রেকর্ডের দ্বারপ্রান্তে সাকিব

আগের সংবাদ

তামিমের সঙ্গী কে?

পরের সংবাদ

‘কোহিনূর’ পত্রিকা ও রওশন আলী চৌধুরী

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ২, ২০১৯ , ৩:১২ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুন ৩, ২০১৯, ১:২৮ অপরাহ্ণ

Avatar

উনিশ ও বিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাঙালি সমাজে হিন্দু ও মুসলমান এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ-বিভাজন-কলহ-বিবাদ-দূরত্ব বৃদ্ধি পেতে থাকে। শিক্ষিত মানুষের মধ্যে জাতিবৈর মনোভাব প্রবল হয়ে ওঠে। এই দৃষ্টিভঙ্গি সামাজিক আচরণ, সংবাদ-সাময়িকপত্র ও সাহিত্যের উপকরণে স্পষ্টই প্রতিফলিত হয়। এর পাশাপাশি কেউ কেউ ছিলেন সম্প্রদায়-সম্প্রীতির পক্ষে যদিও এই ধরনের উদার মন ও মতের মানুষের সংখ্যা খুব বেশি ছিল না। সেই সংখ্যালঘু মিলনকামী মানুষের মধ্যে মোহাম্মদ রওশন আলী চৌধুরীর (১৮৭৪-১৯৩৩) নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়।
রওশন আলী চৌধুরী স্বচ্ছ দৃষ্টি ও মুক্ত মনের মানুষ ছিলেন। তাঁর পরিচয় সাংবাদিক-লেখক-সংগঠক-রাজনীতিক হিসেবে। স্বকালে তিনি খ্যাতিমান ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু মন্দ-ভাগ্য, এমন একজন কৃতবিদ্য মানুষের জীবনীর উপকরণ সুলভ নয়। ফলে নানা বিভ্রান্তি ও বিতর্ক জন্ম নিয়েছে। প্রচলিত তথ্য অনুসারে রওশন আলী চৌধুরী জন্মেছিলেন সেকালের ফরিদপুর জেলার রাজবাড়ী মহকুমার পাংশা থানার মাগুরাডাঙ্গী গ্রামে ১৮৭৪ সালে। কিন্তু কেউ কেউ আবার তাঁর জন্মস্থান হিসেবে মাগুরাডাঙ্গীর পাশের গ্রাম নারায়ণপুরকে নির্দেশ করেছেন। তাঁর জন্মসাল নিয়েও মতভেদ আছে : ১৮৭৪, ১৮৭৬ অথবা ১৮৭৮। তবে নানা যৌক্তিক কারণে ১৮৭৪ সালকেই সঠিক জন্মসাল হিসেবে বিবেচনা করা যায়। তিনি ছিলেন সচ্ছল ও শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। সুযোগ থাকা সত্তে¡ও তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া স্কুলের গন্ডি পেরোয়নি। অবশ্য তাঁর ছোটো দুই ভাই কলেজ পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন। বিশেষ করে পরে লেখক হিসেবে খ্যাত এয়াকুব আলী চৌধুরী কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র ছিলেন, কিন্তু চোখের পীড়ার কারণে বিএ পরীক্ষায় বসতে পারেননি। রওশন আলী চৌধুরীর পাঠ-বিচ্ছিন্নতার সঠিক কারণ জানা যায় না। লেখাপড়া অসম্পূর্ণ রেখেই তিনি কর্মজীবনে প্রবেশ করেন সাময়িকপত্র প্রকাশ ও সাংবাদিকতায় মন দেন উদ্যোগী হন সভা-সমিতির সাংগঠনিক কাজে যুক্ত হয়ে পড়েন রাজনীতির সঙ্গে অনিয়মিত লেখালেখির কাজও চলতে থাকে। সাংবাদিকতা সাময়িকপত্র প্রকাশ ও সাহিত্যচর্চার প্রেরণা লাভ করেন মীর মশাররফ হোসেনের সান্নিধ্যে এসে। রওশন আলী চৌধুরী বিয়ে করেন কুষ্টিয়ার লাহিনীপাড়া গ্রামে, শ্বশুরকুলের দিক দিয়ে মশাররফ হোসেনের সঙ্গে তাঁর আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল। ‘কোহিনূর’ নামের মাসিক পত্রিকার প্রকাশনা-সম্পাদনা দিয়েই তাঁর সংবাদ-সাময়িকপত্রের জগতে প্রবেশ। জড়িত ছিলেন ফারসি ভাষায় প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘হাবলুল মতিন’ পত্রিকার বাংলা সংস্করণের সঙ্গে। সাপ্তাহিক ‘ছোলতান’-এর সহযোগী সম্পাদক ও মাসিক ‘মোহাম্মদী’র বার্তা সম্পাদক হিসেবেও কাজ করেছেন। মীর মশাররফ হোসেনের সঙ্গে যৌথ সম্পাদনায় নবপর্যায়ে পাক্ষিক ‘হিতকরী’ পত্রিকা প্রকাশের বিজ্ঞাপন বেরিয়েছিল। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে তা আর প্রকাশ পায়নি।

দুই.
সাহিত্যচর্চাতেও রওশন আলী চৌধুরীর আগ্রহ ছিল। গদ্য ও পদ্য দুধারাতেই লেখালেখি চললেও তাঁর কোনো বই প্রকাশিত হয়নি। মূলত তাঁর ঝোঁক ছিল মতপ্রধান ও তথ্যমূলক লেখালেখিতে। আর তাঁর গদ্য লেখার প্রেরণা ছিল পত্র-পত্রিকা সম্পাদনার সূত্রে। রওশন আলীর জীবনীলেখক তাঁর ছটি কবিতা ও ছটি প্রবন্ধ এই মোট বারোটি রচনার সন্ধান দিতে পেরেছেন। এই লেখাগুলোর প্রায় সবই বেরিয়েছিল নিজের সম্পাদিত ‘কোহিনূর’ পত্রিকায় একটি ‘ইসলাম-প্রচারক’ ও একটি ‘সাহিত্য পঞ্জিকা’য় প্রকাশ পায়। তিনি যেসব পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সেসব পত্রিকায় তাঁর কোনো লেখা ছাপা হয়ে থাকলেও তার হদিস মেলেনি। তবে ‘কোহিনূর’ পত্রিকায় তাঁর অস্বাক্ষরিত সম্পাদকীয় ও অনুষঙ্গী রচনার সংখ্যা একেবারে কম নয়। কোনো কোনো লেখকের রচনার শেষে পাদটীকায় সম্পাদক হিসেবে তাঁর নিজস্ব মন্তব্যও সংযোজিত হয়েছে। যোগীন্দ্রনাথ সমাদ্দার ও রাখালরাজ রায় সংকলিত ১৩২২ বঙ্গাব্দের ‘সাহিত্যপঞ্জিকা’য় ‘মুসলমান লেখকগণের তালিকা’ নামে তাঁর একটি তথ্যপূর্ণ রচনা প্রকাশিত হয়। মুসলিম সাহিত্যসেবীদের জীবন ও কৃতির সুলুক সন্ধান মিলবে এই মূল্যবান রচনায়। এই লেখায় সমকালীন অনেক লেখকের সঙ্গেই তাঁর অন্তরঙ্গ সম্পর্কের পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁর অন্যান্য গদ্যরচনায় সমাজ-শিক্ষা-ধর্ম-নৈতিকতা এসব বিষয় সম্পর্কে তাঁর আগ্রহ-অনুরাগ-দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন আছে।
তাঁর রচনায় সমাজহিতৈষণা ও নৈতিক মূল্যবোধের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব ও মনোযোগ পেয়েছে। ‘নীতিবার্তা’ (‘কোহিনূর’, কার্তিক ১৩০৫) নামের এক রচনায় রওশন আলী চৌধুরী নীতি ও মনুষ্যত্ব মানবজীবনকে কীভাবে উন্নত ও সুন্দর করে গড়ে তোলার পক্ষে সহায়ক হয় সেই কথা যুক্তি ও দৃষ্টান্ত দিয়ে তুলে ধরেছেন। বলেছেন তিনি :
যদি সুখের সাম্রাজ্যে বিচরণ করিতে চাও, যদি দুঃখের পথে চিরকণ্টক দিতে চাও, যদি বিদ্যা ও ধনে মহাজন হইতে চাও, তবে এস, নীতির অনুসরণ কর, নীতির প্রতিমা হৃদয়ে স্থাপন করিয়া অর্চ্চনা কর।…
নীতি আর মনুষ্যত্বের সঙ্গে রয়েছে একটি নিগূঢ় সম্পর্ক পরস্পরসাপেক্ষ এই আত্মিক যোগের ফলাফল যে মানুষের জন্য কল্যাণকর, সেই বিষয়টির আন্তরিক উল্লেখ মেলে লেখকের ভাষ্যে :
যে মনুষ্যদেহ ধারণ করিয়া তুমি পৃথিবীতে বিচরণ করিতেছ সেই মনুষ্যদেহের প্রসাধক মনুষ্যত্ব। সুতরাং মনুষ্যত্বের সংস্কারই মানুষের প্রধান কর্তব্য। এই মনুষ্যত্বই আবার নীতির সংস্থাপক। মনুষ্যত্ব না থাকিলে নীতি থাকিতে পারে না। নীতির শীতল ছায়া না পাইলে মনুষ্যত্বও পরিপুষ্ট হয় না। নীতি ও মনুষ্যত্ব পরস্পরসাপেক্ষ। কাজেই নীতি অবস্থাভেদে মানুষের মনের সহিত মিশিয়া তাহাকে লক্ষ্যভ্রষ্ট হইতে দেয় না।… তুমি ভাবিয়া দেখ, নীতি ছাড়িয়া মানুষের থাকিবার স্থান নাই, নীতির আশ্রয় ব্যতীত মানুষের শান্তি নাই।… জগৎ খুঁজিয়া নীতির ন্যায় সুহৃৎ আর পাইবে না। তাই তোমাকে বলিতেছি, নীতির অনুসরণ কর, অসাধ্য সাধন করিতে পারিবে। নীতির সাহায্যে অলভ্য লাভ অবশ্যই ঘটিবে।
লেখকের মনে যে এক-জাতীয়তা ও সম্প্রদায়-সম্প্রীতির উদার আদর্শ লালিত, তার সমর্থন ও প্রেরণা তিনি পেয়েছেন এই নীতির মাধ্যমেই। এই আলোকে তাঁর মানসিক উচ্চতার পরিচয় মেলে জাত-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সব মানুষের সঙ্গে আত্মীয়তাবোধে। তাই তিনি সহজেই বলতে পারেন :
… বৃহত্তম ব্রহ্মাণ্ডের অসীম মহত্তে¡র সহিত সম্বন্ধ নীতিশাস্ত্রের অপরিমেয় গাম্ভীর্য্যরে সহিত অনুসৃত। সে বাক্যটি এই ‘বসুধৈবকুটুম্বকম্’ ‘সমস্ত পৃথিবীই আমার আত্মীয়’ পৃথিবীস্থ সমস্ত লোকই আত্মীয়। আমি যখন যাহাকে দেখিব, যখন যে জাতির সহিত মিশিব, সকলকেই নিজের ভাবিয়া লইব, সকলকেই স্বজন করিয়া লইব, সকলকেই আমার সুখের সুখী, দুঃখের দুঃখী করিব, সকলের সহিত মনে-প্রাণে মিশিয়া যাইব, ইহাতে ব্যক্তিবিচার থাকিবে না, জাতিবিচার থাকিবে না, আত্মবিচার থাকিবে না। থাকিবে কেবল বিশ্বপ্রেমিকতা, উচ্চতম সৌহার্দ্দ্য, আর উদার চরিত্রতা। ইহা অপেক্ষা আর উচ্চ আশা কি হইতে পারে যে, পৃথিবীর নরনারীর সহিত আমার সম্বন্ধ স্থাপন।…
বিষয়টি আরো খোলসা করে তিনি এভাবে বলতে চেয়েছেন :
আমরা ব্যক্তিবিশেষ বা জাতিবিশেষ লইয়া বিড়ম্বনায় পড়িতে চাহি না। আমরা চাই, ভালোবাসার শৃঙ্খলে সকলকে বাঁধিতে। উদারতার মহামন্ত্রে সকলকে মুগ্ধ করিতে। ‘ভাই ভাই বলিয়া সকলকে প্রেমালিঙ্গনে সুখী করিতে। আমাদের পূর্ব্বতন মহাপুরুষগণ যেসব জ্ঞানরত্ন সঞ্চয় করিয়া জননী জন্মভ‚মির অঙ্গপ্রত্যক্ষ অলঙ্কৃত করিয়াছিলেন, আর সংস্কারের অভাবে সেসব রত্ন মলিন ও প্রভাহীন হইয়া পড়িয়াছে। তাহার সংস্কার সাধন প্রত্যেক সন্তানের কর্তব্যকাজ। এই মহত্তর কর্ত্তব্য পালন করিবার জন্যই যদি সকল জাতি, এক জাতির ন্যায় হইয়া, সকল ধর্ম্মী, এক ধর্ম্মীর ন্যায় হইয়া, সমান ও উৎসাহে, সমান ঔৎসুক্যে, একই কর্ত্তব্য সম্পাদনে ব্যাপৃত হয়, তাহা হইলে এই জ্ঞানরত্নের সংস্কার সাধিত হইবে।
তাঁর এক কবিতায় (‘মিনতি’ : ‘কোহিনূর’, জ্যৈষ্ঠ ১৩১১) শুভচেতনা এবং নিজেকে প্রীতি-প্রেম-ঐক্যের অনুক‚লে উৎসর্গের ধারণা ছড়িয়ে দিয়েছেন :
তোমরা রাখিয়ো মোরে আপনার করি
আপন মন্দিরে
একা আমি পারি না গো থাকিতে নীরবে
সুদূর এ।
শেষে তাঁর আকাক্সক্ষার কথাও প্রচ্ছন্ন থাকেনি :
আপনি সুন্দর হই
সবারে ডাকিয়া লই,
একাকারে ডুবে দেই সুখের সংসার
দৈন্য ঘৃণা শোক আসি দুর্ব্বল হৃদয়
কভু নাহি করে অধিকার।
শ্রেয়োবোধই যে তাঁর জীবনদর্শনের মূল ভাব ও লক্ষ্য ছিল, তার পরিচয় তাঁর চিন্তা-কর্ম ও রচনায় পাওয়া যায়।

তিন.
রওশন আলী চৌধুরীর সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। এই প্রয়াসে তিনি যুক্ত হন মূলত সাহিত্য-রাজনীতি ও সমাজকর্মের অনুষঙ্গে। তিনি পাংশায় ‘কোহিনূর সাহিত্য সমিতি’ (১৩১০) নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এই ‘সমিতি’র পক্ষ থেকেই একসময় ‘কোহিনূর’ পত্রিকা বের হতো। ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ’ ও ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’র সঙ্গেও রওশন আলী চৌধুরীর বিশেষ যোগ ছিল। জানা যায়, তিনি ১৩২৫ সালে সাহিত্য পরিষদের কার্যনির্বাহক সমিতির নির্বাচনে সদস্যপদে প্রার্থী হয়েছিলেন। পাংশায় তিনি ‘পূর্ণিমা সম্মিলনী’ নামে একটি সাহিত্য-সংগঠনও গড়ে তোলেন। বিভিন্ন সাহিত্য-সম্মেলনেও তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণের খবর জানা যায়। হুগলির চুঁচুড়ায় অনুষ্ঠিত ‘বঙ্গীয়-সাহিত্য-সম্মিলনের’র পঞ্চম অধিবেশনে তিনি অংশ নেন। অধিবেশনের তৃতীয় দিনে (২১ ফাল্গুন ১৩১৮/৪ মার্চ ১৯১২) মীর মশাররফ হোসেনের মৃত্যুতে রওশন আলী চৌধুরী একটি শোক-প্রস্তাব উত্থাপন করেন এই বয়ানে :
বঙ্গ-সাহিত্যে মুসলমান লেখকগণের অগ্রণী ‘বিষাদ-সিন্ধু’ প্রণেতা মীর মশারফ হোসেন সাহেবের মৃত্যুতে এই সম্মিলন শোক-প্রকাশ করিয়াছেন এবং এক্ষণে তাঁহার স্মৃতি-রক্ষার জন্য বঙ্গীয় সাহিত্য-পরিষদকে ভার দেওয়া হইল।
প্রস্তাবটি সমর্থন করেন চব্বিশ পরগনার চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
সামাজিক কল্যাণ ও স্বসমাজের উন্নয়নের জন্যে ২৩ চৈত্র ১৩১০ রাজশাহীর রামপুর-বোয়ালিয়ায় স্থাপিত ‘বঙ্গীয় ইসলাম মিশন সমিতি’র সহকারী সম্পাদক মনোনীত হন তিনি। মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ছিলেন এর অন্যতর সহকারী সম্পাদক। এই সম্মেলন ও ‘সমিতি’-প্রতিষ্ঠায় তাঁর সক্রিয় ভ‚মিকা ছিল। ‘বঙ্গীয় ইসলাম-মিশন-সমিতি’ শীর্ষক তাঁর এক প্রবন্ধ থেকে জানা যায় : ‘কোহিনূর’ সম্পাদক মুনশী মোহাম্মদ রওশন আলী চৌধুরী সাহেব, মিশন সম্বন্ধে সমস্ত বিষয়ের আলোচনাপূর্ণ নীতিদীর্ঘ একটি বক্তৃতা প্রদান’ এবং সেইসঙ্গে ‘এই সভার ভিত্তি স্থাপন জন্য’ কিছু প্রস্তাবও উত্থাপন করেন (‘ইসলাম-প্রচারক’, বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৩১১)। এই ‘সমিতি’র মূল উদ্দেশ্য ছিল :
অজ্ঞান তিমিরাচ্ছন্ন মানবসমাজের মধ্যে পবিত্রতম সত্য সনাতন ইসলাম ধর্ম্ম-ভাস্করের অত্যুজ্জ্বল স্বর্গীয় রশ্মির বিকীর্ণতা সাধন, ত্রিত্ববাদী খৃষ্টান প্রভৃতি বিধর্ম্মীদিগের অযথা আক্রমণ হইতে ইসলাম ধর্ম্ম ও মোসলেম সমাজের রক্ষা-বিধান এবং আবশ্যক মত আক্রমণগুলির প্রতি-উত্তর প্রদান, খৃষ্টান প্রভৃতি বিধর্ম্মীগণের প্রকাশিত ইসলাম ধর্ম্মের গøানিকর ট্রাকট বা পুস্তিকাগুলির প্রতিবাদকরণ, এবং বিধর্ম্মীদিগের আরোপিত সন্দেহভঞ্জন, হতচেতন মোসলেম সমাজের মধ্যে জ্ঞানবৃদ্ধি ও ধর্ম্মবিস্তৃতি এবং ইসলাম ধর্ম্মের সর্ব্বপ্রকার উন্নতি চেষ্টা প্রভৃতি নানাবিধ উদ্দেশ্য বঙ্গভাষায় নানাবিধ উদ্দেশ্য বঙ্গভাষায় নানাবিধ ট্রাকট বা পুস্তিকা এবং পত্রিকাদি প্রকাশ করা।
সমিতির এই প্রস্তাব মুন্্শী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ ও মুনশী শেখ জমিরুদ্দীনের আন্দোলনকে প্রেরণা ও সমর্থন জুগিয়েছিল। এই দুজন রাজশাহীর সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন এবং সভায় গঠিত ‘কার্য-পরিচালক সমিতি’র এঁরা সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন। রওশন আলী চৌধুরী এঁদের দ্বারা হয়তো কিছু প্রভাবিত বা প্রাণিত হয়ে থাকতে পারেন। আরো কিছু সংগঠনের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ ছিল, যেমন ‘প্রাদেশিক মুসলমান শিক্ষা সমিতি’। সাংগঠনিকভাবে একদিকে তিনি উদার অসাম্প্রদায়িক ভূমিকা পালন করেছেন, অন্যদিকে নিজের সম্প্রদায়ের প্রতি তাঁর যে কর্তব্য ও দায় আছে, সে-কথাও তিনি ভুলে যাননি।

চার.
সমাজ ও স্বদেশমনস্ক রওশন আলী চৌধুরী শুধু রাজনীতিসচেতন ছিলেন না, সরাসরি রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। জাতীয়তাবাদী চেতনা ও মনোভাব নিয়ে তিনি ছিলেন রাজনৈতিক দল জাতীয় কংগ্রেসের সক্রিয় সমর্থক ও অনুসারী। কীভাবে কার প্রেরণায় তিনি রাজনীতিতে আসেন সে তথ্য অজ্ঞাত। শুধু আদর্শে নয়, লেবাসেও তিনি ছিলেন কংগ্রেসি সারাজীবন খদ্দর পরেছেন যাপন করেছেন সাদাসিধে জীবন। বঙ্গভঙ্গের প্রেক্ষাপটে স্বদেশি আন্দোলনের কালে তাঁর রাজনৈতিক তৎপরতা বিশেষভাবে প্রকাশ পায়। এই আন্দোলনকে গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠা করেন ‘স্বদেশবান্ধব সমিতি’। মোহাম্মদ আবুল হোসেন মল্লিক তাঁর এক লেখায় রওশন আলী চৌধুরীর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন :
রাজনৈতিক জীবনে রওশন আলী চৌধুরী কংগ্রেসের আদর্শে আস্থাশীল ছিলেন বলিয়া ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলনে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসকেই সমর্থন করিয়াছিলেন। বঙ্গবিভাগকে কেন্দ্র করিয়া ভারতব্যাপী যে বিরাট আন্দোলন গড়িয়া উঠে তাহাই পরবর্তীকালে স্বদেশী আন্দোলনের রূপ নেয়।… স্বদেশী আন্দোলনকে বাস্তবায়িত করিবার জন্য তিনি মহাত্মা গান্ধীর ঘোষিত বিদেশী দ্রব্য বয়কট ও স্বদেশী শিল্পের প্রতিষ্ঠা ও স্বদেশী দ্রব্যের পোষকতা নীতি গ্রহণ করিয়াছিলেন। তিনি স্বদেশী আন্দোলনের পরবর্তী রূপ সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনকে সমর্থন করেন নাই এবং ইহার বিরোধিতা করিয়াছিলেন বলিয়া জানা যায়।
১৯২০ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় মুসলমানরা খেলাফত আন্দোলন শুরু করিলে রওশন আলী চৌধুরী খেলাফত আন্দোলনে ঝাঁপাইয়া পড়েন এবং পাংশার মুসলমানদিগকে ঐক্যবদ্ধ করিয়া খেলাফত আন্দোলনকে শক্তিশালী করিয়া তোলেন। এই সময় তাঁহার অনুজ এয়াকুব আলী চৌধুরীও শিক্ষকতা পরিত্যাগ করিয়া খেলাফত আন্দোলনে যোগদান করেন।
রাজনৈতিক সভা-সমিতিতে রওশন আলী চৌধুরীর বক্তৃতা শ্রোতাদের বিশেষ অনুপ্রাণিত ও উদ্দীপ্ত করতে পারত। অনেক সময় সে বক্তৃতা যথেষ্ট উত্তেজকও হতো। এ রকম একটি ঘটনার উল্লেখ মেলে ‌‌‌’The Mussalman‌’ পত্রিকায় (২৮ এপ্রিল ১৯২২)। এই পত্রিকায় বাংলা প্রদেশের পাবলিসিটি অফিসার পরিবেশিত একটি তথ্য-বিবরণী Moulvi Raushan Ali Choudhury / Case against him withdrawn’ GB শিরোনামে প্রকাশিত হয়।
On the 30th January last Moulvi Raushan Ali Chaudhury, one of the leaders of the Khilafat and non-cooperation movement in Pangsha, district Faridpur, delevered a violent speech at the Langalbandh bazar, police station sreepur, in the Magura subdivision of the district of Jessore for which he was prosecuted under section 124A I.P.C.

মোকদ্দমার ট্রায়ালের সময় রওশন আলী চৌধুরী মহকুমা শাসক-বরাবর ৩ এপ্রিল ১৯২২-এ লিখিত তাঁর একটি আবেদনপত্র আদালতে দাখিল করেন। এতে তিনি দোষ কবুল করে এই অঙ্গীকার করেন যে :
I do hereby admit that in the course of my speech that I delevered at the non-cooperation meeting at Langalbandh the allegation that I made against the govt. that unjustifiable and wrong and I plead guilty and beg to be pardon for the same.
I do hereby also promise that in future I shall not take part in any political movement of agitation against the govt. or made any speech in any meeting against the govt.
রওশন আলী চৌধুরীর অনুতাপ, দোষ-স্বীকার, ক্ষমা-প্রার্থনা এবং ভবিষ্যতে এই ধরনের সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত না হওয়ার অঙ্গীকারের ফলে তিনি এই রাজনৈতিক অভিযোগ থেকে রেহাই পান। এই মুচলেকার কারণে তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত হয়ে আসে এবং তিনি নিজেও ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।

পাঁচ.
রওশন আলী চৌধুরীর কর্মজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ মাসিক ‘কোহিনূর’ পত্রিকার প্রকাশনা ও সম্পাদনা। এই পত্রিকা পরিচালনায় তিনি বিশেষ নৈপুণ্যের পরিচয় দেন। ‘বিবিধ বিষয়ক মাসিকপত্র ও সমালোচনা’ এই পরিচয় দিয়ে ১৩০৫ সালের আষাঢ় মাসে ‘কোহিনূর’ প্রকাশিত হয়। প্রথম সংখ্যাতেই জানিয়ে দেওয়া হয়, এই পত্রিকার ‘প্রচার সংখ্যা ৩০০০’। মফস্বল থেকে মুসলিম-পরিচালিত কোনো মাসিকপত্রের এই প্রচার সংখ্যার তথ্য জেনে বিস্মিত হতে হয়। প্রথম সংখ্যার সম্পাদকীয় ভাষ্য থেকে জানা যায় : “হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি, জাতীয় উন্নতি, মাতৃভাষার সেবাকল্পে এবং কলিকাতা অনাথ আশ্রমের সাহায্যার্থ ‘কোহিনূর’ প্রচারে ব্রতী হইয়াছি।” সম্পাদক হিন্দু-মুসলমান মিলিয়ে ৩৫ জনকে নিয়ে একটি ‘পরিচালক-সমিতি’ গঠন করেন। তাতে যেমন মীর মশাররফ হোসেন, কায়কোবাদ, মুন্্শী মেহেরুল্লা, আবদুল হামিদ খাঁ ইউসফজী, মুনশী শেখ জমিরুদ্দীন, আবদুল করিম বি.এ., ওসমান আলী ছিলেন পাশাপাশি দুর্গাদাস লাহিড়ী, নিখিলনাথ রায়, মহেন্দ্রনাথ রায় বিদ্যাবিধি, ব্যারিস্টার চন্দ্রশেখর সেন, প্রাণকৃষ্ণ দত্ত, মন্মথনাথ চক্রবর্তী, রাইচরণ দাস এঁদের নামও ছিল। এমন সমদর্শী দৃষ্টিভঙ্গি সেকালের সংবাদ-সাময়িকপত্র পরিচালনায় কী হিন্দু, কী মুসলমান কোনো সম্প্রদায়েই তেমন চোখে পড়ে না। ‘কোহিনূরে’র লেখক-সূচিতেও হিন্দু-মুসলমানের প্রায় সমান উপস্থিতি। সূচনা-সংখ্যার প্রচ্ছদে ‘বর্ত্তমান সংখ্যার লেখকগণে’র যে নাম ছাপা হয় তার আটজন হিন্দু ও চারজন মুসলমান। তাই প্রথম সংখ্যার ‘আমাদের নিবেদন’-এ সম্পাদক স্পষ্টই বলেছেন :
সভ্যতালোকে দেশ আলোকিত হইবার পর কত পত্র, কত পত্রিকাই না প্রকাশিত হইল, কিন্তু কেহ কি বলিতে পারেন, বঙ্গীয় কৃতবিদ্য হিন্দু-মুসলমান লেখকগণকে একত্রিত ও একসূত্রে গ্রথিত করিয়া কখন কোন পত্র বা পত্রিকা প্রচারিত হইয়াছে? তাই আমাদের এই অনুষ্ঠান নূতন নহে কি?
পত্রিকার উদ্দেশ্য আরো নির্দিষ্ট ও কার্যকর করার জন্য চতুর্থ সংখ্যা থেকে প্রচ্ছদে মুদ্রিত হয় : ‘হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রীতি উদ্দেশ্যে প্রকাশিত মাসিকপত্র ও সমালোচন’।
বঙ্গাব্দ ১৩০৫ থেকে ১৩২২ পর্যন্ত ‘কোহিনূর’ মোট তিন পর্যায়ে প্রকাশিত হয়। প্রথম পর্যায়ে পত্রিকাটি মুদ্রিত হতো কাঙাল হরিনাথ মজুমদার-প্রতিষ্ঠিত কুষ্টিয়ার কুমারখালীর মথুরানাথ যন্ত্রে। ১৩০৮ পর্যন্ত অনিয়মিত প্রকাশনার পর ‘কোহিনূর’ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ১৩১১-তে ‘২য় কল্প’ নামে এর দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকাশনা শুরু হয়। ১৩১৪ বঙ্গাব্দে এসে ‘২য় কল্পে’র প্রকাশও অব্যাহত থাকেনি। বৈশাখ ১৩১৮ থেকে ‘কোহিনূর’ আবার তৃতীয় ও শেষবারের মতো ‘নবপর্যায়ে’ প্রকাশিত হয়ে চৈত্র ১৩২২ পর্যন্ত চালু থাকে। গ্রাহক ও পৃষ্ঠপোষকদের সহযোগিতা ও আনুক‚ল্যের অভাবই ‘কোহিনূর’ উঠে যাওয়ার মূল কারণ। ধারণা করা চলে, ‘কোহিনূর’ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে কিংবা এর প্রকাশ-বিরতিকালে রওশন আলী চৌধুরী ‘হাবলুল মতিন’, ‘ছোলতান’ ও ‘মোহাম্মদী’ পত্রিকায় কাজ করেন। প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বে পত্রিকার বানান ছিল ‘কোহিনুর’ তৃতীয় বা শেষ পর্বে নামের বানানে সামান্য পরিবর্তন এসে হয় ‘কোহিনূর’। আমরা পত্রিকার শেষপর্বের বানানটিই গ্রহণ করেছি।
সেকালের অনেক খ্যাতিমান হিন্দু-মুসলমান লেখক ‘কোহিনূর’-এ প্রায় নিয়মিত লিখতেন। লেখক-তালিকা কম দীর্ঘ নয় নির্বাচিত নামের উল্লেখ করলে বলা যায় : মীর মশাররফ হোসেন, কায়কোবাদ, মোজাম্মেল হক, বিজয়চন্দ্র মজুমদার, ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ, দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার, রামপ্রাণ গুপ্ত, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, শশাঙ্কমোহন সেন, মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, সৈয়দ এমদাদ আলী, পাঁচকড়ি দে, চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, ইসমাইল হোসেন সিরাজী, শেখ ফজলুল করিম, কাজী ইমদাদুল হক, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, এয়াকুব আলী চৌধুরী, মোহিতলাল মজুমদার, কালিদাস রায়। কবিতা-প্রবন্ধ-গল্প-গোয়েন্দাকাহিনি-পাঁচমিশেলি রচনা প্রকাশিত হতো সেই সঙ্গে অনুবাদ বা ধারাবাহিক লেখাও। কখনো কখনো ছবিও ছাপা হয়েছে।
নমুনা হিসেবে আমরা ‘কোহিনূরে’র একটি বিশেষ সংখ্যা নিয়ে এখানে সংক্ষেপে আলোকপাত করব। বাংলা সাময়িকপত্রের ইতিহাসে প্রথম ঈদ সংখ্যা প্রকাশের গৌরব প্রাপ্য সৈয়দ এমদাদ আলী সম্পাদিত ‘নবনূর’ পত্রিকার। দ্বিতীয় ঈদ সংখ্যা বের হয় ‘কোহিনূরে’র। নবপর্যায়ের মাসিক ‘কোহিনূর’ পত্রিকার প্রথম বর্ষ ষষ্ঠ সংখ্যা (আশ্বিন ১৩১৮) ‘ঈদ সংখ্যা’ হিসেবে প্রকাশিত হয় তখন ‘কোহিনূর’ ছাপা হতো কলকাতায়, কার্যালয়ও ছিল সেখানে। মোট ৪৪ পৃষ্ঠার পত্রিকার দাম ছিল চার আনা। এই ঈদ সংখ্যায় গদ্য-পদ্য মিলিয়ে মোট ১৩টি রচনা স্থান পায়। এখানে ঈদবিষয়ক ও অনুষঙ্গী মোট তিনটি বিশেষ লেখা ছাপা হয়, এর মধ্যে দুটি কবিতা দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের ‘ঈদ’ ও কায়কোবাদের ‘ঈদ-আবাহন’, অনুষঙ্গী রচনাটি ‘রমজান’ বিষয়ে একটি প্রবন্ধ লেখক এয়াকুব আলী চৌধুরী। এর বাইরে আছে আরো চারটি কবিতা ইন্দুপ্রকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আলেয়া’, কৃষ্ণচন্দ্র কুন্ডুর ‘শাস্তি’, শেখ মনসুর আলির ‘মুক্তাহার’ এবং সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের রুমির কাব্যনুবাদ ‘মর্দ্দ-ই-খুদা’। ছাপা হয় ও. আলীর লেখা ‘পুরস্কারে বিপদ’ নামে একটি গল্প ও ‘অর্দ্ধচন্দ্র চিহ্ন সম্বন্ধে যৎকিঞ্চিৎ’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ। ধারাবাহিক রচনা ছিল তিনটি : কাজী ইমদাদুল হকে ‘ফরাসী রাজ্যে মোসলেম অধিকার’, শেখ রেয়াজউদ্দিন আহাম্মদ অনূদিত ‘আরবজাতির ইতিহাস’ এবং পাঁচকড়ি দে-র গোয়েন্দা-কাহিনি ‘দস্যুর কাণ্ড’। ‘জাতীয় আহ্বান’ শিরোনামে অস্বাক্ষরিত সম্পাদক-ভাষ্যে ‘কোহিনূর’ প্রকাশের প্রেক্ষাপট ও জাতীয় কল্যাণের জন্যে এই ধরনের পত্রিকার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়েছে। পত্রিকার শেষে আছে ছয় পৃষ্ঠার সচিত্র বিজ্ঞাপন। এই বিশেষ সংখ্যাতেও সম্পাদক রওশন আলী চৌধুরী হিন্দু ও মুসলমান দুই সম্প্রদায়কে এক সুতোয় গেঁথেছেন। এই ঈদ-আয়োজনেও তিনি অনুদার সামাজিক আবহে সম্প্রদায়-সম্প্রীতির সুরভি ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন।
‘ঈদ’ শীর্ষক কবিতার লেখক ছিলেন বাংলার চিরায়ত রূপকথার সংকলন ‘ঠাকুরমার ঝুলি’, ‘ঠাকুরদার ঝুলি’ এমন অনেক জনপ্রিয় শিশুতোষ গ্রন্থের রচয়িতা প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার। ‘কোহিনূর’ পত্রিকার সঙ্গে তাঁর ছিল ঘনিষ্ঠ যোগ। এই পত্রিকায় তাঁর গদ্য-পদ্য বেশ কয়েকটি লেখা প্রকাশ পায়। তাঁর রচনায় সম্প্রদায়-সম্প্রীতির একটা চেতনা সবসময়ই কাজ করেছে। ‘কোহিনূর’ পত্রিকার ১৩১২-এর জ্যৈষ্ঠ সংখ্যায় ‘হিন্দু-মুসলমান’ নামে তাঁর একটি কবিতা প্রকাশিত হয়। শিরোনামেই কবিতাটির বক্তব্য-বিষয়ের আভাস ফুটে উঠেছে। এই পত্রিকার ঈদ সংখ্যায় সূচনা-রচনা হিসেবে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর ‘ঈদ’ কবিতাটি। ৮২ পঙ্ক্তির এই দীর্ঘ কবিতায় মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব সম্পর্কে তাঁর অন্তরের গভীর শ্রদ্ধা ও আবেগ-অনুরাগের অনুভ‚তি প্রকাশ পেয়েছে। হিন্দু ও মুসলমান এই দুই সম্প্রদায়ের পারস্পারিক সংশয়, ব্যবধান ও বিচ্ছিন্নতা এবং একটা জাতিবৈর পরিবেশের ভেতরে দক্ষিণারঞ্জনের এই ব্যতিক্রমী উচ্চারণ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ :

প্রভাত! সুপ্রভাত!
হেম করোজ্জ্বল উদার ললাট,
খুলি’ নিখিলের কেন্দ্র কবাট,
দোয়ালে মিশান তুলি’ কলগান
পোহা’য়ে তামসী রাত,
আসিয়াছে ঈদ পরম সুহৃদ,
কণক চরণ-পাত,
চির স্মরণীয় চির বরণীয়
নিখিল সুপ্রভাত।

‘নিখিল-অমৃতের রাশি’ ‘আনন্দ-অমৃতের হাসি’ ‘অমিয় সিন্ধুসাধ’ এই ঈদ সম্পর্কে কবির উপলব্ধি :
ভুবন ছানিয়া আসিয়াছে প্রীতি,
গগন ছানিয়া আসিয়াছে গীতি,
নিখিল নিঙারি’ আসিয়াছে প্রেম
করিতে আত্মসাৎ।
ঈদকে দক্ষিণারঞ্জন দেখেছেন ‘মহামিলনের মুক্ত নভোতল’ আর ‘বিশ্বপ্রাণের সাধ’ হিসেবে দেখেছেন আন্তরিক সখ্য-সৌহার্দ্য রচনার সর্বজনীন উৎসব হিসেবে :
দ্বেষ হিংসা ঘাত সমুদয় ভুলি’
নিখিল ভ্রাতায় আজ কোলাকুলি,
এ অমৃত-যোগ, অমৃত অমোঘ
আনন্দ অশ্রুপাত,
ভিন্ন ধর্ম ভিন্ন সম্প্রদায়ের একটি ধর্মীয় উৎসব সম্পর্কে এমন শ্রদ্ধাপূর্ণ ও আবেগঘন শিল্পসৃষ্টির নমুনা সেকালে প্রচুর ছিল না। অমুসলিম কবিদের মধ্যে দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারই প্রথম ‘ঈদ’ নিয়ে কবিতা লিখেছিলেন এই বিষয়টির যে একটি বিশেষ কালিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক তাৎপর্য আছে তা স্বীকার করতে হয়।
‘কোহিনূর’ পত্রিকায় ঈদ-বিষয়ক কায়কোবাদের ৫৪ পঙ্ক্তির ‘ঈদ-আবাহন’ কবিতাটি দুই পর্বে বিভক্ত : প্রথমাংশে ঈদের উৎসব-আনন্দের বিবরণ এবং দ্বিতীয়াংশে ঘোষিত হয়েছে ঈদের প্রেরণায় হৃত মুসলিম-গৌরব ফিরিয়ে আনার আহ্বান। ঈদ-উৎসবের স্বতঃস্ফূর্ত আবাহন-ধ্বনি কবির কণ্ঠে :
কুহেলির অন্ধকার সরাইয়া ধীরে ধীরে ধীরে,
উঠেছে ঈদের রবি উদয়-অচল গিরি-শিরে!
অই হের বিশ্বভ‚মে কি পবিত্র দৃশ্য সুমহান্,
প্রকৃতি আনন্দময়, চারিদিকে মঙ্গলের গান!
‘ঈদ ঈদ’ ব’লে আজি বিশ্ব মাঝে প’ড়ে গে’ছে সাড়া,
জীবজন্তু পশুপাখী সবি যেন সুখে আত্মহারা!
কুসুমিত কুঞ্জবন ফুলে ফুলে শ্যামল পল্লবে
সাজা’য়ে রেখেছে গৃহ অতিথি আসিবে আজি ভবে!
কায়কোবাদ ঈদের ভেতরে ‘বিধাতার’ ‘শুভ উদ্দেশ্য মহান’ আবিষ্কার করেছিলেন। ঈদ তাই ‘নহে শুধু ভবে আনন্দ-উৎসব ধুলাখেলা’ তাঁর বিবেচনায় এই উৎসব ‘জাতীয় পুণ্য-মিলনের এক মহা মেলা’। ঈদকে অবলম্বন করে জাতীয় জাগরণের প্রত্যাশা জেগেছিল কবির মনে। ঈদের আগমন তাই :
শিখা’য়ে একতা-মন্ত্র বাঁধিতে মোস্লেমে সখা-ডোরে,
এসেছে এ ‘ঈদ’ আজি মোস্লেমের প্রতি ঘরে ঘরে!
এরপর তিনি অধঃপতিত-অবক্ষয়িত মুসলিম সম্প্রদায়কে তার কর্তব্য-কর্ম সম্পর্কে সচেতন করে দিতে চেয়েছেন। তাদের উদ্বুদ্ধ করতে গিয়ে তিনি উপস্থাপন করেছেন ইসলামের সোনালি যুগের দৃষ্টান্ত। অতীতের সেই গৌরবময় কীর্তি-কাহিনি থেকে প্রেরণা-পাথেয় সঞ্চয় করে ‘এই মহা শুভক্ষণে’ ‘মিলনের এ মহা প্রান্তরে’ আহ্বান জানিয়েছেন। কেন না :
এস হে মোস্লেম এস কত আর ঘুমাইবে তুমি
অই তব কর্ম্মক্ষেত্র জগতের মহা রঙ্গভ‚মি!
সবাই জেগেছে বিশ্বে কেহই ত না আর ঘুমে,
শুধু কি একাই তুমি রহিবে পড়িয়া এই ভ‚মে?
যদি জাতিগত ঐক্য-একাত্মতা থাকে, তাহলে ‘ডুবিবে না তবে আর ঈদের এ জ্যোতিষ্মান রবি’। সবশেষে তিনি কামনা করেছেন :
আজি এ ঈদের দিনে হ’য়ে সবে এক মনঃপ্রাণ,
জাগা’তে মোসলেম সবে গাও সবে মিলনের গান!
‘কোহিনূর’ পত্রিকার সম্প্রদায়-সম্প্রীতি অভিপ্রায় ও প্রয়াস সেকালে অভিনন্দিত হয়েছিল। এর আলোচনা করতে গিয়ে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা প্রশংসাসূচক মন্তব্য প্রকাশ করেছিল। ‘এডুকেশন গেজেট ও সাপ্তাহিক বার্ত্তাবহ’ (৭ শ্রাবণ ১৩০৫) পত্রিকায় উল্লেখ করা হয় :
এই নূতন মাসিকপত্রখানির কল্পনা মহৎ কার্য্যও সেই কল্পনানুযায়ী হইতে পারিবে এরূপ একটু লক্ষণও দেখা যাইতেছে। এই ১ম সংখ্যার লেখকগণের মধ্যে ৯ জন হিন্দু এবং ৪ জন মুসলমান। এতগুলি মুসলমান ভদ্রলোককে একত্রে হিন্দুর সহিত বাঙ্গালা সাহিত্যচর্চায় যোগ দিতে দেখিয়া বড়ই সুখী হইয়াছি।
‘আলোচনা’ (কার্তিক ১৩০৫) শীর্ষক মাসিকপত্র উচ্ছ¡সিত হয়ে বলে :
বহু শিক্ষিত হিন্দু ও মুসলমান একত্র হইয়া ইহার পরিচালনা ভার গ্রহণ করিয়াছেন। হিন্দু ও মুসলমানে চির বৈরীভাব, কিন্তু কোহিনূর দৃষ্টে আমাদের সে ভ্রম ঘুচিয়াছে। মুসলমানগণ আমাদের চরিত্র ও মাতৃভাষার উন্নতিকল্পে মনোনিবেশ করিয়াছেন ইহা কম সৌভাগ্যের বিষয় নহে। হিন্দু ও মুসলমান সখ্যতা স্থাপন করা ইহার উদ্দেশ্য। ভগবান কোহিনূরের এই সৎ উদ্দেশ্য সফল করুন।
‘সাহিত্য’ (শ্রাবণ ১৩০৫) পত্রিকাতেও এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে কামনা করা হয় : ‘আশা করি সম্পাদক মহাশয় উত্তরোত্তর কৃতকার্য্য হইবেন।’
‘কোহিনূরে’র কাছে মুক্ত মনের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের যে প্রত্যাশা ছিল, তা পূরণে এই পত্রিকা আন্তরিকভাবে চেষ্টা করে গেছে। পত্রিকা-সম্পাদনা, রাজনীতিচর্চা ও ব্যক্তিগত জীবনে রওশন আলী চৌধুরী সাম্প্রদায়িক মনোভাব ও চেতনাকে কখনোই প্রশ্রয় দেননি। ‘হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি’ ‘কোহিনূরে’র এই ঘোষিত নীতিরও পরিবর্তন ঘটেনি। অথচ ‘কোহিনূর’ পত্রিকার দ্বিতীয় বর্ষ (১৩০৬) শুরুর আগে প্রকাশিত একটি বিজ্ঞাপন-পুস্তিকার শেষভাগে মীর মশাররফ হোসেনের ‘হিতকরী’ পত্রিকা মশাররফ ও এস. কে. এম. মহম্মদ রওশন আলীর যৌথ সম্পাদনায় বৈশাখ ১৩০৬ থেকে ‘নতুন প্রণালীতে খাঁটি নিখুঁত মুসলমানীভাবে বাহির হইবে’ বলে বিজ্ঞপ্তি প্রচারিত হয়। একই সময়ে ‘কোহিনূরে’র ক্ষেত্রে মিলনকামী, কিন্তু ‘হিতকরী’র বেলায় স্বাতন্ত্র্যবাদী মনোভাবের প্রকৃত কারণ বা রহস্য সম্পর্কে কিছু জানা যায় না।

ছয়.
রওশন আলী চৌধুরীর শেষজীবন অজ্ঞাতবাসের কাল। সাংবাদিকতা ও পত্রিকা-সম্পাদনার কাজ আগেই ছেড়েছিলেন। রাজনীতি থেকেও স্বেচ্ছায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। সভা-সমিতির সঙ্গেও আর তেমন যোগ ছিল না। নানা রোগ-শোকে জর্জরিত হয়ে মাগুরাডাঙ্গীর বাড়িতে প্রায় গৃহবন্দি জীবনযাপন করতে হয়। এখানেই তাঁর মৃত্যু হয় ৬ আগস্ট ১৯৩৩ (২২ শ্রাবণ ১৩৪০)। কেউ বলেন গ্যাংগ্রিন, কেউ বলেন প্লুরিসি তাঁর মৃত্যুর কারণ। রওশন আলী চৌধুরীর মৃত্যুর খবর ‘The Mussalman’ ছাড়া আর হয়তো দু’একটি পত্রিকায় বেরিয়ে থাকতে পারে, তবে তার সন্ধান মেলেনি। কিন্তু তাঁর মৃত্যুতে স্থানীয় বা জাতীয় পর্যায়ে কোনো শোক-স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়নি। তাঁর স্মরণে বিশেষ কোনো লেখাও কোনো পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছে এমন খবর পাওয়া যায় না। অথচ তিনি একসময় অনেক অনুসন্ধান করে খ্যাত-অখ্যাত মুসলিম সাহিত্যসেবীদের জীবনতথ্য প্রকাশ করেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের কোনো লেখকও তাঁকে স্মরণ করতে আগ্রহী হননি। শুধু তাঁর ‘মৃত্যুশয্যার পাশে বসে তাঁর শিষ্য আবদুল খালেক লিখলেন প্রবন্ধ, শোক-সভায় পাঠ করবার জন্যে’। শোকসভা যে হয়েছিল তার সাক্ষ্য-বিবরণও অপ্রাপ্য। রওশন আলী চৌধুরীর দৌহিত্র ছিলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক, লেখক ও শিশু-সংগঠক রোকনুজ্জামান খান (দাদাভাই)। অকালে মা ও বাবাকে হারিয়ে তিনি মাতামহের কাছেই মানুষ হন। একান্ত প্রিয়জনের মৃত্যুর সময় তাঁর পাশেই ছিলেন তিনি। এই মৃত্যু তাঁকে গভীরভাবে আলোড়িত ও শোকাচ্ছন্ন করে তুলেছিল। তাই মাত্র আট বছর বয়সে তিনি কাঁচা হাতে যে কবিতাটি লিখেছিলেন তা উদ্ধৃত করেই রওশন আলী চৌধুরীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করি :
জন্মেছিলেন তাই মরিলেন আজ,
কে-গো? সে-যে ওগো পাংশার রাজ।
কে-না কাঁদছে তাঁহার জন্য,
আজিকে ফুরালো পাংশার অন্ন।
কার্য ছিল তাঁর সভা-সমিতি,
খদ্দর পরা টুপি মাথায় দেওয়া
এই ছিল তাঁর প্রধান নীতি।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা