নরম্যান্ডির পথে পথে

আগের সংবাদ

লঙ্কানদের পাত্তাই দিল না নিউজিল্যান্ড

পরের সংবাদ

রবীন্দ্রনাথের গ্রামীণ উন্নয়ন ভাবনা

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ১, ২০১৯ , ৮:৫৯ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুন ২, ২০১৯, ৫:৩৪ অপরাহ্ণ

অনলাইন প্রতিবেদক

আত্মশক্তিতে বলীয়ান রবিঠাকুর সর্বদাই বাইরের বাধা-বিপত্তিকে তুচ্ছজ্ঞান করে নিজের ভেতরকার ক্ষতগুলোকে নিরাময়ের পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, ‘জাহাজের খোলের ভেতরটায় যখন জল বোঝাই হয়েছে তখনই জাহাজের বাইরেকার জলের মার সাংঘাতিক হয়ে ওঠে ভেতরকার জলটা তেমন দৃশ্যমান নয়, তার চালচলন তেমন প্রচ- নয়, সে মারে ভারের দ্বারা, আঘাতের দ্বারা নয়, এ জন্য বাইরের ঢেউয়ের চড়-চাপড়ের উপরেই দোষারোপ করে তৃপ্তি লাভ করা যেতে পারে; কিন্তু হয় মরতে হবে নয় একদিন এই সুবুদ্ধি মাথায় আসবে যে আসল মরণ ওই ভেতরকার জলের মধ্যে, ওটাকে যত শিগগিরই পারা যায় সেঁচে ফেলতে হবে। কাজটা যদি দুঃসাধ্যও হয় তবু একথা মনে রাখা চাই যে, সমুদ্র সেঁচে ফেলা সহজ নয়, তার চেয়ে সহজ, খোলের জল সেঁচে ফেলা। এ কথা মনে রাখতে হবে, বাইরের বাধাবিঘ্ন বিরুদ্ধতা চিরদিনই থাকবে, থাকলে ভালো বৈ মন্দ-নয়; কিন্তু অন্তরে বাধা থাকলেই বাইরের বাধা ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। এই জন্য ভিক্ষার দিকে না তাকিয়ে সাধনার দিকে তাকাতে হবে, তাতে অপমানও যাবে, ফলও পাব। (ii, দ্বাদশ খ-, পৃ. ৫৮৩)
রবীন্দ্রনাথ জোর দিয়ে বলেন, গ্রামীণ দারিদ্র্যের মূল কারণ হলো গ্রামের মানুষের আত্মবিশ্বাসের অভাব যা তাদের সর্বদাই সরকারে মুখাপেক্ষী করে তোলে। তাই ঐক্যের মাধ্যমে গ্রামের মানুষের আত্মশক্তি জাগিয়ে তোলাকে তিনি প্রাথমিক কাজ হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি কখনো বিশ্বাস করেননি শুধুমাত্র আয়ের অভাবেই দারিদ্র্য সৃষ্টি হয়। তিনি মনে মরতেন যে দারিদ্র্যের ভয় ভূতের ভয়ের মতো। কোনো দেশ ধনী কি দরিদ্র তা নির্ভর করে সে দেশে গরিবের অর্থ উপার্জনের উপায় বা রাস্তা আছে কিনা তার ওপর।
রবীন্দ্রনাথ ছিলেন পুরোপুরি মানবপ্রেমিক। মানুষের দুঃখ-কষ্ট-বঞ্চনায় তিনি বরাবরই হতেন সমব্যাথী। এ কথা ঠিক তিনি জন্মেছিলেন জমিদার পরিবারে। ধনীর সন্তান বলে অনেকেই প্রশ্ন তুলতেন তিনি কি করে গরিবের দুঃখ বুঝবেন? এ প্রশ্নে তিনি খুবই মর্মাহত হতেন। কেননা, দীর্ঘদিন তিনি পূর্ব-বাংলায় জমিদারি পরিচালনায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। পদ্মার পাড়ের দুঃখী মানুষদের খুব কাছে থেকে তিনি দেখেছেন। তাদের সঙ্গে গভীরভাবে মিশেছেন। শিলাইদহে তিনি ছিলেন এক কর্মবীর। কফিলুদ্দীন-জামালুদ্দীন শেখের সঙ্গে ধানক্ষেতে পোকা মারার পদ্ধতি নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে কথা বলতেন যে রবীন্দ্রনাথ, পল্লীর মঙ্গল সাধনায় সংগঠন গড়ার কাজে শ্রম, মেধা ও অর্থ ঢেলেছেন যে মানুষটি তাঁর গ্রামপ্রীতি নিয়ে সন্দেহ করাটা আসলেই ছিল দুঃখজনক। এ কারণে কতবার যে তিনি তাঁর প্রতি এই অন্যায় সন্দেহের প্রতিউত্তর দিয়েছেন তাঁর লেখায় তা বলে শেষ করা যাবে না।
রবীন্দ্রনাথ নগরে জন্মেছিলেন। বলা যায় জন্মেছিলেন রুপোর চামচ মুখে নিয়েই। কিন্তু সেটি শেষ কথা নয়। পরিবার তাঁকে বৃহত্তর জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করেনি। বরং সাধারণের জীবনচলাকে খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ করে দিয়েছে তাঁর পরিবার। কাজের সুবাদে তাঁকে আসতে হয়েছিল পূর্ব-বাংলায়। কৃষকদের খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ তাঁর হয়েছিল। নগরে জন্মেও গ্রামীণ জীবনের দুঃখ-কষ্টকে নিজের অন্তরে প্রতিস্থাপন করে তিনি সেই দুঃখ নিরসনের বাস্তব পথের সন্ধান করে গেছেন আমৃত্যু। রবীন্দ্রনাথ যতদিন গ্রামে ছিলেন ততদিন গ্রামকে, গ্রামের মানুষকে তন্ন তন্ন করে জানবার চেষ্টা করতেন। গ্রামবাসীর দিনকৃত্য, তাদের বৈচিত্র্যময় জীবনযাত্রার ধরন দেখে তাঁর প্রাণ ঔৎসুক্যে ভরে উঠত। আমরা দারিদ্র্য নিয়ে যেসব কথা এখন বলছি, রবীন্দ্রনাথ বহু আগে এর চেয়েও গভীর সব কথা বলে গেছেন। দারিদ্র্য যে শেষ পর্যন্ত মনে দৈন্য সে কথাটি তাঁর মতো করে আর কেউ এমন স্পষ্ট করে বলতে পারেননি। সৃষ্টির আনন্দে তিনি চলতেন। তিনি নিজেই বলেছেন, ‘আমার ইচ্ছা ছিল সৃষ্টির এই আনন্দপ্রবাহে পল্লীর শুষ্কচিত্তভূমিকে অভিষিক্ত করতে সাহায্য করব, নানা দিকে তার আত্মপ্রকাশের নানা পথ খুলে যাবে। এইরূপ সৃষ্টি কেবল ধনলাভ করবার অভিপ্রায়ে নয়, আত্মলাভ করবার উদ্দেশ্যে।’ (‘অভিভাষণ’, ii, দ্বিতীয় খ-, পৃ. ৩৭৫)।
মূলত তাঁর প্রজাদের সীমাহীন দুঃখ এবং তাদের গভীর অসচেতনতা তাঁকে খুবই পীড়া দিতো। তাই তাদের জন্যে কিছু একটা করার জন্যে তাঁর মন সবসময় ছটফট করতো। তাই তিনি লিখেছেন, ‘আমি নগরে পালিত, এসে পড়লুম পল্লীশ্রীর কোলে-মনের আনন্দে কৌতূহল মিটিয়ে দেখতে লাগলুম। ক্রমে এই পল্লীর দুঃখ দৈন্য আমার কাছে সুস্পষ্ট হয়ে উঠল, তার জন্যে কিছু করব এই আকাক্সক্ষায় আমার মন ছট্ফট্ করে উঠেছিল।’ (শ্রীনিকেতনের ইতিহাস ও আদর্শ, ii, চতুর্দশ খণ্ড, পৃ. ৩৭৮)। জমিদারি বাবদ যে তিনি আয় করতেন তা নিতে তাঁর লজ্জার শেষ ছিল না। বলতেন এ ভারী অন্যায়। তিনি তাই প্রজাদের দুঃখ মোচনে নানা উদ্যোগ নিতে পিছপা হননি।
রবীন্দ্রনাথ ছিলেন এক কর্মবীর। সুযোগ পেলেই তিনি তাঁর পাঠকদের আহ্বান জানিয়েছেন গ্রাম-বাংলার এই প্রকৃত চেহারা দেখবার জন্যে। বলেছেন ‘দেখে যেতে হবে দেশের উপেক্ষিত এই গ্রাম, বাপ-মায়ের তাড়ানো সন্তানের মতো এই গ্রামবাসীদের, এই উপেক্ষিত হতভাগারা কেমন করে ছিন্ন বস্ত্র নিয়ে অর্ধাশনে দিন কাটায়। আপনাদের নিজের চোখে দেখতে হবে, কত বড় কর্তব্যের শুরুভার আমাদের ও আপনাদের ওপর রয়েছে। এদের দাবি পূর্ণ করবার শক্তি নেই-আমাদের এর চেয়ে লজ্জা ও আপমানের কথা আর কী আছে! কোথায় আমাদের দেশের প্রাণ, সত্যিকারের অভাব অভিযোগ কোথায়, তা আপনাদের দেখে যেতে হবে।’ (‘শ্রীনিকেতনের ইতিহাস ও আদর্শ’, ii, চতুর্দশ খণ্ড, পৃ. ৩৭৮)
একদিনেই তাঁর মনের গহীনে এই গ্রামপ্রীতি দানা বেঁধেনি। রবীন্দ্রনাথের গ্রামোন্নয়ন চিন্তা-ভাবনার সূত্রপাত হয়েছিল শিলাইদহ-পতিসরে জমিদারি পরিচালনার সময় উনিশ শতকের শেষ দশকে। তিনি ১৮৮০ সালে ২২ বছর বয়সে বাবা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আদেশে পূর্ববঙ্গে ঠাকুর এস্টেটের জমিদারি (বিরাহিমপুর পরগনার শিলাইদহ এবং কালীগ্রাম পরগনার পতিসর) দেখাশুনার জন্যে সাময়িক দায়িত্ব গ্রহণ করে শিলাইদহে আসেন। নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে জমিদারি পরিচালনা করে পিতার আস্থা অর্জন করার পর ১৮৯০ সালে তিনি ঠাকুর এস্টেট পরিচালনার দায়িত্ব পান। প্রাথমিক পর্যায়ে রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহ থেকেই ঠাকুর এস্টেটের দেখাশুনা করেন এবং জমিদারির কাজ পরিচালনা করেন, সে কাজে তাঁকে মাঝে মাঝে কালীগ্রাম পরগনাতেও যেতে হয়েছে। এই সময় তাঁকে শাজাদপুরের জমিদারি দেখাশুনার ভারও নিতে হয় তাঁর কাকা গিরীন্দ্রনাথের নাবালক পুত্রদের অভিভাবক হিসেবে। জমিদার হিসেবেও তিনি ছিলেন খুবই সফল। এ কাজে নিমগ্ন থাকার সময়ই তিনি অনুভব করলেন গ্রামের উন্নতি ছাড়া দেশের উন্নতি হবার নয়। উড়িষ্যা (কটক) জেলায় ঠাকুর এস্টেটের ভারও তাঁর ভাই হেমেন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর তাঁর নাবালক পুত্রদের পক্ষ থেকে তাঁকে দেখতে হয়। এইভাবে শিলাইদহে বসবাস করলেও তাঁকে জমিদারির কাজে চারটি পরগনাতেই যাতায়াত করতে হয়েছে। জমিদারির দায়িত্ব নেবার পর অধিকাংশ সময় তিনি শিলাইদহেই থেকেছেন এবং সেখান থেকেই শাজাদপুর ও পতিসরে যাওয়া-আসা করেছেন।
স্থানীয় কৃষকরা তাঁরই কর্মচারীদের নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন এ কথা জেনে তিনি অভিনব গ্রামীণ বিচার ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। গ্রামবাসীদের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপের পর তিনি এই উদ্যোগ নিয়েছিলেন। অভিযুক্ত এমন কার্মচারীদের অনেকের চাকরিও চলে গিয়েছিল। কুষ্টিয়ায় প্রজাদের সুবিধার্থে তিনি দীর্ঘ রাস্তা করে দিয়েছিলেন। প্রজাদের কুয়োর পাড় বেঁধে দিয়েছিলেন। কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের উপযুক্ত মূল্য দিয়ে তা কেনার ব্যবস্থা করেছিলেন। প্রজাদের ভেতর ভেদবুদ্ধির অবসানকল্পে কত উদ্যোগই না তিনি নিয়েছিলেন। সুযোগ পেলেই তিনি যে কোনো কর্মকে উৎসবের মেজাজ দেবার চেষ্টা করেছেন। প্রজাদের কাছ থেকে সামান্য চাঁদা নিয়ে তার সঙ্গে জমিদারি তহবিল থেকে অর্থ যোগ করে তিনি তাদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুবিধের ব্যবস্থা করেছিলেন। সে কারণেই যখন তিনি জমিদারি পরিচালনার কাজ শেষ করে স্ব-গৃহে ফিরে যাচ্ছিলেন তখন ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল প্রজা তাঁকে সজলচোখে বিদায় জানিয়েছিলেন। তারা সেদিন তাঁকে দেব-রূপেই অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। পরজন্মে তাঁকে ফের জমিদার হিসেবেই পেতে তারা আগ্রহী ছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন, প্রায় ৯০ ভাগ কৃষকের এই উপমহাদেশের প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক কৃষি উন্নয়ন। এজন্যে গ্রামীণ সমাজের উন্নয়নে তিনি নানামাত্রিক প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নিয়েছিলেন। নিজের সন্তান ও জামাতাকে কৃষি বিষয়ে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে এনেছিলেন গ্রামের দুঃখী মানুষগুলোর ভাগ্য বদলানোর জন্যে। আমেরিকা থেকে কৃষি বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি শেষে কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ পতিসরে আসেন। তিনি ক্ষেতে ট্রাক্টর চালান। সেই দৃশ্য দেখে স্থানীয় চাষিরা বিস্ময়ে হতবাক হন। তারা আধুনিক কৃষি খামার প্রতিষ্ঠায় উৎসাহিত হয়। কৃষকের প্রচলিত জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে কৃষি বিজ্ঞানীদের সক্রিয় ভূমিকা রাখার পক্ষে ছিলেন তিনি। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন, প্রায় ৯০ ভাগ কৃষকের এই উপমহাদেশের প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক কৃষি উন্নয়ন। বিজ্ঞানভিত্তিক কৃষি পদ্ধতি প্রবর্তনে কলের লাঙল ব্যবহারের কথা বলেছেন। আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদের জন্যে পতিসরে ৭টি বিদেশি কলের লাঙল আনেন কলকাতা থেকে। সাথে আনেন একজন বিদেশি ইঞ্জিনিয়ার।
একইসঙ্গে তিনি বিশ্বাস করতেন যে, শুধু উন্নত পদ্ধতিতে চাষাবাদ করলেই গ্রামীণ মানুুষের ভাগ্য বদলানো যাবে না। জনসংখ্যার যে চাপ তাতে পুরো শ্রমশক্তিকে শুধু কৃষিতে নিয়োজিত করা সম্ভব নয়। তাই মূল ফসল ধানের পাশাপাশি ফল, সবজি চাষের কথা যেমন বলেছেন, তেমনি হস্তশিল্পের ওপর খুব জোর দিয়েছেন। মৃৎশিল্প, ছাতা তৈরির কারখানা, ধান মাড়াইকল স্থাপনসহ নানা বিষয়ে তিনি তার পুত্র ও সহযোগীদের পরামর্শ দিয়েছেন। পতিসরে ১২৫টি গ্রামের ৬০-৭০ হাজার মানুষকে হিতৈষী সভায় যোগদানে উৎসাহিত করেছিলেন। এই সভা গ্রামের স্কুল, হাসপাতাল পরিচালনা করা ছাড়াও রাস্তাঘাট মেরামত, জঙ্গল পরিষ্কার ও ছোটখাটো বিচার আচারের দায়িত্ব নিয়েছিল। কৃষক নিজেই চাঁদা দিতো এবং জমিদার রবীন্দ্রনাথও রাজস্বের একটা অংশ এতে অনুদান দিতেন।
রবীন্দ্রনাথের কালিগ্রাম পরগনার আশি ভাগ প্রজা ছিল মুসলমান। কৃষিই ছিল তাদের একমাত্র পেশা। কিন্তু জমি ছিল অপেক্ষাকৃত অনুর্বর। বছরে একটিমাত্র ফসলের আবাদ হতো। কোনো কোনো বছর তাও যেত বর্ষার পানিতে তলিয়ে। ঋণের জন্যে কৃষকরা হাত পাততো মহাজনের কাছে। জমিদারের খাজনা দেয়ার পয়সা জুটতো না। মানবদরদি জমিদার রবীন্দ্রনাাথ প্রজাদের দুঃখ দুর্দশা বুঝতে পারতেন। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন একটি কৃষি ব্যাংক স্থাপনের। তাঁর নোবেল পুরস্কার থেকে লব্ধ টাকা কৃষি ব্যাংকের মূলধন হিসেবে প্রদান করেন। এটিই ছিল বাংলাদেশের প্রথম কৃষি ব্যাংক। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগে একাধিকবার ফসলহানির কারণে কৃষক এই ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়। অতঃপর ব্যাংকটি বন্ধ হয়ে যায়।
দীর্ঘদিন গ্রামের মানুষের সঙ্গে কাজ করতে করতেই রবীন্দ্রনাথের গ্রামীণ উন্নয়ন ভাবনাসমূহ পোক্ত হয়। নিজের চোখে দেখেছেন বলেই গ্রামের প্রতি যে অন্যায্য আচরণ করা হচ্ছিল, তাকে তিনি তাঁর লেখায় স্পষ্ট করে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছিলেন। পল্লীর প্রতি এই অবহেলা শেষ পর্যন্ত আমাদের নগরকেও ভালোভাবে টিকতে দেবে না সে কথা তিনি অনুভব করতে পেরেছিলেন। তাঁর ভাষায় ‘আজ পল্লী আমাদের আঁধমরা: যদি এমন কল্পনা করে আশ্বাস পাই যে, অন্তত আমরা আছি পুরো বেঁচে, তবে ভুল হবে, কেননা মুমূষর্েুর সঙ্গে সজীবের সহযোগ মৃত্যুর দিকেই টানে।’ (‘উপেক্ষিত পল্লী’, ii, চতুর্দশ খ-, পৃ. ৩৭২)
তিনি এও বলেছেন যে, ‘গ্রামে অন্ন উৎপাদন করে বহু লোকে, শহরে অর্থ উৎপাদন ও ভোগ করে অল্পসংখ্যক মানুষ; অবস্থার এই কৃত্রিমতায় অন্ন এবং ধনের পথে মানুষের মধ্যে সবার চেয়ে প্রকাণ্ড বিচ্ছেদ ঘটেছে। ওই বিচ্ছেদের মধ্যে যে সভ্যতা বাসা বাঁধে তাঁর বাসা বেশি দিন টিকতেই পারে না।’ (ঐ, পৃ. ৩৭১)
গ্রামবাসীদের ঐক্যবদ্ধ রাখার পক্ষে বলতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘মনের মাঝে উৎকণ্ঠা নিয়ে আজ এসেছি গ্রামবাসী তোমাদের কাছে। পূর্বে তোমরা সমাজবন্ধনে এক ছিলে, আজ ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে পরস্পরকে কেবল আঘাত করছ। আর-একবার সম্মিলিত হয়ে তোমাদের শক্তিকে জাগিয়ে তুলতে হবে। বাহিরের আনুকূল্যের অপেক্ষা করো না। শক্তি তোমাদের মধ্যে আছে জেনেই সেই শক্তির আত্মবিস্মৃতি আমরা ঘোচাতে ইচ্ছা করেছি। …আর-সব দেশ এগিয়ে চলেছে, আমরা অজ্ঞানে অশিক্ষায় স্থাবর হয়ে পড়ে আছি। এ সমস্তই দূর হয়ে যাবে যদি নিজের শক্তি সম্বলকে সমবেত করতে পারি। আমাদের এই শ্রীনিকেতনে জনসাধারণের সেই শক্তি সমবায়ের সাধনা।’ (‘গ্রামবাসীদিগের প্রতি’, রাশিয়ার চিঠি, ii, দশম খ-, পৃ. ৬০৯)
সমবায় সম্পর্কিত প্রবন্ধগুলোর ভূমিকায় তিনি আমাদের মাতৃভূমির যথার্থ স্বরূপের কথা বলেছেন। গ্রামের মধ্যেই যেন আমাদের আসল প্রাণশক্তি নিহিত রয়েছে সে কথা নানাভাবে বলবার চেষ্টা করেছেন। ‘মাতৃভূমির যথার্থ স্বরূপ গ্রামের মধ্যেই; এইখানেই প্রাণের নিকেতন; লক্ষ্মী এইখানেই তাহার আসন সন্ধান করেন।’ (ii, চতুর্দশ খ-, পৃ. ৩১১)
তিনি এ প্রসঙ্গে আরো লিখেছেন যে, ‘সেই আসন অনেককাল প্রস্তুত হয় নাই। ধনপতি কুবের দেশের লোকের মনকে টানিয়াছে শহরের যক্ষপুরীতে। শ্রীকে তাহার অন্নক্ষেত্রে আবাহন করিতে আমরা বহুকাল ভুলিয়াছি। সঙ্গে সঙ্গে দেশ হইতে সৌন্দর্য গেল, স্বাস্থ্য গেল, বিদ্যা গেল, আনন্দ গেল, প্রাণও অবশিষ্ট আছে অতি অল্পই। আজ পল্লীর জলাশয় শুষ্ক, বায়ু দূষিত, পথ দুর্গম, ভা-ার শূন্য, সমাজবন্ধন শিথিল, ঈর্ষা কলহ কদাচার লোকালয়ের জীর্ণতাকে প্রতিমুহূর্তে জীর্ণতর করিয়া তুলিতেছে। সময় আর অধিক নাই। শ্রীহীন অনাদৃত দেশে যমরাজের শাসন দিনে দিনে রুদ্রমূর্তিতে প্রবল হইয়া উঠিল। আজ যাঁহারা জীবধাত্রী পল্লীভূমির রিক্তস্তনে শূন্য সঞ্চার করিবার ব্রত লইয়াছেন, তাঁহার নিরানন্দ অন্ধকার ঘরে আলো আনিবার জন্য প্রদীপ জ¦ালিতেছেন, মঙ্গলদাতা বিধাতা তাঁহাদের প্রতি প্রসন্ন হউন; ত্যাগের দ্বারা, তপস্যা-দ্বারা, সেবা-দ্বারা, পরস্পর মৈত্রীবন্ধন-দ্বারা, বিক্ষিপ্ত শক্তির একত্র সমবায়ের দ্বারা ভারতবাসীর বহুদিন সঞ্চিত মূঢ়তা ঔদাসীন্যজনিত অপরাধরাশির সঙ্গে সঙ্গে রুষ্ট দেবতার অভিশাপকে সেই সাধকেরা দেশ হইতে তিরস্কৃত করুন এই আমি একান্ত মনে কামনা করি।’ (ঐ, পৃ. ৩১১)
রবীন্দ্রনাথ সত্যি সত্যি বিশ্বাস করতেন যে পল্লীবাসীরা উপেক্ষিত। গ্রাম-বাংলার এই দৈন্য গ্রামীণ মানুষ সৃষ্টি করেনি। শহরের এলিটরাই গ্রাম থেকে সম্পদ শুষে এন বৈষম্যের পাহাড় গড়েছেন। এই অবস্থার অবসানের জন্যেই তিনি সারা পৃথিবীর আলো পল্লীতে ফেলতে বলেছেন। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের পরশ পল্লীবাসীর পাবার অধিকার রয়েছে। সে কারণে নগরবাসীরও রয়েছে দায়। দেশে জন্মালেই যে দেশ আপন হয় না সে কথা তিনি তাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন। ‘যতক্ষণ দেশকে না জানি, যতক্ষণ তাকে নিজের শক্তিতে জয় না করি, ততক্ষণ সে দেশ আপনার নয়।’ (‘দেশের কাজ, ii, চতুর্দশ খ-, পৃ. ৩৬৮)
পল্লীকে আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তোলার স্বপ্ন ছিল তাঁর সুগভীর। তাই তিনি বলতেন যে, ‘নিজের পাঠশালা, শিল্পশিক্ষালয়, ধর্মগোলা, সমবেত পণ্যভা-ার ও ব্যাংক স্থাপনের জন্য পল্লীবাসীদের শিক্ষা সাহায্য ও উৎসাহ দান করতে হবে। এমনি করে দেশের পল্লীগুলি আত্মনির্ভরশীল ও ব্যূহবদ্ধ হয়ে উঠলেই আমরা রক্ষা পাব। (সমবায় নীতি, ii, চতুর্দশ খ-, পৃ. ৩১৯)
আমাদের জ্ঞানের ভা-ারে সবচেয়ে মূল্যবান রত্নটির নাম রবীন্দ্রনাথ। শতবর্ষ আগেই তিনি আমাদের সমাজ ও অর্থনীতির মূল সংকটের স্বরূপ চিহ্নিত করেছেন। গ্রাম ও শহরের বিভেদ নীতি যে আমাদের জাতীয় অস্তিত্বকে একদিন প্রশ্নবিদ্ধ করবে সে আশঙ্কা তাঁর মনে ছিল। আমরা আজ বিদেশিদের দেয়া উন্নয়ন কৌশল নিয়ে কত কসরতই না করছি। অথচ আমাদের পূর্ব-পুরুষ রবীন্দ্রনাথের অর্থনীতি কতই না সমৃদ্ধ। তাঁর গ্রামীণ ভাবনায় যে সাম্য ও মানবিকতার সন্ধান পাই তা সত্যি বিরল। সংস্কৃতি তো জীবনেরই আরেক নাম। সেই সংস্কৃতির সাধক করা যায় সেই চেষ্টাই করে গেছেন আজীবন। এমন বিপুল যার জ্ঞানের পরিধি তাঁর ভাবনার আলোকে কেন আমরা আমাদের কল্যাণধর্মী অর্থনীতিকে সাজাতে উৎসাহী হই না। বিশেষ করে তাঁর গ্রামীণ উন্নয়ন ভাবনাকে কেন আমরা সমকালীন উন্নয়ন ভাবনার মূলে আনতে পারছি না? এ প্রশ্নের মুখোমুখি আমাদের একদিন না একদিন হতেই হবে। বিদেশিদের ভাবনার আলোকে আমাদের অর্থনীতিকে সাজাতে গিয়ে আমরা কতো ধরনের বৈষম্য তৈরি করে চলেছি। গ্রামে-শহরে বৈষম্য, অঞ্চলে-অঞ্চলে বৈষম্য, নারী-পুরুষে বৈষম্য আমাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের সীমিত সাফল্যকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। সার্বিক কল্যাণধর্মী উন্নয়নই যদি হয় আমাদের মূল লক্ষ্য, তাহলে রবীন্দ্রনাথের সাম্য ও সুন্দরের আকাক্সক্ষাকে আমাদের নীতি ভাবনার মূলে প্রতিস্থাপন করতেই হবে। রবীন্দ্রভাবনার আলোকে আমাদের উন্নয়ন ভাবনাকে সাজাতে পারলে নিশ্চিতভাবেই বাঙালির স্ব-উন্নয়নের স্বপ্ন পূরণ করা সম্ভব হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ নামের যে সুদূরপ্রসারী কর্মযজ্ঞ শুরু করতে যাচ্ছেন তা বাস্তবায়নে রবীন্দ্রনাথের পল্লী উন্নয়ন ভাবনা আমাদের বিরাট পাথেয় হতে পারে।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা