শতবর্ষে বঙ্গবন্ধু: জুলিও কুরি শান্তি পদকের প্রাসঙ্গিকতা

আগের সংবাদ

বালিতে কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন কৌশানী?

পরের সংবাদ

ভারতজুড়ে মোদি-সুনামি

প্রকাশিত হয়েছে: মে ২৪, ২০১৯ , ৮:২৮ অপরাহ্ণ | আপডেট: মে ২৪, ২০১৯, ৯:৩৩ অপরাহ্ণ

বিভুরঞ্জন সরকার

যুগ্ম সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়

মোদি জিতলে ভারত জিতবে। এই প্রচারণা কাজে দেয়। মানুষ মোদিতে আকৃষ্ট হয়েছেন চুম্বকের মতো। মোদি তাদের কি দিয়েছেন, মোদি তাদের কি দেবেন সে সব বিষয় নিয়ে খুব মাথা ব্যথা ছিল বলে মনে হয়নি। বিরোধীরা যত চেষ্টা করেছেন মোদিকে বিচ্ছিন্ন করতে, ঘায়েল করতে মোদি তত মানুষের হৃদয় কেড়েছেন। সব কিছু হয়ে উঠেছে মোদিময়। নির্বাচনের ফল তার বড় প্রমাণ। একক শক্তি হিসেবে বিজেপির বিস্ময়কর উত্থান ভারতীয় গণতন্ত্রের জন্য কোনো ঝুঁকি তৈরি করছে কিনা সেটাও এখন একটি বড় প্রশ্ন হয়ে আসবে। শক্তিশালী নেতৃত্ব শক্তিশালী গণতন্ত্রের পথ সুগম করলেই ভালো।

রাজনৈতিক পণ্ডিত-বিশ্লেষকদের সব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ভুল প্রমাণ হয়েছে ভারতের লোকসভা নির্বাচনে। রাজনৈতিক বা ভোট সুনামির কোনো পূর্ব-সতর্কতা ছিল না। অথচ এবারো বিশাল ভারতের নির্বাচনে মোদি-সুনামি সব হিসাব-নিকাশ ওলটপালট করে দিয়ে বিজেপি জোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ম্যাজিক সংখ্যা ২৭২ আসন বিজেপি এককভাবেই পেয়েছে। ৫৪২ আসনের ভারতীয় লোকসভার সাড়ে তিনশ আসন বিজেপি এবং তার মিত্ররা পেয়েছে।

এখন এ নিয়ে কারো মনে কোনো সংশয় নেই যে, নরেন্দ্র মোদি হতে চলেছেন দ্বিতীয় দফায় প্রধানমন্ত্রী। ‘ফির একবার, মোদি সরকার’। হ্যাঁ, মোদি শুধু পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র ভারতে পরপর দুবার ক্ষমতায় ফেরার নজির স্থাপনই করলেন না, তিনি ভারতের রাজনীতির মানচিত্রে অনেক পরিবর্তনেরও সম্ভবত সূচনা করলেন। ১১ এপ্রিল থেকে ১৯ মে পর্যন্ত মোট সাত দফায় ভোট হয়েছে ভারতে।

নির্বাচনী প্রচারণার শুরুতে বলা হচ্ছিল এবার নির্বাচনে জেতা মোদির জন্য সহজ হবে না। কারণ ২০১৪ সালের নির্বাচনে যে মোদি-ঝড় বয়ে গিয়েছিল, এবার তেমন ঝড়ের সম্ভাবনাও কেউ দেখতে পাননি। এ ছাড়া গত পাঁচ বছর দেশ শাসন করে নিশ্চয়ই মোদি জনপ্রিয়তা হারিয়েছেন। তার শাসনকাল নিয়ে অনেকের মধ্যেই অসন্তোষ্টি আছে। দুয়েকটি রাজ্য নির্বাচনে কংগ্রেস ভালো ফল করায় এবং প্রিয়াঙ্কা গান্ধী সরাসরি রাজনীতিতে নামায় ধারণা করা হচ্ছিল যে কংগ্রেস এবার তার হৃত গৌরব হয়তো পুনরুদ্ধার করতে পারবে। এ ছাড়া রাজ্যে রাজ্যে কিছু আঞ্চলিক দল শক্তিশালী মোদিবিরোধী অবস্থানে থাকায় মনে করা হচ্ছিল যে, এবার নির্বাচনে জিততে মোদিকে বিরাট চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। এসবের কিছুই হয়নি। বাইরের অবস্থা এবং ভেতরের বাস্তবতার মধ্যে যে তফাৎ ছিল, সেটা অনেকের নজরে পড়েনি।

ধারণা করা হয়েছিল, উত্তর প্রদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি তথা মোদিকে বড় ধাক্কা দেবে। হিন্দিবলয় মোদির দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। মোদিকে ক্ষমতা থেকে বিদায় করার জন্য একটা সাজসাজ রব পড়ে গিয়েছিল। উত্তর প্রদেশের ভোট কেন্দ্রে সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এমনও বলা হয়ে থাকে যে, উত্তর প্রদেশ যার গোটা ভারত তার। এবার উত্তর প্রদেশ থেকে মোদিকে খালি হাতে বিদায় করার একটি আওয়াজ তোলা হয়েছিল। লোকসভার সবচেয়ে বেশি আসন (৮০) এই রাজ্যে। মোদিকে রুখতে এই রাজ্যে জোটবদ্ধ হয়েছিলেন রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বহুজন সমাজ পার্টির ময়াবতী এবং সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব। ধারণা করা হচ্ছিল এই জোট মোদির জন্য বিপদ ডেকে আনবে।

পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলে আসছিলেন যে, এবার তার রাজ্যের একটি আসনও পাবে না বিজেপি। ৪২ আসনই থাকবে তৃণমূলের দখলে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্বাচনী কৌশল ছিল আক্রমণাত্মক। তিনি ছিলেন অতি আত্মবিশ্বাসী। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্নও তিনি দেখতেন। পশ্চিমবঙ্গে ৪২ আসন কব্জা করে মমতা বিজয় কেতন উড়ানোর খোয়াবে এতটাই বেপোয়ারা ছিলেন যে, প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করতে গিয়ে তার ভাষা, শব্দচয়ন মানসম্পন্ন ছিল না। প্রধানমন্ত্রী মোদির বিরুদ্ধে বলতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই শালীনতা-সৌজন্যের সীমা লঙ্ঘন করেছেন। তবে নির্বাচনী ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, মমতার ঔদ্ধত্য পশ্চমবঙ্গবাসী ভালোভাবে নেননি। দিদির প্রতি বিরক্তি বেড়েছে, মোদির প্রতি বেড়েছে অনুরাগ। মমতার দুর্গে শক্ত কামড় দিতে সক্ষম হয়েছে বিজেপি। দুই থেকে বিজেপির আসন সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮। মমতার তৃণমূল ৩৬ থেকে ২২-এ নেমে এসেছে।

বিজেপির আসন এবং ভোট দুটোই বেড়েছে আগেরবারের চেয়ে। মোদির ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা তো একেবারে তুঙ্গে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মানুষ মোদির মতো একজনকে, আরো স্পষ্ট করে বললে মোদিকেই চেয়েছেন। মোদি মানুষের মনে একই সঙ্গে আস্থা ও আশাবাদ তৈরি করতে পেরেছেন। বিজেপির চেয়ে মোদি বড়।

নির্বাচনের প্রচার কৌশলে বিজেপি এগিয়েছিল। বিজেপি ক্ষমতায় গেলে মোদি যে প্রধানমন্ত্রী হবেন তা নিয়ে কারো সন্দেহ ছিল না। কিন্তু তিনি না হলে প্রধানমন্ত্রী কে সেটা অনেকের কাছেই ছিল অস্পষ্ট, অজানা। কংগ্রেসের সামনে ছিল রাহুল গান্ধী। তাকে দেশের এক নম্বর নেতা হিসেবে মানতে অনেকেরই অনীহা ছিল। রাহুল নিজেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রজেক্ট করতে পারেননি। ক্যারিশম্যাটিক নেতা বলতে যা বোঝায় তিনি তা হয়ে উঠতে পারেননি। তাকে সব ক্ষেত্রে স্বতঃস্ফূর্ত মনে হয় না। এর বাইরে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যেসব নাম গণমাধ্যমে এসেছে, সাধারণ মানুষ বিবেচনায় নেয়নি। কোয়ালিশন সরকার নিয়েও ভারতের ভোটারদের আগ্রহ কম। তারা মনে করেন, কোয়ালিশন সরকার হলো দুর্বল সরকার। অনেক সময়ই কোয়ালিশন সরকার নিজেদের মধ্যে ঝগড়াঝাটির কারণে মেয়াদ পূরণ করতে পারে না।

নির্বাচনের আগে একটি জনমত জরিপ হয়েছিল কাকে ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান? ৮০ শতাংশের ওপর ভোট পেয়েছিলেন মোদি। দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন রাহুল গান্ধী, ভোট ছিল সাড়ে আট শতাংশের মতো। ময়াবতী, মমতারা ভোট পেয়েছিলেন এক শতাংশের নিচে। ওই জনমত জরিপকে অন্যরা গুরুত্ব না দিলেও বিজেপি দিয়েছে। মোদি যেহেতু সবচেয়ে জনপ্রিয় সেহেতু তাদের প্রচারণার কেন্দ্রে চলে আসেন। সারাদেশে এক আওয়াজ ‘ভোট ফর মোদি’। প্রতিটি আসনে একজন প্রার্থী আছেন কিন্তু তিনি যেন কলাগাছ। ভোট চাওয়া হয় মোদির জন্য। মোদি জিতলে সব হবে। মোদি জিতলে ভারত জিতবে। এই প্রচারণা কাজে দেয়। মানুষ মোদিতে আকৃষ্ট হয়েছেন চুম্বকের মতো। মোদি তাদের কি দিয়েছেন, মোদি তাদের কি দেবেন সে সব বিষয় নিয়ে খুব মাথা ব্যথা ছিল বলে মনে হয়নি। বিরোধীরা যত চেষ্টা করেছেন মোদিকে বিচ্ছিন্ন করতে, ঘায়েল করতে মোদি তত মানুষের হৃদয় কেড়েছেন। সব কিছু হয়ে উঠেছে মোদিময়। নির্বাচনের ফল তার বড় প্রমাণ।

ভারতের এই ১৭তম লোকসভা নির্বাচন ভারতের রাজনীতিতে কতগুলো বিষয় সামনে নিয়ে এসেছে। প্রথমত, শতাব্দী প্রাচীন দল কংগ্রেসের ভবিষ্যতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হাজির হয়েছে। এবার গতবারের তুলনায় কংগ্রেসের আসন সামান্য বেড়েছে। কিন্তু দলটির সর্বভারতীয় ইমেজ দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মোট ১৭টি রাজ্য ও কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলে কংগ্রেস খাতা খুলতে পারেনি। একটি আসনও পায়নি। দ্বিতীয়ত, কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বও আরেক দফা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ল। তিনি যে পারছেন না, দলকে এগিয়ে নেয়া দক্ষতা ও সক্ষমতা যে তার নেই এটা আবারো প্রমাণ হলো। তিনি সম্ভবত জনতার ভাষা বোঝেন না এবং জনতাও তার ভাষা বোঝে না। আমেথিতে তাদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী আসনটিও রাহুল ধরে রাখতে পারেননি। বিজেপির স্মৃতি ইরানির কাছে রাহুলের পরাজয় তার ভাবমূর্তিকে অনুজ্জ্বল করেছে। রাহুল সম্ভবত আঁচ করতে পেরেছিলেন যে আমেথিতে তার পায়ের নিচে মাটি আলগা হয়ে এসেছে। তাই তিনি কেরালায় গিয়ে দ্বিতীয় একটি আসনে নির্বাচন করেছেন এবং সেখানে জিতেছেন। দুই আসনে ভোট না করলে রাহুলকে সংসদের বাইরে থাকতে হতো।

তৃতীয়ত, ভারতের রাজনীতি থেকে বামপন্থিদের নাম এবার একেবারে মুছে গেছে। এক সময় যাদের ভাবা হতো বিকল্প তারা একেবারে ভেনিশ হয়ে গেল। ভারতের অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য এটি নিশ্চয়ই একটি খারাপ বিষয়। বামপন্থিরা কেরালা, পশ্চিমবঙ্গ এবং ত্রিপুরায় দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিল। তারা কেন মানুষের মন জয় করতে এভাবে ব্যর্থ হলো তা ভাবার বিষয়। কেন একটি আসনও বামেরা পেল না তা নিয়ে গবেষণা হওয়া উচিত।

চতুর্থত, কিছু কিছু রাজ্যে আঞ্চলিক দল শক্তিশালী হয়েছিল এবং তারা রাজ্যে সরকারও গঠন করতে সক্ষম হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ, দিল্লি, উত্তর প্রদেশ, বিহার, তামিলনাড়ু, অন্ধ্রসহ অনেক রাজ্যেই আঞ্চলিক দল এবং তার নেতারা নির্বাচনের সময় গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে ওঠেন। কেন্দ্রে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, মায়াবতী, অখিলেশ যাদব, চন্দ্রবাবু নাইডু, স্টালিন, নবীন পট্টনায়ক প্রমুখ নাম আলোচনায় আসে। কিন্তু এবারের নির্বাচন এই আঞ্চলিক দলগুলোরও কোমর ভেঙে দিয়েছে। সব জায়গায় থাবা ছড়িয়ে বিজেপি।

পঞ্চমত, এখন বিভিন্ন রাজ্যে যে অবিজেপি সরকার রয়েছে সেই সরকারগুলো ঝুঁকিতে পড়ল। বিজেপি চাইবে দুর্বল কোয়ালিশন সরকারগুলো অকার্যকর প্রমাণ করে নিজেদের সরকার গঠন করতে। পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন ২০২১ সালে। কিন্তু সে পর্যন্ত মমতা শান্তিতে থাকতে পারবেন তো? ভোটের আগেই বলা হয়েছিল তৃণমূলের ৪০ জন বিধায়ক নাকি বিজেপিতে যোগ দিতে চায়। এখন ভোটের পর কি এই সংখ্যা বাড়বে? বিজেপি কি সর্বগ্রাসী অবস্থানে যাবে? রাজ্যে নিজের সরকার না থাকলে কিছু সমস্যা তো হয়-ই। যেমন মমতার বিরোধিতার কারণে মোদি বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তা চুক্তি করতে পারেননি। এবার কি মমতা তিস্তার প্রশ্নে নমনীয়তা দেখিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা করবেন, নাকি মোদির সঙ্গে টক্কর অব্যাহত রাখবেন?

একক শক্তি হিসেবে বিজেপির বিস্ময়কর উত্থান ভারতীয় গণতন্ত্রের জন্য কোনো ঝুঁকি তৈরি করছে কিনা সেটাও এখন একটি বড় প্রশ্ন হয়ে আসবে।

শক্তিশালী নেতৃত্ব শক্তিশালী গণতন্ত্রের পথ সুগম করলেই ভালো। নির্বাচনী প্রচারণায় নানা তিক্ততা হয়। কিন্তু নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বিজয়ীরা যদি সবাইকে নিয়ে কাজ করার মানসিকতা দেখাতে পারেন তাহলে তারচেয়ে ভালো আর কিছু হয় না। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর এক টুইট বার্তায় নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, ‘আমরা একসঙ্গে বড় হই, একসঙ্গে সমৃদ্ধ হই। একসঙ্গে আমরা শক্তিশালী এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ভারত গড়ে তুলবো’। তার এই ঘোষণার বাস্তব প্রতিফলন দেখার অপেক্ষা এখন।

বিভুরঞ্জন সরকার: যুগ্ম সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়।