ভৈরবে মুক্তিপণের টাকার জন্য বন্ধুকে খুন করল ৩ বন্ধু

আগের সংবাদ

প্রেসক্লাবের সামনে দেখা হবে

পরের সংবাদ

অনু এবং ছয় দফা খাতা

প্রকাশিত হয়েছে: মে ৩১, ২০১৯ , ৮:০০ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুন ২, ২০১৯, ৫:২৫ অপরাহ্ণ

কাগজ প্রতিবেদক

ভূমিকা

স্বাধীন দেশের প্রথম ক্লাস ওয়ান আমরা। ‘ছয় দফা’ খাতায় আমরা লিখেছি। এক্সারসাইজ খাতা। রুল টানা এবং সাদা, দুরকম খাতা ছিল। মলাটে ‘ছয় দফা’ লেখা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি ছাপাই ছিল। জয় বাংলা।

১.
‘এই ছেলে, তোর নাম কী রে?’
‘অনু।’
‘অনু। হা! হা! হা! তুই তো অনু না, পরমাণু রে। হা! হা! হা! কোন পাড়ার? কার ছেলে তুই?’
‘উকিলপাড়ার। দীপেনদার ছেলে।’
‘উকিলপাড়ার দীপেনদার ছেলে। হা! হা! হা!’
হাসির কী হলো? অনু বুঝল না। তার বাবাকে তো সবাই দীপেনদাই ডাকে। একমাত্র টেডিপিসি ডাকে দুপুদা। এটা কি কোনো হাসির কথা হলো? মানুষটা কে?
ছোটোকাকুর বয়সি। দাড়িগোঁফঅলা। পাগল পাগল দেখতে। চোখ বড়ো বড়ো। সবুজ রঙের ঢোলা বেপারি শার্ট আর শেয়াল রঙের চোঙা প্যান্ট পরে আছেন। পায়ে হলুদ রঙের প্লাস্টিকের স্যান্ডেল। কে এটা?
সীতারামভাইয়ের মুদির দোকানে টেডিপিসির সঙ্গে এসেছে অনু। টেডিপিসি তেঁতুল কিনবে এবং অনুকে কাঠি লজেন্স কিনে দেবে। কিনে দিয়েছে। সীতারামভাই ইয়া মোটা মানুষ। নড়তে চড়তে পারে না এরকম। টেডিপিসি তাকে আট আনা দিয়েছে, বিশ পয়সা ফেরত দেবে, ক্যাশ বাক্স থেকে কষ্টমষ্ট করে পাঁচ পয়সা এক পয়সা করে ওঠাচ্ছে, এই সময় মানুষটা দোকানে ঢুকলেন, সীতারামভাইকে একটা হাসি দিয়ে বললেন, ‘কেমন আছ, সীতারামভাই? কিংস্টর্ক দাও তো দুই শলা।’
সীতারামভাই দেশোয়ালী মানুষ। তার মা রজন্তীমাসি। সীতারামভাই না থাকলে, রজন্তীমাসি বসে দোকানে। সীতারামভাইকে পাড়ার সবাই ডাকে সীতারামভাই। রজন্তীমাসিকে ডাকে রজন্তীমাসি। সীতারামভাইও কথায় কথায় বলে, ‘আমি রজোন্তীমাসির ব্যাটা হোই না?’
সীতারামভাই, রজন্তীমাসিরা অনুদের মতো করে কথা বলে না। কেমন করে বলে, স স করে।
সীতারামভাই মনে হলো খুশি হয়েছে মানুষটাকে দেখে। টেডিপিসির পয়সা ফেরত না দিয়ে কথা জুড়ে দিল তার সঙ্গে, ‘আরে দাদা! তুমি কোবে শহরে ফিরল্যা? কোতোদিন পর দেখলাম তুমারে! আট নোয় বরসের কম তো হোবে না।’
‘তোমার সব হিসাব থাকে সীতারামভাই। হা! হা! হা! আট বছর আগেরও হিসাবও রেখেছ। আমার হিসাব মনে আছে তো? আমার কাছে কত পাও, বলো দেখি! খাতা দেখবে না।’
‘দুই ট্যাকা ছয় আনা চোদ্দ পইসা, দাদা।’
‘এই দেখ! হা! হা! হা! তুমি একটা জিনিয়াস সীতারামভাই। সলিড জিনিয়াস। হা! হা! হা! এই ধরো, তোমার দুই টাকা ছয় আনা চৌদ্দ পয়সাও রাখো এ থেকে।’
বলে সীতারামভাইকে পাঁচ টাকার একটা চকচকে নতুন নোট দিলেন মানুষটা। সীতারামভাই সিগারেট দিল। মানুষটা একটা সিগারেট ধরালেন। আর একটা সিগারেট শার্টের পকেটে রেখে অনুকে নিয়ে পড়লেন।

টেডিপিসি বলল, ‘পয়সা দাও, সীতারামভাই।’
সীতারামভাই বলল, ‘দেই, দিদি।’
মানুষটা বলল, ‘হেই! টুকু না তুই?’
টেডিপিসির নাম টুকু।
টেডিপিসি বলল, ‘হ্যাঁ।’
‘আমি কে বল তো? চিনতে পারিস নাই? হা! হা! হা! আমি এনায়েত রে। আধা মাইল পাড়ার এনায়েত। এনায়েত সৈয়দ রে! হা! হা! হা!’
টেডিপিসি বলল, ‘এ-না-য়ে-ত ভাই! কী করে চিনব বল তো, কত ছোটো থাকতে দেখেছি তোমাকে!’
‘ঠিকই তো। তুইও তো বিরাট বড়ো হয়ে গেছিস। আমি তো এতক্ষণ চিনতেই পারি নাই। হা! হা! হা! বিজু, কল্যাণরা কেমন আছে? কাকা, কাকীমা?’
‘সবাই ভালো আছে। বাসায় যেও তুমি।’
‘যাব, দেখি।’
‘দেখার কী আছে? এখন চল।’
‘নারে, এখন না। সীতেশ স্যারের সঙ্গে একটু দেখা করতে যাব এখন। রেজান আলি স্যারের বাসায়ও যাব। এই যে দীপেনদার ছেলে তনু।’
টেডিপিসি বলল, ‘তনু না, এনায়েত ভাই। অনু! অনু!’
‘ও অনু। অনু বাবু আপনার বাবাকে বলবেন এনায়েত ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। হা! হা! হা! এই নেন ধরেন। টুকু, তুইও নে একটা।’
বলে বেপারি শার্টের পকেট থেকে দুটো রঙিন কাগজে মোড়ানো কিছু বের করে দিলেন মানুষটা।
টেডিপিসি বলল, ‘কী গো এনায়েত ভাই?’
‘জলপিপির ডিম। হা! হা! হা!’
‘জলপিপির ডিম!’
‘আরে নারে। চকলেট। ইতালিয়ান চকলেট।’
কী অদ্ভুত কথা! ইতালিয়ান কী? এত কঠিন কথা বুঝল না অনু কিন্তু মানুষটাকে এতক্ষণে পছন্দ হয়ে গেল তার। চকলেট নিল তারা। টেডিপিসি বলল, ‘এখন খাবি না।’
টেডিপিসির কথা তেঁতুলপাতা। সব মানে অনু। টেডিপিসি বলল, ‘পকেটে রেখে দে।’ সব মানলেও টেডিপিসির এই কথাটা মানতে পারল না অনু। তার প্যান্টের পকেট ছিঁড়ে গেছে। দুটো পকেটই। টেডিপিসিকে সে কথাটা বলেনি। আচ্ছা এই যে, এনায়েত ভাই মানুষটার সঙ্গে দেখা হলো তাদের, এই এনায়েত ভাই মানুষটার কথা কি সে তার বাবাকে বলবে?
না। বাবাকে খুবই ভয় পায় অনু। এমন না যে বাবা তাকে বকেন কখনও বা পেটান, মারধর করেন। কিছুই না, তাও ভয় পায়। এনায়েত ভাই মানুষটার কথা যদি বলতে হয় অনু অবশ্যই বলবে মাকে। টেডিপিসি বলবে বাবাকে।
তারা একটা পাড়ায় থাকে এবং পাড়াটার নাম উকিলপাড়া এটা কিছুদিন আগেও জানত না অনু। টেডিপিসি কয়েকদিন আগে বলেছে। আজ শুনল আধা মাইল পাড়া। এর আগে ষোলঘর এবং হাছন নগরের কথা শুনেছে। বাসস্ট্যান্ড রোডের কথাও শুনেছে। বাপিদের বাসা হাছননগরে। ফরিদদের বাসা বাসস্ট্যান্ড রোডে। এমন কয়টা পাড়া আছে শহরে? জিজ্ঞাস করবে অনু, এই সময় টেডিপিসি বলল, ‘এনায়েত ভাই আর্টিস্ট। দুপুদার বন্ধু।’
আর্টিস্ট! আর্টিস্ট?
টেডিপিসি বলল, ‘ছবি আঁকে। মানুষ দেখে মানুষ আর্ট করতে পারে। তোকে দেখে তোকে আর্ট করতে পারবে। ঢাকার আর্ট কলেজে পড়েছে। এখন থাকে ইতালিতে।’
অনু বলল, ‘ইত্-আলি!’
টেডিপিসি বলল, ‘অনেক দূরের দেশ। বিলাতের থেকেও দূরে।’
অনু বলল, ‘পাহাড় থেকেও দূরে?’
টেডিপিসি হাসল, ‘তুই একটা বোকা রে অনু।’
তাদের শহর থেকে পাহাড় দেখা যায়। দূরে। নীল রঙের।

লম্বাবাসা এবং বৃষ্টি গাছ পার হয়ে অনুদের বাসার কাছে এসে গেছে তারা, অনু বাগানে তার মাকে দেখল। অতসী, গন্ধরাজ, গোলাপ, জবা, কাঠচাঁপা এবং পদ্ম গাছ আছে বাগানে। স্থলপদ্ম। আর একটা বরই গাছ, আর একটা আঙুর গাছ আছে। বরই ধরে। আঙুরও ধরে। বরই মিষ্টি। আঙুর তিতা। দুনিয়ার তিতা!
সন্ধ্যা পূজার জন্য দূর্বা তুলছেন মা, তাদের দেখেননি, টেডিপিসি ডাক দিল, ‘বৌদি।’
মা ঘুরে বললেন, ‘ও, কার্তিক। এদিকে আয় তো। আমার চোখে কি পড়েছে দেখ তো।’
‘হাতি পড়েছে, বৌদি।’
বাঁশের বেড়া, বাঁশের গেট বাগানের। গেট সরিয়ে তারা ঢুকল। কিন্তু মার চোখে হাতি পড়েছে। মানে কী? এই কদিন ধরে এত আজব কথা শুনছে, জন্মে আর শোনেনি অনু। এই কিছুক্ষণের মধ্যেই কত কী শুনল! আর্টিস্ট, ইতালি, বিলেত, ঢাকা, কিংস্টর্ক। আরও আজব কথা আছে দুনিয়ায়? কত কথা?

২.
মেইন রোডের ধারে বাসা অনুদের। তাদের পাশের বাসাটা পিংকুদের। দাদাবাবু, ছোড়দা, পিংকু, ফুলদি, মেজদি, সেজদি, ছোড়দি এবং দুলি, আট ভাইবোনের মধ্যে ছোটো পিংকু। অনুর এক বছরের বড়ো। পিংকুদের পরের বাসাটা পাখি পিসিমার। পাখি পিসেমশাই ছিলেন একজন। তাকে কখনও দেখেনি অনু। ওকালতি করতেন। অনুর জন্মের বহুবছর আগে কালাজ্বর হয়ে মারা গেছেন। পাখি পিসিমার তিন ছেলে। বড়দা, মেজদা থাকে ইন্ডিয়ায়। ছোড়দা ঢাকায় কলেজে পড়ে। পাখি পিসিমার বাসার লাগোয়া পরের বাসাটা টেডিপিসিদের। টেডিপিসি, মিষ্টিপিসি, ছোটোকাকু, ফুলকাকু। আর আছেন ভাই এবং ঠাম্মা। টেডিপিসির বাবাকে ‘ভাই’ ডাকে অনু। মাকে ঠাম্মা। ভাইয়ের সঙ্গে তার একটা বিশেষ সখ্যতার সম্পর্ক আছে। সন্ধ্যায় ভাইয়ের সঙ্গে বসে হরলিকস খায় সে। মিষ্টিপিসির নাম সন্ধ্যা। ফুলকাকু কল্যাণ এবং ছোটোকাকু বিজু। টেডিপিসির… টেডিপিসি ডাকে কেন অনু? আগে নাম ধরে ডাকত, ‘কাত্তিক।’ এই কার্তিকও টেডিপিসির নাম না। কিন্তু বাবা ডাকেন ‘কার্তিক’। কেন যে? টেডিপিসি কি কার্তিক ঠাকুরের মতো দেখতে? তীর ধনুক আর লেজ লম্বা ময়ূর নিয়ে ঘুরে বেড়ায়? তবে? বাবার দেখাদেখি মাও ডাকেন কার্তিক। তাহলে অনু ‘কার্তিক’ ডাকবে না? বাবা একদিন বললেন, ‘আরে! তুই কার্তিক ডাকিস কেন কার্তিককে?’
মা বললেন, ‘আমিও বলি। মিষ্টিপিসি তো আছে একজন। রাঙাপিসি ডাকবি কার্তিককে।’
বাবা বললেন, ‘আরে দুর! রাঙাপিসি কী? কার্তিকটা কেমন টেডি দেখো না! অনু তুই টেডিপিসি ডাকবি কার্তিককে।’
টেডিপিসি। পাক্কা।

৩.
অনুর বয়স এখন তিন বছর সাত মাস। তার জগৎটা এখনও অনেকটাই টেডিপিসির জগতের সঙ্গে যুক্ত। টেডিপিসি ইশকুলে পড়ে। শহর প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয়ে। পারলে টেডিপিসির সঙ্গে সেই ইশকুলেও যায় অনু। বায়না ধরে প্রায়। টেডিপিসি বলেছে, নিয়ে যাবে একদিন। ফুলকাকু বলেছে, ‘হ্যাঁ, তুইও টুকুদের স্কুলে ভর্তি হয়ে যা।’
ইহ! টেডিপিসিদের ইশকুলে ভর্তি হবে কেন অনু? সে কি মেয়ে নাকি?
শহর প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয়। মানে হলো মেয়েদের ইশকুল। অনু পড়বে গাঙপাড়ের ইশকুলে। রাজগোবিন্দ প্রাথমিক বিদ্যালয়। নদীর পাড়ে, জেটির ধারে। মানুষজন বলে গাঙপাড়ের ইশকুল। পিংকুদের বাসার ছোড়দা এবং লম্বাবাসার শান্তুদা পড়ে গাঙপাড়ের ইশকুলে।
অনুর বাবা দীপেন কর্মকারের ফার্মেসি আছে বাজারে। ন্যাশনাল ফার্মেসি। রোজ সকাল নয়টায় ভাত খেয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যান দীপেন কর্মকার। ফার্মেসি করেন রাত নয়টা পর্যন্ত। তিন বছর সাত মাস বয়সের অনু কী চোখে দেখে তার বাবাকে?
ভয় পায়।
বাবা লম্বা। এই লম্বা। রং ফর্সা। কথা কম বলেন। খুবই কম বলেন। হাসিঠাট্টা করে কথা বলেন একমাত্র টেডিপিসির সঙ্গে। সকালে ঘুম থেকে উঠে জলখাবার খেতে খেতে রেডিও শোনেন অনেকক্ষণ। রাতে ফিরে ভাত খেয়েও শোনেন। লাল রঙের রেডিও। বাবার ঘরে বইয়ের আলমারি আছে, সেই আলমারির উপর থাকে এমনিতে। বাবা যখন শোনেন, বিছানায় বসে রেডিও সামনে রেখে শোনেন। রেডিওর সঙ্গে কথা বলছেন এরকম মনে হয় দেখলে।
বাসায় থাকলে লুঙ্গি আর হাতকাটা গেঞ্জি পরেন বাবা। ফার্মেসিতে যান সাদা বেপারি শার্ট এবং সাদা ধুতি লুঙ্গির মতো করে পরে। খড়ম পরেন। টায়ারের খড়ম। আর হাতে মস্ত টর্চ থাকে একটা। অনু তাকে এত ভয় পায় কেন? বলতে পারবে না।
অনুর মা যুঁথি। যুঁথিকা কর্মকার। হাসিখুশি মানুষ। পাড়ার কারোর বৌদি, কারোর কাকিমা, কারোর মাসিমা, কারোর দিদি। টেডিপিসির মতো ইশকুলে যান না মা কিন্তু অনু বুঝতে পারে না, সবসময় মা এত কী পড়েন! দুপুরে ভাত খেয়ে উঠে না ঘুমিয়ে বই পড়েন, রাতে ঘুমিয়ে পড়ার আগে বই পড়েন। এত বই পড়ে কী হবে তার?
রাতে মায়ের সঙ্গে ল্যাপ্টে শোয় অনু। কারেন্ট চলে গেলে খুবই ভয় পায় বলে। নদীর পাড়ের এই তল্লাটে কারেন্ট আছে একমাত্র তাদের বাসাতেই। অন্যদের ঘরে কুপি, হারিকেন জ্বলে। কারেন্ট চলে গেলে ঘরদোর হঠাৎ এমন ঘুরঘুট্টি অন্ধকার হয়ে যায়, ভয় না পেয়ে কেউ পারে? অন্ধকারে আনাগোনা করে ভূতরা। দেওয়ান সাহেবের রাইসমিলের পেছনে মস্ত যে বটগাছটা, ব্রহ্মদৈত্য থাকে সেই গাছে। পিংকুদের বাসার ছোড়দা নিজে এক অমাবস্যার রাতে দেখেছে। শরীর ভর্তি চোখ ব্রহ্মদৈত্যর। বটগাছের ডালে এক পা, দেওয়ান সাহেবের রাইসমিলের চালে এক পা। আর একটু হলে ধরত ছোড়দাকে। কিন্তু ছোড়দা কি এতটাই বোকা? ব্রহ্মদৈত্য তাকে দেখা মাত্রই ভূতমন্ত্র পড়ে দিয়েছে। ব্রহ্মদৈত্য আর থাকে তল্লাটে!
ভূতমন্ত্র! ভূতমন্ত্র কী?
টেডিপিসি শিখিয়ে দিয়েছে অনুকে।
ভূত আমার পুত

পেত্নি আমার ঝি
রামলক্ষণ সঙ্গে আছেন
করবি আমার কী?
ভূত দেখলে এই মন্ত্র পড়তে হয়। ভূত পালায়।
ভূতমন্ত্রর মতো সাপমন্ত্রও আছে। মনে মনে তিনবার বলতে হয়,
দোহাই আস্তিক মুনি
দোহাই আস্তিক মুনি
দোহাই আস্তিক মুনি

৪.
অনুদের বাসার সামনে বারোয়ারি পুকুর। টেডিপিসিদের কাচারিঘর পুকুরের পাড়ে পড়েছে। গোয়ালঘরও। দুটো গরু আছে ভাইয়ের। বুধি আর টেপি। বুধির একটা বাছুর হয়েছিল। মরে গেছে। ফুলকাকু সেই বাছুরের চামড়ার ভেতর খড় পুরে একটা বাছুর বানিয়ে দিয়েছে। খড়ের বাছুর সামনে রেখে এখন দুধ দোয়ানো হয় বুধির। মাঝেমধ্যে এই বুধির কী হয়, পুকুরে নেমে যায়। কয়েকদিন আগে একটা ঘটনা ঘটেছে। পুকুরে নেমেছিল, বুধি উঠেছে, টেডিপিসির সঙ্গে অনু পুকুরপাড়ে ছিল, টেডিপিসি হঠাৎ ত্রাহি চিৎকার দিল, ‘মাগো! সাপ!’
‘সাপ! কোথায়?’
‘বুধির পায়ে দেখ! বুধির পায়ে দেখ! সাপ! সাপ! ও ফুলদা! ও ছোড়দা! সাপ গো! সাপ!’
ঢোঁড়া সাপ একটা। বুধির একটা পা প্যাঁচিয়ে আটকে আছে। ফুলকাকু, ছোটোকাকু আসতে হলো না। টেডিপিসির চিৎকারেই মনে হয়, বুধি পা ঝাড়া দিয়েছিল, সাপটা ছিটকে পুকুরে পড়ে সাঁতার কেটে চলে গেল। ঢোঁড়া সাপ অনেক পুকুরে। ছোটো ছোটো মাছ ধরে খায়। বিষদাঁত নেই, এতটাই নিরীহ। কিন্তু অনু কি আর তা জানে? ঢোঁড়া সাপ সাপ তো। সে ভয় পায়। দেখলেই সাপ মন্ত্র পড়ে। অথচ বুধির পায়ে সাপ দেখে কি না সেই মন্ত্রটা তার মনেই আসেনি। টেডিপিসিরও মনে আসেনি। মন্ত্র না পড়ে ভয়ে চিৎকার করছিল তারা।

ঘুম কাতুরে না মোটেও অনু, তাও প্রায় রাতে তার ঘুম ধরে যায় বাবা ফার্মেসি থেকে ফেরার আগেই। আজও ধরে গিয়েছিল। বাবা ফিরে কখনও কখনও তাকে ওঠান। আজও ওঠালেন।
‘এই দেখ অনু, তালপাতার সেপাই!’
প্রথমে অনু ঘুম চোখে দেখল, দেখে তার চোখের সব ঘুম উড়ে গেল। তালপাতার সেপাই সে আগে আর দেখেনি, এই প্রথম। তালপাতা কেটে বানানো সেপাই। সুতা দিয়ে একটা কাঠির সঙ্গে আটকানো। কাঠি ঘুরালে সেপাই তিড়িংবিড়িং করে।
‘দেখ! দেখ!’
অনু হাতে নিয়ে দেখল। তার বিস্ময়ের সীমা থাকল না।
তালপাতার সেপাই তিড়িংবিড়িং করছে। তার হাতে নাচছে। অনু বলল, ‘টেডিপিসি যাব।’
‘ভাত দিয়েছি। খেতে আসো।’
বলতে বলতে এই সময় ঘরে ঢুকলেন যুঁথি। বাপ ছেলেকে এক ঝলক দেখলেন এবং আফসোস করে বললেন, ‘ছেলেকে আবার উঠিয়েছ কেন? আর ও ঘুমাবে?’
অনু বলল, ‘মা, টেডিপিসি যাব।’
যুঁথি বললেন, ‘এখন কে টেডিপিসির কাছে নিয়ে যাবে তোমাকে? টেডিপিসি ঘুমিয়ে পড়েছে।’
‘ঘুমায়নি।’
‘ঠিক আছে, ঘুমায়নি। কিন্তু তোমার বাবাকে যে ভাত বেড়ে দিয়েছি, ময়না। বাবার খাওয়া হয়ে যাক, তখন আমরা টেডিপিসি যাব, কেমন?’
‘আচ্ছা।’
বলে অনু ঘাড় কাৎ করলেও তর তো তার সইছে না একটুও। বাবা বললেন, ‘আমার সঙ্গে দুটো ভাত খাবি, ব্যাটা?’
‘উঁহ।’
‘ও। আচ্ছা, আরেকটা কথা, এনায়েতের সঙ্গে দেখা হয়েছে নাকি তোর? সীতারামের দোকানে?’
‘হুঁ। এনায়েত ভাই আমাকে চকলেট দিয়েছে।’
‘এনায়েত ভাই! হা! হা! হা! হা! এনায়েত তোর ভাই হয় নাকি?’
‘টেডিপিসি বলল এনায়েত ভাই।’
‘টেডিপিসি বলল। হা! হা! হা!’
যুঁথি বললেন, ‘এই যে, ভাত কিন্তু ঠা-া হয়ে যাবে।’
‘যাচ্ছি। আচ্ছা রে, ব্যাটা।’
বলে রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন বাবা। মাও।

রান্নাঘরে বসে খায় তারা। পিঁড়ি আছে, জলচৌকি আছে। ছোটো একটা পিঁড়ি আছে অনুর। অনু কখনও সেই পিঁড়িতে, কখনও জলচৌকিতে বসে ভাত খায়। কখনও উঠানে হেঁটে হেঁটে ভাত খায়। উঠানের কোণে একটা কাঁঠাল গাছ আছে। পিংকু বলেছে, এই গাছের কাঁঠাল মাটির নিচে হয়। পাকলে গর্ত খুঁড়ে শেয়াল নিয়ে যায়। ছোড়দা বলেছে, সামনের বার পাহারা বসাবে। শেয়াল হানা দিলে ঠেঙিয়ে তাড়াবে। মাটির নিচের আশ্চর্য কাঁঠাল তল্লাটের মানুষজন খাবে। পিংকু চোখ বড়ো করে বলেছে, ‘মাটির নিচের কাঁঠাল, তার স্বাদই আলাদা, বুঝলি?’
‘তুই খেয়েছিস?’
‘খাইনি বলে স্বাদ বলতে পারব না! এই আমি পিংকু রে, পিংকু!’
লম্বাবাসার বিজিতদা, উদয়দা, পিংকুকে ডাকে ‘ছাওমোড়ল।’ এমনি ডাকে না।
লম্বাবাসা। তাদের শহরে এত লম্বা বাসা নাকি আর একটাও নাই। এজন্য শহরের মানুষজন বিজিতদাদের বাসাটাকে বলে লম্বাবাসা। টেডিপিসি বলেছে। লম্বাবাসার সুধীর জেঠু কালোয়াতি গান করেন সন্ধ্যায়।
বাবা মাত্র খেতে বসেছেন। কতক্ষণ আর? কতক্ষণ আর? মাও বসেছেন। গল্প করে করে তারা খাবেন। টেডিপিসি যদি ঘুমিয়ে পড়ে! খাট থেকে নেমে পড়ল অনু। তার ভূতের ভয় মনে থাকল না, সাপের ভয় মনে থাকল না। হাতে থাকল, মনেও থাকল, একমাত্র আজব তালপাতার সেপাই।
টেডিপিসিদের অন্ধকার কাচারিঘরের পাশ দিয়ে ঢুকল অনু।
ঘুমায়নি টেডিপিসি। চুল আঁচড়াচ্ছে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। আয়নাঅলা টেবিল। ড্রেসিং টেবিল বলে। জানে অনু। টেডিপিসি হারিকেনটা ড্রেসিং টেবিলের কোনায় রেখেছে। ছায়া মনে হচ্ছে টেডিপিসিকে। দরজার চৌকাঠ থেকে ডাক দিল অনু, ‘টেডিপিসি!’
টেডিপিসি ঘুরে তাকাল, ‘তুই!’
‘এই দেখ!’
‘এমা! তালপাতার সেপাই। তোকে কে দিল?’
‘বাবা।’
‘হুঁ। তুইই তো ছোটোখাটো একটা তালপাতার সেপাই রে অলম্বুশ!’
অনু বলল, ‘ইহ্!’
হারিকেনের আলো অনুর চোখেমুখে শরীরে পড়েছে। হাফপ্যান্ট পরা, খালি গা খালি পা, হাতে একটা তালপাতার সেপাই, কেমন দেখাচ্ছে? ভূতের ছানার মতো?
টেডিপিসি বলল, ‘ইহ্ কি রে? এখন না তালপাতার সেপাই! ছোটো সময় তুই তো দেখতে একদম ভূতের ছানার মতো ছিলি, বল।’
অনু আবার বলল, ‘ইহ্!’।
টেডিপিসি বলল, ‘হুঁ। তুই কি ঘর থেকে একা একাই চলে এসেছিস নাকি রে?’
‘হুঁ।’
‘বৌদি দুপুদাকে বলে এসেছিস?’
‘না।’
‘কী সর্বনাশ!’
সর্বনাশের কী অনু বুঝল না।
টেডিপিসি ডাক দিল, ‘মা!’
পাশের ঘরে ভাই আর ঠাম্মা থাকেন।
ঠাম্মা বললেন, ‘কী?’
‘আমি অনুকে ঘরে দিয়ে আসছি।’
‘অনু? অনু এসেছে নাকি?’
‘হ্যাঁ! বৌদি দুপুদাকে কিছু না বলে একা একা উনি চলে এসেছেন। এই চল!’
ভাই বললেন, ‘ভাই নাকি?’
অনু বলল, ‘হ্যাঁ ভাই, তুমি ঘুমাওনি?’
‘নারে ভাই। তোমার ঠাম্মার গান শুনি।’
ঠাম্মার গান! অনু তো শোনেনি। কখনও শোনেনি। এখনও শুনল না!
টেডিপিসি বলল, ‘এই চল।’
কপাল ভালো। বাবা মাত্র খেয়ে উঠেছেন। বিছানায় রেডিও নিয়ে বসেছেন। মা রান্নাঘরে। গোছগাছ করছেন। বাবা তাদেরকে দেখে বললেন, ‘আরে কার্তিক! এটাকে কোত্থেকে নিয়ে এলি তুই?’
টেডিপিসি বলল, ‘বকো না, দুপুদা। তালপাতার সেপাই এনে দিয়েছ, সেটা আমাকে না দেখালে হবে? তোমার ছেলে একা একা আমাদের ঘরে চলে গিয়েছিলেন। বুঝতে পারেনি, তুমি বকো না। বৌদি কোথায়? রান্নাঘরে? বৌদিকে আবার পুত্রের কীর্তি বলো না। বৌদি বকবে।’
‘শুধু বকবে? ধরে ঠেঙাবে। বিরাট নটবর হয়ে গেছে ছেলে। রাত বিরাতে একা বের হয়ে যায়। একে তো গরু বাঁধার দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখতে হবে দেখি।’
টেডিপিসি বলল, ‘দুপুদা, লক্ষ্মী না তুমি! বৌদিকে বলো না।’
‘আচ্ছা, বলব না। ওহে নটবর, আর কখনও এরকম করো না, বুঝেছ? তোমার মা তো চিন্তায় পড়তেন নাকি? আমি তো চিন্তায় পড়তাম নাকি?’
‘আর করব না।’ অনু বলল।
টেডিপিসি বলল, ‘আমি তাহলে যাই, দুপুদা। রেডিওতে কী বলে গো?’
বাবা রেডিওর সাউন্ড কমিয়ে বললেন, ‘দেশের পরিস্থিতি খারাপ রে, কার্তিক। দিনকাল কিছুদিন ভালো যাবে না।’
বাবার কথা কিছু বুঝল না অনু। পরিস্থিতি কী? কী হয়েছে? দিনকাল কিছুদিন ভালো যাবে না। রেডিওতে এসব কথা বলেছে? রেডিওর ভেতর থেকে যারা কথা বলে, তাদের একদিন দেখার খুব ইচ্ছা অনুর। তারা কি খুব ছোটো মানুষ? এইটুক একটা রেডিওতে ধরে যায়!

৫.
অল্প অল্প ঠা-া হয় এখন ভোররাত। পাহাড় থেকে আসে উত্তরের হাওয়া। নদীর পাড় থেকে পাহাড় দেখা যায়। অনেক দূরে নীলরঙের পাহাড়। পিংকু বলেছে, নীলরঙের না, আসলে সব পাহাড়ের রঙ সবুজ। পাহাড়ে ঘরদোরও আছে মানুষের। নদী পার হয়ে ছোড়দার সঙ্গে একদিন পাহাড়ের নিচে নিয়েছিল পিংকু, দেখে এসেছে। তা আসুক। পিংকুর কথা অর্ধেক বিশ্বাস করেছে অনু। অর্ধেক অবিশ্বাস করে মাকে জিগ্যেস করেছিল, ‘সব পাহাড় নাকি সবুজ রঙের মা? পিংকু বলল।’
মা বললেন, ‘ঠিকই তো বলেছে।’
‘ঠিকই বলেছে? পাহাড় নীল না?’
‘হ্যাঁ, নীলও। নীলও, সবুজও। কাছের পাহাড় সবুজ, দূরের পাহাড় নীল। আচ্ছা তোর বাবাকে বলব, তোকে পাহাড়ের নিচে নিয়ে যাবেন একদিন।’
বলে কী হাসি! মা হাসলে মায়ের গালে টোল পড়ে, গেজদাঁত দেখা যায়, সিঁথির কিছু সিঁদুর নাকের ডগায় পড়ে।

মায়ের সঙ্গে ল্যাপ্টে অনু তার বাবা আর মায়ের মাঝখানে ঘুমায়। ঘুমিয়েছিল। ঘুম ভেঙে গেল, হিসি পেয়েছে। ঘরে মৃদু নীল আলো লাইটের। অনু মাকে, বাবাকে দেখল। মা ঘুমিয়ে, বাবা ঘুমিয়ে। মায়ের মাথার কাছে বই একটা। ঘুমিয়ে পড়ার আগে পড়ছিলেন।
নিঃশব্দে অনু খাট থেকে নামল। হুড়কো আলগা করে দরজা খুলল। সঙ্গে সঙ্গে অল্প কনকনে হাওয়া কাঁপিয়ে দিল তার ছোট্ট শরীরটা।
সকালের আলো এখনও ফোটেনি। কিছু তারা বরং আছে আকাশে। তবে বোঝা যাচ্ছে, ভোর হলো বলে। কচি করমচা পাতার মতো রং এখন আকাশের। অনেক দূরে কোথায় কুকুর ডাকল একটা। ঘেউ ঘেউ ঘেউ। আবার সব সুনসান। ঘুম ভেঙেছে, তবে কাটেনি, বারান্দার কোনায় দাঁড়িয়ে হিসি করল অনু। ঘুরে ঘুম চোখে যা দেখল, ভয়ে ঠা-া হয়ে গেল মুহূর্তে। বাগানে কী? বরই গাছের নিচে? সাদা শাড়ি পরা! শাকচুন্নি, না পেত্নি? ভূতমন্ত্র মনে পড়ল না অনুর। মাত্র সে চিৎকার দিতে যাচ্ছিল, শুনল, ‘কে রে বাবা, অনু? এত সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে পড়েছ রে বাবা। ভালো। ভালো। হরে কৃষ্ণ! হরে কৃষ্ণ!’
যাক। পেত্নিও না শাকচুন্নিও না, এটা হলো বিন্দুর মা পিসি।
‘তুমি কী করো গো, পিসি?’
বিন্দুর মা পিসি বলল, ‘ঠাকুরের জন্য দুইটা ফুল নেই রে, বাবা। ঠাকুর। ঠাকুর। হরে কৃষ্ণ! হরে কৃষ্ণ!’
ঠাকুরের জন্য ফুল এত সকালে নিতে হয়?
দুপুরে ভুল ভাঙাল পিংকু। পুকুর ঘাটে বসে তারা কথা বলছিল। ঘটনা শুনে পিংকু বলল, ‘বিন্দুর মা পিসি ছিল না ওটা।’
‘আমি দেখেছি। কথা বলেছি।’

‘তাতে কি? আমি শিউর ওটা ছিল পেত্নি। বরই গাছে পেত্নি থাকে। গাছ থেকে নেমেছিল হয়তো, তোকে দেখে বিন্দুর মা পিসি হয়ে গেছে।’
তাই নাকি? দিনের বেলা ভয় অত থাকে না। তাও অনুর সারা শরীর ভয়ে আবার কাঁটা দিয়ে উঠল। সত্যি বিন্দুর মা পিসি ছিল না ওটা? পিংকু যা বলল সেসব কিছু ছিল?
‘তুই কখনও পেত্নি দেখেছিস?’
‘কত! তারা মানুষের রূপ ধরে থাকে।’
বলে অত্যন্ত অবহেলার সঙ্গে পিংকু একটা ঢিল ছুড়ল পুকুরে। ঢেউ উঠল শান্ত পুকুরের জলে। ছোটো ছোটো ঢেউ। ঝিকমিক ঝিকমিক করে উঠল রোদে। পিংকু বলল, ‘অনু!’
ফিসফিস করে বলল।
কী হয়েছে?
অনু তাকাল।
‘মাছরাঙা দেখ!’
অনুও ফিসফিস করে বলল, ‘কোথায়?’
‘আরে গাধা! এদিকে না! টুকুদিদের ঝিঙের মাচানে।’
অনু দেখল। টেডিপিসিদের ঝিঙের মাচানের একটা কঞ্চিতে বসে আছে পাখিটা। মাছরাঙা। অনেক রঙের পাখি। উড়াল দিল দেখতে না দেখতে। উড়াল তো না, ছোঁ দিল পুকুরে। উড়াল দিল ঠিক একটা মাছ নিয়ে।
পিংকু বলল, ‘কী মাছ নিল বল তো?’
‘পুঁটি?’
‘খলসে। বাজি ধর।’
‘বাজি?’
‘হ্যাঁ। খলসে হলে তুই আমাকে পাঁচ পয়সা দিবি, পুঁটি হলে আমি আমি তোকে পাঁচ পয়সা দেব।’
‘এ মা! কেন?’
‘বাজি ধরলি না?’
‘বাজি ধরলাম? কখন? পাঁচ পয়সা আমি কোথায় পাব বল?’
‘আচ্ছা তাহলে দুই পয়সা।’
‘দুই পয়সা আমি কোথায় পাব, বল।’
‘কেন দীপেন মামার এত টাকা। বললে তোকে মাত্র দুই পয়সা দেবে না?’
‘কী বলব বাবাকে? বাজি ধরেছি?’
‘আরে না, বোকা! বলবি হাওয়াই মিঠাই খাবি।’
‘মা বকবে।’
‘কী আশ্চর্য! মামিকে বলবি কেন? বলবি তো দীপেন মামাকে। তোর বাবাকে।’
‘আমি মাকে সব বলি।’
‘ন্যাকুপুষু!’
ন্যাকুপুষু কী আবার?
এই সময় বিকট একটা শব্দ।
পিংকু বলল, ‘বোমা!’
পরমুর্হূতে গোঁ গোঁ করে একটা হলুদ রঙের এরোপ্লেন উড়ে চলে গেল তাদের মাথার উপর দিয়ে। পিংকু ত্রস্ত হয়ে উঠল, ‘ঘরে চল অনু! বোমা ফেলবে! বোমা ফেলবে!’
বোমা ফেললে, সেটা একটা আতঙ্কের ব্যাপার, অনু তার মতো করে বুঝল। একসঙ্গে দৌড় দিল তারা। পিংকু তাদের ঘরে ঢুকে গেল, অনু তাদের ঘরে। আবার এরোপ্লেনের গোঁ গোঁ শব্দটা উড়ে গেল আসমান জমিন কাঁপিয়ে। অনু জাপটে ধরল তার মাকে।
মা বললেন, ‘কিছু না, বাবা। কিছু না। কিছু না।’
অনু বলল, ‘বোমা ফেলবে মা!’
‘না রে বাবা। এরোপ্লেন চলে গেছে তো।’
বাজারের দিক থেকে এই সময় একটা হল্লার আওয়াজ উচ্চকিত হয়ে উঠল। মানুষের হল্লা। মনে হলো হল্লা এদিকে আসছে। আসছে। অনু জানালা দিয়ে দেখল। দিশেহারা মতো ছুটে আসছে মানুষজন।
ছোটোকাকু, ফুলকাকু, ছোড়দাকে দেখল অনু। লম্বাবাসার বিজিতদাকে দেখল। বাবাকে দেখল। বাবা বাগানের গেট দিয়ে ঢুকলেন। অনু এই বাবাকে কখনও দেখেনি। দিশেহারা, হতবিহ্বল বাবা। ইলেকট্রিসিটি আছে কিন্তু ঘরে ফ্যান নাই অনুদের। মা বললেন, ‘তুমি বসো।’
বাবা বসলেন।
অনু কী বলবে বুঝতে পারল না। বাবার হাত ধরে থাকল।
মা এক গ্লাস জল নিয়ে এলেন। বাবা ঢকঢক করে জলটুকু খেলেন। মা বেড়া থেকে একটা হাতপাখা নিয়েছেন। বাবাকে বাতাস করতে করতে বললেন, ‘কী হয়েছে?’
বাবা কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছেন। বললেন, ‘বোমা ফেলেছে। পিটিআই ইসকুলের মাঠে।’
‘কারা গো? কেন?’
‘তুমি, যুঁথি! কেন কী? কেন কী? দেশে কী ঘটছে তুমি জানো না!’
‘যুদ্ধ?’
‘তবে? শোন, শহরে আর থাকা যাবে না মনে হয়।’
‘কোথায় যাব?’
‘এখনও জানি না।’

৬.
সন্ধ্যার আগে আগে বিরাট খবর দিল শংকরকাকা। আপাতত শহর ছেড়ে যেতে হবে না। জাউয়া বাজারে হানাদার বাহিনীর দুটো গাড়ি বিকল হয়ে গেছে। হানাদার বাহিনীর অফিসাররা পাগলা বাজার ডাকবাংলোয় থাকবে আজ রাতে। কাল দুপুরে রওয়ানা দেবে এদিকে।
শংকরকাকা আর বাবার কথা শুনল অনু। কিছু বুঝল কিছু বুঝল না।
বাবা বললেন, ‘তোকে এই সাংঘাতিক খবর কে দিল, শংকর?’
শংকরকাকা বলল, ‘আরে দীপেনদা, তোমরা তো মনে করো, হু আর শংকর! শংকর কে?’
বাবা বলল, ‘আর না ওটা, ইজ হবে। হু ইজ শংকর।’
‘তুমি বড়ো কথায় ধরো।’
‘তোর কথায় ধরি! কী বলিস। তুই তো চাঁদের পাহাড়ের শংকর।’
চাঁদের পাহাড়ের শংকর! চাঁদের পাহাড় কোথায়? চাঁদে? অনু ভাবল।
শংকরকাকা বলল, ‘সে তোমার যা মনে হয় বল। বৌদি-ই-ই-ই!’
মা দরজা থেকে বলল, ‘হ্যাঁ।’
শংকরকাকা বলল, ‘চা…আরে! তুমি চা নিয়ে এসেছ! সঙ্গে আবার পাঁপড় ভাজাও! নাহ্! তুমি একটা সাক্ষাৎ লেডি হেলম্যাট বৌদি।’
বাবা বললেন, ‘হেলম্যাট না, শংকর, লেডি হ্যামলেট। লেডি হ্যামলেট হ্যালমেট পরত বা পাঁপড় ভাজত বলে কখনও শুনিনি।’
‘বললাম না তোমার স্বভাব ভালো না! কথার কথায় ধর। আরে, কথাটা আমি বলেছি বৌদিকে, তোমাকে না। যা বলেছি বৌদি বুঝেছে। বোঝোনি, বৌদি?’
মা বুঝেছেন। অনু বিন্দু বিসর্গ বোঝেনি। হ্যালমেট, হ্যামলেট কী এসব? লেডি হ্যালমেট, না, হ্যামলেট! কঠিন কঠিন কথা। টেডিপিসি থাকলে ভালো হতো। পরে সব বুঝিয়ে বলতে পারত অনুকে। এই রে, সন্ধ্যা হয়ে গেছে তো! ভাই এখন হরলিকস খাবেন। অনু বলল, ‘মা।’
‘কী?’
‘আমি টেডিপিসিদের ঘরে যাই?’
‘তা তো যাবেই। হরলিকসের ঘণ্টা পড়ে গেছে না?’
মা হাসলেন।
অনু ছুটল।
টেডিপিসিদের থাকার ঘর আর গোয়াল ঘরের মাঝখানে উঠান। গোয়ালঘরের ধারে পেয়ারা গাছ। অনু উঠান থেকে দেখল এবং শুনল, গোয়ালঘরে কুপি জ্বলছে এবং ভাই কথা বলছেন বুধি টেপির সঙ্গে। অনু গোয়ালঘরের দরজায় দাঁড়াল। টেপির গলায় আদর করে দিচ্ছেন ভাই।
‘তোমাদের বড়ো কষ্ট গো মা। মশা কামড়ায়। কটা টাকা পাই হাতে, মশারি বানিয়ে দেব দুজনকে। মশা আর তোমাদের কামড়াতে পারবে না গো বেটিরা!’
টেডিপিসি ঘর থেকে ডাক দিল, ‘বাবা, আসো। হরলিকস ঠা-া হয়ে যাবে কিন্তু। অনু আয়।’
হরলিকস খেতে খেতে অনু বলল, ‘ভাই, বুধিরা মশারির নিচে ঘুমাবে?’
ভাই বললেন, ‘হ্যাঁ, ভাই। অবলা প্রাণী।’
‘অবলা পানি কী, ভাই?’
‘পানি না ভাই, প্রাণী। অবলা, কথা বলতে পারে না তো।’
‘অ। তুমি তো কথা বল। বেটি বল বুধি টেপিকে।’
টেডিপিসি বলল, ‘বেটি বলবে না? বুধি আর টেপি তো আমাদের বোন হয়। তোর বুধি পিসি, টেপি পিসি হয়। হি! হি! হি!’
ভাই বললেন, ‘সন্ধ্যার সময় এত হেসো না। দিনকাল ভালো না। দিনকাল ভালো না! হে ভগবান, তুমি দেখ।’
টেডিপিসি অনুকে বলল, ‘ভগবান সব দেখেন। ভগবানে চোখ তিনটা জানিস? কপালে একটা।’
অনু বলল, ‘তুই দেখেছিস?’
‘ছবি দেখেছি, বইতে আছে। তোকে দেখাব।’
হরলিকস শেষ। ভাই এখন বিশ্রাম নেবেন কিছুক্ষণ।
অনু বলল, ‘টেডিপিসি?’
‘হুঁ।’
‘ক্যামলেট কিরে?’
‘ক্যামলেট! ক্যামলেট আবার কী? তোকে কে বলল?’
‘আমাকে না। শংকরকাকা মাকে বলেছে!’
‘শংকরদা বলেছে। আরে শংকরদা তো নাটঢিলা একটা! কী বলে না বলে ঠিক নাই।’
‘নাটঢিলা! নাটঢিলা কী?’
‘নাটঢিলা হলো শংকরদা।’
অনুর মনে পড়ল এবং বলল, ‘হু আর শংকর?’
‘কী? কী-কী-কী? হু আর শংকর? হি! হি! হি!’
‘এত হাসে না। দিনকাল খারাপ। ভগবান! হে ভগবান!’
ভাই বললেন।
রান্নাঘর থেকে ঠাম্মা বললেন, ‘হাসে কেন? এই ভরসন্ধ্যায় হাসে কেন? এই চুপ! চুপ বললাম! চুপ!’
চুপ কেন? ভরসন্ধ্যায় হাসলে কী হয়?
‘আমি অনুকে ঘরে দিয়ে আসি মা।’ টেডিপিসি বলল।
ঠাম্মা বললেন, ‘যাও। বৌদির সঙ্গে গল্প করতে বসে আবার রাত বারটা বাজিয়ে এসো না। দিনকাল খারাপ।’
‘খারাপ দিনকালে ভালো থাকতে হয় মা। যাই। অনু, চল।’

৭.
তাদের বাসায়ও কেউ হাসছে।
হা! হা! হা!
হা! হা! হা!
ঘরে ঢুকে যে মানুষটাকে দেখল, তাকে দেখবে চিন্তাও করেনি অনু।
মানুষটা হলেন এনায়েত ভাই। এনায়েত সৈয়দ। অনু আর টেডিপিসিকে দেখে বললেন, ‘পরমাণুটা সবসময় টুকুর ল্যাজে ল্যাজে ঘুরে নাকি রে?’
টেডিপিসি খেপল, ‘আমার ল্যাজে ল্যাজে কেন ঘুরবে? এ আবার কী রকমের কথা! এত বছর বিদেশে থেকেও তুমি একফোঁটাও বদলাওনি তো!’
‘বদলাতে কি আর গেছি রে, পাগলি। হা! হা! হা!’
‘দুপুদা, আমি যাই।’
‘রেআ কুটুু, ইতু নোখএ ইটোছো সছিআ। হা! হা! হা!’
টেডিপিসি ভেঙাল, ‘হা! হা! হা! হাসবে না তুমি! আবার ইতালির ভাষায় কথা বলো কেন? আমরা কি ইতালির ভাষা বুঝি?’
‘ইতালির ভাষা! হা! হা! হা!’
বাবাও হাসলেন। অল্প হেসে বললেন, ‘ইতালিয়ান না, কার্তিক। এনায়েত বাংলাভাষাই বলেছে।’
টেডিপিসি বলল, ‘বাংলাভাষা! এ আবার কোন জাতের বাংলাভাষা শুনি?’
‘উল্টো করে দেখ।’
‘কী উল্টো করে দেখব? ছাই কথা তো আমার মনেই নাই।’
বাবা বললেন, ‘এনায়েত আবার বল তো।’
এনায়েত সৈয়দ আবার বললেন, ‘রেআ কুটু, ইতু নোখএ ইটোছো সছিআ।’
বাবা বললেন, ‘আরে টুকু, তুই এখনও ছোটোই আছিস।’
টেডিপিসি বলল, ‘তা তো আছিই। আমি তো ছোটোই থাকব। চিরকাল ছোটোই থাকব।’
রান্নাঘর থেকে মা ডাক দিলেন, ‘কার্তিক, এদিকে আয়।’
‘যাই, বৌদি।’
টেডিপিসি রান্নাঘরে গেল। এনায়েত সৈয়দ মানুষটা আবার হা হা করে হাসলেন। হেসে নিয়ে বললেন, ‘পরমাণু সাহেব, দেশের কী অবস্থা? খবর রাখেন কিছু?’
অনু বলল, ‘নাহ।’
‘সে কী কথা! রেডিও শোনেন না?’
‘বাবা শোনে।’
‘এখন থেকে আপনিও শুনবেন। রেডিওতে কী বলে, বলি। বলে, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।’
‘মুক্তিযুদ্ধ!’
‘হ্যাঁ, মুক্তিযুদ্ধ। হা! হা! হা! আপনি কি যুদ্ধে যাবেন?’
কেন? অনু কেন মুক্তিযুদ্ধে যাবে? ছোটো মানুষরা কি যুদ্ধ করতে পারে?
এনায়েত সৈয়দ বললেন, ‘আমি যাব। হানাদারদের মেরে তাড়িয়ে দেশ স্বাধীন করে তবে ফিরব।’
অনু তেমন কিছুই বুঝল না। দেশ, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, হানাদার। দেশ কী? স্বাধীনতা কী?
মা একটা রিকাবিতে করে দুই কাপ চা নিয়ে ঢুকলেন।
এনায়েত সৈয়দ বললেন, ‘আবার চা। ঠিক আছে, তুই এখন বস তো।’
অনু তাকাল। মাকে তুই করে বলছেন নাকি এনায়েত সৈয়দ?
মা একটা মোড়ায় বসলেন। টেডিপিসিও এই সময় ঘরে ঢুকল একটা কাঁসার থালায় অনেক পাঁপড়ভাজা নিয়ে। পাঁপড়ভাজা টেবিলে রেখে বাবার পাশের চেয়ারটায় বসল।
পাঁপড়ভাজা নিয়েছেন এবং চায়ে একটা করে চুমুক দিয়েছেন তারা, বাবা এবং এনায়েত সৈয়দ, মা বললেন, ‘চা কিন্তু কার্তিক বানিয়েছে।’
এনায়েত সৈয়দ বললেন, ‘ফার্স্ট ক্লাস। তোর বানানো চা খেলে তো লিওনিদ ব্রেজনেভ তোকে বিয়ে করে ফেলত রে, টুকু।’
টেডিপিসি আবার খেপল, ‘সবসময় তুমি এরকম কর!’
‘আচ্ছা যা, আর কখনও এরকম করব না। লিওনিদ ব্রেজনেভ কিন্তু লোক খারাপ না মোটে এ। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট। পরে একবার চিন্তা করে দেখিস। যুঁথি, তুই বল এখন। তুই যুঁথি, আমাদের যুঁথি, তুই মা হয়ে বসে আছিস! কী আশ্চর্য!’
মা বললেন, ‘আশ্চর্য হওয়ার কী হলো, এ মা! মা হয়েছি, ছেলে বড়ো হয়ে গেছে, কদিন পর ছেলের বিয়েও দিয়ে দেব।’
‘আ-হা-হা! নিজেই এখনও বড়ো হলো না! আমার তো ধারণা তুই এখনও বরই গাছে উঠে বরই পেড়ে খাস।’
‘কী যে বলো না বলো তুমি!’
টেডিপিসি বলল, ‘বৌদি তো ছেলের বিয়ের কথা বলল। আমি একটা কথা বলতে পারি। একজনকে কিন্তু অনুর খুবই পছন্দ।’
বাবা হেসে বললেন, ‘তাই নাকি? কে?’
‘কেন? নীলকৃষ্ণ ডাক্তারের মেয়ে ঝিলি। তাই নারে অনু! ঝিলিকে তোর পছন্দ না?’ টেডিপিসি বলল।
অনু আর কী বলবে? হতবাক হয়ে গেছে সে টেডিপিসির বিশ্বাসঘাতকতায়।
ঝিলির বড়দি সুতপাপিসি, টেডিপিসির সঙ্গে পড়ে। টেডিপিসির সঙ্গেই একদিন ঝিলিদের বাসায় গিয়েছিল অনু। হাছননগরে। ঝিলির সঙ্গে ভাব হয়েছিল অনেক। টেডিপিসি যদি কিছু না বলত, অনু কি কিছু বলত? ঝিলিদের বাসা থেকে ফেরার সময় সেদিন টেডিপিসি নিজেই কিনা বলল, ‘তুই ঝিলিকে বিয়ে করবি অনু?’
অনু কী বলেছিল?
‘করব।’
এখন সেই কথা এভাবে সকলের সামনে বলে দেবে নাকি টেডিপিসি? খুবই খুবই রাগ হলো অনুর। মনে মনে সে বলল, আমি আর তোর সঙ্গে কথা বলব না। অনেকদিন কথা বলব না।
ঘরে এর মধ্যে হাসির হুল্লোড় পড়ে গেছে।
হা! হা! হা!
হো! হো! হো!
হি! হি! হি!
এনায়েত সৈয়দ হাসছেন। বাবা হাসছেন। মা হাসছেন। টেডিপিসিও।
রাগে অনু চেঁচিয়ে উঠল, ‘গাধি!’
ও মা! আরও হা হা! আরও হো হো! আরও হি হি!
রাতে অনুদের ঘরে ভাত খেয়ে গেলেন এনায়েত সৈয়দ। খেতে বসে আবার বাবার সঙ্গে কিছু কঠিন কঠিন কথা বললেন। আরও কিছু নতুন শব্দ শুনল অনু। আরও কিছু নতুন নাম শুনল। পাকহানাদার, নির্যাতন, বর্বর, মুক্তির সংগ্রাম। ভুট্টো, আইয়ুব খান, টিক্কা খান এবং শেখ মুজিবুর রহমান। এরা কারা?

৮.
এখন দুপুর। আকাশ খুব নীল। ঝকঝকে রোদ। খুচরো-খাচরা কিছু সাদা মেঘ উড়ছে। কিছু পাখি উড়ছে।
মাটিতে?
মানুষ।
কত মানুষ?
অনু কিছু গুনতে শিখেনি এখনও। বলে দিলে এক থেকে দশ পর্যন্ত পারে অবশ্য। কত দশজন মানুষ এই দুপুরে, এই মাঠে হাঁটছে? সবচেয়ে দূরের মানুষগুলোকে সাদা, কালো, নীল, লাল, সবুজ, হলুদ বিন্দুর মতো দেখাচ্ছে। এত বড়ো মাঠ। মাঠ তো না, আসলে কাটা ধানক্ষেত। অনু কি আর আগে ধানক্ষেত দেখেছে, তাই ফারাক করতে পারেনি। তাদের শহরে মস্ত মাঠ দেখেছে একটা। স্টেডিয়াম বলে। ফুটবল খেলা হয়। মনে করেছিল সেই মাঠের থেকেও অনেক বড়ো একটা মাঠ এটা বুঝি। এই মাঠে কি ফুটবল খেলা হয়, এই চিন্তাও একবার করেছে।
তারা হাঁটছে আরও মানুষের সঙ্গে। বাবা, মা এবং অনু।
এত মানুষ! কোথায় যায় তারা?
যায় না, পালায়।
সব মানুষ শহরের মানুষ। তারা তাদের শহর ছেড়ে পালাচ্ছে। আবার জঙ্গি বিমানের গোঁ গোঁ শব্দ শুনে আজ সকালে শহরের অনেক মানুষ ঘুম থেকে উঠেছে। উঠেই বোমার বিকট শব্দ শুনেছে। তিনটা বোমা। একটা বোমা কলোনির মাঠে পড়েছে। একটা বোমা হাওরের শুকনায়, আর একটা পশ্চিম বাজারের মানিক লাল বণিকের ইটভাটায়। ইটভাটা সম্পূর্ণ ভাটা হয়ে গেছে। হাওরের শুকনায় কিছু ছাগল চরছিল, তারা মরেছে। ইটভাটায় কেউ বলছে তেরজন মরেছে, কেউ বলছে একুশ জন মরেছে। আবার সকাল হতে না হতেই আরও একটা খবর ছড়িয়ে পড়েছে শহরে। হানাদার বাহিনী পাগলা বাজার থেকে মার্চ করতে শুরু করে দিয়েছে। দুপুর নাগাদ পৌঁছে যাবে শহরে। যাকে পাবে তাকে ধরবে, মারবে। হানাদার বাহিনী, তারা কী রকম? ব্রহ্মদৈত্যের মতো?
আরে! পালাচ্ছে দেখি গৌরা সাধুও।
তার এই তিন বছর সাত মাসের জীবনে, যে কজন বিস্ময়কর মানুষ দেখেছে অনু, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বিস্ময়কর এবং ক্ষমতাবান ব্যক্তি হলো গৌরা সাধু। জটাজুটধারী, গেরুয়া পরে। তার গেরুয়া ঝোলাও বিস্ময়কর। কত কী যে থাকে ঝোলার ভেতরে। শঙ্খ আছে একটা। দূরের কোনো সমুদ্রের শঙ্খ। সেই শঙ্খের ভেতর আস্ত একটা সমুদ্রকে আটকে রেখেছে গৌরা সাধু। এত ক্ষমতা! অনুকে সে নিজে বলেছে। শঙ্খ কানে ধরে আটকা পড়া সেই সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জনও শুনিয়েছে অনুকে। তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলেছে, ‘মানুষ বলে গর্জন, দাদাঠাকুর। ঢেউয়ের গর্জন। আমি বলি গর্জন না রে, কান্না, কান্না। ফুঁপিয়ে কাঁদে আটকা সমুদ্রের ঢেউ।’
কী অদ্ভুত কথা।
বাবাকে ‘ঠাকুর’ ডাকে আর অনুকে ‘দাদাঠাকুর’ ডাকে গৌরা সাধু।
‘ও গৌরা দাদা।’
অনু ডাক দিল।
গৌরা সাধু হনহন করে যাচ্ছিল, অনুকে দেখে গতি কমাল। হাসিমুখে বলল, ‘দাদাঠাকুর, দেখি। নমস্কার ঠাকুর। জয় মা তারা!’
‘নমস্কার গৌরা।’ বাবা বললেন।
‘নমস্কার, ঠাকরোন।’
ক্লান্ত মা অল্প হাসলেন।
অনু বলল, ‘তুমি পালাও!’
‘আহারে আমার দাদাঠাকুর রে! হাঁটতে বেজায় কষ্ট হচ্ছে, না গো? ওঠো দেখি, আমার কাঁধে ওঠো!’
‘এই! না! না!’
‘ওরে আমার দাদাঠাকুর! যোগাসাধনা করে গৌরা সাধু। দুই-চারটা হাতি ঝোলায় নিয়ে ঘুরে। তুমি তো শিমুল তুলা মাত্র গো। ওঠো!’
এবার বাধা দিলেন বাবাও, ‘না না গৌরা!’
‘বললাম ঠাকুর, যোগাভ্যাসে অভ্যস্ত দেহ। ছেলেপানের কষ্ট আমার সয়না গো, বাবা। জয় মা তারা! দাদাঠাকুর, ওঠো।’
বলে গৌরা সাধু একটানে তার কাঁধে উঠিয়ে নিল অনুকে। নিরুপায় অনু কী করে আর? জটালাগা লম্বা চুল গোঁফদাড়ির দুই পাশে দুই পা ঝুলিয়ে গৌরা সাধুর মাথার জটাজুট ধরে জুৎ মতো হয়ে বসল। লহমায় দৃশ্য অন্যরকম। মানুষ আর মানুষ আর মানুষ, সে তো আছেই, আরও অনেক কিছু দেখতে পেল অনু। দূরের বটগাছ, মানুষের ঘরদোর। অন্যরকম মনে হলো উঁচু থেকে মায়ের মুখ, ঠাম্মার মুখ দেখেও।
‘গৌরাদাদা!’
‘বলো, দাদাঠাকুর।’
‘তুমি পালাও?’
‘পালাই? না গো দাদাঠাকুর। পালাব কেন? কোন দুঃখে পালাব? কার ভয়ে পালব? আমি হলাম গৌরা সাধু। নন্দি ভৃঙ্গির সঙ্গে এক পাতে খাই। আমি পালাব কেন? কোথায় পালাব? আরে, মনস্থির করেছি বুঝেছ, বারো বছর পর্বতের গুহায় বসে সাধনা করব। কঠিন সাধনা। লোকালয়ে হওয়ার নয় সে। শ্মশানেও না। সেজন্য না পর্বতে চলেছি! বুঝেছ, দাদাঠাকুর? জয় মা তারা!’
বাবা বললেন, ‘কোন পাহাড়ে সাধনা করতে যাচ্ছ, গৌরা?’
গৌরা সাধু বলল, ‘আর কোন পর্বতে ঠাকুর! সাধনার উপযোগী পর্বত তো পৃথিবীতে একটাই গো। হিমালয় পর্বত।’
‘তুমি হিমালয় পর্বতে যাবে?’
‘মনে সেই উদ্দেশ্যই পোষণ করি, ঠাকুর।’
‘সে তো এদিক থেকে অনেক দূর হয়ে যাবে, গৌরা। এটা তো মাত্র জয়ন্তিয়া পাহাড়।’
‘ও আমি পার হয়ে চলে যাব, ঠাকুর। যোগাভ্যাসে অভ্যস্ত দেহ। জয় মা তারা! মা! মাগো!’
‘হিমালয়ে কিন্তু বরফ পড়ে, গৌরা। তোমার এই পোশাকে ঠা-া মানবে না।’
‘ঠা-া বশীকরণ মন্ত্র জানি, ঠাকুর। কেন? আমাদের এই এলাকায় কি কম ঠা-া পড়ে? শ্মশানের বটগাছে ঠা-ায় রাতভর ওঁয়া ওঁয়া করে শকুনির ছানারা। ভূতপ্রেতের দল লটকি দিয়ে থাকেন। এই ঠা-ায় আমি থাকি কী করে? সব মন্ত্রের সাধন, ঠাকুর।’
‘আমাদের এলাকায় বরফ পড়ে না। এই ঠা-া আর ওই ঠা-া এক না, গৌরা।’
‘আমার আপনার কাছে এক না ঠাকুর। মন্ত্রের শক্তির কাছে সব এক।’
‘যাও তবে।’
‘অনুমতি দিলেন তো, ঠাকুর। জয় মা, তারা। মা! মাগো! তোর পাগল ছেলে আসছে রে, বেটি।’

৯.
চোখের সামনে এখন সবকিছু স্পষ্ট। মানুষের ঘরদোর। বিরাট বটগাছ। সব পার হয়ে চলে যাচ্ছে মানুষ। শুধু মানুষ। কে কোথায় যাচ্ছে? বটগাছের নিচে দাঁড়িয়ে কয়েকজন মানুষ কথা বলছিলেন। একজনকে চিনতে পারল অনু। মুহুরী সিরাজ মিয়া কাকা। টেডিপিসিদের গোয়ালঘরের উল্টোদিকে ভানুদা, ছন্দাদি, নন্দাদের বাসা। পরের বাসাটা মৃদুল, রিভামাসিদের। পরে নদীর পাড়ে কয়েকটা ছোটো ছোটো ঘর। একটা ঘরে থাকে নারায়ণদাদারা। একটা ঘরে অখিলদা, আরতিদিরা। আর একটা ঘরে এই সিরাজ মিয়া কাকা থাকেন। তার সঙ্গে থাকে ফজরালি ভাই। সম্পর্কে কাকার নাতি। দেখাশোনা করে কাকার। রেঁধে বেড়ে খাওয়ায়।
সিরাজ মিয়া কাকাও দেখেছেন তাদেরকে। এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলেন বাবাকে। মাকে আদাব দিলেন। গৌরা সাধুকে বললেন, ‘অনু মিয়াকে কাঁধ থেকে নামাও, গৌরা।’
‘জয় মা তারা!’
গৌরা সাধু নামিয়ে দিল অনুকে।
‘সিরাজ দাদা, আমি যাই গো।’ গৌরা সাধু বলল।
সিরাজ মিয়া কাকা বললেন, ‘সন্ধ্যা লেগে গেল, এই সময় তুমি কোথায় যাবে গৌরা? গরিবের বাড়িতে থাকো একরাত। একবেলা দুটো ভাত খেয়ে যাও। ভয় নাই, তোমাদের জাতের মানুষজনই রান্নাবান্না সমস্ত করছেন।’
গৌরা সাধুর চোখ জলে ভরে উঠল। অনু দেখল।
গৌরা সাধু কিছু আড়ালও করল না। চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে তার, হাতজোড় করে ভাঙা গলায় সে বলল, ‘আমি গৌরা সাধু, সিরাজ দাদা। আমার জাতপাত কিছু নাই গো। সব পাতেই আমার পাত পড়ে। জয় মা তারা!’
সিরাজ মিয়া কাকা বললেন, ‘চলো তাহলে। অনু মিয়া, কী? খুব কষ্ট হয়েছে? এই, মিয়াকে কোলে নে কেউ।’
অনু বলল, ‘না, না! গৌরাদাদা নাও।’
সিরাজ মিয়া, তার সঙ্গের মানুষজন, বাবা-মা, গৌরা ফকির, মোটকথা অনু ছাড়া আর সকলে হাসল। চোখে জল নিয়ে হাসিমুখ গৌরা সাধু আবার কাঁধে উঠিয়ে নিল অনুকে।
সেই সকাল থেকে হেঁটে এতদূর, অনুর কি কষ্ট হয়নি একটুও? অল্প হয়েছে। যতক্ষণ হেঁটেছে। তারপর থেকে তো সে গৌরাসাধুর কাঁধে। সবচেয়ে কষ্ট মনে হয় হয়েছে বাবার। এক হাতে ট্রাংক, এক হাতে রেডিও, পিঠে লেইসফিতাঅলাদের মতো গাঁটরি। কম কষ্ট মায়েরও হয়নি। ফর্সা মায়ের চোখমুখ তেতে আছে এখনও। বাবার ট্রাংক এবং গাঁটরি এখন সিরাজ মিয়া কাকার দুজন মানুষের হাতে।
হাঁটা দিল তারা।
বামদিকে নেমে কিছুদূর হেঁটে বিরাট একটা পুকুর পড়ল। পুকুরের পাড় দিয়ে রাস্তা। এই সন্ধ্যাকালে পুকুরে ঝাঁপাঝাঁপি করে সাঁতার কাটছে কিছু ছেলেপান। দুই তিনটা অনুর বয়সি। তাদের একটা শুশুকের মতো ডোবাচ্ছে। নদীতে শুশুক এরকম ডুব দেয়। অনু দেখেছে। এখন খুবই বিস্মিত হলো সে, তার বয়সি একটা ছেলেকে সেই শুশুকের মতো ডুব দিতে দেখে। সে নিজে তো সাঁতারই জানে না। সামনের বছর শিখিয়ে দেবে, ফুলকাকু বলেছে। আচ্ছা, টেডিপিসিরা কোথায়? পিংকুরা? ছন্দাদি, নন্দারা?
সিরাজ মিয়া কাকার ঘরদোর দেখেও কম বিস্মিত হলো না অনু। টিনের চালের তিনটা বড়ো বড়ো ঘর। বিরাট গোয়ালঘর। বিরাট উঠান। অনেক মানুষ।
‘অনু!’
আরে সেজদি!
মেজদি, ছোড়দি, দুলি, পিংকুও আছে। পিসিও ঘর থেকে বের হয়ে এলেন। দাদাবাবু, ছোড়দা? পিংকু ফিসফিস করে বলল, ‘বিড়িতে টান দিতে গেছে তারা।’
পাখি পিসিমা, টেডিপিসিরা?
পিংকু বলল, ‘চিন্তা করিস না। যোগীর গাওয়ের আবু তালেব মাস্টারের বাড়িতে তারা উঠেছে।’
দুনিয়ার সব খবর রাখে পিংকু। ছাওমোড়ল।
শহরের আরও কিছু পরিবার সিরাজ মিয়া কাকার ঘরদোরে উঠেছে। কতদিন তারা থাকবে?

১০.
সন্ধ্যার পর বেজায় ঘুম ধরল অনুর। ঘুমিয়ে পড়ল সে। শীত শীত করছে। কতক্ষণ পর মা তার মাথায় হাত রাখলেন এবং আর্তনাদ করে উঠলেন, ‘আমার ছেলের তো জ্বর! হায় ভগবান!’
বাবাও অনুর কপালে হাত দিয়ে দেখলেন। বললেন, ‘ওষুধের বাক্সে থার্মোমিটার আছে না?’
‘ওষুধের বাক্স! আনিনি তো।’
‘ঠিক আছে, আমি দেখছি।’
‘কী দেখবে! আমার ছেলের শরীর তো জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। ভগবান! হায় ভগবান!’
‘যুঁথি! কান্নাকাটি করো না, আমি দেখছি।’
অনুর মাথায় জল ঢালা হলো অনেক। কিন্তু জ্বর সারল না তার। একদিন, দুদিন, তিনদিন, চারদিন। নাকি ছয় দিন? নাকি আট দিন? কতদিন পর সারল? সে বলতে পারবে না অনু।
সকাল হয়ে গেছে। পাখিরা ডাকছে। কিচিরমিচির করছে ঘরের চড়–ইরা। অনু টেডিপিসিকে দেখল। টেডিপিসি বুধির পিঠে বসে আছে। একী কাণ্ড! অনু বলল, ‘টেডিপিসি!’
টেডিপিসি বলল, ‘টেডিপিসি? আমি তোর কোন কালের টেডিপিসি হই রে? টেডিপিসি! আমি না তোর রাংতাপিসি হই।’
অনু বলল, ‘ইস্! না। টেডিপিসি তুই!’
‘দাদাঠাকুর! অ, দাদাঠাকুর!’
গৌরা সাধু ডাকল। অনু তাকাল। জানালা দিয়ে আকাশের যতটুকু দেখল, ততটুকু বিবর্ণ, খোসা ছাড়ানো বেতফলের রঙের। ভোররাত এখন? টেডিপিসি…ঘুমের মধ্যে ছিল। স্বপ্ন। অনু মৃদু গলায় ডাক দিল, ‘মা।’
গৌরা সাধু বলল, ‘দাদাঠাকুর।’
স্বপ্ন না, এটা সত্যি।
গৌরা সাধু দ হয়ে বসে আছে ঘরে।
অনু বলল, ‘গৌরা দাদা! মা কোথায়?’
‘মা তো রান্নাঘরে, দাদাঠাকুর। ঠাকুর শিংমাছ ধরে এনেছেন। তোমার জন্য ঝোল রান্না করছেন মা।’
‘মায়ের কাছে যাব। আমি কোথায়?’
‘সিরাজ দাদার ঘরে গো, দাদাঠাকুর।’
‘সিরাজ দাদা!’
‘আমার সিরাজ দাদা, তোমার কাকা। নদীর পাড়ের সিরাজ মিয়া মুহুরি গো। আমরা এখন তার বাড়িতে আছি না? শহরে যে যুদ্ধ লেগেছে। তোমার কিছু মনে নাই, দাদাঠাকুর?’
মনে আছে। আস্তে আস্তে সব মনে পড়ল অনুর। ক্ষীণগলায় সে বলল, ‘তুমি কি পাহাড়ে যাওনি?’
গৌরা সাধু বলল, ‘না গো দাদাঠাকুর। এই দেশ ছেড়ে আমি কোথাও যাব না।’

১১.
যমের দুয়ারে পড়ল কাঁটা
বোন দিল ভাইকে ফোঁটা
যমের বোন যমুনা
দেন তার ভাইকে ফোঁটা
আমি দেই আমার ভাইকে ফোঁটা
ফোঁটা যেন নড়ে না
ভাই যেন মরে না
ভাই তুমি শতায়ু হয়ো
বছর বছর ফোঁটা খেয়ো…।
বলে বলে মেজদি, সেজদি, ছোড়দি এবং দুলি ভাইফোঁটা দিল তাদেরকে। দাদাবাবু, ছোড়দা, পিংকু, অনু এবং তোতনকে। পিংকু, দুলিদের মাসতুতো ভাই তোতন। রীনামাসির ছেলে। তোতনের বাবা যুদ্ধে চলে গেছেন। রীনামাসি সারাদিন কাঁদেন। সিরাজ মিয়া কাকার পড়শি আবদুল জলিল বেপারির বাড়িতে উঠেছেন তারা। তোতন মাত্র কথা বলতে শিখেছে। সেজদিকে ডাকে ‘সেস্সি’। দুলিকে ‘উলি।’
শঙ্খ বাজল। গৌরা সাধুর সমুদ্র আটকানো শঙ্খ। নিয়ম করে রোজ সন্ধ্যায় দুই তিন বার ফুঁ দেয় গৌরা সাধু। সন্ধ্যা মিলিয়ে গেছে এর মধ্যে। থেকে থেকে কনকনে ঠা-া একটা হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। শীত এল বলে। ভাইফোঁটা দিয়ে মেজদি প্রণাম করল একমাত্র দাদাবাবুকে। সেজদি, ছোড়দি এবং দুলি প্রণাম করল দাদাবাবু এবং ছোড়দাকে। পিংকু, অনু এবং তোতন প্রণাম করবে বোনদের।
মেজদি, সেজদি, ছোড়দি, দুলি, চারজনকেই প্রণাম করল তোতন এবং অনু। পিংকু মেজদি, সেজদি, ছোড়দিকে প্রণাম করল। দুলি বলল, ‘অ্যাই, আমাকে প্রণাম করলি না ভাই?’
পিংকু ঘাড় ত্যাড়া করে বলল, ‘তোকে প্রণাম করবে তেমন বান্দা এই পিংকু না, বুঝলি?’
‘কেন? প্রণাম করবি না কেন? আমি তোর বড়ো হই না?’
‘নাহ!’
‘কী? আমি তোর বড়ো হই না? তোর আগে জন্মাইনি?’
‘নাহ্। তুই আমার পরে জন্মেছিস। আমি তোর বড়ো। তুই আমাকে দাদা ডাকবি। প্রণাম করবি।’
‘ওরে আমার দাদা মানিকরে! আসো! আসো! তোমাকে প্রণাম করি আসো!’
পিংকু একটা তিড়িং লাফ দিয়ে ঘরের চৌকাঠ পার হয়ে গেল। হাসির রোল উঠল, হা! হা! হি! হি! রীনামাসিকে এই প্রথম হাসতে দেখল অনু। মায়ের মতো রীনামাসিরও গেজদাঁত আছে। হাসলে দেখা যায়।
অনুর যখন জ্বর ছিল তখন এখান থেকে চলে গেছে ছন্দাদি, নন্দারা। পিংকু বলেছে, ইন্ডিয়ায় চলে গেছে। ইন্ডিয়া কোথায়? পাহাড়ের ওপারে। পিংকুরাও নাকি চলে যাবে। দাদাবাবু বালাট গিয়েছিল। সব ঠিকঠাক করে এসেছে। বালাটের রিফিউজি ক্যাম্পে তারা থাকবে।
রিফিউজি ক্যাম্প!
বোঝেনি অনু। তারা কি ইন্ডিয়া যাবে না? বালাটের রিফিউজি ক্যাম্পে থাকবে না? বাবাকে জিগ্যেস করে দেখবে। না হয় মাকে। মনে করে রেখেছিল অনু। পরে আর মনে নাই। পিংকু তাকে কথাটা বলেছে দুই-তিন দিন আগে মনে হয়।
গৌরা সাধু। সে কী করবে? ইন্ডিয়া যাবে না? দেশ ছেড়ে কোথাও যাবে না বলেছে। সত্যি যাবে না? সিরাজ মিয়া কাকা, মিনারা কাকী, জুবের মিয়া কাকা, নাহার কাকী, হারুন, আকবর, পারুল আপা? তারা যাবেন? পারুল আপা যে কী সুন্দর। জুবের মিয়া কাকার একমাত্র মেয়ে। হারুন, আকবর পারুল আপার ছোটো দুই ভাই। আকবর অনুর বয়সি, হারুন তাদের এক বছরের ছোটো। আকবর গুলতি ছুড়ে পাখি মারতে পারে, সুপুরি গাছ বাইতে পারে এবং পুকুরে সাঁতার কাটতে পারে। অনুকে বলেছে গুলতি ছুড়তে শেখাবে। পিংকু অবশ্য বারণ দিয়ে রেখেছে, ‘গুলতি ছোড়া শিখে কী করবি তুই? পাখি মারবি নাকি? পাখি মারলে পাপ হয়, জানিস? যমদূতরা নরকে তোকে আঠার হাজার বছর ধরে আগুনে পোড়াবে।’
শুনে ভয় পেয়েছে অনু। আর কিছু বলেনি। আকবরের সঙ্গে পিংকুর অবশ্য ব্যক্তিগত শত্রুতা আছে। দুইজন দুইজনকে দুই চোখে দেখতে পারে না।

১২.
জ্বর সেরেছে আট-নয়দিন, অনু যথেষ্ট দুর্বল এখনও। থেকে থেকে শুধু ঘুম পায় তার। এই যে এখন রাত আটটাও বাজেনি, বাবা রেডিও শুনছেন, মা উঠানে বউঝিদের সঙ্গে বসেছেন, ঘুমিয়ে মাটির ঢেলা হয়ে আছে অনু। রেডিও শুনতে শুনতে বাবা দেখলেন, আর ভাবলেন, আহারে! আমার ছেলেটা! রোগে ভুগে এক্কেবারে চড়–ইপাখির ছানা হয়ে গেছে। স্বপ্ন দেখছে নাকি চড়–ইপাখির ছানাটা? ঠোঁট যে নড়ছে। স্বপ্নে কার সঙ্গে কথা বলছে সে?
পিংকুর সঙ্গে।
‘পিংকু তুই ছাওমোড়ল?’
‘না, আমি একটা কাঠঠোকরা!’
‘কাঠঠোকরা! কাঠঠোকরা কী?’
‘কাঠঠোকরা পাখি! কাঠ ঠুকরায়। এই দেখ, আমিও ঠুকরাচ্ছি।’
বলে পিংকু মস্ত একটা কাঁঠাল ঠুকরাতে থাকল।
অনু বলল, ‘কাঁঠাল ঠুকরাস?’
‘সব ঠুকরাই। তোকেও ঠুকরাবো।’
‘ইস্!’
এটার পর আরেকটা স্বপ্ন দেখল অনু।
আরেকটা দেখল।
আরেকটা দেখল।
কত যে স্বপ্ন। একটা স্বপ্নে জঙ্গি বিমানও দেখল।
ঘুমের মধ্যেই মা একবার উঠিয়ে খাইয়ে দিলেন অনুকে। শিংমাছের ঝোল। খেয়ে আবার বেভুল ঘুম দিল অনু। আর যখন উঠল গভীর রাত তখন। কুপি জ্বলছে ঘরে। নিভু নিভু সেটা। কেরোসিন ফুরিয়ে যাচ্ছে মনে হয়। দুইদিন আগে আমবাড়ি বাজারে গিয়ে বাবা এক শিশি কেরোসিন কিনে এনেছেন। কুপি যদি এখন দপ করে নিভে যায়, ভয় পাবে অনু? একফোঁটা না। সে এত ভয়কাতুরে নাই আর। নাকি আছে? কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই মনে হলো, আছে। তার মনে হলো দরজার টোকা দিচ্ছে কেউ।
টুক! টুক! টুক!…টুক! টুক! টুক!
মনে হওয়া-হওয়ির বিষয় না কিছু, সত্যি সত্যি কেউ টোকা দিচ্ছে দরজায়।
টুক! টুক! টুক!
টুকু! টুক! টুক!
ভয়ে কাঠ হয়ে গেল অনু। কে?
এই সময় বাবা উঠলেন, অনুকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বললেন, ‘কী হয়েছে, অনু?’
অনু দরজার দিকে দেখাল।
টুক! টুক! টুক!
বাবাও শুনলেন। বললেন, ‘কে?’
‘দরজা খোল।’
চাপা গলায় কেউ বলল।
বাবা আবার বললেন, ‘কে?’
‘আরে আমি!’
‘এনায়েত?’
হ্যাঁ। দরজা তো খুলবি।’
‘দাঁড়া।’
বাবা লাফ দিয়ে খাট থেকে উঠলেন।
মাও উঠে বসেছেন, উৎকণ্ঠিত গলায় বললেন, ‘কে?’
বাবা চাপা গলায় বললেন, ‘এনায়েত! এনায়েত পাগলা!’
মা বললেন, ‘হায় ভগবান!’
খুশি গলায় বললেন।
দরজা খুলতে ঘরে যে মানুষটা ঢুকলেন, এই মানুষটা কি এনায়েত সৈয়দ?
এই লম্বা গোঁফদাড়ি হয়ে গেছে। সবুজ চাদর মাথায় মুড়ি দিয়ে পরেছেন। বললেন, ‘কী রে পরমাণু?’
এনায়েত সৈয়দই।
অনু খাট থেকে নামল। মা এর মধ্যে কেরোসিন ভরা আরেকটা কুপি জ্বালিয়ে দিয়েছেন। হঠাৎ নিভে গেল আগের কুপিটা। তাতে কী? এনায়েত সৈয়দকে দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট। এনায়েত সৈয়দের চোখ দুটো কি আরও সাদা আর বড়ো হয়ে গেছে? অনু বলল, ‘তুমি যুদ্ধে যাওনি?’
এনায়েত সৈয়দ হাসলেন, ‘গেছি তো, কেন?’
‘যুদ্ধ শেষ?’
‘নারে, বাবা।’
‘তবে তুমি ফিরে এলে যে?’
‘ভাইফোঁটা নিতে।’
বলে এনায়েত সৈয়দ আবার হাসলেন।
অনু বলল, ‘সত্যি?’
‘কিরে যুঁথি? সত্যি কি না বল তোর ছেলেকে। তোর তো মনে হয় আজ একবারও আমার কথা মনে পড়েনি।’
মা বললেন, ‘হ্যাঁ, মনে পড়েনি। মনে পড়েনি বলেই তো ঘরের খুঁটিতে তোমার জন্য ফোঁটা দিয়ে রেখেছি বলো।’
‘সত্যি তুই এটা করেছিস?’
‘এই দেখ।’
অনুও দেখল। ঘরের বাঁশের খুঁটিতে একটা চন্দনের ফোঁটা। চন্দন শুকিয়ে সাদা হয়ে আছে। অনু এই ব্যাপারটা জানে। ভাই দূরে থাকলে ঘরের খুঁটিতে ভাইয়ের জন্য ফোঁটা দিয়ে রাখে বোনরা। মা কখন এটা করলেন? এনায়েত সৈয়দ কি মায়ের ভাই হন? না হলে মা ফোঁটা দেবেন কেন?
কুপির আলো এনায়েত সৈয়দের দুই চোখের মণিতে নাচছে। জল আসছে চোখে? এনায়েত সৈয়দের? কেন? কেউ কিছুক্ষণ কোনো কথা বলল না। দুঃখ-কষ্ট, আনন্দ-বেদনা, সব এখন বোঝে অনু। কষ্ট হচ্ছে তার। বুকের ভেতরে। কেন কষ্ট হচ্ছে?
প্রথম কথা বললেন এনায়েত সৈয়দই, ‘এই না হলে আর আমার বোন! কিন্তু এখন তো আমি উপস্থিত নাকি? আমাকে তো ফোঁটা দিতে হবে নাকি? পিঁড়ি দে, বসি।’
মা বললেন, ‘নাকি বলো।’
হেসে ফেললেন এনায়েত সৈয়দ। মাও হাসলেন। বাবাও হাসলেন। অনু বাদ যাবে কোন দুঃখে?
এনায়েত সৈয়দ বললেন, ‘তাড়াতাড়ি কর কিন্তু। চলে যেতে হবে।’
‘চলে যেতে হবে মানে?’
‘ক্যাম্পে ফিরে যেতে হবে না? তিন ঘণ্টা ছুটি দিয়েছেন কমান্ডার। তিন ঘণ্টার মধ্যে রিপোর্ট করতে হবে ক্যাম্পে।’
বাবা বললেন, ‘অ। যুঁথি, তাহলে তাড়াতাড়ি করো।’
মা বললেন, ‘কেন? একটা রাত থেকে গেলে কী হবে বলো?’
এনায়েত সৈয়দ বললেন, ‘মাথা খারাপ তোর! যুদ্ধ করছি না? হয়েছে, ফোঁটা দে, আমি চলে যাই।’
‘দিচ্ছি বাবা। বসো তো একটু।’
বলে মা ফোঁটার জোগাড়যন্তরে লাগলেন।
এনায়েত সৈয়দ বললেন, ‘তারপর পরমাণু, তুই বল।’
অনু বলল, ‘কী বলব?’
‘জয় বাংলা বল।’
‘জয় বাংলা!’
‘এভাবে না। ভালো করে বল। আমার মতো বল, জ-অ-অ-য় বাংলা!’
‘জ-অ-অ-য় বাংলা!’
‘গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বল ব্যাটা!’
অনু চিৎকার করে বলল, ‘জ-অ-অ-য় বাংলা!’
মা বললেন, ‘এই! এই! এই! ঘুম ভেঙে যাবে মানুষের!’
ভেঙে যাবে কী, ভেঙে গেছে। আকবর, হারুনের। দুই ভাইই একসঙ্গে চেঁচাল, ‘জয় বাংলা!’
এনায়েত সৈয়দও আবার বললেন, ‘জয় বাংলা।’
শোর উঠল এই ঘর এই ঘর থেকে। জেগে গেছে সব ঘরের ছেলেপানরা। বয়স্ক, বুড়োরা। ধ্বনিত হলো হাওয়ায়, মাটিতে, আকাশে। জয় বাংলা! জয় বাংলা!
পরদিন দুপুরে অনু ভাবছিল, শেখ মুজিব মানুষটা কেমন? রাতে এনায়েত সৈয়দ বলেছেন, এই মানুষটার এক ডাকে তারা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। বাংলা মায়ের দামাল ছেলেরা এবার দেশ স্বাধীন করে ছাড়বেই ছাড়বে। চিন্তা শুধু মানুষটাকে নিয়ে। শেখ মুজিব। মানুষটা এখন কারাগারে বন্দি। তাও এই দেশে তাঁকে রাখেনি। হাজার মাইল দূরে পশ্চিম পাকিস্তানের এক কারাগারে আটক করে রেখেছে। কারা অত কিছু বোঝেনি অনু। পশ্চিম পাকিস্তানি যারা? ভাইফোঁটা নিয়ে হাপুতহুপুত করে ধোঁয়া ওড়া গরম ভাত খেতে খেতে কথা বলছিলেন এনায়েত সৈয়দ, ‘শেখ মুজিবকে তাদের ছাড়তেই হবে।’
বাবা বললেন, ‘মেরে ফেলে যদি!’
‘সেটা সম্ভব না। শেখ মুজিবকে তারা ভয় পায়।’
কারা ভয় পায়?

১৩.
কাল রাতে ‘জয় বাংলা’ রব প্রথম কোত্থেকে উঠেছিল? কোন ঘর থেকে? কেউ দেখা গেল বলতে পারে না। পিংকুকে সত্যিটা বলেছে অনু, ‘আমাদের ঘর থেকে। বাবার বন্ধু, মায়ের ভাই, এনায়েত সৈয়দ প্রথম বলেছেন।’
পিংকু আমলে নেয়নি, ‘কোন এনায়েত? আধা মাইল পাড়ার মুক্তি এনায়েত?’
‘মুক্তি কী? এনায়েত সৈয়দ?’
‘কেন? মুক্তিযুদ্ধে গেছে না সে? মুক্তিযুদ্ধে যারা গেছে, তাদের বলে মুক্তি।’
‘তোতনের বাবাও মুক্তি?’
‘হ্যাঁ। কিন্তু এটা তুই কী কথা বললি? মুক্তি এনায়েত কালরাতে তোদের ঘর থেকে জয় বাংলা বলেছে! তোদের ঘরে সে এসেছিল কেন? তোদের ঘরে কি মুক্তিরা বন্দুক জমা রাখে? হাসালি মোরে!’
আকবর, হারুনকেও বলতে গিয়েছিল অনু, তার আগেই তাদের কথা শুনে থ হয়ে গেছে। তারা নাকি প্রথম ‘জয় বাংলা’ বলেছে। কীভাবে? গায়েবি আওয়াজ শুনে তারা এটা করেছে।
গায়েবি আওয়াজ? হ্যাঁ। গায়েবি আওয়াজ হয়েছিল।
‘জয় বাংলা!’
আকবর, হারুন দুই ভাই শুনেছে। শুনে তারাও আওয়াজ দিয়েছে, ‘জয় বাংলা!’
কী করা আর?
আর একটা কথা তো এখনও কাউকেই বলেনি অনু। জয় বাংলা শোর ওঠার পর, মা যখন এনায়েত সৈয়দকে ভাইফোঁটা দিচ্ছেন, আরেকজন মানুষ তাদের ঘরে এসেছিলেন। রীনামাসি। কথা বলেছেন এনায়েত সৈয়দের সঙ্গে। এনায়েত সৈয়দ বলেছেন, ‘দুশ্চিন্তা করবেন না, বৌদি। অজয় বেঁচে আছে। ভালো আছে। যুদ্ধ করছে।’
এত বড়ো একটা ঘটনা। একটা কাউকে যদি বলতে পারত অনু। পিংকুর মাসি রীনামাসি। তাও পিংকু মনে হয় ঘটনা জানে না। জানলে একবার না একবার কথা তুলতই। করে কী অনু? কাকে বলে? হিজলগাছটাকে?
বলল।
‘তোতনের বাবা যুদ্ধ করছেন।’
বলে দৌড় দিল। কেন যে!
অচিন কোনও ফুল ফুটেছে কোথাও। তার ঝিমঝিম ঘ্রাণ হাওয়ায়। আকাশ খুবই নীল। রোদ মিষ্টি। ঘুঘু ডাকছে দূরের কোনো প্রান্তরে। আকবর কোত্থেকে অনুকে ডাকল, ‘অনু-উ!’
ছাতিমতলা পার হচ্ছিল অনু। বোকার মতো দাঁড়িয়ে পড়ল এবং তার সারা শরীর কাঁটা দিয়ে উঠল।
‘এই অনু!’
আকবর কোথায়? দেখা যাচ্ছে না কিন্তু ডাকছে। আকবর ডাকছে নাকি আর কেউ? ছাতিম গাছে ভূতপেত্নিরা থাকে। সন্ধ্যা রাতে থাকে, দুপুরেও থাকে। আকবরদের রাখাল টুনাকে কতবার ধরেছে! আকবরই বলেছে। টুনাও বলেছে।
‘এই এদিকে। উপরে তাকা।’
তাকিয়ে তাজ্জব হয়ে গেল অনু। ছাতিম গাছের একটা ডালে পা ঝুলিয়ে বসে আছে আকবর। আবার হাসছে। হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল ‘জয় বাংলা!’
বাবারে! ধড়ে প্রাণ ফিরে এল অনুর। সেও আকবরের মতো চেঁচাল, ‘জয় বাংলা।’
হেথায় হোথায় ‘টুইট! টুইট!’ করে ডেকে উঠল কয়েকটা পাখি। পাখিদের ভাষায় তারা কী বলল?
‘জয় বাংলা!’

তল্লাটের কেউ কাল রাতে ঘুমায়নি। ঘুমাতে পারেনি। গোলাগুলির শব্দ শুনেছে রাতভর। আমবাড়ি বাজারে মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করেছে হানাদার বাহিনীর সঙ্গে। হরিনাপাটিতে হানাদার বাহিনীর ক্যাম্প উড়িয়ে দিয়েছে মুক্তিযোদ্ধারা। সকালে মিছিল হয়েছে এখানে। বাবা, গৌরা সাধু, সিরাজ মিয়া কাকা, নজির মিয়া কাকা, আরও অনেক মানুষ ছিল মিছিলে। ছোটোরাও মিছিল করেছে। আকবর, হারুন, টুনা, অনু, মিরিনময় (মৃন্ময়), রাজু, রাশেদ, মনোয়ার, সেন্টু। বড়োদের থেকে কম জোর তাদের গলায়?
‘জ-অ-অয় বাংলা!’
‘জ-অ-অয় বাংলা!’
‘জয় বাংলা!’
‘জয় বাংলা!’
‘এবারে সংগ্রাম!’
‘স্বাধীনতার সংগ্রাম!’
‘এবারের সংগ্রাম!’
‘মুক্তির সংগ্রাম!’
‘জেলের তালা ভাঙব!’
‘শেখ মুজিবকে আনব!’
‘জেলের তালা ভাঙব!’
‘শেখ মুজিবকে আনব!’
‘জ-অ-অয় বাংলা।’
‘জয় বাংলা!’
দিনটা ইনিয়ে বিনিয়ে গেছে।
সন্ধ্যার পর থেকে আবার গোলাগুলির শব্দ। ঘুমায় কে আর? আমবাড়ি বাজার দূরের জায়গা না, হরিনাপাটি দূরে। তাতে কী? আজ আমবাড়ি বাজারে ঢুকে পড়েছে, কাল এই গাঁয়েও ঢুকবে হানাদার বাহিনী। জ্বালাবে, পোড়াবে। মানুষকে মারবে। নির্যাতন করবে। ভয়ে পরদিন ভোররাত থেকে আবার পলায়নপর হলো মানুষ। নদী পার হতে পারলে তবে রক্ষা। গৌরা সাধু বলল অনুকে। অন্ধকারে খেয়া নৌকায় নদী পার হয়েছে তারা অনেকজন। পিংকু, দুলি, রীনামাসিরা ইন্ডিয়া চলে গেছে কয়েকদিন আগেই। গৌরা সাধু আছে অনুদের সঙ্গে। নদীর পাড়ে উঠে হাঁটা রাস্তা ধরতেই সে কাঁধে তুলে নিল অনুকে। বাবা বারণ করলেন। মা বারণ করলেন। গৌরা সাধু কার কথা শোনে?
হিমপড়া রাস্তায় তারা হাঁটছে। হাঁটছে। হাঁটছে। শর্ট প্যান্ট, সোয়েটার মাফলার আর চাদর, মা সব পরিয়ে দিয়েছেন অনুকে। ভালো হয়েছে। শীত কম লাগছে। তবে আবছা অন্ধকারে মস্ত গৌরা সাধুর কাঁধে অনুকে মনে হচ্ছে একটা কাপড়ের পুঁটলি। ব্যাপার না। কুয়াশা কাটিয়ে কষ্টমষ্ট করে সকালের আলো একটু ফুটল কি ফুটল না, গৌরা সাধুর কাঁধ থেকে অনু আশ্চর্য দৃশ্য দেখল। সর্ষের ক্ষেত পথের দুধারে। ফুল ধরেনি। সবুজ হয়ে আছে। না, সাদা। হিম পড়ে সাদা হয়ে আছে।
কুয়াশার দাপট একটু কমতে কমতে আরও অনেক পথ পার হলো তারা। রোদ উঠল। অনু তাকাল। ঘুমিয়ে পড়েছিল গৌরা সাধুর কাঁধেই। চোখ খুলে একটা আজব নদী দেখল। হেঁটে পার হয়ে যাচ্ছে মানুষজন। বালি জেগে আছে নদীর এখানে-ওখানে। এ কেমন নদী?
গৌরা সাধু বলল, ‘এই নদীর নাম চলতি গো, দাদাঠাকুর। চলে বর্ষায়। স্রোত কি স্রোত হয় রে! শীতকালে আবার দেখো কেমন কাকতাড়–য়ার মতো ছিরি হয়ে যায়।’
কাকতাড়–য়া দেখেছে অনু। সিরাজ মিয়া কাকার আবাদি জমিতে। খড় দিয়ে আর বাঁশ দিয়ে বানায়। শার্ট পরায়। মাথা বানায় মাটির কেলে হাঁড়ি দিয়ে। চোখ এঁকে দেয়, নাক এঁকে দেয়। সেই কাকতাড়–য়ার মতো নদী! কী করে হয়? গৌরা সাধু এরকম অজস্র জটিল কথা অহরহ বলে। অনু ধরল না। তারা এখন আজব নদী পার হচ্ছে। বালু অনেকটুকু জুড়ে এখানে। বালুতে কিছু গাছও হয়েছে। ছোটো একটা গাছে একটা হলুদ প্রজাপতি বসে আছে। ছোটো প্রজাপতি। সকালবেলার রোদ ডানায় নিয়ে ঘুমাচ্ছে। ঘুম কাটেনি মনে হয় বেচারির। আরে এটা কী?
‘গৌরা দাদা!’
‘দাদাঠাকুর?’
‘দেখ।’
গৌরা সাধু দেখে চোখ বড়ো করল কিনা, কাঁধ থেকে অনু বুঝতে পারল না। বড়ো করার কথা। করেছে মনে হয়। গৌরা সাধু বলল, ‘জয় মা তারা! এ তোর কেমন ইশারা গো মা!’
বালুতে একটা চুড়ি পড়ে আছে। সোনালি রং রোদে ঝিকমিক করছে। আগে যারা গেছে তারা কেউ দেখেনি?
‘দাদাঠাকুর, তুমি নদীর জলে পা ডোবাও একটু।’
বলে গৌরা সাধু অনুকে কাঁধ থেকে নামাল। চুড়িটা নিল। পরখ করে দেখে বলল, ‘স্বর্ণের জিনিস গো, দাদাঠাকুর। ছেলেপানের হাতের।’
‘কী করবে, গৌরা দাদা?’
‘দেখি গো দাদাঠাকুর কী করা যায়? ছেলেপান কম তো ওপারে যাচ্ছে না।’
‘ওপারে?’
‘ইন্ডিয়া গো, ইন্ডিয়া।’
‘আমরা ইন্ডিয়া যাচ্ছি?’
‘আর কোথায়?’
‘তুমিও যাচ্ছ? আমাদের সঙ্গে থাকবে?’
‘না গো, দাদাঠাকুর, আমি যাব না। বলিনি এই দেশ ছেড়ে আমি কোথাও যাব না।’
‘কী করবে তুমি, গৌরা দাদা?’
‘যুদ্ধ করব গো, দাদাঠাকুর।’
‘তুমি মুক্তি…মুক্তিযোদ্ধা হবে?’
‘উপায় কী আর! দেশ হলেন মা, দাদাঠাকুর। সেই মা বিপদে পড়েছেন। তার সন্তান হয়ে আমি এখন সাধুগিরি করে বেড়াব? ঝাড়ফুঁক তুকতাক করে বেড়াব? হয়, বলো।’
‘বন্দুক দিয়ে যুদ্ধ করবে তুমি?’
ছোট্ট চুড়িটা তার গেরুয়া ঝোলায় রেখে গৌরা সাধু অল্প হাসল, ‘বন্দুক? হ্যাঁ। বন্দুক দিয়েই ওই হানাদার পাকিস্তানিদের মেরে শেষ করতে হবে দাদাঠাকুর। উড়িয়ে দিতে হবে মোছুয়ার দলকে।’
হেসে ফেলল অনু, ‘এসব কী বলো, গৌরা দাদা!’
‘যা বলি তা সত্য বলি গো, দাদাঠাকুর। আর একটা কথা বলি শোনো। শঙ্খে সমুদ্র আটকে রাখতে পারেন, এমন মানুষ কিন্তু আছেন একজন। সে আমি না। বুঝলে, আমি না।’
‘কে গৌরা দাদা?’
‘শেখের ব্যাটা গো! শেখ মুজিব!’
‘শেখ মুজিব!’
বাবা আর মা এর মধ্যে কিছুদূর এগিয়ে গিয়েছিলেন। বাবা ফিরে এলেন। উদ্বিগ্ন চোখমুখ। বললেন, ‘কী হলো গৌরা?’
‘কিছু না ঠাকুর। যাই।’
‘আরে, তুমি নদীতে বসে পড়েছ, আমরা তো চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম।’
‘চিন্তার কিছু নাই গো, ঠাকুর। জয় মা তারা!’
কাঁধের বোঝা মানে অনুকে আবার কাঁধে তুলে নিল গৌরা সাধু। হাঁটা দিল। চলতি নদীর পর কয়েকটা গাঁ। একটা গাঁয়ের নাম সরদাবাজ। সরদাবাজের এক গেরস্থ বাড়িতে দুপুরে দুটো খাবার জুটল অনুদের। কাকিলা মাছের ঝোল, হিদল ভর্তা, পালংশাক আর মুসুরির ডাল। অনু হিদলভর্তা খায় না। ঝাল লাগে। গৌরা সাধু খেল হাপুতহুপুত করে।
আর কিছু মানুষও তাদের সঙ্গে খেয়েছে। তাদের মধ্যে মহিলা একজনের কথা শুনে কান পাতল অনু।
‘মুখপুড়ি! আগেই বলেছিলাম পরার দরকার নাই। এখন হলো তো! আট আনা স্বর্ণ দিয়ে গড়ানো। গেল তো! হ্যাঁ? মুখপুড়ি! ইচ্ছা করে দেই এক ঠোকর!’
মুখপুড়ি একটা ছোটো মতন মেয়ে। অনুর বয়সি। চোখ বড়ো বড়ো, টলটলে। কিছু কান্না করেছে মনে হয়। চোখের কোণে কান্নার দাগ লেগে আছে। মা ‘মুখপুড়ি’ বললে কাঁদবে না? গৌরা সাধুও দেখেছে, শুনেছে। উঠানে মা, মেয়ে আর মেয়ের বাবাও বসে খাচ্ছেন। বাবা মানুষটা অনুর বাবার বয়সি। মা অনুর মায়ের বয়সি। দেখতে মৃদুলের মা পুতুলদির মতো। মৃদুলরা কোথায়? ইন্ডিয়া চলে গেছে আগেই?
খেয়ে উঠে গৌরা সাধু বলল, ‘দাদাঠাকুর?’
‘গৌরাদাদা?’ অনু বলল।
গৌরা সাধু বলল, ‘জয় মা তারা! মায়ের পরীক্ষা। মা! মাগো!’
মুখপুড়িদেরও খাওয়া হয়ে গেছে। আবার পাত পড়েছে উঠোনে। বাবা কথা বলছেন অচিন একজনের সঙ্গে। মা গাঁটরি আগলে বসে আছেন বারান্দায়। অনুর মনে হলো মায়ের ঘুম পাচ্ছে নাকি? মায়ের না আসলে, তার ঘুম পাচ্ছে। উকিলপাড়ায় থাকলে সে কী করত এখন? কী সিরাজ মিয়া কাকার বাড়িতে থাকলে? ঘুমিয়ে পড়ত না? গৌরা সাধু পা ছড়িয়ে বসেছে। জিরোচ্ছে বুঝি। ঘুম চোখে নিয়ে অনু দেখল, মুখপুড়ি গৌরা সাধুকে দেখছে। বিস্মিত চোখে দেখছে। ভয় পাচ্ছে না? মুখপুড়ির বাবা বিড়ি ধরিয়ে মোটা একজন মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন এবং হাসছেন।
গৌরা সাধু বলল, ‘কী গো, জননী?’
মুখপুড়ি বলল, ‘তুমি সাধু?’
‘নাগো জননী, আমি ফকির। হা! হা! হা! জননীর নামটা কী গো?’
‘পার্বতী।’
‘পার্বতী! বা-বা! বা-বা! জয় মা তারা! তোমার লীলা বোঝা দায় গো মা! জননী পার্বতী, মন খারাপ কেন গো?’
‘মন খারাপ না।’
‘উহুঁ, মন খারাপ। না হলে মুখটা মলিন কেন গো জননী?’
‘আমার চুড়ি হারিয়ে গেছে তো।’
‘হারায়নি গো। পার্বতীর চুড়ি কোনোদিন হারায়?’
‘হারিয়ে গেছে! হারিয়ে গেছে!’
‘তাহলে এটা কার চুড়ি গো?’
গৌরা সাধু তার ঝোলা থেকে বের করে দেখাল চুড়িটা।
অমনি চিল চিৎকার দিল পার্বতী, ‘মা-আ-আ!’
মুহূর্তে ভিড় জমে গেল একটা। ঘটনা যখন সকলে শুনল জয় জয়কার পড়ে গেল গৌরা সাধুর। পার্বতীর মা আর বাবা একসঙ্গে প্রণাম করতে গেলেন গৌরা সাধুকে। ‘একী! একী!’ বলে গৌরা সাধু লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘শোনেন গো, ভালো কথা কিছু যদি বলতে হয় তবে বলেন আমার দাদাঠাকুরকে। দাদাঠাকুর না দেখলে আমি কোত্থেকে চুড়ি পেতাম গো জননীর? চলতির বালুতে পড়েছিল যে। দাদাঠাকুর দেখে না আমাকে বললেন। কী গো, দাদাঠাকুর?’
অনু লাল হয়ে গেল লজ্জায়! কেউ চেঁচিয়ে উঠল, ‘জয় বাংলা!’
সঙ্গে সঙ্গে শোর উঠল উঠানে, ‘জয় বাংলা!’
শীতের একটা আধা আতঙ্কিত দুপুর চনমন করে উঠল জয় বাংলায়।
কয়েকবার ‘জয় বাংলা’ হলো। কিছুক্ষণ পর আবার হাঁটা দিল তারা। সরালীর একটা ঝাঁক চিউ চিউ করে উড়ে গেল তাদের মাথার উপর দিয়ে। বড়ো একটা শূন্য হাট পার হয়ে তারা পাকা রাস্তায় পড়ল। দুই একটা গাড়ি, মানুষজন দেখল। আরও কিছু দূর হেঁটে বাসস্ট্যান্ড। একটা বাসস্ট্যান্ড ছেড়ে যাচ্ছে। কোনোরকমে সেই বাসে উঠে পড়তে পারল অনুরা। গৌরা সাধুর দাপটে বলা যায়।
বাসে বিকাল হলো, কুয়াশা নামল। সন্ধ্যা কখন হলো বোঝা গেল না। বাস তাদের নামিয়ে দিল একটা ছোটো বাজারের মাথায়। বাজারে মানুষজন আছে, সদাইপাতি কিনছে। বাস থেকে নেমে যে যার রাস্তা ধরল অন্য যাত্রীরা। অনুরা থাকল। বাস ফিরে গেল আবার এক দঙ্গল মানুষ নিয়ে।
গৌরা সাধু বলল, ‘এখন, ঠাকুর?’
বাবা বললেন, ‘দেখি গৌরা।’
এগিয়ে এল বাজারের দুয়েকজন।
খাটো একজন মানুষ, সবুজ রঙের বেপারি শার্টের সঙ্গে সাদা ধুতি মালকোচা দিয়ে পরেছেন, পান খাচ্ছেন, পিচিক করে পানের একটা ফিক ফেলে বললেন, ‘জয় বাংলার মানুষ, বাবুরা?’
বাবা বললেন, ‘হ্যাঁ। আপনি কি এই এলাকার?’
‘আজ্ঞে বাবু। ক্যাম্পে যাবেন তো, নাকি আপনারা?’
পিংকু…। ক্যাম্প…ক্যাম্পে দেখা হবে পিংকু, দুলিদের সঙ্গে?
বাবা বললেন, ‘না। আমরা সিংলাছড়া যাব।’
‘সিংলাছড়া চা বাগানে? সে তো বহুত দূরের পথ, বাবু। বাস গাড়িতে যেতেই ধরেন তিন-সাড়ে তিন ঘণ্টা লাগে। বাস তো সকালের আগে আর পাবেন না। এক রাত এই গরিবের কুটিরে থেকে যান। আমি আজ্ঞে মাখনলাল কর।’
মাখনলাল কর! বাবাকে মাখনলাল করতে বলছেন মানুষটা। কী আজব কথা! মাখন কোথায়! মাখন কী লাল হয়? কী আশ্চর্য!
বাবা বললেন, ‘আমি দীপেন কর্মকার। ইনি আমার স্ত্রী যুঁথি। এ ছেলে অনু। এই যে, এ গৌরা সাধু। কালী সাধক।’
গৌরা সাধু বলল, ‘জয় মা তারা!’
হাত জোড় করলেন মানুষটা।
মা ফিসফিস করে অনুকে বললেন, ‘নমস্কার কর।’
অনু হাত জোড় করে বলল, ‘নমস্কার।’
মানুষটা হেসে বললেন, ‘নমস্কার। নমস্কার।’
বাবা বললেন, ‘বলছিলাম মাখন বাবু, এখানে ভাড়ায় গাড়ি মিলে না?’
‘তা মিলে। কিন্তু তারা তো সকলেই আজ্ঞে ভাড়া খাটতে চলে গেছে, বাবু। জয় বাংলা থেকে কত লোক আসছেন।’
এই সময়… গাড়ির হর্ন!
একটা গাড়ি এদিকে আসছে।
গাড়িও দেখা গেল।
মাখনলাল কর বললেন, ‘ওই এলেন। আলী ইদরিশের বেতোঘোড়া। এর গাড়িতে আবার চড়তে যাবেন না, বাবু। আমার দাদার দাদার দাদার আমলের গাড়ি। জন্মের পর থেকে দেখছি।’
বাবা বললেন, ‘গাড়ি কাশে।’
তাদের অনেক কাছে এসে পড়েছে, মনে হলো হঠাৎ থেমে গেল গাড়িটা। এনজিন খক খক করে কাশল।
মাখনলাল কর হাসলেন, ‘দেখলেন তো বাবু, গাড়ির নমুনা! যক্ষ্মারোগীর মতো কাশে না, বলেন! হে! হে! হে!’
খক! খক! খক!
খক! খক! খক!
খক! খক! খক!
আরও কয়েকবার কেশে গাড়িটার এনজিন চুপ করে গেল।
গাড়ির দরজা খুলে যে মানুষটা নামল, ডাকাতের মতো সে দেখতে। অনু কখনও ডাকাত দেখেনি। মায়ের কাছে বিশু ডাকাত, রঘু ডাকাতের গল্প শুনেছে। ছবি দেখেছে বইতে। মনে হলো তেমন। লম্বা চওড়া মানুষ। ইয়া গোঁফঅলা। জবাফুলের মতো চোখ দুটো লাল। গাড়ির সামনের ডালা উঠিয়ে এনজিনের কিছু সে দেখল। ডালা নামিয়ে বিরক্ত, ক্রুদ্ধ গলায় বলল, ‘তুই বিলে ডুবে মর গিয়ে!’
গাড়িকে বলল? গাড়িকে এমন কথা বলে কেউ?
মাখনলাল করকে দেখে ডাকাত মার্কা মানুষটা বলল, ‘মাখন কাকা, এরা কারা? জয় বাংলার মানুষ? আদাব, দাদা।’
বাবা বললেন, ‘আদাব। হ্যাঁ ভাই আমরা জয় বাংলার মানুষ।’
‘সেটা দেখেই বুঝেছি, দাদা। আমি ইদরিশ। আলী ইদরিশ। কোনদিকে যাবেন দাদা আপনারা?’
‘সিংলাছড়া ভাই। চা বাগান।’
‘চিনি। গাড়িতে যাবেন?’
‘আপনি যাবেন?’
‘যাব না কেন, অবশ্যই যাব। আপনারা কজন?’
মাখনলাল কর বললেন, ‘বাবা ইদরিশ।’
আলী ইদরিশ বলল, ‘বলো মাখন কাকা। কী বলবে বলো!’
‘না, বাবা। তোমার গাড়িখানার কথা বলছিলাম। যে রকম কাশল। দম আটকে মরে যায়নি তো, বাবা?’
‘তুমি একটা ধেঁড়ে বদমায়েশ, মাখন কাকা। হা! হা! হা! আমার গাড়ি তোমার আগে মরবে না। গলা শুকিয়ে গেছে কিনা, এজন্য কাশল। জল খেলেই দেখো ঠিক হয়ে যাবে। হা! হা! হা! ব্ল্যাক ডায়মন্ডের মতো দৌড়াবে। হা! হা! হা!’
‘সে কথা মনে করিয়ে আর দুঃখ দিও না, বাবা ইদরিশ। ব্ল্যাক ডায়মন্ড! কান ধরেছি, নাকে খৎ দিয়েছি। রেসের মাঠে আর প্রাণ থাকতে না।’
‘সে কাল দুক্কুরের পর তোমার মনে থাকলেই হলো।’
‘আমার কথার দাম একশ টাকা, বাবা ইদরিশ। সেটা তুমি জানো।’
‘সেটা কে না জানে মাখন কাকা! হা! হা! হা! দাদা, ভাতের হোটেল আছে বাজারে। খাওয়া-দাওয়া করে নেন আপনারা। রাস্তার আর ভাতের হোটেল পাবেন না। মালপত্তর গাড়িতে রেখে যান।’
‘ইদরিশ ভাই!’
‘জি দাদা, বলুন।’
‘কত দিতে হবে?’
‘যা মনে হয় দেবেন, দাদা। গাড়ির তেলের খরচ উঠলেই হলো। জয় বাংলার মানুষ আপনারা। মালপত্তর উঠিয়ে ফেলুন তাহলে। আমি যাই, জলের ব্যবস্থা দেখি ওদিকে।’
‘ইদরিশ ভাই!’
‘কী হলো? হা! হা! হা! ভয় নেই দাদা, কোনো ভয় নেই। জয় বাংলার মানুষের জিনিস এই এলাকার চোররাও চুরি করবে না। বলো, মাখন কাকা?’
‘তা ঠিক, বাবু। খাঁটি একখানা কথা বলেছে ইদরিশ। এই এলাকায় চোর আছে ধরেন চারজন। বিন্দা, মাধো, কালু, সুবল। এরা কেউ এত বড়ো পাপকাজ করবে না। এই গ্যারান্টি আমি দিতে পারি আজ্ঞে। আমার কথার দাম একশ’ টাকা।’
‘তা গ্যারান্টি তুমি ছাড়া আর কে দিতে পারবে, মাখন কাকা! বিন্দা, মাধোরা মানে তোমাকে। কর্তা বলে ডাকে। তাদের চোরাই মাল তুমি গচ্ছিত রাখো।’
‘এ বড়ো অন্যায় কথা হলো, বাবা ইদরিশ। চোর হলেও তারা এলাকার ছেলে। তাদের দিকটাও আমাকে দেখতে হয়।’
‘তা তো ঠিকই! তা তো ঠিকই। স্কুলে তো চার ক্লাস অব্দি পড়েছি। মানবদরদী, মহাত্মা, মহান, এসব কথা কিছু ছিল বইতে। তুমি মাখনকাকা মানবদরদী। হা! হা! হা!’
গৌরা সাধু বলল, ‘ঠাকুর?’
বাবা বললেন, ‘হুঁ?’
‘জিনিসপত্র উঠাই গাড়িতে?’
আলী ইদরিশ বলল, ‘ওঠান তো দাদা। আচ্ছা শোনেন, আমি জল নিয়ে আসি কেমন! তারপর না হয় দুটো খেয়ে নেবেন আপনারা। আমি বসে থাকব গাড়িতে।’
বাবা বললেন, ‘আপনি খাবেন না?’
মাখনলাল কর বলল, ‘ও নিয়ে চিন্তা করবেন না, বাবু। আমাদের ইদরিশ বাবা হোটেলের খাবার খায় না। বিবির রান্না করা খাবারের বাক্স মওজুদ রাখে গাড়িতে। বউমা কেমন আছেন, বাবা ইদরিশ?’
‘তোমাদের দোয়ায় ভালো আছে, মাখনকাকা। আচ্ছা দাদা, আমি আসছি।’
বাজারে ঢুকে একটা দোকানের আড়াল হয়ে গেল আলী ইদরিশ। বাবা আর গৌরা সাধু জিনিসপত্র গাড়িতে ওঠালেন। অনু বলল, ‘মা, গাড়িতে উঠি।’
‘উঠ।’
অনু গাড়ির ড্রাইভিং সিটে উঠল। বেলুনের মতো জিনিসটা হর্ন। পোঁ পোঁ করে বাজে। অনু বাজাবে?
ফিরে এল আলী ইদরিশ। জেরিক্যান ভরে জল নিয়ে ফিরেছে। সবটুকু জল ঢেলে দিয়ে এনজিনের ডালা বন্ধ করে মানুষটা বলল, ‘আশা করি আর কাশবি না তুই!’
মাখনলাল কর বললেন, ‘বিষ্ণু! বিষ্ণু!’
গৌরা সাধু বলল, ‘জয় মা তারা!’
আলী ইদরিশ বলল, ‘খেয়ে আসুন, দাদারা।’
মাখনলাল কর থেকে গেলেন। কথা বলবেন আলী ইদরিশের সঙ্গে।
বাবা বললেন, ‘চল, অনু।’
গাড়ি থেকে নেমে হাঁটতে হাঁটতে অনু বলল, ‘আমি ওকে কী ডাকব, মা?’
মা বললেন, ‘কেন? মামা।’
গৌরা সাধু বলল, ‘জয় মা তারা! ঘটনা কিছু বুঝলেন, ঠাকুর?’
বাবা বললেন, ‘কী গৌরা?’
গৌরা সাধু বলল, ‘মাখনলাল কর। কী বিগলিত ভাব দেখলেন, ঠাকুর! এই মানুষ চোরাই মাল রাখে! চিন্তার কথা। খুবই চিন্তার কথা। জয় বাংলার মানুষের জিনিসে কী সিল-ছাপ্পড় মারা থাকে নাকি? জয় বাংলার জিনিস তারা চুরি করে না।’
খেয়ে ফিরে তারা দেখল, মাখনলাল কর চলে গেছেন। আলী ইদরিশ একা বসে আছে গাড়িতে। তাদেরকে দেখে বলল, ‘উঠে পড়েন দাদা। আমার গাড়ি ঠিক হয়ে গেছে।’
বাবা বললেন, ‘গৌরা।’
গৌরা সাধু বলল, ‘ঠাকুর।’
‘অনুর মা, অনু আর আমি পেছনের সিটে বসি। তুমি ইদরিশ ভাইয়ের সঙ্গে বস, কেমন?’
‘ঠাকুর!’
‘কী? গৌরা? কী হয়েছে?
‘আমাকে যে বিদায় দিতে হয়, ঠাকুর।’
‘বিদায় মানে? কী বলো তুমি?’
‘আমি জয় বাংলায় ফিরে যাব গো, ঠাকুর।’
‘জয় বাংলায় ফিরে যাবে! জয় বাংলায় তো যুদ্ধ চলছে।’
‘আমি যুদ্ধ করব।’
আলী ইদরিশ গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে নামল, ‘দাদা, আপনি মুক্তি। আগে বলবেন তো। স্যালুট, দাদা।’
গৌরা সাধু কেমন লজ্জা পেয়ে বলল, ‘এখনও মুক্তি হইনি গো ভাই। জয় বাংলায় যাব। যুদ্ধ করে জয় বাংলা স্বাধীন করতে পারলে তবে না মুক্তি, নাকি গো দাদাঠাকুর?’
অনু কী বলবে? বিস্ময়ে বোবা হয়ে গেছে ছোটো মানুষটা। গৌরা দাদা ফিরে যাবে? যুদ্ধ করবে স্বাধীন জয় বাংলার জন্য? গৌরা দাদা?
‘তুমি যুদ্ধ করতে পারবে, গৌরা?’ বাবা বললেন।
‘সে নিয়ে চিন্তা করবেন না ঠাকুর। আমি এখান থেকে সোজা যাব ক্যাম্পে। বারিকের টিলায় ট্রেনিং ক্যাম্প হয়েছে। মুক্তি কমান্ডার ছাতক বাজারের ওহাব মাস্টারের সঙ্গে কথা বলে রেখেছি।’
বাবা বললেন, ‘তবে তুমি যাও গৌরা।’
অনু বলল, ‘যেও না, গৌরা দাদা।’ মনে মনে বলল। কে শুনবে? গৌরা সাধু বলল, ‘যাই গো, দাদাঠাকুর। বউ ঠাকরোন, যাই। ইদরিশ ভাই, আদাব। বিদায় দেন গো।’
আলী ইদরিশ পরম মমতার সঙ্গে বুকে জড়িয়ে ধরল গৌরা সাধুকে। বলল, ‘জয় বাংলা স্বাধীন হবেই, দাদা।’
বাবা বললেন, ‘তোমরা উঠো।’
অনু আর মা গাড়িতে উঠলেন। বাবা বললেন, ‘যাই গৌরা। যেখানেই থাকো, ভালো থেকো তুমি।’
‘আশীর্বাদ রাখবেন, ঠাকুর। যান গো, ইদরিশ ভাই।’
বাবা উঠে অনুর পাশে বসলেন। আলী ইদরিশ ড্রাইভারের সিটে।
গাড়ি স্টার্ট হলো।
খক! খক! খক!
অনু গৌরা সাধুকে দেখল। দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ চিৎকার দিল, ‘জয় বাংলা।’
গাড়ি চলতে শুরু করেছে। অনুও চিৎকার দিল। মনে মনে চিৎকার দিল, ‘জয় বাংলা!’

১৪.
সিংলাছড়া চা বাগানে তারা পরের কয়েকটা মাস থাকল। সবুজ চা বাগানের মাঝখানে বাংলো। চা বাগানের ছোটো চা-ঘর বাবু তপংকর সান্যালের বাংলো এটা। তপংকর সান্যাল বিবাহিত নন। একাবোকা মানুষ। তবে থাকেন রাজার হালতে। কাজের লোক তিনজন। রামা, মঙ্গল আর সিধু। রামা চা-ঘর বাবুর পায়ের জুতো খুলে দেয়, মঙ্গল রান্নাবান্না করে, সিধু ঘরদোর ঝাড়ামোছা করে। গাড়ি আছে। নিজে ড্রাইভ করেন তপংকর সান্যাল। কার্নিশঅলা টুপি পরেন ক্যাম্বিসের। গল্প করতে পারেন জমিয়ে। এই তপংকর সান্যাল হলেন দীপেন কর্মকারের ছেলেবেলার বন্ধু। গাঙপাড়ের ইশকুলে এবং জুবিলী ইশকুলে তারা একসঙ্গে পড়ালেখা করেছেন।
তপংকর কাকার বাংলোয় দুদিন থাকার পর অনু বুঝতে পারল তারা এখন ইন্ডিয়ায়। তপংকর কাকার কথা থেকে। রাতে ঘুমিয়ে পড়ার আগে জিগ্যেস করল মাকে, ‘আমরা কি এখন ইন্ডিয়ায়, মা?’
‘হ্যাঁ রে, বাবা।’
‘ইন্ডিয়া কি একটা দেশ?’
‘হ্যাঁ!’
‘আমাদের দেশ?’
‘না, ইন্ডিয়া আমাদের প্রতিবেশী দেশ।’
‘আমাদের দেশ তবে কোনটা?’
‘জয় বাংলা।’
‘জয় বাংলা! আমরা আর জয় বাংলায় যাব না?’
‘যাব।’
‘কোনদিন, মা?’
‘এই তো, বাবা।’
আজব ব্যাপার হলো তপংকর কাকাও অনুকে ডাকেন পরমাণু। যতবার ডাকেন ততবারই এনায়েত সৈয়দের কথা মনে পড়ে অনুর। এনায়েত সৈয়দ মুক্তি হয়ে গেছেন। যুদ্ধ করছেন। তোতনের বাবাও যুদ্ধ করছেন। গৌরা দাদাও যুদ্ধ করতে গেছে।
সিংলাছড়া চা বাগানে মনে হয় মানুষের চেয়েও বেশি শেয়াল। আর কটা। কাটবিরালকে সিধু মঙ্গলরা বলে, কটা। গাছে গাছে এই কটাদের রাজত্ব। বিরাট আখক্ষেত তপংকর কাকার বাংলোর পেছনে। পাহারা থাকে। তাও চুরি করে আখ খেয়ে যায় শেয়ালরা। দিনে দুপুরে তাদের দেখা যায়। সন্ধ্যারাত থেকে তারা হুক্কাহুয়া জুড়ে।
আখখেতের পর একটা ছড়া বয়ে গেছে। বর্ষাকালে পাহাড়ি ঢল নামে। অনেক স্রোত হয়। শীতকালে এক ফোঁটা পানিও থাকে না, ছড়া শুধু বালুর ছড়া হয়ে যায়। ঝিকমিক করে রোদে, চিকচিক করে জোছনায়।
মঙ্গলের সঙ্গে মোষের পিঠে চড়ে একদিন রাতাবাড়ি গিয়েছিল অনু। রাতাবাড়ি থেকে বাস ছেড়ে যায় এদিক-ওদিকে। অনুকে একটা দোকানের বেঞ্চিতে বসিয়ে সদাইপাতি কিছু কিনতে গিয়েছিল মঙ্গল। অনু বসে মানুষজন দেখছিল। তার পাশে এসে বসেছিলেন একজন। বয়স্ক মানুষ। বাজারের রাস্তায় একটা বাস এসে থামল। বয়স্ক মানুষটা বললেন, ‘এই বাসটার নাম কী জানো খোকা? দিদিমার স্মৃতি। খিক! খিক! খিক! লেখা আছে দেখো। দিদিমার স্মৃতি! পেট ভরতি করে মানুষ নিয়ে যাচ্ছে। দিদিমার স্মৃতি! খিক! খিক! খিক!’
বাসটা চলতে শুরু করেছে। লেখা দেখে কী বুঝবে অনু? মাত্র সে অ আ ক খ শিখেছে। কিন্তু বাসের জানালায় কে? টেডিপিসি! উঠে একটা দৌড় দিল অনু, ‘টেডিপিসি!’
টেডিপিসি অনুকে দেখলই না। বাস ছেড়ে দিল।
বাংলোয় ফিরে অনু মাকে সমস্ত ঘটনা বলল। বলতে ভুল করল শুধু বাসের নামটা। বলল, বাসের নাম ‘ঠাকুমার স্নেহ’। মা শুনে খুব হাসলেন। কেন? অনু বলল, ‘হাসো কেন তুমি, মা?’
‘বাসের নাম শুনে হাসি। বাসের আবার নাম হয় নাকি? কি জানি, এই দেশে হয় হয়তো।’
অনু বলল, ‘টেডিপিসি!’
‘আরে বাবা, তারা লামডিঙে এখন। এখানে কী করে আসবে? এই দেখ, সে চিঠি লিখেছে। আজই পেয়েছি।’
বলে মা একটা পোস্টকার্ড দেখালেন।
অনু বলল, ‘টেডিপিসি! চিঠি লিখেছে?’
‘হ্যাঁ শোন। প্রিয় বৌদি, কেমন আছ? আমরা লামডিঙে আছি। আমি, ছোড়দা, ফুলদা, মা। বাবা সেজদা আছে জলপাইগুড়িতে। বড়দির ওখানে। লামডিঙের জামাইবাবু স্কুল শিক্ষক। তপংকর দাদা তার পিসতুতো ভাই। জামাইবাবুর নিকট হতে তোমাদের সংবাদ পেয়েছি। কতদিন তোমাদের দেখি না বৌদি। যুদ্ধ কী শেষ হবে না? ভগবান আমাদের কষ্ট দেখছেন না? লামডিঙে খুব শীত। কথা বললে কথা জমে যায়। ভালো থেকো। চিঠি দিও তুমি। দুপুদাকে আমার প্রণাম দিও। আজ আসি। ইতি তোমাদের কার্তিক।’
টেডিপিসির চিঠি।
অনু বলল, ‘আমার কথা কিছু লিখেনি?’
মা হাসলেন।
লিখেনি তাহলে?
অনুর বুক কিরকম করে উঠল।
মা বললেন, ‘ওরে বাবারে! আমি কি বলেছি লিখেনি? চোখমুখ শুকিয়ে গেছে কিছু না শুনেই। এই যে আপনার টেডিপিসি আপনাকে আলাদা করে চিঠি লিখেছেন, বুঝেছেন? এই দেখেন।’
মা আবার কার্ডটা দেখালেন। অনু দেখল। সিল মারা দিকে গোটা গোটা অক্ষর। টেডিপিসি তাকে লিখেছে! অনু বলল, ‘পড়ে দাও।’
মা পড়লেন, ‘ক্যাংটা অনুটা, কেমন আছিস তুই? তোর কথা সবসময় মনে করি। তোর কি আমার কথা মনে পড়ে না? লামডিঙে আয়। তোকে নিয়ে অনেক পাহাড়ে ঘুরব। ভালো থাকিস ছোটো বকপাখি। নাকি তুই অনেক বড়ো হয়ে গেছিস? খবরদার বড়ো হবি না। ইতি তোর টেডিপিসি।… হলো?’

সিংলাছড়ার কয়েকটা মাস সত্যি অনেক বড়ো করে দিল অনুকে। কত কী দেখল সে, কত কী শুনল। কত কী জানল, কত কী বুঝল। আদর্শলিপি মুখস্থ করল। অ আ ক খ, এ বি সি ডি পড়তে, লিখতে শিখল। ছোটো হাতের, বড়ো হাতের।
তবে সিংলাছড়ায় শীত কী বাবারে! দুপুর থেকে সব ঠা-া হয়ে থাকে। সন্ধ্যায় চা বাগান ডুবে যায় কুয়াশায়। কোনো মানুষ আর ঘরের বার হয় না। তপংকর কাকার বাংলোয় বসার ঘরে ফায়ারপ্লেস আছে। আগুন জ্বালিয়ে রাখে মহাদেব দাদা। রামার কাকা এই মহাদেব দাদা। এই শীতেও খাকি হাফপ্যান্ট আর একটা হাতকাটা গেঞ্জি পরে খালি পায়ে ঘুরে বেড়ায়। অবশ্য ফায়ারপ্লেসের ধারে থাকে তো সারাক্ষণ। ফায়ারপ্লেসের কাঠ দিয়ে যায় রেংকা। যথেষ্ট গরম হয়ে থাকে বাংলো। শীত বোঝা যায় কেবল বাংলোর দরজা ও জানালার কাচে। কুয়াশা জমে থাকে বৃষ্টির ফোঁটার মতো।
তপংকর কাকা দুনিয়ার বই পড়েন এবং দুনিয়ার গল্প জানেন। রাপুনজেল, স্বার্থপর দৈত্য, ছোট্ট লালটুপি, প্যানডোরার বাক্সের গল্প। এর মধ্যে অনুর সবচেয়ে পছন্দ ছোট্ট লালটুপির গল্পটা। তপংকর কাকাকে বলে অবশ্য খুবই বিপদে পড়েছিল সে। কথাই বুঝলেন না, তপংকর কাকা বললেন, ‘তলে তলে এই, হ্যাঁ?’
‘কী?’
‘ছোট্ট লালটুপিকে বিয়ে করবি তুই?’
কী আশ্চর্য। ছোট্ট লালটুপিকে কেন বিয়ে করতে যাবে অনু? ছোট্ট লালটুপি কী সিংলাছড়ায় থাকে? সিংলাছড়ায় থাকলেও কি তাকে বিয়ে করত নাকি অনু?
মহাবিব্রত অনুকে দেখে আবার হাসি কী তপংকর কাকার।
‘হা! হা! হা! হা! হা! এই ব্যাটা, লজ্জা পায় কেন? তুই বড়ো হয়ে বিয়ে করবি না?’
‘নাহ্।’
‘কনফিডেন্ট। কেন রে? হা! হা! হা!’
‘তুমি কি বিয়ে করেছ?’
‘ওরে সর্বনাশ! দীপেন! ও দীপেন! তোর ছেলের কথা শুনে যা! হা! হা! হা! বড়ো হয়ে তুই অবশ্যই একটা কিছু হবি রে ব্যাটা।’
‘মুক্তি হব।’
‘সাবাশ, ব্যাটা!’
‘তপংকর কাকা?’
‘বল।’
‘তুমি কেন যুদ্ধে যাওনি? হ্যাঁ?’
‘আমি তো আরেক দেশের মানুষ রে এখন।’
‘বাবা কেন যায়নি?’
‘সব মানুষ কি যুদ্ধে যায়, বল? তোর বাবা যায়নি, তুই যাবি।’
হ্যাঁ, যাবে। মুক্তি হবে অনু। কিন্তু পারল না। যুদ্ধেও যেতে পারল না, মুক্তিও হতে পারল না। বাবার মতো দ হয়ে বসে একদিন সন্ধ্যায় রেডিওতে শুনল, জয় বাংলা স্বাধীন হয়ে গেছে!

১৫.
ছয়দিন পর তারা তাদের শহরে ফিরল। ঘরদোরে ফিরল। তাদের আগে ফিরেছে পাড়ার অনেকেই। তারা ভিড় করল তাদেরকে দেখতে। পিংকু, ছোড়দি, সেজদি, দুলি, মৃদুল, রিভা মাসি, নন্দা, ছন্দাদি, পনই, মান্না, বিভু, আরও কতজন। একটুপর দেখা গেল মিছিল করছে তারা।
‘জয় বাংলা!’
‘জয় বাংলা!’
‘আমার দেশ তোমার দেশ!’
‘বাংলাদেশ! বাংলাদেশ!’
‘জাতির পিতা শেখ মুজিব!’
‘লও লও লও সালাম!’
‘জয় বাংলা!’
‘জয় বাংলা!’

মৃদুলের ভাই মিন্টুমামা যুদ্ধে গিয়েছিল। ভদ্রদের বাসার সাধনদা গিয়েছিল। তারা ফিরেছে। এনায়েত সৈয়দ? রিভা মাসি বলল, ফিরেছেন। দুপুরে তাদের দাদাবাবু, মিন্টুমামার সঙ্গে ভাত খেয়ে গেছেন। গৌরা দাদা, গৌরা সাধু? কেউ কিছু বলতে পারল না। রাতে অনু অনেক চিন্তা নিয়ে ঘুমাল। শহরের অনেক মানুষকে হত্যা করেছে হানাদার বাহিনী। মুক্তিযোদ্ধা কয়েকজন আছেন তার মধ্যে। গৌরা দাদার কী কিছু হয়েছে?
পরদিন অনু গৌরা সাধুকে দেখল। সন্ধ্যায়। তার আগে দুপুরে বিরাট ঘটনা ঘটল। টেডিপিসিরা ফিরল। সেই থেকে টেডিপিসির সঙ্গে আছে অনু। লামডিঙে টেডিপিসিদের যে বোন থাকেন তার নাম হলো ছবি পিসি। ছবি পিসির তিন ছেলে। সন্তু, অন্তু-রন্টু। শেষের দুটো যমজ।
‘যমজ কী রে, টেডিপিসি?’
টেডিপিসি বলল, ‘একসঙ্গে জম্মেছে। একই রকম দেখতে। কোনটা অন্তু কোনটা রন্টু, ধরতেই পারবি না। অন্তুকে মনে করবি রন্টু, রন্টুকে মনে করবি অন্তু।’
অনু বলল, ‘যাহ্!’
‘হ্যাঁ-এ-এ। আচ্ছা, একটু বড়ো হলে তারা তো আসবে, তখন দেখিস। ও দাঁড়া, ছবি তো আছে। তোকে দেখাই।’
টেডিপিসি ছবি দেখাল। সত্যি একরকম দেখতে দুটো বাচ্চা! আসলেও ধরা মুশকিল কে কোনটা! টেডিপিসি ঠিকই বলেছে। এ অন্তু হলে ও রন্টু, এ রন্টু হলে ও অন্তু! তাজ্জব হয়ে গেল অনু। টেডিপিসি বলল, ‘কী-ই, বিশ্বাস হয়েছে?’
আর বিশ্বাস না হয়ে পারে?
ভাই কোথাও গিয়েছিলেন, ফিরে অনুকে দেখে বললেন, ‘কেমন আছ, ভাই?’
‘ভালো ভাই। তুমি কেমন আছো?’
‘আছিরে, ভাই।’
সন্ধ্যার অল্প আগে ফুলকাকু ছোটোকাকু, টেপি আর একটা বাছুরকে নিয়ে ফিরল। টেপির বাছুর। বুধি কোথায়? ফুলকাকু ছোটোকাকু যা বলল, বুকটা ব্যথা করে উঠল অনুর। ভাই টেপিকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন, ‘মা! মা গো! ও-ও-ও!’ টেডিপিসি স্তব্ধ। ভাইয়ের কান্না শুনে ঠাম্মা ঘর থেকে বের হয়ে এলেন, ‘কী হলো? হ্যাঁ? কী হলো? ও টুকুর বাপ!’
শুনে ঠাম্মাও স্তব্ধ হয়ে গেলেন।
বুধিকে ধরে নিয়ে জবাই করে খেয়ে ফেলেছে পিটিআই ইশকুল ক্যাম্পের হানাদাররা।
পাড়ার যত লোক এর মধ্যে জুটেছে। নানাজন নানা কথা বলে আকাশ থেকে সন্ধ্যা থেকে নামিয়ে আনল। হাঁক শোনা গেল গৌরা সাধুর, ‘জয় মা তারা! মা! মা গো!’
মানুষজন গৌরা সাধুকে নিয়ে পড়ল।
‘তুমি সাধু! কবে ফিরলে?’
‘তুমি সাধু, যুদ্ধ করেছ?’
‘তুমি সাধু, ব্রিজ উড়িয়ে দিয়েছ?’
গৌরা সাধু বিশদ বর্ণনা করল।
টেপি আর তার বাছুরকে এর মধ্যে গোয়ালঘরে ঠাঁই করে দেওয়া হয়েছে। ভাই, ঠাম্মাও গৌরা সাধুর যুদ্ধের কাহিনি শুনলেন এবং বিস্মিত হলেন। সকলে অনেক অনেক ভালো বলল গৌরা সাধুকে।
একজন দুজন করে ভিড় কমে আসল মানুষের। কমতে কমতে থাকল মাত্র তিনজন। টেডিপিসি, গৌরা সাধু আর অনু। সন্ধ্যা মিলিয়ে রাত হয়ে গেছে কখন। আকাশে অনেক তারা ফুটেছে। গৌরা সাধু বলল, ‘যাই গো দাদাঠাকুর। জয় মা তারা!’
অনু বলল, ‘গৌরা দাদা!’
‘দাদাঠাকুর?’
‘কোন তারার কথা বলো তুমি? তোমার মা কোন তারাটা?’
‘কী? হা! হা! হা! কোন তারাটা আমার মা? হা! হা! হা! আসমানের সব তারাই যে আমার মা হন গো দাদাঠাকুর। হা! হা! হা!’
‘সব তারা?’
‘না গো দাদাঠাকুর, ভুল কথা বলেছি। জয় মা তারা! জয় বাংলা! আমার তারা মা হলেন জয় বাংলা। জ-অ-অ-য় বাংলা!’

১৬.
অনু এখন শিক্ষিত ছেলে। পড়তে লিখতে পারে। বই আছে তার, স্লেট পেনসিল আছে। বাক্য লিখতে পারে, নামতা লিখতে পারে, দ দিয়ে টিয়েপাখি আঁকতে পারে। এটা মা শিখিয়ে দিয়েছেন।
দ-এর হলো মাথাব্যথা
হেকিম এলেন বাইশ জন
বসতে দিলাম পিঁড়ে
হেকিম দিলেন বড়ি
মাথা ধরা সেরে গেল
হয়ে গেল টিয়ে।
খুব মজার এটা, খুব মজার। অনু যে কতবার স্লেটে এঁকে দেখাল টেডিপিসিকে। সব বার টেডিপিসি চোখ বড়ো করল।
রাতে খেতে বসে বাবা বললেন, ‘অনু মিয়া?’
‘হুঁ।’
‘স্কুলে ভর্তি হবেন?’
‘হ্যাঁ-এ-এ।’
‘রোজ স্কুলে যেতে হবে কিন্তু।’
‘যাব।’
‘একা যেতে হবে।’
‘যাব।’
‘ভেরি গুড।’
পরদিন বাবা তার ফার্মেসি খুললেন। কদিন পর শহরের গাঙপাড়ের ইশকুল, রাজগোবিন্দ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দিলেন অনুকে। ইয়া মোটা একজন মানুষ, পানজাবি আর লুঙ্গি পরে আছেন, খাতাপত্রে অনুর নাম তুলে বাবাকে বললেন, ‘তোর ছেলে এত বড়ো হয়ে গেছে! তুই না এই সেদিন এত বড়ো ছিলি! হরিদাদার ধুতির খুট ধরে এসে ইশকুলে ভর্তি হয়ে গেলি।’
বাবা হেসে বললেন, ‘জি, স্যার।’
‘তাহলে বাবু অয়নাংশ কর্মকার, তোমার রোল নাম্বার হলো উনত্রিশ। ঠিক আছে?’
অনু মাথা দোলাল।
বাবা বললেন, ‘জি, স্যার, বল!’
অনু বলল, ‘জি, জি স্যার!’
বাবা বললেন, ‘সালাম কর স্যারকে।’
অনু পায়ে হাত দিয়ে সালাম করল স্যারকে। স্যার মাথায় হাত দিয়ে দোয়া করলেন, ‘দোয়া করি, বাপের মতো, দাদার মতো ভালো মানুষ হও।’
অনুর দাদা স্বর্গীয় হরিশংকর কর্মকার। তাদের গ্রামের প্রথম বিএ পাস মানুষ। অনুর বাবা দীপেন কর্মকার সেই হরিশংকর কর্মকারের একমাত্র ছেলে। মেট্রিক এবং হায়ার সেকেন্ডারিতে ফার্স্ট ডিভিশন পেয়েছিলেন। ইংলিশে অনার্স, তাও ফার্স্ট ক্লাস। অভাবের সংসার। আর পড়াশোনা করতে পারেননি। অল্প পুঁজি নিয়ে, ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসা শুরু করে দিতে হয়েছে। ফার্মেসি, ওষুধের ব্যবসা। এখন নুন আনতে পানতা ফুরায় না আর।
রাজগোবিন্দ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথমদিন অনুর বন্ধু হলো তিনজন। মান্না, অমিয় এবং ফরিদ। তিনটা ক্লাস হলো প্রথম দিন। বাংলা, ধারাপাত এবং হাতের লেখা। প্রথম ক্লাসটা নেবেন হাতি স্যার। থার্ড বেঞ্চের দাঁত উঁচু একটা ছেলে বলল। অনু ভাবল, হাতি স্যার!
তারা, মান্না, অমিয়, ফরিদ এবং অনু, সেকেন্ড বেঞ্চে বসেছে, কথা বলছিল, এই সময় ঘণ্টা পড়ল ক্লাসের।
মান্না ফিসফিস করে বলল, ‘দেখ।’
অনু তাকিয়ে হাতি স্যারকে দেখল। আরে ইনি তো বাবার সেই স্যার! এনার নাম কি হাতি নাকি? দুর! হাতি কখনও মানুষের নাম হয়? অনু আর চিন্তা করতে পারল না, হাতি স্যার ক্লাস রুমে ঢুকলেন। নিস্তব্ধ হয়ে গেল গোটা ক্লাস রুম। হাতি স্যার তার চেয়ারে বসলেন। টেবিলে খাতা, চক, ডাস্টার রাখলেন। তাকিয়ে ক্লাসরুম জরিপ করলেন খানিক। এই সময় কেউ ফিক করে হাসল। হাতি স্যার বললেন, ‘অ্যাই কেরে? কেরে তেলাপোকা?’
কেউ তেলাপোকা হওয়ার দায়িত্ব নিল না। হাতি স্যার বললেন, ‘আচ্ছা, দেখছি। আগে সবকটার নাম জেনে নিই, নাকি? নাম ডাকি।’
বলে হাতি স্যার নামের খাতাটা খুললেন।
‘হারুনুর রশীদ।…এই কে? হারুনুর রশিদ কে? উঠে দাঁড়া।’
ফার্স্ট বেঞ্চের একটা ছেলে উঠে দাঁড়াল।
‘ও, তুই। উপস্থিত স্যার বল।’
ছেলেটা বলল না।
‘এই যে খলিফা হারুনুর রশিদ, উপস্থিত স্যার বলেন, জাঁহাপনা। আচ্ছা শোন, আমি যখন তোদের নাম ধরে ডাকব, তোরা উঠে দাঁড়িয়ে বলবি উপস্থিত স্যার, বুঝলি? কেউ উপস্থিত না বললে তার নামের পাশে কাটা দাগ পড়ে যাবে, বাবা। নামের পাশে কাটা দাগ পড়া কিন্তু ভালো কিছু না মোটেও। যত কাটা দাগ, তত বিপত্তি। তোরা কি বুঝতে পেরেছিস? নাম ডাকি কেমন? হারুনুর রশিদ।’
হারুনুর রশিদ বলল, ‘উপস্থিত, স্যার।’
‘আবু আলী তৈয়ব?’
‘উপস্থিত, স্যার।’
‘শাহ আবু জামান।’
‘উপত্তিত।’
হি হি করে হেসে উঠল গোটা ক্লাসরুম।
‘অ্যাই!’
সঙ্গে সঙ্গে আবার চুপচাপ গোটা ক্লাসরুম।
হাতি স্যার বললেন, ‘হাসলি কেন তোরা? এটা তো খুবই দুঃখজনক ব্যাপার। একসঙ্গে তোরা অনেক বছর পড়বি, একজনকে আরেকজনের ভাই হবি, বন্ধু হবি, তোদের ভাই বন্ধু এরকম হলে তোরা হাসবি? এরকম আচরণ করাটা অন্যায়! মনে থাকবে?’
‘মনে থাকবে, স্যার।’
গোটা ক্লাস একসঙ্গে বলল।
হাতি স্যার বললেন, ‘মনে রাখিস। আচ্ছা, মুহম্মদ নজীর হোসেন।’
‘উপস্থিত, স্যার।’
‘শান্তনু ভট্টাচার্য?’
‘উপস্থিত, স্যার।’
হঠাৎ অনু তার নাম শুনল।
‘অয়নাংশ কর্মকার?’
অনু উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘উপস্থিত, স্যার।’
‘সাজ্জাদ হোসেন।’
‘উপস্থিত, স্যার।’
‘রণজিৎ কুমার ধর।’
‘উপস্থিত, স্যার।’
গলা শুনে ঘুরে তাকিয়ে আশ্চর্য হলো অনু। পিংকু!
হাতি স্যার বললেন, ‘বাবা রণজিৎ কুমার ধর।’
পিংকু বলল, ‘জি, স্যার?’
‘যুদ্ধের আগে দুই বছর তুই এই ক্লাসে ছিলি। দেশ স্বাধীন হয়ে গেল, তাও এই ক্লাসের মায়া ছাড়তে পারলি না? ভালো। কিন্তু স্বাধীন দেশে তো দুই বছর এক ক্লাসে থাকা যাবে না, বাবা। এর জন্য কি ছেলেপুলেরা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে? স্বাধীন দেশে ক্লাসের পরীক্ষায় ফেল করা তো খুবই লজ্জার। স্বাধীন দেশের প্রথম ক্লাস ওয়ান তোরা।’
স্কুল ছুটির পর মান্না বলল, হাতি স্যারের ছেলে কামরুজ্জামান ভাই শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করে মরেছেন। ডলুরা এলাকায়। ছেলের জন্য স্যারকেও ধরে নিয়ে গিয়েছিল হানাদার বাহিনী। নির্মম অত্যাচার করেছে।
ধারাপাত ক্লাস নিলেন মন্টু স্যার।
হাতের লেখার ক্লাস আবদুর রউফ স্যার।
ছুটির ঘণ্টা পড়ল, ঢং! ঢং! ঢং!
হা-রে-রে করে এই ক্লাসের ওই ক্লাসের দরজা জানালা দিয়ে ছিটকে বের হলো ছেলেরা। অনু বের হয়ে স্কুলের গেটে তার বাবাকে দেখল। বাবা বললেন, ‘ক্লাস কেমন হলো?’
‘ভালো।’
‘গুড। ক্ষুধা লেগেছে?’
অনু বলল, ‘নাহ্।’
বাবা বললেন, ‘বাজারে যাবি?’
‘বাজারে কী?’
‘বাজারে? কত কী! যাবি?’
‘যাব।’
‘গুড।’
বাবা হাঁটতে হাঁটতে অনুকে নিয়ে বাজারে ঢুকলেন। বাজারের দোকানপাট সব এখনও খোলেনি। বন্ধ একটা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে বাবা বললেন, ‘সাইন বোর্ডে কী লেখা পড় তো?’
অনু বানান করে পড়ল, ‘ন-এ য ফলা আ-কার শ.. শ.. ন-এ আ-কার-আর ল…।’
বাবা হাসলেন, ‘কী হলো? ন্যাশনাল। ন্যাশনাল ফার্মেসি।’
অনু বলল, ‘ন্যাশনাল ফার্মেসি!’
বাবা বললেন, ‘হ্যাঁ। এটা হলো আমাদের দোকান, বুঝলি?’
বাবা তালা খুললেন দোকানের দরজার। অনু এই প্রথম তাদের দোকান দেখল। ওষুধের শিশিতে ঠাসা দোকান। আলমারি ভর্তি ওষুধের শিশি। বাবা একটা চেয়ারে বসে বললেন, ‘বস।’
অনু একটা ছোটো টুলে বসল। এই সময় একজন দোকানে ঢুকলেন। বয়স্ক মানুষ। বাবার থেকে বড়ো হবেন তবে ভাইয়ের থেকে ছোটো হবেন। বললেন, ‘দোকান খুলতে আজ দেরি যে, দীপেন।’
‘ছেলেকে স্কুল থেকে নিয়ে এলাম, মোসাদ্দেক ভাই।’
‘স্কুল থেকে নিয়ে এলে মানে? তোমার ছেলে স্কুলে ভর্তি হয়ে গেছে! কী বলো? এই সেদিন জম্মাল হারু, কাল দেখি দিতে আসল ঝাড়–। হেঁ হেঁ হেঁ। ছেলে, ইনিই তো?’
বাবা বললেন, ‘জি।’
মোসাদ্দেক ভাই বললেন, ‘এই ছেলে, আমি তোর মোসাদ্দেক কাকা, তোর বাপের আট বছরের বড়ো। আদাব সালাম দে।’
অনু উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আদাব।’
‘আদাব। আদাব। বস ব্যাটা তুই।’
বলে মোসাদ্দেক কাকা একটা চেয়ারে বসলেন। অনু আবার টুলে বসল। বাবা বললেন, ‘চা খান, মোসাদ্দেক ভাই।’
‘দিতে বল।’
বাবা বললেন, ‘চা খাবি অনু?’
খেতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু অনু ‘না’ করল।
বাবা চেঁচিয়ে বললেন, ‘ডাম্বেল, দুইটা।’
ডাম্বেল! নাম কারোর? হ্যাঁ। ন্যাশনাল ফার্মেসির উল্টোদিকে চায়ের দোকান তার। বাবার ডাক শুনে বলল, ‘দিচ্ছি। ডাম্বেলের চা, জয় বাংলা চা।’
মোসাদ্দেক চাচা বললেন, ‘আচ্ছা কাণ্ড! সব জয় বাংলা হয়ে যাচ্ছে এখন। জয় বাংলা চা। বুদ্ধি আছে ডাম্বেলটার মাথায়। তা দীপেনের ছেলে, নাম কী রে তোর?’
অনু বলল, ‘অনু।’
‘শুধু অনু? আর কিছু না? স্কুলের নাম বল।’
‘অয়নাংশ কর্মকার।’
‘অয়নাংশ। অয়নাংশ অর্থ কী বল তো?’
জানে না অনু। হা করে থাকল।
‘অয়ন হলো সূর্যের ভ্রমণপথ বুঝলি। অয়নাংশ হলো সূর্যের ভ্রমণপথের অংশ। বোঝা গেছে?’
বোঝা গেছে। একটু একটু।
ডাম্বেল চা নিয়ে এলো। মোসাদ্দেক কাকা চা নিয়ে বললেন, ‘সাবু মিয়া নয় বার্লি মিয়াকে একটু ডেকে দিয়ে যা তো ডাম্বেল।’
সাবু মিয়া! বার্লি মিয়া! বাজারের সব মানুষের নাম কী এমন অদ্ভুত? ডাম্বেল, সাবু, বার্লি! ডাম্বেল বলল, ‘ডেকে দিচ্ছি। আগে চায়ে একটা চুমুক দিয়ে বলেন।’
‘কী বলব?’
‘ফাস ক্লাস বলেন।’
মোসাদ্দেক কাকা চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, ‘ফার্স্ট ক্লাস!’
ডাম্বেল বলল, ‘জয় বাংলা চা, নাম ঠিক আছে?’
‘খুব ঠিক আছে।’
ডাম্বেল দুইপা গিয়ে কিছু দেখল। ফিরে বলল, ‘মিয়া, বার্লি মিয়াকে তো দোকানে দেখি না। সাবু মিয়া, তাকেও দেখি না।’
‘কাকে দেখিস?’
‘মেকুড় ভাই…ইয়ে. জামরুল ভাইকে।’
ডাম্বেল, সাবু, বার্লির পর জামরুল!
মোসাদ্দেক কাকা বললেন, ‘ওকেই ডেকে দে।’
ডাম্বেল ডাক দিল, ‘জামরুল ভাই। ও জামরুল ভাই! ঘুমাও নাকি? ও জামরুল ভাই!…মিয়া ডাকেন যে। বাবুর দোকানে।’
অনু রাস্তায় ছোটোকাকুকে দেখল। রিকশায় যাচ্ছে।
‘ছোটোকাকু, বাবা!’
অনু বলল।
বাবা দেখলেন এবং ডাক দিলেন, ‘এই বিজু!’
রিকশা থামিয়ে নেমে এলো ছোটোকাকু। ডাম্বেল তার দোকানে গিয়ে বসল। অনু আরেকটা মানুষকে দেখল। ছোটোখাটো, ছোটোকাকুর বয়সি, মিশমিশে কালো। চোখ দুটো লাল। ঘুম থেকে উঠেছে।
মোসাদ্দেক কাকা বললেন, ‘জামরুল?’
এই তবে জামরুল। বলল, ‘জি?’
‘তুই কি জাগন্ত? নাকি ঘুমন্ত?’
‘জি।’
‘জি মানে? ভালো। দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে, তোরাও স্বাধীন হয়ে গেছিস। দুইজন দোকানে থাকে না। একজন ঘুমায়। ভালো। এই হারামজাদা, চোখে পানি দে।’
‘জি।’
বলে জামরুল চলে যেতে নিচ্ছিল, মোসাদ্দেক কাকা বললেন, ‘যায় কোথায়? এই!’
‘জি। চোখে পানি দিতে বললেন।’
‘পরে দে, গাধা কোথাকার! রুল টানা একটা ছয় দফা খাতা আর একটা কাঠপেনসিল দিয়ে যা আগে।’
‘জি।’
ঘুরে হাঁটা দিল অর্ধেক ঘুমন্ত জামরুল।
বাবা বললেন, ‘বিজু কি বাসায় যাচ্ছিস? অনুকে নিয়ে যা তাহলে।’
অনু বলল, ‘তুমি বাসায় যাবে না?’
বাবা বললেন, ‘পরে।’
‘পরে কখন?’
‘কখন আবার, রাতে।’
‘আমি কিন্তু ঘুমাব না।’
‘ঘুমাবি না কেন? ঘুম ধরলে ঘুমিয়ে পড়বি।’
‘না। তুমি বাসায় ফিরলে ঘুমাব।’
‘আচ্ছা। ছোটোকাকুর সঙ্গে চলে যা এখন।’
ছোটোকাকু বলল, ‘চল, অনু।’
অনু উঠল।
মোসাদ্দেক কাকা বললেন, ‘আরে! আরে! এক মিনিট! বিজু একটু আমার দোকানে যা তো। জামরুল গাধাটাকে কান ধরে টেনে নিয়ে আয়।’
ছোটোকাকুকে যেতে হলো না, জামরুলকে দেখা গেল আবার। হাতে কী?
মোসাদ্দেক কাকাও বললেন, ‘হাতে কী তোর?’
জামরুল বলল, ‘চকের বাক্স। আনতে বললেন না?’
‘চকের বাক্স! আমি তোকে চকের বাক্স আনতে বলেছি? ডাস্টার আনতে বলিনি?’
‘জি না, ডাস্টার আনতে বলেননি।’
‘দেখেছ দীপেন, এই হারামজাদা ছেলেরা আমার ব্যবসায় লাল বাতি না জ্বালায় তো…। গাধার গাধা, তোকে আমি একটা ছয় দফা খাতা আর একটা কাঠপেনসিল আনতে বলেছি।’
‘অ।’
‘আবার বলে অ। বিজু, তুই গাধাটার সঙ্গে যা তো।’
ছোটোকাকু গেল এবং খাতা আর কাঠপেনসিল নিয়ে ফিরল। মোসাদ্দেক কাকা খাতা পেনসিল নিয়ে অনুকে বললেন, ‘ধর ব্যাটা।’
বাবা বললে, ‘কী করেন, মোসাদ্দেক ভাই? মাত্র তো স্কুলে ভর্তি হলো ছেলে। এখন খাতায় কী লিখবে?’
‘যখন লিখার তখন লিখবে।’
অনু কিন্তু খুবই খুশি হলো। লাল রঙের কাঠপেনসিল। কেটে নিতে হবে। খাতা ছোটো সাইজের। মলাটে বড়ো করে লেখা ছয় দফা এবং যে মানুষটার ছবি দিয়েছে, তাকে এখন চেনে অনু। জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান! খাতায়ও অবশ্য লেখা আছে সেটা।
রিকশায় উঠে বসে অনু বলল, ‘মোসাদ্দেক কাকা কি করেন, ছোটোকাকু?’
‘কেন তুই তার দোকান দেখিসনি? তোদের দোকানের দুই দোকান পরেই তো। রহমান এন্ড ব্রাদার্স। ইশকুলের বই, খাতাপত্র, পেনসিল, ইরেজার এসব পাওয়া যায়।’
‘অ। সাবু মিয়া, বার্লি মিয়া, জামরুল, এরা কারা?
‘সাবু, বার্লি মোসাদ্দেক ভাইয়ের ছেলে। জামরুল ভাতিজা। সাবু, বার্লির বড়ো ছিল আপেল ভাই।’
‘সে মোসাদ্দেক কাকার দোকানে বসে না?’
‘ছিল বললাম না। আপেল ভাই মুক্তিযোদ্ধা ছিল। যুদ্ধের সময় গভীর রাতে একদিন মাকে দেখতে এসেছিল শহরে, ধরিয়ে দেয় তোফা রাজাকার।’
এই কদিনে এই রাজাকারের কথা অনেকবার শুনেছে অনু। যুদ্ধের সময় হানাদার বাহিনীর পক্ষ নিয়েছিল এদেশের কিছু ‘নরাধম।’ এরা হলো রাজাকার, আল-বদর। হানাদার বাহিনীর ‘পাওয়ারে’ এরা নির্মম অত্যাচার নির্যাতন করেছে মানুষকে। ধরিয়ে দিয়েছে অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে। হানাদার বাহিনী নির্দয়ভাবে হত্যা করেছে সেইসব মুক্তিযোদ্ধাদের।
মোসাদ্দেক কাকার ছেলে আপেল ভাইকেও তবে হত্যা করেছে হানাদার বাহিনী!
এত যে মানুষের অনিষ্ট করেছে, তোফা রাজাকারের শাস্তি কি হয়নি? হবে না? দিন দুপুরে কুয়ায় পড়ে সে মরেছে। একথা পিংকু বলেছে অনুকে। ‘নরাধম’, ‘পাওয়ার’ এসব কথাও বলেছে। ভদ্রদের বাসার ভজনদার সঙ্গে উত্তর পাড়ায় গিয়েছিল পিংকু। তোফা রাজাকারের কুয়া দেখে এসেছে। অনুকে নিয়ে যাবে দেখাতে একদিন। অনু অবশ্য বলেছে যাবে না। মা বকবেন। পিংকু বলেছে, ‘মামিকে না বললেই হলো।’
‘না। মাকে না বলে আমি কোথাও যাই না।’
‘ও বাবা! তবে মায়ের কোলে বসে থাক গিয়ে। দুনিয়াদারি আর দেখতে হবে না।’
না দেখতে হলে নাই। মাকে না বলে দুনিয়াদারি দেখার কোনো দরকার নাই অনুর।

১৭.
ছয় দফা খাতা অনু মাকে দেখাল।
‘মা! দেখো!’
মা বললেন, ‘খাতা তোকে কে কিনে দিয়েছে? তোর বাবা? কাণ্ডজ্ঞান আর হলো না মানুষটার। তুই কি এখন খাতায় লিখিস?’
‘বাবা না মা, মোসাদ্দেক কাকা দিয়েছেন।’
‘মোসাদ্দেক ভাই দিয়েছেন।’ বলে মা চুপ করে গেলেন।
অনুর মনে হলো কিছু মনখারাপ হয়ে গেছে মায়ের।
‘তোমার কি মনখারাপ হলো? মা? মোসাদ্দেক কাকার ছেলে আপেল ভাইয়ের জন্য মন খারাপ হলো?’
মা বললেন, ‘আপেলের জন্য? না অনু। তার জন্য মন খারাপ কেন করব? যুদ্ধ করে শহীদ হয়েছে ছেলেটা। তার জন্য তো আমরা অহংকার করব। মন খারাপ করব কেন?’
অনু মায়ের কথা অত বুঝল না। এছাড়া তাড়া আছে তার। ছয় দফা খাতা এক্ষুনি দেখাতে হবে টেডিপিসিকে।

টেডিপিসি দেখে বলল, ‘তোর তো মোটে একটা! আমার ছয় দফা খাতা তিনটা।’
‘ইহ্! দেখি।’
টেডিপিসি দেখাল। সত্যি তিনটা জয় বাংলা খাতা! রুল টানা দুটো, সাদা একটা। একটা রুল টানা খাতায় বাংলা, একটা রুলটানা খাতায় ইংরেজি লিখেছে টেডিপিসি। সাদা খাতার অংক লিখেছে। কাঠপেনসিল আছে টেডিপিসিরও। জ্যামিতি বক্সে। খাতায় অবশ্য লিখেছে নিবকলম দিয়ে। অনু কি কাঠপেনসিল দিয়ে লিখবে? কী লিখবে? লিখতে পারবে?
‘পারবি না কেন?’
টেডিপিসি বলল।
‘পারব?’
‘খুব পারবি।’
কাঠপেনসিলটা কেটে দিয়ে টেডিপিসি খাতায় লেখা শেখাতে বসল অনুকে। স্লেটে যথেষ্ট ভালো লিখতে পারে অনু, খাতায় লিখতে গিয়ে কিছু গ-গোল করল। রুলটানা খাতা। কিছু এবড়ো খেবড়ো হয়ে গেল অক্ষর। তাতে কী? টেডিপিসি হাতে ধরে শেখাল। রুলটানা খাতায় অনু প্রথম যে বাক্যটা লিখল, সেটা হলো, আমি বই পড়ি। টেডিপিসি লেখাল বলে লিখল।
কয়েকদিন বা কয়েক মাসে, আরও অনেক বড়ো হয়ে গেল অনু। আবার শীত পড়ল তাদের শহরে। কনকনে ঠা-া এবং কুয়াশা। বার্ষিক পরীক্ষার পরপরই ইশকুলে শীতের ছুটি পড়ে গেল বলে রক্ষা। পারতে মানুষ ঘরের বার হয় না, ইশকুলে যাবে কী করে ছেলেপুলেরা? টেডিপিসিদের ইশকুলও ছুটি।
টেডিপিসি অনুদের ঘরে ছিল এতক্ষণ। মাত্র উঠেছে। রাত এখন কটা? নয়টার কম না। শীত বলে মনে হচ্ছে রাত নিশুতি। বাবা ফিরছেন না কেন এখনও? শীতে আটকা পড়েছেন?
মায়ের দেখি কোনো দুশ্চিন্তাই নাই। বই পড়ছেন। এক মিনিট, দুই মিনিট, কত মিনিট, খুব ঘুম ধরে যেতে থাকল অনুর। বাবা কখন ফিরবেন? কখন? কখন? ঘুম চোখে অনু তার ছয় দফা খাতায় এই প্রথম একটা চিঠি লিখল তার বাবাকে।
পিয় বাবা,
কেনম আছ?
কখন ফিবে? আমি ঘুমাই।
জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান।
ছয় দফা। জয় বাংলা।
হতি তোমার অনু।

আমার কথা
চিঠির ভুলগুলো অনু করেছে। ‘প্রিয়’কে ‘পিয়’ লিখেছে। ‘কেমন’-কে ‘কেনম! ‘ফিরবে’ লিখতে নিয়ে ‘ফিবে’ লিখেছে। ‘ইতি’ লিখতে গিয়ে ‘হতি’। আমি এসব কিছু ঠিক করতে গেলাম না। থাক। অনুর লেখা অনুর মতোই থাক। জয় বাংলা!

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা