র্সূয ওঠার আগে

আগের সংবাদ

পঞ্চকবিদের অন্যতম দ্বিজেন্দ্রলাল রায়

পরের সংবাদ

অশনি সংকেত

প্রকাশিত হয়েছে: মে ১৬, ২০১৯ , ৮:২৯ অপরাহ্ণ | আপডেট: মে ১৬, ২০১৯, ৯:২০ অপরাহ্ণ

কাগজ প্রতিবেদক

নদীসমূহ ছিল এ দেশের ধমনী। নদীপ্রবাহ সচল রাখে জীবনকে। নদী মৃতপ্রায় হলে পরিবেশ, প্রতিবেশে তার প্রবল প্রভাব পড়ে। নদীর মৃত খাত স্মরণ করিয়ে দেয় অতীতের স্রোতস্বীনিকে। একদার সমৃদ্ধশীল অবস্থাকে। কবি রচনা করেন : ‘মরাখাত, একদিন এর গভীরতা ছিল, গভীরতার ভেতর দিয়ে একদিন বহে যেত বাংলার প্রধান জলধারা, আজ শীর্ণ পাঁজরের হাড়, ক্ষত ঘাস, মরা শর বন।’ নদী নাব্যতা সংকটে ভুগছে। অশনি সংকেতের মতো এখন আমাদের দেশে বিপন্ন নদীসমূহের বিশুষ্ক চিত্র ফুটে উঠছে। নদীর বুকে চর পড়েছে। উত্তাল ঢেউয়ের মালার পরিবর্তে উড়ছে খরখরে বালুরাশি। কবির ভাষায়, চিত্রকল্পে সেই জীর্ণ রূপ।

সৈয়দ শামসুল হকের কবিতার পঙ্ক্তিতে দেশের বিভিন্ন সংকটকালীন অবস্থা নদীর পরিপ্রেক্ষিতে বর্ণিত হয়েছে। উচ্চারিত হয়েছে সমকালীন সময়ের ভাষ্য। কবি যেন নদীতে অন্তর্লীন হয়ে ঐতিহ্যের অন্বেষণ করেছেন। তেরশত নদী প্রবাহের গতিময়তার ভেতর দিয়ে স্বদেশের আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে আবিষ্কার করতে চেয়েছেন। হাত বাড়িয়েছেন শেকড়ের দিকে। এই অনুসন্ধান প্রক্রিয়ায় কবির নিকটে এমনতর বোধ জন্ম নিয়েছে যে স্বদেশের আত্মপ্রতিষ্ঠার বিষয়টি নদীতে ঢেউয়ের মালার মতো অসংখ্য অগুনতি এসেছে। শাদা ফেনার ঝালর দোলানো পোশাকে এসেছে তারা। সোনালি বালিয়াড়িতে চিরকালের আলপনা টেনে টেনে গেছে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় এসেছে অসংখ্য মায়ের দীর্ঘশ্বাসকে ছাপিয়ে। কবির নিকটে তখন প্রতিভাত হয়েছে যে মোরগ ডাকা ভোরে নিসর্গ গান গেয়ে উঠেছে। প্রত্যুষ আশা জাগানিয়া হয়ে ডাক দিয়েছে কবিকে। কবি যেন নদীর কাছ থেকে শুনতে পেয়েছেন স্বদেশের মুক্তির বার্তা।
সৈয়দ শামসুল হক নদীর বিস্তারে দেশের রূপচিত্র অঙ্কন করেন।
‘ফিরে এসো বাংলাদেশ,
ফিরে এসো লৌহিত্য নদের কিনারে, ফিরে এসো
বুক রংগী মাছের সংসারে,
লাল শাদা শাপলার কচুরির বেগুনি জাজিমে
যুবতীর কলসের ছলাৎ ছলাৎ ছল শব্দের ভেতরে
আমাদের পিতামহ পিতামহীদের ব্যবহৃত তৈজসে ফিরো এসো।’
সৈয়দ শামসুল হক বাঙালি ও বাংলাদেশকে দেখেছিলেন এক অবিচ্ছেদ্য সত্তা হিসেবে। চিত্রশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর অনবদ্য রেখাঙ্কনে নৌকোর গলুইয়ের যে চোখ ফুটে উঠেছিল তা সৈয়দ হককে জুগিয়েছে অনুপ্রেরণা। কাইয়ুমের নৌকোর চিত্রপট নিয়ে কবিতা লিখেছেন। সেই চোখ কবির কাছে ঐতিহ্য-ভাবনার প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
কবি নদীমাতৃক বাংলাদেশকে অন্তরঙ্গ অনুভব শক্তিতে জারিত করে নিয়ে বহুভাবে উপস্থাপিত করেছেন। বহুমাত্রিকতায় উদ্ভাসিত করেছেন। সর্বদা এ কথা ভেবে গর্ব অনুভব করতেন যে, তিনি তেরশ নদী প্রবাহিত একটি দেশের সন্তান। এ দেশের মানুষকেও সেই গর্বের অংশীদার হতে আহ্বান করেছেন। কিশোর কবিতার পঙ্ক্তিতে সেই গৌরবগাথাকে প্রকাশ করেছেন নতুন প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করতে। তার সেই আহ্বান ছিল স্বদেশ প্রেমের মগ্নতায় ভাস্বর।
‘ফিরে এসো, তোমার নদীর কাছে,
তেরোশ নদীর জল যার আছে তার মতো
কে আছে সচ্ছল?
ফিরে এসো, সন্তানের নিরত সিক্ততার পাশে
আয়নায় মেয়েটির মুখের বাঁ ধারে
ফিরে এসো, উঠোনের ধান গন্ধে
ওপারের নৌকোটিকে এ পারের যাত্রীটির পার হবো, পার হবো
ডাকের ভেতরে
ফিরে এসো বাংলাদেশ, ফিরে এসো তুমি।’

বাঙালির স্বপ্নের ফসল বারবার বিনষ্ট হয়েছে। কবির নিকটে মনে হয়েছে বাংলার নদীর মতো চোখের তরল রূপা বারবার তার শষ্য আউশ নষ্ট করে দিয়ে গেছে।
পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ দিয়ে যখন মুক্তিযুদ্ধের সময় গুলিবিদ্ধ লাশ ভেসে যায় তখন কবি সেখানে জলজ লোকজ সংস্কৃতির উপাখ্যান ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’র স্পর্শ খুঁজে পান। নদীবক্ষে ভেসে যাওয়া লাশ দেখে ধারণা করেন মৈমনসিংহের গীতিকার পাতা ছিঁড়ে আজো সে ফিরেছে। আমাদের সমৃদ্ধ লোক-সাহিত্যে নদ-নদীর বিস্তারের ব্যাপক উল্লেখ রয়েছে। কবির নিকটে মনে হয়েছে নদী যেন এক অপরূপ জীবন্ত সত্তা। যা নিবিড় হয়ে মিশে রয়েছে তার সর্বাঙ্গীণ অস্তিত্বে। তাই গভীর বিশ্বাসে উচ্চারণ করেন :
‘করোটিতে ব্রহ্মপুত্র বহে যায়,
কুয়াশার নৌকোর দাঁড়ের শব্দ ছপ ছপ করে
আমার পায়ের পাতা ধুয়ে দেয় ঘাসের শিশির।

তেরোশত নদীর ওপরে ফের অসংখ্য নৌকোর চলাচল শুরু হয়,
জামরঙ পাল তুলে অস্তিত্বের
ঈশানী হাওয়ায়।’

নদীমাতৃক বাংলাদেশের জলজ সংস্কৃতির এক অপূর্ব, তেজোদীপ্ত উপাখ্যান হচ্ছে অসম সাহসী চাঁদ বেনের কথা। এ দেশের নদীবহুল অঞ্চলের চিত্র তাতে উদ্ভাসিত হয়েছে। চাঁদ বেনের প্রবল প্রতাপ নিয়ে উপাখ্যান রচনা করেছেন সেলিনা হোসেন। চাঁদ সওদাগর দেবীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন অকুতোভয়ে।

সৈয়দ শামসুল হক স্বপ্ন হারানো বাঙালি জাতিকে স্মরণ করিয়ে দেন :
‘চাঁদ সওদাগর ছিল কোন কালে
কবেকার বণিক সে?
কোন পণ্য?
নীল সমুদ্রের লবণজল ভেঙে দূর দেশ থেকে
তার সপ্তডিঙা
বয়ে আনত কোন বস্তু যার প্রয়োজন ছিল বাঙালির?’
চাঁদ সওদাগরের সপ্তডিঙার যাত্রা প্রাচীন বাংলার নৌ-যাত্রার ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। সপ্তডিঙার বিবরণ বাঙালির দুঃসাহসী যাত্রার বিবরণ প্রকাশ করে। কোনো জাতির শক্তিমত্তা, শৌর্য প্রকাশের জন্য অতীতকালের উপাখ্যান থেকে উদাহরণ সংগ্রহ করা অতীব প্রয়োজন।
‘প্রথমে তুলিল ডিঙা নামে মধুকর,
সুধাই সুবর্ণে তার বসিবার ঘর
তবে তোলো ডিঙাখানি নাম গুয়ারাখি
দুই প্রহরের পথে যার মালুম কাঠ দেখি
আর ডিঙা তুলিলাম নামে শঙ্খশূল
আমি গজ পানি ভাঙি গাঙে লয় কূল
তবে ডিঙাখানি তোলে নাম সিংহমুখী
সূর্যের সমান রূপ করে ঝিকিমিকি।’
নদীর তীরেই উর্বর ভূমিতে গড়ে ওঠে মানবসভ্যতা। নদীপ্রবাহ সেই সভ্যতাকে সমৃদ্ধ করে। নদী সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসের শেষ রবিবার বিশ্বা ব্যাপী পালন করা হয় ‘আন্তর্জাতিক নদী দিবস’। ১৯৮০ সাল থেকে ব্রিটিশ কলম্বিয়ার ড. মার্ক অ্যাঞ্জেলার নেতৃত্বে সূচিত হয় নদী বাঁচাও আন্দোলন। ড. মার্ক বিশ্বের এক হাজারেরও বেশি নদী ভ্রমণ করেছেন। তাকে প্রবলভাবে উদ্দীপিত করেছিল লগংস্টন হিউজের কবিতা ‘নদীর কথা বলি’।
‘এইখানে নদীর গান গাই
পৃথিবীর বয়সের মতো আজন্ম
সমতা রেখে বহমান নদী।
ধমনীর স্রোত সে তো তার কাছে
একান্ত নবীন। ইতিহাস আরো পরে।
আমার হৃদয় যেন
প্রত্যন্ত গভীর ছোঁয়া,
নিতল শিকল-মেলা নদী।
আমার অবগাহন য়ুফ্রেতিসে
বিশুদ্ধ ভোরের কৈশোর
আমার ঘর বাঁধার স্বপ্নে আমার
নীড় কঙ্গোর ধারে, কত ঘুম তার ঘুর।
আমার চেতনার উজ্জীবনে আমি
মিসিসিপির গান শুনেছি বহুবার।
আমি দেখেছি তার বুক আহা
গোধূলিতে সোনার উৎসব
সূর্যাস্তে অপরূপ শোভা।
আমি নদীদের জানি- গান গাই
আজন্ম স্থবির স্থির, বহমান সন্ধ্যার নদী।
তাই বুঝি আমারও হৃদয়
প্রত্যন্ত গভীর ছোঁয়া
নিতল শিকড়-মেলা নদী
জ্যোতির্ময় যাত্রার গান।’

নদী সংরক্ষণ বিষয়ে তিনশোর অধিক তথ্যসমৃদ্ধ নিবন্ধ রচনা করেছেন ড. মার্ক। নদীকে বাঁচানোর বিষয়টিকে তিনি তার জীবনের অন্যতম ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছেন। নদীই হচ্ছে তার সার্বক্ষণিক ধ্যান-ধারণা। নির্মাণ করেছেন নদী নিয়ে একাধিক প্রামাণ্য চিত্র। যা ওয়েবসাইটে ৪০ মিলিয়নের বেশি ভিজিটরের কাছে পৌঁছেছে। ড. মার্কের সুচিন্তিত অভিমত হচ্ছে, ‘নদীই আমাদের এই গ্রহের সবচাইতে প্রয়োজনীয় ধমনী। আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান বলে মনে করি যে, বিশ্বের এত নদী ও প্রবাহ পরিভ্রমণের সুযোগ আমার হয়েছে।’
আত্মপ্রতিষ্ঠার দাবিতে বাঙালি জাতিকে বহুবার সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে হয়েছে। স্বৈরতান্ত্রিক সময় বাংলাদেশকে বিপন্ন করেছে। অশুভ শক্তি বাঙালি জাতিসত্তাকে বিপর্যদস্ত করতে চেয়েছে। সৈয়দ শামসুল হক এ রকম পরিস্থিতিতে বাঙালিকে আশায় উজ্জীবিত হতে অনুপ্রাণিত করেন। তিনি প্রত্যাশিত বাংলাদেশের অপেক্ষায় থাকেন। তিনি দেশকে তখন মৃতপ্রায় ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে তুলনা করে মানুষকে আবার নতুনভাবে জাগিয়ে তুলতে চান। যেনবা মৃতপ্রায় শুকনো নদীতে আবার বান আসবে। পুনরায় কল্লোলিত হবে নদী। ফিরে পাবে গতিপ্রবাহ। আবার স্পন্দমান হয়ে উঠবে মানুষের বুক। কবির উচ্চারণে পঙ্ক্তিসমূহ আশার ব্যঞ্জনায় ঝঙ্কৃত হয়।
‘বনপথে বেদের বহর চলে গ্রাম থেকে গ্রাম অভিমুখে
ঈশা খাঁর তলোয়ার যেন ফিরে পায় তার ধার-
মানসিংহ পরাজয় মানে,
বাংলার তেরোশত নদীর কিনারে যেন জেগে ওঠে ধান,
সবুজের গন্ধে যেন ভরে যায় বাংলার প্রাণ।’
বাংলার সংগ্রামের ধারাবাহিক ইতিহাস কবিকে আত্মজিজ্ঞাসু করে তোলে। দীর্ঘ পথপরিক্রমাকে কবি তুলনা করেন বহতা উত্তাল নদীর সঙ্গে। কবির নিকটে নদী জীবন্ত সত্তারূপে তখন রূপায়িত হয়। নদীমাতৃক উপমাটি নতুন এক মাত্রা পায়। কবি আবিষ্কার করেন বিশাল প্রেক্ষাপট। দীর্ঘ পথ পরিক্রমা তাকে ক্রমশ আত্মপ্রত্যয়ী করে তোলে।
‘যে আমি বাংলার বুকে হাজার বছর বড় দীর্ঘ পথ হেঁটে
নীল বিদ্রোহের কাল, রক্তলাল ফেব্রুয়ারি পথ হেঁটে হেঁটে
বারবার উত্থানে পতনে পড়ে যে আমি উত্তাল
মেঘনা যমুনা পদ্মা ঠেলে ঠেলে মধুকরী নৌকোয় একদা
পৌঁছে গেছি রমনার বিশাল উদ্যানে।’
সৈয়দ শামসুল হক-এর নদী বিষয়ক ভাবনাচিন্তাগুলো ছিল স্বতন্ত্র। তার একমাত্র পুত্র দ্বিতীয় সৈয়দ হক স্মৃতিচারণমূলক লেখায় লিখেছেন,
‘… সেই বিকেলগুলোতে সোফায় শুয়ে বিস্মিত হয়ে শুনতাম তিস্তা এবং ধরলা নামে দুটি বিশাল নদীর কথা, শিখলাম কীভাবে সেই নদী দুটি ভারত থেকে এসে এক সময় আবারও মিশে হয়ে যায় আমাদের মহৎ যমুনা। সেই থেকে আবারও বয়ে যায় আমাদের পদ্মায়। সেই একই পানি আবার কোত্থেকে যেন এক সময় হয়ে যায় মেঘনা। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা। তিনটে ভিন্ন নদী অথচ তারা সকলেই ভাই বোন। সেই নদী নাকি বাবার কথায় মানুষকে ডেকে কয়, আমার জল শরীর থেকে সোনার কুঠার হাতে দেবী উঠবেন যদি তুমি সত্যবাদী হও। একটি নদীর পানি যেন তার রক্ত। নদীর মতো আমাদেরও রক্ত বয় শিরায় শিরায়, প্রতিটি আঁকে-বাঁকে বয়ে যায় সেই রক্ত যা আমাদের বাঁচিয়ে রাখে, প্রাণ দেয়। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর আমাদের সেই চিলতে খাটে শুয়ে অন্ততপক্ষে আমার তেরো বছর বয়স পর্যন্ত চলে রোজ দুপুরে এসব গল্প। আবারও মনে পড়ে নূরলদীনের সেই একই কথা-
‘মাটিতে মিশিয়া যায় মানুষের শরীর
মাটিতে জন্ম নেয় আবার শরীর।’
সৈয়দ শামসুল হকের পুত্রের এই আত্মজৈবনিক রচনাটি থেকে অতি সহজেই অনুধাবন করা যায় যে নদীর বিষয়কে কতটা গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতেন সব্যসাচী লেখক। যিনি নিজের সমাধি লিপি ২০০৭ সালের ২৪ আগস্ট লন্ডনে বসে রচনা করেছিলেন। যেখানে এই বিশ্বাস ছিল :
‘তেরোশত নদীর এ দেশ পলিসমৃদ্ধ নিশ্চয়।
পলি পড়ে। পলল-শিলায় লেখে গল্পটা সময়।
তোমার সন্তান কবি, পদচ্ছাপ রেখো মা শিলায়।
যদি রাখো, কী আছে জীবন যদি মাটিতে মিলায়।’
সৈয়দ শামসুল হক তার জীবনকেও তুলনা করেছিলেন নদীতে নৌকোর নৃত্যের মতো। লিখেছেন, ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর, দাঙ্গা, দেশভাগ, একাত্তর- চক্ষুষ্মান ব্যক্তির অধিক সে দেখেছে, আধকোশা নদীর লহরে তাররচনা গায়ন অগ্নিধরা নৌকোর মতো নৃত্য করেছিল চল্লিশ বছর।’
বাংলার লোকায়ত জীবনে নদীর বিশাল প্রভাব লক্ষ করেছিলেন। নদী তীরের জীবনযাত্রা থেকে জলজ সংস্কৃতির রূপরেখাকে বিন্যস্ত করেছিলেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের বিখ্যাত গুণ টানা চিত্রটি তাকে যথেষ্ট আলোড়িত করেছিল। লিখেছেন,
‘… নিকট নিকট হয়ে দেখা দেয় গ্রাম,
নদী-নৌকো-লোক, প্রত্যহের গুণ টেনে চলা পাঁকে।
অবিরাম পদচ্ছাপ ফেলে, পাটল ও ক্রুদ্ধ জল
টেনে নিচ্ছে বাড়িঘর, গিলে খাচ্ছে ফসলের মাঠ,
তবুও মানুষ তার পাঁজরের ভেতর-দোতারা
বাজিয়ে চলেছে আজো বিরুদ্ধ সময়ে।’
নদীসমূহ ছিল এ দেশের ধমনী। নদীপ্রবাহ সচল রাখে জীবনকে। নদী মৃতপ্রায় হলে পরিবেশ, প্রতিবেশে তার প্রবল প্রভাব পড়ে। নদীর মৃত খাত স্মরণ করিয়ে দেয় অতীতের স্রোতস্বীনিকে। একদার সমৃদ্ধশীল অবস্থাকে। কবি রচনা করেন : ‘মরাখাত, একদিন এর গভীরতা ছিল, গভীরতার ভেতর দিয়ে একদিন বহে যেত বাংলার প্রধান জলধারা, আজ শীর্ণ পাঁজরের হাড়, ক্ষত ঘাস, মরা শর বন।’ নদী নাব্যতা সংকটে ভুগছে। অশনি সংকেতের মতো এখন আমাদের দেশে বিপন্ন নদীসমূহের বিশুষ্ক চিত্র ফুটে উঠছে। নদীর বুকে চর পড়েছে। উত্তাল ঢেউয়ের মালার পরিবর্তে উড়ছে খরখরে বালুরাশি। কবির ভাষায়, চিত্রকল্পে সেই জীর্ণ রূপ।
‘ব্রহ্মপুত্র নদ কবে শুকিয়ে গেছে
মরাখাতে একটি নৌকোর লাশ শুয়ে আছে একা,
একটি হাভাতে কাক গলুয়ের পরে বসে
অন্য কোনো খাদ্যাভাবে
নিজেরই পালক ঠোঁটে ভীষণ ছিঁড়ছে, দ্যাখো
উপারের ছেঁড়াখোঁড়া গ্রামখানি পাটল ধুলায়
প্রায় মিলিয়ে গিয়েছে।’

স্বৈরশাসনের সময়ে যখন বাংলাদেশে চরম দুরবস্থা নেমে এসেছিল তখনো কবি সৈয়দ শামসুল হক নদীমাতৃক দেশটির এই নির্মম রূপ তুলে ধরেছিলেন :
‘বাংলার ঢাকের ধ্বনি থেকে আমি সরে গেছি বহুদূর আজ,
মরা ব্রহ্মপুত্র নদে লাশ শহীদের
চর হয়ে জেগে আছে,
বুঁজে গেছে সব নাব্য পথ।
মাথার ওপরে
অন্ধ এক হরিয়াল ঘুরে ঘুরে ওড়ে।’
এভাবে নদী তখন হয়ে উঠেছিল অশনি সংকেত।