নীলক্ষেতে সাত কলেজ শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধ

আগের সংবাদ

দুরন্ত মেয়েদের উড়ন্ত সূচনা

পরের সংবাদ

শিল্পকলায় প্রথা ভাঙল নাট্যজনের ‘মুনতাসির’

প্রকাশিত হয়েছে: এপ্রিল ২৩, ২০১৯ , ১২:৩৫ অপরাহ্ণ | আপডেট: এপ্রিল ২৩, ২০১৯, ১২:৪১ অপরাহ্ণ

Avatar

সেলিম আল দীনের প্রথা ভাঙার ধারার অন্যতম নাটক ‘মুনতাসির’ মঞ্চস্থ হলো। প্রথাটি ভাঙল নাট্যজন। গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় শিল্পকলা একাডেমির প্রধান মিলনায়তনে মঞ্চায়ন হলো এর দশম প্রযোজনা। মিউজিক্যাল কমেডি ঘরানায় তৈরি মুনতাসির নাটকটির নির্দেশনা দিয়েছেন সেলিম কামাল।
নাটকটি প্রথম মঞ্চায়িত হয় ১৯৭৩ সালে। ‘মুনতাসির’কে বলা হয় বাংলাদেশের প্রথম মিউজিক্যাল কমেডি। এর আঙ্গিকটা লক্ষ্য করার মতো। নাটকের শুরু থেকেই একদল লোক বাদ্য বাজাতে বাজাতে মঞ্চে আবির্ভূত হয় এবং নাম ভূমিকা চরিত্রটির সম্পর্কে তথ্য সরবরাহ করতে থাকে। প্ল্যাকার্ড নিয়েও ক’জন পুরো নাটক জুড়েই মঞ্চে আসা-যাওয়া করতে থাকে। তাদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডগুলোতেও নাম ভূমিকা চরিত্রটির সম্পর্কে তথ্যে পূর্ণ। নাটকের গল্প বিন্যাসে রচনাকালের সমসাময়িক সময়টাকে পাওয়া যায়। সময়টা মুক্তিযুদ্ধোত্তর স্বাধীন বাংলাদেশের। সেলিম আল দীন গল্পে খামখেয়ালি আর রাক্ষসের মতো সর্বভুক এক চরিত্র এঁকেছেন। এই চরিত্রটিই পুরো মঞ্চটাকে নিয়ন্ত্রণ করে চলে। এই চরিত্রটিই মুনতাসির। ওই সময়ের সৃষ্টি, বস্তু থেকে শুরু করে সৃজনশীলতা, প্রেম, দ্রোহ, ইতিহাস, আন্দোলন সবই খেয়ে ফেলার তাড়না নিয়ে মুনতাসির মঞ্চে চলমান থাকেন। ঘুমের ঘোরে হাঁটাহাঁটি করেন। লক্ষ্যহীন এলোমেলো দৃষ্টি আর চলাচল মুনতাসিরের। সমাজ, রাষ্ট্র, অফিস, আদালত, এমনকি হাসপাতালের মতো মানবিক চেতনায় উন্মুখ থাকার জায়গাটিও হয়ে ওঠে অবহেলা আর উদাসীনতার প্রতীক।
হাসপাতালের এক ডাক্তার জানালেন, মুনতাসির মাল্টিমিলিওনার এবং জাতীয়তাবাদী নেতাও। বাঙালি জাতির ইতিহাসে মুনতাসির সেই বিশ্রুত ব্যক্তি যার রাজনৈতিক ইতিহাস তার ব্যাংক ব্যালেন্সের অঙ্কের মতোই প্রচুর চাঞ্চল্যকর ঘটনায় পূর্ণ। যুদ্ধের আগে মুনতাসির দুটা ছোট লজেন্স ও শিশুতোষ খেলনা তৈরি কারখানার মালিক ছিলেন। ঊনসত্তরের গণআন্দোলনে লাখ লাখ মানুষ মুনতাসিরের কারখানার লজেন্স খেয়েই নাকি মার্চের খর রোদে স্লোগান আর সংগ্রাম করবার প্রথম প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন।
কিন্তু যুদ্ধ শুরু হলে মুনতাসির হঠাৎ করেই নিশ্চুপ হয়ে যান। তার কারখানা দুটোও বন্ধ হয়ে যায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার কয়েকদিন আগে পয়লা ডিসেম্বরে মুনতাসির পশ্চিমা শোষকদের হাতে ধরা পড়েন। ধরা পড়বার পর একটানা ষোলোদিন মুনতাসিরকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। তখন থেকেই মুনতাসিরের অসুখটার শুরু। মুনতাসিরের অসুখটার নাম এপেটাইট। এ অসুখ মুনতাসিরকে রাক্ষসের মতো সর্বভুক বানিয়ে ফেলে। তিনি শুধু খাই খাই করেন। কোনো কিছুতেই তার অরুচি নেই। তিনি শিল্প খেয়ে ফেলেন, সমাজ খেয়ে ফেলেন, অর্থনীতি খেয়ে ফেলেন, মনুষ্যত্ব খেয়ে ফেলেন, পুরো দেশটাই যেন মুনতাসির তার পেটে ঢুকিয়ে ফেলতে চান। অতৃপ্ত হিংস্র পুঁজির রাক্ষুসে ক্ষুধায় মুনতাসির সবকিছুই নিঃশেষ করে দিতে চান, কিছুই বাদ দেন না, সবই তিনি চান গোগ্রাসে খেয়ে ফেলতে।
অবশেষে অস্ত্রোপচার হয় মুনতাসিরের পেটে। অস্ত্রোপচারের টেবিলে মুনতাসিরের পেট থেকে বের হয় টিসিবির শাড়ি, গামছা, দলিলপত্র, শিল্পসঙ্গীত, নারীর আব্রু, দড়িসহ আরো অনেক কিছু। মুনতাসির অস্ত্রোপচারের সময় মারা যান। তবে এখানেই এই মিউজিক্যাল কমেডি শেষ হয় না।
মুক্তিযুদ্ধের পরের বাংলাদেশটাতে যেন রাক্ষুসে ক্ষুধার মুনতাসিরদের দৌরাত্ম্য বেড়ে গিয়েছিল। সে সময়ের পত্রপত্রিকা, কথাসাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্রগুলোও আমাদের সেই তথ্যই দেয়। সেলিম আল দীন মুনতাসিরকে দিয়ে জানালেন, মুনতাসিরের পেট থেকে বের হওয়া সুদীর্ঘ দড়িটি ছাপান্ন হাজার বর্গমাইলের স্বার্থপর আর লোভী লোকেদের মুনতাসিরের রিপু নিয়ে বেঁধে ফেলতে শুরু করেছিল।
নাটকে অভিনয় করেন তবিবুল ইসলাম, বিজন সরকার, শেখ খায়ের, সেলিম কামাল, মহসীন শামীম, শাহীন শিবলী, অভি প্রামাণিক, শরিফুল ইসলাম, আল-ইমরান, রুক্সি, আশা, মায়া, আদিফ প্রমুখ।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা