হুমায়ুন আজাদ একটি নক্ষত্রের নাম

আগের সংবাদ

ছিনতাইয়ের কবলে চবির ৫০ শিক্ষার্থী

পরের সংবাদ

কাল-কালান্তরের সমাজ-রাষ্ট্র

প্রকাশিত: এপ্রিল ২৭, ২০১৯ , ৮:৫৪ অপরাহ্ণ আপডেট: এপ্রিল ২৭, ২০১৯ , ৯:০২ অপরাহ্ণ

খুব ছোট্ট পরিসরে অসামান্য একজন মানুষকে নিয়ে বইয়ের লেখক লিখতে চেষ্টা করেছেন লেখাটি যত ছোটই হোক আকারে, প্রকারে বিশাল। তাঁর লেখার শিরোনাম ‘যিনি সকলের স্যার’। মহান মানুষটি হচ্ছেন ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি শিক্ষক ছাত্রদের, সঙ্গে সমাজেরও।

সাহিত্যের সবচেয়ে জটিলতম অধ্যায় হচ্ছে প্রবন্ধ। ওখানে আবেগের স্থান নেই। যুক্তি, বুদ্ধি, বিচারশক্তি অর্থাৎ মেধার ক্রিয়া চলে ওখানে। সেখানে লিখিয়েদের ভিড় খুব কম। দেখা গেছে জনবিরল ওই স্থানের দিকে বড় সাহসে কেউ কেউ হেঁটে গেছেন। মযহারুল ইসলাম বাবলা তাঁদেরই একজন। তিনি ইতোমধ্যে পাঠক মহলে চেনা হয়ে গেছেন। অনেক ক’টা বই আছে তাঁর। সমাজ ও রাজনীতির সেকাল একাল তার মধ্যে অন্যতম। বইটির শিরোনামেই এর ভেতরকার অর্থাৎ অন্তঃসারকে চেনা যায়। এ বইটিকে যদি আমরা একটি বৃক্ষ বলি তবে বলতে হয় এর অনেক ক’টি শাখা-প্রশাখা আছে। অর্থাৎ প্রবন্ধগুলো বিষয় বৈচিত্র্যে বৃক্ষ শাখার মতো। ইতিহাস, রাষ্ট্রনীতি, সমাজ, স্মৃতি, বিগতকাল, সমকাল অর্থাৎ জীবন ও কালের প্রায় সবদিকই রচনাগুলোর বিষয়ভাবনা।
গ্রন্থের প্রতিটি লেখাই গুরুত্ব বহন করে। এর ভেতর এমন কিছু লেখা আছে যার সঙ্গে মানবসভ্যতার বিপ্রতীপ বা প্রতিকূলতার সম্পর্ক। ‘জাত প্রথায় শ্রেণি শোষণ’ অন্যতম প্রধান লেখা। লেখক দেখিয়েছেন হিন্দু বর্ণবাদ কীভাবে সমাজ-রাষ্ট্রের রক্তে মিশে আছে। ধর্মগুরুরাও যে এ থেকে মুক্ত নন, রামকৃষ্ণের কথা বলতে গিয়ে লেখক তা স্পষ্ট করেছেন। বর্ণবাদ নিয়ে বাংলা সাহিত্যের দৃষ্টান্তও দেখিয়েছেন লেখক। আসল কথা হচ্ছে এই বর্ণবাদ ধর্মাশ্রয়ীও বটে। ধর্মগ্রন্থ ঋগে¦দ বর্ণপ্রথাকে স্পষ্ট করে দিয়েছে। দলিত নেতা আম্বেদকর ধর্ম বদল করেও এর নিষ্ঠুরতা থেকে মুক্তি পাননি। বিস্ময়কর এই যে, বর্তমানে ভারতবর্ষে বহু প্রদেশের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জনজাতিগুলো নিজেদের নীচুবর্গ তফসিলি জাতি হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি পেতে আন্দোলনে নেমে পড়েছে। বর্ণবাদের অভিশাপ মুক্তির বদলে বর্ণবাদকেই রক্ষাকবচ হিসেবে ওরা আঁকড়ে ধরতে চায়। উদ্দেশ্য সরকারি দান-দক্ষিণা, চাকরি, অনুদান ইত্যাদির সুবিধা লাভ। রক্ষা কবচ থাকলে মন্ত্রী, বিধায়ক, সাংসদ, পঞ্চায়েত হওয়া যায় এবং শ্রেণি বদল করে ধনী আর ক্ষমতাবানও হওয়া যায়। ভারতীয় শাসকশ্রেণি এভাবেই নিম্নবর্গকে বশে রাখার কৌশল নিয়েছে। বিষয়টা এমন যে শাসকদের দয়া, করুণা, ভিক্ষা, অনুদান যদি বিত্ত আর ক্ষমতা কিংবা সম্মানের সরকারি বড় পদ এনে দেয় তবে তারা বর্ণবাদ ধ্বংসের বদলে নিজেরাই বর্ণবাদকে টিকিয়ে রাখতে চায়। ভারতীয় শোষক বুর্জোয়া শ্রেণির অপকৌশল এভাবেই জয়ী হচ্ছে। যে কোনো সচেতন মানুষ এই বাস্তব অবস্থার সামনে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যেতে বাধ্য।

গ্রন্থের প্রবন্ধকার মযহারুল ইসলাম বাবলা তাঁর ‘ধর্মভেদে গরু ও গরুকেন্দ্রিক রাজনীতি’ লেখায় নিজের মতামতকে সমাজ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের উচ্চতর বিশ্লেষণে তুলে আনতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর লেখার পরিভ্রমণ আন্তর্জাতিক। আরববিশ্ব থেকে উপমহাদেশ। পুষ্টিবিজ্ঞান থেকে অর্থনীতি আর রাজনীতির নিক্তিতে মেপে অত্যন্ত নিরপেক্ষভাবে বিষয়টিকে দেখেছেন রচনাকার। বর্তমান ভারতবর্ষে মানুষ আর সমাজ নিয়ে চিরাচরিত যে রাজনীতি তার একেবারে উল্টো। মৌলবাদীরা মানুষকে দূরে ঠেলে গরুকে টেনে এনেছে সামনে। মানুষ আজ তাদের কাছে জীব জগতের শ্রেষ্ঠ প্রাণী নয়, বরং ইতরপ্রাণী গরু। মানুষকে পায়ে ঠেলে গরুকে পূজনীয় করে নিয়েছে। গরুর জীবন ও মর্যাদা আকাশ ছুঁয়েছে, মানুষ গড়াগড়ি খায় মাটি আর কাদায়। সবার ওপরে গরু সত্য তার ওপরে কিছু নাই। এরই নাম শোষকের রাজনীতি। মানুষ জাতির এতবড় অসম্মান কে কবে দেখেছে?

মূল্যবান এই বই পাঠকমাত্রকেই নাড়া দেবে বইটির বিষয় ভাবনার কারণে। প্রবন্ধকার কখনো প্রাচীন পরিব্রাজকের মতো বিশ্ব ভ্রমণে বেরিয়েছেন প্রাচীন ইতিহাসের পা-ুলিপি হাতে। পর্তুগিজ আগ্রাসনে পতিত সতের শতকের ভারতবর্ষ, আঠার শতকের সিপাহি বিদ্রোহ থেকে তিনি একেবারে সমকালের সামাজিক- জীবন, যেমন ঈদপার্বণ থেকে দৈনন্দিন বাজারের দুনিয়ায় হেঁটে গেছেন অবলীলায়। বাঙালির ভাষা-সংস্কৃতি, তার নববর্ষ, বিগত বছরের প্রাপ্তি শূন্যতাকেও আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন তাঁর প্রবন্ধে।

‘সমাজ বদলের বিকল্প নেই’ রচনায় স্পষ্ট করেছেন কেন, কোন পথে সমাজকে বদলাতে হবে। শাসক যারাই ক্ষমতায় থাকুক তাদের শ্রেণি আর রঙ যে এক অর্থাৎ শোষক, সে কথা সাহসের সঙ্গে স্পষ্ট করেছেন তাঁর লেখা ‘সকল শাসকের রঙ অভিন্ন’ প্রবন্ধে। সমাজ না বদলালে শাসক বদলে যে যোগফল শূন্য এমন উদাহরণ তাঁর স্পষ্ট। কেবল জাতীয় নয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতির পথে প্রবন্ধকারের পরিভ্রমণ পাঠককে কৌতূহল জোগাবে। আধিপত্য রক্ষা আর আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মার্কিন রুশ দ্বন্দ্ব নিয়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ প্রবন্ধ লিখেছেন লেখক ‘আধিপত্য বিস্তারে দুই পরাশক্তি’ শিরোনামে। আমেরিকা আর রাশিয়ার দ্বন্দ্বটা আজ আর পুঁজিবাদ বনাম সমাজবাদের দ্বন্দ্ব নয়, বরং পুঁজিবাদ আর পুঁজিবাদের তৈল, বাজার আর ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের দ্বন্দ্ব। পরের প্রবন্ধের লেখাটি পাঠকের কৌতূহলের বিষয়। ‘যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের ক্রীড়নক এরদোগান’। মুসলিম দেশ হয়েও কি করে ‘ইহুদি রাষ্ট্র’ ইসরাইলের কেবল বন্ধু রাষ্ট্রই নয়, স্বার্থরক্ষাকারী রাষ্ট্র তুরস্ক, সে বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন প্রবন্ধকার। অথচ তুরস্ক আজো ইউরোপের অপরাপর প্রভাবশালী রাষ্ট্রের কাছে ব্রাত্য, ইউরোপীয় অঞ্চলের হয়েও। প্রশ্ন হলো খ্রিস্ট ইউরোপের দেশগুলোর প্রতি মুসলিম দেশ তুরস্ক কেনো এত অনুগত? কেন সে মুসলিম নিপীড়নকারী ইসরাইলের প্রতি ক্ষুব্ধ হতে পারছে না? পারছে না এ কারণেই যে, সাম্রাজ্যবাদী ইঙ্গ-মার্কিন শক্তির কাছে তুরস্কের শাসকশ্রেণি নিজের স্বার্থ রক্ষার্থে দায়বদ্ধ। স্বধর্মী জনগণের স্বার্থের চেয়ে আপন স্বার্থই প্রধান। দেশের চেয়ে সাম্রাজ্যবাদই তাদের প্রভু এবং বন্ধু।

‘ঈদের বদলে যাওয়া’ প্রবন্ধটি নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। সমাজ যে কতটা বদলেছে, সমাজের মূল্যবোধের বিবর্তন কতটা ঘটেছে, মানুষ সমাজের অপরাপর মানুষ থেকে কতটা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, আজকের ঈদ তার প্রমাণ। ঈদের আনন্দ থেকে শুরু করে ধনী-দরিদ্রের ভেতর অন্তত একদিনের জন্য হলেও যে শ্রেণি বিলোপের কথা ইসলাম বলেছে তা আজ আর নেই। শ্রেণিটা বরং আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে ঈদের পোশাকে-আশাকে। খাওয়া-খাদ্যে, চলনে-বলনে এবং ব্যক্তির আচরণে। সম্প্রীতি বলতে যা বোঝায় তা আদতে আন্তরিকতা শূন্য, লৌকিকতামাত্র। কেবল ঈদ নয়, পুঁজিবাদী বিশ্বের সব ধর্মের সব অনুষ্ঠানই আজ ব্যক্তির আনন্দ আর ব্যক্তির উপভোগই প্রধান। সেখানে ‘মহামানবের মিলন’ বিষয়টা আজ আর নেই। কেন নেই? কেননা পুঁজিবাদী সমাজ আর রাষ্ট্রব্যবস্থা এমনি নির্মম যে, মানুষের সব শুভবুদ্ধি, মানবিক বোধ, স্নেহ-ভালোবাসা সবই গিলে খায়। আনন্দ আজ সর্বজনীন নয়, বরং ব্যক্তিকেন্দ্রিক।

খুব ছোট্ট পরিসরে অসামান্য একজন মানুষকে নিয়ে বইয়ের লেখক লিখতে চেষ্টা করেছেন লেখাটি যত ছোটই হোক আকারে, প্রকারে বিশাল। তাঁর লেখার শিরোনাম ‘যিনি সকলের স্যার’। মহান মানুষটি হচ্ছেন ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি শিক্ষক ছাত্রদের, সঙ্গে সমাজেরও। ‘জাতীয় অধ্যাপক’ নামক প্রাতিষ্ঠানিক যে পদবি রয়েছে বিশ্বের সব দেশেই, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সেই সীমানাকে ছাড়িয়ে ছড়িয়ে আছেন জ্ঞানে, মনুষ্যত্বে, মানবিকতায়, প্রগতিতে, সৃষ্টিশীলতায়। তিনি নিজেই গবেষণার বিষয়, তাঁর সাধনা নিয়ে লেখা বড় সহজ নয়, তাঁর সৃষ্টির মতোই শ্রমসাধ্য। প্রবন্ধকার চেষ্টা করেছেন, এ জন্য তাকে তারিফ করতেই হয়। বইয়ের শেষ লেখা ‘সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় অসামান্য স্ট্যালিন’ এই লেখা দিয়েই চেনা যায় বইটি লেখার উদ্দেশ্য এবং লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি কোন সমাজ-শ্রেণির বন্ধু তাও স্পষ্ট হয়। বইটি মূল্যবান। বইটি প্রকাশ করেছে কথাপ্রকাশ।

সমাজ ও রাজনীতির সেকাল-একাল, মযহারুল ইসলাম বাবলা, কথাপ্রকাশ, ঢাকা, ৩৫০ টাকা।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়