চোখ

আগের সংবাদ

যে কারণে বাদ পড়লেন মৌনী!

পরের সংবাদ

হয়ত রীনা ব্রাউন কিংবা নয়

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ১, ২০১৯ , ৮:১৪ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুন ২, ২০১৯, ৫:৩০ অপরাহ্ণ

অনলাইন প্রতিবেদক

বিদিশাকে হারিয়ে জীবন যখন সবচেয়ে নিষ্ঠুর মূর্তি নিয়ে আমার সামনে হাজির হয়েছিল, যখন কোনো কিছুর মধ্যেই আশ্রয় খুঁজে পাচ্ছিলাম না তখনকার কথা। সে কী ভয়ঙ্কর এক অস্থির সময় গেছে। কখনও দুর্দান্ত ক্রোধে মন ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে তো পরমুহূর্তে আবার তীব্র আক্ষেপ, তুমুল অনুশোচনা। সে এমন এক সময় গেছে যখন ঈশ্বরের কাছেও আশ্রয় খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কিন্তু তিনি তো আছেন। তিনি কখনও মানুষকে পরিত্যাগ করেন না। যখন আমার বিশ্বাস ছিল না তিনি তখনও আমার ভেতরে ছিলেন। আমি অন্ধ, তাই দেখতে পাইনি। বধির, তাই শুনিনি। সেইসব অশান্ত অস্থির দিনে তিনিই ভেতর থেকে বলে উঠেছিলেন, শান্ত হও ‘খোদাকে ঘর মে দের হ্যায়, আন্ধের নেহি’। প্রার্থনার ভাষা খাঁটি হলে খোদার কাছে তা পৌঁছবেই। কিন্তু তখন সেই আশ্বাসেও শান্ত হতে পারিনি। হায়! কুড়ি বছর আগের সেই অস্থির অশান্ত মন একমাত্র বিদিশাকে দেখেই শান্ত হতে পারতো কেবল। তবে খোদার কাছে সেদিন সেই প্রার্থনা মঞ্জুর হয়েছিল বোধহয়, কিন্তু কিছুটা ভিন্নভাবে। কুড়ি বছর আগে মনে হয়েছিল কোথায় গেলে বিদিশাকে খুঁজে পাবো? আর আজ মনে হচ্ছে কোথায় পালালে ভগ্নস্তূপ বিদিশার করুণতম ক্লান্ত মুখটি আর দেখতে হবে না? বিদিশার সঙ্গে এভাবে দেখা হোক, তা তো চাইনি। তাকে জ্বলজ্বলে নক্ষত্রের মতো দেখতে চেয়েছিলাম। যা সে হতে চেয়েছিল। যেন তাকে দেখতে হলে মাথা উঁচু করে তাকিয়ে দেখতে হয়। সেই বিদিশার সঙ্গে দেখা হলো ঠিকই। কিন্তু বড় করুণ, বড় নিষ্ঠুরভাবে। এভাবে বিদিশাকে দেখতে চাইনি। যে কঠিন পেশেন্ট পোর্টফোলিও হাতে নিয়ে আজ আমি নির্বিকার আছি, একদিন তার জন্যই তো জীবন দিতে বসেছিলাম। মে আই কাম ইন? সেই দীর্ঘকায়, প্রিয়দর্শিনী বিদিশা। ওর দিকে তাকিয়ে থমকে গেলাম। চোখ বসে গেছে, গাল সামান্য ভাঙা। বেশিরভাগ চুলই পড়ে গেছে। কোনোরকম একটা ঝুঁটি করে এসেছে। রীনা ব্রাউনের মতো ডবল বেণী করার মতো চুল আর নেই। নির্দয় ব্যাধি তার চোখের সেই ঘন কালো ফুলের কেশরের মতো দীর্ঘ পাপড়িগুলো পর্যন্ত কেড়ে নিয়েছে। অল গুল থিংস কাম টু অ্যান এন্ড। বিদিশাকে দেখে মনে পড়লো। আজ হয়ত আমার কাছে কথাটির অতখানি তাৎপর্য নেই। কিন্তু বিদিশাকে হারিয়ে চারপাশের সবাইকে যখন হিংস্র মনে হচ্ছিল, ভয়ঙ্কর অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছিল; কোনোদিন যে অন্ধকার আর কাটবে বলে মনে হয়নি, জীবনের সবকিছু শূন্য হয়ে গেছিল যেদিন, সবকিছু অর্থহীন হয়ে গেছিল যেদিন, ওই কথাটুকুনের মধ্যেই আশ্রয় খুঁজে পেয়েছিলাম সেদিন। অল গুল থিংস কাম টু অ্যান এন্ড। কুড়ি বছর পর আজ আবার অল গুল থিংস কাম টু অ্যান এন্ড এর মধ্যে আশ্রয় খোঁজার চেষ্টা করছি। তবে সম্পূর্ণ বিপরীতভাবে। সেদিন চেয়েছিলাম, বিদিশার সব সুন্দরের শেষ হোক। আজ চাইছি বিদিশার শেষটুকুন যেন অন্তত সুন্দর হয়। আমার হাতে এইটুকুই আছে মাত্র, বিদিশার জন্য কিছু করার। প্রথমে তো বিশ্বাসই করতে চাইনি। যদিও পেশেন্টের পোর্টফোলিওতে ডিটেইলস আছে। দেখে বুকের ভেতরে দ্রিম দ্রিম আওয়াজ শুরু হয়েছিল। সেই আওয়াজ ক্রমাগত বেড়েছে। একসময় চূড়ান্ত অশান্ত লাগছিল। ভয় হচ্ছিল এত জোর আওয়াজ যেন বাইরে থেকে শোনা যাবে। অনেক এফোর্ট দিয়ে নিজেকে শান্ত করতে হয়েছে। আবার একঝলক পোর্টফোলিওর দিকে তাকিয়ে কুড়ি বছর আগেকার ঝকঝকে দিনগুলো মনে পড়ে গেছে। বারবার মনে মনে উচ্চারণ করেছি, আই মাস্ট স্টে হার গো ইন পিস। আমি অবশ্যই তার যাওয়াটা শান্তিময় করবো।
যে মেয়েটি হাসপাতালে ভর্তির দু’দিন পরও পাহাড়ি ঝর্নার মতো কলহাস্যে নিজের জীবনের এতগুলি স্বপ্নের কথা বলে গেল তাকে কেমন করে বলি বিদিশা তোমার হার্টের বাম দিকে একটা টিউমারের মতো বস্তু দেখা যাচ্ছে। ওটা একটা বলের মতো তোমার মাইটার ভাল্্ভটা বন্ধ করে দিতে চাইছে। সার্জারি করে ওটা বাদ না দিলে তোমার জীবন নিয়েই সংশয়। তাছাড়া টিউমারের চেহারাটাও খুব সুবিধার নয়। ম্যালিগনেন্ট হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। যে মেয়ে কিনা রোজ ক্যালেন্ডারের পাতায় বান্দরবানের নীলগিরি পর্বত, ঝর্না আর নারকেল বীথির সৌন্দর্য দেখে আর কল্পনায় সেখানে ঘুরে বেড়ায় তাকে কেমন করে বলি যদি ওর টিউমারটি মিক্সোমা হয় তবে হয়ত সেরে যাবে। কিন্তু যদি এটা হার্টের মাংসপেশির ক্যান্সার বা র‌্যাবডোমায়োসারকোমা হয় তাহলে ওকে রেডিয়েশন নিতে হবে। হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট পর্যন্ত করতে হতে পারে।
একজন ডাক্তার হিসেবে জানি, ক্যান্সার শব্দটি কীভাবে এক ঝটকায় জীবনকে চুরচুর করে দেয়। কীভবে একটি পরিবার রুয়িন্ড হয়ে যায়। ক্যান্সার হয়েছে শোনার পর কত শক্তপোক্ত মানুষকে যে চিৎকার করে পাগলের মতো কাঁদতে দেখেছি, কেউ মাথার চুল ছিঁড়ে হাহাকার করেছে। শরীর যদিবা সামলে উঠতে পারে ধাক্কাটা, মন পারে না। সত্য যে ফিকশনের চেয়ে অবিশ্বাস্য এই পেশায় এসে সবচেয়ে বেশি বুঝেছি এটা। তারচেয়ে বেশি বুঝেছি ঈশ্বর সবসময়ই মানুষের সঙ্গে বেয়াড়া রসিকতা করতে ভালোবাসেন। এবং প্রায়ই বিপজ্জনক সব খেলা খেলেন। আমি পেশাদার ডাক্তার। যখন তখন যে কাউকে দুঃসংবাদ দেয়াটা আমার পেশারই অংশ। কিন্তু বিদিশা আমাকে বোবা করে দিল। একবার মনে হলো, হাসপাতালের ডিরেক্টর এবং পেশেন্ট কাউন্সিলরের সঙ্গে মিটিং করে ওকে অসুখের কথা না জানাই। কিন্তু আমি নিশ্চিত জানি কেউই আমার সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হবে না। আইনের কাছে পরাজিত হবে আবেগ। পেশেন্টকে তার রোগ সম্পর্কে জানানোর অধিকারের যে আইন নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে সারা বিশ্বে তোলপাড় চলছে তাতে নির্ঘাত ফেঁসে যাবো আমি। কিন্তু আমি তো জানি বিদিশার অবাস্তব জেদের কথা, তার অন্তহীন উচ্চাশার কথা। এক মুহূর্তে তার জীবন থেমে যেতে পারে, এমন আশঙ্কা আছে শোনার পর বিদিশার যে পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার শুরু হবে তা থেকে ওর রেহাই মিলবে না কিছুতেই। ক্যান্সার যদিবা রেহাই দেয় ট্রমা রেহাই দেবে না।

দুই.
খোদার কাছে কায়মনোবাক্যে কিছু প্রার্থনা করলে তিনি তা শোনেন। অন্তত আমার জীবনে বারবার এই ঘটনা ঘটেছে। তখন আমি ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র। সিলেবাসের বাইরে অন্য কোনো বই পড়েছি বলে মনে পড়ে না। বই পড়ার মতো স্থির শান্ত ছিলামই না। তখন অফুরন্ত আশা, অগাধ স্বপ্ন, অবাধ আনন্দের হাতছানি, সীমাহীন চাঞ্চল্য। বেপরোয়া, বেসামাল রুটিন। কী এক কারণে যেন তারাশঙ্করের সপ্তপদী হাতে এসে পড়েছিল। ও মনে পড়েছে। ইন্টারমিডিয়েট সেকেন্ড ইয়ারে জন্মদিনে বিদিশা উপহার দিয়েছিল বইটি। কৃষ্ণেন্দু চরিত্রটি তখন এত ভালো লেগে গেল যে বাকি জীবনে কৃষ্ণেন্দুর ঘোর আর কাটেনি। না, ভুল বললাম। কৃষ্ণেন্দুও নয় ঠিক। আসলে কৃষ্ণেন্দু যতখানি মনোযোগ টেনেছিল তার চেয়ে অনেক বেশি ঘোর তৈরি করেছিল, কৃষ্ণেন্দু থেকে রেভারেন্ড কৃষ্ণস্বামী হয়ে ওঠার ঘটনাটি। ঈশ্বর তখন নিশ্চয়ই আড়াল থেকে হেসেছিলেন। কারণ কিছুদিন বাদে আমার জীবনেও ঘটতে যাচ্ছে পয় একইরকম ট্রাজেডি। ‘খোদাকে ঘর দের হ্যায়, অন্ধের নেহি’। খোদার কাছে কায়মনোবাক্যে কিছু প্রার্থনা করলে তিনি তা শোনেন। আমার ক্ষেত্রেও শুনেছিলেন। চোখ বন্ধ করলেই তখন দেখতে পেতাম রেভারেন্ড কৃষ্ণস্বামীর মতো অরণ্য অঞ্চলে আদিবাসীদের ‘দেওতা ডাক্তার’ হয়ে গেছি। গ্রাম গ্রামান্তরে ঘুরে বেড়াচ্ছি বাইসাইকেল নিয়ে, পেছনে বাঁধা ওষুধের বাক্স। কাউকে বলছি এই ওষুধটা আমার ভাঁড়ারে নাই, এটা দোকান থেকে কিনে আনতে হবে। কখনও দেখি, শালবনের কাছে লালমাটির রাস্তা ধরে ঘুরে প্রত্যেক রোগীর বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ নিচ্ছি, যাদের সবাইকে আবার আমি নাম ধরে ধরে চিনি। আর তারাও আমাকে ডাকে রেভারেন্ড কৃষ্ণস্বামীর মতো পাগলা পাদ্রি বলে। পাগলা পাদ্রি ডাক্তার কৃষ্ণস্বামী হওয়ার সেই ঘোর এখনও কি কেটেছে? এখনও যদি বিদিশা আমাকে কৃষ্ণেন্দু বলে ডাকে তা কি আমার মস্তিস্কে ধাক্কা দেবে না? আশ্চর্য তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়বে না অনুভূতির মধ্যে? সেই রেভারেন্ড কৃষ্ণস্বামীর ঘোরেই আছি। যদিও তেমন কিছু রোগীদের জন্য করতে আর পারি কই? বাস্তব জীবনে কৃষ্ণেন্দুর মতো ডাক্তার হওয়া কী যে কঠিন! অবশ্য কাঠখোট্টা, পেশা সর্বস্ব, অপারেশনের আগে টেবিলে গুনে গুনে টাকা না রাখলে ওটিতে ঢুকবো না এমন হওয়াটা আমার জন্য আরো কঠিন। তবে জীবনে একবার যার কৃষ্ণস্বামীর মতো পরহিতব্রতী চিকিৎসক হওয়ার নেশা চেপে যায় তার পক্ষে আর সেখান থেকে বেরোনো সম্ভব নয়। কিছুদিন আগে এক হোমলেস রোগী এসেছিল হাসপাতালে। বাসে চাপা দেয়ার কেস। ভদ্রলোক ছিল সাইকেলে। রাস্তার বাঁকের মাথায় পিছলে গেছে চাকা। পেছন থেকে বেপরোয়া বাস এসে পিষে দিয়ে গেল হাঁটুর নিচের পুরোটাই। ব্যস্ত ঢাকার প্রতিদিনের সড়ক দুর্ঘটনার গল্প। এসব ঘটনায় যা হয়, বেশিরভাগ মানুষই পাশ কাটিয়ে যায়। অনেকে ভিড়ের মধ্যে মাথা গলায় বটে কিন্তু দায়িত্ব নিয়ে হাসপাতাল পর্যন্ত আসে না। তবে কেউ কেউ থাকে ব্যতিক্রম; নিষ্ঠুর শহর যাদের কোনোদিন নিরাবেগ নির্লিপ্ত করতে পারে না। তেমনই একজন অপরিচিতজন সঙ্গে নিয়ে এসেছিল ভদ্রলোক। সঙ্গে স্বজন নেই। সাধারণত এসব রোগীকে নিয়ে আসা হয় ইমারজেন্সিতে। আর ইমারজেন্সিতে যা হয়। তাড়াহুড়া, যত্নহীন, রোবটের মতো একদল মানুষ ট্রলি ঠেলে ঠেলে পেশেন্টকে ওটিতে ঢোকায় শুকনো কর্তব্যের ছলে। ডাক্তারদের নার্ভ এমনিতেই শক্ত। ইমারজেন্সি ওয়ার্ডে কাজ করতে করতে তা হয়ে যায় রোবটের মতো। কোনো করুণ ঘটনাই সেই মস্তিষ্কে ছাপ ফেলতে পারে না। সেটাই হওয়ার কথা। প্রতিদিন এত মৃত্যু, এত দুর্ঘটনা। ডাক্তাররাও মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকেন সব ধরনের মৃত্যু দেখার জন্য। প্রতিদিন শত শত মৃত্যু দেখে স্পট ডেড শব্দটিও ভিন্ন কোনো ভাবান্তর আনে না মনে। পেশাদারদের মতো বলে ফেলে, সরি, রোগীকে বাঁচানো গেল না। দেখলাম ভদ্রলোককে কেউ দেখতে আসে না। ইমারজেন্সিতে খোঁজ নিলাম, সেখানকার ডাক্তার বললো, কোনোরকম বাঁচানো গেছে, তবে বাম পাটা ছাড়াই। ডাক্তরি ভাষায় ‘অ্যাম্পুটেড বিলো দ্য নি’। ভদ্রলোকের ঘটনাটি ট্র্যাজিক। পার্মানেন্টলি ক্রিপলড জেনে আত্মীয়স্বজন যাও ছিল কেটে পড়েছে। অফিস থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, নেচার অব দ্য জব রিকোয়ার্স অ্যান এবল পারসন। একজন ডিসেবলকে রাখার জন্য কোম্পানিতে প্রভিশন নেই। চাকরিটা থাকবে না জেনে যে দু’একজন স্বজন ছিল তারাও যে যার মতো কেটে পড়েছে। কেউ খবর নিতে আসে না ভদ্রলোকের। এই করুণ কেসটিকে আমি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলাম। জানতাম আমাদের দেশে না হলেও বাইরে কোথাও নিয়ে গেলে ঠিকই ভদ্রলোক আবার নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবেন। দু’চারটে বড় বড় ওষুধ কোম্পানি আমাদের ফ্ল্যাট গাড়ি দিতে চায়। তাদের একজনকে অনুরোধ করে ভদ্রলোকের বাইরে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা গেল। স্টুডিওতে নিয়ে গিয়ে ফটো তোলার ব্যবস্থা করা, ভালো এজেন্ট ধরে পাসপোর্টের ব্যবস্থা করা, ইমেইল করে ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে স্পন্সরশিপের জোগাড়যন্ত্র করা, ব্যাংকের স্টেটমেন্ট অব অ্যাকাউন্ট আনানো, টিকিট বুক করা, ভিসার জন্য আমেরিকান অ্যামবেসিতে অনলাইন অ্যাপোয়েন্টমেন্ট নেয়া। নিজে গিয়েছিলাম ওই রোগীর সঙ্গে। চব্বিশ ঘণ্টার জার্নিতে অসুস্থ মানুষটির ভেরিকোজ ভেইন থ্রম্বোসিস যেন না হয় তার জন্য দুই সিটের মাঝখানে ওয়াক ওয়েতে রোগীকে হাঁটাহাঁটি করিয়েছি, প্রেশারাইজড কেবিনে ডিহাইড্রেশনের সমস্যা কাটানোর জন্য ত্রিশ মিনিট পর পর ড্রপারে পানি খাইয়েছি। এমন দু’একটি ঘটনায় নিজেকে রেভারেন্ড কৃষ্ণস্বামী ভেবে মিথ্যে তৃপ্তি যে নিইনি বললে মিথ্যে বলা হবে। এমন কিছু ভুল সন্তুষ্টি নিয়েই তো বেঁচে থাকা। মিথ্যে কৃষ্ণেন্দু, মিথ্যে রেভারেন্ড কৃষ্ণস্বামী।

তিন.
ভোরের শুরুতে আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন। তখন মনে হয়েছিল ঝড়বৃষ্টির জোর সম্ভাবনা থাকছে আজও। ক’দিনের টানা বৃষ্টিতে গাছের ডালে শ্যাওলা জমে জমে অদ্ভুত এক সুবাস তৈরি করেছে। ভোরের বাতাসে অচেনা সেই সুবাস কীরকম ঘোর তৈরি করেছে। হাতের আঙুলের মতো চেনা হাসপাতালের বাউন্ডারিটিও অচেনা করে দিয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিম ঈষাণ কোণের মেঘ সরে যাচ্ছে। একটু আগে যে নৈঋতি হাওয়া বইছিল থেমেছে তাও। হাসপাতালের উঁচু বাউন্ডারি ঘেঁষা গাছগুলোর ওপর সদ্য সকালের নরম রোদ এসে পড়েছে। ঘরের জানালার পর্দা সরাতে লেবু ফুলের রঙের ফিকে আলো সম্ভাষণ জানালো। অন্ধকার থাকতেই আমার বিছানা ছাড়ার অভ্যাস। ফিনফিনে পাতলা সেই অন্ধকারে পাখিরাও যখন বাসা ছেড়ে ওড়ার সাহস পায় না; পাখিদের আড়মোড়া ভাঙার আগেই আমার ঘুম ভাঙে। অন্যান্য দিনের মতো বেশিরভাগ ওয়ার্ডের রোগীরা এখনও ঘুমে। আজ ক’দিন ধরে মনের মধ্যে তুমুল এক উথাল-পাতাল টানাপড়েন চলছে। বিদিশা আমার স্ত্রী। অবশ্য প্রাক্তন স্ত্রী বললেই হয়ত যথার্থ বলা হয়। আমাদের দু’জনের ঈশ্বর এক, ঈশ্বর বিশ্বাস এক। দু’জনেই মেডিকেলের ছাত্রছাত্রী। দু’জনেরই আর্থিক স্ট্যাটাস প্রায় সমান। তাই পরিবার থেকে বিয়েতে তেমন কোনো বাধা ছিল না। তাছাড়া বিদিশাকে তো আগে থেকেই চিনতাম। রেভারেন্ড কৃষ্ণস্বামীর চরিত্রটিকে ভালোবেসেই তো সে আমাকে উপহার দিয়েছিল সপ্তপদী। নির্লোভ বিদিশা, নিষ্পাপ বিদিশা, নিষ্কলুষ বিদিশা হঠাৎ করেই যেন বদলে গেল। রেভারেন্ড কৃষ্ণস্বামীর মতো গ্রামে গ্রামে গিয়ে গরিব রোগীদের চিকিৎসার বদলে আমাকে ক্রমাগত চাপ দিতে লাগলো ক্লিনিক খোলার। তারপরের সমস্ত ঘটনাই বিদিশার জীবনকে বেপরোয়া খাদের কিনারায় নিয়ে গিয়েছিল। কোন ঘূর্ণির মধ্যে যে পড়েছিল সে এবং কেন, আজ তা জানার কোনো উপায় নেই। কেন সে চলে গিয়েছিল এমন বেসামাল হতাশার পথে, হয়ে উঠেছিল ডেয়ার ডেভিল, তাও আর জানা যাবে না কোনোদিন। কোনো দেহজ দুর্বলতা? একজন মানুষ জীবনে বহুবার বদলায়। বদল কিংবা রূপান্তর তো স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু বিদিশার রূপান্তর কোনোভাবেই তার বেসিক স্বভাবের সঙ্গে মেলে না। কে জানে মানুষের মন আরো কত বিচিত্র হতে পারে। যে জীবন মানুষ এত ভালোবাসে সেই জীবনই কেন নিজের হাতে নষ্ট করে ফেলে মানুষ? নষ্ট যে হয়েছে জীবন তার প্রমাণ তো পাওয়াই গেল। আজ সে সঙ্গীহীন, একা, চূড়ান্ত একা হয়েই ভর্তি হয়েছে হাসপাতালে। জানি, বিদিশা আমার সামনে তার জীবনের যে সুখের স্কেপ তুলে ধরেছে তার পুরোটাই মিথ্যে। কোনো দায়িত্বশীল স্বামী তার স্ত্রীকে এভাবে হাসপাতালে ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারে না। বিদিশা নিজেই একটি ক্যামোফ্লেজ তৈরি করে রেখেছে। হয়ত আমার কাছে পরাজিত হতে চায় না বলে। কিংবা হয়ত এর পেছনে অন্য আর কোনো গভীর সত্য লুকিয়ে আছে। সে গল্পও কি শোনার সুযোগ হবে কোনোদিন? সিডেটিভ দিয়ে এখন ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে বিদিশাকে। নিষ্কম্প নিথর বিদিশা। হায় ঈশ্বর! যেন বিদিশার মিথ্যে গল্পই সত্যি হয়। তাকে লজ্জায় ফেলতে কিছুতেই সায় দেয় না মন।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা