রানা প্লাজা: বিচারহীনতা এবং অনিরাপত্তার বসতি

আগের সংবাদ

বিমানবন্দরে শেখ সেলিমকে প্রধানমন্ত্রীর সান্ত্বনা

পরের সংবাদ

প্যারোল না জামিন ও শপথ না বর্জন প্রশ্নে ফয়সালা হবে কি?

প্রকাশিত হয়েছে: এপ্রিল ২৩, ২০১৯ , ৮:৫০ অপরাহ্ণ | আপডেট: এপ্রিল ২৩, ২০১৯, ৮:৫০ অপরাহ্ণ

শেখর দত্ত

রাজনীতিক ও কলাম লেখক।

আগামী ৬ দিনে দেনদরবার সামনে রেখে চাপ কে কতটা দিতে পারবে, শর্ত কার পক্ষে কতটা নিতে পারবে কিংবা সমঝোতা হবে কিনা প্রভৃতি সুস্পষ্ট হবে। প্যারোল না জামিন, শপথ না বর্জন এই প্রশ্নের ফয়সালা হবে। এটা হওয়ার ভেতর দিয়ে দেশের রাজনীতির গতি-প্রকৃতিও অনেকটাই নির্ধারিত হবে। সমঝোতা ও সংগ্রামের রাজনীতি নাকি সংঘাত ও সংঘর্ষের রাজনীতি কোন পথ নিবে দেশ এটা নির্ধারিত হবে আগামী কয়েকদিনের মধ্যে।

আর মাত্র ৬ দিন বাকি। এই সময়ের মধ্যে নির্বাচিত ৬ জন সংসদ সদস্য শপথ গ্রহণ না করলে সংসদ আবারো বিএনপিশূন্য হয়ে পড়বে। এমনটা হলে দেশের রাজনীতির গতিধারায় কি প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে আলোচনায় যাওয়ার আগে অতীতের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। বিগত সময়ের নির্বাচন ও সংসদ বয়কট পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, দুই বড় দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি একত্রে অথবা ওই দুই দলের যে কোনো একটি যদি বয়কটের লাইনে যায়, তবে দুটো দিক লক্ষণীয় হয়ে ওঠে। প্রথমত, জনসম্পৃক্ত আন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করে; দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক চাপ কাক্সিক্ষত না হলেও তা প্রবল হতে থাকে। ফলে হয় নির্বাচন হতে পারে না কিংবা নির্বাচন হলেও সংসদ পুরো সময়কাল টিকে থাকতে পারে না। কিন্তু বিগত দশ বছরের অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দিয়ে গেল, বিএনপি সংসদ ও নির্বাচন বয়কট করলে আন্দোলন কিংবা আন্তর্জাতিক তেমন কোনো চাপ সৃষ্টি করতে পারে না।
এই অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিলে দেখা যাবে যে, বড় দলের একটি হয়েও অতীতে নির্বাচন ও সংসদ বয়কট করে বিএনপি কখনো এককভাবে আন্দোলন গড়ে তুলে আগাম সংসদ নির্বাচন আদায় করতে সক্ষম হয়নি। আরো লক্ষণীয় যে, জরুরি আইনের ১/১১-এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়া যখন গ্রেপ্তার হন, তখনো দলকে আন্দোলনে নামাতে সক্ষম হয়নি। তারেককে তাই বাধ্য হয়ে মুচলেকা দিয়ে বিদেশে যেতে হয়। আন্দোলনের দল নয় বিএনপি এই কথাটাই কেবল সত্য নয়, আন্দোলন সম্পর্কে ধারণা নিয়েও বিএনপির বিভ্রান্তি রয়েছে। যদি বিভ্রান্তি না থাকতো তবে জনসম্পৃক্ততা নিয়ে ২০১৪ সালের আগে-পরে বিএনপি নির্বাচন-সংসদ বয়কট করে ‘আগুন সন্ত্রাসের’ দিকে দেশকে ঠেলে দিত না। বাস্তবে আন্দোলন বিষয়ে অপরিক্ব ও আনাড়ি বিএনপি ‘বামুন’ হয়ে  সেই দিনগুলোতে আন্দোলনের মাধ্যমে চাঁদ ধরতে চেয়েছিল, ফলে দলটির যা হওয়ার তাই-ই হয়েছে। বিধ্বস্ত, অকার্যকর ও নেতৃত্বহীন হয়ে পড়েছে বিএনপি।

সহজেই ধারণা করা যায় যে, সবকিছু বয়কটের পরিণতির ওই অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়েই বিএনপি বিগত নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। নির্বাচনে অংশ নেয়ার সময় দলটি আশ্চর্যজনকভাবে তার ওজন বুঝতে সক্ষম হয়নি। বিধ্বস্ত, অকার্যকর ও নেতৃত্বহীন অবস্থায় একদিকে জামায়াত আর অন্যদিকে ড. কামাল অর্থাৎ দুই নৌকায় পা দিয়ে যে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বপ্রদানকারী, ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় সুদক্ষ ও উন্নয়ন করার কৃতিত্বে উজ্জীবিত দল আওয়ামী লীগকে হারানো বা কাবু করা যাবে না, এমন সাধারণ একটা বিষয় বুঝতেও বিএনপি অপারগ হয়েছে। বিএনপি যদি একা কিংবা ড. কামালকে বাদ দিয়ে জামায়াতকে নিয়ে কিংবা জামায়াতকে বাদ দিয়ে ড. কামালকে নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিত, তবে নিঃসন্দেহে আরো ভালো করত। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, বিএনপি গলার কাঁটা হাওয়া ভবনখ্যাত ‘ভাইয়া’ প্রবাসী তারেককে দলের মাথা থেকে সরাতে পারেনি। যে ছেলে মাকে জেলে রেখে নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ‘মনোনয়ন বাণিজ্যে’ বদনাম কামাতে পারে, সেই ধরনের কীর্তিমানকে দলীয় প্রধান রেখে যে দল চলতে পারে না, এটা বন্দি খালেদা জিয়া মাতৃস্নেহে অন্ধ বিধায় বুঝতে না পারেন, কিন্তু বিএনপির নেতৃত্ব বা থিংকট্রাঙ্ক কেন বুঝতে পারে না, তা বিএনপি রাজনীতির বিরাট দেউলিয়াত্বের প্রমাণ। এই প্রেক্ষাপটেই বিএনপির ৬ জন সাংসদ শপথ নিয়ে সংসদীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করবে কিনা প্রশ্নটি বিএনপির বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। উল্টোদিকে নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী সংসদকে রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ কেন্দ্র করবে কিনা এ নিয়েও সরকারি দলেরও সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন। দুপক্ষের দুই প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে বলা যায়, সংখ্যায় স্বল্প তথা ৬ জন হলেও গুরুত্ব ও তাৎপর্যের দিক থেকে এর ওজন অনেক অনেক বেশি। পাকিস্তানি আমলে চরম দমনপীড়ন ও বিভ্রান্তির মধ্যে মৌলিক গণতন্ত্রীর পরোক্ষ নির্বাচনে জাতীয় পরিষদে আওয়ামী লীগের এ এইচ এম কামারুজ্জামান, মিজানুর রহমান, ইউসুফ আলী, এ বিএম  নুরুল ইসলাম প্রমুখ কয়েকজন নির্বাচিত হন। ৬ দফা ও ১১ দফার পক্ষে সংসদের ভেতরে তাদের ভূমিকা আন্দোলনের ভাটা কাটিয়ে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টিতে যে অবদান রেখেছে, তা স্মরণে রাখার মতো। সংসদের ভেতর-বাইরে আন্দোলনের ওই অবদানের কথা স্মরণে রেখেছিল বলেই বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার হত্যার পর জিয়া আমলে তথাকথিত রাজনৈতিক দলবিধির আওতায় সামরিক সরকারের লাইসেন্স নিয়ে অমর্যাদাকরভাবে দল পুনরুজ্জীবিত করে  আওয়ামী লীগ নির্বাচন এবং সংসদীয় কার্যক্রমে অংশ নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে বলতেই হয়, রাজনীতিতে সম্মান-অসম্মানের প্রশ্নটি কখনো বড় হতে পারে না। যে দল বড় করবে সেই দল কৌশলে পরাজিত হতে বাধ্য।

প্রসঙ্গত মুক্তি-যোগদান বিষয়ে সরকারি দল-বিএনপির দেনদরবারের বিষয়টি সামনে আসে বিগত ৬ এপ্রিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল যখন বলেন, ‘প্যারোলে খালেদা জিয়ার মুক্তি আইনগত প্রক্রিয়া। সুনির্দিষ্ট কারণ দেখিয়ে আবেদন পেলে প্যারোলে মুক্তির বিষয়টি চিন্তা করে দেখবে সরকার।’ দুদিন পরই আইনমন্ত্রী বলেন, ‘প্যারোলে মুক্তি চাইতে হয়, না চাইলে সরকার কাউকে জোর করে প্যারোল দিতে পারে না।’ অবশ্য এর আগে থেকেই যে দেনদরবার চলছিল, তা পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবরাখবর থেকে সুস্পষ্ট।

আর সমঝোতা প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বঙ্গবন্ধু মেডিকেল হাসপাতালে আনা এবং নতুন করে ভাগ্নে ডা. মামুনকে যুক্ত করে মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়। দেনদরবারে সমঝোতা বিষয়টি এগিয়ে গেলে ১৪ এপ্রিল বিএনপির তিন নেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে দেখা করেন। সুনির্দিষ্টভাবে খালেদা জিয়ার সঙ্গে বিএনপি নেতাদের কি কথা হয়েছে তা জানা না গেলেও এবং বিএনপি নেতারা সবটা অস্বীকার বা নাকচ করলেও কথাবর্তার ধরনধারণ ও ফাঁকফোকর দিয়ে বোঝা যায়, বিএনপির অবস্থা এখন হয়েছে ঠিক কুল রাখি না শ্যাম রাখি প্রবাদের মতো। পত্রপত্রিকা পাঠে জানা যায়, প্যারোলে মুক্তি দেয়ার ক্ষেত্রে সরকারের শর্ত হচ্ছে, এক. ৬ জন সংসদ সদস্য শপথ নিয়ে সংসদীয় কর্মকাণ্ডে যোগ দেবেন; দুই. খালেদা জিয়া প্যারোল নিয়ে চিকিৎসার জন্য সরাসরি লন্ডন চলে যাবেন; তিন. সেখানে গিয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি সম্পর্কে কোনো কথা বলবেন না। বলাই বাহুল্য, বিএনপি যদি চলমান দেনদরবারের সময় আন্দোলনে দলকে মাঠে নামিয়ে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে পারত, তবে শর্ত বিষয়ে বিশেষত প্যারোল না হয়ে জামিন বিষয়ে সরকারকে হয়তোবা মানাতে পারত। কিন্তু সেটা বিএনপি পারছে না। কেবল তাই নয়, ট্রাম্পকার্ডও যে খুবই দুর্বল তা বুঝতে কারোরই অসুবিধা হচ্ছে না। নির্বাচিত সংসদ সদস্য ৫ জন এলাকার জনগণের চাপের কথা বলে শপথ নিতে এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আর  মহাসচিব ও বিজয়ী সংসদ সদস্য ফখরুল ইসলাম তো দেনদরবারের প্রধান নায়ক। ক্রমেই এটা স্পষ্ট হচ্ছে যে, কূটনৈতিক চাপ ছাড়া বিএনপি সরকারের ওপর আর কোনো চাপ প্রয়োগ করতে পারছে না। এই চাপেরও কিন্তু একটা সীমা আছে। এক কথায় দেনদরবারের শর্তে যে বিএনপি পিছিয়ে রয়েছে তা অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মান হচ্ছে। এদিকে ট্রাম্পকার্ড প্রয়োগের সময় চলে যাচ্ছে। যত তিতাই হোক, মুক্তি-যোগদানের উল্লিখিত শর্তযুক্ত ওষুধ গলাধঃকরণ ছাড়া বিএনপির আর গত্যন্তর থাকছে না।
পর্দার অন্তরালে এখন কি হচ্ছে তা না জানা গেলেও বুঝে নিতে অসুবিধা হচ্ছে না, দুই পক্ষই শর্ত নিজ পক্ষে নেয়ার জন্য নানা কিছু করছে, যার অনেকটাই বাইরে পরিদৃষ্ট হচ্ছে। ইতোমধ্যে তারেক জিয়া ও তার স্ত্রী জোবাইদার নামে ইংল্যান্ডের  ব্যাংকে থাকা তিনটি একাউন্ট জব্দের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আদেশ দিয়েছে ঢাকার একটি আদালত এবং সেই আদেশ কার্যকর করার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পাঠিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। তারেক জিয়াকে দেশে ফিরিয়ে আনারও তোড়জোড় বাড়ানো হয়েছে। আবারো পুরনো কারাগারে খালেদা জিয়াকে পাঠানো হবে বলে খবর প্রচারিত হচ্ছে। উল্টোদিকে বিএনপি মহলও নানাভাবে চাপ দিতে চাইছে। নির্বাচিতরা যাতে সংসদে যোগদানের জন্য শপথ গ্রহণ না করেন সেজন্য বিএনপির পক্ষ থেকে কার্যত হুঁশিয়ারি দেয়া হচ্ছে। লন্ডন থেকে তারেক রহমান পর্যন্ত টেলিফোনে নির্বাচিতদের সঙ্গে কথা বলছেন। এদিকে সংসদে যোগদান করে দলীয় সিদ্ধান্ত ভঙ্গ হয়েছে বিধায় গণফোরাম সংসদ সদস্য মোকাব্বির খানকে শোকজ নোটিস দিয়েছে। যাতে বিএনপির নির্বাচিতরা এ থেকে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রমাদ গোনে। গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল, যাকে বিদেশিদের বিশেষ ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়, তিনি বলেছেন স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনের আগেই সরকারের পতন হবে। খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ এ নিয়ে তো প্রচার চলছেই।

বলাই বাহুল্য, আগামী ৬ দিনে দেনদরবার সামনে রেখে চাপ কে কতটা দিতে পারবে, শর্ত কার পক্ষে কতটা নিতে পারবে কিংবা সমঝোতা হবে কিনা প্রভৃতি সুস্পষ্ট হবে। প্যারোল না জামিন, শপথ না বর্জন এই প্রশ্নের ফয়সালা হবে। এটা হওয়ার ভেতর দিয়ে দেশের রাজনীতির গতি-প্রকৃতিও অনেকটাই নির্ধারিত হবে। পত্রপত্রিকা লিখছে এবং রাজনীতির অঙ্গনে বলাবলি হচ্ছে, ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত আগামী কয়েকদিন হচ্ছে দেশের রাজনীতির ‘টার্নিং পয়েন্ট’। সমঝোতা ও সংগ্রামের রাজনীতি নাকি সংঘাত ও সংঘর্ষের রাজনীতি কোন পথ নিবে দেশ এটা নির্ধারিত হবে আগামী কয়েকদিনের মধ্যে। প্রথম পথ দেশের মঙ্গল ও আলোর পথ আর দ্বিতীয় পথ অমঙ্গল ও অন্ধকারের পথ। ক্ষমতা কারোই চিরস্থায়ী নয়- এটা বিবেচনার মধ্যে রেখেই দুপক্ষকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনের আগে দ্বিতীয় পথটা কারোই কাম্য হতে পারে না। কোন পথে যাবে দেশ তা দেখার জন্য আর মাত্র ১৪৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে।

শেখর দত্ত : রাজনীতিক ও কলাম লেখক।