ঈদুল ফিতরেরর নামাজ জন্য প্রস্তুত জাতীয় ঈদগাহ

আগের সংবাদ

পরপারে চলে গেলেন মমতাজউদদীন আহমদ

পরের সংবাদ

কাকতালীয়

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ২, ২০১৯ , ৪:৪৫ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুন ২, ২০১৯, ৪:৪৫ অপরাহ্ণ

Avatar

-ক্যা-ক্যা-কা-ক্য
-কাউয়াডা এতো ফজরে কোয়ানথেন আইল? ভাগ ভাগ হারামি কুত্তার বাচ্চা কাউয়া।
খেঁকিয়ে তেড়ে যায় জলিল মৃধা। কাকটাকে তাড়াতে গালিগালাজ করতে করতে ডান হাতের মুষ্টিটা শক্ত করে কাকের দিকে ঘুষি মারে। কাকটার কোনো গ্রাহ্যই নেই। মাথাটা ঝুঁকিয়ে এদিকে ওদিকে তাকিয়ে গম্ভীর শব্দে আবার বলে ওঠে ক্রা-ক্রা-ক্রা। এতো ক্ষেপে গেছো কেন? জলিল মৃধ? খুউব ক্ষিদে লেগেছে। খাওয়া পাচ্ছি না খুঁজে।
জলিল মৃধা এবার একটা ঢিল খুঁজে নিয়ে কাকের দিকে ছুড়ে মারে। এতে কাকটা জায়গা বদল করে উপরে ডালে গিয়ে বসে আরো জোরে বলতে থাকে ক্যা, ক্যা, কা।
-ও ফাতুর বাবা, কাউডার লগে এই ভোর বেলায় এতো মেজাজ করতেছন কেন?
ফজরের নামাজটা শেষ করে চিউনিটা বেড়ায় টাঙিয়ে জলিল মৃধার বউ ফাতুর মা ঘরের বাইরে বের হয়ে আসেন। একটু হেসে হেসে বলতে থাকে
-মেজাজে আপনার মাথাডাও গোলমাল হইয়া গেছে। কাউয়ারে গালি দিতে যাইয়া কইতাছেন ‘কুত্তার বাচ্চা কাউয়া’ কাউয়া কী মানুষ? যারে কইতাছেন ‘কুত্তার বাচ্চা’?
হাসতে থাকে আছিয়া খাতুন, জলিল মৃধার বউ।
-হাঁইস না ফাতুর মা, এই কাউডা আমারে জ্বালাইয়া খাইল। যে দিন বা যখন একটা ভালো কাজে যাইতাছি তখুনি হঠাৎ কইরা আসমকা ডাইকা ওঠে কা কা কা। বুকটা আমার তখুন ছাঁৎ কইরা ওঠে। হেই ছোড বেলা থেইকা জাইনা আছি কোনো কাজে যাইবার কালে যদি কউরা ডাইকা ওঠে তবে চিন্তার বিষয়। কা কা কাউরা ডাইকা উঠলে অশুভ ঘটনা ঘটতে পারে।
কাকটা তখনো কা কা কা করে থেমে থেমে ডেকে উঠছে। আছিয়া ঘরে রাখা মাটির হাঁড়ি থেকে একটি বড় মুরির মোয়া নিয়ে হাতের চাপ দিয়ে মোয়াটারে ৩ টুকরা করে উঠানে নেমে কাকের চোখে পড়ে এমনভাবে ভাঙ্গা মোয়ার টুকরাগুলো শূন্যে ছুড়ে দিল। কাকটাও তার সঙ্গী আরেকটা কাক দ্রুত চমৎকার কৌশলে কপ্ কপ্্ করে দুটো মোয়ার টুকরো তাদের ঠোঁটে তুলে নিল। আরেকটা মোয়ার টুকরা মাটিতে পড়লো। এটাও তারা ক্ষণিকের মধ্যেই ঠোঁটে তুলছে বলে।
-এইবার কাউয়ার কা কা বন্ধ অইয়া গেল। আপনে যান তাড়াতাড়ি গোসল সাইরা আসেন। আজ্্কা একটু পরেই মাইয়াডারে দেখতে যাইবেন। আমাগো প্রথম নাতিনকে দোয়া করতে যাইবেন। একটা ভালো কাজে যাইতাছেন কী খুশি লাগতাছে আমার। ফাতুও ভালো আছে, বেয়াই আইসা খবর দিয়া গেল নাতিনডা দেখতে খুউব সুন্দর অইছে। আইজ আর মেজাজ খারাপ কইরেন না।
এই নেন লুঙ্গি আর গামছা। আমি আপনার পাঞ্জাবি-পাজামা ঠিক কইরা রাখছি। একটু আগেভাগেই তৈয়ার থায়েন। লঞ্চের আওয়াজ পাইলে শেষে ছোটাছুটি লাইগা না যায়। ভাত প্রায় হইয়া গেছে। আপনার পছন্দের আন্ডা ভাজি, ঘি আর এটুটু সালন ঠিক কইরা রাখতেছি। নাতনিরে দোয়া করণের সোনার হারডার বাক্্সোডা ঝলমল কাগজে মুইডা পাঞ্জাবির সঙ্গে রাইখা দিছি। যাওনের সময় যেন ভুইলা না যান।
হ ফাতুর মা আপনে ঠিকই কইছেন। আইজ এমন একটা খুশির দিনে মন মেজাজ খারাপ করা ঠিক না। কিন্তু কী করমু কনতো। এই দামড়া কাউডার কা কা ডাকাডাকি একদম সহ্য অয় না। কাউয়াডা আমার দুশমন আমার সতীন।
হি হি করে মিহি সুরে হেসে ওঠে আছিয়া।
-আপনার সতীন? এই কইলেন ‘দামড়া কাউয়া’। আপনার সতীন অইব ক্যামনে! কাউডা মাইয়া কাউয়া আমার সতীন। আপনারে খুব ভালোবাসে বইলা আপনার পিছ ছাড়ে না। হাসতে হাসতে আছিয়া স্বামীকে তাড়া দিয়ে রান্না ঘরের দিকে চলে যায়।
জলিল মৃধা লজ্জা পায়। বোকা বনে যায়। আবার চমকেও ওঠে। আছিয়া এটা কী বলল! কাকটা তার সতীন! সঙ্গে সঙ্গে চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটা মুখ ভালোবাসার মুখ কুলসুম। জলিল মৃধার এতো সুন্দর সংসার, আছিয়া শুধু দেখতেই সুন্দর নয় স্ত্রী হিসেবে জলিল মৃধাকে সব দিক দিয়েই সুখে রেখেছে আনন্দে রেখেছে। জলিল মৃধাও আছিয়াকে গভীরভাবে ভালোবাসে। বড় মেয়ে ফাতেমা। তাকে ভালো পরিবারে বিয়ে দিয়েছে। জামাই জেলা পরিষদে সেনিটারি বিভাগে চাকরি করে। অনেক মান-সম্মান। ফাতেমার পর ৩টি ছেলে। বড়টি কালাম মৃধা এবার এসএসসি দেবে। ছোট দুটিও স্কুলে যায়। অবস্থাপন্ন কৃষক জলিল। অনেক জমি-জিরাত তার। পারিবারিকভাবেই পেয়েছে। নিজেও কিছুটা কিনে নিয়েছে।
ধান, পাট, মরিচ, পেঁয়াজ, ডাল সবই ভালো ফলন হয়। পুকুর ভরা মাছ। অনেক নারকেল গাছ, সুপারি গাছ। পুকুরের চার পাশে ছাড়াও দু’তিনটি গাছ-গাছালির বাগান। বনও বলা যায়। আম, জাম, কাঁঠাল, জামরুল, গাব গাছসহ কাঠের গাছ কড়ই, জারুল, মেহগিনি গাছের সংখ্যাও অনেক।
সুন্দর সাজানো সংসার। সেকদী গ্রামের মৃধা বাড়ির চারটি পরিবারই অবস্থাপন্ন। চাষাবাদে তারা ভালো আছে। গ্রামের এরকম ছয়-সাতটি পরিবার আছে। তাদের হাতেই জমি জিরাত বেশি। বাকি মানুষগুলো খেটে খাওয়া মানুষ, কৃষক-মজুর, বর্গাচাষি, কয়েকটা জেলে পরিবার আছে। ছৈয়াল আছে, কাছমিস্ত্রী আছে।
মৃধা বাড়ির সামনের বাড়িটাই বরকন্দাজ বাড়ি। এ বাড়ির ছৈয়াল মোল্লার পরিবারটাই ছেলেমেয়ে নিয়ে অনেক সদস্যের সংসার। সবাই ক্ষেতমজুর। নিজেরা কামলা খেটে দু’একটা জমির মালিক হয়েছে কয়েকটা গরু-ছাগল পোষে। গাভীর দুধ নিজেরা না খেয়ে মৃধা বাড়িতে কিছু বিক্রি করে বাকিটা বাজারে বেচে দিয়ে লবণ, তেল, কেরোসিন এসব বাজার-সদায় করে। বরকন্দাজ বাড়ির মেয়েরা এই মৃধা বাড়িতেই ফুট ফরমায়েস খাটে। ধান সেদ্ধ করা, শুকানো, মরিচ শুকানো, ধান ভানা, চাল ঝাড়া থেকে শুরু করে রান্নাবান্না ও হাঁস মুরগি দেখাশোনা, ঘর উঠান ঝাড় দেয়া ইত্যাদি কাজে ধারাবাহিকভাবেই লেগে থেকেছে।

কুলসুম এই ছৈয়াল মোল্লার ছয়টি মেয়ের চার নম্বর মেয়ে। তার মায়ের সঙ্গে বড় বোনদের সঙ্গে মৃধা বাড়িতে কাজ করার সূত্র ধরেই তিন চার বয়স থেকেই যাওয়া আসা। জলিলদের পারিবারেই কুলসুমের মা ও তার বড় মেয়ে আবিদার সঙ্গে কুলসুম চলে আসতো।
জলিল কুলসুমের চেয়ে তিন বছরের বড়। জলিলরা পাঁচবোন ছয় ভাই।
অনেক বড় সংসার। তাই তিন-চার জন পুরুষ ও মেয়েকে দিয়ে নিয়মিতভাবেই কাজ করিয়ে সংসার গুছাতে হতো জলিলের মায়ের।
কুলসুম সেই শৈশব থেকেই নেচে নেচে খেলতে খেলতে জলিলের সঙ্গে সখ্যতা এবং খেলার সঙ্গী। সেইকালে গ্রামে চাকর মুনিবদের সঙ্গে একটা দূরত্ব থাকলেও খুব ছোট বেলায় দূরত্বটা থাকতো না। ধনী-গরিব মনিব-চাকরদের ছেলেমেয়েরা এক সঙ্গে খেলাধুলা করে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দূরত্বটা ধীরে ধীরে তৈরি হয়। বিভাজনটা হতে থাকে। আট বছর বয়সে পড়লেই মেয়েদের আর ছেলেদের সঙ্গে মিশতে দিতো না।
কুলসুম ও জলিল এমনি একসঙ্গে খেলাধুলা, দৌড় ঝাঁপ, গাছে ওঠা, গাব গাছে উঠে পাকা গাব খুঁজে খাওয়া, নদীতে সাঁতার ও ‘লুবি’ খেলা, কতদিন নদীর ঘাটে দৌড়ে এসে পরনের ছোট শাড়ি, লুঙ্গি, হাফ প্যান্ট ছেড়ে দিয়ে উদম গায়ে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা খেলাধুলা করে যখন চোখ লাল হয়ে যেত ডাঙায় উঠে ন্যাংটো ও ক্লান্ত শরীরটা পাড়ে রাখা পরিধান জড়িয়ে বাড়ির দিকে হাঁটা দিত।
সেকদি গ্রামের মেয়ে কুলসুম অন্য মেয়েদের থেকে ভিন্নভাবে চলাফেরা করতো। নয়-দশ বছর পর্যন্ত সে অবাধে জলিলের সঙ্গে মিশতো। নদীতেও উদম গায়ে সাঁতার কাটা লুবি খেলায় কেউ তেমন আপত্তিও করতো না। আর কুলসুম ছিল খুব হাসি খুশি, সবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার, আদাব কায়দায় সে অন্য মেয়েদের থেকে এগিয়ে ছিল। বয়স্ক ও মুরব্বিদের দেখলে পায়ের আঙুল ছুঁয়ে সালাম দিত। তাদের ভালোমন্দের খোঁজ খবর নিত। দাদা, দাদি, নানা, নানী, ফুফু, মামা সম্বোধন করে এবং কখনো কখনো মুরব্বিদের হাতের পায়ের নোক কেটে দিয়ে, পাকা চুল বেছে দিয়ে, উঁকুন বেছে চুলে তেল মাখিয়ে, আঁচড়িয়ে দিতো। বাতের ব্যথায় তাদের হাত-পা টিপে দিয়ে মজার মজার কথা বলতো আবার তাদের বেলা-অবেলার গল্প খুউব মজা করে শুনতো। বাজে কর্মে সে বেশ চটপটে ও সহজ ছিল সবাই তাই কুলসুমকে ভালো চোখে দেখতো। তার চমৎকার হাসিটা সবাইকে খুব আনন্দ দিত।
কুলসুম দিনে দিন বড় হচ্ছে। বড় হচ্ছে জলিল। আগরে মতো নদীতে ঝাঁপাঝাঁপি করা হয় না। কুলসুম কখনো কখনো গাছে উঠলেও সেখানে জলিলের থাকা হয় না। কুলসুম এখন তার মায়ের পরিবর্তে মৃধা বাড়িতে জলিদের পরিবারেই কাজে যোগ দিয়েছে। সারাক্ষণই জলিলের মায়ের সঙ্গে ল্যাপ্টে থাকে। খুউব চটপটে ও হাসি খুশিতে সুন্দরভাবে কাজকর্মগুলো সমাধা করে বলে মায়ের বাড়তি আদর পায় কুলসুম।
কুলসুম বরাবরই বেশ চতুর ও কৌতুক প্রিয়। জলিলের চার পাশ দিয়ে ঘুরলেও জলিলকে খুব একটা গুরুত্ব দেয় না। অন্যদিকে জলিল কুলসুমকে একান্তে পাওয়ার জন্য কত চেষ্টা করে কিন্তু কুলসুম মুচকি হাসি দিয়ে এড়িয়ে যেতে খুব পছন্দ করে। মায়ের কাছে পানি চায় কুলসুম তড়িঘড়ি জলিলের পছন্দের কাঁসার ঘটিতে পানি নিয়ে এগিয়ে দেয়। জলিলের হাতে পানির ঘটিটা দিতে গিয়ে ইচ্ছে করে হাতের ধাক্কা দিয়ে কিছু পানি জলিলের হাত ও গায়ের কাপড় চোপড়ে ফেলে দিয়ে ভিজিয়ে দেয়। তারপর হায় হায় ভুল অইয়া গেছে, আমি মুইছা দেই বলে শাড়ির ছোট্ট আঁচল দিয়ে জলিলের হাত ও গা খুব যন্ত করে মুছতে মুছতে মুখটা কানের কাছে এনে বলে রাগ অইছেন জইল্লা ভাই? জলিল রাগ করবে কি। এটা যে কুলসুমের বুদ্ধি একটু হেসে বলেতে যায় তার আগেই কুলসুম বলে পরশুদিন রাইতে চাঁদপুর যাইয়া যে সিনেমা দেইখা আসছেন হেই গল্পটা হুনতে চাই, সুযোগ কইরা বলমু। বারে বারে পানি চাইবেন, পান-সুপারি চাইবেন, ডাবের পানি খাইতে চাইবেন, বেশি বেশি মাথা ধরছে বইলা হা হুতাশ করতে পারেন না? তাইলেই তো জইল্যা ভাইয়ের কাছে আইতে পারি। কথাগুলো বলে কুলসুম বাঁ চোখটা টিপে এমন এক মুচকি হাসি দিল যা দেখে তরুণ জলিল হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। আনন্দে খুশিতে অবাক হয়ে কোনো শব্দ বের হয় না। বুকের মধ্যে ধুক ধুক শব্দ বেড়ে যায়।
ক্যা, ক্যা, ক্যা। চমকে ওঠে জলিল মৃধা। কোথায় সে। সকালের সেই ধুমসি কাকটা আবার কী বলতে এসেছে। এই কাউডা কী আসলেই কুলসুম। কাউয়ার বেশ ধইরা বারবার তার সামনে এসে দাঁড়ায়। জলিল ভুলেই গেছে তাকে তাড়াতাড়ি গোসল সেরে খেয়েদেয়ে এখনই লঞ্চ ধরতে হবে। বাস্তবে ফিরে আসে। অনেক দেরী হয়ে গেছে। তড়িঘড়ি দুইটা ডুব দিয়ে শুকনো লুঙ্গি পরে গামছা দিয়ে ভেজা চুল মুছতে যাবে দেখে সামনে আছিয়া।
আপনে নাতিন আর মাইয়াডারে দেখতে যাইবেন না? অনেকক্ষণ কোনো সাড়া শব্দ না পাইয়া ভাবলাম গোসল করতে গিয়া কোনো বিপদে পড়লেন কিনা? এতো দেরী করছেন কেন? লঞ্চ পাইবেন কিনা আল্লাহ মালুম।
অনেক তাড়াহুড়ো করে নাকে মুখে ভাত গিলে দৌড়াতে দৌড়াতে লঞ্চঘাটে এসে দেখে লঞ্চ ছেড়ে দিচ্ছে। কাঠের সিঁড়িটা এই মাত্র চোখের সামনেই তুলে নিল। জলিল মৃধার আগে এসেও দুজন যাত্রী লঞ্চে জায়গা পায়নি। তাদের অনুনয় বিনয় করেও লাভ হয়নি। লঞ্চের সারেং তার পরিচিত স্কুলে এক সঙ্গে পড়েছে। তার আগে আসা দুজন যেখানে ব্যর্থ যাত্রী অনেক। লঞ্চের ধারণ ক্ষমতার দ্বিগুণ, মালপত্তর ও মানুষে ঠাসাঠাসি, দাঁড়াবার জায়গা পর্যন্ত নেই।
ধুমসি দাঁড় কাকটার ক্যা ক্যা ডাক শুনলেই তার চোখের সামনে প্রায়ই ভেসে ওঠে পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর আগের কুলসুমকে। কুলসুমের গায়ের রঙও ছিল কালো। কিন্তু তার হাসিটা ছিল মোহনীয়। শরীরের বাঁক, উরু, নিতম্ব আর স্তন দুটির দোলা-ছন্দ জলিল মৃধাকে তারুণ্যে পাগল করে ফেলেছিল। শৈশব থেকে খেলার সঙ্গী, তারপর তারুণ্যে মোহনীয় প্রেম, স্বপ্ন-বাস্তবতাকে অতিক্রম করার দুঃসাধ্য অভিলাস সব ব্যর্থ করে দিয়েছিল। এমনি একটি দাঁড়কাকের ক্যা ক্যা ক্যা। নাহ আবার সেই কাক ও কুলসুম। ধুত্তুর! বলে ঝেড়ে ফেলতে চাইল জলিল।
লঞ্চে উঠতে পারল না। কাকটার কা কা কা আর কুলসুমই দেরী করে দিল। আগেভাগে আসতে পারলে সে লঞ্চটা হয়তো পেয়ে যেত। তাদের ঘাট থেকে চারজনকে উঠিয়েছে।
কী করে এখন যাবে চাঁদপুরে? মেয়ে জামাইকে কথা দিয়েছে। বেয়াই এসেছিল তাকেও বলেছে আজ দুপুরের আগেই পৌঁছবে। সবাই জানে এই লঞ্চেই সে যাচ্ছে। মেয়ের বাড়িতে পৌঁছবে সাড়ে বারোটা নাগাদ। আছিয়া বারবার বলে দিয়েছে চাঁদপুরের কালিবাড়ির মোড়ে যে দুইটা মিস্টির দোকান আছে সেখান থেকে বাদশা ভোগসহ আরো কিছু মিষ্টি নিয়ে যেতে। ফাতু, জামাই দুজনেই বাদশা ভোগ খুব পছন্দ করে। গালে টোলপড়া সুন্দর হাসিটা দিয়ে আরো মনে করিয়ে দিল বাড়ি ফেরার দিন মনে কইরা আমাগো লাইগা ওই বাদশাভোগসহ মিষ্টি নিয়া আইবেন। আমাগো একটাই মাইয়া তার পয়লা নাতিন বাড়ির সবাই মিষ্টি খামু না?
লঞ্চে উঠতে পারেনি বলে দমবার পাত্র নয় সেকদি গ্রামের ধনী চাষি জলিল মৃধা। হাঁটতে থাকে চর সটকির চরের দক্ষিণ কিনার ধরে। পালতালুক ঘাটে গেলে চাঁদপুরের দিকে কেরাইয়া নাও পাওয়া যাবে। আট জনের জন্য এক একটা নাও ভাড়া খাটে। ছই দেওয়া নাও। আটজনের ভাড়া দিয়ে একাই নৌকা ভাড়া করতে পারে। কিন্তু সেটা জলিল মৃধা করে না। অন্যদের চোখ টাটাবে। চোখা চোখা বাঁকা কথা বলে অন্যদের তাতাবে।
ইস্্ বাহাদুরী, বাপ-দাদার জমি জিরাত পাইয়া নওয়াবগিরি দেখায়। নিজে কয়টা জমি কিনতে পারছস! ইত্যাদি।
তারচেয়ে চারজনকে সঙ্গে নিয়া বাকি চারজনের ভাড়া দিয়ে একটা কেরাইয়া নিয়া চাঁদপুরের দিকে যাত্রা শুরু করে। আটজনের জায়গায় পাঁচজন হলে একটু হাত পা মেলে নৌকার পাটাতনে বসতে সুবিধা। প্রায় সোয়া দুই থেকে আড়াই ঘণ্টার যাত্রা। এমনকি সে অর্ধেক ভাড়া একাই দিয়েছে বলে অন্য যাত্রীরা তাকে শোবার সুযোগ দিতে পারে। তাই-ই হলো, নৌকায় উঠতেই দাঁড় আর বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ আওয়াজে আর দুলুনিতে চোখ দুটি আরামে বুঝে গেল।
…… ….. …..
ঢেঁকিতে চাল গুঁড়া হচ্ছে। শীতকাল। খেজুরের রস ও গুড়ের মৌ মৌ গন্ধ সেকদি গ্রামের প্রায় সব বাড়িতে। ঢেঁকিতে পার দিচ্ছে কুলসুম ও আরেকটা মেয়ে। জলিল কুলসুমকে দেখে অবাক। বিকালেই নিজেদের বাড়ি চলে যায়। এখনতো বিকেল পাড় হয়ে সাঁঝবেলার দিকে। একটু পরেই মাগরিবের আজান হবে। আড়চোখে কুলসুমের পাড় দেওয়া দেখে জলিল। ওর পাছা আর উরু পায়ের ওঠা নামায় যেন ছন্দে নামছে। বুকের দুধ দুটিও তারে তারে দুলে উঠছে। মা জলিলকে দেখে এস্তে বলে উঠে বাবা জলি, আইজ অনেক কাজ। শেষ করতে করতে কুলসুমের দেরী অইয়া গেছে। দেরী অইলেতো ওর মিয়া ভাই আইসা নিয়া যায়। কুলসুম কইল ওর মিয়া ভাই আইজ হাটে গেছে। ফিরতে অনেক রাইত অইব। তুই যখন বাড়ি আছস কুলসুমরে এখনি দিয়া আয়। এখনো আঁধার নামে নাই।
ভেতরে ভেতরে জলিল পুলকিত হয়ে ওঠে কুসুম পিক করে হেসে সঙ্গে সঙ্গেই বলে খালা জল্লা ভাইয়ের লেখাপড়া আছে। আমনের কাজগুলান তো শেষ অয় নাই। আমি আমনের সঙ্গে থাইকা শেষ করি। যত রাইতই হোক মিয়া ভাইতো আসবেই।
-দুষ্টুমির হাসি চেপে জলিলের দিকে কৌতুকে তাকায় কুলসুম। মা বললেন না এখনই বাড়িত যা। আর ঢেঁকি পাড় দেওন লাগবো না।
কুসুমকে নিয়ে রওয়ানা হওয়ার আগে জলিল মায়ের কাছে একটা অনুমতি চায়।
-মা এই সময়ে রাস্তার ওই পোস্তায় এখন নানা কিসিমের লোক আড্ডা দেয়। কুলসুমের এই সাঁজ বেলায় আমার লগে দেখলে ওরা অনেক খারাপ খারাপ কথা বলতে পারে। তাই এই পুকুর পাড় দিয়া নাইমা বাগানের পাশ দিয়া, কাগুর ক্ষেত পার হইয়া নদীর পাড় দিয়া বরকনদাজ বাড়ি গেলেই ভাল হইব।
-ঠিক আছে ওরে পৌঁছাইয়া দিলেই অইল। যেখান দিয়া তোরা চাস যা।
দু’জনেই ছুটতে থাকে পুকুর পাড় দিয়ে। একদৌড়ে বাগানে উঠে যায়। হ্যাঁ”্্কা টানে কুলসুম জলিলকে বাগানের ভেতর দিয়েই জড়িয়ে ধরে। দুজনেরই শ্বাস জোরে জোরে পড়তে থাকে। কুলসুম এতো জোরে জলিলকে পেঁচিয়ে জড়িয়ে ধরে জলিল পুলকিত হয়ে উঠে, আনন্দে ভয় পেয়ে যায়। কুলসুম কী করছে। কিছুক্ষণ পর জলিলের মুখে গালে ঘাড়ে ও বুকে কুলসুম তার নরম গাল পুরা ঠোঁট ঘসে ঘসে জলিলকে আদর করে। তারপর ফিসফিস করে বলে জইলা হেদিন তুই আঁর দুদ দুইটায় হাত দিছিলি। বুকের বগলে, পেটে হাত দিয়া দলাই মলাই শুরু করছিলি। আঁই তোরে, ‘খবিশ’ বইলা ধমক দিয়া গালি গালাজ কইরা ঠেইলা ধাক্কা দিয়া ফালাইয়া পালাই ছিলাম। তুই আমার উপর রাগ করছিলি। তুইত জানস না মাইয়ারা বড় ইইলে শরীলের অনেক কিছু পাল্টাইয়া যায়। মাসে একবার নিয়ম কইরা শরীর খারাপ হয়। তখন মাইয়াগো কোনো কিছু ভালো লাগে না। কেউ গায়ে হাত দিলে মেজাজ খারাপ হইয়া যায়। যাউকগা আজগা আঁর মনড়া ভাল, তুইতো পাগলা ষাঁড়। আঁরে যত পারস আদর কর কিন্তুক কোমরের উপরে। সাবধান তলপেটের নিজে হাত দিলে তোর মরণ।
-কুলসুম, আঁই যদি তোরে বিয়া করি? তোরে ছাড়া আঁই কোন মাইয়ারে বিয়া করমু না।
শরীর দুলিয়ে হেসে উঠে কুলসুম। তাজ্জবের কথা, তুই আঁরে বিয়া করবি? তুই মনিব আঁই চাকর। তোর কত সাহস তোর বাবা মা আপন লোকরা তোরে মাইরা গাঙে ভাসাইয়া দিব। তুই চাঁদপুরে গিয়া সিনেমা দেইখা মাথাডা গেছে। এইগুলি সিনেমায় চলে। গরিব পোলারা জমিদারের মাইয়া বিয়া কইরা পালাইয়া যায়। উল্টাডাও হয়। বিয়ার আগে অল্প বয়সে এই যেমন তুই আর আঁই। কল্পনা কইরা হাতি ঘোড়া মাইরা শরীলের মিলন ঘটাইয়া কত অঘটন হইছে। কেন তুই শুনছ নাই। এই যে আমাগো বাড়ি জরিনা বুবু। লাল মিয়া মুন্সী ধনী মানুষ মাতব্বুর। কী সোন্দর মাইয়া জরিনা বুবুরে ফুসলাইয়া, টাকা পয়সা দিয়া তারে তিন নম্বর বউ বানাইবো কইয়া গাবিন করইয়া দিল। শেষে ধরাপড়ার ভয়ে মুন্সীর চাকর হাভাত্যা লুলা মজিদের লগে বিয়া দিয়া দিল। জরিনা বুবু লুলা মজিদকে জামাই কইরা বাঁচতে চাইছিল। সংসার করতে চাইছিল। লুলা মজিদ একেকবারেই সব দিয়া লুলা। রাইতের বেলা জরিনা বু তারে জড়াইয়া ধরলেই সে ভয়ে কাঁপতে থাকে। বিছানা ছাইড়া, ছোট একটা পাটিতে আম গাছের নিচে কাঁথা মুড়ি দিয়া গুমাইয়া থাকে। সুযোগ বুইজা লাল মিয়া মুন্সী জরিনা বুবুর ঘরে রাইত কাটাইয়া ফজরে মসজিদে গিয়া নামাজ পড়ে। জরিনা বুবুর দুইডা পোলা। চেহারা সুরত লাল মিয়ার মতই। কত্ত জইল্লা এডারে সংসার কয়। জরিনা বুবু কী সুন্দর মাইয়া আছিল। এট্টা ভাল জামাই পাইত। কিন্তুক তোগো মত ধনী মানুষরা, পয়সা দিয়া ভুলাইয়া ভালাইয়া গরিব মাইগ শেষ করে দেয়।

অবাক হয়ে যায় ধনী চাষির ছোট ছেলে জলিল মৃধা। বয়স তার সতের। চৌদ্দ বছর বয়সের গরিব দিন মজুরের একটি মেয়ের এই অল্প বয়সেই মানুষ, সমাজ ও সংসার নিয়ে কথা শুনে কে বলবে সে লেখাপড়া জানে না। আর যারা লেখাপড়া করে তারাও কী কুলসুমের মতো ভাবতে পারে।
এতোসব কথা বলতে বলতে দুজন দুজনকে আদর করতে করতে কেমন যেন আলাভোলা হয়ে যায় দ্রুত শ্বাস নিতে থাকে দুজনে। এমন সময় ক্যা ক্যা ক্যা। প্রচণ্ড জোরে একটা দাঁড় কাক ডেকে ওঠে। চম্কে ভয় পেয়ে যায কুলসুম।
-ওরে বাবা, কাউয়া ডাইকা উঠছে। তাও রাইতে। খারাপ ঘটনা ঘইটা যাইব। কাউডা কেমন রাইগা তাকাইতেছে। আঁধারে ওর লাল চোখটা জ¦লতাছে। কাউয়ার ডাকে খারাপ কিছু হইয়া যায়।
তাড়াতাড়ি শাড়িটা ঠিকঠাক করে কুলসুম বাড়ির দিকে দৌড়াতে থাকে। পেছনে জলিল মৃধা।
স্বপ্নের ঘুমটা ভেঙে গেল। কিছুক্ষণ আগে প্রচণ্ড বেগে ঝড় বয়ে গেছে। নৌকাটা খালের পাড়ে শক্ত করে বাঁধা ছিল। তাই জলিল ঘুমের মধ্যে ঝড়ের তাণ্ডব দেখেনি। সঙ্গের যাত্রীরা বলে ওঠেন এমন ঝড়ে ক্যামনে ঘুমাইলেন? অনেক গাছপালা, বাড়িঘর উইড়া গেছে। আল্লাহ আমাগো নাওডারে বাঁচাইছে। আমরাও রক্ষা পাইছি।
ঝড় থেমে গেছে। ভাপসা গরম উঠে গেছে। ঠাণ্ডা বাতাস বইছে। নাওটা এগুতে থাকে। বিপরীত দিক থেকে কিছু কিছু নৌকা আসছে আর তারা খারাপ কিছু বিপদের খবর দিচ্ছে। ইছলির দিকে ডাকাতিয়া নদী গভীর ও তীব্র স্রোত। ঝড়ো বাতাসে বেশ কিছু নৌকা উল্টে গেছে। সবচেয়ে ভয়াবহ খবর অনেক যাত্রী ও মালামাল বোঝাই ‘মধুমতি’ নামক লঞ্চটি ঝড়ের কবলে পড়ে গভীর পানির নিচে তলিয়ে গেছে। চাঁদপুর থেকে উদ্ধারকারী জাহাজ চেষ্টা চালাচ্ছে। কয়েকশ মানুষ ডুবে গেছে। প্রচণ্ড স্রোতে কে কোথায় গেছে। ভয়াবহ আবস্থা। এর মধ্যেই নয়জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে।
প্রচণ্ড একটা ধাক্কা খেল জলিল মৃধা। ‘মধুমতি’ লঞ্চেই তার চাঁদপুরে আসার কথা ছিল। ভোরবেলার কাকের কা কা- আর তারুণ্যের প্রেম ‘কুলসুম’ ভাবনা তাকে দেরী করে দিয়েছে বলে মধুমতিতে চড়তে পারেনি।
অস্ফুট স্বরে জলিল মৃধার গলা থেকে ধীরে ধীরে কিছু কথা বেরিয়ে আকাশের দিকে ছড়িয়ে পড়ে।
-কুলসুম, তোমার ভালোবাসা এতো নিখাদ ছিল। আজ ছাব্বিশ বছর পর বুঝতে পারলাম। আছিয়া বলেছিল দাঁড় কাকটা মেয়ে কাউয়া। আছিয়ার সতীন। ভালো মনের সতীন। সব সতীনরা খারাপ হয় না।