ঈদের ৩দিন আগে থেকে মহাসড়কে ট্রাক চলাচল বন্ধ

আগের সংবাদ

ঈদের পরদিন থেকে বগুড়ায় যান চলাচল বন্ধ

পরের সংবাদ

ধর্ষণ-খুন শুধুই কি বিচ্ছিন্ন কিছু?

প্রকাশিত হয়েছে: মে ২৩, ২০১৯ , ৭:৩০ অপরাহ্ণ | আপডেট: মে ২৩, ২০১৯, ৭:৩০ অপরাহ্ণ

ফারুক যোশী

কলাম লেখক।

প্রতিদিন ঘটে যাওয়া এত সব ধর্ষণ আসলে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো এ সমাজে ঘটে যাওয়া অসংখ্য নৃশংস পাশবিকতারই অংশ। বিচারহীনতার সংস্কৃতি সব ক্ষেত্রেই একটা অপরাধী গ্রুপ সৃষ্টি করছে। এরা ব্যবহৃত হচ্ছে, প্রশ্রয় পাচ্ছে। আর সেজন্যই বাড়ছে ধর্ষণসহ সব অপরাধ। তাই ধর্ষণকে ঘৃণ্য-নৃশংস-পাশবিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে যতটুকু আগাতে হবে, ততটুকুই ভেবে দেখতে হবে সমাজ-সংস্কৃতিতে অপশক্তির প্রভাবকে। অপশক্তিকে রোধ করতেই হবে। এবং তা শুরু করতে হবে সমাজ কিংবা রাষ্ট্রের ওপর তলা থেকেই।

ফুটবল খেলায় রুদ্ধশ্বাস গোলের অপেক্ষায় থাকা দর্শকরা যখন দেখে বল গোলপোস্টে পৌঁছাতে পারেননি খেলোয়াড়, তখন একটা ‘ইস’ কিংবা ‘ও’ উচ্চারণের মধ্য দিয়ে দর্শক নতুন আশাবাদের জন্য মাঠের খেলোয়াড়দের দিকে চেয়ে থাকেন। অগণিত দর্শক আরেকটা গোলের অপেক্ষায় থাকেন। আরেকটা গোল পেয়ে গেলে আগের গোলের হতাশাটা কাটিয়ে ওঠেন। আমরা যেন এ রকমই হয়ে গেছি। যেন খেলা দেখছে মানুষ বিশ্বব্যাপী। একেকটা দেশে একেকটা রক্তাক্ত খেলা সংঘটিত হয়। আমরা হাহুতাশ করি, তারপর বেমালুম যেন ভুলে যায় মানুষ। সারা পৃথিবীটাই সম্ভবত এ রকম হয়ে গেছে। সংবেদনশীলতা যেন মরে যাচ্ছে। মানুষের হৃদয় দুঃখ-কাতর হয় এবং নিমিষেই যেন আবার নিঃশেষ হয়ে যায়।
এই-ই যেন নিয়তি, এই-ই যেন বিস্ময়। নিউজিল্যান্ডে বন্দুক দিয়ে মানুষ হত্যা করল একজন, মুসলিম জাতি জেগে উঠল, একটা গোটা রাষ্ট্র বুকটান করে দাঁড়িয়ে গেল মানবতার পক্ষে। এই যে ক’দিন আগে শ্রীলঙ্কায় ধর্মালয়ে কিংবা হোটেলে হামলা হলো, তিন শতাধিক মানুষ মারা গেল। সেই একই আমরা কাতর হলাম। কিছুদিন হা-হুতাশ করে জীবনেরই প্রয়োজনে আবারো এগুতে থাকল মানুষ। আত্মকেন্দ্রিকতার কাছে ক্রমেই যেন হার মেনে নিচ্ছে মানুষ। সমাজ-সভ্যতায় মানুষকে করে তুলছে বড় বেশি যান্ত্রিক। পান থেকে চুন খসলেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সুখ খোঁজে সবাই। অন্যের সঙ্গে সুখের অংশীদার হতে চায়। আর অপরের দুর্বলতা কিংবা দুঃখকে ফুটিয়ে তুলতে চায়। নিজের দুর্বলতাটা নিদারুণভাবে মানুষ ভুলে যায়।
নুসরাত হত্যার রেশ কাটেনি তখনো, এর মাঝে সেই এলাকায়ই আরেক মাদ্রাসা শিক্ষকের ধর্ষণের খবর ওঠে পত্রিকায়। নার্স তানিয়াকে লাশ বানিয়েছে যৌন উন্মাদরা। সাভারে সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ করেছে নৈশপ্রহরী। ছাত্রীর স্পর্শকাতর স্থানে হাত দেন বরিশাল নগরীর হালিমা খাতুন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক, তাকে পুলিশ ধরেছ। কুপ্রস্তাব দেয়া নাকি তার চরিত্রের মাঝে পড়ে। ৭ বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে বরিশালের খাটিয়ালপাড়া নুরানি মাদ্রাসার শিক্ষককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মাদারীপুরে স্কুল ছাত্রীকে ধর্ষণের দায়ে পুলিশ কনস্টেবল গ্রেপ্তার হয়েছেন, এর আগে আর দুজন পুলিশ অফিসারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এ রকম অপরাধেই। এগুলো প্রতিদিনের সংবাদের দুয়েকটা মাত্র।
এ রকম অপরাধী সব সেক্টরেই। এদের সংখ্যা নেহাত কম নয়। মাদ্রাসা-স্কুল-আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কিংবা রাস্তাঘাট-বাস-ট্রেন কোনো স্থানই যেন এ বীভৎসতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। পারছে না। শিক্ষক-নেতাকর্মী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সবাই উঠেছেন এই নির্মম পাশবিকদের লিস্টে। আমাদের পাশে দেশ ভারতেও ধর্ষণের মাত্রা বেড়েছে। কিন্তু এ কথার অর্থ এই নয় যে, পাশ্চাত্যে এ নিয়ে হৈচৈ হয় না। এসব ঘটনা কোর্ট-কাছারিতে ওঠে, মামলা হয় এবং অন্তত দ্রুতগতিতেই এসব মামলার নিষ্পত্তিও হয়। এমনকি ব্রিটিশ জনপ্রতিনিধি কিংবা সেলিব্রিটিরা পর্যন্ত এসব মামলায় আদালতে দৌড়াচ্ছেন, সাজা ভোগ করছেন।
আমাদের বাংলাদেশে যেভাবে বাংলা কিংবা বাঙালিত্ব বিস্তৃত হওয়ার কথা, তারচেয়ে পশ্চিমা সংস্কৃতি অনুসরণ করা হচ্ছে আরো ব্যাপকভাবে। ফাদার্স-মাদার্স ডে’ই হয়ে যাচ্ছে যেন বিনোদনের আরেক মাধ্যম। আমাদের সংস্কৃতিতে বাঙালিত্ব যেভাবে এগিয়ে যাওয়ার কথা, সেভাবে কি এগিয়েছে। বৈশাখ বাণিজ্যে রূপ নিয়েছে। সংস্কৃতিকে ফ্যাশনে রূপ দেয়া হয়েছে। বৈশাখ সংস্কৃতির অঙ্গ হওয়ার চেয়ে বাণিজ্যের অংশ হয়েছে। পোশাকের চাকচিক্য বেড়েছে।
অর্থনৈতিক উত্থান এমন অবস্থায় গিয়ে পৌঁছেছে যে, দুর্নীতি যেন উন্নয়নের সঙ্গে সম্পূরক হয়ে গেছে। অবৈধ আর অনৈতিকতার মধ্য দিয়ে অর্থ লোপাটের সংস্কৃতিকে মানুষ যেন জীবনের সাধারণ এক সোর্স মনে করছে। রূপপুরের ‘বালিশ-বিছানা-কেটলি’ দুর্নীতি, ব্যাংক লোপাট প্রভৃতিকে উপরে ওঠার সিঁড়ি হিসেবে দেখছে একটা শ্রেণি। দুঃখজনকভাবে এই ক্ষুদ্র অপশক্তিই এখন সমাজ কিংবা রাষ্ট্রে শক্তিশালী হয়ে উঠছে। সব মিলিয়ে একটা সামঞ্জস্যহীনতা গ্রাস করছে। শুদ্ধ সংস্কৃতি যুবসমাজকে যেন টানছে না, অপসংস্কৃতি ছড়াচ্ছে দ্রুত। আঁধারের মাঝেই খুলে দেয়া হয়েছে পশ্চিমের হাওয়া। অর্থনৈতিক আকাশ-পাতাল বৈষম্য মানুষদের ক্রমেই যেন অন্ধকারের দিকে টানছে। বৈষম্য এগিয়ে যাওয়া সমাজকে বিষিয়ে তুলছে। মাদক-ধর্ষণ-খুন সমাজের অপরিহার্যতায় যেন পৌঁছে যাচ্ছে।
পাশাপাশি প্রভাবশালীদের ছায়ায় অনেক দুর্নীতি কিংবা অপরাধ বিচারের জন্য ঝুলেই আছে বছরের পর বছর। তনু, নারায়ণগঞ্জের ত্বকী, সাগর-রুনি ছাড়াও অনেক অনেক নৃশংস হত্যার বিচার হয়নি। কিংবা ধর্ষণের শিকার অসংখ্য নারী-শিশুর অভিভাবকরা এখনো প্রভাবশালীদের কাছে জিম্মি। প্রতিদিন ঘটে যাওয়া এত সব ধর্ষণ আসলে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো এ সমাজে ঘটে যাওয়া অসংখ্য নৃশংস পাশবিকতারই অংশ। বিচারহীনতার সংস্কৃতি সব ক্ষেত্রেই একটা অপরাধী গ্রুপ সৃষ্টি করছে। এরা ব্যবহৃত হচ্ছে, প্রশ্রয় পাচ্ছে। আর সেজন্যই বাড়ছে ধর্ষণসহ সব অপরাধ। তাই ধর্ষণকে ঘৃণ্য-নৃশংস-পাশবিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে যতটুকু আগাতে হবে, ততটুকুই ভেবে দেখতে হবে সমাজ-সংস্কৃতিতে অপশক্তির প্রভাবকে। সমাজ কিংবা রাষ্ট্রের চলমান গোটা পদ্ধতির বিরুদ্ধেই সচেতনতা বাড়িয়ে তুলতে হবে। অপশক্তিকে রোধ করতেই হবে। এবং তা শুরু করতে হবে সমাজ কিংবা রাষ্ট্রের ওপর তলা থেকেই।

ফারুক যোশী : কলাম লেখক।