জেলেদের সহায়তা না দিলে কার্যকর করা কঠিন

আগের সংবাদ

বেঁচে থাকতেই হবে গফুর মহেশ আর আমেনাকে

পরের সংবাদ

আমরা কী খাচ্ছি?

প্রকাশিত হয়েছে: মে ২২, ২০১৯ , ৮:৫৪ অপরাহ্ণ | আপডেট: মে ২২, ২০১৯, ৮:৫৪ অপরাহ্ণ

কাগজ প্রতিবেদক

এম আর মাহবুব

লেখক ও গবেষক।

মানুষের মৌলিক চাহিদার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রথম ও প্রধান চাহিদা হচ্ছে খাদ্য। আমাদের জীবনের সব শ্রম ও সাধনার মূলে রয়েছে সুস্থ সুন্দরভাবে বেঁচে থাকা আর এই বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন সুষম খাদ্য গ্রহণ। কিন্তু আমরা কি খাচ্ছি? আমরা কি জীবন ধারণের জন্য খাচ্ছি না জীবন সংহারের জন্য খাচ্ছি। সম্প্রতি বিভিন্ন পত্রিকায় খাদ্যে ভেজাল সংক্রান্ত প্রকাশিত প্রতিবেদন পড়ে এবং টেলিভিশন দেখে আমাদের মনে স্বাভাবিকভাবেই এই প্রশ্নটি জাগতে পারে।
আমাদের দেশে সর্বত্রই চলছে ভেজালের সমারোহ। ভেজালের ভিড়ে অসুস্থ ও দূষিত হয়ে যাচ্ছে আমাদের বর্তমান ও অনাগত ভবিষ্যৎ। এতসব ভেজালের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করেই বেঁচে আছি আমরা। কিন্তু যে ভেজাল আমাদের জীবনী শক্তিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। আমাদের বেঁচে থাকার আশা খর্ব করে দিচ্ছে তা হলো খাদ্যে ভেজাল। পানির অপর নাম জীবন। জীবন ধারণের জন্য আমরা যে পানি পান করি তা কতটুকু বিশুদ্ধ? মিনারেল ওয়াটারের নামে বাণিজ্যিক স্বার্থে দুর্গন্ধময় দূষিত পানি বোতলজাত করে বাজারে বিক্রি হচ্ছে। পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে আমরা জানতে পারি। বেশিরভাগ মিনারেল ওয়াটার বোতলজাত হয় গণশৌচাগার থেকে কিংবা ওয়াসার সরবরাহকৃত পানি থেকে। আইসিডিডিআরবি পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করে ৯৮ ভাগ কোম্পানির মিনারেল ওয়াটার পানের অযোগ্য বলে প্রমাণ হয়। গ্রামের মানুষ অনাদি কাল থেকে নিশ্চিন্তে এবং পরম তৃপ্তিতে যে টিউবওয়েলের পানি পান করে আসছে সেখানেও আর্সেনিক নামক বিষক্রিয়া। পানির মতো সহজলভ্য দ্রব্যেও যদি ভেজাল থাকে তাহলে আমরা খাব কি, যাব কোথায়। ফাস্ট ফুডের দোকানে বিক্রি হচ্ছে মরা মুরগির ফ্রাই এবং মুখরোচক নানা বাসি পচা খাবার। কেক, ব্রেড তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে পচা ডিম।
চাল ও ডালে বালি, পাথর মিশিয়ে বাজারে বিক্রি হচ্ছে হরদম। শরীরের পুষ্টির চাহিদা মেটাতে ফল খাবেন তাতেও সমস্যা। কলা, আপেল, আমসহ প্রায় ফলেই কৃত্রিম রং মেশানো হয় এবং ফল পাকাতে ব্যবহৃত হয় ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ। শাক-সবজি উৎপাদনে ব্যবহার করা হয় কৃত্রিম সার। মাছের পচন ঠেকাতে ব্যবহৃত কৃত্রিম রং এবং নানা রাসায়নিক পদার্থ। ‘মাছে ভাতে বাঙালি’ এই চিরন্তন প্রবাদের যথার্থতা আজ আর নেই। ভেজাল মাছ আর ভাত খেয়ে বাঙালি আজ মরণপথযাত্রী। আয়োডিন যুক্ত লবণের নামে বিভিন্ন লবণ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করে আয়োডিনবিহীন লবণ প্রস্তুত করে চলছে। লবণ বাজারজাতকারী কোম্পানির মধ্যে ৯৫ ভাগ লবণের মধ্যেই আয়োডিন নেই এতে গর্ভবতী মায়ের পেটের বাচ্চা বিকলাঙ্গ, হাবাগোবা, মানসিক ও শারীরিক প্রতিবন্ধী হচ্ছে এবং গলগ-সহ বিভিন্ন রোগ ছড়াচ্ছে।
শিশুদের বলা হয় জাতির ভবিষ্যৎ। এই ভবিষ্যৎ বংশধর শিশু-কিশোররা স্কুলে গিয়ে ক্ষুধা নিবারণের জন্য কী খাচ্ছে তার ভয়াবহ চিত্র প্রতিফলিত হয় বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন পত্রিকায়। একটি প্রতিবেদনে বলা হয় : ‘প্রতিদিন স্কুল-কলেজের ২০ হাজার শিক্ষার্থী পচাবাসি ও অপরিষ্কার আচার, ঝালমুড়িসহ নানা ভেজালযুক্ত অখাদ্য ও কুখাদ্য খাচ্ছে।
এসব খাদ্যের পরিণতি সম্পর্কে প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, “মহাখালী আইসিডিডিআরসি বিজ্ঞানীরা বলেছেন স্কুল-কলেজের সামনে ভ্রাম্যমাণ দোকানে থেকে পচাবাসি, নিম্নমানের ভেজাল খাবার খেলে ছাত্রছাত্রীদের কলেরা, ডায়রিয়াসহ যে কোনো ধরনের পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা একশ ভাগ। পাশাপাশি হেপাটাইটিস ‘এ’ ও ‘ই’ টাইফয়েডসহ যে কোনো ধরনের সংক্রামক ব্যাধি হওয়ার আশঙ্কা একশভাগ।”
চকোলেট, মিষ্টি আইসক্রিম, জুস, কোমল পানীয় শিশুদের খুবই পছন্দ। অথচ এসব পণ্যসামগ্রীতেও কৃত্রিম রং ও ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ মেশানো হয়। দুধ একটি আদর্শ খাদ্য। এই আদর্শ খাদ্যটিও ভেজালের হাত থেকে রেহায় পায়নি। গাভীর দুধে মেশানো হয় পানি আর পাউডার দুধ এবং দুগ্ধজাত খাদ্য সামগ্রী যেমন- মিষ্টি, দই, আইসক্রিমে মেশানো হয় ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ। জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরীক্ষাগারে প্রাপ্ত রিপোর্টে বলা হয়েছে ৯৪ ভাগ দোকানের মিষ্টি ও দুগ্ধজাতীয় খাবার ভেজাল ও নিম্নমানের। এসব খাবার খাওয়ার কয়েক বছর পর ক্যান্সার, কিডনি ও লিভারের জটিল ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা ৯৯ ভাগ।
শুধু দুধ আর মিষ্টিই নয় ঝাল জাতীয় খাবার যেমন- পেঁয়াজু, বেগুনি, পুরি ইত্যাদি খাবার তৈরির সময় বিষাক্ত তেল এবং টেক্সটাইলের বিষাক্ত ডাই ব্যবহার করা হয় যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। মাছ, মাংস, পোলাও, খিচুরিসহ নানা মজাদার খাবার কার না পছন্দ। বিশেষ করে পবিত্র রমজান মাসে ইফতারিতে এসব মুখরোচক খাবারের তুলনা হয় না। এসব রান্নার জন্য যেসব তেল, ঘি, ডালডা, বাটার অয়েল ব্যবহৃত হয় তাতে মেশানো হচ্ছে কলকারখানার কেমিক্যাল রং, গরুর চর্বি ও নাড়ি। এ ছাড়া ভ্রাম্যমাণ আদালতের বদৌলতে টিভি পর্দায় দেখতে পাচ্ছি ঘি’র কৌটায় মরা ইঁদুর, তেলাপোকা। আমরা প্রতিনিয়ত এসব বিষাক্ত খাবার খেয়ে যাচ্ছি নিজের অজান্তে।
বাজারজাতকারী গাওয়া ঘি ৯৩ ভাগ ভেজাল ও খাবারের অনুপযোগী, বাটার অয়েল ৯২ ভাগ ভেজাল, ডালডা ১০০ ভাগ ভেজাল, সয়াবিন ও সরিষার তেল ৯২ ভাগ ভেজাল ও খাবারের অনুপযোগী। ঘি, তেলে পাওয়া মরা ইঁদুর, চাল, ডাল, পানি, লবণ, তেল, মাছ, মাংস, সবজি, মিষ্টি, টক, ঝাল সব খাবারই ভেজাল। এই যদি দেশের অবস্থা হয় তাহলে আমরা কী খাব।
মাদক ও দুর্নীতি থেকেও ভয়াবহ হলো খাবারে ভেজাল মেশানোর মতো জঘন্য কর্মকাণ্ড। কারণ আমরা এবং আমাদের আগামী প্রজন্ম সহজ সরল বিশ্বাসে এসব ভেজাল খাবার খেয়ে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছি। একজন ভেজালকারী এভাবেই শত শত মানুষকে এমনকি সমগ্র জাতিকে হত্যা করে চলছে। যারা আমাদের এই অনিশ্চয়তার দিকে নিয়ে যাচ্ছে তারা কারা? এরা কি ধরাছোঁয়ার বাইরে। এরা তো আমাদের সমাজেরই অংশ। আমাদের সমাজে একজন মানুষ হত্যাকারী সন্ত্রাসীর বিচার হয়, ফাঁসি হয় অথচ শত শত মানুষ হত্যাকারী একজন ভেজালকারীর বিরুদ্ধে কোনো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির নেই। আমাদের সবার চোখের সামনে প্রতিনিয়ত ভেজালকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত দাপটের সঙ্গে তাদের অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। কোনো প্রতিকার নেই, প্রতিরোধ নেই, উপযুক্ত বিচার নেই। সম্প্রতি হাইকোর্ট প্রধানমন্ত্রীকে মাদক নির্মূলের মতো ভেজাল খাদ্যপণ্যের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ বা প্রয়োজনে জরুরি অবস্থা ঘোষণার অনুরোধ করেছেন। আসলে এ থেকেই আমরা উপলব্ধি করতে পারি খাদ্যদ্রব্যে ভেজালের ভয়াবহতা।
চলছে ভেজালবিরোধী অভিযান। শুভ উদ্যোগ। তবে শুধু জরিমানা আদায় করে তাদের প্রতিরোধ করা যাবে না। প্রয়োজনে আইনপ্রণয়ন করে অপরাধীদের কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের বেঁচে থাকার প্রয়োজনে অবশ্যই খাদ্যে ভেজাল প্রয়োগের অবৈধ ব্যবসা রোধ করার কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। বিশুদ্ধ খাবারের নিশ্চয়তা দিতে হবে। ভেজালবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকুক এটা সব সচেতন মহলের দাবি।

এম আর মাহবুব : লেখক ও গবেষক।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা