আজ প্রকাশিত হলো “ঢাকার ইতিহাসচর্চা ও মুনতাসীর মামুন”

আগের সংবাদ

অনুকরণীয়, অনুসরণীয় মুনতাসীর মামুন

পরের সংবাদ

কবি নজরুল : প্রস্তুতিপর্বের কথা

প্রকাশিত হয়েছে: মে ২৩, ২০১৯ , ৬:১৮ অপরাহ্ণ | আপডেট: মে ২৪, ২০১৯, ১২:৪৪ অপরাহ্ণ

অনলাইন প্রতিবেদক

কবি নজরুলের জন্মভিটা চুরুলিয়া থেকে আসানসোল খুব কাছে নয়, আর নজরুলের সময় বিবেচনায় যথেষ্ট দূরেই বলা যায়। নজরুল তাঁর শৈশবে চুরুলিয়ার লেটোর দল ছেড়ে আসানসোলে এসেছিলেন প্রথমত পড়তে, পরে জীবিকার প্রশ্নে তিনি আসানসোলে রুটির দোকানে কাজ নিয়েছিলেন। সেখান থেকেই ময়মনসিংহের কাজীর শিমলার রফিজ উল্লাহ দারোগা তাঁকে নিয়ে এসেছিলেন ময়মনসিংহে। সেটা ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের কথা, অর্থাৎ নজরুল তখন ১৫ বছরের কিশোর। সেই পনের বছরের জীবনেই নজরুল ধারণ করেছিলেন চুরুলিয়ার লোকজীবনের সংস্কৃতি, যার মধ্যে লেটোর দলের গান তো ছিলই, সাথে ছিল সেখানকার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সংস্কৃতিও। কাজীর শিমলা থেকে নজরুলের আবাস চলে যায় রফিজ উল্লাহ দারোগার শ্বশুরবাড়ি এলাকায় ত্রিশালের নামাপাড়া গ্রামে বিচুটি ব্যাপারীর বাড়িতে। সেখান থেকেই তাঁকে ভর্তি করা হয় দরিরামপুর উচ্চবিদ্যালয়ে। বছরখানেক ছিলেন নজরুল ত্রিশালে। দরিরামপুর স্কুলে নজরুলকে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি করা হলেও মনে রাখতে হবে নজরুলের বয়স তখন ১৫ বছর; স্থান-কাল-পাত্র ও প্রেক্ষাপট বিবেচনায় যত বাস্তবতা ও যৌক্তিকতাভিত্তিক উপস্থাপন করা হোক, নজরুল তখন পনেরো বছরের কিশোর এবং বয়সটা খুবই দ্বিধাসংকুল। ত্রিশালের জনজীবনে নজরুল সম্পর্কে নানান গল্প আজ প্রচলিত আছে। অন্য বিবেচনায় ত্রিশাল এখন নজরুলময়। ত্রিশালের মানুষ নজরুল বিষয়ে এক বিস্ময়কর আবেগ ধারণ করে। কিন্তু সেই ১৯১৪-১৫ খ্রিস্টাব্দে ত্রিশালে নজরুলের জীবন কেমন ছিল? কবি নজরুলের ত্রিশাল জীবন নিয়ে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ আমরা পাইনি। একজন ছিলেন নিয়ামত আলী মাস্টার, যিনি তাঁর জীবদ্দশায় বেতার-টেলিভিশন-পত্র-পত্রিকায় বেশকিছু সাক্ষাৎকার দিয়েছেন তাঁর সহপাঠী নজরুলের স্মৃতিচারণ করে। আশির দশকে আমার বন্ধু কবি নুরুল ইসলাম মানিক আর আমি নজরুলের ত্রিশাল জীবন নিয়ে কিছু অনুসন্ধানের চেষ্টা করি, তখন আমাদের সামনে একটা নতুন বিষয় চলে আসে। আমরা জানতে পারি ত্রিশালের তরফদার বাড়ির ইয়াকুব আলী তরফদার দরিরামপুর স্কুলে নজরুলের সহপাঠী ছিলেন। তাঁর সাথে আমরা একাধিক বৈঠকে মিলিত হই, আমরা জানতে নিশ্চিত হতে পারি ইয়াকুব আলী তরফদার নজরুলের সহপাঠী ছিলেন, কিন্তু তাঁর ভাষ্যমতে, নিয়ামত আলী মাস্টার ছিলেন তাঁর এক বছরের সিনিয়র। ভ্রান্তিমোচনে আমরা দু’জনকে নিয়ে মুখোমুখি বসি; তারপরও মীমাংসায় আসতে পারিনি। বিশেষ করে, দু’জনই তখন এতোটাই বয়স্ক ছিলেন, যে তাঁদের নিয়ে তর্ক করবার অবকাশ ছিল না। কারো সম্মান নষ্ট হয়, বা কেউ বিব্রত হন সেটাও ছিল আমাদের জন্য সংকটের; কিন্তু তাঁদের সাথে আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা দু’জন অবশ্য ঐকমত্য প্রকাশ করেছিলাম ইয়াকুব আলী তরফদারই সঠিক, কিন্তু তিনি অপ্রচারিত এবং অনুদ্ঘাটিত। ইয়াকুব আলী তরফদার শেষজীবনে অনারারি ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। আমার বর্তমান আলোচনা নিয়ামত আলী-ইয়াকুব আলী বিতর্ক নয়। আমি বরং আজ উদ্ঘাটন করতে চাই কবি নজরুলের প্রস্তুতিপর্বে ময়মনসিংহ আর চুরুলিয়ার প্রভাব নিয়ে।
আসানসোল থেকে নজরুল যখন ময়মনসিংহে আসেন তখন তার সঞ্চয়ে ছিল চুরুলিয়ার লোকসংস্কৃতি, ময়মনসিংহে এসে তার সাথে যুক্ত হয় এ অঞ্চলের লোকসংস্কৃতিও, বিশেষ করে পালাগান, কিসসাপালা, ঘাটুগান আর বেদের জীবন। ত্রিশালের ‘আইরাদি’ তখন ঘাটুগানের জন্য খ্যাত, কিশোর নজরুলের যে দুরন্তপনা, তাতে তাঁর পক্ষে এসব গানের সাথে পরিচিত হবার যথেষ্টই কারণ ছিল। ত্রিশালজীবনের একপর্যায়ে নজরুল ধানিখলা এলাকার সুতিয়া নদীতে বেদেবহরের সাথে ঘনিষ্ঠ হয় যান; নজরুলের ময়মনসিংহে অবস্থানকালে তাঁর এ জনপদের পালাগানের সাথে সম্ভবত পরিচয় ঘটে। নজরুলের গল্প ‘জ্বীনের বাদশা’ এবং ‘সাপুড়ে’ পড়লে আমরা দেখবো নজরুলের গল্পে ময়মনসিংহ জীবনের প্রভাব। জ্বীনের বাদশা গল্পের সংলাপে আমরা পাবো ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ভাষার স্বাদ আর সাপুড়ে গল্প তো সরাসরি মৈমনসিং গীতিকার গুরুত্বপূর্ণ পালা ‘মহুয়া’র ছায়া অবলম্বনে রচিতই বলা যায়। মৈমনসিং গীতিকায় মহুয়া পালাটি যেভাবে উপস্থাপিত, তাতে দেখতে পাই ডাকাত হুমরা শিশু ব্রাহ্মণকন্যা মহুয়াকে চুরি করে পালিয়ে যায় এবং বেদেরদল গঠন করে। হুমরা বাইদ্যা মহুয়াকে কন্যা স্নেহে বড় করে এবং পালিতপুত্র সুজনের সাথে বিয়ে দিকে চায়; মহুয়া যৌবনবতী হলে জমিদারনন্দন নদের চাঁদের প্রেমে পড়ে এবং পলাতক হয়। শেষ পর্যন্ত মহুয়া এবং নদের চাঁদ দু’জনের মৃত্যু হয়। মৈমনসিং গীতিকায় সংকলিত পালাটির সাথে ময়মনসিংহের কোনো কোনো অঞ্চলে প্রচলিত পালার সামান্য বৈসাদৃশ্য লক্ষ করে গেছে, কোনো কোনো অঞ্চলের পালায় দেখা গেছে হুমরা বাইদ্যা নিজেই মহুয়ার পাণিপ্রার্থী। সম্ভবত নজরুল যে মহুয়া পালাটি দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন তার কৈশোরে, সেখানে হুমরা মহুয়ার প্রণয়াকাক্সক্ষী ছিল, সাপুড়ে গল্পেও আমরা তেমনটিই দেখি।
লোকজ সংস্কৃতির ধারায় ঘাটুগান অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি মাধ্যম। বৃহত্তর ময়মনসিংহ, সিলেট, কুমিল্লা এবং ঢাকা জেলার কোনো কোনো অঞ্চলে এ ধারার গানের প্রচলন দেখা যায়। সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ থেকে বৃহত্তর ময়মনসিংহের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘাটুগানের প্রচলন শুরু হয় বলে তথ্য পাওয়া যায়। গত শতাব্দীর শেষার্ধেও এ অঞ্চলে ঘাটুগানের প্রচলন দেখা গেছে, তবে সাম্প্রতিক সময়ে আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া ঘাটুগান খুব একটা শোনা যায় না। ময়মনসিংহের ভালুকা, ত্রিশাল, গফরগাঁও, ফুলবাড়ীয়া; নেত্রকোনার কেন্দুয়া, মদন, খালিয়াজুরি; কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর, ইটনা, করিমগঞ্জ, মিঠামইন, নিকলি; টাঙ্গাইলের কালিহাতি, ঘাটাইল, ভুয়াপুর এবং জামালপুর জেলার কোনো কোনো গ্রামে ঘাটুগানের প্রচলনের তথ্য পাওয়া যায়। ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার ‘আইরাদি’ গ্রামের নাম ঘাটুগানের সাথে খুবই খ্যাতিমান। অল্পশিক্ষিত ও অশিক্ষিত ঘাটুগানের গীতিকারদের মুন্সীয়ানাও লক্ষণীয়। ঘাটুগানের ক্ষেত্রে আরো একটি উল্লেখযোগ্য তথ্য হলো যারা ঘাটু গানের নৃত্য-গীতি পরিবেশন করে তাদের মেয়েদের মতো দীর্ঘ চুল এবং গান পরিবেশনার সময় মেয়ে সেজে নৃত্য-গীত পরিবেশনের রীতি প্রচলিত। ঘাটুগান সম্পর্কে ময়মনসিংহের বিভিন্ন অঞ্চলে যেসব গল্প কাহিনীর প্রচলন আছে তাতে সহজেই ধারণা করা যায় ঘাটুগানের সাথে সমকামিতার নিবিড় সম্পর্ক বর্তমান। তা ছাড়া ত্রিশাল অঞ্চলের ঘাটুগানে যে বিষাদসুর নজরুল শুনেছিলেন, সে সুর যেন ছড়িয়ে পড়েছিল তাঁর গীতিতে। নজরুলের গানের প্রধান প্রবণতাও দেখি বিষাদে ছাওয়া। অন্যদিকে চুরুলিয়ার লেটোর দলের গানের সাথে ময়মনসিংহ অঞ্চলের পালাগানের কিছুটা সাযুজ্যও আমরা লক্ষ করতে পারি, সে মিল ঘাটুগানের সাথেও ছিল। আমরা বরং ঘাটুগানের কতিপয় চরণ স্মরণ করি-
* হায়রে পিতলের কলসী তরে লইয়া যাইমু যমুনায়
কলসীরে তোর গলায় ধরি
লইয়া যা মোরে বন্ধুর বাড়ি
ঐ দেখা যায় ছোকরা বন্ধু পানসি নাউয়ের গুণ টানায় ॥
* বন্ধু একবার আইসা আমায় দেইখা যাও রে ॥
জ্বালাইছে চান্দের বাত্তি কাটে না রতিরে

বন্ধু একবার আইসা আমায় দেইখা যাওরে ॥
চিঠিতে তো লিখি কত কতা
সব কতা কি যায়ওরে লেখারে বন্ধু ॥
লণ্ঠনো জ্বালাইয়ারে লিখি
না দেখে যে ননদী শাশুড়ি
পন্থ পানে চাইয়ারে থাকি তোমারি আশায় ॥
* বাবু মহিমচন্দ্র রায়
ধোপীর সনে প্রেম করিয়া কইলকাতা পলায় ॥
আর্শি কান্দে পড়শি কান্দে
তেমাল্লার উপরে গো কান্দে বাবুর দুই কইন্যায় ॥
আডারো বাড়ির জমিগোদারীর কি অইবো উপায়
বাবু বলে লেইখা গো দিবাম
ধোপীনির মাইয়ায় ॥
এসব ঘাটুগানের কোনো লিখিত রূপ নেই। সবই ঘাটুশিল্পীদের মুখে মুখে প্রচারিত, যা আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। এগুলো উদ্ধার করে সংরক্ষণের উদ্যোগ যত দ্রুত নেয়া যাবে ততই মঙ্গল। কবি নজরুল ঘাটুগান রচনা করেছেন, তেমনটি জানা যায় না; কিন্তু তাঁর গানে ভিন্নমাত্রায় নারীর বেদনা বিধৃত হয়েছে-
সই ভালো করে বিনোদ বেনি বাঁধিয়া দে
বঁধু যেনো বাঁধা থাকে বিনুনী ছাদে ॥
চপল পুরুষ সে তাই কুরুশ কাঁটায়
বেঁধিয়া খোঁপার সাথে রাখিবো লো তায়।
সই পায়ে ধরে বঁধু যেনো আমারে সাধে ॥
ত্রিশাল জীবনের এক বছরের স্মৃতি নজরুল পরিণত বয়সেও বিস্মৃত হননি। সে কথা নজরুলের স্মৃতিচারণমূলক রচনাতেও আমরা দেখতে পাই। ভুলতে পারেননি বলেই নজরুলের গল্প-কবিতা-প্রবন্ধ ও গানে আমরা সহজেই খুঁজে পাই তাঁর ত্রিশাল জীবনের অভিজ্ঞতার কথা; সুতরাং অসংকোচেই বলা যায় নজরুল সাহিত্যের প্রস্তুতিপর্ব শুরু হয়েছিল তাঁর শৈশব-কৈশোরের জীবন চুরুলিয়া, আসানসোল আর ময়মনসিংহের ত্রিশালে। বিদ্যায়তনের পাঠে নজরুলের অমনোযোগ থাকলেও প্রকৃতি আর পরিপার্শ্বপাঠে নজরুলের সামান্যতম অনাগ্রহ ছিল না; নজরুলের শৈশব-কৈশোরের সেই মানুষ-প্রকৃতি আর পরিপার্শ্বপাঠের অভিজ্ঞতাই তাঁর সাহিত্যজীবনের ভিত রচনা করে দিয়েছিল, সে কথাটি জোর দিয়েই বলতে পারি।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা