ফেনীতে ট্রাকচাপায় অটোরিকশার যাত্রী নিহত

আগের সংবাদ

আয় বৈষম্য ও তথ্য ঘাটতি এসডিজির বড় চ্যালেঞ্জ

পরের সংবাদ

সংস্কারপন্থিদের নতুন প্লাটফর্ম ঘোষণায় জামায়াতে তোলপাড়

প্রকাশিত: এপ্রিল ২৮, ২০১৯ , ১১:৪৯ পূর্বাহ্ণ আপডেট: এপ্রিল ২৮, ২০১৯ , ৩:২৫ অপরাহ্ণ

আওয়ামী লীগ ক্ষমতা গ্রহণের পর গত ১০ বছর ধরে দেশের রাজনীতিতে কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি ও নিবন্ধন বাতিলসহ নানা ইস্যুতে দলটি দৃশ্যত বিপর্যস্ত। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভূমিকার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়াসহ সংস্কার ইস্যুতে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে দলটির দুটি অংশ। এ অবস্থায় দলটির রক্ষণশীল অংশ এগুচ্ছিল সংস্কারপন্থিদের চাপে রাখার কৌশল নিয়ে। তবে রক্ষণশীলদের কৌশলকে পদপিষ্ট করে গতকাল সংস্কারবাদীদের নতুন প্লাটফর্ম ঘোষণার মাধ্যমে সারা দেশের জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে তোলপাড় শুরু হয়েছে।
রাজধানীর হোটেল সেভেনটি ওয়ানে গতকাল শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সংস্কারবাদীরা ‘জন আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ’ নামে নতুন একটি রাজনৈতিক মঞ্চের ঘোষণা দেন। রাজনৈতিক এই মঞ্চের সমন্বয়ক জামায়াত থেকে বহিষ্কৃত নেতা (ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাবেক সভাপতি) মুজিবুর রহমান মঞ্জু। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে মঞ্জু বলেন, আজ আমরা উপস্থিত হয়েছি জাতীয় মুক্তি ও ‘জন-আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ’ নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে। যারা এই উদ্যোগে শরিক হতে চান, তাদের সংগঠিত করার কাজ আজ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো। আমরা কোনো ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল গঠন করতে যাচ্ছি না উল্লেখ করে মঞ্জু বলেন, আমরা যে রাজনৈতিক দল গঠন করতে যাচ্ছি, তা হবে ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ নির্বিশেষে সবার জন্য গ্রহণযোগ্য।
আলোচনা, পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে সংগঠনের নাম, কাঠামো, কর্মপদ্ধতি ঠিক করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, পূর্ণাঙ্গ দল গঠনে পাঁচটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এসব কমিটি তাদের কাজ শুরু করে দিয়েছে। কবে নাগাদ পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হবে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা যত তাড়াতাড়ি পারি যথা শিগগিরই আসব। এই উদ্যোগ জামায়াতে কোনো প্রভাব ফেলবে কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে মঞ্জু বলেন, এত ছোট জায়াগায় যাচ্ছেন কেন আপনারা? আমরা তো মনে করি পুরো দেশেই একটা প্রভাব পড়বে। আমাদের প্রত্যাশা এই উদ্যোগ সবার মধ্যে সাড়া ফেলবে। নির্দিষ্ট ১৯টি বিষয়ে একমত হয়ে সবাই এই উদ্যোগে শামিল হয়েছেন দাবি করে মঞ্জু বলেন, আমরা নির্দিষ্ট আদর্শভিত্তিক কোনো রাজনৈতিক দল গঠন করছি না। জনগণের আকাক্সক্ষাভিত্তিক দল গঠন করব। এই রাজনৈতিক দল হবে ইতিবাচক বাংলাদেশ গড়ার নতুন কার্যক্রম।
নিজের সাবেক দল জামায়াত সম্পর্কে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী একমাত্র দল না হলেও পরবর্তী সময়ে জামায়াতের ভূমিকা নিয়েই বেশি প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকার দায় স্বীকারের আহ্বান জামায়াত নেতৃত্ব অগ্রাহ্য করেছেন। এই রাজনৈতিক অবস্থানের বোঝা একাত্তর-পরবর্তী প্রজন্মের বহন করা উচিত নয় বলে আমরা বিশ্বাস করি। লন্ডনে থাকা জামায়াতের সিনিয়র সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক এই উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন দাবি করে তিনি বলেন, আমরা অনেকের কাছ থেকেই পরামর্শ নিয়েছি। আব্দুর রাজ্জাকের কাছ থেকেও পরামর্শ নিয়েছি। নতুন এই উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক ডা. আব্দুল ওয়াহাব মিনার, মাওলানা আব্দুল কাদের, মো. নাজমুল হুদা, মো. সালাহ উদ্দীন, ব্যারিস্টার জুবায়ের আহমেদ ভূঁইয়া, এডভোকেট তাজুল ইসলাম, গোলাম ফারুক, মোস্তফা নূর, কামাল উদ্দীনসহ অন্যরা। এরা প্রত্যেকেই এক সময় জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
জানা যায়, সংস্কারপন্থি নেতাদের রাজনৈতিক নতুন উদ্যোগে দিশেহারা জামায়াতের রক্ষণশীলরা। জামায়াতের নীতিনির্ধারণীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে সংস্কারপন্থিদের যোগাযোগ রয়েছে, এমন তথ্য পাওয়ার পর জামায়াত-শিবিরের মধ্যে রীতিমতো ‘কম্পন’ শুরু হয়েছে। তারা সংস্কারপন্থিদের সঙ্গে দলের নেতাকর্মীদের যোগাযোগ ঠেকাতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। সংস্কারপন্থিদের এ উদ্যোগে মূল দলের বা ছাত্র শিবিরের কেউ যেন অংশ না নেন, সে জন্য জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান বেশ কিছুদিন থেকে দেশে-বিদেশে সফর করে শেষ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। জামায়াতের এক কেন্দ্রীয় নেতা ভোরের কাগজকে বলেন, জামায়াতের বর্তমান সেক্রেটারি জেনারেলের স্বৈরাচারী মনোভাবের কারণে অনেকেই জামায়াত ছেড়ে দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ইতোমধ্যে অনেকেই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। একদিকে সরকারের নির্মম নির্যাতন, অন্যদিকে দলে গুরুত্ব না পাওয়ার কারণে বিকল্প চিন্তা করছেন। অনেকেই সংস্কারপন্থিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। সংস্কারপন্থিদের কার্যক্রম সফল হলে জামায়াতের অনেকেই তাদের সঙ্গে প্রকাশ্যে যোগ দেবেন। জামায়াতের কারো সঙ্গে যোগাযোগ আছে কিনা জানতে চাইলে সংস্কারপন্থি এক নেতা বলেন, অনেকেই ভেতর থেকে পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করছেন। তারাও আমাদের সঙ্গে যোগ দেবেন এটা শুধু সময়ের অপেক্ষা।
জামায়াতের নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, সংস্কারপন্থিদের মূল টার্গেট হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী প্রজন্ম। সে ক্ষেত্রে শিবিরের মেধাবী এবং সাংগঠনিকভাবে দক্ষ এমন তরুণদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছেন। এ ছাড়াও স্বনামধন্য চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও আইনজীবীসহ বিভিন্ন পেশার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে এ রাজনৈতিক দলটি তারা গঠন করতে চাচ্ছেন। নতুন রাজনৈতিক দল গঠন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত এক নেতা বলেন, নতুন প্রজন্মের চিন্তা ও মনোভাবের প্রতিফলন ঘটানোই আমাদের মূল লক্ষ্য।
দলের সংস্কার ও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া নিয়ে সম্প্রতি জামায়াতে প্রকাশ্যে বিরোধ দেখা দেয়। যার রেশ ধরে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি জামায়াত থেকে পদত্যাগ করেন সিনিয়র সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক। একই বিষয়ে প্রকাশ্যে অবস্থান নেয়ায় দল থেকে বহিষ্কৃত হন মুজিবুর রহমান মঞ্জু। এ পরিস্থিতিতে চাপে পড়ে জামায়াত নতুন সংগঠন গড়ার ঘোষণা দেয়। জামায়াতের সংস্কারমনস্ক নেতাদের অনেকেই মনে করেন, নতুন নামে দল গঠনের যে ঘোষণা দেয়া হয়েছিল, তা কার্যত দলের ভেতরকার চাপ কাটানো এবং উত্তেজনা প্রশমনের একটা তাৎক্ষণিক কৌশল মাত্র। দলের সংস্কার দূরের কথা, উল্টো সংস্কার ঠেকাতে বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে সাংগঠনিক সফর করেছেন দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা। তারা এসব সফরে সংস্কারপন্থি নেতাদের অবস্থানের বিরুদ্ধে কথা বলার পাশাপাশি নেতাকর্মীদের ওপর নজরদারি বাড়িয়েছেন।
জামায়াত নেতারা জানান, ইতোমধ্যে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও রাজশাহী অঞ্চলের জামায়াত-শিবিরের নানা পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের ডেকে আলাদাভাবে কথা বলেছেন রক্ষণশীল নেতারা। কাজ না হলে ধমকও দিয়েছেন। কিন্তু তাদের মধ্যে কেউ কেউ সবকিছু উপেক্ষা করে সংস্কার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকবেন বলে জানিয়ে দিয়েছেন। সংস্কারপন্থি এক নেতা বলেন, জামায়াতের বর্তমান কমিটি গঠনের পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ উত্তরাঞ্চলের শিবির নেতাকর্মীদের অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। এতে জামায়াত দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। ক্ষুব্ধ এসব নেতার বড় একটি অংশই সংস্কারপন্থিদের দলে যোগ দেবেন বলে তাদের কথা দিয়েছেন। অনেকে ইতোমধ্যে কাজও শুরু করে দিয়েছেন।
এদিকে সংস্কারপন্থিদের রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ ঠেকাতে সম্প্রতি জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল শফিকুর রহমানসহ কয়েকজন নেতা সৌদি আরব, মালয়েশিয়া ও লন্ডন সফর করেন। তারা সেখানকার দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে একাধিক ঘরোয়া বৈঠক করেন। সেখানেও তারা সংগঠনের প্রবাসী দায়িত্বশীলদের সংস্কারপন্থিদের ব্যাপারে সতর্ক করেন। বর্তমানে শফিকুর রহমান লন্ডনে অবস্থান করছেন। দেশ তিনটিতে জামায়াতের অনেক নেতাকর্মী ও সমর্থক আছেন, যাদের একটি বড় অংশ জামায়াতের সংস্কার চায়। সেখানকার সদস্যদের আর্থিক অবস্থাও ভালো। তাদের দেয়া অর্থ জামায়াতের কেন্দ্রীয় তহবিলে জমা হয়।
নতুন রাজনৈতিক মঞ্চ গঠনের কাজ শুরু করলেও ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক এ ধরনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত নয় বলা হলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে রাজ্জাকেরও সম্পৃক্ততা আছে। গত ১১ এপ্রিল লন্ডনের ওসবর্নে আবদুর রাজ্জাকের আইন পেশার ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ‘এন ইভিনিং উইথ ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক’ শিরোনামে সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। আব্দুর রাজ্জাকের ওই অনুষ্ঠানে যেন কোনো নেতাকর্মী না যায়, সে বিষয়েও সতর্ক ছিল জামায়াতের রক্ষণশীলরা। এ ছাড়া গত ২৫ মার্চ ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে নিউজিল্যান্ডের মসজিদে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে মানবিক সংহতি জানাতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন মুজিবুর রহমান। ওই অনুষ্ঠানেও দলের কেউ যেন অংশ না নেন, সে জন্য জামায়াতের শীর্ষ পর্যায় থেকে মৌখিকভাবে সাংগঠনিক নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়