ইতিহাস গড়ল টাইগাররা

আগের সংবাদ

পোশাক খাতকে ভ্যাটমুক্ত রাখার দাবি বিজিএমইএর

পরের সংবাদ

উচ্ছেদের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ ও বিএনপি একাট্টা

পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস

প্রকাশিত হয়েছে: মে ১৮, ২০১৯ , ১০:৫৭ পূর্বাহ্ণ | আপডেট: মে ১৮, ২০১৯, ১১:০৬ পূর্বাহ্ণ

Avatar

সরকারের চেয়েও ক্ষমতাধর পাহাড়খেকোদের কারণে চট্টগ্রামের ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলোতে অবৈধ বসতি গড়ে উঠছে। আর দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় এসব বসতিতে ঘটছে প্রাণহানি। ধ্বংস হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশ। অবৈধ বসতি ও দখলদারদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান চালাতে গিয়েও নাজেহাল হচ্ছেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা। এ পরিস্থিতিতে পাহাড়ধসে প্রাণহানি রোধে বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ ও প্রশাসনের সিদ্ধান্তগুলোও ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে আছে। পাহাড়ধসে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেয়া হচ্ছে না। বরং মামলাগুলো বছরের পর বছর বিচারাধীনই থাকছে।
সূত্র জানায়, রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ-বিএনপি দুই মেরুর হলেও অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের উচ্ছেদের বিরুদ্ধে তারা একাট্টা। এ ছাড়া সরকারি বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের সরিয়ে নেয়া বা পুনর্বাসন করার উদ্যোগ সফল হচ্ছে না। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন সূত্রমতে, চট্টগ্রামে ২৮টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের মধ্যে অতি ঝুঁকিপূর্ণ ১৭টি পাহাড়ে ৮৩৫টি পরিবার বসবাস করছে। এসব পাহাড়ের মধ্যে ১০টি ব্যক্তি মালিকানাধীন পাহাড়ে ৫৩১ পরিবার এবং বাকি সাতটি সরকারি পাহাড়ে ৩০৪ পরিবার বসবাস করছে। সরকারি পাহাড়গুলোর মালিক সিটি করপোরেশন, রেলওয়ে, চট্টগ্রাম ওয়াসা, গণপূর্ত ও জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। ‘পাহাড়ে অবৈধভাবে বসবাসরতদের হালনাগাদ তালিকা’
অনুযায়ী, রেলওয়ের লেকসিটি আবাসিক এলাকাসংলগ্ন পাহাড়ে ২২ পরিবার, পূর্ব ফিরোজ শাহ ১ নাম্বার ঝিলসংলগ্ন পাহাড়ে ২৮ পরিবার এবং জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের মালিনাকানাধীন কৈবল্যধামের বিশ্ব কলোনি পাহাড়ে ২৮টি পরিবার, পরিবেশ অধিদপ্তরসংলগ্ন সিটি করপোরেশন পাহাড়ে ১০ পরিবার, রেলওয়ে, সড়ক-জনপদ বিভাগ, গণপূর্ত অধিদপ্তর ও ওয়াসার মালিকানাধীন মতিঝর্ণা ও বাটালি হিলসংলগ্ন পাহাড়ে ১৬২ পরিবার, ব্যক্তি মালিকানাধীন এ কে খান এন্ড কোম্পানি পাহাড়ে ২৬ পরিবার, বায়তুল আমান সোসাইটিতে হারুন খানের পাহাড়ে ৩৩ পরিবার, আকবর শাহ আবাসিক এলাকাসংলগ্ন পাহাড়ে ২৮ পরিবার, খাস খতিয়ানভুক্ত পলিটেকনিক কলেজসংলগ্ন পাহাড়ে ৪৩ পরিবার, মধুশাহ্? পাহাড়ে ৩৪ পরিবার, ফয়েজলেক আ/এ সংলগ্ন পাহাড়ে ৯ পরিবার, ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটসংলগ্ন পাহাড়ে ৩৩৪

পরিবার, ভিপি সম্পত্তি লালখান বাজার জামেয়াতুল উলুম মাদ্রাসাসংলগ্ন পাহাড়ে ১১ পরিবার, এম আর সিদ্দিকীর পাহাড়ে ৮ পরিবার, মিয়ার পাহাড়ে ৩২ পরিবার, রৌফাবাদ এলাকার ভেড়া ফকিরের পাহাড়ে ১১ পরিবার, আামিন কলোনিসংলগ্ন ট্যাংকির পাহাড়ে ১৬ পরিবার বসবাস করছে। পাহাড়ের এসব অবৈধ বসতিতে রয়েছে ‘বৈধ’ গ্যাস-পানি-বিদ্যুৎ সংযোগ।
পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে উঠা অবৈধ স্থাপনায় বসবাস করছে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত অসহায় নিস্ব মানুষ। নিম্ন আয়ের এসব মানুষ নগরীতে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত। অল্প টাকায় ঘর ভাড়া নিয়ে তারা বসবাস করছে পাহাড়ের পাদদেশে। এদের অধিকাংশ গার্মেন্টস শ্রমিক, রিকশাচালক কিংবা গরিব দিনমজুর। জীবিকার তাগিদে তারা শহরের কাছাকাছি থাকতে চায়। নগরীর লালখান বাজার এলাকার টাংকির পাহাড়ে বসবাসরত বাসিন্দা রিকশাচালক মোহাম্মদ নূরুল আসলাম ১২ বছর আগে এসেছেন নোয়াখালী থেকে। তিনি বলেন, এখানে বসবাসকারী সবাই নিম্ন আয়ের মানুষ। কম টাকায় এখানে থাকা যায় বলে মৃত্যু ঝুঁকি নিয়ে এখানে বসবাস করছি।
পাহাড়ের চূড়ায় কাউন্সিলরের সুইমিংপুল : চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ১৪ নম্বর লালখান বাজার ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এ এফ কবির আহমদ মানিক লালখানের একটি পাহাড় কেটে সিড়ি বানিয়ে নির্মাণ করেছেন নান্দনিক বাগানবাড়ি। পাহাড়ের চ‚ড়ায় বানানো হয়েছে সুইমিংপুল। অবৈধভাবে স্থাপনা নির্মাণের বিষয়ে কাউন্সিলর মানিক বলেন, বংশ পরম্পরায় আমরা এ পাহাড়ের মালিক। বাগানবাড়ি ও জলাধার নির্মাণ করে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তুলে পাহাড় সুরক্ষা করছি। দেশীয় ফলদ গাছ লাগিয়েছি। গাছে পানি দেয়ার জন্য জলাধার নির্মাণ করেছি। আর পাহাড়ের সিঁড়ি বেয়ে এত উপরে উঠার পর বিশ্রাম নেয়ার জন্য একটি ঘর নির্মাণ করেছি। তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, পাহাড়ে গর্ত করে জলাধার নির্মাণ করা হলে ভ‚মির অভ্যন্তরীণ ভ‚গঠন অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে। একমাত্র বনায়ন ছাড়া অন্য কোনো স্থাপনা পাহাড়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে ধ্বংস করে।
স্থানীয় রাজনীতিবিদ এবং প্রভাবশালী পরিবারের লোকজন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে অবৈধ বসতি গড়ে তোলেন। উচ্ছেদে গেলেই ‘ওপর মহল’ থেকে শুরু হয় তদবির। ফলে প্রশাসনের উদ্যোগ কোনো কাজে আসে না। এ ছাড়া পাহাড় তত্ত্বাবধানকারী সরকারি ৬টি সংস্থাই অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। পরিবেশ আন্দোলনকর্মীরা বলছেন, প্রশাসনের উদাসীনতা, রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের লেজুড়বৃত্তি, তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন না করাসহ সমন্বিত উদ্যোগ না থাকায় পাহাড়ধসে প্রাণহানির সংখ্যা বাড়ছে। অন্যদিকে প্রশাসন বলছে, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে পাহাড় মালিকদের উদাসীনতা, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি সরিয়ে নেয়া ও পুনর্বাসনে সফলতা আসছে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পরিবেশ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িতরা অত্যন্ত ক্ষমতাধর। ব্যবস্থা নিতে গেলেই হুমকি আসে।
গত ১৬ এপ্রিল পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল মান্নান ঘোষণা দিয়েছিলেন, অবৈধ বসতি উচ্ছেদে যারা বাধা দেবে তাদের গ্রেপ্তার করে কারাগারে নেয়া হবে। কিন্তু তার সেই ঘোষণা কার্যকর হয়নি। উল্টো ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’র আঘাত থেকে বাঁচাতে লালখানবাজারের পাহাড়ে অবৈধ অবস্থানকারীদের উচ্ছেদ করতে গেলে উচ্ছেদকারী টিম নাজেহাল হয়ে ফিরে আসে। ফলে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়নি।
মামলা নিষ্পত্তিতে ধীরগতি : পাহাড় কাটার অভিযোগে গত এক যুগে সরকার শতাধিক মামলা করেছে। বর্তমানে চট্টগ্রামের পরিবেশ আদালতে অর্ধশতাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে। কিন্তু মামলার তদন্ত প্রতিবেদন তৈরিতে সময়ক্ষেপণ, সাক্ষী হাজিরায় জটিলতার কারণে মামলাগুলো নিষ্পত্তি হচ্ছে না। মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় বড় বড় অপরাধীরা উচ্চ আদালত থেকে আগাম জামিন নিয়ে আসছে। ফলে পাহাড় কাটাও বন্ধ করা যাচ্ছে না।
পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য সচিব ও চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) দেলোয়ার হোসেন ভোরের কাগজকে বলেন, পাহাড়ে অবৈধ স্থাপনা তৈরিতে স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের ইন্ধন রয়েছে। এসব পাহাড়ে অবৈধভাবে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির সংযোগও রয়েছে। কয়েকটি পাহাড়ে সরকারি টাকায় প্রকল্প নিয়ে সড়ক, ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে। এসব কারণে অবৈধভাবে বসবাসরত লোকজনকে পুরোপুরিভাবে সরিয়ে নেয়া যাচ্ছে না। তবে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে যেন আর কোনো প্রাণহানি না ঘটে এ পরিকল্পনা নিয়েই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।
পরিবেশ অধিদপ্তর আঞ্চলিক পরিচালক মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসাইন বলেন, পাহাড় কাটা এখন সর্বগ্রাসী। পরিবেশ অধিদপ্তর একা তা রোধ করতে পারছে না। পাহাড় কাটার সঙ্গে অনেক উঁচু পর্যায়ের প্রভাবশালী লোক জড়িত। পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (মহানগর) মোহাম্মদ আজাদুর রহমান মল্লিক বলেন, লোকবল সংকটের কারণে পাহাড় কাটা সংক্রান্ত মামলার তদন্তে বিলম্ব হচ্ছে।
সিদ্ধান্ত-সুপারিশ কাগজে-কলমে : পাহাড়ধসের প্রাণহানির ঘটনা এড়াতে গঠিত শক্তিশালী পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্ত কার্যত কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। বড় ধরনের দুর্ঘটনার পর কিছুদিন এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তোড়জোড় দেখা গেলেও পরবর্তীতে যত দিন গড়ায় ততই ফাইলের ওপর বাড়তে থাকে ধুলোর স্তর। ২০০৭ সালের ১১ জুন ভয়াবহ পাহাড়ধসে ১২৯ জনের প্রাণহানির ঘটনার পরই পাহাড়গুলোতে তদারকি ও প্রাণহানি রোধে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে ১৮ সদস্যের পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটিও গঠন করা হয়। ওই কমিটি পাহাড়ধসের ২৮টি কারণ চিহ্নিত করে সমস্যা সমাধানে ৩৬টি সুপারিশ করলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। এছাড়া পাহাড়ধস এড়াতে এবং পাহাড় ব্যবস্থাপনার সভায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
তবে এবার পাহাড় অবৈধ দখলমুক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস রোধে প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল মান্নান বলেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নেতৃত্বে কিছু মাস্তান পাহাড়ে বসবাসকারীদের নানা অভয় দেখিয়ে বসবাস করায়। অবৈধ ঘর-বাড়ি বানিয়ে নিম্ন আয়ের মানুষকে ভাড়া দেয়। যেসব মাস্তান বা দুর্বৃত্ত পাহাড়ে বসবাস করতে প্ররোচনা দিচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করা হবে। যত বড় নেতাই হোক, তালিকা করে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াস হোসেন বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করলে ইউটিলিটি সার্ভিস প্রোভাইডার কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড এবং চট্টগ্রাম ওয়াসার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হবে।