দিনাজপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় শিশুসহ নিহত ৩

আগের সংবাদ

উড়িষ্যায় মাওবাদীদের হামলায় নারী পোলিং এজেন্ট নিহত

পরের সংবাদ

দুই ঘাতকের জবানবন্দিতে লোমহর্ষক বর্ণনা

আগুন দেয়া হয় যেভাবে

প্রকাশিত হয়েছে: এপ্রিল ১৮, ২০১৯ , ১১:৫৭ পূর্বাহ্ণ | আপডেট: এপ্রিল ১৮, ২০১৯, ১১:৫৮ পূর্বাহ্ণ

Avatar

ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে পরিকল্পিতভাবে শরীরে কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। চাঞ্চল্যকর ওই হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয় পাঁচজন। এর মধ্যে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। অপর ঘাতককে আটকের চেষ্টা করছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত দুজন গত রবিবার ফেনীর আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে লোমহর্ষক বর্ণনা করেছেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) পরিদর্শক (ওসি) মো. শাহ আলম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) পরিদর্শক (ওসি) মো. শাহ আলম গতকাল বুধবার জানান, সরাসরি কিলিং মিশনে অংশ নেন ৫ জন, অন্যরা তাদের সহযোগিতা করেন। এর মধ্যে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা হলো মোট ১৬ জনকে। গ্রেপ্তারকৃতদের পৃথকভাবে এবং মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তদন্তে সহায়ক তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্ত কর্মকর্তা জানান, সিঁড়ি দিয়ে ওই পাঁচজন যখন নামছিলেন তখন নুসরাতের আগুন, আগুন, বাঁচাও, বাঁচাও বলে চিৎকার তারা শুনতে পান। পা থেকে আগুন ধরানোয় প্রথমে নুসরাতের পায়ের বাঁধন খোলে। এরপর আগুন যখন উপরে উঠে তার হাতের বাঁধন খুলে তখনই তিনি উঠে দৌড়ে নিচে নেমে আসেন।
এদিকে ফেনীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইনের আদালতে নুসরাত হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন মামলার অন্যতম আসামি নূর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীম। জবানবন্দিতে অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার নির্দেশে তারা নুসরাতের গায়ে আগুন দিয়েছেন বলে স্বীকার করেছেন।
আদালত সূত্র মতে, শাহাদাত হোসেন শামীম জবানবন্দিতে বলেছেন, মামলা প্রত্যাহারে অস্বীকৃতি জানালে তিনি নিজে পেছন থেকে এক হাত দিয়ে নুসরাতের মুখ চেপে ধরেন ও অন্য হাত দিয়ে তার হাত ধরেন। আর উম্মে সুলাতানা পপি তখন নুসরাতের পা ধরেন। তার (শামীমের) চাচাতো বোনের পালিত মেয়ে জান্নাত আফরোজ মনি নুসরাতের শরীর চেপে ধরেন। তারা তিনজন মিলে নুসরাতকে ছাদের মেঝেতে ফেলে দেন। এ সময় উম্মে সুলতানাকে কৌশলে তারা চম্পা বলে ডাক দেন। শামীম বলেছেন, নুসরাতকে মেঝেতে শুইয়ে ফেলার পর জোবায়ের নুসরাতের ওড়না দুই টুকরো করে তার হাত ও পা বেঁধে ফেলেন। জাবেদ তখন নুসরাতের সারা শরীরে কেরোসিন ঢেলে দেন। এরপর শামীমের চোখের ইশারায় জোবায়ের তার পকেট থেকে দেয়াশলাই বের করে কাঠি জ্বালিয়ে নুসরাতের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেন। পরে পাঁচজনই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসেন। নামতে নামতেই তিনজন ছাত্র তাদের বোরকা খুলে শরীরের কাপড়ের মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলেন। ছাত্রী দুজন মাদ্রাসায়ই তাদের পরীক্ষার হলে চলে যান। আর বাকি তিনজন নিজেদের মতো করে পালিয়ে যান। নুসরাতের মুখ শামীম চেপে ধরায় সেখানে আর কেরোসিন ঢালা হয়নি। তাই পুরো শরীর পুড়লেও মুখে আগুন লাগেনি।
ফেনী পিবিআইর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মনিরুজ্জামান জানান, গতকাল ঢাকার কেরানীগঞ্জ থেকে মামলার আসামি শরীফকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে নুসরাত হত্যা মামলায় ১৬ জন গ্রেপ্তার হয়েছে। এদের মধ্যে এজাহারভুক্ত সাতজন, বাকিরা সন্দেহভাজন। ১৬ জনের মধ্যে এজাহারভুক্ত ১ নম্বর আসামি সিরাজ উদদৌলাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তিনি সাত দিনের রিমান্ড আদেশপ্রাপ্ত। ২ নম্বর আসামি নুর উদ্দিন (২০) ও তিন নম্বর আসামি শাহদাত হোসেন শামীম (২১) গত রবিবার রাতে দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। চার নম্ব^র আসামি পৌরসভার চার নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা মাকসুদ আলমকে (৪৫) সোমবার পাঁচদিনের রিমান্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। এ ছাড়া মামলার এজাহারভুক্ত পাঁচ নম্বর আসামি জাবেদ হোসেনকে (১৯) সাত দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। ছয় নম্বর আসামি মাদ্রাসার ইংরেজি বিষয়ের অধ্যাপক আফছার উদ্দিন (৩৫) ও সাত নম্বর আসামি আলাউদ্দিন (৩০)। এ ছাড়া কেফায়েত উল্লাহ (৩২), নুসরাতের সহপাঠী ও অভিযুক্ত অধ্যক্ষের ভাগ্নি উম্মে সুলতানা পপি ওরফে শম্পা (১৮), মাদ্রাসাছাত্র নূরউদ্দিন (১৯), নূর হোসেন (২১), শহীদুল ইসলাম (১৯), জোবায়ের আহমেদ (২১), আরিফুল ইসলাম (১৯) ও নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়া নারী সন্দেহে কামরুন নাহার মনি পাঁচ দিন করে রিমান্ডের আদেশ পেয়ে কারাগারে আছেন।
শ্লীলতাহানির মামলায় আগে থেকেই কারাবন্দি ছিলেন সিরাজ উদদৌলা। হত্যা মামলা হওয়ার পর এখন পর্যন্ত ১৬ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাকে ৭ দিন, আওয়ামী লীগ নেতা ও পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলমকে ৫ দিন, জাবেদ হোসেনকে ৭ দিন, নূর হোসেন, কেফায়াত উল্লাহ, মোহাম্মদ আলাউদ্দিন, শাহিদুল ইসলাম, আবছার উদ্দিন, আরিফুল ইসলাম, উম্মে সুলতানা পপি ও যোবায়ের হোসেনকে ৫ দিন করে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে।
নুসরাত হত্যা মামলায় গত সোমবার রাতে গ্রেপ্তার হওয়া কামরুন নাহার মনিকে গতকাল বুধবার পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেয়ার অনুমতি দিয়েছেন আদালত। মনি সোনাগাজী বাসস্ট্যান্ডের ইমান আলী হাজী বাড়ির মরহুম আজিজুল হকের পালিত মেয়ে। তিনি নুসরাতের সহপাঠীও। এ ছাড়া জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক হয়েছেন সহপাঠী মো. শামীম ও জান্নাতুল আফরোজ মনি। আর ঘটনার দিন মাদ্রাসার গেট পাহারা দেয়া শরীফকে গতকাল ঢাকার কেরানীগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করেছে পিবিআই।
এদিকে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) প্রধান বনজ কুমার মজুমদার জানান, তদন্তের মাধ্যমে এ ঘটনায় জড়িত পরোক্ষদেরও আইনের আওতায় আনা হবে। এরই মধ্যে শ্লীলতাহানির অভিযোগ করতে থানায় যাওয়ার পর নুসরাতের ভিডিও ধারণ করে ছড়িয়ে দেয়ায় সোনাগাজী থানার ওই সময়ের ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে আইসিটি আইনে মামলা করা হয়েছে। এ মামলাও তদন্তের জন্য পিবিআইকে দায়িত্ব দিয়েছেন আদালত।
প্রসঙ্গত, গত ৬ এপ্রিল ওই মাদ্রাসায় আলিম পরীক্ষার কেন্দ্রে গেলে ভবনের ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে পালিয়ে যায় মুখোশধারীরা। এর আগে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার বিরুদ্ধে করা শ্লীলতাহানির মামলা প্রত্যাহারের জন্য নুসরাতকে চাপ দেয় তারা। পরে আগুনে ঝলসে যাওয়া নুসরাতকে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল রাতে নুসরাত মারা যান।