দায়

আগের সংবাদ

ভৈরবে মুক্তিপণের টাকার জন্য বন্ধুকে খুন করল ৩ বন্ধু

পরের সংবাদ

এ্যান এক্সপার্ট হেডমাস্টার

প্রকাশিত হয়েছে: মে ৩১, ২০১৯ , ৭:৩৯ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুন ২, ২০১৯, ৫:২২ অপরাহ্ণ

অনলাইন প্রতিবেদক

মেঘনা গোমতির তীরঘেঁষে একটি গ্রাম নাম তার সুবর্ণগ্রাম। সেই গ্রামের এক সময়ের সুশীল শিশু সুকোমল বসাক প্রথম জীবনে স্থানীয় হাইস্কুলে কিছুদিন শিক্ষকতা করেছিলেন। গ্রামে-গঞ্জে তখন কার্ল মার্কস চর্চা জোরেশোরে সবে শুরু হয়েছে। ওস্তাদ সাগরেদরা উঠতি আঁতেল প্রকৃতির সেসময় সেরখানেক ফিদেল কাস্ট্রো, আধাকেজি পরিমাণ ট্রটস্কি, টিটো, মার্টিন লুথার কিং, চার চা চামচ চৌচেস্কু, মাওসেতুং ও মার্শাল টিটি এদের অধ্যয়নে সময় কাটাতো। সুকোমল বাবু গাঁওগেরামের অর্থনীতি নিয়েও আলোচনায় আঁতেল ভাবই শুধু প্রকাশ করতেন তা নয়, ঢাউস প্রকৃতির বই লেখবার পাঁয়তারাও করেছিলেন তিনি। তাঁর ছিল সুবর্ণগ্রাম হাইস্কুলের হেডমাস্টার হবার বড় শখ কিন্তু স্কুলে হঠাৎ করে তো হেডমাস্টার হওয়া যায় না এবং তখন দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এত উন্নতিসাধিত হয়নি যে, যে কেউ তদবির তেলেসমাতি করে এমন কি বিশেষ ক্ষমতাবলে হেডমাস্টার কেন অধ্যাপক হতে পারেন। তাই তিনি হোমড়া চোমড়া হবার জন্য গ্রামের চৌধুরী বাড়ির বড় কেরানির চাকুরিতে মহকুমা সদরের বড় চাকুরিতে ঢুকলেন। গোটা মহকুমায় তখন চৌধুরী পরিবারের প্রতিপত্তি যেমন ছিল একই সাথে মুখুজ্জেদেরও প্রভাব। বড় চৌধুরী হরিচরণ বাবু হঠাৎ হার্টফেল করলেন। সর্বেসর্বা ক্ষমতাধরের এমন অন্তর্ধানে চৌধুরী পাড়ায় তো বটেই মহকুমায় মড়ক লেগেছে মনে হলো। এমন অবস্থায় মদন মুখুজ্জেদের মুখ চন্দনে সবাই হতভম্ব। মুখুজ্জের বড় পোলা কমলকান্ত তার প্রভাব প্রতিপত্তির পসার সাজানোর শুরু করেছে। চৌধুরীদের দহলিজ থেকে মুখুজ্জেদের দস্তরখানায় পাত্র নিলেন যেন বসাক বাবু। তার এই বাড়াবাড়ি ভোল পাল্টানোয় সবাই আশ্চর্য হলো বৈকী। শুধু তিনি একা নন, সুকোমল বাবুদের জ্ঞাতিগোষ্ঠীর মধ্যে বেশ কয়েকজন ইতিমধ্যে গ্রামের বিদ্বজন সভায় স্থান করে নিয়েছে। কমল কান্ত গ্রামের উন্নয়নের নামে বেশ কিছু কর্মসূচি হাতে নিলেন। তিনি নিজেই কোদাল কাস্তে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। মানুষের উন্নতি কিভাবে হবে, কিভাবে মানুষ সহজে সুপেয় পানি পাবে, বিদ্যুৎ পাবে, গোলাভরা ধান পাবে, পুকুর ভরা মাছ পাবে আরো কত কি স্বপ্ন দেখা ও দেখানো শুরু হয়ে গেল সুবর্ণগ্রামে। কমল বাবুর এই কর্মসূচির মোদ্দা কথা হলো গ্রামের যত খানা-খন্দ, পুকুর-পুষ্করিণী, খাল-বিল সবটাকে খনন করে সেখানে সুপেয় পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করা। খনন করা খাল ও পুকুর পাড়ে শুরু হয়ে গেল ফল, ফসল, পাট ও ধান লাগানো। সাথে শুরু হলো মাছ চাষের আর্ট ও গান। এসব কাজে কর্মে কমল বাবু আর সুকোমল বাবু হঠাৎ করে যেন পরস্পরের ভাবশিষ্য ও হরিহর আত্মা হয়ে গেলেন। রাতদিন খাল খনন কাজে সুকোমল বসাক এমনভাবে নিজেকে জড়ালেন যেন মনে হচ্ছিল কমল মুখুজ্জের এমন ভক্ত কুশীলব ভূভারতে আর জন্মায়নি। চারদিকে ধন্য ধন্য পড়ে গেল। তাতে বসাক বাবুর পসারও বাড়তে লাগল। তরতর করে পেয়ে গেলেন পদোন্নতি। তিনি হোমড়া চোমড়া হয়ে মাঝেমধ্যে বড় বড় বিদ্যালয়েও বক্তৃতা দিতে যান। মোটামুটি একজন বুদ্ধিদীপ্ত কামলার পর্যায়ে উঠে গেলেন তিনি।

কমলাকান্ত বাবু নানাবাড়ি চাপাডাঙ্গায় দরকারি কাজে বেড়াতে যেয়ে বর্ষণমুখর ভোরে খুন হলেন। এই অদৈব দুর্বিপাক দুর্ঘটনায় মুখুজ্জেদের বাড়িতে সবাই মুষড়ে পড়লেন। উপায়ন্তর না দেখে বসাক বাবু এই সুবাদে তীর্থযাত্রী হবার বাসনা বা ফন্দি আঁটলেন। মথুরায় তার এক পিসি থাকত। তার আমন্ত্রণে তিনি মথুরায় পাড়ি জমালেন। সেখানেও তিনি তার পসার বাড়াতে চেষ্টিত হলেন। বসাক বাবু বরাবরই মেধাবী, চৌকস, বাগ্মি ও বাক্যালাপে বেজায় শব্দ নির্মাণের শক্তি তার ছিল। সেই সব চালবাজি খাটিয়ে বসাক বাবু প্রায় আট বছর মথুরায় কাটিয়ে আবার গাঁয়ে ফিরলেন এবার মনে হলো এ যেন খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন। গ্রামে তখন আবার চৌধুরীদের প্রভাব জাগতে শুরু করেছে। সবাই বিস্ময়ে একদিন দেখল কমল মুখুজ্জের কাছের কামলা খাটা বসাক বাবু হঠাৎ করে চৌধুরী বাড়ির বড় দিদিমণির প্রেমে পড়ে গেলেন। হরিচরণ চৌধুরীর মেধাবী মেয়ে বিদেশে কূটকৌশল রপ্ত করে সবে গ্রামে ফিরে এসেছে। ক্রমে ক্রমে সবার দিদিমণি গ্রামের মাথার মণি হবার পথে। দিদিমণির বড় কামলা হবার বাসনা বসাক বাবুর মধ্যে জেগে উঠল তীব্রভাবে। মোক্ষম এ সময়ে দিদিমণির ভালোবাসা লাভের আকাক্সক্ষায় আমাদের সুকোমল বসাক বাবু গ্রামের সব কুলবধূদের শ্রীকৃষ্ণের বাঁশির সুরে উতলা হতে উদ্বুদ্ধ করলেন। শেষমেশ কৃষ্ণরূপী বসাক বাবুর বাঁশরী শুনে সব ললনারা ঘরের বার হলো। হ্যামিলনের সেই বাঁশিওলার মতো গাঁয়ের যত ছোটবড় মুটে মজুরেরা তার পিছু নিল। গাঁয়ের সবাই প্রমাদ গুনল। মান্যি গণ্যি সব হাওয়ায় উড়ে গেল। হঠাৎ করে বড় ছোট জ্ঞান সকাল বিকেলের পালাবদলে দুধ ও ঘোল তেল ও ঘির মধ্যে একাকার হতে শুরু করল। বাড়ির লক্ষ্মী ঘরের লক্ষ্মী ললনাদের এভাবে একূল ওকূল বরনের খেলায় সবাই আঁতকে উঠল।

এভাবে চৌধুরীরা যে তালুক পেল সেই তালুকে ভোল পাল্টানোয় পটিয়সী বসাক বাবু সর্বেসর্বা হয়ে উঠলেন। ঘরের সৌন্দর্য যে সব ললনারা তার কথা শুনে জাতকুলের মান খেয়ে কৃষ্ণের বাঁশি শুনে বের হয়েছিল তাদের বেশ এনাম দিয়ে পুরস্কৃত করা হলো আর তারা কথা রাখেনি তাদের ঘরছাড়া করা শুরু হয়ে গেল। এ যেন গ্রাম্য ক্ষমতা প্যাঁচালের উৎকোচের উদগ্র উদ্বাহু। যাহোক বছর পাঁচেক পর মুখুজ্জে বাড়ির বৌ সুদামণি দেবী চৌধুরী বাড়ির দিদিমণির বিরুদ্ধে চেয়ারম্যান ভোটে দাঁড়িয়ে জিতে গেল। অবস্থা যা দাঁড়ালো তাতে প্রথম বেকায়দায় পড়লেন বসাক বাবু নিজে। এখন বসাক বাবু কোথায় দাঁড়াবেন? বারবার পক্ষ ত্যাগ করায় ওস্তাদ বর্ণচোরাদের মতো বসাক বাবু একঘরে হবার জোগাড়। কমলাকান্ত বাবুর সাথে তার এক সময়কার সখ্যর সূত্র ধরে তার কুলরক্ষা হলো না এবার। তিনি এগাঁ সেগাঁয় গা ঢাকা দিয়ে বেড়ান। কয়েক বছরের মাথায় ভয়ানক গোলমাল বেধে গেল গ্রামে। ফণি ম-লের ছেলে ননিগোপাল হঠাৎ করে মাতাব্বরী নিয়ে নিল গ্রামের। তখন তার দাপট আর দেখে কে। সে প্রথমে এসে বসাক বাবুদের মতো কোকিলদের কাবু করতে একঘরে করে ফেলল। সে ঘরে বসাক বাবুকে যে ক’দিন যেভাবে রাখা হয়েছিল বাবু তার বর্ণনা করে একখান বই লিখে ফেললেন। তাকে কিভাবে কথায় কথায় ঠাট্টা মসকরায় মাথায় ঘোল ঢেলে দিয়ে হেনস্থা ও অপমান করা হয়েছে সে সব কথা সবাইকে বলবার বাসনা থেকে তিনি বইটা ছাপার উদ্যোগ নিলেন। তবে বাবুর মনে হলো এ ক’দিনে তার মাথায় নতুন অনেক বুদ্ধিও গজিয়েছে। এসব হেনস্থায় একবার তার ধারণা হলো তার শিক্ষকতায় ফিরে যাওয়া উচিত। বারবার ভোল পাল্টিয়ে তিনি যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন তা নিয়ে একখানা ভালো পাঠ্যপুস্তক রচনা করতে পারবেন তিনি। বাল্য ও কিশোরকালে এ্যান এক্সপার্ট হেডমাস্টারের যে নোটবই তিনি বা তারা পড়তেন তাঁর এই বইও জিপিএ ফাইভ না হলেও অন্তত প্রশ্ন ফাঁসরোধের দাওয়াই হিসেবে কাজে লাগতে পারে। এই বই একজন অভিজ্ঞ হেডমাস্টারের তাজ তার মাথায় পরাতে পারে বাবু এটাও তবক নিলেন যে কিভাবে টাকাপয়সা নয়-ছয় করা যায়, না আঁচিয়ে কামানো যায়, সরানো যায়, বাঁচানো যায়। বসাক বাবুর দিব্যচোখ খুলে গেল। ব্যস ইতিমধ্যে চৌধুরীরা আবার স্থানীয় পর্যায়ে প্রভু হয়ে উঠলো। তারা বসাক বাবুর প্রতি মুখ ফেরালেন। বাবুর জ্যোতি বেড়ে গেল। বয়োবৃদ্ধ বাবু টাকাপয়সা সরানোর ব্যবসায় নাম লেখালেন। গ্রামের সরল মানুষেরা লেনদেনের ব্যবসায় বাবুকে বেশ বিশ্বস্ত ও এ্যান এক্সপার্ট হেডমাস্টার হয়ে উঠলেন। ঘরের টাকাপয়সা গয়নাগাটি হাতিয়ে নেয়ার কাজে তার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে একদিন সবাইকে পথে বসিয়ে ছাড়লেন। স্কুলের চাকুরি পাওয়ায় তিনি নেই তথাপি সবাই তাকে এ্যান এক্সপার্ট হেডমাস্টার হিসেবে মান্যি গণ্যি করতে এমনকি গালমন্দ করতে শুরু করল। বন্যায় ভেসে গেলেন তিনি।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা