৫২টি ভেজাল পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ

আগের সংবাদ

স্বাদে অনন্য শাহী জিলাপি

পরের সংবাদ

‘আমার গ্রাম, আমার শহর’ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন

যাবতীয় নাগরিক সুবিধা পৌঁছে দেয়া হচ্ছে গ্রামে

প্রকাশিত হয়েছে: মে ১২, ২০১৯ , ৩:২২ অপরাহ্ণ | আপডেট: মে ১২, ২০১৯, ৩:২২ অপরাহ্ণ

Avatar

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল ‘আমার গ্রাম, আমার শহর’ অর্থাৎ প্রতিটি গ্রামে আধুনিক নগর সুবিধা সম্প্রসারণ। টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। এ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে হ্যাটট্টিক করেন দলটির সভাপতি শেখ হাসিনা। ৭ জানুয়ারি থেকে আগামী ৫ বছরের জন্য সরকার প্রধানের দায়িত্ব পালন করবেন তিনি। দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই নির্বাচনী প্রতিশ্রতি বাস্তবায়নে গ্রামকেন্দ্রিক কার্যক্রম শুরু করেন শেখ হাসিনা। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, গ্রামকে শহরে উন্নীত করার প্রক্রিয়া অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছে।
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর মতে, গ্রামগুলো অনেকটা শহর হয়েই গেছে। এমন কোনো গ্রাম নেই যেখানে উন্নত রাস্তা-ঘাট নেই। গ্রামের মানুষ গ্যাসের চুলায় রান্না করছে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে গৃহস্থালির কাজকর্ম করছে। কৃষি যন্ত্রপাতি আধুনিক হয়েছে। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে টেলিভিশন ও ইন্টারনেট চলে গেছে। যেটুকু বাকি আছে, আগামী ৫ বছরে তা বাস্তবায়ন করা হবে।
জানা গেছে, প্রতিটি গ্রামকে শহরে উন্নীত করার পরিকল্পনা আওয়ামী লীগের বহু পুরনো। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর যুদ্ধবিদ্ধস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন নগর ও গ্রামের বৈষম্য দূর করবেন। এজন্য কৃষি বিপ্লব, গ্রামে বিদ্যুতায়ন, কুটিরশিল্পসহ অন্যান্য শিল্পের বিকাশ এবং শিক্ষা, যোগাযোগব্যবস্থা ও জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন করে গ্রামাঞ্চলে আমূল পরিবর্তনের কথা বলেন তিনি। এজন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা নেবে বলেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সেই চিন্তা থেকেই এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রতিটি গ্রামকে শহরে উন্নীত করার উদ্যোগ নিয়েছেন তারই কন্যা শেখ হাসিনা।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে শেখ হাসিনা গ্রামকে কিভাবে শহরে রূপান্তর করা হবে, তার পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, উন্নত রাস্তা-ঘাট, যোগাযোগ, সুপেয় পানি, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা ও সুচিকিৎসা, মানসম্পন্ন শিক্ষা, উন্নত পয়ঃনিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানো, কম্পিউটার, দ্রুতগতির ইন্টারনেট সুবিধা, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও মানসম্পন্ন ভোগ্যপণ্যের বাজার সম্প্রসারণ করে প্রতিটি গ্রামকে আধুনিক শহরের সকল সুবিধা দেয়ার ব্যবস্থা আমরা নিয়েছি। গ্রামে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ আরো বাড়ানো ও নির্ভরযোগ্য করতে গ্রুপভিত্তিক বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট ও সৌরশক্তি প্যানেল বসানোর উৎসাহ এবং সহায়তা দেয়া হবে। গ্রামপর্যায়ে কৃষিযন্ত্র, সেবাকেন্দ্র, ওয়ার্কশপ স্থাপন করে যন্ত্রপাতি মেরামতসহ গ্রামীণ যান্ত্রিকায়ন সেবা সম্প্রসারণ করা হবে। এসবের মাধ্যমে গ্রামীণ যুবক ও কৃষি উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে উৎপাদনশীল কর্মসংসংস্থান করা হবে। অকৃষি খাতের এসব সেবার পাশাপাশি হাল্কা যন্ত্রপাতির তৈরি ও বাজারজাত করতে বেসরকারি খাতের প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ সুবিধাসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়ার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের মূল লক্ষ্য হলো প্রতিটি গ্রামে শিক্ষা, চিকিৎসাসহ সব ধরনের নাগরিক সুবিধা পৌঁছে দেয়া। আমরা সেটি করে যাচ্ছি।
দেখা গেছে, সরকারের এ পরিকল্পনা অনেক আগে থেকেই বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। বর্তমানে ৯০ ভাগের বেশি মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে। ২০২০ সালে শতভাগ বিদ্যুৎসেবা নিশ্চিত হবে। এখন গ্রামের রাস্তা-ঘাট আগের থেকে অনেক উন্নত হয়েছে। ১০ টাকায় কৃষকরা ব্যাংক একাউন্ট খোলার সুবিধা পাচ্ছেন। রাজধানীসহ বিভিন্ন বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা এখন বেশ ভালো। সড়ক-মহাসড়কে অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত বাস, নৌপথ ও আকাশপথে যোগাযোগ তুলনামূলক অনেক বেড়েছে। প্রতিটি গ্রামে নেটওয়ার্ক সুবিধা পৌঁছে গেছে। ১২ কোটির ওপরে জনগণ এখন মোবাইল ব্যবহার করছে। ভিডিওফোনে ছবি দেখাসহ কথা বলার সুবিধা, ডিজিটাল কৃষি সেবাসহ নানা ক্ষেত্রে মানুষের উন্নতি হয়েছে।
সরকারের এসব পরিকল্পনার বিষয়ে নৌপ্রতিমন্ত্রী বলেন, আমাদের এখন গুণগত শিক্ষার মান বাড়াতে হবে। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার মান ও পরিবেশ যাতে আরো ভালো হয় সেজন্য যা যা সহায়তা দেয়া দরকার, আমরা তা করছি।
গ্রাম শহরের এই দূরদৃষ্টি পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে সরকারের এই প্রতিমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য আছে। এ দলটি হঠাৎ ক্ষমতায় এসে দেশ পরিচালনা করছে, বিষয়টা তেমন নয়। অনেক আগে থেকেই পরিকল্পনা করা আছে, আমরা ক্ষমতায় গেলে কী কী করব। বঙ্গবন্ধু যেমন স্বাধীনতার প্রশ্নে অনেক আগেই পরিকল্পনা করে রেখেছেন। মানুষের স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার অধিকার প্রশ্নে কী কী করবেন, তিনি তা করছেন। দেশ স্বাধীন হতে কি কি করা দরকার, সেগুলোরও পরিকল্পনা তিনি করে গেছেন। কাজেই দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেলে আমরা কী কী করব, সেগুলো পূর্ব নির্ধারিত। প্রতি নির্বাচনে দলের ঘোষণাপত্র ও বাস্তবতার আলোকে ইশতেহার ঘোষণা করা হয়ে থাকে। এবারো সেটা হয়েছে। কাজেই কিভাবে বাস্তবায়ন হবে, তা ধারাবাহিকভাবে হচ্ছেই। নতুন করে পরিকল্পনা নেয়ার কিছু নেই। বঙ্গবন্ধু কন্যার নেতৃত্বেই দেশ উন্নত হচ্ছে।
এদিকে টেলিযোগাযোগ, ইন্টারনেট-ওয়াইফাইসহ বিভিন্ন ডিজিটাল সুযোগ-সুবিধাও এখন মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার কাজ করছে সরকার। অনেক গ্রামেই এই সুযোগ-সুবিধাগুলো মানুষ এখন ভোগ করছে। ক্রমান্বয়ে এই পরিবেশ সৃষ্টি করা হচ্ছে।
জাতীয় সংসদে দেশকে এগিয়ে নেয়ার প্রেক্ষাপট ও পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ সাল, এই ২১ বছর বাংলাদেশের জন্য দুঃসময় গেছে। বিশে^ দরিদ্র দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল। ছিল বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস, কঙ্কালসার মানুষের দেশ। ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে ওই ৫ বছর ছিল স্বর্ণযুগ। সে সময় পার্বত্য শান্তিচুক্তি, ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর, বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণ এবং খাদ্যে স্বয়ং-সম্পূর্ণতা অর্জন, কৃষকদের জন্য কল্যাণমূলক কর্মসূচি, দুঃস্থ-অসহায় মানুষের জন্য দুঃস্থভাতা, স্বামী পরিত্যক্তা ও বিধবা নারীর জন্য ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, বয়স্কদের জন্য শান্তি নিবাস, আশ্রয়নহীনদের জন্য আশ্রয়ন প্রকল্প ও একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পসহ নানা প্রকল্প চালু করি। ২০০৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০৮ সালে আমরা সরকার গঠন করি। এরপর ২০১৪ সালে দশম সংসদ নির্বাচনে আবারো ক্ষমতায় আসি। বিগত দুই মেয়াদে আমরা বহুমাত্রিক তৎপরতা- যেমন শিক্ষা সম্প্রসারণ, কৃষি ও অকৃষি খাতে দক্ষ জনবল সৃষ্টিতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা-প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো, স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ, গ্রামাঞ্চলে আর্থিক সেবা খাতের পরিধি বিস্তার, কৃষিপ্রযুক্তির সম্প্রসারণ, বিদ্যুতায়ন, গ্রামীণ অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রভৃতি গ্রামোন্নয়ন প্রয়াসকে ত্বরান্বিত করেছি। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধি গ্রামীণ অর্থনীতির এই বিকাশ প্রক্রিয়ায় সহায়ক হচ্ছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য এসেছে। কৃষিজ ও অকৃষিজ উভয়ক্ষেত্রে কর্মকাণ্ড বহুগুণ সম্প্রসারিত হয়েছে। বর্তমান সরকার কৃষিক্ষেত্রে অসামান্য গুরুত্ব দেয়ার পাশাপাশি অকৃষি খাত, যেমন- গ্রামীণ অবকাঠামো নির্মাণ, গ্রামীণ পরিবহন ও যোগাযোগ এবং গ্রামীণ ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের জন্য বিনিয়োগ বাড়িয়ে চলেছে। ফলে গ্রামীণ পরিবারের আয় ও কর্মসংস্থানে অকৃষি খাতের অবদান বেড়ে চলেছে।
আওয়ামী লীগের আরেক সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, গ্রাম থেকে মানুষ যেন শহরমুখী না হয়- শহরে যে সুযোগ-সবিধা পায়, গ্রামে বসেও যেন মানুষ সেটা পায়- সেই জন্যই গ্রামকে শহরে পরিণত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সরকার সেটি বাস্তবায়ন করবে। এতে কর্মসংস্থানের জন্য গ্রামের মানুষ আর ঢাকায় খুব একটা ভিড় করবে না। কারণ এখন জেলা পর্যায়ে অনেক কর্মস্থানের জন্য সরকার কাজ করছে। ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণ করা হচ্ছে। বেসরকারি খাতকে উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে, যাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বেশি বেশি করে হয়।