দেশজুড়ে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটে পাটকল শ্রমিকরা

আগের সংবাদ

ব্যথার রোগীদের রমজান প্রস্তুতি

পরের সংবাদ

রোজা রেখেই সুস্থ থাকুন

প্রকাশিত হয়েছে: মে ১৩, ২০১৯ , ৪:৪৭ অপরাহ্ণ | আপডেট: মে ১৩, ২০১৯, ৪:৪৭ অপরাহ্ণ

Avatar

শবনম মোস্তফা :

নিউট্রিশন কন্সালটেন্ট

চলছে সংযম ও আত্মত্যাগের মাস-মাহে রমজান। রোজা শুধু আত্মার শুদ্ধতা নয়, শরীর থেকে বিষাক্ত বা অস্বাস্থ্যকর পদার্থ দূর করার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। রোজা শরীরের চমৎকার ডিটক্স হিসেবে কাজ করে। সুস্থ জীবনযাপনের জন্য শরীর থেকে টক্সিন বা বিষাক্ত পদার্থ দূর হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। সারাদিন না খেয়ে থাকার মাধ্যমে আপনার শরীর রমজানজুড়ে আপনার ডাইজেস্টিভ সিস্টেমকে ডিটক্সিফাই করার বিরল সুযোগ পায়। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে, অসুস্থ যারা কিংবা নিয়মিত ওষুধ খেতে হয় যাদের তারা কী এই বিরল সুযোগ হতে বঞ্চিত? এ নিয়েই আমাদের আজকের আলোচনা।

ডায়াবেটিক রোগীর রোজা
অনেকের ধারণা, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগী রোজা রাখতে পারবেন না। এটি একটি ভুল ধারণা। ডায়াবেটিস রোগীর ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকলে রোজা রাখতে কোনো সমস্যা নেই। যাদের ডায়াবেটিস শুধু ব্যায়াম ও খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন দ্বারাই নিয়ন্ত্রণে আছে, তারা অনায়াসেই রোজা রাখতে পারেন। বরং যারা ডায়াবেটিসের সমস্যায় ভুগছেন তাঁরা রোজার মাসে খুব সহজেই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। মানতে হবে কিছু বিষয়-
# সেহরির খাবার সেহরির শেষ সময়ের অল্প কিছুক্ষণ আগে খাওয়া।
# সেহরির খাবার মেন্যতে জটিল শর্করা জাতীয় খাবার যেমন- ভাত, রুটি,শাক-সবজি, আঁশ জাতীয় তরকারি এবং মাছ-মাংস জাতীয় খাবার রাখতে হবে।
# ইফতারের সময় অধিক পরিমাণে মিষ্টি জাতীয় খাবার গ্রহণ না করা।
# রাতের খাবার একেবারে বাদ দেয়া উচিত নয়। অল্প করে হলেও খেতে হবে।
# ডায়াবেটিক রোগীদের পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি ও পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে যেন তারা পানিশূন্যতায় না ভোগেন। প্রচুর পরিমাণে চিনি ছাড়া পানীয় খাবেন।
# ডায়াবেটিসের সঙ্গে অন্য কোনো জটিলতা, যেমন কিডনির রোগ, উচ্চমাত্রার ইউরিক এসিড থাকলে ডালের তৈরি খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।

উচ্চ রক্তচাপ ও রমজান
পরিমিত ও সুষম খাবারদাবারের মাধ্যমে সুন্দরভাবে উচ্চ রক্তচাপ আক্রান্ত ব্যক্তিগণ রোজা রাখতে পারেন। এর পাশাপাশি অত্যাবশ্যকীয় বিষয় হল নিয়মিত ও নিয়মমাফিকভাবে রক্তচাপ মাপা ও নিয়ন্ত্রণে রাখা। সেক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে

# রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে পটাশিয়ামের ভ‚মিকা অনেক। আর খেজুর বা খুরমাতে উচ্চমাত্রায় পটাশিয়াম সঙ্গে ম্যাগনেসিয়াম এবং ভিটামিন বি রয়েছে। এ ছাড়া ডাবের পানিতেও প্রচুর পরিমাণে পটাশিয়াম থাকে। তাই ইফতারে এগুলির পাশাপাশি কলা, আম, বেল ইত্যাদি খেতে হবে।
# তেলে বা ডালডায় ভাজা খাবার রক্তচাপ বাড়াতে পারে। তাই ভাজাপোড়া খাবার এড়িয়ে চলতে হবে।
# অতিরিক্ত লবণ, টেস্টং সল্ট কিংবা বিট লবণ-যুক্ত খাবার এড়াতে হবে। সয়া সস, ওয়েস্টার সস, আঁচার ইত্যাদি খাবারে প্রচুর লবণ থাকে। তাই এ ধরনের খাবার এড়াতে হবে।
# এর পাশাপাশি কোমল পানীয় পরিহার করতে হবে। লেবুর শরবত, কাচা আমের জুস বা ঘরে বানানো হালকা চিনিযুক্ত যে কোনো ফলের রস খাওয়া যেতে পারে।

জেনে রাখুন আরো কিছু বিষয়
# নিয়মিত হাল্কা ব্যায়াম এর মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশনে আক্রান্ত ব্যক্তি উপকার পাবেন।
# স্ট্রেস বা মানসিক চাপ উচ্চ রক্তচাপের জন্য একটি বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। শুধু উচ্চ রক্তচাপধারী ব্যক্তি-ই নয় সাধারণ ও সুস্থ যে কারোরই মানসিক চাপ মুক্ত থাকা বাঞ্ছনীয়।
# পরিমিত ঘুমের অভাবে রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই, তারাবির নামাজ শেষ করে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়া উচিত।
# সারাদিন না খেয়ে থাকার পর ইফতার শেষে ধূমপানের অভ্যাস উচ্চ রক্তচাপ রোগীদের জন্য খুবই ক্ষতিকর।
# সঠিক খাবারের পাশাপাশি রোজার সময় সঠিক সময়ে ওষুধ খাওয়া জরুরি।
হৃদরোগ ও রমজান
সাধারণত এ ধরনের ব্যক্তির ক্ষেত্রে রোজা রাখার বিধিনিষেধ নেই। তবে যেসব রোগীর ‘অ্যাকিউট মায়োকার্ডিয়াল ইনফারকশন’ হয়েছে কিংবা অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছেন তাদের অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাতের কার্ডিওলজিস্টের একটি দল আবিষ্কার করেছেন যে, যেসব লোক রোজা রেখেছে তাদের লিপিড প্রোফাইলের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে, যার মানে হচ্ছে রক্তে কোলেস্টেরল হ্রাস পেয়েছিল। নিম্ন কোলেস্টেরল কার্ডিওভাস্কুলার স্বাস্থ্য বৃদ্ধি করে এবং হৃদরোগ, হার্ট অ্যাটাক অথবা স্ট্রোকের ঝুঁকি হ্রাস করে। তবে খেয়াল রাখতে হবে কিছু সাধারণ বিষয়ে
# যাদের কোলেস্টেরল বেশি, রোজার সময় ভাজা-পোড়া খাবার থেকে তাদের সতর্ক থাকা উচিত। এমনিতে গবেষণায় দেখা গেছে, রোজাদার যদি বিবেচক আহারী হয়, তবে তার ওজন কমবে এবং ভালো কোলেস্টেরল বা এইচডিএল বাড়বে।
# ইফতার ও রাতের খাবারে প্রচুর পরিমাণে আঁশ যুক্ত খাবার রাখুন।
# ফাস্টফুড, বিরিয়ানি কিংবা যে কোনো ধরনের ফ্যাটযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। তার বদলে সেদ্ধ, ঝলসানো কিংবা বেক করা খাবার খাওয়ার অভ্যাস করুন।

রমজানে অন্যান্য শারীরিক সমস্যা
# বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যাদের পেপটিক আলসার, পাকস্থলীর প্রদাহজনিত রোগ, ক্ষুধামন্দা ইত্যাদি আছে তারা রোজার মাধ্যমে উপকৃত হন। রোজা রাখার কারণে পাকস্থলীতে এসিড কম তৈরি হয়। তবে অতিরিক্ত ভাজা-পোড়া খাবার গ্রহণে অতিরিক্ত এসিড তৈরি হতে পারে যার কারণে বুক জ্বালা-পোড়া হতে পারে। এক্ষেত্রে ভাজা-পোড়া ও তৈলাক্ত খাবার পরিহার করবেন এবং চা-কফি ও ধূমপান করবেন না।
# রোজার সময় বিভিন্ন কারণে মাথাব্যথা হতে পারে। যেমন পানিস্বল্পতা, ক্ষুধা, কম বিশ্রাম, চা-কফি না খাওয়া। এগুলো সমাধানে প্রচুর পরিমাণে ঘরে তৈরি ফলের রস খাওয়া যেতে পারে। প্রয়োজনে পুষ্টি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
# ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত রোগীর জন্য রোজা রাখার ব্যাপারে কোনো বাধা তো নেই-ই, বরং রোজা তার লিভারের ফ্যাট কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখতে পারে।

সবাইকে তার নিজের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রয়োজন হলে নিউট্রিশনিস্টের সঙ্গে যোগাযোগ করে খাবার তালিকা ঠিক করে নিতে হবে। লক্ষ্য রাখতে হবে ওষুধের সঙ্গে খাবারের যেন সামঞ্জস্য থাকে।

 

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা