কেরালায় আইএসের হামলার পরিকল্পনা

আগের সংবাদ

স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে সিয়াম পালন

পরের সংবাদ

‘ফিস্টুলা মুক্ত জীবন, সকল নারীর জন্য নিশ্চিত করুন’

প্রকাশিত হয়েছে: মে ২৬, ২০১৯ , ৪:৩১ অপরাহ্ণ | আপডেট: মে ২৬, ২০১৯, ৪:৩১ অপরাহ্ণ

Avatar

পৃথিবীর উন্নত অনেক দেশে প্রসবজনিত জটিলতা কমে যাওয়া বা না থাকার কারণে মহিলাজনিত ফিস্টুলার মতো একটি নিদারুণ রোগ সেখানে আর দেখা যায় না। যার ফলে ওই সব উন্নত দেশে প্রসবজনিত বা মহিলাজনিত ফিস্টুলা সেবাদানকারী হাসপাতালগুলোও বন্ধ হয়ে গেছে। আমেরিকা, ইউরোপ থেকে প্রসবজনিত ফিস্টুলা নির্মূল হয়েছে প্রায় ১০০ বছর আগে। প্রসবজনিত বা মহিলাজনিত ফিস্টুলা রোগ নিয়ে বর্তমানে আফ্রিকা ও এশিয়ার দেশগুলো মারাত্মকভাবে ভুগছে। আফ্রিকা ও এশিয়ার প্রায় ৫০টিরও বেশি দেশে লাখ লাখ নারী এই অবর্ণনীয় সমস্যা নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই করে যাচ্ছে। প্রসবজনিত বা মহিলাজনিত রোগ শুধু একটি নিদারুণ রোগ নয়, এ যেন এক নিষ্ঠুর নিয়তিও বটে।
একজন সাধারণ সচেতন মানুষ হিসেবে একবার কল্পনা করুন একজন মহিলা তার প্রস্রাব নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না, দিনে-রাতে সবসময় তার প্রসব/মাসিকের রাস্তা দিয়ে প্রস্রাব ঝরছে, তার পরিধেয় কাপড় ভিজে যাচ্ছে, সে বিছানায় বসা এমনকি ঘুমাতে পারছে না, কখনো কখনো তার প্রস্রাব পায়খানা উভয়ই ঝরছে, শরীর থেকে অনবরত ঝাঁজালো দুর্গন্ধ বের হচ্ছে, সবসময় বিষণ্ণতায় ভুগছে, নিজের পরিবারের লোকজন আত্মীয়-স্বজন দূরে সরে যাচ্ছে, জায়গা হচ্ছে না নিজের পরিবার বা সমাজের কোথাও। সবকিছুর আড়ালে চলে যাওয়া বিপন্ন এক দুর্বিষহ জীবন এটাই হলো ‘মহিলাজনিত ফিস্টুলা’।
মহিলাজনিত ফিস্টুলা কি?
মহিলাজনিত ফিস্টুলা হলো মাসিকের বা প্রসবের রাস্তার সঙ্গে মূত্রথলি/মূত্রনালি অথবা মলাশয়ের সঙ্গে এক বা একাধিক অস্বাভাবিক ছিদ্র হয়ে যুক্ত হওয়া যার ফলে মাসিকের রাস্তা বা প্রসবের রাস্তা দিয়ে দিনে-রাতে সবসময় প্রস্রাব অথবা পায়খানা অথবা উভয়ই ঝরে।
মহিলাজনিত ফিস্টুলার কারণ :
মহিলাজনিত ফিস্টুলা হওয়ার কারণ মূলত দুটি।
১) প্রসবজনিত কারণে ফিস্টুলা,
২) অস্ত্রোপচারজনিত কারণে ফিস্টুলা।
এ ছাড়া আঘাতজনিত কারণেও ফিস্টুলা হতে পারে। যেমন- দুর্ঘটনাজনিত কারণে, দলবদ্ধ ধর্ষণের কারণ ইত্যাদি।
প্রসবজনিত ফিস্টুলা :
প্রসবজনিত ফিস্টুলা হয় মূলত দীর্ঘস্থায়ী বা বাধাগ্রস্ত প্রসবের ফলে। প্রসব দীর্ঘস্থায়ী অর্থাৎ ১২ ঘণ্টার বেশি হলে মহিলাদের ফিস্টুলা হওয়ার ঝুঁকি ও সম্ভাবনা বেশি থাকে। প্রসবের সময় বাচ্চার মাথা মায়ের প্রসব রাস্তার নরম অঙ্গসমূহকে চাপ দিয়ে রাখে। বাচ্চার মাথার এই চাপের ফলে মায়ের প্রসবের রাস্তার নরম অঙ্গসমূহের মধ্যে রক্ত সঞ্চালন বাধাগ্রস্ত ও বন্ধ হয়ে যায়। যদি প্রসব দীর্ঘস্থায়ী হয় (১২ ঘণ্টার বেশি), তাহলে মায়ের ওই চাপে পড়া অঙ্গসমূহে পচন ধরে এবং খসে পড়ে। এর ফলে মাসিকের রাস্তা বা প্রসবের রাস্তার সঙ্গে মূত্রথলি/নালি অথবা পায়খানার রাস্তা অথবা উভয়ের মধ্যে এক অস্বাভাবিক ছিদ্র তৈরি হয়। এর ফলে প্রসবের বা মাসিকের রাস্তা দিয়ে সবসময় অথবা মাঝে মাঝে প্রস্রাব অথবা পায়খানা অথবা উভয়ই ঝরতে থাকে। এই অবস্থাটিকেই প্রসবজনিত ফিস্টুলা বলে।
অস্ত্রোপচারজনিত ফিস্টুলা :
অস্ত্রোপচারজনিত ফিস্টুলা সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে বাচ্চার জন্মের সময় অসাবধানতাবশত ধারালো অস্ত্রের আঘাতে ফিস্টুলা হয়। এ ছাড়া মহিলাদের তলপেটে, যোনিপথে বা জরায়ুতে অন্য যে কোনো ধরনের অপারেশনের সময়ও অসাবধানতাবশত ধারালো অস্ত্রের আঘাতে ফিস্টুলা হতে পারে।
বাংলাদেশে ফিস্টুলা হওয়ার অনেকগুলো কারণের মধ্যে বাল্যবিয়ে, কুসংস্কার, অশিক্ষা, দারিদ্রতা, ন্যূনতম যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকা, প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাস করা অন্যতম। “আমরা কিশোরী, ফিস্টুলা মুক্ত দেশ গড়ি” কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশের একেবারে প্রতন্ত অঞ্চল যেখানে এখনো পর্যন্ত কোনো উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই বা গড়ে উঠেনি সেই সব অঞ্চলে মহিলাজনিত ফিস্টুলা প্রতিরোধে ৯ম ও ১০ম শ্রেণির স্কুলপড়–য়া মেয়েরা বিশেষভাবে ভ‚মিকা রেখে চলেছে। “আমরা কিশোরী, ফিস্টুলা মুক্ত দেশ গড়ি” এই কর্মসূচির একটি বিরাট অর্জন হলো ৯ম ও ১০ম শ্রেণিতে পড়–য়া কিশোরী মেয়েরা তারা নিজেরা ১৮ বছরের আগে বিয়ে করবে না মর্মে শপথ নেয় এবং নিরাপদ গর্ভধারণ ও নিরাপদ প্রসবের জন্য এএনসি, পিএনসি, প্রসব পরিকল্পনা, পুষ্টি, পরিবার-পরিকল্পনা পদ্ধতি ইত্যাদি সম্পর্কে নিজেরা বিশেষ জ্ঞান লাভ করে যা তাদের পরবর্তী জীবনে খুবই কাজে লাগে।
বাংলাদেশে ফিস্টুলা সমস্যাটি কত বড় সেটা নিয়ে দীর্ঘদিন ধোঁয়াশা থাকলেও বর্তমানে তা পরিষ্কার। ২০১৬ সালে পরিচালিত জাতীয় মাতৃস্বাস্থ্য ও মাতৃত্বজনিত অসুস্থতা সম্পর্কিত জাতীয় সমীক্ষা অনুযায়ী বাংলাদেশে বর্তমানে মহিলাজনিত ফিস্টুলা আক্রান্ত মোট রোগীর সংখ্যা ১৯,৫০০। অর্থাৎ বাংলাদেশে জীবনে একবার অন্তত বিয়ে হয়েছে এমন প্রতি ১০ হাজার নারীর মধ্যে ৪ জন নারী ফিস্টুলা রোগে ভুগছেন।
জাতিসংঘ এই প্রজন্মেই ফিস্টুলা অবসানের লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। এর সরল অর্থটি হলো ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বকে ফিস্টুলা মুক্ত করা। বাংলাদেশ সরকার জাতিসংঘের এই লক্ষ্যের আলোকে নির্দিষ্ট কৌশলগত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। লক্ষ্যমাত্রাটি হলো ২০৩০ সাল থেকে আর কোনো মহিলা নতুন করে প্রসবজনিত ফিস্টুলায় আক্রান্ত হবেন না। আর যারা বর্তমানে ফিস্টুলায় আক্রান্ত আছে, সেটি প্রসবজনিত হোক আর অস্ত্রোপচারজনিত হোক তাদের সবাইকে অপারেশনের আওতায় এনে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা। যেসব ফিস্টুলা রোগীদের চিকিৎসার পর ভালো হয়ে গেছে তাদের মধ্যে যাদের পুনর্বাসন সুবিধা দরকার তাদের জন্য পুনর্বাসন সুবিধা নিশ্চিত করা। যারা পরিবার অথবা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন তাদের পুনর্মিলনের ব্যবস্থা করা। যে সব মহিলা চিকিৎসার পর ভালো হয়নি বা আর ভালো হওয়ার সম্ভাবনাও নেই তাদের জন্য একটি ধারাবাহিক সেবার ব্যবস্থা করা।
জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে কিশোরী মেয়েরাও বিশেষ অবদান রেখে চলেছে। নির্বাচিত এলাকার কিশোরী মেয়েরা তাদের গ্রামে আর কোনো মহিলা যাতে ফিস্টুলা আক্রান্ত হতে না পারে সেজন্য তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে একটি প্রাথমিক জরিপ সম্পন্ন করে। জরিপের সময় তারা গর্ভবতী মহিলাদের তালিকা করে। এ ক্ষেত্রে তারা স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীর সহযোগিতাও নিয়ে থাকে। তালিকাকরণের পর গর্ভবতী মহিলার সব থেকে নিকটতম কিশোরী মেয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয় যে পরবর্তী সময়ে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা ও পরামর্শ প্রদান করে থাকে।
“এই প্রজন্মেই ফিস্টুলার হোক অবসান”। বাংলাদেশকে ফিস্টুলা মুক্ত করার জন্য একটি সামগ্রিক সামাজিক আন্দোলন প্রয়োজন। এই আন্দোলনে আপনিও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশকে একটি ফিস্টুলা মুক্ত সুস্থ জাতি উপহার দিতে এগিয়ে আসুন।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা