মায়া ও আমার পুত্র

আগের সংবাদ

চোখ

পরের সংবাদ

রবীন্দ্রনাথ ও বিবেকানন্দের সৌহার্দ্য

সঙ্গীত চর্চার সূত্রে

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ১, ২০১৯ , ৮:১১ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুন ২, ২০১৯, ৫:২৯ অপরাহ্ণ

অনলাইন প্রতিবেদক

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও স্বামী বিবেকানন্দ- একজন কবি, আরেকজন সন্ন্যাসী। একজন গৃহী, অন্যজন গৃহত্যাগী। চিন্তায়, ভাবনায়, জীবনাচরণে- এই দু’জনের অবস্থান একান্ত বিপরীতধর্মী হওয়াই তো স্বাভাবিক। নাম শুনেই হয়তো অনেকে এ রকমই বলে বসবেন, এ দু’জনের পারস্পরিক সম্পর্কের কথা ভাবতেও পারবেন না হয়তো।
আসল ব্যাপারটি কিন্তু অনেকাংশেই অন্যরকম। এই দু’জনের মধ্যে সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গভীর, অনেক বিষয়ে মতভিন্নতা সত্ত্বেও কোনো কোনো বিষয়ে ছিলেন পরস্পরের পরিপূরক। এই দুই মনীষীর মতভিন্নতা ও পারস্পরিক পরিপূরকতার বিষয়টির অনুপুঙ্খ পর্যালোচনা করলে আমাদের চিন্তাচর্চার ইতিহাসের অনেক অন্ধকার কোণই আলোকিত হয়ে উঠবে।
রবীন্দ্রনাথের জন্ম ১৮৬১ সালের ৭ মে, আর বিবেকানন্দের (আসলে নরেন্দ্রনাথ দত্তের, সন্ন্যাস গ্রহণের পূর্বে এই নামেই ছিল তাঁর পরিচয়) ১৮৬৩ সালের ১২ জানুয়ারি। অর্থাৎ বিবেকানন্দ ছিলেন রবীন্দ্রনাথের চেয়ে প্রায় দেড় বছরের ছোট। অন্যদিকে চল্লিশ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই ১৯০২ সালের ৪ জুলাই বিবেকানন্দের জীবনাবসান ঘটে, আর রবীন্দ্রনাথ ৮০ বছর ৩ মাস বেঁচে থেকে মৃত্যুবরণ করেন ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের জীবৎকাল ছিল বিবেকানন্দের দ্বিগুণ।
রবীন্দ্রনাথ ও নরেন্দ্রনাথ- শৈশবকালেই পরস্পর পরিচিত হয়েছিলেন এবং দু’জনের ভেতর অতি স্বল্প সময়ের জন্য হলেও সদ্ভাব স্থাপিত হয়েছিল। এই সদ্ভাবের উৎস ছিল সঙ্গীতচর্চা। এছাড়া ধর্মবিশ্বাসের দিক দিয়েও তখন উভয়ে অনেকটাই একাত্ম ছিলেন। পারিবারিকভাবেই রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ‘আদি ব্রাহ্মসমাজ’ভুক্ত। কিশোর নরেন্দ্রনাথের সংযোগ ছিল ‘সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ’-এর সঙ্গে। তবে সঙ্গীতচর্চার সূত্রেই কৈশোরে রবীন্দ্রনাথ ও নরেন্দ্রনাথের সৌহার্দ্যরে সৃষ্টি হয়েছিল। এই দুই কিশোরের সঙ্গীতচর্চার সঙ্গে ব্রাহ্মভাবনাকেও সংশ্লিষ্ট করে না দেখে পারা যায় না।
এ প্রসঙ্গে রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশনের সহসম্পাদক স্বামী সুবীরানন্দ লিখেছেন-
“নরেন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ ব্রাহ্মসমাজের দুই গোষ্ঠীর দুজন তরুণ হিসাবে প্রাথমিকভাবে তাঁদের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। আদি ব্রাহ্মসমাজের রবীন্দ্রনাথ ও সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের নরেন্দ্রনাথের ব্যবধান সেকালে খুব অল্প ছিল। ইতিহাসের ধারায় সেই দুই ব্যক্তিত্বের ব্যবধান যদি স্বল্পতর হয়ে যেত, তাহলে আশ্চর্যের বিষয় কিছুই ছিল না, বরং সেটাই ছিল খুব স্বাভাবিক। কিন্তু বহিরঙ্গের ঘটনাপ্রবাহের ফলশ্রুতি হিসাবে বলা যেতে পারে, ঠিক তার বিপরীত পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ আজীবন ব্রাহ্মসমাজের একজন ছিলেন ঠিকই, কিন্তু সময়ের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের চিন্তা ও কর্ম কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সংজ্ঞাকে তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলেনি। অন্যদিকে, সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের সদস্য নরেন্দ্রনাথ তাঁর তীব্র আধ্যাত্মিক পিপাসা নিয়ে সত্যস্বরূপ শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে ছুটে গিয়েছিলেন এবং সেই সংযোগ ধীরে ধীরে তাঁকে ‘স্বামী বিবেকানন্দ’-এ উত্তীর্ণ করেছিল। বিভিন্ন গবেষক তাঁদের উভয়ের চিন্তা ও কর্মকে গভীর ও আন্তরিকভাবে অনুধাবন করে দেখেছেন যে, তাঁরা অনেক স্থানে পরস্পরের অতি কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছেন, তাঁদের আপাতবিরোধ ও বৈষম্যের অন্তরালে তাঁরা অনেক সময় নিকটতম সান্নিধ্যে অবস্থান করেছেন। তাঁদের প্রচ্ছন্ন ঐক্য ও সামঞ্জস্য অনেক ক্ষেত্রে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে সহিষ্ণু গবেষকদের অনুমান।”
স্বামী সুবীরানন্দ এ-ও লক্ষ করেছেন যে,
“রবীন্দ্রনাথ ও নরেন্দ্রনাথ যে দুই পরিবারের সন্তান ছিলেন, তাদের মনোভাব ও বিশ্বাসের মধ্যে ব্যবধান ছিল। তবে উভয়ের মধ্যে একটা মিলও ছিল। দুজনই জন্মগ্রহণ করেছিলেন এমন বংশে, যাঁদের সম্পূর্ণ সনাতনপন্থী বলা যায় না। উভয়ের বংশের পূর্বপুরুষগণ ইংরেজি শিক্ষা ও ইউরোপীয় চিন্তাধারার সংস্পর্শে এসেছিলেন। পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের অধ্যাত্মসাধনা ও ধর্মচিন্তা রবীন্দ্রনাথের ওপর প্রভাব বিস্তার করবে- এটাই স্বাভাবিক। অন্যদিকে নরেন্দ্রনাথও আইনজীবী পিতা বিশ্বনাথের কাছ থেকে একদিকে যেমন লাভ করেছিলেন তীক্ষè বিচারবোধ ও যুক্তিশীলতা, তেমনি অন্যদিকে পেয়েছিলেন তীব্র অনুভূতিপ্রবণ মন ও সঙ্গীতের ওপর অধিকার।…দেবেন্দ্রনাথের অধ্যাত্মসাধনা ও ঠাকুরবাড়ির সাহিত্য, শিল্প ও সঙ্গীতসাধনা রবীন্দ্রনাথের প্রতিভার মধ্য দিয়ে পূর্ণতা লাভ করেছিল। নরেন্দ্রনাথের পিতামহ দুর্গাচরণের তীব্র সংসারবৈরাগ্য ও সন্ন্যাসবৃত্তি অবলম্বন হয়তোবা নরেন্দ্রনাথের রক্তে খেলা করেছিল। তবে শ্রীরামকৃষ্ণ সংসর্গ না হলে নরেন্দ্রনাথের জীবন কোন খাতে প্রবাহিত হতো, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।”
পরে আমরা অবশ্যই শ্রীরামকৃষ্ণের সংস্পর্শে এসে নরেন্দ্রনাথের বিবেকানন্দ হয়ে ওঠার বিষয়টির পর্যালোচনা করবো। রবীন্দ্রনাথও শ্রীরামকৃষ্ণের ভাবগঙ্গায় অবগাহন করে কী পেয়েছিলেন, তা-ও আমরা দেখে নেবো। তবে এর আগে ঠাকুরবাড়ির রবীন্দ্রনাথ ও দত্তবাড়ির নরেন্দ্রনাথের সংযোগসূত্রটির প্রতি দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।
নরেন্দ্রনাথ দত্ত ছিলেন রবীন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা দ্বিজেন্দ্রনাথের পুত্র দ্বিপেন্দ্রনাথের সহপাঠী। উভয়েই তাঁরা জেনারেল অ্যাসেম্বলি স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাস করেন। এই সূত্রেই ছিল ঠাকুরবাড়িতে নরেন্দ্রনাথের যাওয়া-আসা।
দ্বিপেন্দ্রনাথের স্ত্রী হেমলতা ঠাকুর তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন-
“আমার স্বামী আর স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন বাল্যবন্ধু।… সন্ন্যাসধর্ম নেওয়ার আগে তিনি প্রায়ই আমার স্বামীর কাছে আসতেন, কিন্তু পরে দেখাসাক্ষাৎ হতো মধ্যে মধ্যে। এন্ট্রান্স পাস করে আমার স্বামী আর পড়লেন না। কিন্তু বিবেকানন্দ কলেজে ভর্তি হলেন। বিবেকানন্দ বাল্যবয়সে আমার স্বামীর কাছে এসেছেন, তখন তিনি সন্নাস গ্রহণ করেননি- সে আমি দেখিনি। কিন্তু পরে বিবেকানন্দ আমাদের জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে এসেছেন, পরনে গেরুয়া বসন, মাথায় পাগড়ি। আসতেন মহর্ষির (দেবেন্দ্রনাথ) সঙ্গে দেখা করতে। আলাপ-আলোচনা করে চলে যেতেন। …আমার মনে আছে, শিকাগো পার্লামেন্ট অব রিলিজিয়ন্স থেকে ফিরে এসেই বিবেকানন্দ জোড়াসাঁকোতে এসে মহর্ষির সঙ্গে দেখা করেন।”
শুধু হেমলতা দেবীর স্মৃতিচারণেই নয়। কালিদাস নাগ, প্রবোধ চন্দ্র সেন, শঙ্করীপ্রসাদ বসু প্রমুখ অনেক খ্যাতকীর্তি গবেষকও রবীন্দ্রনাথ ও নরেন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠতা সম্পর্কে বিভিন্ন দিক থেকে আলোকপাত করেছেন।
তবে ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে নরেন্দ্রনাথ যখন ‘হিন্দু’ রামকৃষ্ণ পরমহংসের শিষ্য হয়ে গেলেন, তখন স্বল্প সময়ের জন্য হলেও, রবীন্দ্রনাথের মনে নরেন্দ্রনাথের প্রতি বিরূপতার সঞ্চার ঘটেছিল। অনেকেই সে সময়ে বলতে শুরু করেছিলেন যে, রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব নানা দেবদেবীর মূর্তিপূজার মধ্য দিয়ে গভীর আধ্যাত্মিক শক্তি লাভ করায় ব্রাহ্মদের নিরাকারতত্ত্বের অসারতাই প্রমাণিত হয়ে গেছে। রবীন্দ্রনাথ তখন ‘সাকার ও নিরাকার উপাসনা’ শীর্ষক প্রবন্ধে এই মতের তীব্র সমালোচনা করে লিখেছিলেন-
“ঈশ্বরকে আমরা হৃদয়ের সংকীর্ণতাবশত সীমাবদ্ধ করিয়া ভাবিতে পারি, কিন্তু পৌত্তলিকতায় তাঁহাকে একরূপ সীমার মধ্যে বদ্ধ করিয়া ভাবিতেই হইবে। অন্য কোনো গতি নাই। …কল্পনা উদ্রেক করিবার উদ্দেশ্যে যদি মূর্তি গড়া যায় সেই মূর্তির মধ্যেই যদি মনকে বদ্ধ করিয়া রাখি তবে কিছুদিন পরে সে-মূর্তি আর কল্পনা উদ্রেক করিতে পারে না। ক্রমে মূর্তিটাই সর্বেসর্বা হইয়া উঠে। …ক্রমে উপায়টাই উদ্দেশ্য হইয়া দাঁড়ায়।”
তবু, এ সবের পরও, রবীন্দ্রনাথ রচিত সঙ্গীতের প্রতি নরেন্দ্রনাথের আকর্ষণ একটুও হ্রাস পায়নি। বৈষ্ণবচরণ বসাকের সঙ্গে যৌথভাবে সংকলিত ‘সঙ্গীত কল্পতরু’ গ্রন্থে নরেন্দ্রনাথ আটটি রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রকাশ করেন। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থানে তিনি রবীন্দ্রনাথের পঁচিশটি গান পরিবেশন করেছেন বলে জানা যায়। স্বামী সুবীরানন্দ জানিয়েছেন-
“এমন কি নরেন্দ্রনাথ শ্রীরামকৃষ্ণ সন্নিধানে ৭ এপ্রিল ১৮৮৩ এবং ৯ মে ১৮৮৫ ‘গগনের থালে রবি-চন্দ্র-দীপক জ¦লে,’ ১৪ সেপ্টেম্বর ১৮৮৪ ‘দিবানিশি করিয়া যতন, হৃদয়েতে রচেছি আসন’ এবং ১৪ জুলাই ১৮৮৫ বলরাম ভবনে রথের পুনর্যাত্রার দিন ও ২৪ অক্টোবর ১৮৮৫ শ্যামপুকুরবাটীতে ‘তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা’ সঙ্গীতত্রয় পরিবেশন করেন। নরেন্দ্রনাথ-কণ্ঠে পরিবেশিত এই তিনটি রবীন্দ্রসঙ্গীত শ্রীরামকৃষ্ণকে আনন্দ দিয়েছিল। ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ২৭ জানুয়ারি, শনিবার সন্ধ্যায় ভগিনী নিবেদিতার বাগবাজারের বাড়ির উঠানে আয়োজিত চা-পান সভায় রবীন্দ্রনাথ ও বিবেকানন্দ মুখোমুখি হয়েছিলেন। সেই সভার জন্য রচিত একটি গানসহ মোট তিনটি অসাধারণ গান রবীন্দ্রনাথ সেদিন গেয়েছিলেন। বিবেকানন্দও অনবদ্যভাবে তাঁর বক্তব্য সেদিন উপস্থাপিত করেন। ৩০ জানুয়ারি ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে মিস ম্যাকলাউডকে লেখা একটি চিঠিতে নিবেদিতা তার বিবরণ দিয়েছেন।”
ঠাকুরবাড়ির সাঙ্গীতিক ঐতিহ্য সম্পর্কে যে কোনো সচেতন বাঙালিই অবহিত। সে রকম অবহিতির সুযোগ স্বয়ং রবীন্দ্রনাথসহ ঠাকুরবাড়ির অন্য অনেকেই আমাদের জন্য অবারিত করে দিয়েছেন। ধীমান গবেষকবৃন্দের সহায়তাও আমরা পেয়ে গেছি।
দত্ত পরিবারের ব্যাপারে কিন্তু ঠিক তেমন কথা বলতে পারি না। ওই পরিবারে যে সঙ্গীতের চর্চা ছিল, সে কথা আমাদের জানা আছে বটে, কিন্তু সেই ‘জানা’টা একেবারেই ভাসা-ভাসা। তবে ইদানীংকাল সঙ্গীত বিশারদদের অনুসন্ধানের ফলে এ বিষয়ে আমাদের জ্ঞান আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রসারিত হচ্ছে। দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী ও রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীতের অধ্যাপিকা ডক্টর শম্পা মিশ্রের ‘ভারতীয় রাগ-রাগিণীর ভাব ও সময় সম্পর্কে বিবেকানন্দের অনুধ্যান’ শীর্ষক প্রবন্ধটির কথা উল্লেখ করতে পারি। বিবেকানন্দের সঙ্গীতচিন্তার অনেক গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ দিকই লেখিকা এই প্রবন্ধটিতে তুলে এনেছেন। ‘স্বামী বিবেকানন্দের সাঙ্গীতিক পরিবেশের সঙ্গে পরিচিতি’ প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য-
“গায়ক, গীতস্রষ্টা, সঙ্গীতত্ত্ব ভাষ্যকার-সমালোচক, গীত-সঙ্কলক- সব দিক থেকেই বিবেকানন্দ অল্প বয়সে একজন মহান সঙ্গীতজ্ঞ হয়ে উঠেছিলেন, যার পরিম-ল তিনি পারিবারিক সূত্রে শৈশবকাল থেকে লাভ করেছিলেন। বিবেকানন্দ তথা নরেন্দ্রনাথের পৈতৃক নিবাস কলকাতার সিমলার দত্ত পরিবারও তৎকালীন জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির মতো সঙ্গীতচর্চার এক পুণ্যক্ষেত্র বলা যায়। পরিবারের সদস্যদের সাঙ্গীতিক প্রতিভা, প্রায়শই দত্তবাড়িতে বা পল্লির কোন বাড়িতে অনুষ্ঠিত সঙ্গীতের আসর- যাত্রাগান, রামায়ণ গান, কীর্তন শিশুকাল থেকে নরেন্দ্রনাথের মনকে প্রভাবিত করেছিল। শুধু তাই নয়, সব ধরনের বাংলা গানের পাশাপাশি তৎকালীন ধনী ও জমিদারদের বৈঠকখানায় এবং অভিজাত বৈঠকগুলিতে হিন্দুস্থানি ক্লাসিক্যাল গানের সমাবেশ তাঁর মনকে সঙ্গীতের প্রতি অনুপ্রাণিত ও মনোযোগী করে তুলেছিল। তবে তিনি বিশুদ্ধ সঙ্গীতশিক্ষার অধিকারী হয়েছিলেন। বাল্যাবস্থায় পিতার কাছে সঙ্গীতশিক্ষা, পরে মার্গসঙ্গীতের ওস্তাদ বেণীগুপ্ত এবং তাঁর গুরু সদারঙ্গের শিষ্যবংশীয় যশস্বী খেয়ালিয়া আহম্মদ খাঁর কাছে তিনি তালিমপ্রাপ্ত হন। তিনি আদি ব্রাহ্মসমাজের পাখোয়াজবাদক কাশী ঘোষালের কাছে পাখোয়াজ এবং বাঁয়া-তবলা বাদনের শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত এবং সঙ্গীত শিক্ষাগুরুদের কাছে আয়ত্ত রাগসঙ্গীতে সহজভাবে অনুপ্রবেশের ক্ষমতা তাঁর কম বয়স থেকে এমন এক জায়গায় পৌঁছেছিল যে, ঋতুচক্রের আবর্তনে নরেন্দ্রনাথ ষড়ঋতুর পৃথক পৃথক ভাবকে সুরের মধ্য দিয়ে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন….
….সঙ্গীত সম্পর্কে তাঁর অনন্য সাধারণ বোধশক্তি, স্মৃতিশক্তি, বিচারবুদ্ধির প্রাখর্য, প্রবল মেধা, গভীর উপলব্ধি তাঁকে সহজ সিদ্ধান্তে পৌঁছে দিতে পেরেছে অতি অল্পবয়সেই। সঙ্গীতের স্বরূপ উপলব্ধিতে তাঁর কোনো অন্তরায় ঘটেনি। বরং এসবই বিবেকানন্দের সঙ্গীতভাবনার ভিত্তি।”
বিবেকানন্দ সঙ্গীতসাধনাকে তাঁর আধ্যাত্মিক সাধনারই অঙ্গীভূত করে নিয়েছিলেন। এ ব্যাপারে ১৮৯৬ সালের ১৩ ডিসেম্বর জনৈক আমেরিকান মহিলাকে লিখিত পত্রে তিনি জানিয়েছিলেন- ‘গঁংরপ রং ঃযব যরমযবংঃ ধৎঃ, ধহফ ঃড় ঃযড়ংব যিড় ঁহফবৎংঃধহফ, রং ঃযব যরমযবংঃ ড়িৎংযরঢ়.’
রবীন্দ্রনাথের ‘পূজা’ পর্যায়ের সঙ্গীতগুলিও তো একই ধরনের আধ্যাত্মিকতার বাহক। বলা যেতে পারে, সঙ্গীতভাবনা ও সঙ্গীতসাধনার ঐক্যই ছিল রবীন্দ্রনাথ ও নরেন্দ্রনাথের ঐক্যের উৎসভূমি।
বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিভিন্ন সময়ে এই দুই মনীষী মতৈক্য ও মতানৈক্যের ভেতর দিয়েই পরস্পরের সান্নিধ্যে এসেছেন। তবে এক সময়ে এ দু’জনের মধ্যে মতানৈক্যই প্রবল হয়ে উঠেছিল। বিশেষ করে নরেন্দ্রনাথ তো ঠাকুরবাড়ি সম্পর্কে কিছু কটুবাক্যও উচ্চারণ করেছেন। যেমন- ঠাকুর পরিবার সম্বন্ধে ভগিনী নিবেদিতাকে সতর্ক করে দিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘এই পরিবার ইন্দ্রিয়রসের বিষ বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দিয়েছে (জবসবসনবৎ ঃযধঃ, ঃযধঃ ভধসরষু যধং ঢ়ড়ঁৎবফ ধ ভষড়ড়ফ ড়ভ বৎড়ঃরপ াবহড়স ড়াবৎ ইবহমধষ)’
এ রকম বক্তব্য অবশ্যি ব্রাহ্মসমাজ সংশ্লিষ্ট নরেন্দ্রনাথের নয়। পরে যখন রামকৃষ্ণ-শিষ্য হয়ে তিনি স্বামী বিবেকানন্দ হয়েছিলেন, তখনকার ভাবনারই প্রকাশ তাঁর এই বক্তব্যে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও স্বামী বিবেকানন্দের পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়টি স্পষ্ট করে তোলার জন্যই প্রয়োজন রামকৃষ্ণের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে নরেন্দ্রনাথ দত্তের স্বামী বিবেকানন্দ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটির পর্যালোচনা। তারও আগে প্রয়োজন : রামকৃষ্ণ সান্নিধ্যে আসার আগেকার নরেন্দ্রনাথের ভাবনাচিন্তা ও জ্ঞানচর্চার খোঁজখবর নেওয়া। সে রকম করতে গিয়েই আমরা এখানে সঙ্গীতসাধনার সূত্রে কীভাবে রবীন্দ্রনাথ ও নরেন্দ্রনাথের ভেতর সৌহার্দ্যরে সৃষ্টি হয়েছিল- সে বিষয়টি তুলে ধরলাম।

 

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা