প্রকাশিত হলো সেলিনা হোসেনের কাঠকয়লার ছবির ইংরেজি অনুবাদ

আগের সংবাদ

র্সূয ওঠার আগে

পরের সংবাদ

বহুধাবিস্তৃত ফরিদ আহমদ দুলাল

প্রকাশিত হয়েছে: মে ১৬, ২০১৯ , ৮:১২ অপরাহ্ণ | আপডেট: মে ১৬, ২০১৯, ৮:১২ অপরাহ্ণ

কাগজ প্রতিবেদক

কবি ফরিদ আহমদ দুলাল এর নিষ্ঠা-দূরদর্শিতা, সততা আর প্রজ্ঞা কাব্যাঙ্গনে তাঁকে প্রতিষ্ঠা দিতে সহায়ক বলে আমি মনে করি।

কবি-কথাশিল্পী-প্রাবন্ধিক-গবেষক-নাট্যকার-অভিনেতা, সর্বোপরি সংস্কৃতজন ফরিদ আহমদ দুলাল। তাঁকে নিয়ে কিছু লেখা স্পর্ধা জেনেও হৃদয়ার্ঘ্য নিবেদনে ব্রতী হওয়ার এটি সামান্য প্রয়াস। তাঁকে যতটুকু দেখেছি বা চিনতে চেষ্টা করেছি, তা অবলম্বন করেই তাঁর সম্পর্কে সামান্য লেখার চেষ্টা করব; একে গঙ্গাজলে গঙ্গাপূজাও বলা যায়।
কবি ফরিদ আহমদ দুলাল নামটি আমার শৈশব থেকে পরিচিত। ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে আমি চিনি স্বল্পদিন। কবিতা সম্পর্কে তাঁর দিকনির্দেশনামূলক জ্ঞানগর্ভ আলোচনায় প্রথম সাক্ষাতেই আমার চমকিত হওয়া; কবিতার সৌন্দর্য তিনি যেভাবে উন্মোচন করলেন, তাতে কবিতার প্রতি মোহাবিষ্ট হওয়ার বিকল্প থাকল না যেন। প্রথম দর্শনেই মনে হলো কবিতায় ঋদ্ধিসাধনে আমার মতো নবীনদের এমন প্রাণময় ঋদ্ধ মানুষেরই প্রয়োজন। কিন্তু দ্বিধার দেয়াল ডিঙিয়ে যাওয়া সহজ? এমন প্রশ্ন বুকে নিয়েই তিনি আবর্তিত হয়েছেন আমার চিন্তায়, পল্লবিত হয়েছেন আমার মননে। তাঁর সম্পর্কে নানা মুখে নানা কথা শুনেছি, কিন্তু যেদিন থেকে তাঁকে চিনি, সেদিন থেকেই ব্যক্তিগত ভাবনায় তিনি অতি সাধারণ নিরীহস্বভাব পরোপোকারী প্রকৃতির স্পষ্টবাদী একজন মানুষ; সত্যকে সত্য আর মিথ্যাকে মিথ্যা বলতে যিনি দ্বিধা করেন না। দায়িত্ব পালনে একনিষ্ঠ, আবার সাংগাঠনিক কাজে একনায়ক, আপাদমস্তক একজন কবিতাপ্রেমী মানুষ। তাঁকে একজন শাদা মনের মানুষ বললেও ভুল হবে না। এত স্বল্প সময়ে একজন মানুষ অন্য একজন মানুষকে এতটা আপন করে নিতে পারেন, তা এক বিস্ময়। এবং তা কেবল পারেন একজন ফরিদ আহমদ দুলাল। আপন আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠেন পলকের মুগ্ধতায়।
সাহিত্যের দুর্লঙ্ঘ আঙিনায় যখন নিজেকে দিশাহারা মনে হচ্ছে; ঠিক তখন, তাঁর দিকনির্দেশনা যেন আলোকবর্তিকা হয়ে পথ দেখালো। সময়কালের সীমাবদ্ধতাকে তিনি তাঁর ঔদার্যের মহিমায় পলকে উড়িয়ে দিলেন। তিনি এমন একজন মানুষ, সাহিত্য বা কবিতা সম্পর্কে উনার কাছে কিছু জানতে চাইলে মনে হয় উনি নতুন করে উজ্জীবিত হয়ে ওঠেন, আর প্রাণের আনন্দে আন্দোলিত করে তোলেন পরিপার্শ্ব। কবিতা বিষয়ে সাহায্য করতে তাঁর যেন ক্লান্তি নেই, কখনো এড়িয়ে যাওয়ার কোনো কৌশলও অবলম্বন করেন না। কবিতা বিষয়ে সহ¯্র প্রশ্নেও ক্লান্ত নন তিনি; বিরক্ত না হয়ে সব আব্দার পূর্ণ করেন; যেন একজন শিক্ষানবিশ কবির জন্য দেবদূত কবি ফরিদ আহমদ দুলাল। কবি ফরিদ আহমদ দুলালের মান এবং উচ্চতা নির্ণয় করা আমার জন্য স্পর্ধা, তবুও আমি এই স্পর্ধাটুকু দেখাচ্ছি আমার প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসার প্রশ্রয়ে।
কবিতার প্রকরণ-ছন্দ আর শিল্পদ্যূতি এতো সহজভাবে তিনি বুঝিয়ে দেন যা অবাক হবার মতো। যেমন উনি আমাকে স্বরবৃত্ত বুঝিয়েছেন বাঁশপাতা ঝরে পড়া দিয়ে, তেমনি অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত বুঝিয়েছেন আমপাতা, কাঁঠালপাতা ঝরে পড়ার আবহ দিয়ে। তাঁর কথায় মুহূর্তে চিত্রময় হয়ে উঠেছে এক একটি ছন্দের দোল-চাল। এমনটি কোথায় পাই, ভেবে বিস্ময়াভিভূত হয়ে পড়ি। কবি ফরিদ আহমদ দুলাল শুধু একটি নাম নয়, একটি প্রতিষ্ঠান, একটি পূর্ণাঙ্গ পাঠাগার। আমি তাঁকে তাই ‘চলমান উইকিপিডিয়া’ বলি। তাঁকে নিয়ে কিছু লিখবো বলে গুগলে সার্চ দেয়ার সাথে সাথে এত তথ্য বেরিয়ে এলো, যে আমি বিস্ময়ে হতবাক। এত কাছাকাছি অবস্থান করে আমরা যাঁকে চিনতে পারিনি তাঁর এত দ্যূতি? তাঁকে জেনে মনে পড়ে গেল রবীন্দ্রনাথ যে বলেছিলেন-
‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া/ ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া/ একটি ধানের শিষের উপরে একটি শিশিরবিন্দু।’
চার দশকের অধিককাল শিল্প-সাহিত্য অঙ্গনে নিজেকে সম্পন্ন করে গড়ে নিয়েছেন তিনি। বারবার নিজেকে ভেঙেছেন, গড়েছেন, নিজেকে নিজেই অতিক্রম করেছেন নিজ সাধনায়। সময়ের কষ্টিপাথরে পরীক্ষা দিয়ে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেছেন বারবার। নিজেকে নিজেই অতিক্রম করে হয়ে উঠেছেন কবিতার সংশপ্তক; কোথায় তাঁর বিচরণ নেই। কবিতা ছাড়াও সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় নিজের যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন; নাটক, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ লেখার পাশাপাশি বৃহত্তর ময়মনসিংহের লোক-সংস্কৃতি শনাক্তকরণ, মূল্যমান নির্ধারণ ও মেধাস্বত্ব সংরক্ষণ বিষয়ে গবেষণা কর্মেও নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেছেন। পাশাপাশি তিনি সাহিত্যের একজন নিষ্ঠ সেবক, দক্ষ সংগঠক; আর নাটকের পরিণত নির্দেশক-দক্ষনট। তাঁর লেখা পঞ্চাশোর্ধ নাটকের প্রায় সবই মঞ্চায়িত হয়েছে। তাঁর লেখা এবং পরিচালিত প্রতিটি নাটক সর্বমহলে সমাদৃত। ফুলজান সমাচার, এবং লাঠিয়াল, মানিক বাউলের পালা, কোঁচ, দীর্ঘ দুঃসময় ইত্যাদি তাঁর সর্বাধিক দর্শকপ্রিয় নাটক। আর তাঁর সাম্প্রতিক কাব্য মৈমনসিং গীতিকাভাসান, নাইওর, কৃষ্ণকলি নাম তার, মৃত্তিকাবন্দনা, এ চারটি কাব্যের কথাই যদি বলি, তাহলে সহজেই বুঝে নিতে পারি কবি হিসেবে তিনি কতটা জীবনঘনিষ্ঠ, কতটা মৃত্তিকাসংলগ্ন। এমন জীবনঘনিষ্ঠ-মৃত্তিকাসংলগ্ন কবি আমাদের কাব্যাঙ্গনে বিরল।
মৈমনসিং গীতিকাভাসান কাব্যে যদি চোখ রাখি, দেখবো কী নিষ্ঠায় তিনি ‘মৈমনসিং গীতিকা’র মূল সুরটি বাক্সময় করে তুলেছেন তাঁর কাব্যে। মৈমনসিং গীতিকাভাসান কাব্যটিকে মৈমনসিং গীতিকা’র নবরূপায়ন বললে ভুল হবে না। মৈমনসিং গীতিকা’র পালাগুলোয় প্রধানত নারীর বিচ্ছেদ-বেদনার আর্তি ফুটে উঠেছে, কবির কাব্যেও সেই মহুয়া-মলুয়া-চন্দ্রাবতী-সখিনা-লীলা-কঙ্ক ইত্যাদি চরিত্র উঠে এসেছে নবরূপে। কবি দেখেছেন এতো দীর্ঘ কালব্যবধানেও নারীচরিত্র্য আজো অপরিবর্তিতই রয়ে গেছে; আজকের সমাজেও নারী বঞ্চনা-প্রবঞ্চনার শিকার। বাঙালি নারীর সেই বঞ্চনাই যেন উচ্চারিত হয়েছে তাঁর কবিতার ছত্রে ছত্রে। আমরা এখানে তাঁর একটি কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করতে পারি।
জীবনের বাঁক পেরিয়ে ‘জয়চন্দ্র’ ফিরে আসে যদি
অপেক্ষায় থাকে বিরহী গ্রামের ‘চন্দ্রাবতী’ নদী।

পয়ারে সাজায় মনসার পালা বেহুলার উপাখ্যান
ভালোবাসা যাকে ডেকেছে যুদ্ধের মাঠে
বীরাঙ্গনা সখিনা রচেছে যুদ্ধে বিচ্ছেদ-ভাসান।
করিমগঞ্জের পাতুয়ারী থেকে কিল্লাতাজপুরে
ছড়িয়ে রয়েছে যত ধুলোয় মলিন পথ
বিরহে কাতর দস্যু কেনারাম ফেরেনি তবুও জয়চন্দ্রের প্রতারক রথ।
(চন্দ্রাবতী-জয়চন্দ্র পালা ॥ মৈমনসিং গীতিকাভাসান ॥ ফরিদ আহমদ দুলাল ॥ পৃষ্ঠা-১৭)
এভাবেই কবি মৈমনসিং গীতিকাভাসান কাব্যের পঙ্ক্তিতে পঙ্ক্তিতে নারীর প্রতি তাঁর সহজাত ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ করেছেন। আবার আমরা যদি তাঁর ‘নাইওর’ কাব্যে চোখ রাখি, দেখবো নারীর ভিন্নবেদনাচিত্র। ‘নাইওর’ চুয়াত্তর সংখ্যক সনেট সমৃদ্ধ একটি কাব্য। নাইওর কাব্যে তিনি দাম্পত্য জীবনের টুকরো টুকরো প্রেম-বিরহ, সুখ-দুঃখ নিয়ে প্রণয় কাসিদা রচনা করেছেন। ‘নাইওর’ শব্দটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় লোকবাংলার চিরায়ত এক আবহের সাথে। বাঙালি নারীর বিবাহোত্তর বাপের বাড়িতে সাময়িক বেড়াতে যাওয়াকে কেন্দ্র করে দম্পতির বুকে যে বিচ্ছেদের জন্ম হয়, যে বিরহকাল মুখোমুখি দাঁড়ায়; আবহমান বাংলার চিরচেনা সেই বিরহকালের কথাই যেনো কবি উচ্চারণ করেছেন নাইওর কাব্যে। কখনো কখনো তিনি নাইওরকে চিরস্থায়ী বিচ্ছেদের লীন করেছেন; এবং তার সাথে যুক্ত করেছেন বাংলার সমাজ-সংস্কৃতি-প্রকৃতি, বাঙালির শৌর্যবীর্যের ইতিহাসও। কবির এ বহুমাত্রিকতা তাঁকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। নিচে নাইওর কাব্য থেকে কয়েকটি পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করছি।
পৃথিবীর কোন অক্ষরেখায় তোমার অবস্থান
আমি থেমে আছি কোন গোলার্ধে এখন দুজনার একই আসমান
উত্তরমেরু দক্ষিণমেরু বিষুব রেখার সীমা কে জানে কোথায়
আমার মেঘেরা প্রেমাকুতি-পত্র নিয়ে ঈষাণে-নৈর্ঋতে যায়
পাহাড় চূড়ায় আমার ইশারা করে আহ্বান-আমন্ত্রণ
নাইওর-বিচ্ছেদ ভেঙে এসো একসাথে বাঁচি-হাসি একত্রে ক্রন্দন।
(নাইওর-৪/ফরিদ আহমদ দুলাল)
সত্তর দশকে আবির্ভূত কবি ফরিদ আহমদ দুলাল-এর পঞ্চদশ কাব্য কৃষ্ণকলি নাম তার প্রকাশিত হয় ২০১৭-তে, আর সর্বশেষ কাব্য মৃত্তিকাবন্দনা প্রকাশিত হয় ২০১৯-এ। এ দুটি কাব্যের কবিতাগুলো ভিন্নতর বিষয়বস্তু নিয়ে রচিত।
কবি ফরিদ আহমদ দুলাল এর নিষ্ঠা-দূরদর্শিতা, সততা আর প্রজ্ঞা কাব্যাঙ্গনে তাঁকে প্রতিষ্ঠা দিতে সহায়ক বলে আমি মনে করি। তাঁর কাব্যের সংখ্যা-১৭টি, কবিতা রচনা করেছেন প্রায় দুই সহস্রাধিক। কবি ফরিদ আহমদ দুলাল মানে কাব্যের সোনালি ফসল, শিল্পের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই বলি, বাংলাদেশের সাহিত্যাঙ্গনে কবি ফরিদ আহমদ দুলাল এক অনিবার্য নাম।
তিনি যে শুধু কাব্যাঙ্গনে নিজ প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন তা নয়। তিনি বিচিত্র বিষয়ে আগ্রহী একজন মানুষ, জীবনের বহু বছর বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে চিনে নিতে চেয়েছেন বাংলার অসংখ্য বৃক্ষ আর পাখি, সেসব প্রসঙ্গ উচ্চারিত হয়েছে তাঁর কবিতায়। তিনি একজন সফল মাছ চাষিও, যা অনেকের জানা নেই। জীবনের এতসব অভিজ্ঞতার আলোকে রচনা করেছেন অসংখ্য গদ্য। তাঁর বিচিত্র রচনাসম্ভার বাংলা সাহিত্যকে দিয়েছে ঋদ্ধি। হয়ে উঠেছেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সব্যসাচী একজন। এমন এক সিদ্ধপুরুষের ভালোবাসায় যে কোনো সাহিত্যকর্মী হয়ে উঠতে পারেন ঋদ্ধ। আপাতত এটুকু বলেই থামতে চাই।
এমন এক মহান ব্যক্তিত্বের সংস্পর্শে যখন যে কেউ পূর্ণতা পেতে পারেন, আমি কেন নিজেকে বঞ্চিত করব, যখন তাঁর ভালোবাসায় আমি সিক্ত, যখন আমি তাঁর স্নেহে আপ্লুত?
আগামী শনিবার তাঁর জন্মদিন, কবির জন্মদিনে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, নিরন্তর ভালোবাসা।

সপ্তর্ষি বেগ