পাকিস্তানের লাহোরে বোমা বিস্ফোরণে নিহত ৮

আগের সংবাদ

পশ্চিমাঞ্চল রেলের যাত্রীরা মৃত্যু ঝুঁকিতে, সেবা ভেঙে পড়েছে

পরের সংবাদ

চবিতে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ

অনিয়মই যেন নিয়ম!

প্রকাশিত হয়েছে: মে ৮, ২০১৯ , ১:৩৮ অপরাহ্ণ | আপডেট: মে ৮, ২০১৯, ১:৩৮ অপরাহ্ণ

Avatar

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে চবি উপাচার্য ড. ইফতেখার উদ্দিন এবং তার কয়েকজন অনুসারীর বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও আঞ্চলিকতার অভিযোগ উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত, বিভিন্ন সন্ত্রাসী মামলার আসামিদের নিয়োগসহ স্বজনপ্রীতির অভিযোগও রয়েছে। এমনকি চাকরির জন্য আবেদন না করেই নিয়োগ পেয়েছেন। পাশাপাশি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্তে অভিজ্ঞতাকে উপেক্ষা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। নিয়োগ পেয়েছেন বিএনপি-জামায়াতপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দলের শিক্ষক নেতাদের সন্তান। গত ১৭ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫১৯তম সিন্ডিকেট সভায় এসব নিয়োগের অনুমোদন দেয়া হলেও কাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে তা একেবারেই জানেন না সিন্ডিকেট সদস্যরা। এমনকি অনেক সিন্ডিকেট সদস্য গত ৪ মাসেও হাতে পাননি সিন্ডিকেটের কার্যবিবরণী। ২০১৫ সালের ১৬ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেন অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী। এরপর থেকেই নিয়োগ পেয়েছেন তিন শতাধিক শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী। এর মধ্যে গত ৫১৯তম সিন্ডিকেটে ১৩৪ জনকে নিয়োগ দেয়া হয়। নিয়োগপ্রাপ্তদের তালিকায় ১৩৪ জনের মধ্যে রয়েছে ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ১৭ জন। এ ছাড়া সিন্ডিকেট সদস্য, প্রক্টরিয়াল বডি, প্রভাবশালী শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আত্মীয়স্বজনও তালিকায় রয়েছেন। এর আগে ‘জামায়াত-বিএনপিকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে’ এই অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় ভিসিকে স্মরকলিপি দিয়েছেন সাবেক ছাত্রনেতারা। এতে কয়েকজনের নামও উল্লেখ করা হয়। বাকি নিয়োগগুলো দেয়া হয়েছে ভিসি নিয়ন্ত্রিত ‘নিয়োগ সিন্ডিকেট’-এর মাধ্যমে। যার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছেন তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির নিয়োগ বোর্ডের দুই সদস্য প্রক্টর অধ্যাপক আলী আজগর চৌধুরী এবং সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. ফরিদ উদ্দিন আহমদ। এই দুজন নিয়োগ বোর্ডে থাকলেও নিয়োগ সিন্ডেকেটের তালিকায় রয়েছেন সহকারী প্রক্টর হেলাল উদ্দিন আহমদ, লিটন মিত্র, নিয়াজ মোরশেদ রিপন, অফিসার সমিতির সভাপতি মাহফুজুল হক খোকন ও সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম।
ভিসির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ : নৈতিক স্খলন ও অনিয়মের অভিযোগে ভিসি প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরীর বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ দায়ের করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রনেতা মোয়াজ্জেম হোসাইন কায়সার। এর আগে ২০১৭ সালের ২৩ এপ্রিল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কাছে অভিযোগ করেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি মো. আরিফ। অভিযোগে বলা হয়, ভিসি ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী তার নিয়োগের ১ মাস আগে মুক্তিযোদ্ধাদের টাকা দিয়ে যে নাটক সাজান তার প্রতিক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রী তাকে ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেন। তাকে নিয়োগ দেয়ার পর ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয় এখন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় ২০১৬ সালের ১৪ মার্চ সব ডিনের অজ্ঞাতে শুধুমাত্র কলা অনুষদে ১৬ জন ছাত্রছাত্রীকে ভর্তি করা হয়, যাদের মধ্যে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেনি এমন শিক্ষার্থীও রয়েছে। অভিযোগে টাকার বিনিময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির বিষয়টি তিনি উল্লেখ করেন।
আঞ্চলিকতার অভিযোগ : ২০১৫ সালের জুন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যে তিন শতাধিক শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ পেয়েছেন এদের সিংহভাগের বাড়ি হাটহাজারী এলাকায়। সর্বশেষ নিয়োগ পাওয়া ১৩৪ জনের মধ্যে শুধু হাটহাজারী ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার নিয়োগ পেয়েছেন অন্তত ৭০ জন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের বাড়ি এ এলাকায় হওয়ায় এসব নিয়োগ হয়েছে বলে জানা গেছে।
আবেদন না করে নিয়োগ : আবেদন না করেও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগে সাঁটলিপিকার কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে নিয়োগ পেয়েছেন কায়সার হামিদ। গত বছরের ২৮ মার্চ প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৫৬ জন আবেদন করেন। ওই পদে এত বিশালসংখ্যক আবেদনকারী আবেদন করলেও তাদের পাশ কাটিয়ে তাকে নিয়োগ দেয়া হয়।
আত্মীয়করণের অভিযোগ : অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে যাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে তারা বেশির ভাগই বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তাব্যক্তিদের আত্মীয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন শিক্ষক, কর্মকর্তাদের নিকটাত্মীয়দের মধ্যে কমপক্ষে ১০ জনকে নিয়মবহির্ভূতভাবে চাকরিতে নিয়োগ দেয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা দিয়াজ হত্যা মামলার অন্যতম আসামি সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক আনোয়ার হোসেনের স্ত্রী আয়েশা আখতারকে চাকরি দেয়া হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরে।
শুধু তাই নয় ছাত্রলীগের দিয়াজ হত্যার রহস্য ধামাচাপা দিতে দিয়াজ যে বাসায় ভাড়া থাকত ওই বাসার দারোয়ান মিজানুর রহমান মিন্টুকেও বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে চাকরি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। দিয়াজ হত্যা মামলার আরেক আসামি ও ছাত্রলীগের সহসভাপতি আব্দুল মালেকের ভাইকে চাকরি দিয়েছে প্রশাসন।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এরশাদ হোসেন অভিযোগ করে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ‘নিয়োগ সিন্ডিকেট’ রয়েছে এটা সবার জানা। এ সিন্ডিকেট ছাড়া কোনো নিয়োগ হয়নি।
নিয়োগের যথাযথ নিয়ম সিন্ডিকেটে মানা হয়নি উল্লেখ করে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট সদস্য এস এম সাদাত আল সাজীব ভোরের কাগজকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটে নিয়োগ প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে সাধারণত সুপারিশগুলো উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু সেগুলো উপস্থাপন করা হয়নি। দুয়েক দিনের মধ্যে সেটা আমাদের কাছে পৌঁছানোর কথা ছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত তা হাতে পাইনি। এমনকি ‘ বঙ্গবন্ধু চেয়ার’ পদে স্বয়ং ভিসি ইফতেখার যেভাবে দখল করেছেন সেটিরও সঠিকভাবে কোনো আইনগত ভিত্তি দেয়া হয়নি এখনো সিন্ডিকেটের সভায়।
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নানা অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী ভোরের কাগজকে বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গত চার বছরে যে অভূতপূর্ব একাডেমিক ও অবকাঠামো উন্নয়ন হয়েছে, সেসব বিষয়কে খাটো করতে একটি কুচক্রী মহল নানা ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। চবি প্রশাসনের অর্জন-উন্নয়ন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে নানা কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করতেই এই ধরনের অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, নিয়োগপ্রাপ্তদের যোগ্যতা অনুযায়ী নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এখানে কে কোন রাজনৈতিক দল করে, কে কার আত্মীয়, কার বিরুদ্ধে কটি মামলা এসব অবান্তর, অপ্রাসঙ্গিক বিষয় তুলে ধরে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপপ্রয়াস চালানো হচ্ছে।
অপরদিকে সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. ফরিদ উদ্দিন আহমদ ভোরের কাগজকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মনীতি অনুসরণ করেই নিয়োগ দেয়া হয়। নিয়োগ বিধিমালা রয়েছে, সিলেকশন বডি রয়েছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। নিয়োগ সিন্ডিকেট বলে কোনো কিছু নেই। চবি প্রক্টর অধ্যাপক আলী আজগর চৌধুরীর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।