কার্যকর পদক্ষেপ নিক বিআইডব্লিউটিসি

আগের সংবাদ

দুই গৌরবোজ্জ্বল উৎসব সামনে রেখে

পরের সংবাদ

ধানের অবিশ্বাস্য কম মূল্যের পরিণতি কী?

প্রকাশিত হয়েছে: মে ২১, ২০১৯ , ৮:২৭ অপরাহ্ণ | আপডেট: মে ২১, ২০১৯, ৮:২৭ অপরাহ্ণ

মজিবর রহমান

কলাম লেখক।

দাম নির্ধারণ নিয়ে প্রতি বছরই কিছুটা অস্বস্তি ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব লক্ষ করি নীতিনির্ধারক মহলে। চালের দাম নিয়ে একটা ভীতি কাজ করে সরকারি মহলে। তা ছাড়া দামের সামান্য বৃদ্ধি জনমনে যেমন বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে, তেমনই রাজনীতির মাঠও গরম হয়। নাগরিক সমাজও এ নিয়ে কথা বলতে ছাড়েন না। সব কিছুর দাম বাড়লেও চালের দাম বাড়তে পারবে না- বিষয়টি এ রকম। এতে ক্ষতির শিকার হন কৃষক।

বাংলাদেশে সত্যিকারের গবেষণা যদি কোনো ক্ষেত্রে হয়ে থাকে তো সেটি ধান নিয়ে। নিঃসংকোচে বলা যায় কৃষি বিজ্ঞানীরা অভাবিত সাফল্য দেখিয়েছেন। একের পর এক তারা উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন দেশ ও বিশ্ববাসীকে। যেখানে অন্য ক্ষেত্রের গবেষকরা বাজেট বরাদ্দের সীমাবদ্ধতা ও অপ্রতুল সুযোগ-সুবিধার কথা বলে হাত গুটিয়ে নিচ্ছেন, কৃষি বিজ্ঞানীরা সেখানে প্রদর্শন করছেন অপরিসীম দক্ষতা ও পারদর্শিতা। তারা কি অতিরিক্ত বাজেট বরাদ্দ, কিংবা ব্যতিক্রমী সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন? না- মোটেও তা নয়। মেধা ও পরিশ্রমের সংযোজন ঘটাচ্ছেন তারা ¯্রফে দায়িত্ববোধ থেকে। সরকার বা দেশবাসীর তরফ থেকে কতটুকু মূল্যায়িত হলেন সেদিকে না তাকিয়ে নিজেদের কাজটা তারা করে যাচ্ছেন আন্তরিকতার সঙ্গে।
কৃতিত্ব কৃষক সমাজকেও দিতে হবে। কৃষকের প্রথাগত শিক্ষা নেই ঠিকই, কিন্তু আছে নতুন টেকনোলজি গ্রহণের অসাধারণ ক্ষমতা। কৃষি বিজ্ঞানীদের নতুন কোনো উদ্ভাবনের তথ্য নিজ উদ্যোগেই সংগ্রহ করে ত্বরিত প্রয়োগ করছেন তারা তাদের চাষাবাদে। এতে ফলও পাচ্ছেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, উৎপাদিত পণ্যের উপযুক্ত মূল্য পাচ্ছেন না।
বোরো-ইরির ভর মৌসুম এখন। গ্রামের সঙ্গে যাদের নাড়ির সংযোগ তারা জানেন নিশ্চয়ই বর্তমানে দেশে এই ফসলটিই প্রধান। আমনের রমরমা দিন এখন আর নেই। বোরো-ইরির গুরুত্ব আরেকটা কারণে বেশি। হাওর অঞ্চলের জমি এক ফসলি, সেখানকার মানুষের সারা বছরের নির্ভরতার উৎস বোরো-ইরি। এবার এর ফলন বেশ ভালো হয়েছে। অন্যান্য বছরের মতো পাহাড়ি ঢল, কিংবা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ গ্রাস করেনি তাদের ফলন। ফসল রক্ষা বাঁধ নিয়েও সচেতন ছিলেন সংশ্লিষ্টরা। সার্বিক বিচারে সারা দেশেই ধানের ফলন ভালো হয়েছে।
কিন্তু ভাগ্য বড় নির্মম কৃষক সমাজের। মণপ্রতি পাঁচশ টাকা মূল্যও পাচ্ছেন না তারা। এই মূল্যস্তরে উৎপাদন খরচও উঠে আসে কিনা সন্দেহ আছে। গত কয়েকদিন ধরে এ নিয়ে আহাজারির খবর প্রকাশিত হচ্ছে পত্রপত্রিকায় নিয়মিতভাবে। মনের দুঃখে কোনো এক কৃষক ক্ষেতের ধান পুড়িয়ে ফেলেছেন, এ রকম খবরও এসেছে। কোনো কোনো জায়গায় ছাত্রসমাজের ক্ষুদ্র অংশ কৃষকের পাশে গিয়ে দাঁড়াচ্ছেন কাস্তে হাতে, যদিও এটি কোনো সমাধান নয়, নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণের প্রয়াস বলা যেতে পারে। সরকারের উচিত হবে একে নেতিবাচকভাবে না নিয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে প্রতিকারের ব্যবস্থা নেয়া।
তা ছাড়া সমস্যাটি যে কেবল এ বছরের তা নয়। পুরনো সমস্যা এটি। ফলন ভালো হলে বিপাকে পড়েন কৃষক বরাবরই। সাময়িক এ নিয়ে কথাবার্তা হয়, তার পর পরিস্থিতি যেমন তেমনই দাঁড়ায়। এ নিয়ে সুদূরপ্রসারী কোনো পরিকল্পনা দৃশ্যমান নয়। রক্ষাকবচ হিসেবে যে পদক্ষেপের কথা শোনা যায় তা হলো সরকারি ক্রয়, যা মূল্যস্তরে ভারসাম্য আনবে মনে করা হয়। বাস্তবে কৃষক এর কোনো সুবিধাই পান না। পকেট ভারি হয় দায়িত্বপ্রাপ্তদের, কিংবা মিল মালিকদের। অতএব ধরে নেয়া যায় সরকারি ক্রয় নামক বহুদিনের পুরনো অস্ত্রটি অকেজো। এর সংস্কার অথবা নতুন অস্ত্রের প্রতিস্থাপন দরকার। রক্ষাকবচ বিষয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। কেননা নতুন বাস্তবতা সমুপস্থিত।
নতুন সেই বাস্তবতার একটি হলো কৃষি শ্রমিকের আকাল। শিক্ষার প্রসারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এ আকাল প্রকট হবে যদি না বিকল্প ব্যবস্থা নেয়া হয়। এই আকালের কারণে মজুরি বাড়বে এটিই স্বাভাবিক। তা ছাড়া আগের মতো এখন আর কম মজুরির শ্রমিক আশাও করা যায় না। উন্নয়ন প্যারাডক্স বলা যেতে পারে পরিস্থিতিকে। সমস্যাকে মোকাবেলা করতে হবে প্রযুক্তি বা যান্ত্রিকীকরণ দ্বারা। প্রচলিত কৃষি ব্যবস্থায় এখন অতি কষ্টসাধ্য কাজ হলো রোপণ ও কর্তন। চাষের জন্য ট্রাক্টর ও মাড়াইয়ের জন্য মাড়াইকল এসে কাজ দুটিকে সহজ করে দিয়েছে। রোপণ ও কর্তন প্রকৃতই কঠিন কাজ। যন্ত্র ছাড়া এ কাঠিন্য দূর করার উপায় নেই। সে লক্ষ্যে কর্ম পরিকল্পনা নেয়া আবশ্যক। যন্ত্র দুটির প্রচলনে বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজন পড়বে। উন্নত দেশের গম-ভুট্টা চাষাবাদের মতো পরিস্থিতি আমাদের দেশে নেই। শুষ্ক মাটিতে তাদের চাষাবাদ হয়। আমাদের তা নয়। আউশ ছাড়া আমাদের অন্য দুই ফলন বোরো-ইরি ও আমন ধানের চাষ ভিজে চুপচুপে কাদামাটি নির্ভর। হাওর অঞ্চলে ফসল কাটতে গিয়ে কৃষককে রীতিমতো পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে পাল্লা দিতে হয়। কাজেই রোপণ-কর্তন উভয় ক্ষেত্রে প্রয়োগতব্য যন্ত্র হতে হবে আমাদের দেশের উপযোগী, পানিতে ডোবা ক্ষেতে ব্যবহারযোগ্য। আমার বিশ্বাস সরকার উদ্যোগ নিলে আমাদের কৃষি বিজ্ঞানীরা এ ক্ষেত্রেও সফল হবেন। বীজতলায় বীজ বুনে চারা করে সেই চারা রোপণ খুব ঝক্কিবহুল কাজ। বোরো-ইরি ও আমন উভয় ক্ষেত্রে এমনটি করতে হচ্ছে। এর ব্যতিক্রম কি করা যায়? আউশের মতো বুনন প্রক্রিয়ায় কি বোরো-ইরি ও আমনের চাষ করা সম্ভব? আমাদের কৃষি বিজ্ঞানীদের বিষয়টি নিয়ে গবেষণার অনুরোধ জানাই।
সরকারি ক্রয় কার্যক্রমের অকার্যকরতার কথা বলছিলাম। কৃষক প্রকৃতপক্ষে এ সুবিধার ছিটেফোঁটাও পাচ্ছে কিনা প্রশ্ন আছে। তারপরও বলি, দাম নির্ধারণ নিয়ে প্রতি বছরই কিছুটা অস্বস্তি ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব লক্ষ করি নীতিনির্ধারক মহলে। চালের দাম নিয়ে একটা ভীতি কাজ করে সরকারি মহলে। তা ছাড়া দামের সামান্য বৃদ্ধি জনমনে যেমন বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে, তেমনই রাজনীতির মাঠও গরম হয়। নাগরিক সমাজও এ নিয়ে কথা বলতে ছাড়েন না। সব কিছুর দাম বাড়লেও চালের দাম বাড়তে পারবে না- বিষয়টি এ রকম। এতে ক্ষতির শিকার হন কৃষক।
কেউ যেন ভুল না বোঝেন যে আমি কোনো অস্বাভাবিক দামের কথা বলছি। আমি বলছি স্বাভাবিক বা ন্যায্য দামের কথা। এই ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা না গেলে সঙ্গত কারণেই কৃষক ধানের আবাদ কমাবে, তাতে উৎপাদন হ্রাস পাবে, দেশ আমদানিনির্ভর হবে। অতিমাত্রায় স্পর্শকাতর বিধায় সরকারকে সারাক্ষণ তটস্থ থাকতে হবে চাল নিয়ে। আমদানি-রপ্তানির বিষয়টিরও ফায়সালা হওয়া দরকার। এ নিয়েও দ্বিধাদ্বন্দ্ব আছে বোঝা যায়।
চালের ন্যায্য মূল্য কখন কীরূপ হওয়া উচিত, আমদানির প্রয়োজন আদৌ আছে কিনা, রপ্তানি কোন বছর কী পরিমাণ করা যাবে, কিংবা যাবে না- এসব বিষয়ে ধারাবাহিক সিদ্ধান্তের জন্য সরকারের একটি স্থায়ী গবেষণা সেল থাকা দরকার, যাতে বিশেষজ্ঞরা নিয়োজিত থাকবেন। জানি না সে রকম কিছু একটা আছে কিনা, না থাকলে সরকার তা করার কথা ভাবতে পারে। মোদ্দা কথা, ধান আবাদে কৃষকের আগ্রহ ধরে রাখার জন্য সরকারের তরফ থেকে যা যা করা দরকার তার সবই করা দরকার বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে। এ ব্যাপারে অর্থব্যয় বা ভুর্তকিকে বিনিয়োগ ধরে নিতে হবে। আফসোস হয়, কৃষি বিজ্ঞানী ও কৃষকের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফসল উচ্চ ফলনের ধান উৎপাদন আশার বদলে নৈরাশ্যের কারণ হচ্ছে থেকে থেকে।

মজিবর রহমান : কলাম লেখক।