উয়েফায় তিন ম্যাচ নিষিদ্ধ নেইমার

আগের সংবাদ

হুমায়ুন আজাদের অগ্রন্থিত কবিতা ও গদ্য

পরের সংবাদ

বাবা, ওপারে ভালো থেকো

প্রকাশিত: এপ্রিল ২৭, ২০১৯ , ৮:২৮ অপরাহ্ণ আপডেট: এপ্রিল ২৭, ২০১৯ , ৮:২৮ অপরাহ্ণ

২৮ এপ্রিল। প্রতি বছরই ঘুরেফিরে এ দিনটি আসে। বাবা মারা গেলেন ১৫ বছর হয়ে গেল। তারপরও তাঁর লেখার যারা ভক্ত তাদের তাঁর সম্পর্কে জানার এখনো রয়েছে প্রবল আগ্রহ। আমার মনে হয় একজন লেখককে সবচেয়ে ভালো বোঝেন অন্য লেখকরা বা তাঁর ভক্তরা যারা তাঁর বই পড়ে তাঁর বোধ, মেধা ও চিন্তাকে ধারণ করতে চেষ্টা করেন। আমি তাঁর লেখার চুলচেড়া বিশ্লেষণ করার মতো ক্ষমতা রাখি না বলেই মনে করি। আমি কেবলই তার ঘরের মানুষ। দেখেছি তাঁকে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত- বাবা হিসেবে। মাঝেমাঝে হয়তো পাঠকের ঘরের মানুষের কাছ থেকেও জানার আগ্রহ হয়। আর তাই ‘ভোরের কাগজের’ অনুুরোধে তাঁর বিষয়ে লিখতে বসলাম।

অন্য আট-দশজন বাবার মতোই তিনি ছিলেন দায়িত্বশীল। তিনি বাজার করতেন, আমাদের পড়াশোনার খবর নিতেন, নিজের চা নিজেই বানিয়ে খেতেন, মাঝেমধ্যে রান্নাও করতেন, কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে বাবাকে আমাকে ভীষণ একাকী ও নিঃসঙ্গ মনে হতো। একলা থাকতে ভীষণ পছন্দই করতেন, বলা যায় রীতিমতো উপভোগ করতেন। একলা না থাকলে চারপাশটা সূক্ষ্মভাবে উপলব্ধি করা যায় কি? কোনো কিছুর গভীরে যাওয়া যায় কি? আর সবকিছু যদি দেখার মতো দেখাই না যায় তবে লেখা যায় কি? বাবা তাঁর- চারপাশ-সমাজ-দেশ-মানুষ এমনকি বাসার কার্নিশে বসা কর্কশ স্বরে ডাকা কাককে তাঁর মতো করে দেখতেন ও ভাবতেন। তাঁকে আমি কখনো দেশে অনুষ্ঠিত কোনো বড় বড় অনুষ্ঠানে যেতে দেখিনি বা সেসব অনুষ্ঠানে যাবার জন্য তার মধ্যে বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখিনি। তিনি অনুষ্ঠানের ভিড় এড়িয়ে বিজ্ঞানমনস্ক তরুণদের নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন ফুলার রোডের মাঠে গুনতেন রাতের আকাশের তারা। সে সময় বাবার মহাবিশ্ব বইটি বের হয়। বিজ্ঞানের ছাত্ররা বাবার কাছে এ বইয়ের বিষয়ে আসতো এবং তাঁকে বিভিন্ন প্রশ্ন করতেন। তিনি সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন- আমি বুঝতে পারতাম না তিনি কীভাবে বিজ্ঞানের এত প্রশ্নের উত্তর দিতেন! তাঁর সবচেয়ে বড় গুণ আমার মনে হতো সবকিছুকে ব্যাখা দিতেন যুক্তি দিয়ে। দেখতাম তাঁর সাথে তর্কে পেড়ে ওঠা ছিল সবার জন্যই বেশ কঠিন। তিনি প্রচুর পড়তেন তাই যখন তর্কে নামতেন তখন ব্যবহার করতেন বিভিন্ন বইয়ের রেফারেন্স। তাঁর জানার পরিধি দেখে সবাই অবাকই হতো। যে কোনো বিষয়কে গভীরভাবে চিন্তা করা ছিল মনে হয় তার স্বভাবজাত। বাবা আমার ব্যক্তিগত জীবনে কিছু পথ দেখিয়ে দিয়েছেন। উদাহরণ দেই :

তখন আমি সবে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। উচ্চ মাধ্যমিকে ভালো ফলাফলের জন্য সে সময় বোর্ড স্কলারশিপ দেয়া হতো (এখন চালু আছে কিনা জানি না)। ভালো কথা আমি স্কলারশিপ পেলাম। কিন্তু আমার প্রাপ্য টাকা আমার হলে আসতে দেরি হচ্ছিল। হল থেকে জানানো হলো আমার নামের বানানে ভুল আছে তাই বোর্ড টাকাটা পাঠাচ্ছে না। বাসায় বিষয়টি জানালাম। মা বাবাকে বললেন- ‘মৌলির এরকম সমস্যা তুমি (যেহেতু বাবাকে সবাই চেনে) বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কাউকে ফোন দাও’। তিনি সরাসরি বললেন, তিনি কাউকে ফোন দিতে পারবেন না। মৌলি নিজেই বোর্ড অফিসে গিয়ে এ সমস্যার সমাধান করবে। আমি মনে মনে বিরক্ত হলাম। ভাবলাম এত পরিচিত বাবা থেকে আমার লাভ কি হলো? বান্ধবীদের বাবারা হলে যে দৌড় মারতো তা তো আমি জানতাম- তাই সেসব বাবাদের মেয়ে কেন হলাম না- এ ভেবে নিজের ওপর নিজেরই রাগ হতে লাগলো। তখন আমার ১৯ কি ২০ বছর। কি আর করা? নিজেই কাগজপত্র নিয়ে বোর্ড অফিসের ঠিকানা জোগাড় করে রওয়ানা হলাম (তখন কোনো গুগল ম্যাপ ছিল না)। তাই নিজেই রাস্তার লোকজনের কাছে তথ্য নিতে নিতে অফিসে পৌঁছালাম। অফিসে গিয়ে রিসেপশন থেকে কার কাছে যেতে হবে জেনে তার ডেস্কে গিয়ে আমার সমস্যা বললাম। লোকটি বেশ দ্রুত কাজটা করে দিল। তিনি বললেন তোমার কাজ শেষ- তোমার হলে গিয়ে এ কাগজটা দেখালেই সামনের মাস থেকে টাকাটা পাবে। আমি হেসে বেরিয়ে আসলাম। কাজটা হয়তো তেমন কঠিন কিছু না, কিন্তু সে বয়সে নিজে নিজে কাজটা করতে পারায় কেমন যেন মনে একটা জোড় এসে গেল।

এরপর নিজের ছোটখাটো অসুখ বিসুখে মা বাবাকে ইনভলভড না করে নিজেই নীলক্ষেত মার্কেটের ফার্মেসির ডাক্তারকে দেখাতাম (তখন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় থাকতাম বিধায়), যে কোনো পরীক্ষায় স্যারদের সঙ্গে যোগাযোগ- নিজের জিনিসপত্র কেনা- পরীক্ষা/চাকরির ইন্টারভিঊ সবকিছুতেই মা বাবাকে ইনভলভ করা ধীরে ধীরে কমাতে লাগলাম। এভাবে স্বাধীনতা পেয়ে একা কাজ করতে করতে বলা যায় বেশ ‘কাজের মেয়েই’ হয়ে উঠলাম। বাড়ল কনফিডেন্স। শিখলাম নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজেই নেবার। আমার মতো অনেক মধ্যবয়সী মহিলাকে চিনি যারা এখনো নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারে না- হাঁ করে তাকিয়ে থাকেন অন্যের ডিসিশনের ওপর। আমার মনে পড়ে না ২৭-২৮ বছরের পর অন্য কারো ডিসিশনে আমি চলেছি কিনা! আমি একাই সব করি-মাঝরাতে অসুস্থ হয়ে পড়লে উবার নিয়ে একাই চলে যাই হসপিটালে এমনকি বিদেশবিভূঁইয়ে অসুস্থ হলেও কোনো পুরুষের ওপর নির্ভর না করে একাই পথ চলি।

ধন্যবাদ বাবা- এক সময় তুমি আমার কাজে সাহায্য করতে না দেখে আমি তোমার ওপর বিরক্ত হতাম আর এই মধ্য বয়সে এসে বুঝি তুমি আমাকে কতটা পরিণত হতে শিখিয়ে দিয়ে গেছো।

তাঁর মতো আধুনিক, মুক্তচিন্তার মানুষ আমি খুব কমই দেখেছি। কোন পদ- পদকের জন্য তাঁকে উদগ্রীব দেখিনি।

ভালোবাসতেন পড়ার মতো বই-ই কেবল পড়তে। বিদেশ নয় এই বাংলাদেশ ছিল তাঁর সব চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে। রাড়িখাল ছিল তাঁর প্রিয় ঘোরার জায়গা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাকে মনে করতেন তাঁর বাস করার জন্য সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ স্থান। দলাদলি/সংগঠন থেকে নিজেকে মনে হয় লেখার স্বার্থেই দূরে রাখতেন। বাবার লেখা কবিতা ‘আমি বেঁচে ছিলাম অন্যদের সময়ে’ পড়লে মনে হয় তাঁর নিজ জীবনের কথা যেন। তাঁর মতো মেরুদ-সম্পন্ন মানুষ আমি আজকাল দেখি না। বাইরে তাঁকে কঠিন মনে হলেও ভিতরটা অনেক সময় মনে হতো খুব কোমল। তাঁর হাসি যেন তাই প্রমাণ করতো।

তাঁকে কখনো নিজ জন্মদিন পালনে আগ্রহী দেখিনি। কোনো সংগঠন তা করতে চাইলে মৃদুভাবেই না বলতেন। তাঁর জন্মদিন মূলত ঘরোয়াভাবে আমাদের মা আয়োজন করতেন। মনে হতো খুশিই হতেন। তাঁর ৫০তম জন্মদিনে ‘আগামী প্রকাশনী’ থেকে বের হয়েছিল তাঁর লেখার সংকলন যাতে তিনি আনন্দিত হন। লেখালেখি-বই-বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেয়া এতেই তিনি পেতেন আনন্দ। ভালো থাকতেন এদের ঘিরেই।

বহুবছর তাঁকে দেখি না। আর দেখা হবে না আমাদের। জানি তাঁর প্রিয় ক্যাম্পাস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-শাহবাগ-বইমেলা কোথাও তাঁকে আমি খুঁজে পাবো না। যে রাড়িখালে এক সময় হেঁটে বেড়িয়েছেন তিনি সেই প্রিয় রাড়িখালের মাটিতেই শুয়ে আছেন এখন। জানি এ ঘুম ভাঙবে না কখনো। জানি না কেমন আছেন ওপারে তিনি কিন্তু তিনি তো ভালো থাকতে বলে গেছেন সবাইকে- তাই না?

‘ভালো থেকো নাও, মধুমতি গাঁও, ভালো থেকো
‘ভালো থেকো মেলা, লাল ছেলেবেলা, ভালো থেকো
ভালো থেকো, ভালো থেকো, ভালো থেকো।’
আমরা ভালো আছি বা ভালো থাকার জন্য নিরন্তর সবাই চেষ্টা করে যাচ্ছি।
ওপারে তুমি ভালো থেকো, বাবা।
শুভ জন্মদিনে শ্রদ্ধা।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়