ঘণ্টায় ২০০ কিলোমিটার বেগে ওড়িশায় ‌‌‌‌ফণীর আঘাত

আগের সংবাদ

দগ্ধ ও কোমল মৃত্তিকার ইতিহাস

পরের সংবাদ

অশনি সংকেত

আলী ইমাম

প্রকাশিত হয়েছে: May 3, 2019 , 10:20 am

সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক বাংলাদেশের নদীসমূহের নিকট থেকে জলজকণ্ঠের আহবানকে নিবিড়ভাবে শুনতে পেয়েছিলেন। নদীর প্রবহমান ধারা তাকে অবিরাম পরিশ্রুত করেছে। চিন্তা-চেতনাকে নতুন দিকনির্দেশনা দিয়েছে। বোধশক্তিকে জারিত করেছে। নদী উপাখ্যান তার নিকটে স্বমহিমায় উদ্ভাসিত হয়েছে। তার কবিতার শব্দাবলিতে ‘তেরোশত নদী’ ‘ব্রহ্মপুত্র নদ’ ‘নৌকোর গলুই’ বিশেষ মর্যাদায় উপনীত হয়েছে।

তিনি লিখেছিলেন পরম মগ্নতায় :

প্রভাষক ব্রহ্মপুত্র
তুমি আমাকে মনে করিয়ে দাও তোমার জলজকণ্ঠে
সেই দিনগুলোর কথা
যখন শস্যের উন্নত মাথাগুলো স্পর্শ করে চলে যেত চাঁদ ও রমণীরা
যখন মানুষ ছিল প্রতিকৃতির চেয়ে অধিকতর গ্রহণযোগ্য

এই নদের অববাহিকার পলল মাটির সান্নিধ্যে বেড়ে উঠেছিলেন কবি। তার মাঝে এমত বিশ্বাস সঞ্চারিত ছিল যে নদীসমূহের প্রবহমান ধারার জন্যই বাংলাদেশ সমস্ত পৃথিবীতে ‘নদীমাতৃক দেশ’ হিশেবে পরিচিতি অর্জন করেছিল। এ দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নির্মাণে নদীসমূহ গভীরতর প্রভাব রেখেছিল।
কবি ব্রহ্মপুত্রের বর্ণনা করেছেন প্রতীকীভাবে। বারবার নদের কাছে ফিরে আসার আশা ব্যক্ত করেছেন। এই নদ বিভিন্ন জনপদের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ভেতরে সঞ্চারিত করেছে নিজের সঞ্জীবনী ধারাকে। নিসর্গ-প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

কবি তাই বলেন :

‘মহৎ ব্রহ্মপুত্র, স্মৃতিধর ব্রহ্মপুত্র,
আমার পিতামহের কৃষি-প্রতিভার আবিস্কারক ব্রহ্মপুত্র,
অতীত ও ভবিষ্যতব্যাপী বিষয়সমূহের জন্য,
আমি আর কোথায় বা যাবো? আমার প্রজাতির নিকটতম আত্মীয়,
কার কাছেই বা যাবো? তুমি ব্রহ্মপুত্র, তোমার কাছে ছাড়া?

এ সকল পঙ্ক্তি নিয়ে নদী বিশেষায়িত হয়েছে। নদী পরিণত হয়েছে আকাক্সিক্ষত ঠিকানায়। নির্ধারিত গন্তব্যস্থলে। নদীর কাছে রয়েছে বাঙালি জাতির পূর্ব পুরুষদের বেঁচে থাকার সংগ্রামের ইতিহাস। নদী অসংখ্য জনবসতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে। কবির অসামান্য প্রকাশগুণে নদী হয়ে উঠেছে বাঙালি জাতির আশা-আকাক্সক্ষার প্রধান আশ্রয় কেন্দ্র। বিবিধ সংকটকালীন অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ হিশেবে উপস্থাপিত হয়েছে বহমান নদীর বুকে ভাসমান গতিশীল নৌকো। নৌকোর গুলুইয়ে অংকিত চোখ হয়েছে সংগ্রামী দৃষ্টিশক্তির প্রতীক। সৈয়দ শামসুল হকের ঘনিষ্ঠ সহচর চিত্রশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীও এমন বিশ্বাসে আস্থাশীল ছিলেন। তাই অপূর্বভাবে অংকন করেছেন নৌকোর গুলুই-এর সিরিজ।
সৈয়দ শামসুল হকের নদী বিষয়ক কাব্য-ভাবনা শিল্পীকে এই সিরিজটি আঁকতে প্রভাবিত করেছিল।

কবির ভাষা ছিল এ রকম :

‘আবার ফিরে এলাম আমি তোমারই সেই সন্নিধানে
সেখানে এখনো তুমি একবার গ্রীবা বাঁকিয়ে
দেখে নিচ্ছ আমাদের জনপদ,
সেখানে এখনো তুমি আকর্ষণ করছ আমাদের সব সড়ক।
এখনো তো তোমার স্রোতে ভাসমান অন্তত একটি নৌকো,
আর তার গলুইয়ে, সে আমার সর্বত্র এবং সবকিছুতে, তোমার চোখ।
মহর্ষি ব্রহ্মপুত্র, তুমি তো আমাদের প্রধান স্বর্ণকারও বটে,
নিরবধি বানিয়ে চলেছ লক্ষ লক্ষ ফেনিল হাঁসুলি ও বালা;

কবির এই অপরূপ বর্ণনায় নদী বাক্সময় হয়ে উঠেছে। নদীর ঢেউতে ঝিকিয়ে উঠেছে অজস্র ফেনিল হাঁসুলি। আমরা স্মরণ করতে পারি তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়ের অসামান্য উপন্যাস ‘হাঁসুলি বাঁকের উপকথা’র কথা। যেখানে নদীর বাঁক নেয়ার গঠনটি ছিল হাঁসুলির মতো।
সৈয়দ শামসুল হক ব্রহ্মপুত্র নদকে কবিতার প্রাণবিন্দু হিশেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাকে একটি প্রাণবন্ত চরিত্র হিশেবে উদ্ভাসিত করেছেন। আর এভাবেই বাংলাদেশের কবিতার দিগন্তকে বিস্তৃত করেছিলেন। সেই নদকে অভিহিত করেছেন পিতামহের কৃষি-প্রতিভার আবিষ্কারক রূপে। এভাবে পাঠকদের উজ্জীবিত করেন নতুন ভাবনায়। নদ তার নিকটে হয়ে ওঠে পেশিবহুল। নদীতে ভাসমান নৌকোর গলুইয়ের চোখ তাকে স্বপ্ন দেখায়। নদীর পলি বাড়িয়েছে মাটির উর্বরতাকে।
কবির বর্ণনায় :

‘এ কথা কি সত্য নয় যে সদ্য লাশ
এখনো আপনার নদী বহন করে?
উজ্জ্বল দুপুরে দেখুন পদ্মায় ইলিশের ঝাঁক,
উৎফুল্ল বাতাস,
হাজার হাজার নৌকোয় দেখা যায় না নদী,
সন্ধ্যের আগেই ওরা ডাঙায় উজাড় করে দেবে রুপালি ফসল।

বাংলার অপরাজেয় প্রাণশক্তিকে আবিস্কার করেছেন নদীতে। বাংলার নদী, নৌকো ও প্রকৃতির বিমুগ্ধতা তাকে শিল্প রূপময় করে তোলে। দিগন্তহীন বিশাল নদীর মাঝখানে তিনি শুনতে পান জলের কল্লোল। বাংলার নিসর্গে স্থাপন করেন কবি তার প্রেমিকাকে।

‘নিচে সমতল মাঠ শস্যের
যমুনা যেখানে যুগলের নাম ডাকে ছলছল স্বরে।’

সৈয়দ শামসুল হক লোকায়ত বাংলার গ্রামীণ জনপদের জীবনধারাকে লোকজ শব্দের ব্যবহারে তুলে ধরেন ‘পরানের গহীন ভিতর’ কাব্যগ্রন্থে। সেখানে মাটিগন্ধী বিশাল জনগোষ্ঠীর চিরন্তন জীবনধারার বৃত্ত ফুটে ওঠে। আর উপমা সংগ্রহ করেন নদী থেকে। জলজ কণ্ঠ থেকে।

‘পাথারে বৃক্ষের তলে ঘন ছায়া জুড়ায় পরাণ,
গাঙের ভিতরে মাছ সারাদিন সাঁতরায় সুখে,
বাসরের পরে ছায়া য্যান দেহে গোক্ষুর জড়ান,
উদাস সংসারে ব্যথা সারাদিন ঘাঁই দেয় বুকে।’

বাংলার লোক-জীবনের আশা-আকাক্সক্ষা, স্বপ্ন-ভালোবাসা, যন্ত্রণা উদ্দীপনাকে রূপায়িত করে তোলেন নদীকেন্দ্রিকতায়। জলজ সংস্কৃতি সেখানে নতুন এক মাত্রা পায়। সৈয়দ শামসুল হক শিল্প কুশলতায় নদীকেন্দ্রিক তার কাব্যবোধকে প্রকাশ করেন। কুশলতায় মূর্ত করেন। লোকজ জীবনের স্পন্দন সেখানে যেন গাঙের ঢেউ-এর মতো ছলছল করে ওঠে। কবি নদীধারাকে আমাদের চেতনায় তরঙ্গায়িত করে দেন।
কবি তার প্রেমিকার অন্যত্র বিবাহ হলে বুকের ক্ষরণকে প্রকাশ করেন লোকজ উপাদানে। যার অন্যতম প্রবহমান শক্তি হচ্ছে নদী।

কবি বলেন,

‘তোমার বিয়ার দিনে মনে হইল, সত্য নিও মনে,
এত বড় এত গোল কোনোদিন দেখি নাই চান।
তুলার মতন ফুল, রানী য্যান দরবারে বসা,
নদীর গহীন তলে জোছনায় দিয়া সে প্রাসাদ।

দীঘল নায়ের মতো দুঃখ এক নদী দিয়া যায়-
মাঝি নাই, ছই নাই, নাই কোনো কেরারা কি লোক।’

বাংলা সাহিত্যের লোকজ উপাদান নির্ভর সাহিত্যের এক অন্যতম নিদর্শন হচ্ছে ‘মৈমনসিংহ গীতিকা।’ যার প্রধান অবলম্বন ছিল নদীকেন্দ্রিক জীবন যাত্রা। ফরাসি মনীষী রমা রোঁলা ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’ পাঠ করে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। অনুভব করেছিলেন জলজ সংস্কৃতির শক্তিকে।
সৈয়দ শামসুল হকও অনুভব করতে সক্ষম হয়েছিলেন যমুনা নদীর স্রোতধারাকে নিবিড়ভাবে মিশে রয়েছে এ দেশের লোক-জীবনের আশা।
প্রকৃতির বর্ণনায় সেই চিত্র রূপ :

‘পথের উপরে এক বাজপড়া তালগাছ খাড়া
পিছের জঙ্গল থিকা কুড়ালের শব্দ শোনা যায়,
যমুনার জলে দ্যাখে নাও তার নিজের চেহারা,
বাতাসের কোলে মাথা কুশালের ফসল ঘুমায়।’

আল মাহমুদও এই বলে আশা প্রকাশ করেন যে কন্যা গাঙের ঢেউয়ের মতো কবুল স্বীকার করবে। বাংলাদেশের নদীসমূহের সাথে গ্রামীণ জনপদের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। নদী থেকে উত্থিত হয় লোক-জীবনের অনুভূতি। নদীর ঢেউ সে ভাষাকে ধারণ করতে পারে। হাজার নদীবিধৌত এ দেশের মানুষের প্রাত্যহিক জীবন নদীকে অবলম্বন করে প্রবহমান বলে নদী পালন করে নিয়ন্ত্রণ সত্তা। মানুষের আচার-অনুষ্ঠান, আধ্যাত্মিকতা, প্রকৃতি-নির্ভরতা, সারল্যতে প্রভাব ফেলেছে নদী।

সৈয়দ শামসুল হক তার পরাণের গহীন ভিতরে সেই তরঙ্গকে অনুভব করে লৌকিক বাগ-ভঙ্গিতে লেখেন :

‘এক্কেরে আওয়াজ নাই, নদী খালি চাপড় দিতাছে
গেরামের পিঠে আর ফিসফাস করতাছে, ঘুম,
ঘুমারে এখনতরি সাতভাই পূর্বদিকে আছে।
এক ফোঁটা ঘুম যে আসে না তার আমি কি করুম?

নদীরে জীবন কই, সেই নদী জল্লাদের মতো
ক্যান শস্য বাড়িঘর জননীর শিশুরে ডুবায়?

আমার থিকাও দুঃখী যমুনার নদীর কিনার,
আমার তো গ্যাছে এক, কত কোটি লক্ষ গ্যাছে তার।’

মানুষের জীবনধারাকে অনেক সময় কবির নিকটে মনে হয়েছে গাঙের মতো। গাঙের মাঝেও বহু রহস্য মিশে রয়েছে। আধ্যাত্মিক সংগীত রচয়িতারা তাই গাঙের ভেতরে উপমা খুঁজে পায়।

গ্রাম্য যুবতীকে উদ্দেশ্য করে কবি বলেন :

‘আরে ও ইসের বেটি, চুলে দিয়া শিমুলের ফুল
যাস কই? কই যাস? যুবকের মাঝখানে দিয়া?
মানুষ গাঙের মতো, বানে ভাসে তারো দুই কূল,
সে পানি কাতান বড়, খলবল রঙ তার সিয়া।’

বাংলাদেশের লোক বিশ্বাসে রয়েছে পানির পীর খোয়াজ খিজিরের উপাখ্যান। পানির রাজ্যে আছে খিজিরের আস্তানা। অনেক অঞ্চলের দরিয়াতে নাও ছাড়ার পূর্বে মাঝি-মাল্লারা পীর খোয়াজ খিজিরের কথা স্মরণ করে। অসীম তার ক্ষমতা।

সৈয়দ শামসুল হক সেই লোক-বিশ্বাসকে মূর্ত করে তোলেন এভাবে :

‘মাছের পাহারা ঘেরা খিজিরের অতল আস্তানা,
আছে তার ইশারায় আগুনের দেহ এক জ্বীন-
যদি ইচ্ছা করে তার অসম্ভব নাই কোনো কাম,
যারে না পাইতে পারি তারো সাথে দিতে পারে মিল।’

সৈয়দ শামসুল হকের কাব্য মনোজগতে দেশাত্মবোধ অত্যন্ত প্রগাঢ় রূপে বিদ্যমান। নদী বিচিত্র মাত্রিকতায় সেখানে সদা বহমান। কবি বাঙালির প্রতিরোধ সংগ্রামকে অনুসন্ধান করেছেন স্বদেশের প্রাচীনতর জলধারা ব্রহ্মপুত্র নদের আশ্রয়ে।

‘বলো, যখন নৌকোর শরীরে অজস্র ফুলের নকশা ফলে ওঠে,
যখন জোয়ার লাগে।’

কবি অতীতের বাংলাদেশের মুক্তির সংগ্রামের কথা অন্বেষণ করেছেন উত্তরাঞ্চলের কৃষক বিদ্রোহের কাহিনীতে। যা তাকে অনুপ্রাণিত করেছিল ‘নুরুলদীনের সারা জীবন’ নামের কাব্য নাটিকা রচনা করতে। যে রচনার মর্মস্পর্শী সংলাপ হচ্ছে, ‘জাগো বাহে, কুনঠে সবাই।’ সেই রচনার ভৌগোলিক পটভূমিতে রয়েছে নদী উপাখ্যান। চিলমারীর বন্দরের কথা। রংপুরের ভাওয়াইয়া গানেও আছে চিলমারীর বন্দরের উল্লেখ।
সৈয়দ শামসুল হকের বিবিধ রচনায় উত্তরাঞ্চলের নদীসমূহ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিতভাবে ফুটে উঠেছে। এ দেশের নিপীড়িত মানুষের জীবন সংগ্রামকে নদীকেন্দ্রিক পটভূমিতে মূল্যায়িত করেছেন।

কবির পঙ্ক্তিমালায় সেই ভূগোল চিত্রিত হয় :

‘যখন তিনদিকে বিল আর শাখানদী ঘেরা
মৃত মহিষের চামড়ার মতো টানটান এক খণ্ড জমিতে
জমে ওঠে চিলগাছার হাট, মনে পড়ুক।
তোমাকে মনে পড়ুক, আমার মনে পড়ুক।
যখন নৌকোর নিচে বন্যায় ডোবা ধানের গাছ
অনবরত খসখসে গলায় তার আত্মচরিত বলে যায়।’

সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক বাংলার মুক্তিকামী মানুষের কাছে নুরুল দীনকে উপস্থাপিত করেছেন নান্দনিক সৌন্দর্যে।

‘নুরুল দীনের কথা যেন সারা দেশে
পাহাড়ি ঢলের মতো নেমে এসে সমস্ত ভাসায়,
অভাগা মানুষ যেন জেগে ওঠে আবার এ আশায়
যে, আবার নুরুলদীন একদিন আসিবে বাংলায়।’

সৈয়দ শামসুল হক-এর নদীকেন্দ্রিক রচনা সম্পূর্ণ এক নতুন ধরনের মাত্রা সংযোজন করেছে। তিনি বিপন্ন সময়ের প্রতীক হিশেবে চিত্রিত করেছেন নৌকোকে। নৌকো হচ্ছে আমাদের এক ঐতিহ্যবাহী লোকযান।
নৌকোর গলুইয়ের উপড়ানো চোখ তার নিকটে ছিল অসহায় সময়ের প্রতীক। পাটাতনের ফুটোও তার কাছে বিপন্ন সময়ের প্রতীক রূপে ধরা দিয়েছে। যে ফুটো দিয়ে নৌকোর ভিতরে কালো জল প্রবেশ করছে।

সৈয়দ হক আবেগাপ্লুত হয়ে লিখেছেন :

‘এই কি সেই নৌকো, আমার নৌকো? যার পাটাতনে এখনো শায়িত আমার শরীর, আমার স্বপ্ন। নিজের হাতেই তো তৈরি ছিল ওটা। আমার যৌবনের নক্ষত্র আর জল আর সাহস দিয়ে বানিয়েছিলাম আমি। কিন্তু এখন আমিই আর চিনতে পারি না, যেন ছিনতাই, এবং তার গলুইয়ের চোখ উপড়ানো, সক্ষম ছিল যে তলপেট সেখানে এখন ছিদ্র।
উঠে আসছে প্রবল কালো জল বড় নিঃশব্দে। আমার ভয় হয় না আমার জন্য নয় একেবারেই না তলিয়ে যায় এই নৌকো।’

এই রকমের বিপন্ন, অসহায় সময়ের বিরুদ্ধেও কবির স্বপ্ন জাগরিত হয়। চেতনা শাণিত হয়। নৌকোর পাটাতনে ছিদ্র দেখা গেলেও তাকে বাদ দিয়ে নতুন নৌকো তৈরির প্রত্যাশা সৃষ্টি হয়।

সেই প্রবল ইচ্ছেশক্তি বিধৃত হয় :

‘এখনো তো আমি সেই বিপুল ইচ্ছাই দেখি আমার ভেতরে নড়ে উঠছে আর বলছে, আবার জীবন যদি পাই, তবে তো আবারও বন থেকে সংগ্রহ করি কাঠ এবং আবারও সেই নৌকোই বানাই।’

সমকাল বৈরী হলেও কবি আশা পরিত্যাগ করেন না। কারণ তার বিশ্বাস, ‘নৌকো চলেছে বাঁকের পর বাঁক পেরিয়ে। …কাঠের সাথে কাঠ ঘষে জ্বলে ওঠা আগুনের শপথ, সিঁদুরের মতো লাল কলরব আজ ভোরবেলায়, ঐ দ্যাখো, গ্রামগুলোর শ্যামল সিঁথিতে। কবি নদীর দিকে পা বাড়াতে চেয়েছেন। যেখানে তার নৌকোর গায়ে জল চাপড় দিয়ে চলেছে। দুঃসময়ের খেয়া পারের জন্য কবি আশাবাদী। বর্তমানের মৃত, বিপন্ন নদী তাকে অসহায় করতে পারবে না। তিনি এই অসহায়ত্বকে অতিক্রম করে যেতে আগ্রহী। তিনি নতুন নৌকো নির্মাণ করতে চান।

কবির বাসনা :

‘আমি যে নদীর কথা এতকাল বলেছি ভাষায়
আপনার গলুই সে নদীই দেখছে,
সে নদী এখন আর নেই দেশে, আছে
শুধু আছে পাটল প্লাবন
এবং কবিই সেই গলুইয়ের চোখ,
এবং কবিই সেই বাংলার মজ্জমান গ্রাম,
তাকেই চেনাতে গিয়ে আপনার এটুকু জীবন,
তাকেই চিনতে গিয়ে জলযান এই বেলা জলে ভাসালাম।’

লোকায়ত অনুষঙ্গে কবি বাঙালির জাতীয় মানসকে বিম্বিত করে তোলেন কবিতায়। বাঙালির গ্রামীণ জীবনের সংঘাতকে উপমা করেছেন নৌকোর পালে জুড়ে দেয়া টুকরো কাপড়ে।
কবির বর্ণনায় :

‘দিনের ভেতর দিয়ে গলে যাওয়া আয়নার মতো বয়ে চলেছে নদী,
তার স্রোতে ভাসমান সব নৌকো
এবং সেই নৌকোর পাল আমাদেরই জীবনের গল্পের মতো
টুকরো টুকরো সংঘাতময় রঙের কাপড়ে সেলাই করে গড়া।’

কবির ঘরমুখো নৌকোর পালে লাগে হাওয়া।

সৈয়দ শামসুল হক বহুবার এ কথা বলে আত্মপরিচয় দিয়েছেন যে তিনি তেরোশত নদী বিধৌত একটি অঞ্চলের সন্তান। এ ছিল তার গর্বিত উচ্চারণ। তিনি স্বদেশের আত্মশক্তির অন্বেষণ করেছেন নদীতে নদীতে।

প্রবল প্রত্যয়ে তাই উচ্চারণ করেছেন :

‘একদা একটি দেশ ছিল, তেরোশত নদী সেই দেশটির গা ধোয়াতো, নদীর জলে ছিল মাছ, কিন্তু মনে হতো না মাছ, যেন জলেরই কাঁপন, রমণীরা জলে আপনাদের ছায়া দেখে প্রসাধন করত দিনের শেষে পুরুষেরা প্রক্ষালন করত মাটি মাখা হাত।’