পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির নয়া-মেরুকরণ

আগের সংবাদ

১০৪০ টাকা দরে কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনা শুরু

পরের সংবাদ

অনিয়ম রোধে সরকারের অভিযান কেন চলা দরকার?

প্রকাশিত হয়েছে: মে ২০, ২০১৯ , ৮:৫৩ অপরাহ্ণ | আপডেট: মে ২০, ২০১৯, ৮:৫৩ অপরাহ্ণ

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত), ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক।

যারা আমাদের সমাজের প্রকৃত উৎপাদনকারীদের লভ্যাংশ সমূলেই খেয়ে ফেলতে উদ্ধত হয়ে আছে। নিঃস্ব করে দিচ্ছে উৎপাদনকারীদের। আর এদের উপরে রয়েছে আড়ৎদার, জোৎদার, করপোরেট শক্তি যারা দিন দিন মহাশক্তি হয়ে উঠছে। সেখানেও আইন ও শৃঙ্খলার বিরুদ্ধেই এই অপশক্তিরা নানা উপায়ে অর্থের পাহাড় জমাচ্ছে। আমাদের দেশটাকে আধুনিক উন্নত করতে হলে সুষম উন্নয়ন এবং বণ্টন অবশ্যই করতে হবে। তাহলেই আমরা সোনার বাংলা তথা আধুনিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সফল হবো।

এই মেয়াদে সরকার ক্ষমতায় আসার আগে ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল যে, সরকারের অন্যতম প্রধান কাজ হবে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। আইনের শাসনটি ব্যাপক পরিসরের বিষয়। বেআইনি যে কোনো কাজকর্ম হতে না দেয়া, রোধ করা কিংবা অতীতে যেসব অনিয়ম হয়েছিল সেগুলোকে প্রয়োজনে উচ্ছেদ করা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার আওতায় পড়ে। এর বাইরেও আরো অনেক প্রতিষ্ঠান নিয়ম কানুন, ব্যবস্থাপনা, বিচার-আচার ইত্যাদি রয়েছে যা আইনের শাসনের অপরিহার্য অংশ। বাংলাদেশকে উন্নত সমৃদ্ধিশালী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই। সে কারণেই এই মেয়াদে সরকার ক্ষমতায় আসার পর বেশকিছু জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে আইন ও শৃঙ্খলায় নিয়ে আসা। অনিয়ম, দুর্নীতি, দখলদারিত্ব ইত্যাদি উচ্ছেদ করার কাজে হাত দিতে দেখা গেছে। ঢাকা শহরের চারদিকে নদী দখল নিয়ে একটি অভিযোগ দীর্ঘদিন থেকে ছিল। বেদখলে থাকা এসব নদী দখলমুক্ত করা। দখলদারিত্বের উচ্ছেদ করা সরকারের জন্য খুবই জটিল সমস্যা ছিল। অতীতে কোনো সরকার এসব অনিয়ম ও দখলদারিত্ব রোধের কথা ভাবতে সাহস পায়নি। এ নিয়ে গণমাধ্যমে সব সময় পরিবেশবাদীদের নানা অভিযোগ ছিল। সাধারণ মানুষও বিশ্বাস করত যে অবৈধভাবে দখলে যাওয়া ঢাকার চারপাশে কোনো নদীই দখলদারদের কাছ থেকে মুক্ত করা যাবে না। কিন্তু এবার সেই অসম্ভবকে সরকার অনেকটাই উচ্চ আদালতের রায় বাস্তবায়নের তাগিদ থেকে দৃশ্যমান করতে সফল হতে যাচ্ছে। ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামেও এ ধরনের অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবার দেশের অন্যান্য নদীও দখলমুক্ত করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এ ছাড়া দেশের আরো অসংখ্য শহর রয়েছে যেগুলো কোনো না কোনো নদীর তীরে অবস্থিত, সেগুলোও দখলদারদের অবৈধ স্থাপনায় চরম বিপর্যয়ের মুখে রয়েছে। সেগুলোও দখলমুক্ত করা গেলে তবেই শহরগুলো বসবাসের উপযুক্ত হবে, পাশের নদী স্বাভাবিক গতি ফিরে পাবে, মানুষ পানির ব্যবহারে শহরের জীবন অপেক্ষাকৃত স্বাচ্ছন্দ্যে পাবে। সরকারের এই অভিযান এখনই শেষ হয়ে যায়নি। এটি সম্পন্ন করার কাজ নিকট-ভবিষ্যতে অব্যাহত রাখা জরুরি। কেননা দেশ শুধু ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো বড় শহর নির্ভর নয়। অন্যান্য অঞ্চলেও পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। সুতরাং আমাদের নগর, নদী, জলাশয়, বাসস্থান, এমনকি গ্রামাঞ্চলসহ সর্বত্রই পরিবেশ রক্ষা করা যেমন জরুরি একইসঙ্গে আইন ও নিয়মকানুন মেনে স্থাপনা বাড়িঘর ইত্যাদি নির্মাণ ও বসবাস, সভ্যতা রক্ষার অপরিহার্য অংশ হিসেবে মানার সংস্কৃতি লালন করতে হবে। সমাজে প্রভাবশালীরা দেশের আইন, নিয়ম-কানুন ও শৃঙ্খলা পরিপন্থী কিছু করে পার পাবেন, নির্বিঘ্নে চলবেন এটি উন্নত রাষ্ট্রের সঙ্গে যায় না। আমাদের কেউ উন্নত রাষ্ট্র গঠনের অপরিহার্য অংশ হিসেবে এ বিষয়টি মেনে চলতে হবে, ব্যত্যয় ঘটানো চলবে না।
ঢাকায় বেশকিছু অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর বুঝা গেল আমাদের শহরগুলোতে কীভাবে ইমারত নির্মাণ কোড ভঙ্গ করে অনেক অভিজাত এলাকাতেও উঁচু উঁচু দালান কোঠা মালিকের ইচ্ছা অনুযায়ী বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগসাজশে তৈরি করা হয়েছে। সেটি বেশ বিস্ময়কর বলে মনে হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকার অনেক আবাসিক এলাকাতেই ব্যবসা বাণিজ্য, শিল্প কলকারখানা, রাসায়নিক ধায্য পদার্থের গুদাম, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাসস্থান, মার্কেট, ধর্ম প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি একাকার হয়ে গিয়েছে। বেশকিছু দুর্ঘটনা নিকট-অতীতে ঘটার পর কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে উঠেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা না ঘটায় বিষয়টি চাপা পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু ক’মাস আগে পরপর কয়েকটি অগ্নিসংযোগ ঘটার পর আবার বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা এসব অবৈধ স্থাপনা আবাসিক এলাকার নিয়মনীতি ভঙ্গ করে অবৈধ ব্যবসা বাণিজ্য, কারখানা, রাসায়নিক দ্রব্যের গুদাম, দাহ্য পদার্থের ব্যবসা বাণিজ্য ইত্যাদি সরিয়ে ফেলার উদ্যোগ শুরু করে। এ ধরনের অবৈধ উচ্ছেদ অভিযান দুর্ঘটনার পর যতটা দেখা গিয়েছিল এখন তাতে কিছুটা ভাটা লক্ষ করা যাচ্ছে। হতে পারে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের পক্ষে এতসব অবৈধ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার মতো জনবল নেই। তবে বাংলাদেশের শহরগুলোর চিত্র এমন বৈধ্য অবৈধ স্থাপনা সহাবস্থান নিয়েই চলছে- যেখানে প্রতিনিয়ত ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটার মতো দাহ্য পদার্থ কমবেশি রয়েছে। আসলে আমাদের ছোট বড় নগর বন্দর, আবাসিক এলাকা, ইত্যাদি শুরু থেকে যেভাবে গড়ে উঠেছে তাতে নগরায়নের চিন্তাভাবনা খুব একটা ছিল না। পরিকল্পনার সঙ্গে অনেকেই অভ্যস্থ ছিল না। অন্তত দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও নগরগুলো অপরিকল্পিতভাবেই দ্রুত যেভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে তাতে কোথায় হাটবাজার হবে, কোথায় আবাসিক এলাকা হবে, কোথায় শিল্প কারখানা হবে- এসবের কোনো বালাই ছিল না। ফলে নতুন পরিকল্পিত মডেল টাউনগুলোতেও আবাসিক এলাকা চরিত্র বজায় রেখে ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ইত্যাদি নির্মাণ করা হয়নি। একইসঙ্গে বিল্ডিং কোড যথাযথভাবে অনুসরণ করে নির্মাণকাজ পরিচালিত হয়নি। এখানে মালিকপক্ষ এবং প্রশাসন যোগসাজশেই এমন কাণ্ডটি ঘটিয়েছে। কিন্তু এটি যে আধুনিক বা মডেল শহরের সঙ্গে যায় না সেই ধারণাই আমাদের মডেল টাউনে মডেল মালিকদের কিংবা মডেল প্রশাসকদের ধারণার মধ্যে ছিল কিনা সন্দেহ আছে। অথচ এখন সেসব মডেল টাউনেই নিরাপধ জীবন ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা পরিষ্কার হয়ে উঠছে। যারা উন্নত দুনিয়ায় যাতায়াত করেন তারা জানেন যে, আধুনিক দুনিয়ায় শহর ও গ্রাম অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠছে। বৈজ্ঞানিক নানা সুযোগ-সুবিধা এসব প্রতিষ্ঠান আবাসিক ভবনে ঢুকছে যেগুলো যথাযথ নিয়মে ব্যবহার না করা হলে যেকোনো বড় ধরনের জীবন সংহারের মতন ঘটনা ঘটা খুবই স্বাভাবিক। এখন বাড়িঘরের প্রচুর বিদ্যুৎ, গ্যাস, ইলেক্ট্রনিক্স যন্ত্রপাতি, নানা ধরনের ব্যবহার্য সামগ্রী ইত্যাদি প্রবেশ করেছে। এর কোনো একটির ব্যবহারে কেউ ভুল করলে তাতে মানুষের প্রাণহানি ঘটার অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠতে পারে। সুতরাং মানুষ যত উন্নত সমাজ ও জীবন ব্যবস্থা গড়ে তুলছে ততবেশি তার বসবাসের জায়গা, সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান, যোগাযোগ ব্যবস্থা ইত্যাদি পরিকল্পিতভাবে তৈরি করতে হয় একইসঙ্গে সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ জানতে হয়। উন্নয়নের সঙ্গে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা বিধানের সম্পর্ক থেকেই পরিকল্পিত নগর, বাসস্থান, বাড়িঘর, সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান ব্যবহার্য সামগ্রী ইত্যাদি পরিচালনা করতে হবে। সেখানে ব্যত্যয় ঘটতে দেয়া যাবে না। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নজরদারি রাখতে হবে। আইন বিধিবিধান ও শৃঙ্খলায় এসব কিছু পরিচালিত করতে হবে। আমাদের বাংলাদেশকে যেহেতু আমরা একটি উন্নত আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তুলতে চাই, তাই আমাদের সবারই গুরুত্বের সঙ্গে এসব বিষয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। রাতারাতি হয়তো সব অবৈধ্য স্থাপনা ভেঙে ফেলা, উচ্ছেদ ঘটানো অথবা নতুনভাবে নির্মাণ করা সম্ভব হবে না। তবে এখন বিদ্যমান বেআইনি স্থাপনাকে কীভাবে উপযোগী করা যায় সে বিষয়ে নিজেদেরই উদ্যোগ নিতে হবে। একইসঙ্গে নিকট-ভবিষ্যতে যেসব আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্পকলকারখানা, সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি গড়ে তোলা হবে সেগুলো যেন হয় আধুনিক নগরায়ন সচেতন ও জীবন ব্যবস্থার নিরাপত্তা বিধানসম্মত। সে কারণে অব্যবস্থাকে জিইয়ে রেখে নয় বরং সেগুলোকে নিজেদের বেঁচে থাকার এবং নিরাপত্তার জন্য দ্রুতই সংস্কারে হাত দিতে হবে। এর কোনো ব্যত্যয় ঘটানো ঠিক হবে না। সে কারণে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে বাস্তবোচিতভাবে আধুনিকায়নের লক্ষ্যে কাজ করে যেতেই হবে।
আমাদের নাগরিক জীবনে এই মুহূর্তে ভেজালবিরোধী একটি অভিযান নজরকাড়ার মতো অবস্থানে চলছে। গত কয়েক বছর ধরেই এ অভিযানটি চলছে বলে আমরা জানি কিন্তু আগের বছরগুলোর চাইতে এবারের অভিযান অনেক বেশি পরিকল্পিত, আন্তরিক, সংযত, বাস্তবোচিত এবং লক্ষাভিমুখী বলে মনে হয়েছে। এবার একাধিক বিভাগ সমন্বিতভাবে ভেজালের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকাণ্ড তদারক করতে গিয়ে যেসব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে তাতে সাধারণ ভোক্তারাও হতভাগ হয়েছে। বাজার থেকে তারা যেসব সুস্বাদু খাবার কিনছেন, নামিদামি প্রতিষ্ঠানে উৎপাদিত পণ্য কিনছেন তার মধ্যে বেশকিছু রয়েছে যেগুলো মানুষের স্বাস্থ্যহানি ঘটানোর মতো, মৃত্যুঝুঁকি বাড়ানোর মতো। এ ক্ষেত্রে অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেগুলো যুগ যুগ ধরে এভাবেই তাদের পণ্য সামগ্রী বা খাদ্য দ্রবাদি উৎপাদন ও বাজারজাত করে আসছিল। এরা ব্যবসা বাণিজ্যের ন্যূনতম নীতি-নৈতিকতা সম্পর্কে জ্ঞাত বা সচেতন কিনা সেটি নিয়েও সন্দেহ তৈরি হয়েছে। এ ধরনের আরো অনেক অনিয়ম আমাদের সমাজ জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে আছে। দালাল চক্রের হাতে অসংখ্য মানুষ নিঃস্ব হচ্ছে, পাচার হতে গিয়ে মারা যাচ্ছে। দেশের ব্যবসা বাণিজ্য, সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানসহ সর্বত্র দালালচক্রে ভরে আছে। প্রায়শই র‌্যাবসহ নানা বাহিনী অভিযান পরিচালনা করছে। মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে চলছে অভিযান। তারপরও মাদক সেবন এবং ব্যবসায় কোনো কমতি যেন নেই। দালালদের মতো এ আর এক মরিয়া গোষ্ঠী। যারা সমাজকে পিছনের দিকে টেনে ধরছে। এ ছাড়া রয়েছে নানা মধ্যস্বত্বভোগী। যারা আমাদের সমাজের প্রকৃত উৎপাদনকারীদের লভ্যাংশ সমূলেই খেয়ে ফেলতে উদ্ধত হয়ে আছে। নিঃস্ব করে দিচ্ছে উৎপাদনকারীদের। আর এদের উপরে রয়েছে আড়ৎদার, জোৎদার, করপোরেট শক্তি যারা দিন দিন মহাশক্তি হয়ে উঠছে। সেখানেও আইন ও শৃঙ্খলার বিরুদ্ধেই এই অপশক্তিরা নানা উপায়ে অর্থের পাহাড় জমাচ্ছে। আমাদের দেশটাকে আধুনিক উন্নত করতে হলে সুষম উন্নয়ন এবং বণ্টন অবশ্যই করতে হবে। তাহলেই আমরা সোনার বাংলা তথা আধুনিক বাংলাদেশ গড়ে তোলতে সফল হবো।

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত), ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক।