পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তবে মৃত্যুপথযাত্রী?

আগের সংবাদ

২৬২ রানের টার্গেট নিয়ে ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশ

পরের সংবাদ

তিন বিশিষ্ট নাগরিককে হত্যার হুমকি: অতঃপর

প্রকাশিত হয়েছে: মে ৭, ২০১৯ , ৮:২৬ অপরাহ্ণ | আপডেট: মে ৭, ২০১৯, ৮:২৬ অপরাহ্ণ

রণেশ মৈত্র

রাজনীতিক ও কলাম লেখক।

বছর কয়েক আগেও তারা ব্লগার বলে পরিচিত অভিজিৎ রায়সহ কয়েকজন অনুরূপ বুদ্ধিজীবীকে হত্যার হুমকি দিয়ে শেষ পর্যন্ত হত্যাও করেছিল নির্মমভাবে। এই হত্যাগুলোর মন্থর তদন্ত এবং বিচার বা কারো শাস্তি না হওয়ায় ওই সন্ত্রাসী, সাম্প্রদায়িক জঙ্গিদের মনে নিরাপত্তা বোধ জাগ্রত হয়েছে বলে মনে করি এবং তা থেকেই তারা সাহস পেয়েছে এমন সুপরিচিত বিদগ্ধজনদের হত্যার হুমকি দিতে, হুমকি কাজে পরিণত করতে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও মানবাধিকার কর্মী সুলতানা কামাল, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির ও শিক্ষাবিদ-গবেষক মুনতাসীর মামুনকে ইসলামের স্বার্থে হত্যা ও শেষ করে দেয়ার হুমকি দিয়েছে একটি জঙ্গি সংগঠন। দিবালোকের মতো সত্য যে, ইসলামিক জঙ্গি সংগঠন বেশ কিছু দিন পর নতুন করে দেশের শ্রেষ্ঠ দেশপ্রেমিক নাগরিকদের তাদের ‘হিট লিস্টে’ স্থান দিয়েছে এবং সে অনুযায়ী তাদের হত্যার হুমকি দিতে শুরু করেছে ‘ইসলামের স্বার্থে’। বছর কয়েক আগেও তারা ব্লগার বলে পরিচিত অভিজিৎ রায়সহ কয়েকজন অনুরূপ বুদ্ধিজীবীকে হত্যার হুমকি দিয়ে শেষ পর্যন্ত হত্যাও করেছিল নির্মমভাবে। এই হত্যাগুলোর মন্থর তদন্ত এবং বিচার বা কারো শাস্তি না হওয়ায় ওই সন্ত্রাসী, সাম্প্রদায়িক জঙ্গিদের মনে নিরাপত্তা বোধ জাগ্রত হয়েছে বলে মনে করি এবং তা থেকেই তারা সাহস পেয়েছে এমন সুপরিচিত বিদগ্ধজনদের হত্যার হুমকি দিতে, হুমকি কাজে পরিণত করতে। অবশ্য খবরে বলা হয়েছে জিডি করার পর থেকেই সুলতানা কামালের নিরাপত্তার জন্য তার বাসায় পুলিশ প্রহরার ব্যবস্থা করা হয়েছে। হয়তো পুলিশ এ ব্যাপারে আন্তরিক এবং সম্ভাব্য যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য রীতিমতো প্রস্তুত। তারপরও উদ্বেগ দূর হয় না, মনের শঙ্কাও হ্রাস পায় না অতীতের ওই ভয়াবহ ঘটনাবলির কথা ভেবে।
আমরা জানি, হুমকিপ্রাপ্তরা আজকের বাংলাদেশের সম্পদ, তারা জাতির অহঙ্কার। স্বাধীনতা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী এবং সাম্প্রদায়িকতার বিষে জর্জরিত ওই ইসলামিক জঙ্গিরা সে কারণেই তাদের টার্গেট করেছে। ওই তালিকায় আরো অনেকের নাম থাকতে পারে যাদের আজো বাংলাদেশের বড্ড প্রয়োজন। দেশকে এখনো তাদের দেয়ার অনেক কিছু আছে।
শঙ্কা ও উদ্বেগ আরো বাড়ে গোটা পৃথিবীর হাল-হকিকত দেখে। এই তো সেদিন মাত্র নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের দুটি মসজিদে জুমার নামাজ আদায়রত ৫১ জন ধর্মানুরাগী মুসলিমকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো, শতাধিককে আহত করা হলো। বাংলাদেশের ভাগ্য ভালো যে, আমাদের ক্রিকেট দলের অনেকে নামাজ পড়তে ওই মসজিদের কাছে যেতেই অসংখ্য লাশ ও রক্তের বন্যা দেখতে পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ফিরে আসেন তাদের হোটেলে। কিন্তু ওই আহতদের মধ্য থেকে চিকিৎসারত, আরো একজন মুসল্লি মারা গেছেন। নিউজিল্যান্ডের মতো শান্তিপ্রিয়, সভ্য ও ধর্মনিরপেক্ষ দেশে এমন মর্মান্তিক ঘটনা যে ঘটতে পারে, এমনটা গোটা বিশ্বে কেউ কল্পনাতেও আনতে পারেনি। বরং গোটা পৃথিবী হয়েছে স্তম্ভিত। কিন্তু নিষ্ঠুর বাস্তবতা হলো, এমন ভয়াবহ ঘটনা সেখানে ঘটল এবং অসংখ্য নির্দোষ ব্যক্তিকে হারাতে হলো বহু মায়ের, অনেক স্ত্রীর, অনেক প্রেমিকার, অনেক ভাইবোনের আপনজন নিমেষেই হারিয়ে গেলেন। বিশ্ব যাদের হারাল তাদের মধ্যে কয়েকজন নিউজিল্যান্ড অভিবাসী জনাকয়েক বাংলাদেশিও ছিলেন। এর পর দুই-তিন সপ্তাহ যেতে না যেতেই ভয়াবহ খবর এলো শ্রীলঙ্কা থেকে। সেখানে তিনটি গির্জায় খ্রিস্টানদের ধর্মীয় উৎসবের দিন ইস্টার সানডের প্রার্থনারত কয়েকশ ধর্মানুরাগীকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হলো। এবং কয়েকটি আন্তর্জাতিক মানের হোটেলেও একই সন্ত্রাসী জঙ্গি বাহিনীর সন্ত্রাসীরা আরো অনেককে একইভাবে অতর্কিতে হত্যা করল। দেশি-বিদেশি তিন শতাধিক মানুষ নিমেষেই হারিয়ে গেলেন, রক্তের বন্যা বইল কলম্বো নগরীতে, অশ্রু বন্যা বইল সমগ্র পৃথিবীতে।
কী করল ওই জঙ্গিরা নিউজিল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কায়? উভয় জায়গার ঘটনায় হত্যাহত হলেন অন্তত হাজার পাঁচেক মানুষ, ধর্মীয় পরিচয়ে তারা মুসলমান, খ্রিস্টান, হিন্দু, বৌদ্ধ সবাই। কোনো ধর্মাবলম্বী মানুষই রেহাই পাননি। হত্যার অভিযান চালালেন দৃশ্যত নিউজিল্যান্ডে শ্বেতবর্ণের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠায় উগ্র বর্ণ ও সাম্প্রদায়িকতাবাদী একজন খ্রিস্টান। ওই খুনিকে গ্রেপ্তার করে জেলে পুরা হয়েছে। মামলা আজো তদন্তাধীন। খুনিও চিকিৎসাধীন, দেখা হচ্ছে লোকটি প্রকৃতিস্থ ছিল না কি মস্তিষ্ক বিকৃতিতে ভুগছিল। মেডিকেল রিপোর্ট পেলেই দ্রুত পুলিশি তদন্ত শেষ হতে পারবে?
আস্থা, খুনিটা যে শ্বেতবর্ণের মানুষদের প্রাধান্য চেয়েছিল বলে প্রচার হলো- তার সেই উদ্দেশ্য কি ৫১ জন মুসলিমকে (মূলত অভিবাসী) হত্যা ও দেড়শ মুসলিমকে আহত করার ফলে প্রতিষ্ঠিত হলো? নিউজিল্যান্ডে তো শ্বেতবর্ণেরই প্রাধান্য, প্রাধান্য খ্রিস্টানদেরও। তাহলে কি হত্যালীলার মাধ্যমে সমগ্র বিশ্বে শ্বেত ও খ্রিস্টান প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল বা হতে চলেছে? বিশ্ব কালো মানুষহীন, মুসলিম-হিন্দু-বৌদ্ধহীন হয়ে গেল কি? আবার শোনা যায়, অন্তত আইএস দাবি করে বলেছে যে তারা তাদের ‘মুসলমান ভাই’দের নিউজিল্যান্ডে হত্যার ‘প্রতিশোধ’ নিতেই শ্রীলঙ্কার ঘটনা ঘটিয়েছে। উভয় দেশের ঘটনার দায়ই আইএস স্বীকার করেছে।
এখানে এ প্রশ্ন ওঠা কি অস্বাভাবিক হবে যে, নিউজিল্যান্ডে না হয় একজন খ্রিস্টান ৫১ জন মুসলমানকে হত্যা করেছে। সে কারণে সব খ্রিস্টান, সব দেশের খ্রিস্টানকে দায়ী করা যায় কোন যুক্তিতে। প্রতিশোধ নেয়া হলো শ্রীলঙ্কার খ্রিস্টানদের ওপর গির্জায় হামলা চালিয়ে, যে খ্রিস্টানরা ওই গির্জাগুলোতে হতাহত হলেন তারা কি আদৌ নিউজিল্যান্ডের হত্যালীলার জন্য দায়ী? তা যদি না হন তবে তাদের হত্যা করার মাধ্যমে ‘প্রতিশোধ’ নেয়াটা কি কোনো ধার্মিক তার কল্পনাতে আনতে পারে? আরো লক্ষণীয় যে, শ্রীলঙ্কার মুসলিম জঙ্গিরা যারা আইএসের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে জানা যাচ্ছে তারা তো শুধু গির্জা আক্রমণ করেই ক্ষান্ত থাকেনি, তারা কয়েকটি আন্তর্জাতিক মানের হোটেলেও বোমা নিক্ষেপ করে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করেছে, আহত করেছে। হোটেলে অবস্থানকারী এই মানুষগুলো তো শ্রীলঙ্কার নন, তারা সবাই বিদেশি পর্যটক। এদের মধ্যে খুব কম সংখ্যকই খ্রিস্টান। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সবাই ছিলেন পর্যটক হিসেবে, তাহলে অখ্রিস্টানদের ওই তথাকথিত প্রতিশোধের উছিলায় হতাহত করাটাও কি যুক্তিসঙ্গত? এটা কি কদাপি ইসলাম ধর্ম অনুমোদন করে?
বস্তুত শ্রীলঙ্কার ঘটনার মাধ্যমে ওই জঙ্গিরা বা আইএসভুক্ত বা বহির্ভূত উগ্র ধর্মান্ধ গোষ্ঠী যা করল তার ফলে ওই দেশে সাম্প্রদায়িকতা নির্ঘাত বৃদ্ধি পাবে। মুসলিমরাই মানুষের টার্গেটে পরিণত হবে। ইতোমধ্যেই পত্রিকা মারফত জানা গেছে যে, শ্রীলঙ্কার মুসলিম সম্প্রদায় আতঙ্কের মধ্যে দিনাতিপাত করছে, তাদের তরুণরা গ্রেপ্তার বা আক্রমণের আশঙ্কায় পালিয়ে বেড়াচ্ছে। এই সংকট-দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করল আইএস নামক মুসলিম জঙ্গি সন্ত্রাসীরা। ধর্মীয় বিচারে মুসলমানদের ক্ষতি ইসলামের নামে তথাকথিত মুসলমানরাই করল। কী ভয়ঙ্কর অপব্যবহার ধর্মের। এভাবে আজ কয়টি বছর ধরে উগ্রপন্থিরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধর্মের বা বর্ণের নামে হত্যালীলা চালিয়ে যাচ্ছে। ঘটনাগুলো শুধু বেদনাদায়ক নয়, অত্যন্ত গর্হিত ও বর্বর এবং অসভ্য প্রকৃতির। ধর্মের সঙ্গে যেমন এগুলোর সম্পর্ক নেই তেমনি আবার ধর্মান্ধ উগ্রবাদ সর্বপ্রযত্নে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, ধর্মীয়, বর্ণগত ও লিঙ্গগত কারণে সৃষ্ট বৈষম্য দূরীকরণ অসম্ভব।
লক্ষণীয় এই উগ্র ধর্মান্ধরা বাংলাদেশে সুলতানা কামাল, শাহরিয়ার কবির, মুনতাসীর মামুনের মতো দেশপ্রেমিক উদার গণতন্ত্রীকে টার্গেট করে তাদের ‘ইসলামের স্বার্থে’ হত্যার হুমকি দিয়েছে। কিন্তু এই দুষ্কৃতরা আদৌ হুমকি দিচ্ছে না বা দেবেও না যেসব অসৎ ব্যবসায়ী পবিত্র রমজান মাসে পণ্যমূল্য অহেতুক বৃদ্ধি করছে, যারা হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করে বিদেশে পাচার করছে, যে অসৎ সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তারা ঘুষ খেয়ে দিব্যি রাজার হালে দিন কাটাচ্ছে, যারা নারীদের ওপর যৌন নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে, যারা ধনী-গরিবের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করে চলেছে, যারা বেআইনিভাবে অন্যের সম্পত্তি গ্রাস করে চলেছে তাদের বিরুদ্ধে। বরং পারলে ওই ঘুষখোর, মুনাফাখোর অসৎ লোকদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ সাহায্য নিয়ে বেআইনিভাবে অস্ত্র কিনে তাদের হত্যালীলা পবিত্র ‘ইসলামের স্বার্থে’ চালিয়ে যাচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে সরকারকে দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে চাই বিদগ্ধজনদের বিন্দুমাত্র ক্ষতি যেন সাধিত না হয়, তাদের নিরাপত্তা বিধান যেন ত্রুটিমুক্ত হয়, তারা স্বাভাবিক জীবনযাত্রা শান্তিপূর্ণভাবে নির্বিঘ্নে চালিয়ে যেতে পারেন দ্রুতই তেমন একটা পরিবেশ রচনা করা হোক। সব বুদ্ধিজীবীর ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী সব কবি, সাহিত্যিক ও অন্য বিদগ্ধজনরাও যেন একইভাবে নির্বিঘ্নে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা চালিয়ে যেতে পারেন। আর ওই উগ্রদর্শনান্ধ জঙ্গি এবং জঙ্গি উৎপাদনকারী ও প্রশ্রয়দাতাদের শিগগিরই গ্রেপ্তার করা হোক। অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে আইনি পন্থায় ওই হুমকিদাতাদের বিরুদ্ধেও কঠোরতম এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি বিধান করা হোক।

রণেশ মৈত্র : রাজনীতিক ও কলাম লেখক।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা