এই মৃত্যুকূপে যাত্রা আর নয়

আগের সংবাদ

জামায়াত বিচ্ছিন্ন নয়া সংগঠনের চরিত্রবিচার জরুরি

পরের সংবাদ

সপ্তাহের সাতকাহন

প্রকাশিত হয়েছে: মে ১২, ২০১৯ , ১০:০৯ অপরাহ্ণ | আপডেট: মে ১২, ২০১৯, ১০:০৯ অপরাহ্ণ

আহমেদ আমিনুল ইসলাম

অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

শিশুখাদ্যসহ সব ধরনের খাদ্যপণ্যে ভেজালকারীদের আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানাই। কেবল রমজান কিংবা বিভিন্ন সময়ে ‘মৌসুমি অভিযান’ পরিচালনা ও জরিমানা আদায়ের মধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত সীমিত রাখলে চলবে না। এর একটি স্থায়ী ও কাঠামোগত রূপদান অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছে। আমরা বিশ্বাস করি, একটি জাতিকে পঙ্গুত্বের কবল থেকে রক্ষার জন্য বর্তমান সরকারই ভেজালমুক্ত ও খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণে সক্ষম ও সমর্থ।

ফণা থেকে ফণী। তাই ফণী শব্দটির মধ্যেই এক ধরনের আতঙ্ক বিদ্যমান। ফণী আসছে। তারই পূর্বাভাস জানাতে আবহাওয়া দপ্তরের মুহুর্মুহু হুঁশিয়ারি সংকেত চলছিল গণমাধ্যমে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রধান সংবাদই শুধু নয়- বিশেষ সংবাদে পরিণত হয়েছিল ফণী। শুরু হয়েছিল এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ থেকে। তবে প্রথম প্রথম সে সতর্ক সংকেতে তেমন একটা আতঙ্ক ছিল না। পরে আস্তে আস্তে ফণীর আকার, আয়তন ও শক্তি সম্পর্কে যতটা জানা যাচ্ছিল ততটাই ভীতিকর এক সংবাদে পরিণত হয়ে উঠেছিল। শুধু বাংলাদেশ নয়- ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ, ওড়িশা, পুরী, পশ্চিমবঙ্গ সব অঞ্চলের মানুষের মধ্যেই এই ভীতির সঞ্চার ঘটেছিল। এপ্রিল মাসটির দিন যত ফুরিয়েছে আমাদের মনের ভেতর দ্বিগুণ কিংবা আরো বেশি পরিমাণে পাল্লা দিয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছিল শঙ্কা-আশঙ্কা ও আতঙ্ক। ফণীর আঘাত হানা ও একেবারে দুর্বল না হওয়া পর্যন্ত আমাদের মনের ভেতর থেকে শঙ্কার অপনোদন ঘটেনি। শঙ্কা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের প্রস্তুতি গ্রহণও হয়েছিল মোটামুটি সন্তোষজনক। ফলে অনুময়ে আশঙ্কার চেয়ে আমাদের জীবনে ফণীর আঘাত ততটা তীব্র হয়নি। তারপরও কিছু দুর্ঘটনা ঘটেছে- কিছু প্রাণহানি ঘটেছে। এসব না ঘটলেই আমাদের জন্য স্বস্তিদায়ক হতো। যাই হোক ফণীর সম্ভাব্য আঘাতের আতঙ্কে আমাদের জীবনে গত সপ্তাহটি ছিল আতঙ্কে উদ্বেল। অন্যদিকে আবহাওয়া দপ্তরের ঘোষণা মতো ফণী তার স্বরূপে আবির্ভূত হয়নি বলে অনেকের মধ্যে এক ধরনের ঠাট্টা-তামাশার অবতারণাও দেখেছি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এর প্রকোপ অনেকটাই যেন মাত্রাহীন, লাগামছাড়া।
ফণীর আগমনের শঙ্কা ও আশঙ্কার মধ্যে জাতীয় রাজনীতির ময়দানেও ঘটে গেল এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে বিজয়ী প্রার্থীদের পাঁচজন অবশেষে সংসদীয় আসন রক্ষার একেবারে সবশেষ দিনে শপথ গ্রহণ করলেন। এ নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা আছে। রাজনীতির পরিভাষায় এই সুযোগে আমরা একটি নতুন শব্দ-জুটি লাভ করলাম- তা হলো ‘শপথ নাটক’। নাটকই বটে! সবাই শপথ নিলেন কিন্তু শুধু বাকি থাকলেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এটি নাকি রাজনৈতিক কৌশল! উপরন্তু দলটির মহাসচিব সম্প্রতি এক আত্মোপলব্ধিতে পৌঁছাতে সমর্থ হয়েছেন। এবং সেই আত্মোপলব্ধির ফলেই বুঝতে পেরেছেন যে, ‘বিএনপি এত দিন ভুল করেছে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’ বহুল কথিত উপরোক্ত শপথ নাটকে এ দেশের মানুষের কিংবা গণতন্ত্রের কতটুকু মর্যাদা রক্ষা হয়েছে তা জানা সহজ নয়। তবে একথা সত্যি, রাজনীতির অভিধান নতুন একটি শব্দবন্ধের জন্য সমৃদ্ধ হয়েছে সন্দেহ নেই। এই শপথ গ্রহণকে উপলক্ষ করে আবার ২০ দলীয় জোটে ভাঙনের সুরও কিছুটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। শপথ নাটক মঞ্চায়নে জোটকে অবজ্ঞা করায় আত্মসম্মানে আঘাত পেয়েছেন জাতীয় পার্টি (মঞ্জুর) প্রধান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ। ২০ দলীয় জোটকে উপেক্ষা করে ঐক্যফ্রন্ট থেকে নির্বাচিত দুই এবং বিএনপির পাঁচ সংসদ সদস্য হঠাৎ শপথ গ্রহণ করায় পার্থের এই অভিমান শেষ পর্যন্ত ২০ দলীয় জোটে কতটা প্রভাব ফেলবে তা সময়ই কেবল বলতে পারে আর কেউ নয়। একদিকে গণফোরাম যেমন নতুন কমিটি গঠনের মাধ্যমে চাঙা হয়ে ওঠার প্রত্যয় গ্রহণ করেছে, অপরদিকে এরশাদ নিয়ন্ত্রিত জাতীয় পার্টিতেও আবার পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। পার্টিপ্রধান এইচ এম এরশাদ হঠাৎ করেই প্রায় এক গভীর রাতে সংবাদ সম্মেলন করে জি এম কাদেরের ওপর ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব দিয়েছেন। এরশাদের শারীরিক অসুস্থতার কারণে এই পরিবর্তন স্বাভাবিক মনে হলেও এরশাদের ‘মতিগতি’ নিয়ে জনমনে ব্যাপক সন্দেহ ও শঙ্কা আছে। শঙ্কা আছে জাতীয় পার্টির সব নেতাকর্মীর মধ্যেও। সবচেয়ে বেশি শঙ্কা বোধকরি জি এম কাদেরেরই। কারণ এ রকম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত তিনি একাধিকবার গ্রহণ করেছেন। আবার সেই সিদ্ধান্ত পাল্টাতে সময়ও লাগেনি খুব বেশি। ফণী আতঙ্ক, শপথ নাটক, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্যেই আমরা দেখি দেশের তিন বিশিষ্ট নাগরিককে হত্যার হুমকি প্রদান। এ নিয়েও সমাজে এক ধরনের অস্বস্তি আছে।
বিএনপির সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ সম্পন্ন হলো। ঘূর্ণিঝড় ফণী ব্যর্থ হলো। কিন্তু আলোচনার টেবিলে এখনো শপথ নাটক, এখনো গোপন হত্যার হুমকি, এখনো ফণী। ফণী যে যে আবার একেবারে ‘বিষহীন ফণী’ ছিল তাও কিন্তু নয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে ফণীর আঘাতে ক্ষয়-ক্ষতি একেবারে যে কম হয়েছে তাও নয়। বিভিন্ন স্থানের বাঁধ ভেঙে পাকা ফসলের মাঠে ঢুকেছে পানি। কয়েক হাজার হেক্টর জমির পাকা ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। নোয়াখালীর বিভিন্ন স্থানে ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হওয়ার সংখ্যাও কম নয়। এখন সরকার এবং আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় চলছে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ ও সে অনুযায়ী সাহায্যের তৎপরতা। এই তৎপরতায় আন্তরিকতা থাকবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
এসব কিছুর মধ্য দিয়ে আমাদের কয়েক লাখ সন্তান তাদের জীবনের প্রথম পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল পেল। এ মাসেরই ৬ তারিখে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল পেয়ে তারা উল্লসিত। আমরাও আনন্দিত। বিগত বছরের চেয়ে এ বছরের ফলাফল শতকরা হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও ব্যক্তিগত সাফল্যের ক্ষেত্রে জিপিএ ফাইভ প্রাপ্তির হার কিছুটা কমেছে; তবু মোটের ওপর ফলাফল সন্তোষজনক। সব বোর্ড মিলিয়ে ৮২.২০ শতাংশ শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নিজের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করার পাশাপাশি বাবা-মা, শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মুখও উজ্জ্বল করেছে। আমরা উত্তীর্ণ সব সফল শিক্ষার্থীকে অভিনন্দন জানাই। আর অকৃতকার্যদের প্রতি পরামর্শ থাকবে হতাশার বদলে মনোযোগী হয়ে আগামী বছরের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের। মনোযোগ দিয়ে পাঠ বুঝে মুখস্থ করে নিলে সাফল্যের জয়টীকা অর্জন অসম্ভব নয়। মনে রাখতে হবে, এসএসসির এই বৈতরণী পার হতে পারলেই জীবনের বৃহত্তর অভিযাত্রার পথ উন্মুক্ত হবে। ‘অসম্ভব বলে কিছু নেই’- এরূপ বাণী চিরন্তনী পড়ার টেবিলে রাখলেই নিজের ভেতরকার মনোবল বৃদ্ধি পাবে। সেই মনোবলই তোমাদের সফল ব্যক্তিত্বে পরিণত করে তুলবে। আবার সফল শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলতে চাই- আত্মতুষ্টিতে ভোগার অবকাশ কম। এসএসসির পর এইচএসসির পাঠক্রমের পরিমাণ বহুগুণে বেশি। সুতরাং জিপিএ ফাইভ বা ভালোভাবে পাস করেছ বলেই কিন্তু গা-ভাসিয়ে চলা যাবে না। যেহেতু এইচএসসির সিলেবাস অনেক ব্যাপক, সেহেতু সফল শিক্ষার্থীদের সময় নষ্ট করার অবকাশ নেই।
এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের আনন্দঘন পরিবেশের মধ্যে শুরু হলো মাহে রমজান। রমজান শুরুর দুই মাস আগে থেকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সিটি করপোরেশনের মেয়রসহ সংশ্লিষ্ট সবাই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি হবে না বলে যে বার্তা দিয়েছিলেন তা রমজানের দিন থেকেই চূড়ান্ত রকমের অকার্যকর মনে হচ্ছে। এমনকি কোথাও কোথাও দ্রব্যমূল্যের তালিকা পর্যন্ত গায়েব হয়ে গেছে বলে গণমাধ্যমের সূত্রে জানা যায়। ব্যবসায়ীদের এহেন কারসাজি দেখে রমজানকে কৃচ্ছ্র সাধনের মাস বলা বড়ই কঠিন হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি খাদ্যসহ সব নিত্যপণ্যে ভেজাল কিংবা মেয়াদোত্তীর্ণ খাবারের যে সচিত্র খবর আমাদের সামনে আসছে তাতে স্বস্তিতে থাকা যায় না। মেয়াদোত্তীর্ণ বিভিন্ন ধরনের খাবার কিংবা ফলমূল বিশেষত রমজান মাসে খেজুরের প্রতি মানুষের যে আলাদা এক চাহিদা থাকে এবং সেই খেজুর সংক্রান্ত যেসব তথ্য আমরা র‌্যাবের অভিযানের ফলে দেখছি, তাতে স্বস্তির বদলে অস্বস্তিই বেশি বাড়ে। এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে রাজধানীর নামিদামি সুপার শপগুলোও যখন সম্পৃক্ত হয়ে যায় তখন নাগরিক হিসেবে আমরা যে কতটা অসহায় বোধ করি তা ভাষায় প্রকাশ সম্ভব নয়। সম্প্রতি নগরের বিভিন্ন স্থানে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ বিষয়ক ব্যানার টানানো দেখতে পাই। সেসব ব্যানারে প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার ছবিও মুদ্রিত। আন্দাজ করি, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ দিবস বলে কিছু আছে নিশ্চয়ই- এসব ব্যানার তারই সাক্ষ্য বহন করছে। এসব ব্যানারে ভেজালমুক্ত মানসম্মত খাদ্যের ওপর জোর দেয়া বিভিন্ন সাধু বাক্য রচিত আছে। কার্যত সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমরা ভেজালমুক্ত এবং মানসম্মত খাদ্যের নিশ্চয়তা সরকারের কাছে প্রত্যাশা করি। শিশুখাদ্যসহ সব ধরনের খাদ্যপণ্যে ভেজালকারীদের আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানাই। কেবল রমজান কিংবা বিভিন্ন সময়ে ‘মৌসুমি অভিযান’ পরিচালনা ও জরিমানা আদায়ের মধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত সীমিত রাখলে চলবে না। এর একটি স্থায়ী ও কাঠামোগত রূপদান অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছে। আমরা বিশ্বাস করি, একটি জাতিকে পঙ্গুত্বের কবল থেকে রক্ষার জন্য বর্তমান সরকারই ভেজালমুক্ত ও খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণে সক্ষম ও সমর্থ। নির্ভেজাল খাদ্যপণ্যের জন্য আমরা প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

আহমেদ আমিনুল ইসলাম : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।