আমরা কী খাচ্ছি?

আগের সংবাদ

ঈদের পর খালেদা জিয়ার জামিন শুনানি

পরের সংবাদ

বেঁচে থাকতেই হবে গফুর মহেশ আর আমেনাকে

প্রকাশিত হয়েছে: মে ২২, ২০১৯ , ৯:০২ অপরাহ্ণ | আপডেট: মে ২২, ২০১৯, ৯:০২ অপরাহ্ণ

জোবাইদা নাসরীন

শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

কৃষকরাই সাহসের সঙ্গে উচ্চারণ করেছিলেন, ‘জান দেবো তবু ধান দেবো না’। আর এই কৃষকরাই তাদের আন্দোলনের মাধ্যমে এ দেশে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন। এখন আর দেশে বর্গি নেই, জমিদারও নেই। তবু এ দেশের কৃষক পান না তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম। হাহাকার বাড়ছে বাংলাদেশের মেরুদ- কৃষিতে। কীভাবে যেন হারিয়ে যাচ্ছে গফুর, মহেশ আর আমেনারা। এরা হারিয়ে গেলে বাংলাদেশের টিকে থাকাই যে মুশকিল হবে।

একটা সময় ছিল যখন এ দেশের গ্রামবাংলায় নবান্নই ছিল সবচেয়ে বড় সামাজিক উৎসব। শুধু বাংলাদেশেই নয়, পৃথিবীর অনেক দেশেই আজো কৃষকের প্রতি কৃতজ্ঞতার উৎসবই এখনো সবচেয়ে বড় উৎসব। এ দেশের নবান্নে কৃষকের মুখে হাসি ফুটত। নতুন ধান ঘরে তুলে কৃষক নতুন স্বপ্ন দেখত। নতুন ধানের চালের ঘ্রাণে মৌ মৌ করত কৃষকের ঘর। কৃষাণীর চোখে-মুখেও তখন আনন্দের ঝলক দেখা দিত। অথচ নবান্ন কী এ প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের অনেকেই হয়তো জানে না। শুধু চারুকলার একদিনের নাচ-গানের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়েই নবান্ন নামক উৎসবটিকে জাদুঘর থেকে টেনে বের করা হয়। কারণ এখন আর গ্রামে নবান্ন হয় না। তাই নবান্নও এখন হয়ে গেছে অনেকটাই রূপকথা। নবান্নের উৎসব তো অনেক দূরের বিষয়, এখন অনেক বেশি ফসল ফলিয়েও কৃষকের মুখে আনন্দ নেই। উল্টো আছে কষ্ট, বেদনা আর হতাশা।
মাসখানেক ধরেই শোনা যাচ্ছে শোরগোলটি। প্রত্যক্ষ উৎপাদক কৃষক তার ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হয়ে আজ নেমে এসেছেন রাস্তায়। বাড়ির গোলায় নয়, ধান বিছিয়ে দিয়েছে রাস্তায়। এই বিছিয়ে দেয়াটাই ছিল তার জন্য সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ। বাংলাদেশে এ বছর বোরো ধানের বাম্পার ফলন হলেও কৃষকরা ধানের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। এ বছর ১ কোটি ৯৬ লাখ টন বোরো ধান উৎপাদন হবে বলে ধারণা করা হয়েছিল এবং ইতোমধ্যেই লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছে গেছেন কৃষক। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, বাংলাদেশ সরকার চলতি মৌসুমে প্রতি মণ বোরো ধানের দাম নির্ধারণ করেছিল ১০৪০ টাকা কিন্তু বাস্তবে কৃষক ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার বেশি দরে এক মণ ধান বিক্রি করতে পারছেন না।
বাংলাদেশে সব কৃষকের অবস্থা এবং অবস্থান এক রকম নয়। আছেন অবস্থাপন্ন কৃষক, ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষক। এর পাশাপাশি আছেন ‘অনুপস্থিত কৃষক’ মানে যারা মূলত কৃষিজমির মালিক, কিন্তু তারা অন্য জায়গায় থাকেন এবং নিজেরা চাষাবাদ করেন না। অন্যের কাছে বর্গা দেন। বর্তমানে ভূমিহীন কৃষক রয়েছেন ১৯ ভাগ, প্রান্তিক এবং ক্ষুদ্র কৃষকের সংখ্যা শতকরা প্রায় ৪৬ ভাগ। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন তেভাগার লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও খোদ বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত বর্গার কত ধরন আছে সেটির কোনো প্রাতিষ্ঠানিক রেকর্ড নেই। তবে প্রান্তিক এবং ক্ষুদ্র চাষিদের একটা বড় অংশ মহাজন বা অন্যদের থেকে ঋণ করে ফসল ফলায় এবং ঋণ শোধের তাগাদায় জমি থেকে ফসল তোলার সঙ্গে সঙ্গে তা বিক্রি করার চেষ্টা করেন। ফসলের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় সবচেয়ে সংকট এসেছে তাদের জীবনে। মাটি আঁকড়ে চাষিরা আহাজারি করে বলছেন, বিঘাপ্রতি তাদের লোকসানের মাত্রা দুই হাজারের বেশি গুনতে হচ্ছে। এর সঙ্গে আরো আছে ধান কাটার মজুরের মজুরি আর আর কিনতে হয় সার। মোট হিসেবে লোকসানের পরিমাণ আসলে আরো বেশি।
এই অবস্থা যে আজকের তা নয়, কমবেশি গত এক দশকের চিত্র। আরো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো এই যে, সার, সেচের জন্য ডিজেল, বীজসহ নানা জায়গায় ভর্তুকি দিচ্ছে সরকার। কিন্তু ক্ষুদ্র, প্রান্তিক বা ভূমিহীন কৃষকরা এই ভর্তুকির সুবিধা পাচ্ছেন না। যখন ধানের দাম বাড়ে তখন কৃষকের ঘর খালি, কারণ ক্ষুদ্র এবং প্রান্তিক কৃষকের মাথায় থাকে ঋণের বোঝা। সেই ঋণ পরিশোধ এবং জীবন টেনে নিতে সে ফসল ঘরে আনার আগেই বিক্রি করতে বাধ্য হন। কয়েক বছর ধরেই কৃষিকাজে জড়িত অনেকেই পেশা পরিবর্তন করেছেন কারণ কৃষিকাজে টিকে থাকতে পারছেন না। কৃষি খাতে শ্রমিকের মজুরিও এখন পর্যন্ত সঠিকভাবে নির্ধারিত হয়নি। এখন অবস্থা এমন হয়েছে যে কৃষকের বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে। এক মণ ধান বিক্রি করে কৃষক পান ৫০০ টাকা। আর একজন মজুরের দৈনিক মজুরি ৬০০-১০০০ টাকা। কীভাবে মজুর জোগান দিবে ক্ষুদ্র এবং প্রান্তিক কৃষক?
কৃষকরা বলছেন ধানের দাম সরকার নির্ধারিত মূল্যে তো পাওয়া যাচ্ছেই না, বরং এমনকি এর অর্ধেক দামেও তারা ধান বিক্রি করতে পারছেন না। তারা বলছেন ধানের মণপ্রতি উৎপাদন খরচ ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকা। কিন্তু বাজারে ধানের প্রকারভেদে এখন ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকার ওপরে বিক্রি হচ্ছে না। সরকার এবারের ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে ১ লাখ ২৫ হাজার টন। ধানের বাজারে এবার ক্রেতা কম। এতেই সমস্যায় পড়েছেন কৃষকরা। ধানের ন্যায্য দাম না পেয়ে এক কৃষক তার ধান ক্ষেতে আগুন লাগিয়ে ক্ষোভ এবং প্রতিবাদ জানিয়েছেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কৃষকরা তাদের প্রতিবাদ জারি রেখেছেন। সরকারের তরফ থেকে কৃষকদের এই দুর্দশাকে স্বীকার করে ৩৬ টাকা কেজি দরে চাল ক্রয় করলেও কোনো লাভ হচ্ছে না। কারণ মধ্যস্বত্বভোগীরা লাভ ছেঁকে নিচ্ছেন। চাষির নাম দিয়ে রাজনৈতিক লোকজন, খাদ্য বিভাগের লোকজন ও ব্যবসায়ীরা সরকারের গুদামে ধান দিচ্ছে। আর এদিকে ধানের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না কৃষক। প্রেক্ষাপট যখন এই রকম ভয়াবহ, তখন আর সরকার বলছে এই মুহূর্তে ধানের দাম বাড়ানো খুবই কঠিন হবে এবং ধান রপ্তানির মতো ভিন্ন কিছু উপায়ের কথা তারা বিবেচনা করছেন। কিন্তু তাহলে কী হবে কৃষকের?
কৃষকের এই সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক দুরবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই। হ্যাঁ, কৃষকের এই অবস্থার জন্য আমরাই দায়ী। এ দেশে কায়িক শ্রমিকরাই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত এবং শোষণ ও বৈষম্যের শিকার। আমরা এখন মেশিনের বন্দনা করি, কিন্তু শ্রমের নয়। গায়ে-গতরে খাটে যে সবচেয়ে বেশি আগে, তার মজুরিই হয় সবচেয়ে কম। কৃষক বাংলার অহংকার বলে আমরা মুখস্থ বুলি আওড়ালেও বাবা-মা কৃষিকাজে জড়িত এটি বলতে এখনকার সন্তানেরা ‘লজ্জা’বোধ করে। কারণ শিল্পের গৌরব করা সমাজ তাকে শিখিয়েছে কায়িক শ্রমিকদের সামাজিকভাবে অস্বীকার করার রাজনীতি। অথচ এই বাংলার মাটি চিরে গড়ে উঠেছিল একের পর এক কৃষক আন্দোলন। তেভাগা, নানকার, টংক, নাচোল সবই এ দেশের কৃষক আন্দোলনের ইতিহাস আর এই কৃষকরাই সাহসের সঙ্গে উচ্চারণ করেছিলেন, ‘জান দেবো তবু ধান দেবো না’। আর এই কৃষকরাই তাদের আন্দোলনের মাধ্যমে এ দেশে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন।
আজো স্পষ্ট দেখতে পাই মনে দাগকাটা এক অতীতকে। আমার পরের ব্যাচের একটি মেয়ের সঙ্গে পরিচয় হলো হলে। সে তখন প্রথম বর্ষে। এক সন্ধ্যায় তার রুমমেট থেকে জানতে পারলাম মেয়েটি খুব কাঁদছে। প্রথম হলে আসলে অনেকেই ফেলে আসা বাড়ির জন্য মন খারাপ করে, কান্না করে। ভাবলাম মেয়েটিও হয়তো সেজন্য কাঁদছে। কিন্তু পরে একদিন আরো মন খারাপ করা কোনো এক বিকেলে মেয়েটি আমাকে বলল তার আসল কান্নার কারণ। মেয়েটির বাবা কৃষিকাজ করতেন। এটি বলতে মেয়েটি প্রথমদিকে খুব সংকোচবোধ করত এবং এটি বলার পর দু’/চার জায়গা থেকে সে এমনভাবে চোখের হাসাহাসিতে পড়েছিল যা তাকে সারারাত কাঁদিয়েছিল। অথচ এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। আমরা গর্ব করে বলি এ দেশের প্রাণ কৃষকরা। কিন্তু আমরা সামাজিকভাবে কতটা মনে করি তাদের কাছেরজন?
কৃষি এবং কৃষকের সঙ্গে গবেষণাও কমে গেছে। সবাই ঝুঁকছে শিল্পের প্রতি। তাই কৃষির কদর কম। কায়িক শ্রমের সামাজিক মর্যাদার অভাব আমাদের নিয়ে গেছে পরিচয়হীনতার দিকে। যার কারণে আমরা কৃষকের সন্তান পরিচয় দিতে আমাদের অস্বস্তি লাগে। এই অস্বস্তি মূলতই রাজনৈতিক অস্বস্তি এবং এটাকে সামাজিক এবং রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে হবে- যেমন কিছুটা অস্বস্তি ভেঙেছে আমাদের শিক্ষার্থীরা। বিভিন্ন অঞ্চলে তারা স্বেচ্ছায় শ্রম দিচ্ছে ধান কাটার জন্য।
এখন আর দেশে বর্গি নেই, জমিদারও নেই। তবু এ দেশের কৃষক পান না তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম। হাহাকার বাড়ছে বাংলাদেশের মেরুদ- কৃষিতে। কীভাবে যেন হারিয়ে যাচ্ছে গফুর, মহেশ আর আমেনারা। এরা হারিয়ে গেলে বাংলাদেশের টিকে থাকাই যে মুশকিল হবে। তাই ভালোভাবেই বাঁচিয়ে রাখতে হবে গফুর, মহেশ আর আমেনাকে।

জোবাইদা নাসরীন : শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।