সকল নারীর জন্য নিশ্চিত হোক ফিস্টুলা মুক্ত জীবন

আগের সংবাদ

উত্তরায় চালু হলো চক্রাকার বাস সার্ভিস

পরের সংবাদ

নরসুন্দর শেফালী

সেবিকা দেবনাথ :

প্রকাশিত হয়েছে: মে ২৭, ২০১৯ , ৪:১৬ অপরাহ্ণ

‘বিউটিপার্লারে যারা কাজ করে তাগরে কয় বিউটিশিয়ান। তারাও তো মাইনষের চুল কাটে। আমিও চুল কাটি। কিন্তু আমি বিউটিশিয়ান না। আমি হইলাম নাপিত। তাগর কাজে যদি কোনো নিন্দা না থাকে তাইলে আমার কাজে কেন থাকব? আমি বাজারের দোকানে বসি বইলে?’
নিজের পেশার প্রতি সম্মান নিয়ে এভাবেই কথাগুলো বললেন শেফালী শীল। ঝালকাঠি জেলার কাঁঠালিয়া উপজেলার শৌলজালিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম ছিটকী গ্রামের দরিদ্র যাদব শীলের চতুর্থ সন্তান শেফালী। দারিদ্র্যের কারণে পঞ্চম শ্রেণির গণ্ডি পেরুতে পেরেছিলেন অতি কষ্টে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও পরিবারের চাপে বাধ্য হন বিয়ের পিঁড়িতে বসতে। মাত্র ১২ বছর বয়সে আতরআলী গ্রামের বিশ্বনাথ শীলের সঙ্গে সাতপাকে বাঁধা পড়েন শেফালী। এক অভাবের সংসার থেকে আরেক অভাবের সংসারে এসে পড়েন শেফালী। সেই সঙ্গে অল্প বয়সে শ্বশুরবাড়ির লোকজনের মন জুগিয়ে চলাও তার জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। জীবনকে বুঝে ওঠার আগেই চার মেয়ে ও এক ছেলের মা হন তিনি। স্বামীর অবহেলা ও উদাসী জীবনযাপনের কারণে তার জীবন বিষণ্ণময় হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে বাবার বাড়ি ফিরে আসেন শেফালি। সেখান থেকে বলতলা গ্রামের দোগনা বাজারে চলে আসেন। স্বামী থেকেও না থাকার মতো। খরচপাতি দেয়া তো দূরের কথা কোনো খোঁজও নেয় না। ছয়জনের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে শেফালীর কাঁধে। পরিবারের সদস্যদের মুখে দুবেলা দুমুঠো খাবার তুলে দেয়ার জন্য প্রথমে তিনি অন্যের বাড়ি কাজ করলেও সংসার যখন চলছিল না তখন তিনি চুল কাটার পেশা বেছে নেন।
শেফালী বলেন, আমি তো ভিক্ষা করি না। কাজ করে খাই। কাজে কোনো ছোট-বড় নেই। গ্রামের বাজারে যখন চুল কাটতে শুরু করলাম তখন অনেকেই তা ভালোভাবে নেয়নি। গ্রামের বাজারে একজন নারী পুরুষের চুল কাটতাছে, তা দেখে অনেকেই হাসিহাট্টা করত। টেরাব্যাকা কথা কইত। আবার কেউ কেউ সাহায্য-সহযোগিতাও করছে। গ্রামের লোকজনই টাকা তুইলা চুল কাটার জন্য আমারে একটা চেয়ার কিনে দিছে।
শেফালী জানান, ২০১৬ সালে ঝালকাঠি জেলার কাঁঠালিয়া ব্র্যাক অফিসের টিইউপি কর্মসূচির আওতায় জরিপের মাধ্যমে চ‚ড়ান্তভাবে সদস্য নির্বাচিত হন। তার মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে গবাদিপশু পালন এন্টারপ্রাইজের ওপর প্রশিক্ষণ দিয়ে তাকে একটি বকনা গরু ও একটি ছাগল দেয়া হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে সহায়ক ভাতা, হোম ভিজিটের মাধ্যমে ইস্যু শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা শেখানো হয়। এরপর থেকে তিনি একটু একটু করে যেন সুখের মুখ দেখতে শুরু করেন। দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। বাকি দুই মেয়ে ও ছেলে এখন লেখাপড়া করছে। আগে অন্যের ঘরে থাকতেন তিনি। এখন ব্র্যাক কর্মীদের অনুরোধে বলতলা জিডিবিসি কমিটি দোগনা বাজারের পাশে ৩ কাঠা খাসজমিতে তাকে একটি ঘর তুলে দিয়েছে।
শেফালী বলেন, অভাবের কারণে আমি পড়তে পারি নাই। অল্প বয়সে বিয়ে হইছে। আমি আমার সন্তানদের লেখাপড়া শিখাইছি। দুই মেয়েরে বিয়া দিছি। কিন্তু বাল্যবিয়া দেই নাই। আমি চাই প্রতিটি মেয়ে মানুষ লেখা শিখুক। বাল্য বিয়া যাতে কারো না হয়।
পুরুষশাসিত সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ব্যতিক্রমী পেশা গ্রহণ করে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন শেফালী।