প্রতিকার নয় প্রতিরোধ জরুরি

আগের সংবাদ

গড়ে তুলুন ডিজিটাল স্কুল

পরের সংবাদ

এবারের নববর্ষ পালন ও আমাদের জাতিসত্তা

প্রকাশিত হয়েছে: এপ্রিল ১৭, ২০১৯ , ১০:১৬ অপরাহ্ণ | আপডেট: এপ্রিল ১৭, ২০১৯, ১০:১৭ অপরাহ্ণ

শেখর দত্ত

রাজনীতিক ও কলাম লেখক।

যেখানে বাঙালি সেখানেই মঙ্গল শোভাযাত্রা- এমনটাই হোক না আগামী দিনের বাংলা, মনে মনে এটাই প্রার্থনা করলাম। আজ যখন বিশ্বের দেশে দেশে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি হচ্ছে, তখন মঙ্গল শোভাযাত্রার চেতনাকে, মঙ্গল শোভাযাত্রাকে বিশ্বময় ছড়িয়ে দেয়া যেতে পারে। আন্তর্জাতিক বাঙালি সমাজ রাখতে পারে এ ক্ষেত্রে ভূমিকা। নববর্ষ পালন, মঙ্গল শোভাযাত্রা প্রভৃতি হচ্ছে আমাদের জাতির পথ চলার আলোকবর্তিকা।

নববর্ষের সকালে বাসা থেকে বের হতেই আনন্দ যেন মন থেকে উপচে পড়ল। ঘুম থেকে উঠে টেলিভিশনে রমনার বটমূলের ছায়ানটে আর আগারগাঁওয়ে সুরধ্বনির অনুষ্ঠানের গান পর্যায়ক্রমে শুনে মন আনন্দে পরিপূর্ণ থাকায় তা উপচে না পড়ে উপায় ছিল না। রাস্তায় যাকে দেখছি তার গায়েই সুন্দর-পরিষ্কার নতুন কাপড়। একটু এগোতেই বাংলামোটর মোড়। মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নেব বলে শাহবাগ মোড়ের দিকে যাচ্ছি। রাস্তায় মানুষ আর মানুষ। ছোট-বড় দল। বন্ধুরা মিলে বা পরিবার বাচ্চাকাচ্চাসহ সবাই বের হয়েছে। হাস্যোজ্জ্বল চারদিক। চিৎকার, চেঁচামেচি, বাঁশি বাজানো, খেলা, খাওয়া-দাওয়া সবকিছু চলছে। এদিক-ওদিক মেলার দোকানপাট। দামাদামি হচ্ছে, কেনাকাটা চলছে। একটু খেয়াল করতেই চোখে পড়ল, মানুষের ছড়ানো-ছিটানো এদিক-ওদিক স্বতঃস্ফূর্ত মিছিলে হিজাব-বোরকা যেমন আছে, তেমনি রয়েছে শাঁখা-সিঁদুর। লুঙ্গি-টুপি ও ধুতির মতো পাজামাও দেখলাম। প্রতিটি মানুষের মনে-চালচলনে, পোশাকে-আকাশে, মেলার পণ্যসামগ্রী প্রভৃতি সবকিছুই বৈচিত্র্যে ভরপুর। এর মধ্যে উৎসবের ঐকতান। বাঙালির প্রাণের এমন আয়োজন সত্যিই অনন্য।

তিন বন্ধু মিলে মঙ্গল শোভাযাত্রা শাহবাগের মোড়ে দাঁড়িয়ে দেখব, এটাই সংক্রান্তির দিনের এক ঘরোয়া স্বজন মিলন অনুষ্ঠানে সহপাঠী-সহযোদ্ধা তিন বন্ধু মিলে ঠিক করেছিলাম। নির্দিষ্ট স্থানের দিকে যেতে যেতে কেবলই দল বেঁধে চলমান তরুণ-তরুণীদের দেখছিলাম। ৭৩ বছরে পদার্পণের দিনে মনে পড়ছিল সেই বয়সে আমাদের জীবনে প্রথম মিছিল ও অনুষ্ঠানের ভেতর দিয়ে পহেলা বৈশাখ পালনের কথা। একটু পরই শাহবাগের মোড়ে ফুলের দোকানগুলোর সামনে যে দুই বন্ধুর সঙ্গে মিলিত হব, তাদের একজন সাবেক অর্থনীতির অধ্যাপক সোমেশ্বর চক্রবর্তী, অন্যজন প্রখ্যাত সাংবাদিক আতাউর রহমান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র আমরা, ছাত্ররাজনীতির কর্মী। তিনজনই ছিলাম ১৯৬৭ সালের পহেলা বৈশাখে সেই প্রথম প্রভাতফেরিতে। ৩১/১ হোসেনী দালান থেকে বের হয়ে শহীদ মিনার দিয়ে আমরা যাচ্ছিলাম রমনা বটমূলে। মুখে আমাদের গান ‘এসো হে বৈশাখ…’, হাতে ব্যানার-ফেস্টুন-গাছের ডাল। দেড়শ থেকে দুশ ছাত্রছাত্রীর প্রভাতফেরি। রমনা বটমূলেও ছোট জমায়েত। তখন সেই বয়সে কি আমরা আদৌ তেমনভাবে বুঝতাম, আগত দিনের জন্য কি করছি আমরা! জাতিসত্তার কোন চারাগাছ রোপণের অংশীদার হচ্ছি, যা একদিন আজকের মতো মহিরুহতে পরিণত হবে।

সময়ই আসলে সবকিছুর ¯্রষ্টা, কারিগর। ১৯৬৭ সালটা ছিল ষাটের দশকের প্রথম দিকের জোয়ারের পর ভাটার বছর। ৬ দফা আদায়ের লক্ষ্যে ৭ জুনের পর থেকে আন্দোলনে ভাটার টান শুরু হয়েছে। ভাটার প্রবল টানে ছাত্র ও রাজনৈতিক আন্দোলন কেমন যেন গণবিচ্ছিন্ন। চারদিকে ধরপাকড়। বন্দি শেখ মুজিবকে নিয়ে পাকিস্তানিরা ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত করছে বলে শোনা যাচ্ছে। আক্রমণ চরম ও সর্বোচ্চ মাত্রায় নিয়ে যাওয়া হবে, এমন গুজবে পরিবেশ ভারি। ক্ষোভ-বিক্ষোভ চাপা পড়ে গেছে, ভীতসন্ত্রস্ত ভাব চারদিকে। আমরা তখন আন্দোলনে রাস্তায় নামতে না পারলেও আন্দোলনের তরঙ্গ সৃষ্টির জন্য ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবসের দিকে চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকতাম। কিন্তু এবারে রাজনৈতিক অঙ্গনে কোনো তরঙ্গ সৃষ্টি না করে সাদামাটাভাবে পালিত হলো শহীদ দিবস। এরই মধ্যে চলছিল প্রচ- বাঙালি সংস্কৃতি ও রবীন্দ্রবিরোধী অপপ্রচার। ‘ভারতের চর’, ‘পাকিস্তান ভাঙতে চায়’ ইত্যাদির প্রচার তখন তুঙ্গে। ইতোমধ্যে ২৮ ফেব্রুয়ারি পাকপন্থি ও ধর্ম অপব্যবহারকারী ডানপন্থি দলগুলোকে নিয়ে পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট-পিডিএম গঠনের মধ্য দিয়ে ভেঙে যায় আওয়ামী লীগ। ছাত্রলীগ সভাপতি ফেরদৌস আহমেদ কোরেশীর নেতৃত্বে একটা অংশ অবস্থান নেয় পিডিএমের পক্ষে। সেই দিনগুলোতে বাম-কমিউনিস্টরা ছিল রুশ-চীন ভাঙনের মধ্যেই। ভাঙন-অবিশ্বাস চারদিকে। মওলানা ভাসানীসহ চীনপন্থিরা তখনো ছিল ‘ডোন্ট ডিসটার্ব আইয়ুব’ কৌশল নিয়ে। বলাই বাহুল্য, জোয়ার-ভাটা নিয়ে জীবনের মতোই চলে রাজনৈতিক আন্দোলন। ষাটের দশকে জাতীয় আন্দোলনে এমন ভাটার টান আর হয়নি। দমন-পীড়ন-অপপ্রচার-দল ভাঙাভাঙি প্রভৃতি সবদিক থেকে পাকিস্তানিরা অফেন্সিভে আর বাঙালিরা ডিফেন্সিভে। দিশেহারা ছাত্র আন্দোলনসহ রাজনৈতিক আন্দোলন।

প্রসঙ্গত, ইতিহাসের দিকে তাকালেই দেখা যাবে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক আমলে বাঙালি জাতিসত্তা ও জাতীয় অধিকার প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক আন্দোলন যখনই বিপদের মধ্যে পড়ে, তখনই সাংস্কৃতিক আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে এবং রাজনৈতিক আন্দোলনকে মাথা তুলে দাঁড়ানোর পথের দিশা জোগায়। ষাটের দশকের শুরুর বছরগুলোতে আইয়ুবের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আন্দোলন যখন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছিল না, তখন ২১ ফেব্রুয়ারি ঘিরে সাংস্কৃতিক আন্দোলন রাজনৈতিক আন্দোলনকে পথ দেখিয়েছিল মাথা তুলে দাঁড়ানোর। কিন্তু ১৯৬৭ সালে এসে ২১ ফেব্রুয়ারিতে তেমনটা হলো না। কী করা! পাহাড় থেকে নামা ক্ষুব্ধ জল¯্রােত যেমন বাধা পেলে নতুন ¯্রােতধারা খুঁজে নেয়, ঠিক তেমনি যেন সামনে আসে পহেলা বৈশাখ। দিবসটি ১৯৬৪ সাল থেকেই ছোট ছোট অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পালিত হয়ে আসছিল। পঞ্চাশের দশকে যখন যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতায় তখনো বাঙালির এই উৎসব বাংলার মানুষের সামনে আসছিল।

এই প্রেক্ষাপটেই ১৯৬৭ সালে পালিত হলো প্রভাতফেরি ও রমনা বটমূলের অনুষ্ঠান দিয়ে পহেলা বৈশাখ। আয়োজন ছিল ছোট কিন্তু এর তাৎপর্য ছিল বিশাল। প্রকৃত বিচারে অতীতের বাংলাকে নতুন রূপে টেনে নিয়ে এসেছে পহেলা বৈশাখ। তিন বন্ধু মিলিত হয়ে যখন মঙ্গল শোভাযাত্রা দেখতে শাহবাগের মোড়ে রাস্তায় দাঁড়িয়েছিলাম, তখন আমরা তিনজন স্মৃতিচারণ করে বলছিলাম, তখন কিন্তু আমরা বুঝিনি বাঙালির জীবনে এর তাৎপর্য হবে এতটা বিশাল ও যুগান্তসৃষ্টিকারী। সেই ১৯৬৭ সাল থেকে পাকিস্তানি আমলে গণতন্ত্র ও জাতীয় স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে, বাঙালি জাতিসত্তাকে পরিপূর্ণ রূপ দিতে, মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে, পঁচাত্তরের পর রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে পাকিস্তানি ভূত নামাতে পহেলা বৈশাখ যে ভূমিকা রেখেছে, তা ইতিহাসে অমোচনীয় কালিতে লিপিবদ্ধ থাকবে। ধর্ম-বর্ণ-মত-পথ নির্বিশেষে বাঙালির এমন অসাম্প্রদায়িক চেতনাম-িত উৎসব যে কোনো জাতির জন্য গর্বের। আর কোন কোন দেশে ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে ‘নতুনের মাঝে তুমি পুরাতন’ হিসেবে সর্বমানবের সম্প্রীতি ও মিলন উৎসবের এমন দিন আছে তার সবটা জানি না। বলাই বাহুল্য, শেখ হাসিনা সরকার বোনাস দিয়ে দিনটিকে উৎসব পালনের অনন্য দিনে পরিণত করেছে।

এদিনটিকে ঘিরে আগ্রহোদ্দীপক ব্যাপার হলো, বিংশ শতকের ষাটের দশকের শেষ দিক থেকে একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশক- এই সময়কালে চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে ধারাবাহিকভাবে বাঙালির নববর্ষ পালনের ভেতর দিয়ে বাঙালি ঐতিহ্যের সব সুকীর্তি নিয়ে সামনে এসেছে মঙ্গল শোভাযাত্রা। প্রবাহমান জাতীয় সংস্কৃতিতে সৃজনশীল সংযোজন হলো জাতিসত্তার জীবন্ত লক্ষণ। এই সংযোজনই হয়েছে মঙ্গল শোভাযাত্রা নববর্ষে সংযোজন করার ভেতর দিয়ে। সঙ্গত কারণেই ইতোমধ্যে জাতিসংঘ সংস্থা ইউনেস্কোর ‘মানবতার অধরা বা অস্পর্শনীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’-এর তালিকায় স্থান করে নিয়েছে।

নববর্ষের সুন্দর সকালে কাঠফাটা গরমের মধ্যেও মনে প্রচ- শান্তি ও স্বস্তি নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে তিন বন্ধু মিলে যখন এসব গল্প করছি, তখনই চারদিকে হৈ হৈ পড়ে গেল। মঙ্গল শোভাযাত্রা আসছে। দেখা যাচ্ছে সুউচ্চে তুলে ধরা আবহমান বাংলার পশু-পাখিসহ বিভিন্ন প্রতিকৃতি। যুগ যুগ ধরে যা আমাদের শিল্পীরা তাদের টেরাকোটার চারুশিল্পে-পটে, আমাদের মায়েরা মাটির আলপনায় ধরে রেখেছে। মঙ্গল শোভাযাত্রা দেখতে দেখতে মনে পড়ল সেই কালজয়ী গানের কলি : ‘বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি/এই অপরূপ রূপে তুমি বাহির হলে জননী।’ আসলেই বাংলা মা যেন নববর্ষের শুভ দিনে পরিপূর্ণ রূপ নিয়ে বের হয়ে আসেন তার সন্তানদের সামনে।

প্রসঙ্গত বলি, মঙ্গল শোভাযাত্রার সামনে র‌্যাবের বাহিনী দেখে অন্তত আমার একটুও খারাপ লাগেনি। বরং পরিস্থিতি বিবেচনায় শান্তি ও স্বস্তি পেয়েছি। সর্বোপরি র‌্যাব, পুলিশ, মিলিটারি যা-ই বলি না কেন, তারা তো বাংলা মায়েরই সন্তান। মায়ের যদি বিপদের আশঙ্কা থাকে তবে মাকে নিরাপত্তা দেয়াটাই সন্তানের কর্তব্য। মঙ্গল শোভাযাত্রা দেখে বাসায় যখন ফিরছি তখন হঠাৎই মনে হলো, পুলিশ-সেনা-জনগণ সবাই মিলেই তো মুক্তিযুদ্ধ করেছি। দেশে এখন জাতিসত্তা পরিপূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠা করাও মুক্তিযুদ্ধেরই ধারাবাহিকতা। তাই মঙ্গল শোভাযাত্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ করতে নিয়মানুযায়ী সংগঠিতভাবে অসুবিধা কোথায়! হঠাৎই একা একা মনে মনে হাসলাম এই ভেবে যে, একদল বাকশাল যখন হলো তখন বাকশালে যোগ দিতে মিছিল করে মানুষের সঙ্গে সেনা-পুলিশও রাস্তায় নেমেছিল। রাজনীতির মধ্যে তাদের টেনে আনা একেবারেই সঠিক নয়।

কিন্তু নববর্ষ পালনের মধ্যে তো কোনো রাজনীতি থাকতে পারে না। এটা ¯্রফে সর্ব বাঙালির উৎসব আয়োজন। যারা রাজনীতি ও ধর্ম এতে টেনে আনছে, তারা অন্ধ-ভ্রান্ত। উদ্দেশ্য তাদের ভিন্ন। এরা ষাটের দশকেও জাতিসত্তাবিরোধী হিসেবে রাজনীতি, সংস্কৃতি ও সমাজজীবনে ছিল, এখনো রয়েছে। নববষের্র সাংস্কৃতির কর্মকা- ও মঙ্গল শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে যদি ধর্ম বিন্দুমাত্র বিলীন হওয়ার সম্ভাবনা থাকত, তবে যে ধর্মের হোক না কেন বাঙালিরা তা পালন করত বলে একদম মনে হয় না। কারণ বাঙালি ধর্মের ব্যাপারে স্পর্শকাতর। অন্ধ-ভ্রান্ত-উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে যারা পবিত্র ধর্ম টেনে আনছে, তাদের কারণেই আসলে নববর্ষ পালনে রাজনীতি থেকে যাচ্ছে। বাঙালি সব ধর্মের, সব মতের বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য খোঁজে। ঐক্যকে লালন-পালন-বিকাশ সাধন করে। মুক্তিযুদ্ধে তেমন ঐক্যই প্রতিষ্ঠা করেছিল। জাতীয় চার নীতি তারই স্বাক্ষর। এখনো তেমনটাই করতে চায়। বাসায় ফিরে ফেসবুক খুলতেই দেখলাম, গ্রামের মেঠো পথেও হচ্ছে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষ আবালবৃদ্ধবনিতার মঙ্গল শোভাযাত্রা।

যেখানে বাঙালি সেখানেই মঙ্গল শোভাযাত্রা- এমনটাই হোক না আগামী দিনের বাংলা, মনে মনে এটাই প্রার্থনা করলাম। আজ যখন বিশ্বের দেশে দেশে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি হচ্ছে, তখন মঙ্গল শোভাযাত্রার চেতনাকে, মঙ্গল শোভাযাত্রাকে বিশ্বময় ছড়িয়ে দেয়া যেতে পারে। আন্তর্জাতিক বাঙালি সমাজ রাখতে পারে এ ক্ষেত্রে ভূমিকা। নববর্ষ পালন, মঙ্গল শোভাযাত্রা প্রভৃতি হচ্ছে আমাদের জাতির পথ চলার আলোকবর্তিকা। সার্বিক মঙ্গলাকাক্সক্ষা নিয়েই আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম। বস্তুতপক্ষে সর্বমানবের উৎসব-আনন্দের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হয়ে আমাদের ইপ্সিত লক্ষ্যাভিমুখে অগ্রসর হওয়া ভিন্ন বিকল্প নেই। নববর্ষ পালনের দিনগুলোতে অতীতের বিশেষত বিগত বছরের ঘটনা প্রবাহ বিবেচনায় নিয়ে আমাদের মেনে নিতেই হবে যে, জাতি হিসেবে আমাদের যেমন অর্জন ও সাফল্য রয়েছে, তেমনি রয়েছে সীমাবদ্ধতা-দুর্বলতা। বালিকা ইয়াসমিন বছর শেষে যে সাহস ও বীরত্ব দেখিয়ে গেছে তা আমাদের কপালের গৌরব টিকা আর ইয়ামিনের দগ্ধ লাশ হচ্ছে আমাদের কপালের কলঙ্কের দাগ। রাষ্ট্র ও সমাজজীবনে এমন অনেক কিছুই রয়েছে যা বাংলা মায়ের মর্যাদাকে যেমন ঊর্ধ্বে তোলে তেমনি অনেক ঘটনা ধুলায় মিশিয়ে দেয়। এই দিকটি খেয়াল করেই কবিগুরু গানে বলেছেন, ‘… বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক।…’ আবর্জনা দূর করে বাঙালি কতটুকু জাতিসত্তা নিয়ে অগ্রসর হতে পারে, এটাই ১৪২৬ সামনে রেখে প্রধান জিজ্ঞাসা!

শেখর দত্ত : রাজনীতিক ও কলাম লেখক।