ভাষা আন্দোলনে ‘বেগম’ পত্রিকা এবং একজন নূরজাহান বেগম

আগের সংবাদ

পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে জাতীয় ঐক্য গড়ার আহ্বান

পরের সংবাদ

নারী জাগরণের অগ্রদূত

নূরজাহান বেগম, বেগম পত্রিকা এবং বেগম ক্লাব

প্রকাশিত হয়েছে: মে ১৬, ২০১৯ , ৯:১৪ অপরাহ্ণ | আপডেট: মে ১৬, ২০১৯, ৯:১৪ অপরাহ্ণ

কাগজ প্রতিবেদক

দেশের বিশিষ্ট সাহিত্যিক, সাংবাদিক এবং সংস্কৃতি কর্মীদের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতায় এই ক্লাবের কার্যক্রম দেশ-বিদেশে ব্যাপক পরিচিতি ও বিশেষ গুরুত্ব পেতে শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় বেগম পত্রিকা ও বেগম ক্লাব এ দেশের নারীর জন্য সাহিত্য ও সংস্কৃতির দুয়ারই শুধু উন্মুক্ত করেনি, বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থার জন্য শুরু থেকেই নানা ধরনের সুচিন্তিত কর্মকাণ্ড গ্রহণ করে ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে এসেছে, জগদ্দল পাথর সরিয়ে পথ তৈরি করার যে কঠিন সংগ্রাম তারা করেছে নারী শিক্ষা, নারী সাহিত্য সংস্কৃতি ও জাগরণের ক্ষেত্রে তা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

এ দেশের নারী জাগরণ, সাংবাদিকতা ও সমাজকল্যাণে নূরজাহান বেগমের অবদান অবিস্মরণীয়। নব্বই বছর আগে জন্ম নেয়া সময় অতিক্রমকারী এই আধুনিক বুদ্ধিদীপ্ত মানুষটি সমাজের পাথরচাপা জগদ্দল অন্ধকার ঠেলে বেগমের মতো আধুনিক মুক্তচিন্তার একটি পত্রিকাই শুধু বের করেননি, যে সময়ে নারীর লেখা বাইরে প্রকাশ হওয়াটা নিন্দনীয় ছিল সেই সময়ে নারী লেখকদের লেখা প্রকাশ করে যে সাহসী, অনুকরণীয় বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন তা আজ ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। এ দেশের নারী জাগরণ ও সমাজ বির্নিমাণে এর ভূমিকা সর্বজনস্বীকৃত। তাঁর সম্পাদনায় ষাট বছর ধরে প্রকাশিত হয়েছে বেগম পত্রিকা, ধরে রেখেছে এর ঐতিহ্য। শুধু তাই নয় পরাধীন ঘুণে ধরা সেই পত্রিকার পাশাপাশি গড়ে তোলেন ঐতিহাসিক বেগম ক্লাব। পত্রিকা ও বেগম ক্লাবকে ঘিরে একটি শক্তিশালী নারী লেখক গোষ্ঠী তৈরি শুধু নয়, তাদের নেতৃত্বে গড়ে তোলা হয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন। যে আন্দোলন সেই সময়ে সমাজ বিবর্তনে অসাধারণ ভূমিকা রেখেছিল। বেগম পত্রিকা ও বেগম ক্লাব শুরুর উদ্দেশ্য ছিল প্রগতির আলোয় আলোকিত একটি সমাজ গড়া। সেই লক্ষ্যে সাহিত্য সৃষ্টিতে নবচেতনা ও বিপ্লব ঘটাতে তিনি এক লড়াকু সৈনিকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন।
শিক্ষা সাহিত্য সংস্কৃতির অধিকার বঞ্চিত মুসলমান নারী সমাজের জন্য সেই সময়ে সচিত্র সাপ্তাহিক বেগম-এর মতো একটি পত্রিকার প্রকাশ শুধু অভাবনীয়ই নয়, অসম্ভবও। কিন্তু সেই দুঃসাহসী, দুঃসাধ্য কাজটি করা সম্ভব হয়েছিল সাহসী, উদ্যোমী সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের জন্য, যিনি তখন সওগাত পত্রিকার মাধ্যমে বেশ কিছু দক্ষ নারীকে সাহিত্য চর্চায় এগিয়ে নিয়ে এসে একটি জাগরণমূলক সমাজ সচেতন পরিবেশ তৈরির প্রাথমিক পর্ব শেষ করেছিলেন আর ঠিক তখনই উদ্যোগ নেয়া হলো তাদের নিয়ে সওগাতের স্থলে সচিত্র সাপ্তাহিক বেগম পত্রিকা প্রকাশ করার। এই প্রস্তুতি পর্বের প্রথম দিকে তিনি যে আন্তরিক সহযোগিতা ও পরামর্শ পেয়েছিলেন সমাজের সর্বস্তরের সুধীমহলের কাছ থেকে তা ছিল একজন নবীন মুসলমান সম্পাদকের জন্য অকল্পনীয়।
১৯৪৭ সালের ২০ জুলাই কলকাতা থেকে এই পত্রিকার প্রকাশ শুরু হয়। প্রথম দিকে নারী লেখক সংকট থাকলেও ক্রমান্বয়ে তা কাটতে শুরু করে এবং শুধু লেখকই নন বিশিষ্ট সমাজসেবী এবং গুণীজনরাও পাশে এসে দাঁড়ান। কলকাতা থাককালীন বেগম পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন আমাদের সকলের জননী সাহসিকা, শতাব্দীর বিবেক কবি সুফিয়া কামাল।
বেগম পত্রিকার প্রকাশ লগ্নে মহিলা লেখকরা তাদের বক্তব্যে আশা প্রকাশ করেছিলেন এই পত্রিকা তাদের জাতীয় ও সামাজিক জীবনে এক যুগান্তর পরিবর্তন আনবে কারণ এর নেপথ্যে রয়েছেন এক উদার, সাহসী, সত্যান্বেষী সম্পাদক যার নাম মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন। যিনি সচিত্র সাপ্তাহিক মহিলা সংখ্যা সওগাত পত্রিকা প্রকাশ করে শুধু নারী লেখক তৈরিই নয়, সমাজ বদলের ক্ষেত্রে সৈনিকের ভূমিকা রেখে সেই অন্ধ সময়ে হয়েছিলেন ব্যাপকভাবে নন্দিত। রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ সে সময়ের সকল উল্লেখযোগ্য হিন্দু ও মুসলমান লেখক, সমাজ সংস্কারক, সমাজবিদরা তাকে পরিপূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতা করেছেন।
বেগম প্রকাশ লগ্নে যারা শুভেচ্ছা জানিয়ে বক্তব্য রেখেছিলেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কবি সুফিয়া কামাল, শামসুন্নাহার মাহমুদ, জোবেদা খাতুন, শ্রীমতি নন্দিতা মজুমদার, প্রতিভা গাঙ্গুলী, মরিয়ম রশীদ, মর্জিনা করিম, সৈয়দা মোতাহেরা বানুসহ অনেকে।
দেশ ভাগের পর সাপ্তাহিক বেগম ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়। লেখিকাদের অধিকাংশই তখন ঢাকায় ফিরতে শুরু করেন। সম্পাদিকা নূরজাহান বেগম-এর সম্পাদনায় ১৯৫০ সালে ৩ ডিসেম্বরের ঢাকায় সাপ্তাহিক বেগম- এর চতুর্থ বর্ষ ১ম সংখ্যার প্রকাশ ঘটে। সেই থেকে আজ অবধি ঢাকায় বেগমের নিয়মিত পথচলা।
বেগম-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে লেখক ও সমাজকর্মীরা যারা সেদিন উপস্থিত ছিলেন তাদের নাম জানলেই সকলের বুঝতে সুবিধা হবে কাদের লেখা এবং সহযোগিতায় এই পত্রিকার প্রকাশ ঘটেছিল। অর্থাৎ ঊষা লগ্নেই বেগম-এর ভিত কত মজবুত ছিল। এই সত্য সঠিকভাবে অনুভব করতে পারলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে এর সুদূরপ্রসারী কালজয়ী ভূমিকার নেপথ্যের চিত্রটি। সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বেগম শামসুন্নাহার মাহমুদ, কবি মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা, কবি মোতাহেরা বানু, নুরুননেছা খাতুন বিদ্যা বিনোদিনী, ফাতেমা সাদেক, অধ্যাপিকা হামিদা খানম, হোসনে আরা মোদাব্বের, মিসেস এ কে ফজলুল হক, লায়লা আঞ্জুমান বানু, ফওজিয়া সামাদ, শাহজাদী বেগম, লায়লা সামাদ আনোয়ারা বাহার চৌধুরী, লিলি খানসহ আরো অনেকে। পুরুষদের মধ্যে ছিলেন ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, প্রিন্সিপ্যাল ইব্রাহীম খান, মন্ত্রী হাবিবুল্লাহ বাহার, মোহাম্মদ মোদাব্বের, কবি আহসান হাবীব, সৈয়দ মোহাম্মদ তায়ফুর, মুজিবর রহমান খান, কবি খান মোহাম্মদ মইনউদ্দিন, কবি ফয়েজ আহমেদ, ফজলে লোহানীসহ আরো বিশিষ্টজন।
বিগত দশকের সকল মহিলাকে সাথে নিয়েই বেগম নিয়মিত প্রকাশ হতে শুরু করলো। শিক্ষিত ও শিক্ষানুরাগী সদসদ্যের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন দেখা দিল। শুধু মহিলাই নয়, প্রগতিশীল মুক্তমনা মানুষরা নানাভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেন। একটি কাক্সিক্ষত পত্রিকা প্রকাশের পর নারী জাগরণের সেই উষা অথচ সাহসী লগ্নে নারীদের জন্য একান্ত নিজস্ব একটি সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন। তারই ফলশ্রুতিতে বেগম পত্রিকার নিজস্ব কার্যালয়ে প্রতিষ্ঠা করা হলো সমমনা মাহিলাদের জন্য প্রথম সাহিত্য সংস্কৃতি ও সামাজিক বিষয়ের এক সম্মিলন কেন্দ্র যা পরবর্তী সময়ে ‘বেগম ক্লাব’ নামে বিশেষ খ্যাতি পায়। সময়টা ১৯৫৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর। এই ক্লাবের উদ্বোধন উপলক্ষে এক মনোজ্ঞ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিলো। বেগম সম্পাদিকা নুরজাহান বেগম অতিথিদের স্বাগত জানিয়ে বলেছিলেন বেগম এবং সাহিত্য ও সমাজ উন্নয়নের কাজকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাবে এই বেগম ক্লাব। মহিলাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মান উন্নয়নের পাশাপাশি তাদের ন্যায্য দাবিগুলো তুলে আনা ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ক্রমান্বয়ে ভূমিকা রেখে যেতে পারবে।
বেগম শামসুন্নাহার মাহমুদ বলেছিলেন- এই ক্লাবে মহিলারা সমবেত হয়ে তাদের লেখা, শিল্পকর্ম, সমাজ উন্নয়ন, সমস্যা সংকট নিয়ে আলোচনা করে সঠিক সিদ্ধান্তে আসতে পারবেন। কবি বেগম সুফিয়া কামাল বলেছিলেন- বেগম পূর্ব বাংলার মেয়েদের একমাত্র পত্রিকা বেগম ক্লাবের প্রতিষ্ঠা হওয়ায় নারী ও সমাজ উন্নয়নে নতুন মাত্রার যোগ হলো। কবি মাহমুদা সিদ্দিকা বলেছিলেন- এখানে লেখিকা এবং সমাজ উন্নয়ন কর্মীরা ভাবের আদান-প্রদানের মাধ্যম এক নতুন শক্তির বিকাশ ঘটাবে।
এর আগে ঢাকায় নারীদের জন্য দু’একটি সমাজ সেবামূলক প্রতিষ্ঠান থাকলেও বেগম ক্লাবই একমাত্র প্রতিষ্ঠান যেখানে কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পীদের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে সমবেত হয়ে সমাজ উন্নয়ন বিষয়ক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা ও স্বাধীনভাবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালনার সুযোগ ছিল। সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে কাজটা সহজ ছিল না। সামাজিক বাধা কঠোর সমালোচনার মধ্যে সাহসের সঙ্গে সকল প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করেই তারা ক্রমান্বয়ে অগ্রসর হয়েছেন।
বেগম ক্লাব প্রতিষ্ঠার নেপথ্যে আর একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল যা সাহিত্য ও সমাজ চিন্তক সম্পাদক নাসিরউদ্দিনকে আলোড়িত করেছিল এবং সেই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বেগম ক্লাব প্রতিষ্ঠার উদ্যোগটি ত্বরান্বিত হয়। সেটি হলো নারী শিল্পী সাহিত্যিকদের সেই দুর্দিনে ঢাকায় এসেছিলেন আমেরিকার প্রখ্যাত নারী সাহিত্যিক সাংবাদিক মিসেস আাইদা আলসাত। বেগম কার্যালয় পরিদর্শন করলেন তিনি। নারী লেখক ও সমাজকর্মীরাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন তাকে সংর্বধনা জানানোর জন্য। বেগম পত্রিকার বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখে তিনি তাদের কার্যক্রমের প্রশংসা করেছিলেন। তার বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেছিলেন সেই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নারীদের জন্য বেশ কয়েকটি মাসিক পত্রিকা ছিল কিন্তু সাপ্তাহিক একটিও ছিল না।
মিসেস আইদা আলসাতের বক্তব্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নারীদের সমাজ সেবা ও সাংস্কৃতিক জাগরণের কথা শুনে সওগাত সম্পাদক নাসিরউদ্দীন সেদিনই সিদ্ধান্ত নিলেন যত বাধা ও প্রতিকূলতাই আসুক না কেন সকল চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে সওগাত সাহিত্য মজলিসের মতো ঢাকায় বেগম ক্লাব প্রতিষ্ঠা করবেন, যেখানে শুধু দেশের নারী লেখক সমাজবিদরাই নিজেদের সাহিত্য সংস্কৃতি এবং বিরাজমান সামাজিক সমস্যার আলোচনা, প্রতিবাদ ও দাবি জানাবেন তাই শুধু নয়, সেই সাথে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আসা বিশিষ্ট নারী অতিথিদের সাথে এই ক্লাবে ভাবের আদান-প্রদান ও সম্পর্ক উন্নয়নের সাথে চিন্তা-চেতনারও বৈশ্বিক বিকাশ ঘটাবেন। নারী শিল্পীদের নিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও পরিচালনা করবেন তারা। সংঘবদ্ধ চিন্তাই শুধু নয় এর মাধ্যমে সম্মিলিতভাবে ভাবের আদান প্রদানের মধ্য দিয়ে এদেশে নারী সাহিত্য গোষ্ঠী তৈরি এবং নারী জাগরণ ঘটানো সম্ভব হবে। কবি সুফিয়া কামালকে সভানেত্রী এবং বেগম শামসুন্নাহার মাহমুদাকে সাধারণ সম্পাদক করে বেগম ক্লাবের যাত্রা শুরু হলো। পরবর্তী সময়ে এই ক্লাবের হাল ধরেন বেগম সম্পাদক নুরজাহান বেগম। এই বেগম ক্লাব পরবর্তী সময়ে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য কাজ করে প্রশংসিত হন। তার মধ্যে তৎকালীন ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের সময় মুসলিম পারিবারিক আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বেগম ক্লাবের এর পক্ষ থেকে উঠে আসা জোরালো দাবিকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়েছিল। এ ছাড়াও প্রাকৃতিক নানা দুর্যোগ, খাদ্য সংকটসহ নারীদের বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে পর্যায়ক্রমে আলোচনা, প্রতিবাদ ও দাবি তুলে ধরা হতো দেশের প্রতিষ্ঠিত দৈনিক, সাপ্তাহিকের সম্পাদকদের সাথে মতবিনিময়ের মাধ্যমে। তবে মূল উদ্যোগ ছিল শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ক্ষেত্রে নারীদের অধিক সংখ্যায় এগিয়ে আনা, সচেতন করা এবং জনসমক্ষে তাদের দক্ষতাপূর্ণ কাজকে তুলে ধরা। বেগম ক্লাব প্রতিষ্ঠার পর এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন দৈনিক ইত্তেফাক সম্পাদক তোফাজ্জেল হোসেন (মানিক মিঞা), অবজারভার সম্পাদক আব্দুস সালাম, পাকিস্তান পত্রিকার সম্পাদক মোহাম্মদ মোদাব্বের প্রমুখ।
বিদেশি অতিথিদের মধ্যে যারা বেগম ক্লাবে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন তাদের মধ্যে যাদের নাম উল্লেখ করতে হয় তারা হচ্ছেন- আন্তর্জাতিক লেখক সংঘের বিশিষ্ট নারীরা। ১৯৫৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত এই সভায় বক্তব্য রাখেন চীনা লেখিকা মিস মেরিয়া ইয়েন, ব্যাঙ্ককের শাস্ত্রীসারণ পত্রিকার সম্পাদক মিস নীলওয়ান পিনতং এবং পিইএন সদস্য কোররাতুল আয়েন হায়দার। তারা তাদের বক্তব্যে নিজ দেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে আলোকপাত এবং বাধাগুলো নিরসনে নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরেন।

১৯৫৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বরের এক সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বিখ্যাত ইংরেজ সাহিত্যিক ও ইতিহাসবিদ অধ্যাপক রাশব্রুক উইলিয়ামসের স্ত্রী চিন্তাবিদ জ্যাক উইলিয়ামস। তিনি তার বক্তব্যে বৃটেনের নারীদের প্রকৃত অবস্থা এবং বিগত মহাযুদ্ধের বিভীষিকাময় সময়ে ইংল্যান্ডের নারীদের নিয়ে নারী সেবক বাহিনী গড়ে তুলে যে সাহসী সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন তার উল্লেখযোগ্য দিক তুলে ধরেন। ১৯৫৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর বেগম ক্লাবে আসেন নিখিল পাকিস্তান মহিলা সমিতির সভানেত্রী বেগম রানা লিয়াকত আলী খান। আরো এসেছিলেন ইন্দোনেশিয়ার তরুণনেত্রী তিতি মোমেত তানু মিজাজা। তিনি ইন্দোনেশিয়ার সমাজ উন্নয়ন সম্পর্কে তার বক্তব্য রাখেন। নয়া চীনের স্বাস্থ্য মন্ত্রী মাদাম লি তে চোয়ান তার বক্তব্যে বলেন, আমরা এশিয়ার নারী সমাজের প্রতি সহানুভূতি সম্পন্ন এবং আমাদের মধ্যে অনেক সাদৃশ্যও রয়েছে। নিজ নিজ দেশের জাতীয় প্রতিভা, জীবন যাত্রার রীতি, সংস্কৃতি ঐতিহ্য ঠিক রেখে আমরা অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছবো।
১৯৫৭ সালে অনুষ্ঠিত হয় বেগম ক্লাবের উদ্যোগে প্রথম সাংবাদিক সম্মেলন। বেগম ক্লাবের শিক্ষা সাব কমিটির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে ইডেন কলেজের বহুবিধ সমস্যার চিত্র তুলে ধরে তার প্রতিকারের আহ্বান জানানো হয়। উপস্থিত ছিলেন আজাদ সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দিন, দৈনিক পাকিস্তানের সম্পাদক এস এম আলী, দৈনিক ইত্তেফাকের বার্তা সম্পাদক সিরাজউদ্দিন হোসেন, দৈনিক পাসবান ও জং পত্রিকার জনাব নাদভী, দৈনিক সংবাদ-এর নারীপাতার পরিচালক মিস নূরুন নাহার, নওবেলাল পত্রিকার সম্পাদিকা হাজেরা মাহমুদ, দৈনিক ইত্তেফাক-এর মিস কামরুন নাহার লাইলী।
বেগম ক্লাব প্রতিষ্ঠার পর কয়েক বছরের মধ্যেই বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য সভা ও সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। দেশের বিশিষ্ট সাহিত্যিক, সাংবাদিক এবং সংস্কৃতি কর্মীদের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতায় এই ক্লাবের কার্যক্রম দেশ ও বিদেশে ব্যাপক পরিচিতি ও বিশেষ গুরুত্ব পেতে শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় বেগম পত্রিকা ও বেগম ক্লাব এ দেশের নারীর জন্য সাহিত্য ও সংস্কৃতির দুয়ারই শুধু উন্মুক্ত করেনি, বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থার জন্য শুরু থেকেই নানা ধরনের সুচিন্তিত কর্মকাণ্ড গ্রহণ করে ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে এসেছে, জগদ্দল পাথর সরিয়ে পথ তৈরি করার যে কঠিন সংগ্রাম তারা করেছেন নারী শিক্ষা, নারী সাহিত্য সংস্কৃতি ও জাগরণের ক্ষেত্রে তা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
নূরজাহান বেগমের প্রয়াণে দেশ ও জাতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। আশা করবো সমাজ প্রগতির সকল ক্ষেত্রে তাঁর চিন্তা ও কর্ম অনুসৃত হবে। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ধর্মান্ধ ও সামাজিক কূপম-ূকতার বিরুদ্ধের লড়াইয়ে তার বিরল সাহস ও প্রেরণা সহায়কের ভূমিকা পালন করবে।