অনু এবং ছয় দফা খাতা

আগের সংবাদ

রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে ভারতের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে: মোদি

পরের সংবাদ

প্রেসক্লাবের সামনে দেখা হবে

প্রকাশিত হয়েছে: মে ৩১, ২০১৯ , ৮:০৯ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুন ২, ২০১৯, ৫:২৬ অপরাহ্ণ

অনলাইন প্রতিবেদক

সারাদেশের মতো সেদিন আমিও তিন মিনিট নীরব ছিলাম।
নন্দিনীও নীরব ছিল। তার হাতের মুঠোয় আমার হাত ধরা ছিল। সে কিছুতেই আমাকে একা ছাড়ছিল না। পাশে অনেকে ছিল। চেনামুখ। অচেনা চোখ। তীব্র চাহনি। কি ভয়াবহ নিস্তব্ধতা। চাদ্দিক মৌনমুখর ছিল। কোনো কেরাস ছিল না। হল্লা ছিল না। কোনো এক মৌন মুখরতায় সবাই তিনটি মিনিট নীরব নিস্তব্ধ ছিল।
আমাদের সম্মুখের কাচের গ্লাসে ঘেরা বাইশতলা বিল্ডিংয়ে শেষ বিকেলের সূর্য ডোবা ?? গলে গলে পড়ছিল।
কি আশ্চর্য সেদিন জামালখানের আশপাশে ঝাঁকড়া বট, পাকুড়, অশ্বথ, মান্দার গাছ দূর বহুদূর থেকে উড়ে এসে ঝুপ ক?ে বুনো পাখি কিচির-মিচির করতে করতে হঠাৎ চারটায় নীরব হয়ে গেল।
কাকগুলো উড়তে উড়তে হঠাৎ উঁচু দেয়ালে, কার্নিশে পাশাপাশি বসে চূড়ান্ত নিশ্চুপ হলো।
আর দুটো হলুদ চড়াই প্রেসক্লাবের সামনে কাঠবাদাম গাছে এসে চুপটি ক?ে বসে রইল।
আর আশপাশে যে যেখানে আছে সেখানে ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইল। কোনো কথা নেই। কারো মুখে কোনো রা নেই। সবাই কেমন যেন চুপচাপ। কেউ কেউ চুপিচুপি প্রেসক্লবের আইল্যান্ডে দাঁড়িয়ে নীরবে কি যেন খুঁজছে। চারপাশে যেন হন্য হয়ে খুঁজছে। আবার যারা অনেকক্ষণ আগ থেকে এখানে এসে অবস্থান নিয়েছিল তাদেরও কোনো নড়ন-চড়ন নেই। কোনো মুভমেন্ট নেই। আশপাশে সব থেমে আছে।
যেখানে শকটের শব্দ, তীব্র হরেন আর এম্বুলেন্সের শব্দ, মানুষের পদভার ব্যস্ত রাস্তা পার হতে যথেচ্ছ সময় পার হয়। সেখানে আজ সব কিছু নিথর নিস্তব্ধ। আর মৌন পাহাড় বিশাল বড় হলো। সাদা তুষার আর বরফে ঢাকা হিমালয় আজ ব্যাকুল হয়ে দেখছে বঙ্গোপসাগরের ঢেউগুলো থেমে গেছে। বুড়িগঙ্গার পালতোলা নৌকাগুলো বাদামে বাতাস থমকে দাঁড়িয়েছে। মেঘনার ইলিশ ছটফট করতে করতে নিথর হলো। কর্ণফুলীর জোয়ারের ঢেউগুলো তিন তিনটি মিনিট যেখানে যেভাবে ছিল সেভাবে থির দাঁড়িয়েছিল, ঢেউ উঠেনি, ঢেউ পড়েনি। আজ সব নদীতে ঢেউহীন ঢেউ।
আজ পদ্মার ঢেউ, ধলেশ্বরীর ঢেউ, চিত্রার ঢেউ, যমুনার ঢেউ, শীতলক্ষ্যার ঢেউ, করোতোয়ার ঢেউ, কুশিয়ারার ঢেউ, শংখের ঢেউ, বুড়িগঙ্গার নদীর পাশাপাশি ব্রহ্মপুত্র, গঙ্গার ঢেউগুলো সব একে একে শাহবাগে জনতার সমুদ্রের ঢেউ দেখে অবিশ্বাস্য নীরবতায় নিমগ্ন হতে দেখে অভাক হয়েছিলাম।
সারাবিশ্ব কি অভাক বিস্ময়ে তাকিয়েছিল এক আশ্চর্য নীরবতার সমুদ্র কোথায় যাচ্ছে?? সেদিন তিনটার পর থেকে যে যেখানে ছিল সেখান থেকে পায়ে পায়ে কেউ বিল্ডিং থেকে, স্কুল থেকে, বাড়ির উঠোন থেকে ইট বালির ট্রাক থেকে নেমে, বরফের মাছের ট্রাক থেকে নেমে, বাসস্ট্যান্ডের যাত্রী ছাউনি থেকে দ্রুত পা ফেলে সবাই দাঁড়িয়ে পড়ছিল। তারপর একে একে যে যেখানে আছে সেখান থেকে নেমে পড়েছে। কেউ ট্রেন থেকে নেমে, কেউ রিকশা থেকে নেমে, পার্ক থেকে বেরুয়ে, অফিস থেকে বেরিয়ে রাস্তায়, এভাবে সড়কে, মহাসড়কে রাজপথে দাঁড়িয়ে পড়েছিল এসব দেখে বিহ্বল হয়ে পড়েছিলাম।
আজ সংসদ ভবনের বাইরে এসে সাংসদরাও দাঁড়িয়ে পড়েছিল। কেউ বাদ যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, স্কুল-কলেজের শিক্ষক-শিক্ষিকা, ছাত্রছাত্রীরা, চারুকলা কলেজের ছাত্রীরা, কলা ভবনের সামনে দিয়ে দলে দলে হল থেকে ছাত্রছাত্রীরা অপারেজয় বাংলার নিচে এসে সারি সারি নিঃশব্দ দাঁড়িয়ে পড়তে দেখেছি। অনেকদিন পর মাধবিকেও অধ্যাপিকা বান্ধবীদের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়তে দেখেছি। তাদের পাশে পাশে পুলিশ, মিলিটারির লরি থেমে গেছে। কোথাও কোথাও পদাতিক বাহিনীর সৈন্যরাও রক্তখচিত বাংলাদেশের পতাকার দিকে তাকিয়ে স্যালুট করছিল। সেদিন সচিবালয় থেকে বেড়িয়ে এসে আমলারা, কেরানিরা, পিয়ন, বিজ্ঞাপনের নায়িকারা, রাস্তার ছন্নছাড়া বেশ্যারা কেউ বাদ যায়নি। শুধু একজন না ওরা অনেকজন শুধু গোপন ষড়যন্ত্রে মেতেছিল। ওরা আরো অনেকে দলবদ্ধভাবে লোকজনের ভিড়ে মিশে গিয়ে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে ছড়িয়ে পড়ে শুধু বিভ্রান্ত করছিল। ওরা বলাবলি করছিল…, ‘হুজুরদের ফাঁসি দিচ্ছে।’ আপনারা একদিন দেখবেন, আল্লাহর বান্দারা একদিন রুখে দেবে, একদিন সারাদেশ থেকে যখন যেখানে ডাক পড়বে তখন সদল বলে সবাই জড়ো হবে, তারপর রফা হবে। এসব কথা বেঙ্গমা বেঙ্গমি পাখিরা শুনে ফলেছিল। ওরা উড়ে উড়ে যেখানে লোকজন জড়ো হয়েছে সেখানে সকলের মাথার ওপর চক্কর খেতে খেতে কোরাস করছিল, তোমরা উল্লাস করো না ওরা পিছু হটেনি, কেবল সরে পড়েছে, যখন তখন হামলা চালাতে পারে। দেখ একদিন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়বে, একটা হাঙ্গামা বাধাবে। নতুন চেহারা নিয়ে বেড়িয়ে পড়বে। তোমরা সাধ করে ফানুস ওড়াবে না। ফুলের গাড়ি করে শহর ঘুরে বেড়িয়ো না। তোমরা দেশ স্বাধীনের পর একবার ভুল করেছিলে, আবার সে ভুল করো না। এবার পার পাবে না। আরও আশ্চর্য যে রেসকোর্স ময়দানে যেদিন পাকিস্তানি বাহিনীর প্রধান জেনারেল নিয়াজী আত্মসমর্পণ করছিলেন জেনারেল অরোরার কাছে সেদিনও দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পাকিস্তানি সৈন্যরা নিরীহ বাঙালির বুকে গুলি চালিয়েছিল। খুন ঝরিয়েছিল। তাদের দোসর বিহারি, আলবদর, রাজাকার, আলশামসরা চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়ে বাঙালি নিধনের নৃশংস পর্ব অব্যাহত রেখেছিল।
স্বাধীন দেশে একাত্তরের পর কি দেখি কখনো বায়তুল মোকাররমে, কখনো শোলাকিয়ার ঈদগাহ মাঠ অতর্কিত বোমা হামলা চালাবার নারকীয় খেলায় নেমেছিল দেখোনি? তোমরা এখনও চাঁদ ডোবার আগ পর্যন্ত জ্যোৎস্না দেখবে?
এসব বিড়বিড় করে কি বলছিল? ধুলো ধূসরিত খোয়া ওঠা পথ শুধু হাঁটছিল। বাড়ি পৌঁছতে পৌঁছতে রাত দশটা বাজবে। বাড়ির পাশে শিমুল গাছে তখন লক্ষ্মী পেঁচা ডেকে উঠবে। তক্ষক বারবার ডেকে উঠবে। আর ঝিঁঁঝির নীরবতা মুহুর্মুহু ছড়িয়ে পড়বে। দরজার কাছে কড়া নেড়ে বলবে, ‘মুন্নি, মুন্নি দরজা খোল। কিন্তু কোনো সাড়াশব্দ নেই। দরজা কেউ খুলছে না। কেমন ঝিম ধরা নীরবতা। নিশ্চুপ। কোনো রা নেই। চাদ্দিকে ছোপ ছোপ অন্ধকার। খুব কাছে থেকে পোড়া গন্ধ আসছে। যেন ভুতুড়ে বাড়ি কেউ নেই। কোথায় গেছে ? ওরা। জানে না বারবার ডাকছে কোনো উত্তর নেই।
চতুর্দিক গভীর নিশীত ছাইপোড়া অন্ধকার খাঁ খাঁ করছে। দূর বহুদূর থেকে স্লোগান ভেসে আসছে। ভিনদেশি ভাষায়। আর কারা যেন ফিসফিস করে বলছে, ওকে পালিয়ে যেতে বল, না হলে রক্ষে নেই।

কিছু বুঝে ওঠার আগে কেউ যেন খুব কাছ থেকে জাপটে ধরে কঁকিয়ে কেঁদে উঠল, ‘বাজান তুমি এহন আইছ? কই ছিলা? এদিকে যে সর্বনাশ হইয়া গেল,’ কিছু বুঝতে পারিনি তখনও কেঁদে কেঁদে নীলার মা বলছিল, বাজান বৌমা আর আমার ভাইডারে বিকাল বেলা তৈলা ভাঙ্গা বিলে মজাহারুল হকের ছেলেরা দা দিয়া কোপাইয়া খুন করছে। কিছুতেই আওয়াজ করতে পারছিলাম না কারো কান্না কানে আসছিল।
কেউ পাশ থেকে ধাক্কা দিয়ে শুধু বলল, ‘উফ অসহ্য রাত বিরাতে চিৎকার চেঁচামেচি, আর ভালো লাগে না,’ ধড়ফড় করে উঠি। বিছানায় উঠে বসি। কখন যে মুন্নি উঠে এক গ্লাস পানি নিয়ে এসেছে।
খুব কাছে বসে, মুন্নি অনেকটা গা ঘেঁষে বলল, ‘কি হয়েছে তোমার?’
কিছু না তখন একটা চিঠি পড়ে শোনাল এবার সাদা কাফন অচিরে পেয়ে যাবেন।
এটা কখন পেলে?
ডাকপিয়ন দিয়ে গেছে।
এখন কি হবে?
কিছু হবে না
আরো কাছে ঘেঁষে অনেকটা জড়িয়ে ধরে মুন্নি বলল ফিসফিস শব্দে তুমি ব্লগে লিখো না, অমিতাভ খুন হয়েছে।
তুমি না একসময় প্রীতিলতার কথা বলছিলে
ভাবতাম; এখন ভাবি না; এ বয়সে বিধবা হতে পারব না
ঘুম আসছে। কাৎ হয়ে শুয়ে পড়েছে। ঘুমে কাদা হয়ে পড়তে সময় লাগল না।
ঘরময় অন্ধকার। মশারির ভিতরে কুল কুল করে ঘামছি। বালিশের নিচ থেকে এরিকসন মোবাইলটা নিয়ে সুইচ টিপে বিছানা থেকে মশারি আলগে নেমে পড়ি ।
জানালার ধারে দাঁড়াই। আর তখন মোবাইলের স্ক্রিনে ভেসে ওঠে প্রেসক্লাবের সামনে দেখা হবে, চারটা নন্দিনী, দিয়া, তবাচ্চুম, তারান্নুম, ফিরদেওসি, শিউলি, নিখিল, জাফর, নুজহাত, অনল, ডলি, কঙ্কা, রূপা, রুমি, রুজদি, ফাতেমা, ফারিয়া, ফারজানা, রুনা, তপন, ইকবাল, কৃষ্ণ ……….
সবাইকে মেসেজটা ফরোয়ার্ড করি। া

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা