গণফোরামের ইফতারে পার্টিতে আওয়ামী লীগ

আগের সংবাদ

নয়াপল্টনে রিজভীর নেতৃত্বে ঝটিকা মিছিল

পরের সংবাদ

কাজের লোক

প্রকাশিত হয়েছে: মে ২৬, ২০১৯ , ৯:২৫ অপরাহ্ণ | আপডেট: মে ২৬, ২০১৯, ৯:২৫ অপরাহ্ণ

মাকিদ হায়দার

কবি ও প্রাবন্ধিক।

চেয়ার কখনোই শূন্য থাকতে চায় না। সে জানে তাকে ছাড়া চলবে না। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘সমাজ বিলাসের ফাঁস’ নিবন্ধে জানিয়েছেন- ‘আমাদের সমাজেও এমন একটি দীনতা আসিয়াছে যে, টাকা নাই ইহাই স্বীকার করা আমাদের পক্ষে সকলের চেয়ে লজ্জাকর হইয়া উঠিয়াছে। ইহাতে ধনাড়ম্বরের প্রবৃত্তি বাড়িয়া ওঠে, লোকে ক্ষমতার অতিরিক্ত ব্যয় করে। সকলেই প্রমাণ করিতে বসে যে আমি ধনী।’ যেমন করেছিলেন সৈয়দ সাহেব তার উৎকোচের অর্থে। তিনি যে ‘কাজের লোক’ তাকে দেখে আমার মনে পড়েছিল নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্যের বিখ্যাত পদ্যটি। কাজের লোক।

কবি নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্য গত শতকে অনেক কবিতা লিখলেও সেগুলো আমাদের স্কুলজীবনে পাঠ্য হয়নি। হয়েছিল তারই একটি মাত্র বিখ্যাত কবিতা ‘কাজের লোক’। ১৯৫৬ সালে আমরা যারা কিশোর এবং বিভিন্ন বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র ছিলাম তাদের জন্য তৎকালীন শিক্ষা বোর্ড মনোনীত করেছিল কাজের লোক কবিতাটিকে। মনে হলো সেই কবিতাটির দুই একটি চরণ, ‘মৌমাছি, মৌমাছি কোথা যাও নাচি নাচি’। মৌমাছি যে কর্মঠ প্রাণী, তারা যে বন থেকে বনান্তরে মধু আহরণের জন্য ছুটে যায় সেটি বলাই নিষ্প্রয়োজন। দেহগত দিক থেকে তারা ছোট হলেও তাদের পরিশ্রমের ফসল হলো মধু। তাদের হাতে দাঁড়ানোর সময় নেই। যেমন সময় নেই আমাদের দেশের অনেক রাজনীতিবিদের। একদা সময় ছিল যখন তাদের ভোটের প্রয়োজন ছিল, তখন সেসব সংসদ প্রার্থী, চেয়ারম্যান এবং কাউন্সিলর পদপ্রার্থী এসে দাঁড়াতেন ভোটদাতাদের বাড়ির সামনে সদলবলে। তার ‘উট’ মার্কা প্রতীকে যেন একটি ভোট অবশ্যই দেই, যাওয়ার আগে উটের দড়ি ধরে যে সকল রাখালেরা প্রত্যেক প্রাপককে মাঝখানে রেখে সমস্বরে প্রার্থনা করতেন একটি ভোট তাকে দিলে দেশের জনগণের এবং এলাকার উন্নয়নে গ্রাম আর গ্রাম থাকবে না, হয়ে যাবে অচিরেই একটি থানা, তখনই সরকার ঘোষণা করবেন উপজেলা। হবে হাসপাতাল ৫০ শয্যার এবং এমন সময় মাইকের বিভ্রান্তি ঘটায় এবং এর পরের শব্দ আর শোনা গেল না, তবে বড় বাজারের সকলেই দেখলেন, সৈয়দ রোকন আলীর খুবই দামি আদ্দি কাপড়ের ফিনফিনে পাঞ্জাবি ভিজে চুপসে গিয়েছে। সৈয়দ সাহেবের সমর্থকরা তারাও চৈত্রের কড়া রৌদ্রে চুপসে গেলেও সমর্থকদের দুজন হাতপাখা দিয়ে সৈয়দ রোকন আলীকে বাতাস দিয়ে ঠাণ্ডা বাতাসে সিক্ত করার চেষ্টায় লিপ্ত থাকলেও তারা দুজনও যে ঘর্মাক্ত, সেটি জেনেও এগিয়ে চলেছেন বড় বাজারের শেষ প্রান্তে, যে প্রান্তে আছেন আরেকজন চেয়ারম্যান প্রার্থী, কাজী গোলাম হোসেন, তিনি আগেও বারদুয়েক পদপ্রার্থী হয়েছিলেন ‘তালগাছ’ প্রতীকে, দ্বিতীয়বার ‘ঘোড়ার গাড়ি’ প্রতীকে। এবার প্রতীক পেয়েছেন সেই ‘হাতপাখা’ যে হাতপাখা দিয়ে সৈয়দ সাহেবের সমর্থকরা বাতাস দিতে দিতে সৈয়দ সাহেবের ঘর্মাক্ত শরীরসহ এগিয়ে আসছেন কাজী সাহেবের ভোটকেন্দ্রের দিকে।

ভোট শুরু হবে এই চৈত্র মাসেই। তার আগেই বিভিন্ন প্রতীকের ছাপানো হাজার হাজার পোস্টার, গাছে, বৈদ্যুতিক খাম্বায়, মানুষের বাড়ির দেয়ালে, এমনকি গোয়াল ঘরের পাটখড়ির বেড়াতেও লাগানো হয়েছে সৈয়দ সাহেবের উট মার্কা পোস্টার। সেই প্রেক্ষিতে কাজী সাহেবের হাতপাখার উপস্থিতি নেই বললেই চলে, কেননা কাজী সাহেব একদা একটি স্কুলে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছেন। শিক্ষকতা শেষ হওয়ার মাত্র বছর চারেক আগে, তাকে এবং তার আশপাশের কয়েকটি স্কুলের শিক্ষকদের নিয়ে ঢাকার প্রেসক্লাবের সামনে সামান্য একটি দাবির আশায় সব শিক্ষককের প্রতিনিধি হতে হয়েছিল কাজী সাহেবকে। দাবি তাদের গ্রামের ওই স্কুলটিকে অচিরেই এমপিওভুক্ত করতে হবে। প্ল্যাকার্ড, ব্যানারও বানিয়ে এনেছিলেন। দাবি রাজপথেই উত্থাপিত হলেও সেই দাবি সরকার গ্রহণ না করলেও কাজী সাহেবের হ্যান্ডমাইকের বক্তৃতার একটি বিশাল ছবি ঢাকার কয়েকটি পত্রিকায় পেছনের পাতায় এবং আরো দুই-একটির প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছিল। আরো তাকে তার পরিবারসহ গ্রামের এবং সমগ্র বাংলাদেশের টেলিভিশন দর্শকরা দেখতে পেয়েছিলেন এবং শুনতে পেয়েছিলেন তার নাম। তিনি যে জনপ্রিয় একজন শিক্ষক নেতা কথাটি শুনতে তার ভালো লাগলেও লাগেনি তাদেরই গ্রামের সৈয়দ রোকন আলীর। সৈয়দের দাবি তাদের পূর্ব পুরুষরা বঙ্গে এসেছিলেন পবিত্র ভূমি আরব থেকে ইসলাম ধর্ম প্রচারের এবং প্রসারের লক্ষ্যে। গর্বিত সৈয়দ রোকন আলীর পিতামহ তার মৃত্যুর আগেই তিনি নাম লিখিয়েছিলেন পাকিস্তান আন্দোলনের সপক্ষে। বাড়িঘর বানিয়েছিলেন নাটোর শহরের রাজবাড়ির বেশ কিছুটা পশ্চিমে। একই সঙ্গে তিনি স্থানীয় একটি মসজিদে ইমামতি করতেন, তৎসঙ্গে মুসলিম লীগের রাজনীতি। রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার সুবাদে মাঝেমধ্যে কলকাতায় যেতেন এবং মিছিল-মিটিংয়ে প্রথম সারিতেই তিনি ‘লড়কে লেঙ্গের’ বিশাল ব্যানারের কোণা ধরেই এগিয়ে যেতেন। কখনো পার্ক স্ট্রিট দিয়ে। আবার কখনো ধর্মতলা দিয়ে। সেই ব্যানারসহ একটি বিশাল ছবি ছাপা হয়েছিল কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায়। দুর্ভাগ্যবশত সৈয়দ রোকন আলীর পিতামহ হঠাৎ একটি কঠিন অসুখেই অথবা তিনি হঠাৎ হার্টফেল করেছিলেন সে কথা সেই মিছিলের লোকজন কেউই বলতে পারেননি, তার হঠাৎ মৃত্যুর খবরও সেই সময়ের ‘লোক সেবক’ অমৃতবাজার পত্রিকাসহ আরো কয়েকটি পত্রিকায় ছবিসহ ছাপা হয়েছিল। তবে অন্য একটি পত্রিকায় তার মৃত্যুর শোক সংবাদ শেষে লেখা হয়েছিল নাটোর নিবাসী সৈয়দ কাজিম আলী পাকিস্তানের একজন লড়াকু সৈনিক হিসেবেই নিজের জীবন পাকিস্তানের জন্য উৎসর্গ করে গেলেন।

সৈয়দ রোকন আলীর পিতামহের মিছিলের যে ছবিটি কলকাতার পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল সেই ছবিটিকে এবং তার মৃত্যুর খবরের কাগজের কাটিং পরবর্তীতে বিশাল এক কাচের ফ্রেমে বড় বড় অক্ষরে লিখে এবং পত্রিকায় ছাপা হওয়া ছবি এবং খবর পাশাপাশি তিনি ঝুলিয়ে রেখেছেন। কোনো আগন্তুক এলে তিনি সেই আগন্তুককে আকারে-ওকারে কোনো না কোনোভাবে পাকিস্তানের প্রসঙ্গ এনে তার পিতামহের গুণকীর্তনের সঙ্গে জানিয়ে দেন সোনার পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা কবি ইকবালের নাম এবং পাকিস্তানের জনক জিন্নার কথা। সেই জিন্না সাহেবের একটি ছবি তার দাদার আমল থেকে মুক্তিযুদ্ধের সময় পর্যন্ত থাকলেও পরবর্তীতে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেই জিন্নার সেই ছবি উধাও হয়ে গিয়েছিল, দেয়াল থেকে অনুরূপভাবে সৈয়দ রোকন আলীও পালিয়ে গিয়েছিলেন নাটোর থেকে উল্লাপাড়ায়। উল্লাপাড়ায় মুক্তিযোদ্ধারা তাকে ধরার আগেই তিনি পালিয়ে চলে গিয়েছিলেন লাহিড়ীমোহনপুরের উধুনিয়া গ্রামে, তার আরেক আত্মীয়ের বাড়িতে। তিনি শান্তি কমিটিতে সরাসরি সম্পৃক্ত না হলেও ছিলেন উপদেষ্টা। তারই উপদেশে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের তরুণরা ধৃত হলেও পাকিস্তানের না-পাক সৈনিকদের তিনি হত্যা করতে দেননি। পাকিদের যে ক্যাপ্টেন ছিলেন তিনি নাকি ‘সৈয়দ’ নামটি শুনেই সৈয়দ রোকন আলীর পায়ে হাত দিয়ে বলেছিলেন, সৈয়দরা হলো নবীজীর বংশধর, আপনি যা বলবেন তাই হবে। তবে কাউকে হত্যা না করে দুই-চার ঘা দিয়ে ছেড়ে দিয়েছিল সেই পাঞ্জাবি ক্যাপ্টেন সাহেব। হিন্দু-মুসলিম তরুণরা ছিল মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে।

আজ কয়েকদিন যাবৎ সেই কথাটিই আলোচিত হচ্ছে, আলোচনা করছেন তার সমর্থকরা। এবং ভোটদাতাদের বোঝাতে চাইছেন, সৈয়দ সাহেবের মতো মহৎ প্রাণ, সমগ্র নাটোর শহরে দ্বিতীয়জন আছেন কিনা আপনারা খুঁজে বের করুন। উপস্থিত বাজারের লোকজনদের কেউ কেউ বললেন উনিতো ১৯৭১ সালে- ঠিক তখনই বিভ্রাটে নিমজ্জিত, মাইক ঠিক হয়েই গর্জে উঠল সৈয়দ রোকন আলী চেয়ারম্যান হলেই সর্বত্রই উন্নয়ন আছে। সেইসঙ্গে ভাইসব উট মার্কায় ভোট দিলে সবাই থাকবেন সুখে-শান্তিতে, শীতল বাতাসের নিচে।

স্কুল শিক্ষক কথাগুলো শুনলেন, সত্যি কি তাই? সৈয়দ সাহেব শীতল বাতাসের ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন? নিজেকেই বার কয়েক প্রশ্ন করলেন এবং এই শতকের গোড়ার দিকে একটি রাজনৈতিক দলের বিশেষ এক নেতা তাদেরই নাটোরের লালপুরের। যিনি একদা পাবনা শহরের লাহিড়ীপাড়া মহল্লায় এডভোকেট আমিন উদ্দিন এবং ‘তৃপ্তি নিলয়’ বাসভবনে জায়গীর থেকে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ থেকে পাস করে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ছাত্রলীগের বিশাল নেতা হয়েছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ছাত্রনেতা তিনি আশা করেছিলেন একদিন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী হবেন। সেটি হননি, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এমনকি ওই লালপুরেই তিনি চেয়েছিলেন যেন সাংসদ হওয়ার একটি টিকেট তাকে দেয়া হয়। দুর্ভাগ্যবশত সেটিও যখন জুটল না তখনই তিনি নৌকার মাল্লাগিরি ছেড়ে দিয়ে পাড়ি জমালেন ধানের ক্ষেতে। সেই ধানের ক্ষেত থেকেই একদিন তাকে মন্ত্রীরূপে দেখতে পেয়েছিলেন নাটোরবাসী। সেই দেখতে পাওয়ার ভেতরে ছিলেন আজকের হাতপাখা মার্কায় ভোট পদপ্রার্থী সাবেক স্কুল শিক্ষক। শিক্ষক খুব আশায় আশায় ছিলেন বর্তমান মন্ত্রীর কাছে গেলে হয়তো তিনি তার হাতেগড়া সেই স্কুলটিকে এমপিওভুক্ত করে দেবেন। অনেকবার নাটোর এবং ঢাকায় যাওয়া-আসা শেষে কোনো কাজই হয়নি। মন্ত্রী মহোদয়কে তার দলের লোকজন হয়তো দুটি কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন ওই নৌকাপন্থি কাজী সাহেবের স্কুলটিকে যদি এমপিওভুক্ত করে দেন তাহলে একদিন ওই মাঝিমাল্লারই নাম হবে। লোকটি নেতা হতে চান, হয়েও যাবেন। কিন্তু আপনি যে স্কুলটিকে এমপিওভুক্ত করে দিলেন, কেউ আপনার নাম মনে রাখবে না। নাম মনে রাখবে ওই কাজী গোলাম হোসেনেরই। কথাটি মনঃপূত হয়েছিল মন্ত্রী মহোদয়ের।

মাঝখানে সময় গিয়েছে, গিয়েছে অনেক কিছু বদলে, ইতোমধ্যে রাজনীতিতে এসেছে পরিবর্তন, সেই পরিবর্তনের হাত ধরেই কাজী সাহেবসহ অন্য স্কুলের শিক্ষকরা এসেছিলেন, ঢাকার প্রেসক্লাবের সামনে ফেস্টুন, প্ল্যাকার্ড হাতে, তাদের ভেতরে কেউ কেউ অনশন করে জয়ী হয়েছিলেন এবং পেয়েছিলেন স্কুলের এমপিওভুক্তির সনদ। এবং অচিরেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন কাজী গোলাম হোসেন, হোসেন সাহেব নাকি স্কুলটিকে একদিন কলেজে রূপান্তরিত করবেন। তার ইচ্ছের কথা কেউ কেউ জেনেছিলেন এবং তারাই জানিয়েছিলেন গ্রামের জনগণকে। কাজী সাহেবের ইচ্ছের কথা, সৈয়দ সাহেবের কানেও গিয়েছিল, তবে সে সবই ইউনিয়ন কাউন্সিলের ভোটের বেশ কিছুদিন আগে। কাজী সাহেবের সুহৃদরা কাজী সাহেবকে অনেক অনুনয় বিনয় করে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন চৈত্র মাসের ইউনিয়ন কাউন্সিলের আসন্ন নির্বাচনে। সেই নির্বাচনে কাজী সাহেব এবং তার হাতপাখার কোনো পোস্টার কোথাও না থাকলেও জনগণ তাকে নির্বাচিত করেছিলেন চেয়ারম্যান পদে। নির্বাচিত হওয়ার কল্যাণে সেই রাতেই তার টিনের চালার বাড়িতে মাঝরাতে অঝোরধারায় পড়েছিল ইটপাটকেল। কাজী সাহেব ইটপাটকেলে চিন্তিত না হয়ে এমনকি প্রতিবেশীদের কাউকে সেই মধ্যরাতে না ডেকে, ধিক্কার দিয়েছিলেন তাদের যারা তাকে উৎসাহিত করেছিলেন ভোট ভোট খেলায়। মাঝখানে দুদিন সরকারি ছুটি থাকায় কাউকে কিছু না জানিয়ে উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত দিয়ে এসেছিলেন, তিনি ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান পদ থেকে অব্যাহতিপত্র দিয়েছিলেন। যথারীতি সেটি গৃহীত হয়তো হয়েছিল কিংবা না হলেও কাজী সাহেব নিজেই একদিন গিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন সৈয়দ রোকন আলীর বাসভবনে। সৈয়দ সাহেবও বুঝতে পারেননি হঠাৎ চেয়ারম্যান সাহেবের আগমনের হেতু কী হতে পারে।

কিছু সময় চিন্তা শেষে সৈয়দ সাহেব জানতে চাইলেন কাজী সাহেবের আগমনের হেতু। সারল্যে উদ্ভাসিত হয়ে কাজী সাহেব জানালেন, এই বৃদ্ধ বয়সে আমার চেয়ারম্যান হওয়ার সাধ নেই, জনা কয়েক লোকের কথায় এবং তাদের পরামর্শে দাঁড়িয়েছিলাম ভোট ভোট খেলায়। সেই খেলায় আমি জিতে গেলাম কেমন করে ভাবতেই শিউরে উঠি। কেননা আমার কোনো পোস্টার-ব্যানার কোথাও না থাকার পরও লোকজন আপনাকে ছেড়ে কেন যে আমাকে ভোট দিল এখনো বুঝে উঠতে পারছি না। আমি পারছি না ভেবেই আগেই থানা নির্বাহী অফিসারের কাছে লিখিত দিয়ে এসেছি। চেয়ারম্যান পদ থেকে অব্যাহতি চাই। কথাটি শোনার পরে সৈয়দ সাহেব হতবাক হয়েছিলেন এবং মনে খুশিও হয়েছিলেন তিনিই হচ্ছেন পরবর্তী চেয়ারম্যান। কিন্তু বিধিবাম, সবকিছু কেমন ওলট-পালট করে দিল ২০০৭-এর তত্ত্বাবধায়ক সরকার, বরং অনেকেই পেলেন শাস্তি উপহার। সেই শাস্তি উপহার থেকে সৈয়দ সাহেবও রেহাই পেলেন না। বেশ কয়েক বছর আগে তিনি যখন সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত ছিলেন তখনই একটি বিশাল অঙ্কের উৎকোচ গ্রহণের দায়ে অভিযুক্ত হলেও, সৈয়দ সাহেবের কিছুই হয়নি। না হওয়ার নেপথ্যে ছিলেন, তারেদই নাটোর জেলার লালপুরেরই সেই মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী মহোদয়। ২০০৭-এর সরকার জানতেন সৈয়দ রোকন আলীর উৎকোচ গ্রহণের তথ্য। তাই তাকে যেতে হয়েছিল মানুষের অন্তরালে ১৪ শিকের ভেতরে। কাজী গোলাম হোসেন নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন ধর্মের পথে। তবে চেয়ারম্যানের চেয়ারটি শূন্য ছিল না। চেয়ার কখনোই শূন্য থাকতে চায় না। সে জানে তাকে ছাড়া চলবে না। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘সমাজ বিলাসের ফাঁস’ নিবন্ধে জানিয়েছেন- ‘আমাদের সমাজেও এমন একটি দীনতা আসিয়াছে যে, টাকা নাই ইহাই স্বীকার করা আমাদের পক্ষে সকলের চেয়ে লজ্জাকর হইয়া উঠিয়াছে। ইহাতে ধনাড়ম্বরের প্রবৃত্তি বাড়িয়া ওঠে, লোকে ক্ষমতার অতিরিক্ত ব্যয় করে। সকলেই প্রমাণ করিতে বসে যে আমি ধনী।’ যেমন করেছিলেন সৈয়দ সাহেব তার উৎকোচের অর্থে। তিনি যে ‘কাজের লোক’ তাকে দেখে আমার মনে পড়েছিল নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্যের বিখ্যাত পদ্যটি। কাজের লোক।

মাকিদ হায়দার : কবি ও প্রাবন্ধিক।