসীর চোখের সামনে স্বাধীন বাংলার ১১ জন খেলোয়াড় তিন রঙা জাতীয় পতাকা উড়িয়ে মাঠে নামলো। সারা মাঠ ঘুরতে থাকলো ওরা। গ্যালারি থেকে জয়বাংলার স্লোগান উঠলো। দেখা গেল বেশিরভাগ মানুষ কাঁদছে। অভ‚তপূর্ব এক দৃশ্য।
খেলা শেষ হতেই অম্লান চক্রবর্তী লক্ষ করলো সামান্য দূর দিয়ে দ্রুত মাঠ ত্যাগ করছে কল্লোল ও আবু রায়হান। বন্ধুদের নিয়ে ওরাও খেলা দেখতে গেছে। অম্লান জোরে চেঁচিয়ে ওঠে দাদা ও দাদা, কল্লোল দাদা, এই যে আমরা? থামুন। অম্লানের ডাক শুনে সুনন্দা ও নবনীতা ঘাড় ফিরে তাকায়। আরে ওরাই তো!
কল্লোল তোমাদের সাথে দেখা হবে ভাবিনি তো ভালো আছো সবাই?
কল্লোলের কথা শেষ হতেই নবনীতা বলে, জানি, বারবার তুমি জ্বর বাধাবে না, কাছে থেকে দেখতেও পাবে না। তবে ধারণা ছিল যাবে কোথায়? বন্ধুদের না দেখে কি ফিরতে পারবে? আজ না হোক কোনো এক দিন। হারিয়ে যেতে দিলে তো?
যদি হারিয়েই যাই তো যুদ্ধের মাঠেই হারাবো নবনীতা, কলকাতার ভিড়ে নেয়। কিন্তু হারাবার জন্যে কি অস্ত্র হাতে তুলেছি? বলেই কাপড়ে পেঁচানো স্টেনগানটার একটা অংশ দেখায় কল্লোল। কী ভয়ঙ্কর দৃশ্য, চারদিকে গিজগিজ করছে মানুষ, কে কখন দেখে ফেলবে! নবনীতা দ্রুত এগিয়ে গিয়ে অস্ত্রটা কাপড় দিয়ে ঢেকে দেয়, যাতে বেশি লোকের চোখ না পড়ে।
সুনন্দা নমস্কার জানিয়ে বলে, দিদিমা, মা-বাবা আপনাদের একবার বাড়ি যেতে বলেছেন। জানি ব্যস্ততা অনেক, তবু সম্ভব হলে যাবেন একবার।
আবু রায়হান হেসে বলে, ওস্তাদের কত কাজ, ও না যেতে পারলে আমি তো যাবোই দিদি। হয়তো কলকাতায় আমাদের দিন শেষ হয়ে আসছে। হঠাৎ করেই কল্লোলের মনটা খারাপ হয়ে ওঠে। বলে, মা-মাসিমা-বাবা সবাইকে বলবেন আমরা ভালো আছি। আরও বলবেন ওই আমাদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট নৃপেন, সে নেই, হারিয়ে গেছে।
প্রচণ্ড আঘাতে মুষড়ে পড়ে সবাই। কীসব বলছে রায়হান হারিয়ে গেছে মানে?
ও একা নয়, আরও কয়েকজন। খুলনার খালিশপুরে একটা গুরুত্বপূর্ণ অপারেশন ছিল। কাজটা শেষও করেছিল। ফেরার পথে একটা বাড়িতে আশ্রয় নিতে হয়ে। রাজাকাররা খবরটা পাকিস্তানি ক্যাম্পে পৌঁছে দেয়। বুঝতেই পারবে এরপর কি ঘটতে পারে। প্রচণ্ড গোলাগুলি হয়েছে। তিনজন তৎক্ষণাৎ মারা গেছে, দুজন আহত হয়ে ধরা পড়েছে। কেউ আর ফিরে আসেনি।

আট।
ডিসেম্বর ১, ১৯৭১।
ইন্দিরা গান্ধী এ দিন সরাসরি পাকিস্তান বাহিনীকে বাংলাদেশ ছাড়ার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করলেন। বললেন, বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তানি সেনার উপস্থিতি ভারতের নিরাপত্তার জন্যে হুমকি। তাঁর সাম্প্রতিক ইউরোপ-আমেরিকা সফরের বিষয়ে রাজ্যসভায় তিন ঘণ্টাব্যাপী বিতর্কের উত্তর দিতে গিয়ে ভারত নেত্রী বললেন, ভারত যথেষ্ট সংযম দেখিয়েছে, আর নয়। আমরা আমাদের প্রতিবেশীদের নিশ্চিহ্ন হতে দিতে পারি না। বাংলাদেশের সকল নিরস্ত্র মানুষকে ধ্বংস করা হবে এটা আমাদের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থি।
৩ ডিসেম্বর। কলকাতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসেছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। ঠিক তখনই খবর এল : পাকিস্তান ভারত আক্রমণ করেছে। পাঞ্জাব, হরিয়ানা, আগ্রাসহ সব জায়গায়। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন ইন্দিরা গান্ধী। চিফ সেক্রেটারি নির্মল সেন গুপ্ত একটা টেলেক্স হতে দাঁড়িয়ে আছেন। টেলেক্সটা হাতে নিয়ে গম্ভীরভাবে চোখ বুলালেন তিনি। সভা আর অগ্রসর হলো না। সেখান থেকেই এয়ারপোর্টে চললেন। এয়ারপোর্টে সাংবাদিকরা তাঁকে প্রশ্ন করলেন আপনি তো কিছুই বললেন না, পাকিস্তান ভারত অ্যাটাক করেছে।
এরাব সব Give me three hours time and wait for the Radio announcement বলেই ঘট ঘট করে প্লেনে উঠে গেলেন। রাতেই রেডিও ঘোষণায় পাকিস্তানের আক্রমণ রোধে সর্বাত্মকভাবে ভারতকে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দিলেন ভারত নেত্রী। ভারত ভূখণ্ডে পাকিস্তানের আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা জানালো বাংলাদেশ সরকার। রাতারাতি গড়ে উঠলো দুই রাষ্ট্রের যৌথ সামরিক কমান্ড। শুরু হলো মুক্তি ও মিত্রবাহিনীর যৌথ অভিযান।
৪ ডিসেম্বর এক বিবৃতিতে ইন্দিরা গান্ধী ঘোষণা করলেন : Today, the war in BanglaDesh has become a war on India…. We have no other option but to put our country on a war footing .
পরিবর্তনগুলো এতোই দ্রুত ঘটে যাচ্ছে যে সুনন্দাদের বাড়ির লোকজন খেই হারিয়ে ফেলছে। আকাশবাণী খোলা আছে দিনরাতে। মাঝেমধ্যে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র খুলেও কলকাতার মানুষ। মায়ের কাছ থেকে রেডিওটা নিয়ে শুভেন্দু হালদার নিজেই ভলিউম বাড়িয়ে রাখলেন, যাতে ভালোভাবে শোনা যায়।
দক্ষিণ কলকাতার বাড়িটা ফাঁকা হয়ে গেছে। বাংলাদেশের রিফ্যুজিরা একের পর এক কলকাতাবাসীর ঘরবাড়ি ছাড়ছে। বাসে, ট্রাকে সবাই সীমান্তের দিকে ছুটছে। ঘরে ফেরার মিছিল। সবাই বুঝে ফেলেছে ফিরে যাবার দিন এসে গেছে। এরই মধ্যে পলাশ অধিকারী, অম্লান চক্রবর্তী ও স্নেহলতা সুনন্দাদের বাড়ি এসে উপস্থিত। দিদি, কী করবো আমরা, কিছুই তো বুঝতে পারছিনে? অনেকটা আক্ষেপের সুরেই কথাটা বলে পলাশ। পাশের একটা চেয়ারে বসে ললিতাবালা জনাব দেন, তোরা সব আনন্দ-উল্লাস কর। এই তো তোরা চেয়েছিলি ? ভগবান করলেন তাই হতে যাচ্ছে।
নবনীতা দেবরায় কৃষ্ণনগরের একটি রিফ্যুজি ক্যাম্পে মৈয়ত্রী দেবীর খেলাঘর প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন। পিতামাতা হারা ভাগ্যহীন শিশুদের দেখাশোনা করেন। দলের আর সবার সাথে তার যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়েছে। সে দেখতে পায়, হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা অস্ত্র গোলাবারুদ কাঁধে করে ঢুকে যাচ্ছে দেশের মধ্যে। নবনীতা ভাবেন, আর কি ফিরবে ওরা? হয়তো কখনোই না। একবার মনে হচ্ছিল কল্লোলের সাথে আর একবার দেখা হবে, হবেই। এই অজস্র লোকবন্যার স্রোতে ভেসে ওপার বাংলার বন্ধুকে সে কী আর একবারও দেখতে পাবে?
মুক্তি ও মিত্র বাহিনীর যৌথ আক্রমণে সকল অঞ্চলে অবরুদ্ধ হতে থাকে হানাদার পাকিস্তান বাহিনী। যশোর পতনের মুখে। ফেনীর পতন ঘটেছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও লালমনিরহাট দখলের মুখে। রংপুর ও দিনাজপুর অঞ্চলে যৌথ বাহিনী এগিয়ে গেছে। খোদ ঢাকার অবস্থাও একই। ভারতীয় জঙ্গি বিমান ঢাকার কুর্মিটোলা বিমান ঘাঁটিতে বোমা রকেট ফেলে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছে। বাধা দিতে চেষ্টা করেও পিছু হটেছে পাকিস্তান।
৪ ডিসেম্বর।
ঢাকার বিমান লড়াইয়ের বিস্তারিত রিপোর্ট দেয় আনন্দবাজার। “— আজ সকালে ঢাকার আকাশে পাকিস্তানের এফ-৮৬ ও ভারতের মিগ জঙ্গি বিমানের সঙ্গে দারুণ লড়াই হয়। এর আগে দফায় দফায় ভারতীয় জঙ্গি বোমারু বিমান ঢাকার বিমানবন্দরে সামরিক সদর কার্যালয় এবং ঢাকার ও ঢাকার আশপাশে অন্যান্য লক্ষ্যবস্তুর উপরে বোমাবর্ষণ করে ও রকেট ছুড়ে মাড়ে। এসোসিয়েটেড প্রেসের সংবাদদাতা পিটার গুগলিন ইন্টারন্যাশনাল হোটেলের হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল) ছাদ থেকে এই বিমান লড়াই দেখেন। হোটেল থেকে বিমানবন্দরের দূরত্ব দুই মাইল।”
৬ ডিসেম্বর ১৯৭১।
বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করে ভারত ও তার দক্ষিণ এশীয় মিত্র ভুটান। এই আনুষ্ঠানিকতায় বিশ্ব মানচিত্রে নতুন রাষ্ট্রের অবস্থান সুদৃঢ় হয়। কলকাতার পত্রিকাগুলো বড় বড় অক্ষরে ভারতের ঐতিহাসিক স্বীকৃতির খবর প্রকাশ করে। পার্ক সার্কাস, রাইটার্স, প্রতিটি সরকারি- বেসরকারি অফিস-আদালত, কলকারখানা থেকে থেকে মানুষ বাইরে বেরিয়ে আসে। প্রতিটি চোখমুখ উজ্জ্বল, হাসিমাখা মুখ ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ওরা একে-অপরকে জড়িয়ে ধরে।
৯ ডিসেম্বর।
ভোরবেলায় পত্রিকা আসতেই সুনন্দা কুড়িয়ে নিয়ে ললিতাবালার কাছে গিয়ে পড়তে থাকে। বলে, দিদিমা শোনো, প্রতি রণাঙ্গনে পাকিস্তান বাহিনী পিছু হটছে। ‘বাংলাদেশে চতুর্দিক থেকে জওয়ানেরা আগুয়ান’। যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। আনন্দ বাজারের প্রতিবেদনে আরও ছাপে : ‘নিয়াজীর আরজি ‘যুদ্ধবিরতি চাই’/মানেক’শ : না, আত্মসমর্পণ/মেয়াদ আজ সকাল নয়টা, ততক্ষণ বোমাবর্ষণও বন্ধ।’
বিস্তারিত এ রকম : “ঢাকায় নিরুপায় পশ্চিম পাকিস্তানি সেনানায়ক নিয়াজী এখন নতজানু। রণসাধ তার মিটেছে। তাই এখন তিনি চান যুদ্ধবিরতি। তার এই আরজি ভারতের সেনানায়ক জেনারেল মানেক’শ সমীপে পাঠিয়ে দিয়েছেন দিল্লির মার্কিন দূতাবাসে। সঙ্গে সঙ্গে মিলেছে জেনারেলের উত্তর। তিনি বলেছেন, যুদ্ধবিরতি নয়, আত্মসমর্পণ করুন।”
গুরুতর পরিস্থিতিতে পাকিস্তান ইস্টার্ন কমান্ডের অধিনায়ক লে. জেনারেল এ এ কে নিয়াজী তার সরকারের কাছে আবেদন জানাতে থাকে চীন যেন অবিলম্বে ভারত ভূখণ্ডে আক্রমণ চালায়, তা না হলে পরাজয় ঠেকানো যাবে না। কিন্তু সিআইএ মার্কিন প্রেসিডেন্টকে অবহিত করেছে বাংলাদেশ প্রশ্নে চীন ভারত ভূমিতে আক্রমণ করবে না। এটি জানার পর ডিসেম্বরের ৯ তারিখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট শেষ চেষ্টা হিসেবে ‘ইউএসএস এন্টারপ্রাইজ’কে বঙ্গোপসাগরের দিকে যাত্রা করার সিদ্ধান্ত দেন, যাতে ভারত শত্রুপরিবেষ্টিত হয় এবং পাকিস্তানি সৈন্যরা নিরাপদে সরে আসতে পারে।
বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তান বাহিনী যখন পর্যুদস্ত, আত্মসমর্পণ ছাড়া যখন তাদের আর কিছুই করার নেই, ঠিক তখনই বঙ্গোপসাগরের দিকে আসতে থাকে মার্কিন সপ্তম নৌবহর। বেপরোয়া নিক্সন-কিসিঙ্গার। হেরে যাচ্ছে তারা ইন্দিরার কাছে। এই খবরে মুক্তি বাহিনীর অগ্রগামী দলগুলি বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। রাইফেলের ব্যারেল শূন্যে তুলে একের পর এক গুলি চালাতে থাকে। এক ভয়ঙ্কর ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ। এই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে কলকাতাসহ পশ্চিমবঙ্গের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। স্লোগান ওঠে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক।
কিন্তু মার্কিন শেষ কৌশলও অকার্যকর পরিণত হয়। বাংলাদেশ প্রশ্নে শ্রীমতি গান্ধীর যুক্তি, দৃঢ়তা এবং বিস্ময়কর আন্তর্জাতিক জনসংযোগের ফলে বিশ্ব জনমত তখন বাংলাদেশের পক্ষে আসে। এমন কি আমেরিকার মিত্ররাও সটকে পড়ে।
অবশ্য এই খবরটির সঙ্গে আরেকটি খবর আসে। কুড়িটি রুশ রণতরীও যাত্রা করেছে বঙ্গোপসাগরের পথে। অতএব ভয় নেই। নতুন দিল্লির কর্তৃপক্ষ মহল স্পষ্ট করে জানান, বাংলাদেশ থেকে দখলদার পশ্চিম পাকিস্তানি বাহিনীকে সরিয়ে নেওয়ার কোনোরকম ইখতিয়ার মার্কিন নৌবহরের নেই। কারণ পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে এখন ভারতীয় ও মুক্তিবাহিনীর যুদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রাষ্ট্রদূত সাংবাদিক সম্মেলন করে জানিয়ে দেন, পাকিস্তানের সৈন্য ও অসামরিক লোকজন সড়িয়ে দিতে বঙ্গোপসাগরের যদি মার্কিন নৌবহর ঢুকতে চায় তাহলে পরিস্থিতি বিপজ্জনক হয়ে উঠবে। এই কাজকে আমরা শত্রুতা বলে গণ্য করবো।
১২ ডিসেম্বর।
বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তান বাহিনী পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে। আমেরিকার অনুরোধে নিরাপত্তা পরিষেদে নতুন করে বৈঠক বসে। বৈঠকে যোগ দিয়ে জুলফিকার আলী ভুট্টো অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব কার্যকরের চেষ্টা চালান। কিন্তু তিনি ব্যর্থ হন। ক্রুদ্ধ ভুট্টো জাতিসংঘ বৈঠকে প্রকাশ্যে নিজের বক্তৃতাপত্রটি ছিঁড়ে ফেলে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন।
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১।
আনন্দ বাজার পত্রিকার খবর : “ঢাকায় নিরুপায় পশ্চিম পাকিস্তানি সেনানায়ক নিয়াজী এখন নতজানু। রণসাধ তার মিটেছে। তাই এখন তিনি চান যুদ্ধবিরতি। তার এই আরজি ভারতের সেনানায়ক জেনারেল মানেক’শ সমীপে পাঠিয়ে দিয়েছেন দিল্লির মার্কিন দূতাবাসে। সঙ্গে সঙ্গে মিলেছে জেনারেলের উত্তর। যুদ্ধবিরতি নয়, আত্মসমর্পণ করুন। জেনারেল মানেক’শ জানিয়েছেন, অবরুদ্ধ ঢাকার ওপর আজ বিকাল পাঁচটা থেকে আগামীকাল সন্ধ্যা নটা পর্যন্ত বিমানবাহিনীর আক্রমণ বন্ধ থাকবে। তবে স্থলবাহিনী এবং মুক্তিফৌজ যথারীতি কাজ চালিয়ে যাবে। মানেক’শর উত্তর যায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে। নিয়াজীর বার্তায় সই করেন পূর্ববাংলার পাকিস্তান বাহিনীর সামরিক গভর্নর মেজর জেনারেল ফরমান আলী। অবশ্যই ধারণা করা যায় নিয়াজীর ওই আরজিতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সমর্থন আছে।
১৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় বিশেষ খবর প্রচার করে আকাশবাণী। খবরটি প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে গোটা কলকাতা স্লোগান-চিৎকারে ভরে যায়। বেশিরভাগের মুখে ‘জয়বাংলা’, কেউ কেউ বলছেন ‘জিন্দাবাদ’। পত্রিকাগুলি পরদিন খবর ছাপে ‘পাকিস্তান নত সেই রমনা ময়দানেই’। লেখে : “সমস্ত পূর্ব রণাঙ্গন আজ স্তব্ধ। যৌথ বাহিনীর চৌদ্দদিনব্যাপী সংগ্রামের পর আজ স্তব্ধতা নেমে এসেছে বাংলাদেশের ইতস্তত বিক্ষিপ্ত গোমতী, কর্ণফুলী, বুড়িগঙ্গার পটভূমিতে পাকিস্তানি সামরিক ছাউনিগুলিতে। বুড়িগঙ্গার তীরে তখন সূর্য অস্ত যাচ্ছে। সেই রমনা ময়দানে পূর্ব বাংলার এক ইতিহাস শেষ হয়ে আর এক ইতিহাস শুরু হয়ে গেল। আগামী দিনের সূর্য অত্যাচারিত নিপীড়িত বাংলাদেশকে দেখবে না। দেখবে অত্যাচারীর শৃঙ্খলমুক্ত আরেক বাংলাদেশ। আজকের বিদায়ী সূর্য তাই জেনে গেল।”
একই দিন পত্রিকার আরও একটি খবর : “ সেই জেনারেল নিয়াজী আজ মুক্ত ঢাকায় হাজার হাজার মানুষের আকাশ ফাটানো জয় বাংলা ধ্বনির মধ্যে আত্মসমর্পণ করেছেন। কার্যত বাংলাদেশ দখলদার পাকবাহিনী আত্মসমর্পণ করে আজ যখন আমাদের জেনারেল জ্যাকব ঢাকায় পৌঁছান তখন দুপুর বেলা বারোটা। আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণ তখন ভারতীয় সময় বিকাল চারটা একত্রিশ মিনিটে। জেনারেল অরোরার কাছে জেনারেল নিয়াজী আত্ম, অস্ত্র ও ফৌজ সমর্পণ করেন। শত শত বাঙালি তাঁকে এবং ভারতীয় সেনা, বিমান ও নৌবাহিনীর উপস্থিত সব অফিসারদের জড়িয়ে ধরলেন। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে আমরা দেখলাম আনন্দে পাগল কিছু মানুষ জেনারেল অরোরাকে কাঁধে তুলে নিয়ে জয়ধ্বনি দিচ্ছে। পাক জেনারেল নিয়াজী এবং আমাদের জেনারেল জ্যাকবও বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন। সঙ্গে দুই বাহিনীর অন্যান্য বহু অফিসার। ডেমরা ও টঙ্গীর দিক থেকেও বহু ভারতীয় সৈন্য ঢুকছে।”
পার্ক সার্কাস, থিটেয়ার রোড, বালুহক্কাক লেন, বালিগঞ্জ থেকে উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্ব কলকাতার বিজয়ের সংবাদ এক অভূতপূর্ব আনন্দধারার সৃষ্টি করে। কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গ যেন নৃত্যে নেমেছে। কলকাতায় ঢাকা বিজয়ের কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন সাংবাদিকদের জানালেন : আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক বিরাট ঘটনা আজ। লক্ষ লক্ষ মানুষের আত্মদান ও দুঃখ বরণের মধ্য দিয়ে অর্জিত এই স্বাধীনতার গুরুত্ব যেমন কর্তব্যও তেমনিই।
‘নিউইয়র্ক টাইমস’ ১৬ ডিসেম্বর এক সম্পাদকীয় নিবন্ধে মন্তব্য করে : বাংলাদেশে পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনীর বিপর্যয়ে গোটা গণতান্ত্রিক বিশ্বে আমেরিকার সম্মান ও ভাবমূর্তি বিনষ্ট হয়েছে। আরও মন্তব্য : পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনীর বিপর্যয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তিরই বিপর্যয় ঘটেছে।
কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহে ললিতাবালার শরীরের ওপর দিয়ে একটা বড় ঝড় গেছে। প্রায় সারাক্ষণই তাঁর চোখ বেয়ে জল গড়াতে থাকে। জল মুছে দিতে দিতে সুনন্দা বলে, আর কাঁদবে কেন দিদিমা, এবার তো স্বাধীন হলো তোমার দেশ, তোমার ছেলের জন্মভূমি। আর তুমিই কাঁদবে এখন দিমিমা?
না রে আমি কাঁদি আনন্দে। নাতনির মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বৃদ্ধা একটা অনরোধ করেন, দিদিভাই, ভগবান যদি বাঁচিয়ে রাখেন একবার আমি ফরিদপুর যেতে চাই, তুই যাবি আমার সঙ্গে? কেউ তো নেই, শুধু একবারই যাবো।
সুনন্দা কিছুু বলার আগেই পুত্রবধূ আরতিবালা হাসতে হাসতে এগিয়ে আসেন, বলেন, তা মা আপনার নাতনিকে নিয়ে যাবেন যান, কিন্তু আমার কথা কিছু বললেন নাতো ? নাকি শ্বশুর-শাশুড়ির জন্মভিটে দেখার কোনো ইচ্ছে আমার থাকতে নেই?
আমরা সবাই যাবো দিদিমা, মফিজউল্লাহ কাকা এই সেদিনও মাথায় হাত রেখে বলে গেলেন, তাঁর বাড়ি আমাদের জন্যে খোলা। যতবার যাবো, থাকবো সেখানে।
সেদিন রাতেই শরীরটা বেশ খারাপ হয়ে গেল ললিতাবালার। অচেতন অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। কিন্তু লাভ হলো না। কয়েক ঘণ্টা পর তিনি শেষ নিঃশ্বাষ ত্যাগ করলেন। যাবার আগে নাতনির হাতটা চেপে ধরেছিলেন ললিতাবালা। সুনন্দা ওর মুখের কাছে মুখ নিয়ে বলে, কিছু কি বলবে দিদিমা?
শুভেন্দু দেবনাথ যেন বুঝেই নিয়েছে কী ঘটতে যাচ্ছে। নিশ্চল কাঠ হয়ে মায়ের বিছানার পাশে তিনি দাঁড়িয়ে থাকলেন।
নয়।
ডিসেম্বর ২২, ১৯৭১।

বাংলাদেশের মন্ত্রিসভা কলকাতা থেকে ঢাকা ফিরে এল। বিরাণ হয়ে পড়লো থিয়েটার রোড, বালিগঞ্জ ও বালুহক্কাক লেনের ঘরবাড়ি। দমদম বিমানবন্দরে (নেতাজি সুভাষ চন্দ্র্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর) প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন ভারতের ৫৫ কোটি মানুষ, ভারত সরকার ও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা জানালেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভাকে বিদায় জানাতে বিমানবন্দরে এসেছেন সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়। শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর বিশেষ দূত হয়ে আছেন ভারতের পররাষ্ট্র দফতরের নীতিনির্ধারক কমিটির চেয়ারম্যান ডি পি ধর।
২৩ ডিসেম্বর কলকাতার পত্রিকার খবর : “শত্রুমুক্ত ঢাকায় বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ও তার মন্ত্রিসভার সদস্যরা এসে পৌঁছলে হাজার হাজার মানুষ তাঁদের বীরোচিত সংবর্ধনা জানায়। তেজগাঁও এয়ারপোর্ট থেকে শহর ঢাকায় দুদিকে হাজার হাজার মানুষের জয়ধ্বনি ওঠে। জয় বাংলা, জয় ইন্দিরা বলে।— গত এপ্রিলের এক দুপুরে মুজিবনগরের আম্রকুঞ্জে স্বাধীনতার যে তামস তপস্যা শুরু হয়েছিল আজ ডিসেম্বরের সূর্যোকরোজ্জ্বল অপরাহ্নে বুড়িগঙ্গার তীরে সে মুক্তিযজ্ঞের শেষ আহুতি পড়ল। দুর্জয় দুঃসাহস তপস্যার শেষে লক্ষ শহীদের রক্তেভেজা পথ ধরে নেতারা আজ পৌঁছলেন ঢাকা শহরে। তোপখানা রোডে সেক্রেটারিয়েট শীর্ষে গত ১৬ ডিসেম্বর থেকে উড়ছে স্বাধীন বাংলার পতাকা। সেই পতাকার দিকে তাকিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের চোখ সজল হয়ে উঠল। কত শহীদের রক্তের মূল্যে কেনা এই পতাকা। আর আজ এই বিজয় উৎসবের দিনে তাদের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান তাদের সঙ্গে নেই।”
মুজিবনগর মন্ত্রিসভার ঢাকা আগমনের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী হিসেবে অধিষ্ঠিত হয় ঢাকা। এর আগে ঢাকা দুবার রাজধানী হওয়ার মর্যাদা লাভ করেছিল। ১৬০৮ সালে বাংলার নবাব ইসলাম খাঁ রাজমহল থেকে রাজধানী সরিয়ে ঢাকায় আনেন। ১৭০৪ সাল পর্যন্ত ঢাকা সুবা বাংলার রাজধানী থাকে। এরপর ১৯০৫ সালে বঙ্গবিভাগের পর ঢাকা ৭ বছর ধরে পূর্ব বঙ্গ ও আসাম প্রদেশের রাজধানী হয়। ঐতিহাসিক এই শহর আবারও অভিসিক্ত হয় রাজধানীতে, তবে এবার স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের।
কিন্তু যাঁর নেতৃত্বে বাঙালির জাতীয় ইতিহাসের এই ইতিহাসের জাগরণ, যাঁর নেতৃত্বে এই অবিস্মরণীয় মুক্তিযুদ্ধ ও পরিশেষে স্বাধীনতা, তিনি তো নেই। ৮ জানুয়ারি ১৯৭২। পাকিস্তানের কারাগারে নয় মাসের বন্দিজীবন শেষে মুক্তি লাভ করলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেদিনই পিআইএর একটি বিশেষ ফ্লাইটে ৬৩৫ এ লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে পৌঁছালেন তিনি।
হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে রাজকীয় ব্রিটিশ এয়ার ফোর্সের একটি বিশেষ বিমানে ঢাকার পথে যাত্রা করেন তিনি ৯ জানুয়ারি। ঢাকার পথে ১০ জানুয়ারি তিনি দিল্লির পালাম বিমানবন্দরে (ইন্দিরা গান্ধী ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট) যাত্রা বিরতি করলেন। ভারতের রাষ্ট্রপতি ভিভি গিরি, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীসহ মন্ত্রিসভার সকল সদস্য ও শীর্ষ সামরিক ও অসামরিক কর্মকর্তাগণ বাংলাদেশের জাতির পিতাকে সাদর অভ্যর্থনা জানালেন, আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় অভ্যর্থনা জানালেন উষ্ণ আবেগ ও ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় আতিথেয়তায়।

একই দিন ঢাকায় পৌঁছলেন বঙ্গবন্ধু। পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থেকেও যিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রাণপুরুষ, স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, সেই নেতাকে ঢাকায় বুকে অভ্যর্থনা জানায় লাখো উদ্বেলিত জনতা। তেজগাঁও বিমানবন্দরে থামার পর ব্রিটিশ রয়াল এয়ার ফোর্সের বিমানটি ঘিরে রাখে লাখো মানুষ। নামার আগে বঙ্গবন্ধু অনেকক্ষণ ধরে বিমানের জানালা দিয়ে তাঁর ‘সোনার বাংলা’ দেখলেন। এরপর বিমানবন্দর থেকে মোটর শোভাযাত্রায় নেতা এলেন রমনা রেসকোর্সে, যেখানে তিনি ৭ মার্চ তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ রাখেন। বললেন, আমাকে কারাগারে আটক রাখা হয়েছিল। কিন্তু আমি জানতাম আমার বাংলাদেশ স্বাধীন হবে। বাংলার মানুষ মুক্ত হাওয়ায় বসবাস করবে, খেয়ে-পরে সুখে থাকবে এটাই ছিল আমার সারাজীবনের সাধনা। বাংলার এক কোটি লোক প্রাণভয়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। তাদের খাবার, বাসস্থান দিয়ে সাহায্য করেছে ভারত। আমরা ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী, ভারত সরকার ও ভারতবাসীকে আমাদের অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে জানাই কৃতজ্ঞতা। বলেন, গত ৭ মার্চ আমি এই রেসকোর্সে বলেছিলাম ‘দুর্গ গড়ে তোল।’ আজ আবারও বলছি আপনারা এ কথা বজায় রাখুন। আমি বলেছিলাম, ‘বাংলাদেশকে মুক্ত করে ছাড়বো’। বাংলাদেশ আজ মুক্ত, স্বাধীন। একজন বাঙালি বেঁচে থাকতেও এই স্বাধীনতা নষ্ট হতে দেব না। বাংলাদেশ ইতিহাসে স্বাধীন দেশরূপেই বেঁচে থাববে। বাংলাকে দাবিয়ে রাখতে পারে এমন কোনো শক্তি নেই।
কলকাতার সাংবাদিক দিলীপ চক্রবর্তীর আনন্দ যেমন আছে, দুঃখেরও শেষ নেই। আনন্দবাজারের বরুন সেনগুপ্ত টাঙ্গাইল দিয়ে ঢাকায় ঢুকে গেছেন। কিন্তু তিনি আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারলেন না।

বললেন, দুঃখ খুবই। ভেঙেও পড়েছিলাম। তবু আনন্দ উদযাপনে গিয়ে উঠলাম থিয়েটার রোডে। চারদিকে কেবল জয়বাংলার কোলাহল। আমাকে দেখেই মন্ত্রী কামরুজ্জামান এই গালে একটা ওই গালে একটা চুমু খেয়ে বললেন, এটা হচ্ছে ভলগার জন্য আর ওটা হচ্ছে গঙ্গার জন্য। বুঝলাম আমি কমিউনিস্ট বলে কথাগুলো তিনি বললেন। এ ক’মাসে দুটো শক্তি দাঁড়িয়েছে। একদিকে আছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সহায়ক হিসেবে ভারতবর্ষ, সোভিয়েত ইউনিয়ন সব সমাজতান্ত্রিক দেশ, অন্যদিকের পাকিস্তান এবং তার সঙ্গে চীন, আমেরিকা….. তাই সদাহাস্য কামরুজ্জামান ঠাট্টা করে ওই বলে চুমু দিলেন। কেউ কেউ আবার স্লোগান দিলেন বিশ্বে আনছে নতুন দিন। ইন্দিরা মুজিব কোসিগীন। যদ্দুর জানি স্লোগানটা লিখেছিলেন প্রিয় রঞ্জন দাশ মুন্সি।
১৬ ডিসেম্বরের বিজয়ের পর মিলিটারির ব্রিফিং হয়ে গেল। আমরা ঠিক করলাম চার বন্ধু মিলে আজকে রাস্তায় অন্ধকারে ঘুরবো। যা খুশি তাই করবো। রাত ১২টার পর। চেঁচাবো, গান করব, ড্রিঙ্ক করব, দরকার হলে মাতাল হয়ে যাব। তো এবার আমরা বসেছি পার্ক সার্কাসের যে আইল্যান্ডটা আছে ওখানে। পার্ক সার্কাসের ওই জায়গাটা মুক্তিযুদ্ধের কেন্দ্রস্থল। আমি, বাংলাদেশের হাসান আলী, সর্দার দবীর উদ্দিন আর আমার এক বন্ধু। এই চার বন্ধু মিলে বসে আমরা বলছি, প্রথম কাজ হচ্ছে কে কাকে কত ভালোবাস রাস্তায় দাঁড়িয়ে জোরে চিৎকার করে বল। আমার পেছনে এক বন্ধু লাগল। বললো, জানি, কোনো এক কালো হরিণ চোখ দিলীপের মনহরণ করেছে। তবে ভাই দেখ, তোমার জন্য আবার মালোয়ান আর মুসলমান ঝগড়া না লাগে। ঠাট্টা করছে।
আমি বললাম , ম-তে মানুষ, ম-তে মালোয়ান, ম-তে মুসলমান আবার ম-তে মা আমার ‘মা’ আমার বাংলাভাষা। এক মায়েরই তো সন্তান আমরা। তবে এখন থেকে কাউকে ভালোবাসতে হলে মনকে বলে দিও, মন তুমি ভালোবাসার আগে কুষ্ঠি দেখে নিও তার ধর্ম কি ? বর্ণ কি? গোত্র কি? সে স্বাধীনতার পক্ষে না বিপক্ষে, এসব দেখে নিয়ে তারপর ভালোবেসো।
তবে শোনো, আমি যাকে ভালোবাসি, তার কথাটা চিৎকার করে বলছি, এখনই। বলেই আমি চিৎকার করে একটা কবিতা আওড়াতে থাকলাম।
‘জোয়ান ছেলেরা মিছিল করে
ভোরের সূর্যটাকে মাথায় বয়ে এগিয়ে গেছে
দ্যাখো বন্ধুরা, সোম্য মেয়েরা লাল পেড়ে শাড়ি প’রে
মিশিলে শরিক হয়েছে।’
একটু থেমে বললাম,
‘অন্যসব মুখ যখন দুর্মূল্য প্রসাধনের প্রতিযোগিতায়
কুৎসিত বিকৃতিকে চাপার চেষ্টা করে,
পচা শবের দুর্গন্ধ ঢাকার জন্য
গায়ে সুগন্ধী ঢালে
তখন অপ্রতিদ্বন্দ্বী সেই মুখ
নিষ্কোষিত তরবারির মতো
জেগে উঠে আমাকে জাগায়।’

আমার ধরনধারণ দেখে ওরা ভেবে বসলো হয়তো নেশা আমায় ধরে ফেলেছে। সকলে হেসে দিল। দবির বলল, মদে পাঞ্চ করে, অনেকে মাতাল হয় শুনেছি। কিন্তু তুই তো দেখি কবিতায় পাঞ্চ করছিস দোস্ত। মানে আমি দুটো কবিতার কয়েকছত্র বলেছিলাম। রাস্তা জনশূন্য। তাই কেউ আমাদের দেখেছিল কিনা জানি না। আর দেখলে কি মনে করত তা নিয়ে আমাদের কোনও পরোয়া নেই। বিজয়ের আনন্দে আমরা মাতাল হয়েছিলাম। তবে সেদিন শেষরাত্রে পার্ক সার্কাসের ঐ চৌরাস্তার মোড় সত্যিই শাসন করেছিল বিজয় আনন্দে পাগল চারজন যুবক।

ইতিমধ্যে কুয়াশার বুক চিরে পার্ক সার্কাসের ট্রাম ডিপো থেকে ভোরের প্রথম ট্রাম বের হলো হেড লাইট জ্বালিয়ে। নতুন দিন শুরু। কিছুক্ষণের মধ্যেই সূর্য এই গ্রহের নতুন এক স্বাধীন দেশকে অভিনন্দন জানাবে। দবির হঠাৎ ঐ আইল্যান্ডের মাঝখানে দাঁড়িয়ে চিৎকার করল আমরা এখন স্বাধীন দেশের নাগরিক। স্বাধীনতা আমার ভালোবাসা। এরপর দীপ্তেন্দু আমার হাত চেপে ধরে বললো, তোদের নিমন্ত্রণ বন্ধু, দাওয়াত, আসবি আমাদের দেশে। দেখিস, আমাদের মেঘনার পানি ঘোলা হলেও বড় মিষ্টি।