এক জীবনে দুবার আমরা মরতে পারি না | তারিক সুজাত

আগের সংবাদ

আজ প্রকাশিত হলো “ঢাকার ইতিহাসচর্চা ও মুনতাসীর মামুন”

পরের সংবাদ

সূর্য ওঠার আগে

রফিকুর রশীদ

প্রকাশিত হয়েছে: মে ২৩, ২০১৯ , ৬:১৬ অপরাহ্ণ

ঢাকা যাবার আগে শেফালি কিংবা আব্দুল গণিকে সূর্যখোলায় আসার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে এমন নয়। তারও ক’দিন আগে মেহেরপুরে গিয়ে কেদারগঞ্জ ইশকুলের আবু বকর মাস্টারের সঙ্গে দেখা, তাকে দিয়েই ঢাকা যাত্রার পরিকল্পনার খবর গণিকে জানানো হয়েছিল। সে খবর আব্দুল গণির কান পর্যন্ত পৌঁছেছে কিনা তাই বা কে জানে! ঢাকা থেকে বাড়ি আসার পর শেফালির মুখটা খুব মনে পড়ে মুজিবুর রহমানের। প্রথম সন্তান, প্রথম স্বপ্ন। ওর মায়ের মতো কাদামাটির মাখা মন। সবার চেয়ে বেশি করে বাপের মন বোঝে। নাতি-নাতনি দুটোও হয়েছে তেমনি গা-ন্যাওটা। নানা-নানিকে কাছে পেলে ছাড়তেই চায় না। প্রতিবারই বিদায় নেবার সময় ওদের না জানিয়ে পালিয়ে আসতে হয়।

কোন খোকার কথা জানতে চাইছে শেফালির মা, সেটা নির্ণয় করতেই যেন এতটা সময় লেগে যায়। এতক্ষণে তিনি সবিস্ময়ে উচ্চারণ করেন,
খোকা!
মায়ের প্রাণ ব্যাকুল হয়ে উথলে ওঠে,
খোকার কী হয়েছে? দেখা হয়নি?
হয়েছে। ওকে তুমি খোকা বলো কেন শেফালির মা?
শেফালির মা তো অবাক, এতদিন পর এ কি একটা প্রশ্ন হলো! এ অঞ্চলের সবাই তো ছেলেদের খোকা বলে ডাকে। নির্দিষ্ট কারো নাম খোকা নয়। হাফিজুরকে ওর আব্বা হাফিজুর রহমান বলে পূর্ণ নামেই ডাকেন। কিন্তু সাতই মার্চের পরদিন সকালে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সেই ঐতিহাসিক আমতলায় হাফিজুরকে দেখেই তিনি আবেগে উদ্বেলিত হয়ে ‘খোকা’ বলে ডেকে ওঠেন। হাফিজুরের চোখে-মুখেও ফুটে ওঠে বিস্ময়ের মুদ্রা। এমন উত্তাল সময়ে পিতার উপস্থিতিতে তার বিস্ময়, নাকি পিতার কণ্ঠে প্রথমবারের মতো খোকা ডাক শুনে সে বিস্মিত, সেটা ঠিক তক্ষুনি বুঝে ওঠা যায় না। তবে আরো অনেক পরে, কথায় কথায় হাফিজুর যখন টের পায় সাতই মার্চের উত্তাল মানবজোয়ার তার জন্মদাতার বিশ^াস ও বোধের জমিনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ফাটল ধরাতে পেরেছে, তখন সে অত্যন্ত বিন¤্রভাবে জানায়- বঙ্গবন্ধুর ছোটবেলার নাম খোকা। মা-বাবার আদরের নাম। হাফিজুর ও আব্বার মুখে খোকা ডাক শুনে অত্যন্ত খুশি হয়েছে। সেই খোকার মাকে নীরব থাকতে দেখে মুজিবুর রহমান বলেন,
তুমি কি জানো- শেখ সাহেবের ছোটবেলার নামও খোকা?
না তো!
ছোট্ট করে জবাব দেয়ার পরই শেফালির মায়ের মনে হয়- এতদিনে চেনা মানুষটাকে সে যেন চিনতে পারছে না, বা মেলাতে পারছে না। ঢাকায় গিয়ে লোকটি কি তবে বদলে গেল! সে ব্যাকুল হয়ে জানতে চায়,
আমার খোকার কী হয়েছে তাই বলো!
কই, কিছু হয়নি তো!
তাহলে সঙ্গে নিয়ে এলে না কেন?
কী মুশকিল, আনতেই তো গিয়েছিলাম!
ছোট মেয়ে জুঁই ফ্যাচ করে কেঁদে ওঠে। তারপর বাপের বুকের মধ্যে ঢুকে গভীর উদ্বেগ শুধায়,
আমার ভাইয়ের কী হয়েছে আব্বা?
নাহ্, কিছু হয়নি তো!
ভাই তাহলে এলো না কেন?
হাফিজুরকে সবাই নাম ধরে ডাকলেও কেবল মাত্র জুঁই তেমন ডাকে না। পিঠোপিঠি ভাইবোন, দু’জনেই তুই-তোকারি চালায়; কিন্তু হাফিজুরকে সে সব সময় ভাই বলে সম্বোধন করে, গাল দিতে হলেও ভাই বলে ডেকে তারপর গাল দেয়। তার যেন উদ্বেগের শেষ নেই, বাপের মুখের উপরে বলেই ফেলে,
আপনি কিছু লুকাচ্ছেন না তো আব্বা?
মাথা খারাপ! কী লুকাব তোদের কাছে?
ভাই তাহলে বাড়ি এলো না কেন?
সেটাই তো ভাবছি- কী করে তোদের বুঝানো যায়, ওদের তখন অনেক কাজ। এতক্ষণে হাফিজুরের মা আবার প্রশ্ন করে, কাজ! ছাত্রের আবার কী কাজ?
সেই কথাই তো বলছি- ঢাকায় না গেলে বুঝানো যাবে না ওদের কত কাজ।
হাফিজুরের মা যেন কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলে,
তুমি কি এই সব বুঝতেই ঢাকায় গিয়েছিলে শেফালির আব্বা?
মেজো মেয়ে চামেলি এগিয়ে আসে বাপকে উদ্ধার করতে। মাকে এবং ছোটবোন জুঁইকে থামিয়ে দিয়ে সে বলে,
তোমরা এখন থামো তো! আব্বাকে রেস্ট নিতে দাও। খাওয়াদাওয়া করতে দাও।
মেজো মেয়ের কথা শুনে মুজিবুর রহমানের প্রাণ জুড়িয়ে যায়। চামেলির মুখের দিকে তাকিয়ে জানতে চান,
তুই কখন এসেছিস মা?
আপনার ঢাকা যাবার খবর শুনেই চলে এসেছি আব্বা।
খুব ভালো করেছিস।
আপনার জামাইও এসেছে।
শেফালির মা স্বামীর ঘাড়ে গামছা দিয়ে তাড়া লাগায়, কলতলা থেকে হাতমুখ ধুয়ে এসো দেখি, আমি ভাত বাড়ছি।
রাতের আহারপর্ব শেষ হলে অত্যন্ত তৃপ্তির সঙ্গে হাত-মুখ মুছে শেখ মোঃ মুজিবুর রহমান অভ্যাসমাফিক আলহামদুলিল্লাহ বলে শোকর গোজার করেন। তারপর সবার মুখের দিকে তাকিয়ে বলেন,
শেফালি আসেনি তাহলে!
শেফালির শ^শুরবাড়ি প্রায় ২০-২৫ মাইল দূরে। একেবারে ভারতীয় সীমান্তের গাঘেঁষে বৈদ্যনাথতলায়। ওই গ্রামের পরই ভারতের হৃদয়পুর। এপর-ওপার একই রকম গাছপালা, পাখপাখালি, মানুষের মুখের ভাষা সবই এক; তবু দুই দেশ। এই বাস্তবতা মানতেই হবে। মানতে হয়েছে মুজিবুর রহমানকেও। শৈশব-কৈশোরের প্রিয় চন্দ্রখোলার সব স্মৃতি ওপারে ফেলে রেখে, ছোট চাচার মৃতদেহ প্রায় সৎকারহীন অবস্থায় কোনো মতে মাটিচাপা দিয়ে এপারে এই সূর্যখোলায় নতুন করে জীবন গড়তে হয়েছে। সীমান্তবর্তী জীবনযাপনের জ¦ালা খুব জানা আছে বলেই বৈদ্যনাথতলা থেকে বড় মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব এলে প্রথমে একরকম না করেই দিয়েছিলেন। পরে মানিকনগরের দোয়াজ মাস্টারের পীড়াপীড়িতে এবং পাত্রের স্বভাবচরিত্রের সব দিক বুঝিয়ে বলার পর সম্মতি জানান। জামাই হচ্ছে গণি বিএসসি। কেদারগঞ্জ হাইস্কুলের সায়েন্স টিচার। দোয়াজ মাস্টারই তাঁর প্রিয় ছাত্র আব্দুল গণিকে জোর করে ইশকুলে ঢুকিয়েছেন। পাত্রের গুণের কথা একের পর এক বলতে বলতে দোয়াজ মাস্টার এক গাল হাসির সঙ্গে জানান, গণির নাম গণিত হলেই ভালো হতো। নাম তার গণি, অঙ্কের খনি। ছাত্রেরা তাকে গণিত স্যার বলেই জানে। এত প্রশংসার পর দোয়াজ মাস্টার আবার উল্টো সুরে গান ধরেন- এ সব ছেলে দিয়ে কী হবে বলেন, এরা তো দেশের কাজে লাগবে না। এই মাস্টারিটা সে করবে ভেবেছেন! ভালো চাকরি পেলেই চলে যাবে টাউনে। আর চাকরি তো সে পাবেই।
মুজিবুর রহমান ঠিক এই পয়েন্টে এসেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন- মেধাবী ছেলে, নিশ্চয়ই ভালো একটা সরকারি চাকরি সে পাবে। গ্রামের নয়, শহরে থাকবে দুঃখের বিষয় হচ্ছে- গত ৮/৯ বছরের মধ্যে এসব স্বপ্নের কিছুই পূরণ হয়নি। আব্দুল গণি সেই গ্রামের হাই ইশকুলেই শেকড় নামিয়ে বসেছে। এরই মঝে দুটো ছেলেমেয়ের বাপ হয়েছে। ছেলেমেয়ে দুটো তার চোখের মণি। সব মিলিয়ে তারা গ্রামে থেকেও ভালোই আছে। তার কথা শুনে মনে হয় না যে এ নিয়ে তার কোনো দুঃখ বা গ্লানি আছে।
ঢাকা যাবার আগে শেফালি কিংবা আব্দুল গণিকে সূর্যখোলায় আসার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে এমন নয়। তারও ক’দিন আগে মেহেরপুরে গিয়ে কেদারগঞ্জ ইশকুলের আবু বকর মাস্টারের সঙ্গে দেখা, তাকে দিয়েই ঢাকা-যাত্রার পরিকল্পনার খবর গণিকে জানানো হয়েছিল। সে খবর আব্দুল গণির কান পর্যন্ত পৌঁছেছে কিনা তাই বা কে জানে! ঢাকা থেকে বাড়ি আসার পর শেফালির মুখটা খুব মনে পড়ে মুজিবুর রহমানের। প্রথম সন্তান, প্রথম স্বপ্ন। ওর মায়ের মতো কাদামাটির মাখা মন। সবার চেয়ে বেশি করে বাপের মন বোঝে। নাতি-নাতনি দুটোও হয়েছে তেমনি গা-ন্যাওটা। নানা-নানিকে কাছে পেলে ছাড়তেই চায় না। প্রতিবারই বিদায় নেবার সমায় ওদের না জানিয়ে পালিয়ে আসতে হয়। মুজিবুর রহমান মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন- অল্পদিনের মধ্যেই তিনি ওদের সবাইকে দেখতে যাবেন।
সবার খাওয়া-দাওয়া সারা হলে রান্নাঘরের পাট গুছিয়ে উঠোনে পা ফেলতেই শেফালির মায়ের গা ছমছম করে। মনে হয় কী যেন করার ছিল, করা হলো না। কী সেটা! অশ্বস্তি হয়, মনে পড়ে না, মনে পড়ে না…। উঠোন পেরিয়ে সদর দরজার কাছে এসে ভাঙাচোরা পাল্লা দুটো ধাক্কা দিয়ে লাগাতে গিয়ে বাঘার কথা মনে পড়ে যায়। সে তো আসেনি আজ রাতে!
সারাদিন যতই সে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়াক, রাতে সে এ বাড়িতে আসবেই। রান্নাঘরের রোয়াকে নিজেই একটা ফাঁকা জায়গা ঠিক করে নিয়েছে, সেইখানে বসে লেজ নাচায়, কাঁইকুঁই করে গৃহকর্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে, খাবার পেলে তবে স্বস্তি। বাঘা যে এ বাড়ির পোষা কুকুর, ঠিক এমনও বলা যাবে না। রাতের অতিথি। হাফিজুরের সাথে বেশ ভাব। যখনই বাড়ি আসে বাঘার নানান কায়দা কসরত মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করে, এমন কি নিজে থেকে কী সব আদেশ-নির্দেশ দেয়, রাতের বেলা নিজের হাতে খেতে দেয় তাকে। মুজিবুর রহমান এ সব আদিখ্যেতা পছন্দ করেন না। আর এ বাড়ির মেজো জামাই আবদুল কুদ্দুস তো মোটেই সহ্য করতে পারে না। সামান্য কুকুরের সঙ্গে কী যে তার শত্রুতা! বাঘাকে দেখলেই সে লাঠি হাতে তেড়ে ওঠে। একেবারে বাড়ির বাইরে বের করে দিয়ে তবে তার স্বস্তি। জামাইয়ের এই কুকুর বিদ্বেষী কর্মকা- দেখে কেউ কিছু বলতেও পারে না। শ্বশুরবাড়িতে খোঁজখবর নিয়ে চামেলি জেনেছে শৈশবে কি কৈশোরে পাগলা কুত্তার কামড় খেয়ে কুদ্দুস নাকি একবার খুব কষ্ট পেয়েছিল। সেই থেকে যে কোনো কুকুর দেখলেই তার মাথায় খুন চেপে যায়। হাফিজুর বেশ ক’বার এই বাঘার পক্ষে সাফাই গেয়ে দুলাভাইকে কুকুরের প্রভুভক্তি বিষয়ক একাধিক গল্প শুনিয়েছে। তাতে খুব সাময়িক কাজ হয়েছে। হাফিজুরের সামনে সে বাঘাকে বিশেষ কিছুই বলে না। কিন্তু হাফিজুর বাড়ি না থাকলে তার কুত্তা-বিদ্বেষী মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। সেই বাঘা রাতে আসেনি বলে শেফালির মা সদর দরজা হাট করে খুলে রেখে আবার রান্নাঘরে ফিরে আসে। রোয়াকের পাশে বাঘার শোবার জায়গায় দুমুঠো খাবার ফেলে রাখে। বাঘার জন্য এ সব করতে গিয়ে অকারণেই হাফিজুরের মুখ মনে পড়ে যায় তার। বাপের সঙ্গে হাফিজুর কেন বাড়ি এলো না সেই ব্যাখ্যা এখনো খোলাসা করে জানা হয়নি বলে মনটা ভার হয়ে আছে। কিন্তু হাফিজুরের আব্বার কাছে কি খোলা মনে দুটো প্রশ্ন করার উপায় আছে! তিনি ঢাকায় গেলেন ছেলেকে বাড়ি ফিরিয়ে আনতে, ছেলে আসেনি; কেন আসেনি সেই কথাটা গুলিয়ে বুঝিয়ে বলতে হবে তো! না, কী যে হয়েছে, তার মুখের আগল খোলানোই মহামুশকিল হয়েছে।
শোবার ঘরে এসে দেখা গেল এশার নামাজ শেষে মুজিবুর রহমান জায়নামাজেই বসে আছেন। হাতের ফাঁকে তসবিমালা দাঁড়িয়ে আছে স্থির। মাথাটা এমনভাবে ঝুলে আছে যে বুঝার উপায় নেই যে তিনি ঘুমিয়ে গেছেন, নাকি গভীর কোনো চিন্তা করছেন। মেফালির মা স্বামীর কাঁধে হাত রেখে ধীরে ধীরে তাঁকে বিছানায় তুলে আনে। তারপর খুব কোমল স্বরে জিজ্ঞেস করে,
কী হয়েছে আমার খোকার? সে বাড়ি এলো না কেন?
তার অনেক কাজ শেফালির মা।
কী কাজ এত!
দেশের কাজ। এই দেশটা ভেঙে আবারও দুভাগ করা হবে। তাই নিয়ে ব্যস্ত আছে ওরা সবাই।
বেশ। তাই বলে বাড়ি আসবে না কেন?
আসবে, আমাকে কথা দিয়েছে- অল্পদিনের মধ্যেই বাড়ি আসবে। শেখ সাহেবের ভাষণ শুনেছ?
স্বামীর মুখে শেখ সাহেবের কথা শুনে শেফালির মা ভীষণ অবাক,
নাহ! কেমন করে শুনব ভাষণ!
আমি শুনেছি। সগৌরবে ঘোষণা করেন মুজিবুর রহমান, এমন ঘটনা আমি আর কখনো দেখিনি। সেদিন মানুষে মানুষে সয়লাব ঢাকা শহর। এত মানুষের ভিড়ে হাফিজুরকে কোথায় পাব!
চমকে ওঠে শেফালির মা,
তার মানে খোকার সঙ্গে তোমার দেখাই হয়নি?
কী আশ্চর্য! আমি কি তাই বলেছি তোমাকে?
ওই যে বললে মানুষের ভিড়ে…।
হ্যাঁ, সেদিন দেখা হয়নি। হাফিজুরের সঙ্গে দেখা হয়েছে পরদিন সকালে।
অ, তাই বলো।
আমি তো তা-ই বলছি।
তোমাকে দেখে খোকা অবাক হয়নি?
তা আবার হয়নি। তিনি তখন রেডিওতে ভাষণ শুনছিলেন।
অমা, সে আবার কোথায়?