অনুকরণীয়, অনুসরণীয় মুনতাসীর মামুন

আগের সংবাদ

প্রিয় মুনতাসীর মামুন

পরের সংবাদ

সর্ব সাধারণের শিক্ষক মুনতাসীর মামুন

প্রকাশিত হয়েছে: মে ২৩, ২০১৯ , ৬:২৩ অপরাহ্ণ | আপডেট: মে ২৪, ২০১৯, ১২:৪১ অপরাহ্ণ

অনলাইন প্রতিবেদক

মুনতাসীর মামুন স্যারের সঙ্গে আমার পরিচয় প্রায় দুই যুগ ধরে। প্রথমে ছাত্র হিসেবে এবং পরে কাজের সূত্র ধরে। এই দীর্ঘ সময়ে স্যারকে যেভাবে কাছ থেকে দেখার বিরল এক সুযোগ হয়েছে, এজন্য নিজেকে ধন্য মনে করি। এই সময়ের অভিজ্ঞতায় দেখেছি একজন শিক্ষক কীভাবে সর্ব সাধারণের শিক্ষক ও গবেষকদের গুরু হতে পারেন।
মুনতাসীর মামুন স্যারের বিশেষ গুণ হলো তিনি ছাত্রছাত্রীদের নিয়মিত পাঠদানের পাশাপাশি মানসিকভাবে শক্তিশালী করে গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। তাদের প্রশ্ন করতে শেখান এবং নিজের ও জাতির অধিকার আদায় কীভাবে করতে হয় তারও শিক্ষা দেন। তিনি বিশ্বাস করেন, প্রশ্ন করতে না পারলে কোনো ব্যক্তি বা জাতি অগ্রসর হতে পারে না। শুধু তাই নয়, ছাত্রদের তিনি অগাধ বিশ্বাসও করেন। তাই, তিনি ছাত্রদের হাতে ছেড়ে দেন অনেক বড় দায়িত্ব। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে মামুন সিদ্দিকীকে মনোনীত করেছেন রচনাবলির সম্পাদক ও গণহত্যা নির্ঘণ্ট সিরিজের সহযোগী সম্পাদক। আহম্মেদ শরীফের ওপর ন্যস্ত করেছেন গণহত্যা-বধ্যভূমি ও গণকবর জেলা জরিপ। তপন পালিতের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে শহীদের তালিকা প্রণয়নের দায়িত্ব এবং চৌধুরী শহীদ কাদের ওপর সাংগঠনিক দায়িত্ব। এরা সকলেই খুব যোগ্যতার সঙ্গে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করছেন। এর পাশাপাশি তিনি দেশব্যাপী প্রায় ৩০০ জনের মতো একটি গবেষকের দল সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন। এই গবেষকগণ আলোকিত সমাজ সৃষ্টি করবে বলে বিশেষজ্ঞগণ মনে করে।
এই কাজ মুনতাসীর মামুন স্যারের পক্ষেই কেবল সম্ভব। কারণ যাঁর নিজের মোট গ্রন্থের সংখ্যা ৪৭১টির বেশি তিনিতো লেখক-গবেষক সৃষ্টি করবেনই। তাঁর গ্রন্থগুলোর মধ্যে মৌলিক গবেষণাগ্রন্থ ৩০০টি এবং সম্পাদিত ১৭১টি। তিনি গবেষকদের কাছে এক বিস্ময়। কীভাবে তিনি এত গবেষণা করলেন? এই প্রশ্ন শুধু বাংলাদেশ নয়, দেশের বাইরেও। মুনতাসীর মামুনের সব বইয়ের পরিচিতি নিয়ে রচিত ‘মুনতাসীর মামুনের বই’-এর অন্যতম সম্পাদক হিসেবে আমার এই প্রশ্নে জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘ছোটবেলায় স্কুল পালালে যেরকম অপরাধবোধ কাজ করত, একদিন না লিখলে সেই রকম অপরাধবোধ কাজ করে’। এই সাধনার বলে তিনি হয়ে উঠেছেন গবেষকদের গুরু।
শুধু গবেষক-লেখক ও শিক্ষক হিসেবে মূল্যায়ন করলে তাঁকে পরিপূর্ণভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। তিনি দীর্ঘদিন রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামের সঙ্গেও যুক্ত আছে। পরিচিত হয়েছেন- সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে। এটা সম্ভব হয়েছে কারণ তিনি ন্যায়ের পক্ষে কথা বলেছেন। ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করেছেন। অসহায়, নির্যাতিত ও সমাজের অসঙ্গতি বিপক্ষে তাঁর এই লড়াই। দেশে যখনই কোনো অসঙ্গতি দেখা দিয়েছে, তিনি ওই অসঙ্গতির বিপক্ষে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। রুখে দাঁড়িয়েছেন, আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে। কৃষক, শ্রমিক, দিনমজুর ও জনতার পক্ষে তিনি কথা বলেছেন। তাইতো তিনি সকলের শিক্ষক হয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছেন। জনসাধারণের মধ্যে রয়েছে তাঁর ব্যাপক জনপ্রিয়তা।
একবার স্যারের সঙ্গে একুশে বই মেলায় গেলাম। সেখানে স্যারের অনেক ভক্ত আছে কোনো সন্দেহ নেই। আমি অবাক হয়ে লক্ষ করলাম একজন পুলিশ কনস্টেবল স্যারের পেছনে পেছনে ঘুড়ছেন। এক সময় তিনি স্যারের পায়ে সালাম করে বললেন, স্যার আমার বাবা স্কুল শিক্ষক। তিনি আপনার একজন ভক্ত। পত্রিকায় আপনার সব লেখা পড়ে। গতকাল বই মেলায় আপনাকে দেখার পর বাবাকে ফোনে বললাম আপনার কথা। তিনি আমার কাছে (ছেলের) আবদার করেছেন আপনার লেখা একটা বই অটোগ্রাফসহ দেয়ার জন্য।
ঈদে আমি গ্রামে গেছি। গ্রামের একটি বৈশিষ্ট্য হলো সন্ধ্যার পর সবাই একসঙ্গে দোকানে বসে ঈদের অনুষ্ঠান দেখে। ইদানীং টকশো খুব বেশি তারা আর দেখতে চান না। কারণ তা অনেক সময় বিভেদের সৃষ্টি করে। কিন্তু চ্যানেল পরিবর্তনের সময় হঠাৎ দেখা গেল মুনতাসীর মামুন স্যার টকশোতে কথা বলছেন। সবাই চিৎকার করে উঠলেন স্যার অনুষ্ঠান থাক, এটাই দেখবো। পরে তাদের সঙ্গে আমি কথা বলে জানতে পারলাম গ্রামবাসী স্যারকে ন্যায়ের ও সত্যের প্রতীক বলে মনে করেন।
স্যার এতই জনপ্রিয় যে অনেকে তাঁর নাম অনুসারে সন্তানের নাম রাখেন। আমার একছাত্রে নাম মুনতাসীর মামুন। বাড়ি নীলফামারী। তাকে একদিন বললাম, তুমি জানো তোমার নামে বাংলাদেশে একজন বিখ্যাত ঐতিহাসিক আছেন। সে গর্বের সঙ্গে আমার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে বলল, স্যারের নাম অনুসরণ করেই তার নাম রাখা হয়েছে। ফকিরেপুল একটি প্রেসে আমাকে ছাপার কাজে মাঝে মাঝে যেতে হয়। প্রেস মালিককের ভাই আমাকে জানালেন মুনতাসীর মামুন স্যারের নাম অনুসরণ করে তার নাম রাখা হয়েছে। আমার নিকটাত্মীয় জ্যাট শালিকার ছেলের নামও মুনতাসীর। প্রবল জনপ্রিয়তার কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে।
মুনতাসীর মামুন স্যার এত জনপ্রিয়তা কারণ তিনি মানুষের যোগ্যতার সম্মান দিতে জানেন। তাই তার এতো জনপ্রিয়তা, এত সম্মান। কিছুদিন আগে যখন দেশে সরকারি কর্মচারী, কর্মকর্তাদের বেতন বাড়ানোর জন্য আন্দোলন হচ্ছিল, তিনি বলেছিলেন সব থেকে বেশি বেতন হওয়া উচিত কৃষিবিদের, সামরিক বা বেসামরিক আমলাদের নয়। কৃষিবিদরা নিরন্তর গবেষণা করে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছেন। যেখানে সব পেশার মানুষ নিজেদের বেতন বাড়ানোর জন্য আন্দোলন করে যাচ্ছিলেন, সেখানে তিনি কৃষিবিদদের বেতন বাড়ানোর কথা বলেন।
এই জন্যেই তিনি সর্বসাধারণে কাছে গ্রহণযোগ্য হয়েছেন। সর্বসাধারণের শিক্ষক হয়েছেন।