ঈদ সংস্কৃতির রূপান্তর

আগের সংবাদ

এক ঠোঙা তারা

পরের সংবাদ

অগ্নিভস্মের কাল

প্রকাশিত হয়েছে: মে ৩১, ২০১৯ , ৬:২৬ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুন ২, ২০১৯, ৫:২০ অপরাহ্ণ

অনলাইন প্রতিবেদক

(প্রথম অগ্নি)

তিনি এলেন। তিনি আবির্ভূত হলেন। পলাশী যুদ্ধের পর দুইশত বৎসর তার প্রতীক্ষায় ছিল ওরা। অবশেষে তার জন্ম হলো মহাকাশ ছোঁয়া লেলিহান মহা অগ্নিকু- থেকে। উনিশ শত সাতচল্লিশ সালের মধ্য অগাস্টের ঘোর অমাবস্যার নিকষ অন্ধকার রাতে। ঠিক মধ্যরাতের প্রহরে। যারা তার আবির্ভাবের প্রতীক্ষায় ছিল তারাও ঠিক জানে না তিনি কে? ঘোরকৃষ্ণবর্ণ পুরুষ, অজানুলম্বিত লোমশ বাহু। দৈত্যাকৃতি শরীর, নীল অগ্নিময় চোখের তারা।

বিস্ময় এই, তার কৃষ্ণবর্ণ শরীর রাতের আকাশের সবটুকু অন্ধকার গ্রাস করে নেয়। সারাটা আকাশ তার কৃষ্ণবর্ণ শরীরে স্থির হয়ে থাকে। সেই সূর্য আর চন্দ্রগ্রাসী ভয়াল অগ্নিপুরুষের মস্তকে যে কেশগুচ্ছ তার বিস্তার কাঁধ অবধি। নিরবসন সেই পুরুষের নাভিদেশে এক কর্তিত নরমুণ্ডু । স্পষ্ট বুঝা যায় সেই পুরুষ মৃত্যু এবং ধ্বংসের মহা শক্তি। মুখ তার কঙ্কাল স্তূপের মতো নিরস বিষণ্ন।
তিনি কে? কেউ তা জানে না। বাংলার শেষ নবাবের মৃত্যু স্মৃতিবাহী মানুষগুলো তারই আগমনের আপেক্ষায় ছিল কি? উত্তর অজানা। কেমন করে তার আবির্ভাব? নগরবাসী ধর্মশালার ঘণ্টাধ্বনি আচমকাই শুনতে পায়। একি তার আগমন বার্তা? দুয়ার খুলে অন্ধকার রাত দীর্ণ করে দিগি¦দিক জ্ঞানশূন্য হয়ে রাজপথে নেমে পড়ে নগরবাসী। ওরা নগরীর মধ্যবিন্দুতে যে শূন্য মাঠ রয়েছ সে দিকেই ছুটতে থাকে। সেখানেই এক অগ্নিকুণ্ড। অগ্নিকু- নগরীর যে অংশে তাতে এখন মহানন্দের কোলাহল। তিনি বুঝি এসে গেছেন দুই শত বৎসরের নাগবন্ধন থেকে তাদের মুক্ত করতে। অথচ কি আশ্চর্য, নগরীর অন্য অংশে তখন স্তব্ধতা খাঁখাঁ করছে। হঠাৎ কারো কান্না কিংবা বিলাপের ধ্বনি। কিন্তু মানুষের কায়া অদৃশ্য।
জনৈক প্রবীণ নগরবাসী। তিনি ত্রিকালজ্ঞ। অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ। সম্রাটদের কালের আখ্যান স্মৃতি তিনি ধার করেছেন পূর্ব পুরুষদের বয়ান থেকে, বর্তমানের সাক্ষী স্বয়ং, ভবিষ্যৎ তার তৃতীয় নয়ন। তাই অগ্নিকু-ের ভেতর থেকে কীভাবে অগ্নিপুরুষের আবির্ভাব ঘটেছে তার প্রথম সাক্ষী তিনি। দ্রুত ঘটে যাওয়া ঘটনা তার স্মৃতিতে আবদ্ধ করেন তিনি। তার মনে হলো এই অগ্নিকু- একটি মহাকালের অগ্নিপথ। উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম। এ বুঝি দোজখের অগ্নিসর্পের দুনিয়ার জমিনে আগমনের কাল সমাগত। লক্ষ কোটি অগ্নি সর্পের লম্ফকে ফণা জমিন থেকে আসমানে দোলায়মান। মাঝখানে উত্তর গোলার্ধের অতলস্পর্শী গ্রেট ক্যানিয়নের পথ। ক্যানিয়ন পথটি মানুষের আজো অগত্য। আর যখন তার চোখের সামনেই অগ্নিপুরুষের জন্ম, তখনই বুঝে ফেলেন যার প্রতীক্ষায় ছিল নগরবাসী তিনি সেই। অগ্নিকু-টি সৃষ্টি হয় তাকেই জন্ম দিতে। প্রধান ব্যক্তি বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে দেখলেন আচমকা আসমানের অন্ধকারের সামিয়ানা বিদীর্ণ করে মহাকাশ থেকে অগ্নিকু-ে ঝরে পড়ছে অযুত-নিযুত স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা। মুদ্রার পাহাড়। সেই পাহাড় ঘিরে অগ্নিবলয়। আগুনের আলো, মুদ্রা থেকে বিচ্ছুরিত আলো মিলে সৃষ্টি হয় অপার্থিব রংধনু। বিস্মিত প্রবীণ বিড়বিড় করেন, ‘মুদ্রা, তারই নাম ঈশ্বর। গরিবের ঈশ্বর, ধনীর ঈশ্বর, বণিকের ঈশ্বর।’
তখনই সমুদ্রে প্রবল ভূকম্পন সৃষ্টির পর জলের গভীর তলদেশ বিদীর্ণ করে নতুন ভূখ- জেগে উঠার মতো মুদ্রার পাহাড় ফেটে আবির্ভাব ঘটে অগ্নিপুরুষের। প্রবীণ ব্যক্তি তফাতে দাঁড়ানো ভয়ার্ত নগরবাসীকে উচ্চগলায় জানান, ‘আখেরি জামানা, সোনার টাকা, রুপার টাকার কাল সমাগত। তোমরা দেখো মানুষের রক্তের ¯্রােতে, কংকালের পর্বতে ঝলমল করছে সোনার মোহর।’
স্তব্ধ জনতার ভেতর থেকে প্রতিবাদ করে জনৈক ব্যক্তি, ‘এসব কি বলছেন আপনি? রাতের পর রাত আমরা খোয়াব দেখলাম কুদরতি এক নয়া দেশের? সুখ-স্বপ্ন কি মিথ্যা? কোথায় সেই পাক জমদুরিয়াত? এটাই কি?’
প্রধান মানুষটি নিরুত্তর। তিনি স্থান পরিত্যাগ করেন। নগরীর গুহার মতো শীর্ণ গলির অন্ধকার ছায়াচ্ছন্নতায় হাঁটছেন। হঠাৎ তার কানে আসে অনেকগুলো পায়ের আওয়াজ। অমানিশার অন্ধকারে অন্ধকার বর্ণের চেয়েও শ্মশানের অর্ধপোড়া জীবন্ত লাশের মিছিল। আর তখন অনতিদূর থেকে আবির্র্ভূত অগ্নিপুরুষের কণ্ঠের বজ্রনির্ঘোষ ধ্বনিত হয়, ‘আমি অযোনিসম্ভূত, কোনো নারীরগর্ভে আমার জন্ম হয়নি, নারীকে আমি ঘৃণা করি, দ্বীপদেশের বণিকেরা জানে আমার জন্ম রহস্য। নগরবাসী আমার অনুগত দাস মাত্র।’
অনতিদূরে যে বন্দর নদী, বিশাল বাণিজ্য জাহাজ, তা থেকে দক্ষিণে ইস্পাতের পাচিল ঘেরা সুরক্ষিত যে টাকশাল তার শীর্ষদেশে অগ্নিজাতকের বজ্র নির্ঘোষ ধ্বনিপুঞ্জ আছড়ে পড়ে। ধ্বনির রূপান্তর ঘটে। ইস্পাতের তরবারিতে একটার পর একটা নরমু- ছেদনের মতো ঝপাং শব্দ এবং রক্তে স্ফুলিঙ্গের মতো শিস্্-শিস্্ শব্দ কালো আসমান ভিজিয়ে দেয়। সেই রক্তে ভেজা আসমানের নিচে যে নগর তাতে অগ্নুৎপাত ঘটে। মাটি নয়, পাথর নয়, ধাতব পদার্থ নয়, জ¦লন্ত ইস্পাতে তৈরি অগ্নিময় শরীরের অগ্নিজাতক নগর পরিভ্রমণে পা ফেলেন। পৌরাণিক দেবতা শ্মশানচারী রুদ্র শিবের মতো তার হাতে ডমরু। ডুগ-ডুগ নয়, বরং ধ্রিস ধ্রিস শব্দ নাচে তাতে। এ যেন ধ্বংসের কাল। মহাপ্রলয়-কিয়ামতের আখেরি জামানা। ভস্মীভূত হবে কি নগর? তাহলে মানুষ?
ওই তো একজন মানুষ। জীর্ণ শরীর। ধনুক বাঁকা শরীর দোলায়মান। হাতে নবী মুসার মতো সর্পাকৃতি যষ্ঠি। প্রাণ রক্ষার্থে পলায়নপর। মানুষটি নারী না পুরুষ? না, তিনি নারীও নন, পুরুষও নন। অর্ধনারীশ্বর। এই জ¦লন্ত নগরীর নারী আর পুরুষের মাংসপি-ের মিলিত প্রেত-প্রচ্ছায়। তিনি পরিত্যাগ করছেন তার তৃতীয় পৃথিবী। প্রথম-দ্বিতীয় পৃথিবী তার স্মৃতি। সে সবের অস্তিত্ব হারিয়ে গেছ মহাকালে। পেছন থেকে দেখলে তাকে অর্ধনারীশ্বর বলে ভ্রম হলেও, সামনে থেকে দেখলে স্পষ্ট বুঝা যায় তিনি হিমালয় নিবাসী দেবতা শিব। পিতা কর্তৃক পতি নিন্দায় অম্মানিত অত্মঘাতী সতী বা দেবী দুর্গা। স্বামী শিব তার লাশ বহন করছে কাঁধে।
এসবই প্রহেলিকা মাত্র। আসলে এই মানুষটি প্রাচীন এই নগরীর জনৈক প্রৌঢ় নাগরিক। গৃহদাহে আপনজনেরা পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেলে অবশিষ্ট ছিল এই যুবতীকন্যা। সে অর্ধদগ্ধা। কিন্তু মৃত। নগর পরিত্যাগের জন্য কন্যাকে কাঁধে করে ছুটছেন তিনি। কন্যার দগ্ধ শরীর থেকে কষ ঝরছে তার সারা শরীরে। চামড়ার পোড়া গন্ধ পচা মাছের গন্ধের মতো চারপাশে উড়ছে। এই জ¦লন্ত নগরী পরিত্যাগ করতে চান তিনি বাইবেলের ইহুদিদের মতো, মিশর ছেড়ে যারা জর্ডন নদী অতিক্রম করেছিল। কিন্তু প্রৌঢ়ের সামনে কি হাঁটছেন ইহুদিদের নবী মুসার মতো কেউ? না, কেউ না। তিনি ছন্দবেশী ঈশ্বরকে পথ প্রদর্শকের মতো সামনে হাঁটতে দেখতে চান। কিন্তু না, কেউ নেই।
দগ্ধকন্যার শরীর বহনকারী প্রৌঢ় হঠাৎ পেছনে শিবের ডমরু বাজনার শব্দ শুনতে পান। পেছন ফেরেন তিনি। কাউকে দেখতে পেলেন না। কিন্তু উত্তুঙ্গ অগ্নি শিকার ভেতর থেকে তিনি শিবের ডমরু বাজনার শব্দ স্পষ্ট শুনতে পান। তৎক্ষণাৎ তিনি রুদ্রশিব হয়ে যান। কাঁধে তাঁর সতীর দেহ। তিনি এখন বিশ্বপরিব্রাজক। সতীর লাশের খ-াংশের মতো ছড়িয়ে দিতে চান কন্যার শরীরের অংশ সারা দুনিয়ায়। কিন্তু পথ যে তার ফুরায় না। বুড়িগঙ্গা তীরের এই শহর একদিন নবাব সিরাজের ছিল, তারপর ইংরেজ। কিন্তু আজ কার? সাতচল্লিশের এই অগাস্টে কাদের এই শহর? আর যারই হোক, তার নয়। একদিন ছিল। আজ নয়। তাই অগ্নি প্রজ¦লিত এই প্রাচীন নগরী পরিত্যাগ করছেন তিনি। কেউ সঙ্গী নেই। একাকী হাঁটতে দারুণ ভয়। তাই সঙ্গী হয়েছে কন্যার পোড়া লাশ। বাকি আপনজনেরা অঙ্গার হয়ে আছে শহরের পোড়া বাড়িতে। লাশ বহনকারী পিতাকে পথ দেখাচ্ছে অগ্নিশিখার আলো। সেই অগ্নিময় আলোতে এই নিশাকালে আজই প্রথম বুঝলেন, চির চেনা এই জন্ম শহরটার মানচিত্র তিনি চেনেন না। মনে হয় হাজার মাইল দীর্ঘ এই শহর। রাজ গোখরো সাপের মতো লম্বা অলি-গলি। এমনও প্রশ্ন জাগে মনে, আপনজনেরা পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে, কাঁধে তার মৃত পোড়া কন্যার লাশ। তবে কার জন্য আত্মরক্ষা করতে চান তিনি? নিজের জন্য? কে তিনি নিজে? উত্তর পেয়ে যান সঙ্গে সঙ্গে। তিনি একজন কন্যার জন্মদাতা পিতা। মৃত পোড়া কন্যা তার ইহকাল-পরকালের অক্ষয় সম্পদ। এ সম্পদ হারালে তিনি ভিখেরি হয়ে যাবেন। তাই এ লাশ পরিত্যাগ করা যায় না। অসম্ভব।
অগ্নিময় রাত ফুরিয়ে যায়। নগরীর পথ ফুরোয় না। আসলে কাণ্ডজ্ঞানহারা এই প্রৌঢ় পিতা গোলকধাঁধায় পড়ে এ গলি ও গলি কেবলই ছুটে চলেছেন লাশ কাঁধে। একটি জনবিরল সংকীর্ণ গলির ভেতর হঠাৎ কাঁধ থেকে লাশটি পড়ে যায় তার মাটিতে। তিনি উবু হয়ে বসে পড়েন। ক্লান্তি আছে, ক্ষুধা আছে, পিপাসা আছে। আবার কিছুই নেই। কন্যার পোড়া লাশের পাশে তার সারাটা শরীর ভেঙে পড়ে। চোখ বুজে আসে। দিনগত হয়ে ঘনায়মান সন্ধ্যায় তিনি চেতনা কিংবা নিন্দ্রা থেকে জেগে ওঠেন। দেখতে পেলেন ঠিক তার পুড়ে ছাই হয়ে যাাওয়া যুবক পুত্রের বয়সী এক যুবক তার দগ্ধ শরীর কন্যার হাত থেকে সোনার বালা খুলে নিচ্ছে। অথচ তার মনে হলো সদ্য বিয়ে হওয়া তার কন্যার হাতে তার স্বামী সোহাগ করে সোনার অলংকার পরিয়ে দিচ্ছে। এ দৃশ্য তাকে এতটাই অভিভূত করে যে, তিনি কেবল বিড়বিড় করে বলেন, ‘কল্যাণ হোক, তোমরা সুখী হও।’
সন্ধ্যা গড়িয়ে নাগরিক রাত নামে। অগ্নিগ্রাসী পৃথিবীতে রাত নামে। পোড়া নগর বড় ক্লান্ত। তার দীর্ঘশ্বাস চারদিকে ধূম্রজাল তৈরি করে। আগুনেরা নেই। ধোঁয়ার গন্ধ নরমাংস পোড়া গন্ধের সঙ্গে মিশে চৌদ্দই অগাস্টের রাত এক অজাগতিক মহিমায় ডুবে যায়। প্রৌঢ় মানুষটি উঠে দাঁড়াতে চান। পারেন না। কন্যার লাশ টেনে তুলতে চান তিনি। কিছুতেই পারেন না। কারো নাম ধরে ডাকতে ইচ্ছে করে। কিন্তু কারো নাম কিংবা পদবি কোনো কিছুই স্মরণে নেই তার। তিনি বুঝতে পারেন কন্যার পোড়া লাশের চেয়ে এখন তার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান এক মুঠো খাদ্য। ক্ষুধা তাকে প্রতারিত করে, পিপাসা করে ছলনা। এই ক্ষুধা আর পিপাসার জগৎ এত যে নির্দয় ভাবতেও পারছেন না তিনি।
রাত আরো গভীর হলে তন্দ্রাচ্ছন্নতার ভেতর তিনি চারপাশে কোলাহল শুনতে পান। মানুষের নয়, অন্য জীবের। ছায়াচ্ছন্ন অন্ধকারে অন্য দুনিয়ার জীবদের তিনি দেখতে পান। ওরা চারপাশ ঘিরে তার মৃতাদগ্ধ কন্যার গলিত রসালো শরীরে হামলে পড়ে। ওরা ধেড়ে ইঁদুর। অন্ধকার গর্তের দুনিয়ার নিবাসী ওরা। ক্ষুধা তাদের আগুনের চেয়ে প্রলয়ংকর। এই ভস্ম নগরীর আসমানে কি চাঁদ জেগেছে? না হলে এই অন্ধকার গলিতে জোনাক কেন নামবে? নাকি জোনাকেরাও উপবাসী। ওরাও কি খাদ্য চায়? নরমাংস? তাইতো চাঁদের জোনাক আর ইঁদুরেরা কি অবলীলায় খুবলে খাচ্ছে একটি যুবতীর চোখের মণি। ইঁদুরদের এই বৈরিতা প্রৌঢ়কে ক্রুদ্ধ করে তোলে। তাদের প্রতি হিংসায় জ¦লে ওঠেন মানুষটা। তাদের তাড়াতে চান। পারেন না। আক্রোশে মানুষটাকেই চাকুর মতো ধারালো দাঁত দিয়ে কামড়ে দেয়। পিতা বুঝতে পারেন কন্যার শরীরের মাংস রক্ষা করার ক্ষমতা তার নেই। তাই তিনি হার মানেন। ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদতে থাকেন। ইঁদুরেরা তাকে দয়া করে না। এই নগরীর ইঁদুরেরাও দয়া-মায়া শূন্য হয়ে গেছে। আসমানের চাঁদ আর মাটির জোনাকেরাও।
রাতের শেষ প্রহরে ইঁদুরেরা অদৃশ্য হয়ে যায়। চারদিক নিস্তব্ধ। জনমানুষের কোনো আলামতই নেই। নগর পেঁচা ডেকে ওঠে। বোধ করি এই নগরীর একমাত্র বেঁচে থাকা পাশের চালতা গাছে বসে ওরা ইঁদুরের সন্ধান করছে। ইঁদুরেরা ততক্ষণে পলাতক। তারপর রাতের প্রহর শেষের সবটুকু কালো ছায়া সরে গেলে প্রৌঢ় মানুষটি ঝুঁকে পড়েন দগ্ধ কন্যার শরীরের দিকে। তিনি প্রায় চিৎকার দিয়ে ওঠেন। একটি ক্ষত-বিক্ষত প্রায় মাংসহীন নরকংকাল। সেই নরকংকাল প্রৌঢ় মানুষটিকে ভয় দেখায়। তিনি ভয় পেয়ে যান। প্রাণপ্রিয় কন্যা এখন এক প্রেত শরীরের অন্য দুনিয়ার জীব। প্রৌঢ় মানুষটি তাকে পরিত্যাগ করেন। তিনি পালাতে চান। হঠাৎ মনে হলো কংকাল সদৃশ পোড়া দেহটির একটি ঘোরকালো বর্ণ হাত প্রৌঢ় মানুষটির একটি হাত খাবলে ধরে। সেই হাত ছাড়িয়ে নিয়ে তিনি হাঁটতে থাকেন। ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ক্লান্তিকে জয় করার প্রাণান্ত চেষ্টা তার। কেননা আপন প্রাণ আর বেঁচে থাকার দুর্দমনীয় মোহ তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। তিনি বাঁচতে চান শূন্যতার ভেতর। সেই শূন্যতা তাকে রক্ষা করুক, এমনি প্রবল প্রত্যাশা তাকে তাড়িত করে। কিন্তু শরীরের টাল সামলাতে ব্যর্থ হয়ে লুটিয়ে পড়েন। ঠিক তখনই বুক ভেঙে আচমকা কান্না আসে তার; মাগো, তোর পোড়া দেহ কোথায় নিয়ে যাব আমি?’

দুই.
সারা অস্তিত্বে একটি পোড়া দেহের গন্ধ ছড়িয়ে প্রৌঢ় মানুষটি নগর ছেড়ে পালাচ্ছেন। আপন শরীরের বোঝা যে এ ভারী তা আজই বুঝতে পারছেন মানুষটা। আপন শরীরের বোঝা যে মানুষকে জীবনের কোনো না কোনো দিন বইতে হয় তা আজই প্রথম বুঝলেন। এতদিন জানতেন শ্মশান কিংবা গোরস্থান যাত্রীদেরই এই দায়। তাই কষ্টসাধ্য এই জন্মনগর পরিত্যাগ যাত্রা। কিন্তু গলির শেষ প্রান্তে আসতেই আচমকা তার চোখে পড়ে রাজপথে একটি অগ্নিকুণ্ড। এক স্তূপ বিছানাপত্র আর জামা কাপড় আগুনে পুড়ছে। উচ্চ গলায় কে যেন কাকে ডাকছে। সঙ্গে সঙ্গে সমস্বরের চিৎকার নাকি জয়ধ্বনি, বোঝা গেল না। প্রৌঢ় মানুষটি ভয় পেয়ে পালাতে চান। শরীরটাকে পেছনে টেনে চলেন। এবার তিনি আত্মগোপন করতে চান। কোথায় সেই গুপ্তস্থান? না, নেই কোথাও। তিনি পুনরায় ফিরে আসেন কন্যার পোড়া আর ইঁদুরে খুবলে খাওয়া কংকালপ্রায় লাশটির পাশে। সেই লাশের সঙ্গে লাশ হয়ে শুয়ে পড়ে আত্মগোপন করেন তিনি। লাশটির প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই তার। মৃত পোড়া বীভৎস একটি লাশ তাকে প্রাণরক্ষার আশ্রয় দিয়েছে। জগতে এমন ঘটনা অকল্পনীয়। তাই সেই ক্ষত-বিক্ষত পোড়া লাশটি সর্ব ইচ্ছা পূরণকারী স্বর্গের পবিত্র বৃক্ষ অর্থাৎ কল্পতরু হয়ে যায়।
এই কল্পতরুকে কী করে পরিত্যাগ করবেন তিনি? সে তো তার ঔরসজাত কন্যা। তার দ্বিতীয় অস্তিত্ব। তাকে পরিত্যাগ করলে নিজের অস্বিত্বকেই যে অস্বীকার করা হয়। তিনি সিদ্ধান্তে আসেন যতদিন বেঁচে থাকেন ততদিন তার কাছেই রক্ষিত থাকবে কন্যার দেহাবশেষ বা কংকাল। ঠিক তখনই সামনে এসে দাঁড়ায় দু’জন পুলিশ আর ক’জন অচেনা মানুষ। তারা জোর করে লাশ তুলে নেয়। প্রৌঢ় ব্যক্তি আর্তচিৎকার দিয়ে ওঠেন, ‘করছেন কি, এ যে আমার মেয়ের লাশ।’
প্রৌঢ়কে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় পুলিশ! লাশ তুলে নিয়ে যায় ওরা রাজপথে দাঁড়িয়ে থাকা একটি খোলা গাড়িতে। দ্রুত অদৃশ্য হয়ে যায় লাশবাহী গাড়ি। প্রৌঢ় লোকটি কেবল শুনতে পান, ‘কন্যার লাশের দাবিদার পিতা নয়, নতুন জন্ম নেয়া এই দেশ। কেটে পড় তুমি।’
তা হলে এখন তিনি কি করবেন? ভস্মীভূত নগরী পরিত্যাগ করে যাবেন কোথায়? কেন যাবেন? না যাবেন না। নিজের কাছেই বিস্ময় ঠেকে তিনি এখন ভয় শূন্য। মায়া শূন্য। নিজের জন্য তো নয়ই, দগ্ধ কন্যার জন্য নয়, এমন কি পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়া স্ত্রী-পুত্রের জন্যও নয়। ক্ষুধার কাছে হার মানে অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ। কিন্তু খাদ্য কোথায়? এই নগরে কি খাদ্য আছে? আছে কেবল আগুন। আকাশে চোখ তোলেন তিনি। দূরে কোথাও বাতাসে ভাসমান ধোঁয়া দেখতে পান। কিন্তু সূর্যালোকিত নগরে বিকট ভয়ংকর রাতের সেই অগ্নিদানব কোথায়? সুুবর্ণ মুদ্রার সেই পাহাড়ই কোথায়? রাত নামলে সে কি আবার ফিরে আসবে? যদি এখন সে দৃশ্যমান হতো তবে নিশ্চয়ই তার কাছে এক মুঠো খাদ্য প্রার্থনা করতেন, ‘মাত্র একমুঠো দয়া কর।’
ক্ষুধা-তৃষ্ণা কাতর প্রৌঢ় মানুষটি নগরীর অবশিষ্ট অংশের দিকে কষ্টসাধ্য পা ফেলেন যেখানে পাকা বাড়িগুলো অগ্নিগ্রাস থেকে রক্ষা পেয়েছে। নিশ্চয়ই ওদিকে খাদ্য আছে, আছে পিপাসার জল। তার বিধ্বস্ত শরীর ভেঙে পড়ে কাঠের দরোজায়। গৃহস্বামী তাকে টেনে নিয়ে যান বারান্দায়। কিন্তু আগন্তুক জ্ঞানশূন্য। জ্ঞান ফিরতে আরো সময় দেয়। জ্ঞান ফিরলে গৃহস্বামী জানতে চান, ‘আপনি কে?’
প্রৌঢ় মানুষটি ইশারায় খাদ্য ও পানীয় প্রার্থনা করেন। খানিকটা জল গিলে বিড়বিড় ভাঙা স¦রে বলেন, ‘আমি মানুষ! তো আপনি কে?’
গৃহস্বামীও অস্ফুট স্বরে বলেন, ‘আমিও আপনার মতোই মানুষ।’ বিস্ময় এই পরস্পর অচেনা দুটো মানুষই ক্ষণ মুহূর্তের জন্য হলেও আপন আশ্রিত ধর্মকে ভুলে যান। গৃহস্বামী বুঝতে পারেন আগন্তুকের দুর্দশার কারণ। তিনি এতটাই অস্থির হয়ে পড়েন যে আগান্তুক প্রৌঢ়ের আহার গ্রহণের ভেতর বিড়বিড় করে বলা কথাটির মর্মার্থে পৌঁছতে পারেন না। কথাটি ছিল, ‘আমার মেয়ের পোড়া শরীরের গন্ধ বুড়িগঙ্গার জলও শরীর থেকে মুছে নিতে পারবে না।’
এক সময় প্রৌঢ় মানুষটি উদোম বারান্দায় ঘুমিয়ে পড়েন। এই ঘুম খুবই ক্ষণস্থায়ী। একদল মানুষের আচমকা কোলাহল ভেসে আসে গলিপথ থেকে। প্রৌঢ় জেগে ওঠেন। তিনি গৃহস্বামীর কাছে জানতে চান, ‘কিসের কোলাহল?’
গৃহস্বামী উত্তর দেন, ‘ইংরেজরা চলে গেছে, হিন্দুস্তান, পাকিস্তানের জন্ম দিয়ে গেছে ওরা।’
প্রৌঢ় মানুষটি মাথা নেড়ে বলেন, ‘ওদের মুখের বুলি আমি বুঝতে পারছি না। যাদের ওরা জন্ম দিয়ে গেছে ওরা দেখতে কি মানুষের মতন?’
গৃহস্বামী নিরুত্তর। কিন্তু পর মুহূর্তেই বলেন, ‘আমি আপনাকে আপনার বাড়ি নবাবপুর রোডের রথখোলা নিয়ে যাব’।
‘আমি যে বাড়ির নাম্বার ভুলে গেছি, হয়তো চিনতে পারব। পোড়া বাড়ি, ঘরের ভেতর মানুষের পোড়া কংকাল, আমার স্ত্রী আর ছেলে।’
‘না, না, ওসব কি বলছেন আপনি, মাথা ঠিক নেই।’
‘অথচ জানেন, আমি আমার আপনজনদের কোনো দিনই খুঁজে পাব না।’
এমনি প্রকার আরো কিছু বাক্যালাপ হয় দুজনের। তারপর এক সময় প্রৌঢ় লোকটি হারানো প্রিয়জনদের প্রত্যেকের নাম বিড় বিড় করে উচ্চারণ করতে করতে রাস্তায় নেমে আসেন। তার দেহ ও মনের ভেতর আতংক আর ভয়শূন্য দমকা ঝড়ো হাওয়া বইতে থাকে। হাওয়া আর প্রবল বৃষ্টির মিশ্রণ। দ্বৈত অভিঘাত। মানুষটির সারা শরীরে লেগে আছে আপন কন্যার পোড়া শরীরের চামড়ার গন্ধ আর আঠালো কষ। সেই কষ থিকথিকে চিটচিটে। তিনি এই নগর পেছনে ফেলে পালাতে চান। কিন্তু কেন পালাবেন? আত্মরক্ষা? হ্যাঁ, আত্মরক্ষা বটে। কার জন্য আত্মরক্ষা? প্রিয় ঘর, প্রিয়জন ভস্মীভূত। অথচ অগ্নিময় এই দুনিয়ায় একাকী তিনি বেঁচে আছেন। কিন্তু বাঁচার অর্থ কি? কিংবা মৃত্যুরইবা কোন অর্থ? জীবন আর মরণের এই দ্বৈত সংঘাতে প্রৌঢ় মানুষটি ভেঙে খান খান হয়ে যান। আতংকে তিনি নুয়ে পড়েন, পুনরায় আতংককে ঠেলে ওঠে দাঁড়াতে চান। মেরুদ- ঠক্ ঠক্ করে।
আসলে জীবন-মৃত্যুর সব অর্থই এখন তার কাছে গোলকধাঁধা। বিধ্বস্ত প্রৌঢ় নিজের লাশ নিজেই বয়ে চলেছেন। তার মনে হয় সারা দুনিয়ায় তিনিই একমাত্র মানুষ, প্রথম এবং শেষ মানুষ, যিনি আপন লাশ কাঁধে তুলে হাঁটছেন। এই নগর তাকে পরিত্যাগ করতে হবে। কেননা রাত নামলেই অগ্নিদানবের আবির্ভাব ঘটবে। অবশিষ্ট নগর গ্রাস করবে সে। কিন্তু নগরের শেষ সীমানা কোথায়? সীমানা শেষের ঠিকানা ভুলে যান প্রৌঢ়। এমনও ইচ্ছে হয় ভস্মীভূত আপন বাড়িতে অন্তত একবার ফিরে যেতে। যতদিন বাঁচবেন সেই ভস্মস্মৃতি তাকে পুরাতন জীবনের কাছে ফিরে নেবে। কিন্তু ফেরার পথের ঠিকানা যে আর কোনোদিন ফিরে পাবেন না, এমনটাই তার বিশ্বাস।
হঠাৎ প্রৌঢ় মানুষটি খেয়াল করেন দুটো কুকুর তার পিছু নিয়েছে। কি চায় ওরা? ওরাও কি গৃহহীন? ওদের বাড়িও কি ভস্মীভূত হয়ে গেছে? ওরা কেন তার শরীরের ঘ্রাণ নিচ্ছে? তাকে চিনতে চায় কি? না, এবার তিনি বুঝতে পারেন কুকুরেরা নরমাংসের ঘ্রাণ পেয়েছে। তার শরীরে আটকে থাকা দগ্ধ কন্যার গন্ধ আর শরীরের গলিত চর্বির গন্ধ। সেই ঘ্রাণ কুকুরদের ক্ষুধা-তৃষ্ণার আগুন জ¦ালাতে চায়। তাই প্রৌঢ় মানুষটি কুকুরদের প্রতি প্রতিহিংসায় জ¦লে ওঠেন। ভাঙা ইটের খ- তুলে তাদের তাড়া করেন তিনি। পর মুহূর্তেই তার মন ভেঙে পড়ে। কুকুরদের প্রতি করুণা হয় তার। মনে হয় ওরাও তার মতো প্রতিহিংসায় ভস্মীভূত গৃহেরই বাসিন্দা। ওরা গৃহহারা। তিনি তাদের করুণায় বিগলিত স্বরে ডাকেন, ‘আয়, আয় তোরাও কি ঘর হারিয়েছিস?’
কুকুরেরা তার কথায় কর্ণপাত করে না। দুটি কুকুর দু’দিকের গলির ভেতর হারিয়ে যায়। প্রৌঢ়ের করুণার ডাক হয়তো তারা বিশ্বাস করেনি। মানুষ আর কুকুরের এই পরস্পর অবিশ্বাসের ইতিহাস বড় দীর্ঘ। হয়তো মানুষ যেমনি জানে না, ঠিক কুকুরেরাও নয়। প্রৌঢ় মানুষটি এবার বুঝতে পারেন তিনি ভীষণ একা হয়ে গেছেন। একাকিত্ব বরং তাকে অধিক আতংকিত করছে। তিনি জনারণ্য চান, গণকোলাহল চান। মানুষের ভিড়ে অদৃশ্য হয়ে যাক তার দেহ। কোলাহলের ভেতর বিলুপ্ত হয়ে যাক তার মনে ভেতরের সব ভাষা।
‘তোরাও কি ঘর হারিয়েছিস? এই জিজ্ঞাসায় তাড়িত প্রৌঢ় হেঁটে চলেন। নগর পারিত্যাগ করতে হবে তাকে। এক সময় তার জিজ্ঞাসার ভেতর নতুন নতুন জিজ্ঞাসা জন্ম নেয়। আকাশের নীলে পৃথিবীর গৃহদাহের জ¦ালাময়ী ধোঁয়া উড়ে বেড়ায়। নগর ভস্মের ধোঁয়ারা কি দিকচিহ্নহীন দিগ¦লয়ে হারিয়ে যাবে? আচমকা তার ভাবনায় যতি পড়ে। তিনি দেখতে পান অর্ধভস্মীভূত একটি পাকা বাড়িতে হৈ হৈ করে ঢুকছে একদল মানুষ। কেউ ছাই পরিষ্কার করছে, কেউ পোড়া জানালায় কাপড় টাঙিয়ে দিচ্ছে, কেউ বাড়িটির সীমানা পরখ করছে। প্রৌঢ়ের মনে পড়ে তার ভস্মীভূত বাড়িতেও কি এমনি মানুষের কোলাহলের দৃশ্য তৈরি হয়েছে? বাড়ির দখল নিলেও তার স্ত্রী-পুত্রের পোড়া দেহাবশেষের কি হবে? আগতরা কি অর্ধপোড়া বীভৎস লাশগুলো দেখা মাত্র ভয়ে আর্তনাদ করে বাড়ি ছেড়ে পালাবে? না কি লাশগুলো টেনে ঘর থেকে বের করে রাস্তায় ফেলে রেখে ছুটে যাবে ঘরের দিকে?
হঠাৎ মাথাটা পাক খায় প্রৌঢ়ের। উবু হয়ে বসে পড়ে পথে। পুনরায় উঠে দাঁড়ান। নতুন প্রশ্ন মগজে ভিড় করতে থাকে। এতক্ষণ তার প্রশ্ন ছিল তিনি কি গৃহহারা? তিনি প্রিয়জন হারা?
নতুন প্রশ্নটি এবার তার মনে আগুন হয়ে দাউ দাউ জ¦লে ওঠে, তিনি কি দেশহারা? আর সেই আগুনে পুড়িয়ে দিতে চায় তার অন্য জিজ্ঞাসা, তিনি কি সন্তানহারা? তিনি কি স্ত্রী হারা? দেশ, গৃহ, স্ত্রী-পুত্র-কন্যার বিচ্ছেদ সংঘাতে প্রৌঢ় মানুষটি অগ্নিদানবের পদতলে বিচূর্ণ হতে থাকেন। শোক, বিষাদ, অন্তর্দাহ বিষ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে তার সারা চৈতন্যে। তিনি হঠাৎ দু’হাত আকাশে তুলে তার পরম আরাধ্য দেবতাকে অভিশাপ দিতে থাকেন চিৎকার করে, ‘আমি তোকে মানি না, চিনি না, তুই দেবত্ব হারিয়ে পশু হয়ে যা।’

চিৎকার থেমে গেলে ঘন ঘন দম ফেলতে থাকেন প্রৌঢ়। অদ্ভুত এক অনুভূতি তার চৈতন্য নাড়িয়ে দেয়। সেই অনুভূতির স্বাদ প্রশান্তির মতো। তবে কি তিনি ঈশ্বরদ্রোহী হয়ে গেছেন? এমনও তার মনে হয় ওই অগ্নিদানব সে হচ্ছে ছদ্মবেশী ঈশ্বর। ওই যে যারা তার বাড়ি ভস্মীভূত করে গেছে, ছাই করে দিয়ে গেছে তার স্ত্রী-সন্তানদের, যদিও ওরা চেনা প্রতিবেশী তবু ছদ্মবেশী ঈশ্বর। অন্য ঈশ্বরে বিশ্বাসী প্রতিবেশীদের প্রতি বিশ্বাস হারাতে রাজি নন তিনি।
আর ঠিক তখনই এই অগ্নিভস্মের কালে প্রৌঢ় মানুষটির পায়ের তলার মাটি কেঁপে ওঠে। তাকে নিশানা করে এক ব্যক্তি ছুটে আসছেন। তারই পায়ের আওয়াজে পৃথিবীর মাটি কেঁপে কেঁপে উঠছে। সেই ব্যক্তি ছুটে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ে প্রৌঢ়ের ওপর। ‘ওরে ব্রজবাসী কোথায় পালাচ্ছিস তুই? খুঁজে মরছি সারা শহর।’
এই ব্যক্তির নাম করিম হাজি। এবার প্রৌঢ় মানুষটির অস্তিত্বের খোলস ভেঙে যায়। বেরিয়ে আসে মানুষের পরিচয়, ব্রজবাসী বণিক। শহরের একই মহল্লায় জন্ম আর বেড়ে ওঠা। বাল্যসখা। রাস্তায় একা পেয়ে ইংরেজ কুঠিয়ালকে লালমুখো বাঁদর গাল দিতে গিয়ে পরস্পরের কান ধরে উঠবস করে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফেরার স্মৃতি আজো ভুলতে পারেনি। দীর্ঘ বৎসর পর আজ পুনরায় একসঙ্গে কাঁদছে ওরা। রাজপথে দুই প্রৌঢ়ের পরস্পরকে জড়িয়ে এমন কান্না পথচারীদের কৌতূহল জাগালেও বিগলিত করে না। বরং করুণার্দ্র করে একটি পথকুকুরকে। খানিক তফাতে দাঁড়িয়ে মানুষের কান্না দেখে সে। এক সময় খানিকটা এগিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে দু’বার কাঁই কুঁই শব্দ উচ্চারণ করে চক্রাকারে ঘুরতে ঘুরতে শুয়ে পড়ে। বোধ করি কুকুরটি নিদ্রা কাতর। চোখ বুজে যায় তার। পরক্ষণই চোখ খুলে অপলক তাকিয়ে থাকে দু’জন মানুষের কান্নার দিকে। সে কি মানুষের কান্নার ভাষা বুঝতে চায়? দু’জন প্রৌঢ়ের যেমনি জানার কথা নয়, ঠিক তেমিন আগুনে পোড়া এই শহরেরও।

তিন.
‘ব্রজবাসী, ফিরে চল। আমি তোর পুড়ে যাওয়া বেদখল হওয়া বাড়ি ফিরিয়ে দেব, আমার চার মেয়ের এক মেয়েকে তোর হাতে তুলে দিব খোদার কসম। তুই কি মুসলমান মেয়ের হিন্দু বাবা হতে রাজি?’ করিম হাজির মুখে এমনি কথা শুনে চমকে ওঠে ব্রজবাসী। তার চোখ বুজে আসে। নিরুত্তর।
উত্তরের আশায় ব্রজবাসীর হাত ধরে দগ্ধ নগরীর গভীরে ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকে করিম হাজি। এবার মুখ খোলে ব্রজবাসী। বিড়বিড় করে বলে, ‘মুসলমান মেয়ের হিন্দু বাবা, সে কি হয়?’
‘বাবার আবার জাত-ধর্ম কিরে? বাবা তো বাবাই,’ করিম হাজি পরখ করতে চান ব্রজবাসীর মুখ। বড় জটিল, বুঝতে পারেন না।
এবার সবাই নীরব। করিম হাজি ব্রজবাসীর হাতটা শক্ত করে ধরে হাঁটছেন। তার বিশ্বাস ব্রজবাসী পালিয়ে যাবে। এক সময় নীরবতা ভেঙে তিনি বলেন, ‘এই জন্ম শহর ছেড়ে কই যাবি তুই ব্রজ? অচেনা হিন্দুস্তানের যে শহরে যেতে চাস সেই শহরটাও পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, সেখানে রয়েছে আর এক অগ্নিরাক্ষস, সংবাদ পাসনি?’
সেই অগ্নিদানবের অগ্নিশিখায় নিজের অস্তিত্ব পোড়াতে পোড়াতে করিম হাজির দুয়ারে পা রাখেন ব্রজবাসী। চিরচেনা এ বাড়ি তার কাছে অচেনা মনে হয়। ব্রজবাসীকে ঘিরে এ বাড়িটিতে যেন কান্নার রোল ওঠে। শেষ রাতের আজানের করুণ সুরের মতো সবকিছুই যেন হারিয়ে যায়, তলিয়ে যায়। ব্রজবাসীর প্রতি মানুষগুলোর করুণা, মায়া, আক্ষেপ, ভালোবাসা জমতে জমতে পর্বতের মতো উঁচু হয়ে যায়। সহমর্মিতা আর ভালোবাসার পর্বতের ভারে ব্রজবাসীর দম বন্ধ হয়ে আসে। ক্ষুদ্র একটি মানুষের দুঃখ-কষ্টে অন্য মানুষের দুঃখ-কষ্ট যেন তার শ্বাসরুদ্ধ করে দিতে চায়। তিনি আর সহ্য করতে পারছেন না। করিম হাজির বাড়ি আর তার অস্তিত্ব থেকে তিনি পালিয়ে বাঁচতে চান। কিন্তু কোথায় পালাবেন তিনি?
নাকি ফিরে যাবেন বিক্রমপুরের গ্রাম থেকে তিন পুরুষ আগে এসে ঢাকা শহরে আধপাকা বাড়ি বানিয়ে নগরবাসী হওয়ার স্মৃতির কাছে? নিজ হাতেই তো কাঁচা বাড়িটা পাকা করেছিলেন। ওখানে গেলে কি দেখতে পাবেন ব্রজবাসী বণিক? আধ অঙ্গার হওয়া এক জোড়া লাশ! হয়তো অদৃশ্য হয়ে গেছে জোড়া লাশ। নতুন দখলদার পাহারায় বসে আছে পোড়া দরজায় হ্যারিকেন জ্বালিয়ে। হয়তো হ্যারিকেনের আলো এখনো পৌঁছেনি মেঝের ছাইয়ের স্তূপে। পৌঁছলেও আলো গিলে নিয়েছে কালো অঙ্গারের স্তূপ। সেই ভস্মস্তূপেরা মানুষের সভ্যতার সাক্ষী। আরো সাক্ষী লোভ, হিংস্রতা আর নিষ্ঠুরতা। নতুন বাসিন্দারা হয়তো একদিন ভুলে যাবে আগুন আর পোড়া লাশের গল্পকথা।
এভাবেই তো মানুষ হাজার বছর ধরে প্রাচীন ইতিহাসের অঙ্গারস্তূপের ওপর আপন গৌরবের নতুন ইতিহাস লিখছে নিষ্ঠুরতার, জিঘাংসার।
ঘুম নেই। তবু জড়িয়ে আসে ব্রজবাসীর চোখে ঘুমের নেশা। ক্ষণ মুহূর্ত বাদে পুনরায় জেগে ওঠেন। ক্রমেই তিনি মতিভ্রমে আক্রান্ত হন। তিনি স্পষ্ট শুনতে পান জানালার ওপাশ থেকে তাকে কারা যেন ডাকছে। কারা? ওই তো তার স্ত্রী-পুত্র-কন্যা। হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলো ফিরে এসেছে তার কাছে। তাই ব্রজবাসী বিছানা ছেড়ে, করিম হাজির বাড়ি ছেড়ে আপন বাড়ির সন্ধানে স্ত্রী-পুত্র-কন্যার সঙ্গে হাঁটতে থাকেন।
তারা ফিরে যাচ্ছেন চিরচেনা ঠিকানায়। ওরা পরস্পর কথা বলেন। এমন এক দুনিয়ার কথা বলেন যার অস্তিত্ব কোথাও নেই।
তাদের পথ ফুরোয় না। হারানো ভস্মীভূত বাড়ির ঠিকানা হারিয়ে ফেলেন তারা। কি ফক্ফকে নগর জোছনা। না, এতটুকু ক্লান্তি নেই মানুষগুলোর। ধর্মশালার সন্ধানে জৈন তীর্থঙ্করদের মতো তারা হেঁটেই চলেছেন। কেউ জানে না হারানো বাড়িটি কোথায়। পিতা-মাতা-পুত্র-কন্যা। আদি মানব। স্বর্গ হতে বিতাড়িত। মর্ত্যলোকে হেঁটে চলে অচেনা একটি আশ্রয়ে। পৃথিবীর আদিকথা তাদের আলাপচারিতায়। বিস্ময়ের এক পৃথিবী। তাদের আত্মায় কেবল পৃথিবীর আদি প্রথম পুষ্পবনের প্রথম পুষ্পের গন্ধস্মৃতি।
নগর অতিক্রম করলেই রাত ফুরিয়ে যায়। হঠাৎ ব্রজবাসীর মনে হয় তিনি একা। কই, কেউ তো সঙ্গে নেই। স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, কেউ নয়। তাহলে কারা তাকে করিম হাজির বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে এলো? রাতের আত্মজন সঙ্গীরা কি এ জগতের জীবিত কেউ নয়? পরজগতের মানুষ? কেন ওরা তাকে নগরীর বাইরে নিয়ে এলো? নগরীতে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে গেল কি? ওরা কি নগর পরিত্যাগ করে নিরুদ্দেশের পথে হেঁটে যেতে বলে গেল? কিন্তু পথ কোথায়? যাবেন তিনি কোথায়? হু হু কান্নায় ভেঙে পড়েন ব্রজবাসী। প্রিয় আত্মজনদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘এত নিষ্ঠুর কেন তোমরা?’
পর মুহূর্তেই ব্রজবাসীর মনে হয় ওরা নিষ্ঠুর নয়, বরং দয়ালু। ওরা তাকে পথের দিশা দিয়ে গেছে। এই মাটি, এই শহর, দগ্ধ এই দেশ পরিত্যাগ করতে ইশারা দিয়ে গেছে। মৃতেরা এই জন্ম শহরকে বিশ্বাস করতে মানা করেছে? জন্ম শহরের প্রতি বিশ্বাস হারানো কি আত্মরক্ষার সঠিক পথ? এই শহর কি ব্রজবাসীর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে? ওই যে করিম হাজি তাকেও কি বিশ্বাস করা যায় না? যে মানুষ তার কন্যার পিতৃত্ব তার হাতে সঁপে দিতে চেয়েছিল তার প্রতিও বিশ্বাস রাখা যায় না? অগ্নিভস্মের কাল কি মানুষের বিশ্বাসের নদীর সবটুকু জল শুষে নিয়েছে?
এসব জটিল প্রশ্নের উত্তর কিছুই জানেন না ব্রজবাসী। ঘোর এক আচ্ছন্নতার ভেতরও বুঝতে পারেন নগর পরিত্যাগ করেছেন তিনি। একটি নদী। চেনা নদীটি যেন তার অচেনা। নদীর ওপারে শহর আর নাই। গাছ-গাছালির গ্রাম। নদী তীরে দাঁড়িয়ে তিনি আকাশ দেখেন। জনশ্রুতি এই, ওই আকাশেই দেবতারা থাকেন। ঈশ্বরের ঠিকানা। এবার এই শহরের প্রতি অবিশ্বাসটা ঘৃণা আর বিদ্বেষে রূপান্তর ঘটে। তার মনে হয় ওই আকাশে ঝুলে আছে ঈশ্বরের সিংহাসন। ঈশ্বর বসে আছেন। ঈশ্বর সাপের মতো দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছেন ব্রজবাসীকে। ঠিক তখনই মানুষটা আচমকা চিৎকার করে আকাশের দিকে থুথু নিক্ষেপ করেন, ‘ঈশ্বর আর শয়তান, যে-ই হোস তাকে আমি ঘৃণা করি।’
এবার মাটিতে লুটিয়ে পড়েন ব্রজবাসী। দু’হাতের আঙ্গুলের নখে খামচে ধুলো তুলে সারা শরীরে, মুখে মেখে দিতে দিতে ওঠে দাঁড়ান। এবার তিনি হাঁটবেন। তার মনে হয় পরিত্যাগ করে যাওয়া প্রিয়জনরা পুনরায় ফিরে এসেছে। পথের সঙ্গী হয়েছে। কিন্তু তিনি তাদের দেখতে পাচ্ছেন না। অজাগতিক শরীর নিয়ে ওরা হাঁটছে পাশাপাশি। কথা হবে। কল্পলোকের অফুরান গল্পকথা। পথও ফুরোবে না। পিতা, পুত্র, কন্যা, মাতা। এ সম্পর্ক জন্ম জন্মান্তরের। অগ্নিভস্মের কাল তাকে বিনাশ করতে পারে না। তাই তো একজন জাগতিক মানুষ এবং তিনিজন অজাগতিক মানুষ অনতিদূরের নদীঘাটে নোঙর করা ভিড়ে ঠাসা একটি জাহাজে উঠে বসেন। জাহাজের গন্তব্য কেউ জানে না। জানে কেবল খালাসীরা আর ওই আসমানে আত্মগোপন করা ঈশ্বর।
জাহাজঘাট পরিত্যাগ করা মাত্রই ব্রজবাসী বুঝতে পারেন তিনজন অজাগতিক সঙ্গী তাকে পরিত্যাগ করেছে। কেউ পাশে নেই। জাহাজের এই জনারণ্যে তিনি একা। ভয়, শোক, পরিতাপ তাকে সাপের মতো পেঁচিয়ে ধরে। তার শরীর কাঁপছে। চিৎকার করে ওঠেন তিনি। জগতের কারো সাধ্য নাই বুঝার তার এই চিৎকারের অর্থ কি? একি শোক? একি আতঙ্ক? জাহাজের প্রপেলারের আঘাতে নদীর আন্দোলিত জলস্রোতের মতো তার মুখে উচ্চারিত হয়, ‘জাহাজ ভিড়াও, আমি কোথাও যাব না, ওই তো ঘাটে দাঁড়িয়ে আছে আমার ছেলেমেয়ে আর তার মা। ওদের ছেড়ে আমি কোথাও যাব না। কেন যাব?’
জাহাজে তখন কেবলই কান্নার রোল। সহস্র জনকণ্ঠের কান্না ইঞ্জিনের শব্দের সঙ্গে একাকার হয়ে নদীর ¯্রােতে ভাসতে থাকে। কান্নার এই মহাধ্বনি থামাবার জন্য এই জনারণ্যে কেউ রইল না। এ যেন গৃহহারা, দেশহারা, ঈশ্বরহারা একদল মানুষের মহাপ্রস্থানের পথে যাত্রা। ক্রমেই সন্ধ্যা ঘনিয়ে অন্ধকার নামে। বিশাল এই নদীর বুকে আকাশ আর বিশাল চরাচর ঘিরে আঁধার নেমে আসে। এই অন্ধকারের সীমানা নেই। তার ঘ্রাণের বিস্তার স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল অর্থাৎ ত্রিলোকের মতো বিশাল।
নদীর বুকে রাত গভীর হলে ক্রমেই কান্না আর বিলাপের স্বর বিলয় হতে থাকে। জাহাজের খোলে উঁকি দিলেই বোঝা যাবে জেলে নৌকার খোলে মরা মাছের স্তূপের মতো অসংখ্য মানুষ লাশ হয়ে পড়ে আছে। ওরা নিদ্রাচ্ছন্ন। কেবল জেগে আছে খালাসীদের সঙ্গে একজন। ব্রজবাসী। মানুষটির মনে হয় তার পাশে স্ত্রী আর সন্তানেরা ঘুমিয়ে আছে। তিনি তাদের সুখ নিদ্রার পাহারাদার। এবার তাই তাকে উঠে দাঁড়াতে হয়। জাহাজের মৃদু আলোর ভেতর তিনি নিদ্রাচ্ছন্নদের ভিড়ে স্ত্রী, পুত্র, কন্যাকে খোঁজেন। মাথা নুইয়ে আলো-ছায়ার রহস্যে নিদ্রাকাতর মানুষগুলোর মুখ একটার পর একটা তালাশ করে চলেন। কারো কারো মাথা টেনেও দেখেন। কোথায় তার চেনা মুখগুলো?
মৃত্যু এবং জীবন, এই দুইয়ের মধ্যে যে তফাৎ তা উপলব্ধির শক্তিটুকু এখন ব্রজবাসীর চেতনায় চাপা পড়ে গেছে। এমন এক শূন্যতার ভেতর তিনি ডুবে আছেন যা থেকে ফেরার চেষ্টা যতবারই করেছেন, সামনে কেবলই দেখতে পান অগ্নিশিখা আর পোড়া লাশ। স্তূপাকার সংখ্যাতীত লাশ। মৃত্যু আর আগুনের দুনিয়া থেকে ছুটে পালাতে চান ব্রজবাসী। কিন্তু ওরা তাকে ঘিরে থাকে। পুরাতন সময়ের পৃথিবীটা দূরে অস্পষ্ট দেখা যায়। কিন্তু মাঝখানে যে গভীর খাত তা ডিঙাবেন কী করে?
জাহাজের খোলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জানালা দিয়ে অন্ধকার নদীর কালো বাতাস ছুটে বেড়ায়। নিদ্রিত কিংবা অচৈতন্য স্তূপাকার মানুষের শ্বাস-নিঃশ্বাসের বাতাস নদীর বাতাসের সঙ্গে একাকার হয়ে দুই তীরের লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়ে। হঠাৎ কেন যে ব্রজবাসীর মনে হয় এই জাহাজ ভিন্ন পৃথিবীর অন্য কোথাও এমন সুখনিদ্রা আর নেই। এই আগুন, ধোঁয়া আর বাতাসের দুনিয়ায় আর কি কোনো দিন ওরা ঘুমের নাগাল পাবে না? তাই তো ব্রজবাসীর ইচ্ছে করে একে একে সবাইকে ডেকে জিজ্ঞেস করতে, যেখানে ওরা যাচ্ছে সেখানে কি ঘুম নিষিদ্ধ? তাহলে ব্রজবাসীও ঘুমোক। সত্যি এবার তার কষ্ট, শোক, আতঙ্ক ক্লান্ত বিধ্বস্ত শরীরের কাছে হার মানে। কুকুরকু-লী হয়ে ঘুমিয়ে পড়েন তিনি। একি সুখনিদ্রা নাকি নিদ্রার নামে চেতনা লোপ এটা নিদ্রিত সহযাত্রীরা কেউ জানে না।
হঠাৎ জাহাজের ভোঁ সিটিতে ঘুম কেটে যায় ব্রজবাসীর। ভস্মীভূত ঢাকা শহরের বাড়িটার কথা নয়, এবার বিক্রমপুরের শ্রীনগরের পূর্বপুরুষের আদি বাড়িটার কথা মনে পড়ে। ছোট ঠাকুদ্দার হাত ধরে বাবা ঢাকা শহরের নতুন ঠিকানায় উঠে আসেন। বড় ঠাকুদ্দা ওবাড়িতেই রয়ে যান। ঠাকুদ্দারা গত হলেও গ্রামের ঠিকানা একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়নি। পিতার জীবদ্দশায় যোগাযোগটা ছিল। তারপর একদিন কাছের মানুষও দূরের হয়ে যায়। লতা যেমনি মাটি আর গাছগাছালি বাইতে বাইতে নতুন শিকড় ছাড়ে, দূরে ছড়িয়ে পড়ে এবং মূল শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, ঠিক তেমনি ব্রজবাসীর বংশ লতিকাও।
ছোটবেলা পিতা ব্রজবাসীকে তার বাল্য স্মৃতির কথা বলতেন। গরিব থেকে কেমন করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় লবণ, কাপড় আর আফিমের ব্যবসা করে রাতারাতি অঢেল টাকার মালিক হয়ে শহরে উঠে আসেন সে সব রূপকথা। ব্রজবাসীও বিক্রমপুরের বাড়িতে বহুবারই গিয়েছেন। ছোট ছোট লাল ইটের একতলা বাড়ি। জাহাজে নাকি সে সব ইট আসতো কলকাতার মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীদের মোকাম থেকে। দেয়ালে ঠাকুদ্দাদের অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া সাদাকালো ছবি। ইংরেজ মহারানী আর বড়লাটের ছবি। একবার একটা ছবিতে হাত দিয়েছিল ব্রজবাসী। নাড়া লেগে ঘুণধরা কাঠের ফ্রেম খুলে গিয়ে মাটিতে পড়ে কাচ ভেঙে যায়। কান মলে দিয়েছিল ঠাকুদ্দা। সে যেন সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর যুগের আখ্যান।
হঠাৎ রাতের নদীতে বাতাস ওঠে। ঢেউয়ের গর্জন শোনা যায়। দোল খায় জাহাজ। একে একে নিরুদ্দেশ যাত্রীদের ঘুম ভেঙে যায়। একটি দুটি করে জাহাজের সব শিশুরা সমস্বরে কেঁদে ওঠে। তারপর বিলাপ ওঠে বৃদ্ধদের। মানুষের এই কান্না আর বিলাপের ঝড়ো হাওয়ায় নদীতে যেন জোয়ার ওঠে। এর নাম যে পদ্মা নদী। বড় বড় ঢেউ আছড়ে পড়ে জাহাজে। তখনই ভয়ার্তদের কান্নাকাটি, প্রাণরক্ষার প্রার্থনায় রাতের বুকে চিড় ধরে।

চার.
পদ্মার এই অন্তর্জলি যাত্রা যেন কোনোকালেই শেষ হবে না। কোথায় ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, কোথায় বা গোয়ালন্দ ঘাট। সেখানে অপেক্ষায় রয়েছে রেলগাড়ি। সে গাড়ি নিয়ে যাবে যেখানে, তার নাম হিন্দুস্থান, কলকাতা শহর। সেখানে পৌঁছতে পারলেই অপার শান্তি আর সুখ। দুঃখ, কষ্ট, রোগ আর মৃত্যুহীন ওই দেশ। স্বর্গসম সেই দেশের কথা বলে জাহাজের একজন খালাসী অস্থির মানুষগুলোকে শান্ত করতে চায়। খালাসী বুঝতে পারে মানুষগুলো ক্ষুধার্ত। ওরা খাদ্য চায়। কিন্তু জাহাজে যে খাদ্য নেই। তাই সে দু’হাত তুলে জাহাজের যেখানে মৃদু আলোর লণ্ঠন ঝুলে আছে তার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। করুণা নয়, বরং হাতুড়ির ঘায়ের মতো কঠিন সুরে জানায় গোয়ালন্দঘাটে মাড়োয়ারিদের লঙ্গরখানা রয়েছে। ভাতের যে পাহাড় তা ডিঙানোর ক্ষমতা কোনো ক্ষুধার্ত মানুষের নেই।
দুগ্ধবতী মায়েদের বুকে সামান্য হলেও দুধ আছে। তাই দুগ্ধপোষ্যরা নীরব হয়ে গেলেও মাতৃদুগ্ধ পরিত্যাগকারী শিশুদের ক্ষুধা মিটবে কি করে? কি করে ক্ষুধা দমন করবে শিশুদের মা কিংবা বাবা? জাহাজের এই খোলের ভেতর যেন এক দুর্ভিক্ষের দেশ। এত বড় দেশ যার কোনো সীমানা নেই। নদী আর বাইরের অন্ধকার এই চরাচরে ক্ষুধার এই দেশ কেবলই সীমানা বৃদ্ধি করে বিস্তার লাভ করছে।
ক্ষুধা, শোক আর বিলাপের এই মহাকোলাহলে কান, মাথা আর বুক যেন ফেটে যাচ্ছে ব্রজবাসীর। গর্জে ওঠেন তিনি, ‘চুপ কর সবাই, এখানে ভাত কোথায়? আগুনে সব ভাত ছাই হয়ে গেছে।’
ব্রজবাসীর এই ক্রুদ্ধ চিৎকার জাহাজের ভেতর জেলে নৌকার খোলে চিটচিটে জলে আটকে থাকা জীবন্ত মাছের মতো মানুষগুলো খলবল করে। একজনই কেবল বলে, ‘আগুনের ক্ষুধা দেশ খায়, ঘর খায়, মানুষ খায়, ভাতও খায়?’
এখনই জাহাজের ভেতর জোরে কেঁদে ওঠে কে একজন, ‘মানুষটা বুঝি আর নাই। মরেই গেল, এখন লাশ কি হবে?’
কে মরল তা জানার জন্য মুখে মুখে ব্যাকুলতা। একজন কেবল বড় নিষ্ঠুর গলায় বলে, ‘ঘাটের মড়া বুড়োর জাহাজে ওঠার কোন দরকার ছিল, মরবি তো মরবি নিজের ভিটায় পড়ে মর।’
কে একজন পাগলের মতো হাসে, ‘বুড়োর লাশ পদ্মার জলে ভাসিয়ে দাও, না হলে বুড়োর দেখাদেখি আর কতজনের মরার সাধ জাগবে, ভগবানই জানেন’।
‘মরার আবার সাধ কিরে পাগলের জাত পাগল?’ ব্রজবাসী এবার লম্বা সুরে কেঁদে ওঠেন। তার এই কান্নার রোল বর্ষার পদ্মার মতো অতলস্পর্শী। হ্যারিকেনের ছায়াচ্ছন্ন আলোর জাহাজের ডেকের ভেতর হঠাৎ আতঙ্কের স্তব্ধতা নামে। জীবিত মানুষের ভিড়ে একটি মৃতদেহ, মনে হয় মানুষের সব সাহস চুষে নিয়েছে। মৃত্যুর গন্ধে পরিপূর্ণ একটি জলযান যাচ্ছে কোথায়? মনে হয় মানুষগুলোর মনে এতক্ষণে দৃঢ় বিশ্বাস শেকড়ের মতো ছড়িয়ে পড়েছে যে, যাত্রাপথ যেখানে শেষ হবে সেখানেই জলের মতোই থই থই করছে মৃত্যু।

ঘুমের মতো জাহাজের মানুষগুলো একে অন্যের শরীরে মাথা নামিয়ে পড়ে আছে। এতগুলো মানুষের নিশ্বাস ভরাট করে দেয় জাহাজের ভেতরটা। এই নিশ্বাসপূর্ণ জাহাজের ভেতর ব্রজবাসী মাথা উঁচু করেন। ইচ্ছে করে যে মরেছে তার ঠা-া মুখখানা দেখতে। মতিভ্রম তাকে অন্য দুনিয়ায় টেনে নেয়। তার মনে হয় কেউ মরেনি, বরং তিনিই আপন কন্যার পোড়া লাশটি বয়ে এনেছেন। পৃথিবীতে কেউ সঙ্গী না হলেও এই নিরুদ্দেশ যাত্রায় জীবিত পিতার সঙ্গী হয়েছে মৃতা কন্যা। কন্যা জানে পিতা একাকী হেঁটে যেতে পারবেন না।
ব্রজবাসী জাহাজের ভেতর আগুনে জ্বলে যাওয়া কন্যার লাশের দিকে এক পা দু’পা করে এগিয়ে যান। এই লাশ যাত্রা বড় সহজ নয়। পা ফেলার জায়গাটুকু নেই। কিন্তু ভয়ার্ত মানুষগুলো ব্রজবাসীর পায়ের চাপ সহ্য করে নীরবে। যার শরীরেরই স্পর্শ পায় ব্রজবাসীর পা সে টুঁশব্দটিও করে না। নীরবে নিঃশ্বব্দে চোখ বুজে থাকে। কেননা এখানে ভয়ংকর এক আতঙ্ক পড়ে আছে মৃত মানুষের রূপ ধরে। একটি মৃতদেহের করতলে আত্মসমর্পিত হয়ে পড়ে আছে শক্তিমান জীবিত মানুষেরা। এ যে ভূভাগ থেকে বিচ্ছিন্ন বিশাল জলজগতের ভাসমান জাহাজের অন্য দুনিয়া।
ব্রজবাসী অচেনা এক বৃদ্ধের মাথা কোলে তুলে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকেন, এ যে তার আগুনে পোড়া কন্যা। কালো অন্ধকার রঙ মুখ। পোড়া। বীভৎস। কিন্তু এই লাশ নিয়ে কোথায় চলেছেন তিনি? যে লাশটিকে সবাই অস্বীকার করেছে কিছুক্ষণ পূর্বে, যে লাশ জলযাত্রীদের অচেনা, তাকে নিয়ে কোথায় যাত্রা শেষ হবে তার? কিন্তু ব্রজবাসীর আচ্ছন্নতা তখনই কেটে যায় যখন রাত ভোর হয় এবং যাত্রীরা ভেঙেপড়া শরীর টেনে মাথা উঁচু করে। মৃত ব্যক্তির আত্মীয়রা প্রথমে দ্বিধাদ্বন্দ্ব, শেষে তাকে রীতিমতো অস্বীকার করে বসে। এই নির্মম নিষ্ঠুর যাত্রাপথ তাদের অন্তরকে, বিবেককে ভয়ার্তই নয় কেবল, চরম স্বার্থপরে পরিণত করে। একজন পৈতেধারী বনেদী ব্রাহ্মণ স্তব্ধতা ভাঙে, ‘কে আপনি? কার লাশ আগলে বসে আছেন? লাশের কি জাত? আপনার জাত কি?’
এবার ব্রজবাসী উঠে দাঁড়ান। সকালের আলোয় জাহাজের মানুষগুলো দেখেন। দুহাতে বুক চেপে ধরে কেঁদে ফেলেন, ‘না, এটা আমার আগুনে পোড়া মেয়ের লাশ নয়,’ মাঝখানে থেমে চোখ মোছেন, ‘ঠাকুর কর্তা, এখন বুঝতে পারছি, আমার জাত গন্ধবণিক। আমার মেয়েরও তাই। আগুন আমার মেয়েকে পুড়িয়ে দিলেও, তার আর তার বাপের জাতের পরিচয় ভগবানও পোড়াতে পারবে না।’
মানুষ পুড়ে ছাই হয়ে গেলেও জাত-বর্ণ-ধর্ম যে অক্ষয় অবিনশ্বর তা বোঝার জন্য ব্রজবাসীকে প্রৌঢ়ে পৌঁছতে হয়। ব্রজবাসী দেখতে পান অজ্ঞাতকুলশীল মৃত মানুষের স্পর্শে জাতি ক্ষয় আর ধর্মক্ষয়ের ভয়ে জাহাজের যাত্রীগণ কেমন করে একটি বৃত্ত তৈরি করেছে। লাশটি এখন স্পর্শের বাইরে। কিন্তু ব্রজবাসী এখন খুঁজে বের করতে চায় সেই ব্যক্তিকে, যে বৃদ্ধের মৃত্যু হলে পর আচমকা আর্তনাদ করে উঠেছিল। তাকে শনাক্ত করা সহজ নয়। ভিড়ের ভেতর হয়তো আত্মগোপন করেছে। আবছায়া অন্ধকারে রাতের বেলা ব্রজবাসী লোকটির মুখ দেখতে পাননি। লোকটি তো ব্রজবাসীর মতো একাকী এই জলযাত্রায় ছিল না? ওরা তবে গেল কোথায়? লাশের দায় কেন গ্রহণ করেনি? মৃত্যু হলে মানুষের শরীরের ওজন এতটাই বেড়ে যায়, প্রিয়জনেরাও কি সে ওজন বাইতে অক্ষম?
হঠাৎ জাহাজের ভেতর শুরু হয় হুলুধ্বনি। ধ্বনি তো নয়, ঝড় আর মেঘের গর্জন। কি হলো? তীর দেখা যায়। গোয়ালন্দ ঘাট। জাহাজের জানালা, ফাঁকফোকরে মানুষের চোখ পাখির মতো ওড়ে পদ্মার ওপারে অনতিদূরের জাহাজঘাটের দিকে। এবার মানুষের মুখে হাসি আর আনন্দ। কাঁদেও কেউ। এ কান্না দুঃখের নয়। ওরা নিশ্চয়ই এবার পবিত্র ঈশ্বরের ভূমি যা দেবভূমি নামে পরিচিত ওখানে যেতে পারবে। ওখানে ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে। সেই লৌহযান সাপের মতো দীর্ঘ। ওখানে ঢুকে গেলে মনে হবে বিশাল এক অজগর অসংখ্য মানুষের শরীর পেটের ভেতর গিলে নিয়ে কয়লার ইঞ্জিনের নিশ্বাস ধোঁয়ার বিষ ছড়াতে ছড়াতে দেবতাদের পবিত্র রাজ্যের ভিতর ছুটে যাচ্ছে।
গোয়ালন্দ জাহাজঘাটের বালি স্পর্শ করতেই চারদিকে কোলাহল, ডাকাডাকি, কান্নাকাটির শব্দে জাহাজের খোল যেন চৌচির হয়ে যায়। মানুষের আত্মপরিচয়ের জন্য কত না নাম। কে বা কারা আগে ঘাটে নেমে আসবে, মহা এক প্রতিযোগিতা। সঙ্গী হিসেবে কে কাকে ধরে আর ছাড়ে, কে উবু হয়ে পড়ে, কার কাঁথা আর বাসনের পোঁটলা কার হাতে যায়। এ হিসাব রাখার লোক নেই। জাহাজ থেকে আগে নামলে স্বর্গবাস, পিছে নামলে নরকবাস। ঘাটে বসেছে মাড়োয়ারি রিলিফ ক্যাম্প। জলছত্র। খাদ্যছত্র। জলছত্রে মেলে পিপাসার জল আর খাদ্যছত্রে চিঁড়ে-গুড়। সঙ্গে মরা ইঁদুর।
জাহাজ জনশূন্য হয়ে যায়। কেবল পড়ে থাকে একটি লাশ। এই জলযাত্রায় ভিড়ে এবং সংকীর্ণ স্থানে গাদাগাদি করে নিশিযাপন করতে গিয়ে যদি কেউ এক জোড়ার একটি পাদুকা কিংবা জোড়াটাই হারিয়ে ফেলে, জাহাজ পরিত্যাগের সময় কষ্টসাধ্য খোঁজাখুঁজি শেষে তা পেয়েও যায়। কেউ কারো পাদুকা পরিত্যাগ করেনি। কিন্তু যা পরিত্যাগ করেছে তার নাম মানুষ। মৃত মানুষ! এ লাশ যদি বেওয়ারিশই হয়ে থাকে তবে কে তার ওয়ারিশ? কে জানে এর উত্তর? কেউ না। জানে কেবল দুটি তারিখ। চৌদ্দই এবং পনেরই আগস্ট উনিশশ সাতচল্লিশ। ওই তারিখ দুটি ভিন্ন এমন জটিল উত্তর জানা কারো সাধ্যের ভিতর নয়।
আসলে মানুষের যা অজানা তা হচ্ছে একটি গভীর রাত। অন্ধকার রাত। মধ্যরাত। চৌদ্দই অগাস্টের এবং পনেরোই অগাস্টের অন্ধকার রাতের মহাশূন্যের যে মহাগহ্বর তার অতলস্পর্শী গভীর নিকষ অন্ধকার থেকেই জন্ম নেয় দুই অগ্নিদানব। সেই অগ্নিরাক্ষসেরাই জানে মানুষের লাশের প্রকৃত মালিক কে। না হলে নতুন জন্ম নেয়া দুই

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা