মাশরাফিকে কটূক্তি: শোকজের জবাব দিলেন ৬ চিকিৎসক

আগের সংবাদ

বাস্তবায়নযোগ্য না কল্পনাবিলাসী!

পরের সংবাদ

কথিত আইএস বার্তা, অতঃপর…

প্রকাশিত হয়েছে: মে ১৪, ২০১৯ , ৭:৪৪ অপরাহ্ণ | আপডেট: মে ১৫, ২০১৯, ১২:৪৮ অপরাহ্ণ

কবীর চৌধুরী তন্ময়

সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ফোরাম (বোয়াফ)।

আলকায়েদা, আইএস হলো সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের আইডিওলজি। যে কেউ, যে কারো পৃষ্ঠপোষক পেয়ে আলকায়েদা বা আইএসের নাম ব্যবহার করে সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ডে পরিচালনা করতে পারে। কারণ এই নামগুলোর সঙ্গে তাদের নিজস্ব আদর্শ ও আন্তর্জাতিক শক্তিমত্তার বিষয়টিও স্পষ্ট করে তোলা। এখানে কোনো রাজনৈতিক দল বা গ্রুপ জড়িত কিংবা আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র আছে কিনা- এটির চেয়ে এই ধরনের ব্যক্তি ও কর্মকাণ্ডকে প্রতিহত, প্রতিরোধ করার বিষয়টিকে আগে গুরুত্ব দিতে হবে।

শ্রীলঙ্কায় আত্মঘাতী সিরিজ বোমা হামলার পর শুধু বাংলাদেশই নয়, বিশ্ব এখন উদ্বিগ্ন। কে, কখন, কোথায় কীভাবে এই বর্বরতার শিকার হবে- এই ধরনের আশঙ্কা বিশ্বের সরকার-রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে সঙ্গে দেশের সচেতন জনগণের মাঝেও বিরাজ করছে। কারণ সংঘটিত অপরাধ থেকে অন্য অপরাধীরা উদ্বুদ্ধ হয়ে পরবর্তী হামলার জন্য নিজেরা অস্থির হয়ে পড়ে। অপরের কার্যক্রম নিয়ে নিজেদের মাঝেও এক ধরনের হতাশা কাজ করে। আর সেখান থেকেই নিজেদের অবস্থান জানান দিতে, শক্তিমত্তা বোঝাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে থাকে। সেটা ব্যক্তি অপরাধ থেকে গ্রুপ কিংবা সাংগঠনিকভাবে পরিচালিত অপরাধ সংঘটিত করতে মরিয়া হয়ে ওঠে।
নিউজিল্যান্ডের বর্বরতার ঠিক পঁয়ত্রিশ দিনের মাথায় শ্রীলঙ্কায় হামলা। এটি কোনো একক ব্যক্তির সংঘটিত অপরাধ নয়, নয় কোনো ছোটখাটো হামলা। তৃতীয় বিশ্বের নেতাদের রীতিমতো নতুন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। ২১ এপ্রিল শ্রীলঙ্কায় গির্জায় এবং আবাসিক হোটেলে ধারাবাহিক আত্মঘাতী বোমা হামলা ঘটিয়ে সাড়ে তিনশরও বেশি শিশু-কিশোর থেকে নারী-পুরুষকে হত্যা করেছে। আহত করে পাঁচশরও বেশি মানুষজন।
আমি মনে করি, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সরকার পরিচালিত রাষ্ট্রযন্ত্রগুলোর অদক্ষতা, দুর্বলতা আর সরকারের মাঝে সমন্বয়হীনতার সুযোগ বুঝেই আদর্শভিত্তিক জঙ্গি সংগঠনগুলো এই ধরনের সমন্বিত হামলা সংঘটিত করে থাকে, যা শ্রীলঙ্কার সরকারের মাঝে প্রতীয়মান। কিন্তু নিউজিল্যান্ডের কাছে সময় ছিল একেবারেই কম। অস্ট্রেলিয়ান সন্ত্রাসী ব্রেন্টন ট্যারেন্ট ক্রাইস্টচার্চে হামলার ঠিক ৯ মিনিট আগে নিউজিল্যান্ডের সরকারপ্রধান জেসিন্ডা বরাবর মেইল পাঠিয়ে হামলার ব্যাপারে আগাম বার্তা দিয়েছিল। সরকারপ্রধানের দপ্তর দ্রুততার সঙ্গে তার সরকারের পুলিশপ্রধানের কাছে পাঠানোর পর কোথায় থেকে মেইল এসেছে, সম্ভাব্য হামলা কোথায় হতে পারে, কে বা কারা পাঠাতে পারে- এ নিয়ে বিস্তারিত জানতে জানতেই ব্রেন্টন ট্যারেন্ট ক্রাইস্টচার্চে হামলা করে।
অন্যদিকে বিদেশি একটি গোয়েন্দা সংস্থা থেকে শ্রীলঙ্কায় কোথায় এবং কারা হামলা করতে পারে- এটি দীর্ঘ ১১ দিন আগে শ্রীলঙ্কান সরকারকে জানানোর পরও তারা কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। কারণ শ্রীলঙ্কার সরকারে অভ্যন্তরীণ কোন্দল বিরাজমান ছিল, ছিল সরকার পরিচালিত রাষ্ট্রযন্ত্রগুলোর সমন্বয়হীনতা।
আমাদের বাংলাদেশও এই বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার পরিচালিত রাষ্ট্রযন্ত্রগুলো তখন কতটা প্রশ্নবিদ্ধ ছিল- এটি এ দেশের জনগণের মনে থাকার কথা। আর সেটি প্রমাণিত হয় ২১ আগস্ট গ্রেনেড ছোড়ার গল্প যখন জজ মিয়ার নাটক তৈরি করে। তখন সাংবিধানিক দায়িত্ব অবহেলা করে ব্যক্তি বিশেষকে খুশি করতে রাষ্ট্রযন্ত্রের ছোট কর্মকর্তা থেকে বড় কর্মকর্তাও ছিল বিতর্কিত ও অদক্ষ।
যেমন, ব্লগার ও গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় নিলয় ফেসবুকে ও মুঠোফোনে বারবার হত্যার হুমকি পেয়ে খিলগাঁওয়ের পরে শাহজাহানপুর থানায় নিরাপত্তা চেয়ে সাধারণ ডায়েরি করতে গেলেও সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন না করে বরং নীলয়কে দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। দুই থানার কোনো ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাই তখন হত্যার হুমকির ব্যাপারটি গুরুত্ব দেয়নি। বরং নিজেদের দায়িত্বে অবহেলা আর অক্ষমতার পাশাপাশি রাষ্ট্রযন্ত্র পুলিশ বাহিনীকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। যার কিছুদিন পর ২০১৫ সালের ৭ আগস্ট এক শুক্রবার খিলগাঁওয়ের বাসায় ঢুকে দিনদুপুরে কতিপয় সন্ত্রাসী পিস্তল ও রামদা নিয়ে নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায়কে কুপিয়ে হত্যা করে। আরো ভয়াবহ ফেনীর সোনাগাজী মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির ঘটনা। নুসরাতের ঘটনায় ইতোমধ্যেই সোনাগাজী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে বহিষ্কার করলেও সপদে আছেন এসপি। এসপি সুকৌশলে ওসিকে বাঁচানোর সব রকমের চেষ্টা করেছে, যার প্রমাণ পুলিশ সদর দপ্তরে ওসির পক্ষে পাঠানো সেই চিঠি ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ। আর পুলিশ সদর দপ্তর গঠিত তদন্ত কমিটি ৩০ এপ্রিল জমা দেয়া তাদের তদন্ত প্রতিবেদনেও ফেনীর পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর আলম সরকার ও সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনসহ চার পুলিশ কর্মকর্তার গাফিলতি পাওয়া গেছে বলেও উল্লেখ করেন।
এখানে এসব বলছি এ কারণে, সরকার ও সরকার পরিচালিত রাষ্ট্রযন্ত্রগুলো শক্তিশালী ও দক্ষ হলে যে কোনো অপরাধ, এবার সেটা ব্যক্তি পর্যায় হোক আর গ্রুপ কিংবা সমন্বিত চেষ্টায় হোক, এটাকে প্রতিহত করা সহজ ও সম্ভব। আমাদের মনে রাখতে হবে, আইএস একটি নাম, একটি আদর্শ। আর এই আদর্শ যে কেউ ধারণ করতে পারে। তাকে সিরিয়া থেকেই আসতে হবে- এমন তো কথা নেই। তাকে আইএসের ঘরেই জন্ম নিতে হবে; ব্যাপারটি এমনো নয়।
‘শিগগিরই আসছি, ইনশাআল্লাহ…’ কথিত আইএস বার্তার পরপরই জেএমবির সক্রিয় একটি গ্রুপ নাশকতা করতে পারে- এমন খবর পেয়ে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বসিলায় জঙ্গিদের টিনশেড আস্তানায় অভিযান চালায় র‌্যাব। সেখানে অবস্থানরত জঙ্গিরা র‌্যাবকে লক্ষ্য করে গুলি করাসহ একটা সময় বিস্ফোরণও ঘটায়। আবার ঢাকার গুলিস্তানের ডন প্লাজার সামনের রাস্তায় দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যদের ওপর ককটেল ছুড়ে মারার ঘটনাটিও কথিত আইএস দায় স্বীকার করেছে। আরেকটি ঘটনা হচ্ছে হাফেজ মাওলানা কামরুজ্জামান নামক এক ব্যক্তি নিজেকে জেএমবির কর্মী পরিচয় দিয়ে বায়তুল মোকাররম মসজিদ ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনে বোমা হামলার হুমকি দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছে।
১৯৯৯ সালে উদীচীর হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া বোমা হামলার সর্বশেষ গুলিস্তানের হামলার বিষয়াদি নিয়ে পর্যবেক্ষণ করলে, কথিত আইএস ‘কথিত’ই থেকে যায় বরং দেশীয় জঙ্গি ও কতিপয় রাজনৈতিক দলের পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া ব্যক্তি, গ্রুপ এবং সরাসরি রাজনৈতিক সংগঠনের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। আর তারা নিউজিল্যান্ড, শ্রীলঙ্কায় হামলায় উদ্বুদ্ধ হবে, উত্তেজিত কর্মকাণ্ড করবে এবং সমন্বিত হামলা করারও চেষ্টা করবে- এটা আমাদের মাথায় রাখতেই হবে।
বাংলাদেশে কমপক্ষে অর্ধশত উগ্রবাদ ও জঙ্গি সংশ্লিষ্ট সংগঠনের কার্যক্রম চলছে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও স্বীকার করেছে, যার মধ্যে মাত্র ৬টি নিষিদ্ধ। অন্যদিকে সক্রিয় কার্যক্রম চালাচ্ছে কমপক্ষে ২০টি সংগঠন। আবার যে ৬টি সংগঠনকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে তাদের কর্মকাণ্ডও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বা বন্ধ করা যায়নি। র‌্যাব এই পর্যন্ত ১৬টি সংগঠনের ১ হাজার ১৮১ জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করেছে। আর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগও ১৪টি সংগঠনের এক হাজারেরও বেশি জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে, যাদের মধ্যে আবার নিষিদ্ধ ৬টি সংগঠনের জঙ্গিও রয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে অনেকেই জামিনে বেরিয়ে এসে আবার একইভাবে জঙ্গি সংগঠনগুলোতে জড়িয়ে পড়েছে।
আর্থসামাজিক অবক্ষয়, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সরকার পরিচালিত রাষ্ট্রযন্ত্রগুলোর অদক্ষতা, দুর্বলতার কারণে মানুষের রাগ, ক্ষোভ আর ঘৃণার জন্ম হয়। ব্যক্তি থেকে গ্রুপ হয়েও মানুষ প্রতিশোধের নেশায় মত্ত হয়। তখন সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়তেও দ্বিধাগ্রস্ত হয় না। অনেক সময় নিজে না পারলে, তখন অন্যদের পৃষ্ঠপোষক করে থাকে। আর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাতের মাধ্যমে বাংলাদেশে শুধু সামাজিক অবক্ষয়ই ফুটে ওঠেনি বরং রাষ্ট্রযন্ত্র পুলিশ বাহিনীর কতিপয় কর্মকর্তার সাংবিধানিক দায়িত্ব অবহেলা, অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়াসহ দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ার অবস্থানও আমাদের সামনে উঠে এসেছে।
আলকায়েদা, আইএস হলো সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের আইডিওলজি। যে কেউ, যে কারো পৃষ্ঠপোষক পেয়ে আলকায়েদা বা আইএসের নাম ব্যবহার করে সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদী কর্মকা- পরিচালনা করতে পারে। কারণ এই নামগুলোর সঙ্গে তাদের নিজস্ব আদর্শ ও আন্তর্জাতিক শক্তিমত্তার বিষয়টিও স্পষ্ট করে তোলা। এখানে কোনো রাজনৈতিক দল বা গ্রুপ জড়িত কিংবা আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র আছে কিনা- এটির চেয়ে এই ধরনের ব্যক্তি ও কর্মকাণ্ডকে প্রতিহত, প্রতিরোধ করার বিষয়টিকে আগে গুরুত্ব দিতে হবে। ‘কথিত’ বলে উড়িয়ে দেয়ার চেয়ে সরকার পরিচালিত রাষ্ট্রযন্ত্রকে কথিত আইসএস বার্তার পক্ষে-বিপক্ষে বিচার-বিশ্লেষণ করে দ্রুততার সঙ্গে ব্যবস্থা নিতে হবে।

কবীর চৌধুরী তন্ময় : সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ফোরাম (বোয়াফ)।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা