রাজনৈতিক শক্তির মদদ!

আগের সংবাদ

রাজধানীর সড়কের চিত্র বদলে দেবে তিন প্রকল্প

পরের সংবাদ

আমি বলি, একেক জন নারী একেকটা উপন্যাস

প্রকাশিত হয়েছে: এপ্রিল ২১, ২০১৯ , ১১:৩২ পূর্বাহ্ণ | আপডেট: এপ্রিল ২১, ২০১৯, ১১:৪২ পূর্বাহ্ণ

Avatar

মার্জিত, স্পষ্টভাষী ও সদালাপী এক নারী। পছন্দ করেন কল্যাণের স্বপ্ন দেখতে ও মানুষের মাঝে সেই স্বপ্ন ছড়িয়ে দিতে। বর্তমানে মোহাম্মদী গ্রুপের কর্ণধার। ২০১৩ ও ২০১৪ সালে বিবিসির করা বিশ্বের ১০০ অনুপ্রেরণাদায়ী ও প্রভাবশালী নারীর তালিকায় ছিল তার নামটিও। তিনি ড. রুবানা হক।
পোশাক খাতের অভিভাবক সংগঠন বিজিএমইএর নির্বাচিত প্রথম নারী সভাপতি। শুধু তাই নয়, ডক্টরেট ডিগ্রিধারী প্রথম সভাপতিও তিনি। গতকাল শনিবার তিনি বিজিএমইএর দায়িত্ব বুঝে নেন। ভোরের কাগজের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় উঠে এসেছে সেসব বিষয়। জানাচ্ছেন মরিয়ম সেঁজুতি

ভোরের কাগজ : পোশাক খাতের নেতা হিসেবে দায়িত্ব নিলেন। এ খাতের উন্নয়নে কী কী চ্যালেঞ্জ রয়েছে এবং কীভাবে তার মোকাবেলা করবেন?
রুবানা হক : ভাবমূর্তির চ্যালেঞ্জ, দামের চ্যালেঞ্জ, দক্ষতা মজুরির চ্যালেঞ্জ, একটা বাজার সম্প্রসারণের চ্যালেঞ্জ। নীতি সহায়ক অনেক ব্যাপার রয়েছে। যেমন ইনফ্রাস্ট্রাকচারের জায়গায় নীতি সহায়তা লাগবে। টেকসই শিল্প গড়তে হলে আমাদের নানা রকম চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একই সময়ে আমাদের উদ্ভাবনের চ্যালেঞ্জ আছে। মূলত চ্যালেঞ্জ সাতমুখী। এখন দেখা যাক কী করা যায়। আন্তর্জাতিক বাজারে ভাবমূর্তি সংকট কাটিয়ে ওঠা, পণ্যের দাম বাড়াতে দরকষাকষি, কারখানা পূর্ণসংস্কার শতভাগ করা, পোশাক খাতের টেকসই উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভরতা বাড়িয়ে দেয়া এবং মালিক-শ্রমিক একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে অগ্রাধিকার দিতে চাই।
ভোরের কাগজ : গ্রোথ ভালো হচ্ছে। আবার ছোট-মাঝারি সাইজের প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তাহলে কী বলতে পারি ছোট-মাঝারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বড় কোম্পানিগুলোর পার্থক্য অনেক বেশি হয়ে যাচ্ছে?
রুবানা হক : গ্রোথ বাড়ছে কারণ আমাদের বড় ফ্যাক্টরিগুলো অনেক বড় হয়েছে। অর্থাৎ সংখ্যায় বাড়ছে। পাশাপাশি ছোট ফ্যাক্টরিগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু গ্যাপ হচ্ছে না। কারণ ছোট ফ্যাক্টরির গ্যাপগুলো বড় ফ্যাক্টরিগুলো ফিলাপ করছে। সমস্যা হচ্ছে, আমরা একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে একটি অসম প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছি। আমার যদি একসম লাইনের একটা ফ্যাক্টরি থাকে তাহলে আমি কিন্তু আর ভাবব না দিনশেষে কী দামে জিনিস নিচ্ছি। হঠাৎ করে অর্ডার নিয়ে নিচ্ছি এবং আমি ভাবছি চাকা চললেই হলো। বেতন কোনোমতে আসলেই হলো। সেটাও আসছে না কিন্তু। অর্থাৎ আমরা কিন্তু কোনোরকম হিসাব-নিকাশ না করেই একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে অসম প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হই, এটা ইন্ডাস্ট্রির জন্য, শিল্প খাতের জন্য অবশ্যই দুঃখজনক বিষয়। আমরা যদি একসঙ্গে কালেক্টিভ বার্গেনিং করি তাতে ক্রেতাও খুশি, আমরাও খুশি। আমাদের একজন ডিরেক্টর ইতোমধ্যে এ কাজটা করেছেন। চারটা আলাদা প্রতিষ্ঠান মিলে একটা কোম্পানি তৈরি করেছেন। এখন তারা একসঙ্গে সমস্ত নেগোসিয়েশন করেন। কারণ একবারেই চার কোম্পানির পণ্য নিতে পারছেন। এভাবে যদি আমরা নিজেদের মধ্যে সংঘবদ্ধ হই, তাহলেই কিন্তু আমরা সব বদলে দিতে পারব।
ভোরের কাগজ : ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প সম্পর্কে নিজের কী ধরনের পরিকল্পনা রয়েছে?
রুবানা হক : ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প অনেক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তাদের সবার কষ্ট হচ্ছে। আমার টার্গেট হলো- ছোট ফ্যাক্টরিগুলোকে বন্ধ না বলে, হয় এটাকে আমরা স্কেল আপ করব অথবা আমরা এক্সিট করাব। যারা কোনোমতেই ব্যবসা করতে পারছেন না তাদের বন্ধ হয়ে যেতে হবে। অন্তত কিছু আর্থিক সহায়তা দিয়ে বন্ধ করে জায়গা খালি করে দিতে হবে। কারণ বিদেশে কিন্তু চ্যাপ্টার সেভেন চ্যাপ্টার ইলেভেন সারাক্ষণ ঘোষণা করছে, আমাদের এখানে ক্ষুদ্র এবং মাঝারি কারখানাগুলো মার খাচ্ছে। এটা ঠিক না। তাই দুটো বিষয় থাকতে হবে। একটি হলো এক্সিট আউট, আরেকটি হলো রি-স্কেলিং। আমরা যদি কোনোভাবে এ ফ্যাক্টরিগুলোকে একসঙ্গে করে একটা জায়গায় শিফট করতে পারতাম, না পারলেও শুধুমাত্র এক ধরনের পাইলট প্রজেক্ট করতে পারতাম, হুবহু একর্ড হতে হবে তা না, বেসিক ফায়ার সেফটি এনসিওর করতে পারলে আমরা কিন্তু অনেক ফ্যাক্টরিতে আমাদের ইউনিফর্ম কোড অব কন্ডাক্ট চালু করতে পারি। আমি মনে করি ক্ষুদ্র এবং মাঝারি শিল্পের জন্য আলাদা নিয়ম হওয়া উচিত।
ব্যাংকিং সেক্টরেরও বোঝা উচিত। ওরা চাইলেও পারছে না। মাঝারি এবং ক্ষুদ্র শিল্পগুলো থমকে দাঁড়াচ্ছে। এমনকি ভালো ফ্যাক্টরিও বন্ধ হচ্ছে। পারছি না কেন তাহলে আমরা? কারণ অর্ডার আসলেই অনেক কম। দুই-তিন মাস এ সমস্যা থাকবে। এরপর আবার অনেক বাড়বে। মোটামুটি কনসোলিডেটেড করতে পারি তাহলে কালেকটিভ বার্গেনিংয়ের জায়গায়ও আসবে। আবার ক্যাপাসিটিটাও ইনক্রিজ করবে। এখন এমন একটা যুগ চলে আসছে যেটা প্রতিযোগিতার যুগ না, বিস্তৃতির যুগ। এই কোলাবরেটিভ কম্পিটিশন ইজ মাচ বেটার। নিজেদের মধ্যে অসম প্রতিযোগিতায় না গিয়ে আমরা এটা করতে পারলে ভালো হয়। এটা আমাদের কনসেপ্ট। আমাদের আরেকটি পরিকল্পনা হচ্ছে- যে ফ্যাক্টরিগুলো একান্তই পারবে না তাদের আমরা এক্সিট করতে সাহায্য করব। আর যারা পারবে, কিন্তু কষ্ট হচ্ছে, তাদের আমরা স্কেল আপ করার ব্যবস্থা করব।
ভোরের কাগজ : আপনার কাজের জায়গাটি মূলত নারী শ্রমিক প্রধান একটি খাতে। এই যে বিপুলসংখ্যক নারী পোশাক শিল্পে কাজ করেন, অথচ আপনার মতো নারী উদ্যোক্তা নেই বললেই চলে। নারী উদ্যোক্তা হিসেবে কেউ এখানে আসতে চাইলে কী করণীয় বলে আপনি মনে করেন?
রুবানা হক : এখানে আমার নির্দিষ্ট একটা প্রস্তাবনা আছে। উদ্যোক্তাদের ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটা নীতিমালা আছে যে, শতকরা ১০ ভাগ দিতে হবে। কিন্তু ব্যাংকগুলো দুই বা তিন শতাংশের বেশি দেয় না। ফলে অধিকাংশ নারী উদ্যোক্তা ঝরে পড়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকে ও বিডাকে একটি প্রস্তাবনা দিয়েছি। সেটা হচ্ছে- ডিজিটাল ক্রেডিট প্লাটফর্ম করেন একটা। তাতে একজন নারী ডিজিটালি লোনের জন্য আবেদন করতে পারবে। সে না পারলেও তার সন্তান তাকে সাহায্য করতে পারবে। এতে করে একেবারে উপজেলা কেন্দ্রিক ডিজিটালি একটা রেকর্ড হবে। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকেরও ন্যাশনাল ক্রেডিট পোর্টালে এক্সেস থাকবে। কমার্শিয়াল ব্যাংকেরও থাকবে। বিভিন্ন জায়গায় লোনটা চলে যাবে এবং কী কারণে তাকে বাদ দেয়া হচ্ছে সেটিও কিন্তু দেখা যাবে। লোনগুলো যে ঝরে পড়ে, এই ঝরে পড়ার জায়গাটা থামাতে হবে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে- আমরা একজনে যদি অন্তত পাঁচজন নারী উদ্যোক্তার দায়িত্ব নেই, ব্যাংককে যদি বলি, ভাই, আমরা একজনে পাঁচজনের দায়িত্ব নিলাম- অর্থাৎ মেন্টরশিপের একটা মেসেজ ছড়িয়ে দিতে হবে সারা দেশে। আমি মনে করি নারীদের এখন ভাইরাল হওয়া উচিত। আমি এখন যে জায়গায় গেছি এই জায়গা থেকে সবাইকে অনুপ্রাণিত করা উচিত যে, মেয়েরা পারে। পুরুষশাসিত এবং শোষিত সমাজেও এটা সম্ভব। এ জন্য শুধু স্বপ্ন দেখলেই হয় না, স্বপ্নটা ধরে থাকতে হয়। যুদ্ধ করতে হয়, তবে তা হাতেপায়ে না- বা চেঁচিয়ে না। যুদ্ধটা স্ট্র্যাটেজির। আমি প্রত্যেকটা নারীকে বলি ইনক্লুডিং এন্ড স্ট্র্যাটেজিক হোন। মানুষের কল্যাণ মাথায় রাখেন দেখবেন আপনি আপনার গন্তব্যে পৌঁছে যাচ্ছেন। শুধু নিজের কল্যাণ চিন্তা করবেন না।
এ ছাড়া বাড়িতে বাড়িতে নারীরা বুটিক শপ দিচ্ছে। ওদের নতুন ডিজাইন তৈরির সক্ষমতা আছে। আমরা যদি ১০ জন করে একটা গ্রুপ করি, বলি আপনারা আমাদের ডিজাইন দেন। তাহলে কিন্তু ঘরের সেই বুটিক কর্মীদের বাইরে নিয়ে আসতে পারি। সুতরাং আমি মনে করি বুটিক থেকে শুরু করে বড় জায়গায় ধাক্কা দেয়া, এটা আমি পারব। আমি প্রত্যেকটা নারীকে বলি, আগে ঝড় সামলান, পরে কান্নাকাটি। আমি জানি প্রত্যেকটা নারীর একটা গল্প আছে। আমি তো বলি একেকটা নারী একেকটা উপন্যাস। অথচ নারীর গল্পও গুছিয়ে বলতে পারি না আমরা। যেমন শ্রমিকের গল্পও গুছিয়ে বলতে পারি না। সুতরাং ভাবমূর্তি বদলাতে হলে নারী শ্রমিকের গল্প বলেই ভাবমূর্তি বদলাতে হবে। সেই জায়গা থেকে আমি মনে করি আমাদের একটা এক্সেলেন্ট অপরচুনিটি আসছে আগামী দুই বছর কাজ করার।
ভোরের কাগজ : বিজিএমইএ প্রেসিডেন্ট হিসেবে অনুভ‚তি যদি বলেন?
রুবানা হক : আগামী দুই বছর পর আমি আমার অনুভ‚তি বলব। কাজ করাটা খুব জরুরি। আমি মনে এটা আমার দায়িত্ব। আরেকটি বিষয় হচ্ছে প্রত্যেকেই বলছেন প্রথম নারী সভাপতি। এতে আমি স্বাচ্ছন্দ্য পাচ্ছি না। তার চেয়ে মহাখুশি হতাম যদি কেউ বলত আপনি প্রথম পিএইচডি সভাপতি। কারণ নারী তো আল্লাহপাক আমাকে করে দিয়েছেন। বরং ৫৫ বছর বয়সে এসে ডক্টরেট করাটা আমার জন্য একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ ছিল। এটা আমি মনে করি পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটা উদাহরণ। যা করতে চাও কর। শুধু আশা করলেই হবে না, প্রতিফলনও দেখাতে হবে।
ভোরের কাগজ : আপনার ‘শি ফর শি’ সম্পর্কে কিছু বলেন?
রুবানা হক : ইউএন উইমেনের একটা টার্গেট হচ্ছে ‘হ্যাশ ট্যাগ হি ফর শি’-অর্থাৎ একটা পুরুষ পাশে থাকলে একটা নারী এগিয়ে যেতে পারে। আমি তাদের মতের পক্ষে না। আমি মনে করি, একজন নারী পাশে থাকলেই আরেকজন নারী এগিয়ে যেতে পারে। আমরা কিন্তু নারীদের পাশে নারীরা সচরাচর দাঁড়াই না। সুতরাং নারীদের একত্রে থাকতে হবে। ঈর্ষা নয়, সহযোগিতায়।