টেবিলে বসে দেখা মুনতাসীর মামুনের লেখা

আগের সংবাদ

যাদবপুরে বিপুল ভোটে বিজয়ী মিমি চক্রবর্তী

পরের সংবাদ

সুহৃদ ও সহযোদ্ধা মুনতাসীর মামুন

প্রকাশিত হয়েছে: মে ২৩, ২০১৯ , ৬:৪০ অপরাহ্ণ | আপডেট: মে ২৪, ২০১৯, ১২:৩৫ অপরাহ্ণ

কাগজ প্রতিবেদক

মামুনের স্কুল ও কলেজ জীবন কেটেছে চট্টগ্রামে। আমার সঙ্গে ওর পরিচয় হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর। একদিন ইত্তেফাক অফিসে রোকনুজ্জামান খান দাদাভাইয়ের দফতরে বসে আছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস বিরতির সময় কিংবা ক্লাস পালিয়ে দাদাভাইয়ের কাছে এসে লেখালেখির ফাঁকে ফাঁকে সাংবাদিকতার পাঠ নিতাম। তখন ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি। মামুনকে দেখি দাদাভাইয়ের দফতরে।

উনিশ শতকের পূর্ব বাংলা থেকে আরম্ভ করে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে মুনতাসীর মামুন অনন্যসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। শুধু বাংলাদেশ নয়, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের ৬৮তম জন্মজয়ন্তী উদযাপনকালে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়- এই উপমহাদেশে প্রথাগত, যান্ত্রিক ও নিরস ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে মামুন নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন, যেখানে ইতিাহস এক সরস প্রাণবন্ত আকর্ষণীয় সত্তায় উদ্ভাসিত। সৃজনশীল সাহিত্য ও গবেষণামূলক রচনার অর্ধশতাধিক বৎসরের কালপরিক্রমায় মুনতাসীর মামুনের তুলনা শুধু তার সঙ্গেই করা যায়, অন্য কারও সঙ্গে নয়।
মহাকালের পরিধিতে আটষট্টি বছর সময় এক পলকেরও কম মনে হবে, কিন্তু বয়সের হিসেব করে পেছনে যখন তাকাই- মনে হয় এই বুড়ো পৃথিবীতে বুঝি অনেক পথ হেঁটেছি। এই আটষট্টি বছরের পথচলায় দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর আমার সহযাত্রী সুহৃদ এবং কখনো পথের দিশারি মুনতাসীর মামুন। মামুনের আটষট্টি বছরে পা রাখার ছ মাস আগে আমি রেখেছি। খালেদা-নিজামীদের নির্যাতনের কারণে আমার শরীর মাঝে মাঝে বিদ্রোহ করে, জানিয়ে দেয় সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে, মামুনের কর্মোদ্দীপনা আর অমলিন চেহারা দেখে মনে হয় প্রবল বৈরী সময়ও ওর কাছে হার মেনেছে।
অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনকে যারা চোখে দেখেননি, যারা বইয়ের মলাটে পরিচিতি পড়েননি তাদের কাছে ওর বয়স অন্ততপক্ষে আশির কোঠায়। তার গ্রন্থ তালিকায় চোখ বুলালে অবিশ্বাস্য মনে হবে- আটষট্টি বছরের কারও পক্ষে এত লেখা সম্ভব! আমাদের ভেতর সবার আগে লেখালেখি শুরু করেছে মামুন। আমরা মানে প্রায় এক বয়সি আলী ইমাম, মুনতাসীর মামুন আর আমি। শুরু করেছিলাম অনেকে এক সঙ্গে। একে একে সবাই লেখালেখির জগৎ থেকে নির্বাসন নিয়েছে। টিকে আছি আমরা তিনজন। আমাদের ভেতর সবার আগে স্বীকৃতি মিলেছে মামুনের। সম্ভবত চৌষট্টি/পঁয়ষট্টি সালে মামুন গল্প লিখে প্রেসিডেন্টের স্বর্ণপদক পেয়েছিল। তখন মামুন ক্লাস এইটে কিংবা নাইনে পড়ে। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট লৌহমানব আইয়ুব খানের কাছ থেকে মডেল আনার জন্য ওই বয়সে মামুন রাওয়ালপিন্ডি না ইসলামাবাদও গিয়েছিল। ছবিসহ মামুন খবর হয়েছিল তখনই।
মামুনের স্কুল ও কলেজ জীবন কেটেছে চট্টগ্রামে। আমার সঙ্গে ওর পরিচয় হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর। একদিন ইত্তেফাক অফিসে রোকনুজ্জামান খান দাদাভাইয়ের দফতরে বসে আছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস বিরতির সময় কিংবা ক্লাস পালিয়ে দাদাভাইয়ের কাছে এসে লেখালেখির ফাঁকে ফাঁকে সাংবাদিকতার পাঠ নিতাম। তখন ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি। মামুনকে দেখি দাদাভাইয়ের দফতরে। চেহারা দেখে মনে হয়েছিল বুঝি নাইন টেনের ছাত্র। দাদাভাই পরিচয় করিয়ে দিলেন ‘এর নাম মুনতাসীর মামুন।’ লেখা আগেই পড়েছি। জানতে চাইলাম ‘কোন ক্লাসে পড়ো?’ মামুন বলল, ‘ফার্স্ট ইয়ারে।’ জিজ্ঞেস করলাম, ‘কোন কলেজে?’ মামুন বলল, ‘ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে।’ শুনে একটু দমে গেলাম। আবার জিজ্ঞেস করলাম, ‘কোন ডিপার্টমেন্টে?’ মামুন বলল, ‘ইতিহাস।’
আমি তখন বাংলার ছাত্র। মামুন জানতে চাইল আমি কী করি? ও ভেবেছিল, আমি বুঝি বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকাঠ পেরিয়ে গেছি। যখন শুনল ও আর আমি একই ব্যাচে তখন মামুন বিব্রত হলো। এর মধ্যে আমি ওকে ‘তুমি’ বলছি, ও আমাকে বলছে ‘আপনি’। চট্টগ্রাম তখন ঢাকার ছেলেদের কাছে মফস্বল। মামুন বুঝতে পারছিল না আমাকে ‘তুমি’ বলাটা ঠিক হবে কি না। শেষে আমিই বললাম, ‘আমাকে আপনি আপনি করছ কেন? আমি তোমারই ব্যাচ মেট।’ মামুনের আড়ষ্টতা কিছুটা কাটল। আর এভাবেই বন্ধুত্বের সূত্রপাত। কম নয়, পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে গেছে! বন্ধুত্বের অনেকগুলো কারণ ছিল। লেখালেখি করতাম দাদাভাইয়ের মাসিক ‘কচি ও কাঁচায়’ আর কচিকাঁচার আসরে। এখলাসউদ্দিন আহমেদের চমৎকার সম্পাদনার ‘টাপুর টুপুরে’ও একসঙ্গে লিখতাম। মাঝে মাঝে দাদাভাইয়ের ফরমায়েশে ইত্তেফাকের সাহিত্য পাতায় বড়দের জন্য গুরুগম্ভীর সব বিষয়ে প্রবন্ধ বা গল্প লিখলেও আমাদের তিনজনেরই ঝোঁক ছিল শিশু ও কিশোর সাহিত্যে। লীলা মজুমদার, প্রেমেন্দ্র মিত্র, শিবরাম চক্রবর্তী আর নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় তিনজনেরই প্রিয় লেখক। লরা ইঙ্গলস-এর ‘লিটল হাউস অন দি প্রেইরি’ পড়ে তিনজনই মুগ্ধ। হেমিংওয়ে, মেলভিল, অস্কার ওয়াইল্ড, ন্যুট হামসুন, ফ্রানয কাফকা, আঁদ্রে জিদ কিংবা গোর্কি, শেকভ, টলস্টয় পড়া শুরু করেছিলাম ওই বয়সেই। বিভূতিভূষণের আরণ্যকের মিল খুঁজতাম নুট হামসুনের প্যানের সঙ্গে।

আমাদের শখ ছিল পুরোনো বইয়ের দোকানে দুষ্প্রাপ্য সব বই খুঁজে বেড়ানোর। মামুন আর আলী ইমামের ঝোঁক ছিল পুরোনো বইয়ের প্রথম সংস্করণের ওপর। পুরানা পল্টনে হাশেম মিয়ার দোকানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যেত পুরোনো বই ঘাঁটতে গিয়ে। বাংলাবাজারেও যেতাম।
সেই বয়সেই মামুনের ঝোঁক ছিল চিত্রকলার দিকে। তখন ও বড় চাচা অধ্যাপক বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের বাড়িতে থাকত, চিত্রকলার সমালোচক হওয়ার কারণে যাঁর সংগ্রহে প্রচুর ছবি ছিল। পরে মামুনও চিত্রকলার ওপর লিখেছে এবং নিজের ছবির সংগ্রহ সমৃদ্ধ করেছে। সংগ্রহ মানে সব উপহার নয়, ছবি কেনার অভ্যাস বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতেই গড়ে উঠেছিল। লেখালেখি করে তখন যা পেত তা দিয়ে মামুন বই আর ছবি কিনত। আলী ইমাম আর আমি বই কিনলেও বিশ্ববিদালয় জীবনে ছবি কিনেছি বলে মনে পড়ে না। আমার ছবি কেনার শুরু ’৭২ থেকে যখন সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছি।
আমারই কারণে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় মামুনের লেখালেখি শুরু হয় ঢাকা শহরকে নিয়ে। ইতিহাস বিষয়ক লেখা ছাড়াও মামুন সাহিত্য আর চিত্রকলা নিয়ে নিয়মিত লিখত বিচিত্রায়। অনেক প্রচ্ছদ প্রতিবেদনও লিখেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকাঠ পেরিয়েই মামুন চাকুরিতে ঢুকেছে নিজের বিভাগে। প্রথমদিকে কী বিড়ম্বনাই না ওকে পোহাতে হয়েছে কিশোরসুলভ চেহারার কারণে। ছাত্র-ছাত্রীদের মানার কথা নয়। অথচ ওই চেহারা নিয়ে আমাদের সবার আগে প্রেম করে বিয়ে করেছে সহপাঠিনী ফাতেমাকে। জনকও হয়েছে সবার আগে। মামুনের বড় ছেলে নাহিন এখন ব্যাংকার, যাকে দেখে মনে হয় ’৭৬/’৭৭ সালের মামুনকে।
অধ্যাপনা করতে গিয়ে মামুন ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে শিশু-কিশোর সাহিত্যের জগৎ থেকে। গুরুত্ব দিয়েছে প্রবন্ধ ও গবেষণামূলক লেখার ওপর। তবে কয়েক বছর আগে হঠাৎ শিশু-কিশোরদের জন্য ‘জয় বাংলা’ উপন্যাস লিখে মামুন জানিয়ে দিয়েছে- এক্ষেত্রে এখনও ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী। সংখ্যার দিক থেকে হিসেব করলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে কিংবা অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে, দেশে বা বিদেশে মামুনের চেয়ে বেশি প্রবন্ধ ও গবেষণার বই আর কেউ লিখেছেন বলে আমার জানা নেই।
ইতিহাসের মতো নিরস বিষয়কে মামুন জনপ্রিয় করেছে তার অসাধারণ সরল ও সরস রচনাশৈলীর গুণে। এক সময় মামুনের সহযোগী শিক্ষকরা ওর রচনাশৈলী ও শৃঙ্খলার সমালোচনা করলেও পরে মেনে নিয়েছেন। কারণ মামুনের স্বীকৃতি অনেক আগেই দেশের গ-ি পেরিয়ে গেছে। ভারতের একজন প্রবীণ কূটনীতিক, যিনি বাংলাদেশের ইতিহাসের একনিষ্ঠ পাঠক, আমাকে অনেক আগে একবার বলেছিলেন, বাংলাদেশে মাত্র দুজনকে তিনি ইতিহাসবিদ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। একজন অধ্যাপক সালাহউদ্দিন আহমেদ, অপরজন অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন।
মামুনই সম্ভবত উনিশ শতকের পূর্ব বাংলার ইতিহাস লিখতে গিয়ে আত্মজীবনীকে অন্যতম উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করেছে। ওর আগে আর কেউ করেছেন বলে আমার জানা নেই, তবে এখন অনেকে করছেন। বদরুদ্দীন উমর ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস লিখতে গিয়ে সংশ্লিষ্টদের সাক্ষাৎকারকে ইতিহাসের অন্যতম উৎস হিসেবে ব্যবহার করেছেন ষাট বছর আগে। স্বাধীন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বিভিন্ন পর্ব লিখতে গিয়ে ইতিহাসের এই উপেক্ষিত উৎসকে মামুন অনেক সমৃদ্ধ করেছে।
আমরা লেখক হিসেবে মামুনের সমসাময়িক হলেও লেখার জন্য মামুন যে পরিমাণ পরিশ্রম করে আর কাউকে তেমনটি করতে দেখিনি। ঢাকা আর উনিশ শতকের পূর্ববঙ্গের ইতিহাসের উপকরণ খোঁজার জন্য মামুন ইংল্যান্ড গেছে, হল্যান্ড গেছে, পর্তুগাল গেছে, এমনকি জাপানও গেছে। অত্যন্ত দুর্লভ কাগজের সন্ধান পেয়েছে ও পর্তুগালে, যা আমাদের দেশের কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিল। কেউ তা সংগ্রহ করার উদ্যোগ নেয়নি।
জাদুঘর প্রতিষ্ঠা একটি রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক কর্ম। আমি ব্যক্তিগত সংগ্রহের দ্বারা ব্যক্তিগত জাদুঘর প্রতিষ্ঠার কথা বলছি না। ঢাকা নগর জাদুঘর প্রতিষ্ঠা থেকে যাত্রা আরম্ভ করে খুলনায় ‘গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মামুন প্রমাণ করেছে স্বপ্ন হিমালয়স্পর্শী হলেও তা বাস্তবে রূপ দেয়া সম্ভব যদি থাকে অদম্য উৎসাহ, কর্মোদ্যোগ এবং বিশ্বাসের প্রতি দায়বদ্ধতা। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনার প্রতি মুনতাসীর মামুনের বহুমাত্রিক দায়বদ্ধতা ও অঙ্গীকারের প্রতীক খুলনার এই জাদুঘর, যা অচিরেই এক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে যাচ্ছে।
চল্লিশ বছর আগে মামুনকে দেখেছি ঢাকা নগর জাদুঘরের প্রতিষ্ঠার জন্য কত কিছুই না করতে। প্রথমে এ নিয়ে লেখালেখি করে জনমত তৈরি করতে হয়েছে ওকে। কারণ এ দেশের অনেক ইতিহাসবেত্তারও ধারণা ছিল না ‘নগর জাদুঘর’ বস্তুটি কী। তারা বলেছেন জাতীয় জাদুঘরে তো সবই আছে বা থাকতে পারে, আলাদা করে নগর জাদুঘর করার দরকার কী? মামুনকে নগর জাদুঘর করতে বাধা দেয়া হয়েছে কিন্তু দমানো যায়নি। মামুন ওর কয়েকজন শুভানুধ্যায়ীকে নিয়ে প্রথম বেসরকারি উদ্যোগে ঢাকা নগর জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেছে। তিল তিল করে বিভিন্ন সামগ্রী সংগ্রহ করেছে। যখন তা সাধ্যের বাইরে চলে গেছে তখন পৌর করপোরেশনকে হস্তান্তর করেছে। নগর ভবনের বারো হাজার বর্গফুট জায়গাজুড়ে এখন যে জাদুঘরটি রয়েছে সেটি মূলত মামুনেরই কীর্তি। ওর সঙ্গে ছিলেন শিল্পী হাশেম খান, স্থপতি রবিউল হুসাইন আর হাশেম সুফীর মতো নিবেদিত ঢাকাপ্রেমী কয়েকজন।
শুধু নগর জাদুঘর নয়, বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও যুক্ত ছিল মামুন। ওর অনেক দিনের স্বপ্ন বিশাল আকারে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর গড়ে তোলার। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘মুক্তিযুদ্ধ বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ গবেষণা ইনস্টিটিউট জাদুঘর ও আর্কাইভ’ গঠন করে মামুন সেই স্বপ্ন পূরণ করতে চেয়েছিল। ওরই অনুরোধে আর্থিক ক্ষতি স্বীকার করে এই প্রতিষ্ঠানের ওরাল হিস্ট্রি প্রজেক্টের দায়িত্ব নিয়েছিলাম আমি। এই জাদুঘরের কাজে মামুনকে যাঁরা সহযোগিতা করেছেন, যাঁরা নিজেদের দুর্লভ সংগ্রহ ওর হাতে তুলে দিয়েছেন তাঁরা কেউ বৈষয়িক প্রাপ্তির কথা ভাবেননি। মামুন বলেছে, মামুন চেয়েছে- করতে হবে, দিতে হবে, এই ছিল বোঝাপড়া। পরে সরকার পরিবর্তনের পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মামুনের এই উদ্যোগ বন্ধ করে দিয়েছিলেন কিন্তু মামুনকে দমানো যায়নি। খুলনার ‘গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর’ মামুনের সেই অদ্যম প্রত্যয়ের মূর্ত রূপ।
নগর জাদুঘর করার সময় থেকেই আমাকে প্রয়োজন হয়েছিল মামুনের। আবার ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’ করার সময় মামুনকে প্রয়োজন হয়েছিল আমার। নির্মূল কমিটির সুবাদে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাইতে গিয়ে, খালেদা-নিজামীদের নজিরবিহীন হিন্দু নির্যাতনের প্রতিবাদ করতে গিয়ে আমরা একসঙ্গে জেল খেটেছি। বিদেশে বহু আন্তর্জাতিক সম্মেলনে একসঙ্গে অংশ নিয়েছি। কখনো যৌথভাবে আন্তর্জাতিক সেমিনারের প্রবন্ধ লিখেছি। এরকম আরও অনেক উদ্যোগে মামুন আর আমি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছি। শুরু হয়েছে সেই আটষট্টি সাল থেকে। এখনো করে যাচ্ছি। যতদিন বেঁচে আছি করে যাব। যদিও জানি আমার অনেক কাজ ও মনে করে সময়ের অপচয়, আমার আরও বেশি সময় দেয়া উচিত লেখালেখির কাজে। অপচয় জেনেও মামুন কাঁধ মিলিয়েছে আমার সঙ্গে, বন্ধুদের সঙ্গে।
মামুনকে আমার কয়েকটি বই উৎসর্গ করেছি। গত বছর (২০১৮) ভ্রমণসমগ্র প্রকাশের সময় দেখি সবচেয়ে বেশি বিদেশ ভ্রমণ করেছি মামুনের সঙ্গে। উৎসর্গপত্রেও লিখেছি- ‘মুনতাসীর মামুন : যে বন্ধুর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি ভ্রমণ করেছি।’ ছ মাস আগে তুরস্ক ঘুরে এসেছি। ছ মাস পরে আবার তুরস্ক আর উজবেকিস্তান ভ্রমণের পরিকল্পনা করছি।
বন্ধুদের সুদিনে যত নয় দুর্দিনে তার চেয়ে অনেক বেশি সঙ্গ দিয়েছে মামুন। চেষ্টা করেছে কিছু করার। বিচিত্রার চাকরি যাবার পর এক সময় যখন অর্থাভাবে চোখে অন্ধকার দেখছিলাম মামুনই এগিয়ে এসেছে সবার আগে। ক্রেতার সন্ধান দিয়েছে, যাদের কাছে আমার ছবির সংগ্রহ বিক্রি করতে পারি।
কথা বলার সময় দেখেছি মামুন কাউকে তোয়াক্কা করে না। এমনকি প্রধানমন্ত্রীকেও নয়। অনেকে এই স্বভাবটির জন্য মামুনকে পছন্দ করেন না, কিন্তু ওকে উপেক্ষা করার ক্ষমতা কারও নেই।
কাল যত গত হয়েছে মামুনের লেখা তত শানিত হয়েছে, ওর কর্মোদ্যম তত বৃদ্ধি পেয়েছে। ওর কলামগুলো খাপখোলা তলোয়ারের মতো। খোলা তলোয়ার হাতে মামুন এগিয়ে চলেছে। লড়ে যাচ্ছে মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার শত্রুদের বিরুদ্ধে। এ লড়াই চলবে। এ লড়াইয়ে আমরা মামুনের পাশে আছি, পাশে থাকব। আমার বন্ধু ও সহযোদ্ধা মামুনের আরও জয় হোক, আরও সাফল্য আসুক। মামুন দীর্ঘ দীর্ঘজীবী হোক।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা