অভিনেত্রী মায়া ঘোষের শেষকৃত্য সম্পন্ন

আগের সংবাদ

আ.লীগের মনোনয়ন পেলেন নিকেতা

পরের সংবাদ

সত্য বলার যোগ্যতা থাকা দরকার উচ্চপদস্থদের

প্রকাশিত হয়েছে: মে ১৯, ২০১৯ , ৯:১৬ অপরাহ্ণ | আপডেট: মে ১৯, ২০১৯, ৯:১৬ অপরাহ্ণ

স্বপ্না রেজা

কলাম লেখক।

সততা একজন ব্যক্তির সবচাইতে অন্যতম আচরণ। আর দায়িত্ববোধ তো তার সততার ওপর নির্ভরশীল একটি দৃষ্টিভঙ্গি, মানসিকতা। যিনি সত্য বলতে পারেন না, সত্যের প্রতি সাধারণ মানুষের আপসহীন চাহিদা বুঝবেন কী করে? আর না বুঝলে সাধারণ মানুষকে সেবা দেয়ার কাজটিইবা করবেন কী করে? কোটি কোটি টাকার অপচয় সস্তা ব্যাখ্যা দিয়ে যারা বুদ্ধিমান জনগণকে বোকা বানাতে চেষ্টা করেন, তারা শুধু সরকারকেই সমালোচিত করেন না, বরং সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা হারাতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।

সত্য কথা বলার চর্চা প্রায় বিলুপ্তের পথে। ঘরে-বাইরে, পথেঘাটে, অফিস-আদালতে, বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানে, রাজনীতির মঞ্চে এই বিলুপ্তির আভাস স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে উঠছে দিন যতই যাচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে বলা যায় যে, একদিন ডাইনোসরের মতো ইংরেজি ভাষার ঃৎঁব বা বাংলা ভাষার সত্য শব্দটা অতীত হয়ে পড়বে নিঃসন্দেহে। যে অতীত সহসায় আর মানুষের চোখে ফিরে আসার সম্ভাবনায় থাকবে না। মানুষ আর দেখতে পারবে না। যেমন এখন মন চাইলেও মানুষ ডাইনোসরকে চাক্ষুস দেখতে পায় না। পারাটা কল্পনাতীত। তবে জাতীয় জাদুঘরে এই শব্দ সংশ্লিষ্ট কোনো ঘটনার রেশ, বর্ণনা হয়তো সংরক্ষণ হতে পারে প্রাচীন সভ্যতার অনেক কিছুর মতোই। যা দেখে পরবর্তী প্রজন্ম ধারণা লাভ করতে পারে যে, এক সময় সত্য বলে একটা বোধ ছিল সমাজে। মানুষই তাকে ধারণ করত। লালন করত। তাকে ভিত্তি করেই সম্মানিত হতে চাইত। কিন্তু সেই সত্যবোধকে এক সময়ে মুষ্টিমেয় কিছু অপরিণত, অসম্পূর্ণ ব্যক্তি স্বার্থপরতার দাঁত দিয়ে কামড়ে খেতে শুরু করল। তাদের এই কামড়াকামড়ি খেলায় অনেকেই সত্যবোধকে কামড়াতে অভ্যস্ত হয়ে উঠল। উদ্দেশ্য হলো, জোর করে টিকে থাকা। লাভবান হওয়া। বিত্তবান হওয়া। ফলে সত্যকে নিঃশেষ করে ব্যক্তি-গোষ্ঠীর এই লাভের খেলা একটা পর্যায়ে এসে সমাজে জনপ্রিয়তা পেয়ে গেল। মানুষ ক্রমশ সম্পৃক্ত হতে থাকল এই ধ্যানে। আর এভাবে সত্যবোধ হারিয়ে যায়। বিপরীতে মিথ্যের অবাধ আবির্ভাব ঘটে সমাজে, এমনকি রাষ্ট্রযন্ত্রে নির্বিঘ্নে।
ফলে সদা সত্য কথা বলিবে- এই কথা এখন আর শোনা যায় না। মুখ ফুটে কেউ বলেন না। বলতে শোনা যায় না। মানুষ ভুলতে বসেছে সত্য বলতে। প্রায়শ মানুষ সত্য বলে না শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, পরিবারে, সামাজিক কোনো প্রতিষ্ঠানে। এমনকি রাজনৈতিক দলেও নয়। বরং রাজনৈতিক দলগুলোই মিথ্যেচারিতায় পটু থাকছে ক্ষমতার জন্য। ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক চর্চাটা মূলত মিথ্যের গভীরেই হয়। এটা সবাই বুঝে গেছে। সমাজে, রাষ্ট্রযন্ত্রে যে মিথ্যের প্রসার, তার নেপথ্যেও এই রাজনীতি। রাজনীতির এই মিথ্যে সংস্কৃতির প্রভাব পড়ে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে। যারা দায়িত্বশীল থাকছেন, তারাও অবলীলায় নির্লজ্জভাবে মিথ্যে বলছেন। কিছুদিন আগে ওয়াসা বিভাগের মহাপরিচালক পানি সংক্রান্ত বিষয়ে সত্যকে আড়াল করেছেন, সত্যকে হত্যা করেছেন এবং তা নিজেকে, নিজের বিভাগকে দোষমুক্ত প্রমাণ করতে। আর সেটা সম্ভব হয়েছে মিথ্যে বলে, সত্যকে এড়িয়ে।
জীবনের অনেকটা সময়জুড়ে দেখছি ট্যাপকলের পানি ফুটিয়ে খেতে। কেরোসিনের চুলোয়, গ্যাসের চুলোয় কিংবা ইলেকট্রিক হিটারে বড় বড় হাঁড়িতে পানি ফুটিয়ে পান করা প্রায় প্রতিটি পরিবারের একটি সাধারণ চিত্র। নিরাপদ স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য বিশুদ্ধ পানির প্রয়োজনীয়তার কারণেই ছিল পানি নিয়ে ঘরে ঘরে এতসব আয়োজন, প্রস্তুতি। শুধু উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণিই নয়, দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীও পানি ফুটিয়ে পান করার বিষয়ে সচেতন হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন বস্তিতেও দেখা যায় তা। তারাও বুঝতে পেরেছে সুস্থ থাকার জন্য পানি ফুটিয়ে বা বিশুদ্ধ করে পান করার দরকার। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন গবেষণা, জরিপ, তথ্য প্রতিবেদনে লাগাতারভাবে প্রকাশিত, প্রচারিত হয়েছে এবং আজো হচ্ছে যে, সরবরাহকৃত পানি বিশুদ্ধ নয়। যেখানে বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বিশুদ্ধ পানি পান করা অতীব জরুরি বলা হয়েছে। এই বিশুদ্ধ পানি পান করার জন্য পানি ফুটিয়ে, ফিটকিরি দিয়ে বিশুদ্ধ করে এবং গভীর নলকূপের পানি পান করবার পরামর্শ দেয়া হয়ে আসছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিভিন্ন সংস্থা থেকে। কারণ একটাই, ওয়াসার সরবরাহকৃত পানি বিশুদ্ধ নয়। আবার অপরিচ্ছন্নতায় রয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন জলাশয়। একজন শিশুও এ কথা অবলীলায় বলে দিতে পারে যে, কেন পানি ফুটিয়ে পান করা হয় বা করা দরকার। শুধু পারলেন না ওয়াসার কর্তাব্যক্তি বলে দিতে অবলীলায়, কেন পানি ফুটিয়ে বা বিশুদ্ধ করে পান করা দরকার। তিনি পারেননি সত্যকে স্বীকার করে তার ন্যায়বোধকে প্রতিষ্ঠিত করতে। তাকে মনে হলো তিনি একজন স্বেচ্ছাচারী রাজনৈতিক নেতা। রাজনীতিবিদের অনেকেই হয়তো আপত্তি তুলবেন আমার এমন কথায়। কিন্তু এটা তো সত্য যে, সত্য চর্চা রাজনীতিতে নেই বললেই চলে। হাতেগোনা কয়জন ছাড়া কেউ এমন আছেন কিনা, যিনি দাবি নিয়ে বলতে পারেন, তিনি সর্বদা সত্য কথা বলেছেন, বলেন এবং অন্যকেও সত্য কথা বলতে পরামর্শ দেন। মনে হয় না আছেন। ফলে সাধারণ জনগণের কাছে রাজনৈতিক ব্যক্তির ইতিবাচক ইমেজ, অঙ্গীকার, আস্থা, বিশ্বাসযোগ্যতা একেবারেই থাকে না, থাকছে না। বিতর্কিত কার্যকলাপের কারণে রাজনৈতিক নেতা মানেই খোলস আর ভুয়া, এমন একটা প্রচলিত ধারণার বিস্তার ঘটছে দিন দিন সর্বত্র। ওয়াসার কর্তাব্যক্তিকে তেমন একটা খোলসে আবৃত মনে হয়েছে। কী বলছেন, কথার কী মানে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে, কতটুকু বিশ্বাসযোগ্যতা পাচ্ছে, তার বিচার-বিশ্লেষণ ক্ষমতা নেই যেন। সত্যকে পেছন ফেলে মিথ্যে সংস্কৃতির একজন দায়িত্ববান হাতি বলে মনে হলো। যিনি বিশাল ওজনের দায়িত্ব নিয়ে হেলেদুলে কেবল হাঁটতেই পারেন, নিজের দায়িত্বের শরীরটাকেই কেবল দৃশ্যমান করতে পারেন। আর কিছুই পারেন না। পারার চেষ্টা করলে জনগণের কাছে তা হয়ে যাচ্ছে কষ্টের, হতাশার। তার বলা কথা যে, কতটা নির্বোধের, লজ্জার আর ব্যর্থতার, সেটা বুঝার ন্যূনতম বোধও নেই তার। বিতর্কিত ও অসম্পূর্ণ এমন একজন ব্যক্তি এতটা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পদে কী করে আসীন হন, অধিষ্ট হন, ভেবে অবাক হতে হয়। কিন্তু এই অবাক, বিস্ময় বেশিদূর যায় না এই ভেবে যে, হচ্ছে তো এসবই। রাজনীতির সুবন্দোবস্তার সূত্র আছে না?
সব সরকার আমলের একটা বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা থাকে সাধারণ জনগণের। সেটা হলো রাজনৈতিক নিয়োগ। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ পদে। আমার জানা নেই যে ওয়াসার এই কর্তাব্যক্তির নিয়োগ বা পদোন্নতি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় কিনা। তবে অভিজ্ঞতার থেকে অর্জিত সাধারণ জ্ঞান বলে, বিভিন্ন সেক্টরে রাঘব বোয়ালরা সাধারণত দলীয় রাজনৈতিক বেশবাসে উচ্চপদে আসীন হন, টিকে থাকেন। রাজনৈতিক সরকারের এ ক্ষেত্রে ইন্টারেস্ট হলো, রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি সেক্টরকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা, আয়ত্তে রাখা। পরবর্তী সময় আবার ক্ষমতায় অধিষ্ট হওয়ার সদূরপ্রসারী পরিকল্পনা এটা হয়তো। কিন্ত ব্যক্তির এহেন আচরণই যে সরকারের ভেতর বিপর্যয় ডেকে আনে, ক্ষতিগ্রস্ত করে তোলে গোটা জাতিকে, সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে, সেটা বুঝি ক’জনে?
একজন ব্যক্তির গ্রহণযোগ্যতা প্রধানত তার সততায় প্রতিষ্ঠিত হয়। সততা একজন ব্যক্তির সবচাইতে অন্যতম আচরণ। আর দায়িত্ববোধ তো তার সততার ওপর নির্ভরশীল একটি দৃষ্টিভঙ্গি, মানসিকতা। যিনি সত্য বলতে পারেন না, সত্যের প্রতি সাধারণ মানুষের আপসহীন চাহিদা বুঝবেন কী করে? আর না বুঝলে সাধারণ মানুষকে সেবা দেয়ার কাজটিইবা করবেন কী করে? কোটি কোটি টাকার অপচয় সস্তা ব্যাখ্যা দিয়ে যারা বুদ্ধিমান জনগণকে বোকা বানাতে চেষ্টা করেন, তারা শুধু সরকারকেই সমালোচিত করেন না, বরং সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা হারাতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। সরকারের উচিত এসব অযোগ্য ব্যক্তি, গোষ্ঠীকে শনাক্ত করে অপসারণ করা, নির্বোধ বিরোধী অভিযান চালানো এবং যোগ্য ব্যক্তি দ্বারা সেবাপ্রদানকারী বিভাগ পরিচালনা করা। মনে রাখা দরকার যে, জনগণ বিনামূল্যে রাষ্ট্রের সেবা নেয় না। তারা সেবা ক্রয় করে এবং সেটা তার কষ্টের অর্থে। সেবা বিক্রেতাদের জবাবদিহিতা স্বচ্ছভাবে থাকতে হবে। দায়বদ্ধতার জায়গাটি থাকবে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সত্য বলবার মতো। সস্তা বিনোদনের জন্য এ জাতীয় ব্যক্তি মাননসই, জনকল্যাণে নয়। আর সত্য প্রতিষ্ঠিত হোক সর্বত্র। অন্যথায় টেকসই উন্নয়নের স্বপ্ন পূরণ হয়ে পড়বে অসম্ভব। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উচিত হবে এসব আগাছাকে পরিষ্কার করা। আমি আশা করি তিনি সেটাই করবেন তার লক্ষ্য পূরণে।

স্বপ্না রেজা : কলাম লেখক।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা