ন্যায় বিচারের স্বার্থে রাষ্ট্রকে তৎপর হতে হবে

আগের সংবাদ

মুক্তিযুদ্ধে এপ্রিলের দুই ঐতিহাসিক দিবসের তাৎপর্য

পরের সংবাদ

বীরের এই রক্তস্রোত মায়ের এই অশ্রুধারা

প্রকাশিত হয়েছে: এপ্রিল ১৫, ২০১৯ , ৮:৫০ অপরাহ্ণ | আপডেট: এপ্রিল ১৫, ২০১৯, ৮:৫২ অপরাহ্ণ

অজয় দাশগুপ্ত

কলাম লেখক।

সত্যি বলছি আমাদের কি আসলে গায়ের চামড়া বলে কিছু আছে? না কোনো সম্মানবোধ? মেয়ে তো সবার বাড়িতেই আছে। আমাদের পরিবারও মাতৃতান্ত্রিক। আমরা কথায় কথায় গর্ব করি মেয়েরা মায়ের জাতি। মায়ের পায়ের তলায় বেহেশত এসব বুলি আওড়াই। কিন্তু বাস্তবে কি আমরা তা মানি? নুসরাতের এলাকা কি দেশের ভিন্ন কোনো এলাকা? না এমন মাদ্রাসা হেডমাস্টার শুধু ওই একজন?

আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি আগামী বৃহস্পতিবার আসতে আসতেই আমরা নুসরাতকে ভুলে যাব। মানুষ ভুলতে না চাইলেও ভুলিয়ে দেয়া হবে। এমনিতেই দেশে সমস্যার কমতি নেই। এমন আরেকটা কিছু এসে হাজির হবে যখন আমরা সেটা নিয়ে এমন ব্যস্ত হয়ে পড়ব যে নুসরাত ডুবে যাবে বিস্মৃতির অতল অন্ধকারে। এমন কত নুসরাত আছে দেশে মরতে পারে না বলে মরে মরে বেঁচে থাকে। তাদের খবর আমরা রাখি না। এই মেয়েটি প্রতিবাদী বলে সবার নজরে পড়েছিল। কিন্তু কি লাভ হয়েছে? বেঘোরে তাজা প্রাণটা ঝরে গেল।

সত্যি বলছি আমাদের কি আসলে গায়ের চামড়া বলে কিছু আছে? না কোনো সম্মানবোধ? মেয়ে তো সবার বাড়িতেই আছে। আমাদের পরিবারও মাতৃতান্ত্রিক। আমরা কথায় কথায় গর্ব করি মেয়েরা মায়ের জাতি। মায়ের পায়ের তলায় বেহেশত এসব বুলি আওড়াই। কিন্তু বাস্তবে কি আমরা তা মানি? নুসরাতের এলাকা কি দেশের ভিন্ন কোনো এলাকা? না এমন মাদ্রাসা হেডমাস্টার শুধু ওই একজন? এই সিরাজ উদদৌলার কি হবে আসলে কেউ জানে না। আজ যে গরম ভাব মানুষের মনে, যে রাগ বা আগুন অচিরেই তা নিভে যাবে। তখন সিরাজ উদদৌলা আবার নবাব হয়ে ঘুরে বেড়াবে। নতুন কোনো শিকারের সন্ধানে নামবে। কিন্তু যৌনতার লালসা থামবে না।

সোহেল রানাকেও নিশ্চয়ই ভুলে যাবো আমরা। নিছক সময়ের ব্যাপার। তবু এই ফায়ার ফাইটারকে শ্রদ্ধা আর সম্মান জানানোর বিষয়টা আমাদের মনে দাগ রেখে গেছে। ফায়ার সার্ভিসের এই অকুতোভয় সেনাকে জাতি কুর্নিশ জানায়। জীবনদান আমাদের সমাজে এখন তেমন কোনো জটিল বিষয় না। কত কারণে যে কত মানুষের জান যায় দেশে। কত তুচ্ছ ঘটনায় জীবনহানি ঘটে সমাজে। কেউ মনেও রাখে না। অথচ একেকটা জীবন কত দরকারি। মানুষের সবচেয়ে পরম সম্পদই আজ হুমকির মুখে।

সোহেল রানার কথা আলাদা। স্বেচ্ছায় জীবন দিয়েছেন এই বীরপুরুষ। বনানীর আগুনে পোড়া মানুষগুলোকে বাঁচানোর জন্য ঝুঁকি নেয়া এই ফায়ার ফাইটার নিজের জানের কথা একবারো ভাবেননি। ভেবে দেখুন কোন সমাজে বাস করি আমরা। যেখানে মানুষ কেউ কারো পরোয়া করে না। ছেলে-বুড়ো কারো জীবন নিয়ে মাথাব্যথা নেই। নারীদের বেলায় এক সময় যে মমতা, যে ভালোবাসা ছিল আজ তা উধাও। এই কঠিন সময়ে সোহেল রানা কীভাবে পারলেন নিজের জীবন বিলিয়ে দিতে? মনে হতে পারে দায়িত্ব করার ফাঁকে তার জীবন গিয়েছে। আসলে কি তাই? আর কত ফায়ার ফাইটারও তো ছিলেন সেখানে। তারাও চেষ্টা করেছেন মানুষদের বাঁচাতে। সোহেল রানা নিশ্চয়ই ঝুঁকিটা বেশি নিয়েছিলেন। সে কারণে দুনিয়া ছেড়ে যেতে হয়েছে অকালে।

আমি যে দেশে বসবাস করি সে দেশে ফায়ার ফাইটারের সম্মান আকাশচুম্বী। আমি দেখেছি শপিং মলে বাজারে বা যে কোনো জায়গায় তাদের দেখা মিললেই জড়ো হয়ে যায় মানুষ। উদ্দেশ্য ছবি তোলা। সেলফি তুলে সামাজিক মিডিয়ায় দিয়ে নিজের পরিচয় ও সম্মান বাড়ানোর মতো দামি এই ফায়ার ফাইটাররা এ দেশের গর্ব। জেনে অবাক হবেন অস্ট্রেলিয়ার এক সময়ের প্রধানমন্ত্রী টনি অ্যাবটও ছিলেন দমকল বাহিনীর গর্বিত সদস্য। প্রধানমন্ত্রিত্ব যাওয়ার পর তার ছবি দেখেছিলাম কোনো এক বুশ ফায়ারের সময় গায়ে ফায়ার সার্ভিসের পোশাক চাপিয়ে সহায়তা করছিলেন। এমন যাদের সম্মান তারাই তো হিরো। পাশাপাশি আমাদের কথা ভাবুন। আজ আমরা সোহেল রানাকে বীর বলছি বটে জীবিত থাকাকালীন তাকে আমরা কি মর্যাদা দিয়েছিলাম? না তাদের কাউকে আমরা পাত্তা দেই? ভাবখানা এই যে, এরা কোনো রকমে একটা চাকরি করে জীবিকা নির্বাহ করে। ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার অধুনা কর্পোরেটের রমরমা সমাজে ফায়ার ফাইটার তো দলিত বা নিম্ন শ্রেণির মানুষ। আগুন না লাগলে আমরা জানতামও না যে তারা আছেন।

এখন দেখছি শোক ও সন্তাপের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। মন্ত্রী মহোদয় বলেছেন তেমন কেউ থাকলে পরিবারে তাকে চাকরিও দেয়া হবে। ভালো। আশা করি চাকরিটা কেবল ফায়ার সার্ভিসে হবে না। তাদের সন্তানরা যেন মাথা তুলে দাঁড়ানোর মতো সাহায্য পায়। তাহলেই বুঝব বিষয়টা কথার কথা বা দায়সারা কিছু না। বলছিলাম সোহেল রানার কথা। তিনি যে বাহিনীর হয়ে কাজ করতে গিয়ে জীবন দিলেন আমাদের দেশ কি ফায়ার সার্ভিস বিষয়ে কিছু জানে না কেউ খবর রাখে? এ দেশে আপনি যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন না কেন আপনাকে জরুরি কিছু বিষয়ে জ্ঞান রাখতেই হবে। আমার মতো মানুষ ও ফাস্ট এইড সার্টিফিকেটধারী। এটা একটা অসম্ভব ব্যাপার। বিশ্বাস করুন আমি শরীরের এনাটমি ফিলোসফি কিছু বুঝি না। তারপরও অফিস পাঠিয়েছিল সে কোর্স করতে গিয়ে যা দেখলাম যে জানলাম তার জের চলবে আজীবন। তেমনি এক ট্রেনিংয়ে গিয়েছিলাম আগুন নির্বাপণের ক্লাস করতে। সে কোর্স আমি কাগজে-কলমে আগে করলেও হাতে-কলমে করিনি কখনো। যখন তা করলাম সত্যি বলতে কি আমার সমানে এক নতুন জগত খুলে গিয়েছিল এত সব বিষয় আছে এতে ভাবতেও পারিনি। আগুন যে কত ভয়ঙ্কর হতে পারে আর তা কীভাবে মানুষের জীবন কেড়ে নিতে পারে ভাবাও যায় না।

আজ সবাই মিলে আগুনের ব্যাপারে সচেতন আর কথা বললেও আমরা এর গুরুত্ব বুঝি না। বুঝলে এত এত মানুষকে জিম্মি করে এমন বড় বড় দালান টিকে থাকতে পারত না। আজ যে রাজউকসহ নানা প্রতিষ্ঠানের লোকজন মাঠে নেমে এসে এত দৌড়ঝাঁপ করছেন এতে কি গুনাহ মাফ হবে। আগে এমন সব কাজ করলে বা তার সিকিভাগ দায় থাকলে কি এত মানুষ মারা যেত? যারা নকশা না মেনে দিনের পর দিন দালানের ব্যবসা করে গেল তাদের পেছনে কারা আছে সবাই জানে। এদের গডফাদাররা অনেক শক্তিশালী। তারা মচকালেও ভাঙে না। তাদের টিকি স্পর্শ করার সাহস নেই কারো। তাই আমরা এবারো শঙ্কিত। এবার এ ঘটনা মানুষের মনে বড় করুণ প্রভাব ফেলেছে। তারা চোখের পানিতে জানিয়ে দিয়েছে এমন ঘটনা তারা আর চায় না। মানুষের এই ভাবনাকে অন্তত সম্মান জানানো দরকার।

রাজউক যদি সময়মতো কোনো ভূমিকা না রাখে বা কাজ না করে দেখায় বুঝতে হবে সব আইওয়াশ। এই আইওয়াশ আমরা চাই না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সন্দেহাতীত ভালোবাসা আর শুভবোধ যেন মাঠে মারা না পড়ে। তিনি পরিশ্রমী। তার কথাও কাজে মিল আছে বলেই মানুষ তাকে ভালোবাসে। সে ভালোবাসার মর্যাদা দেয়ার মানে কিন্তু স্তুতি বা স্তাবকতা না। বরং কাজে প্রমাণ করতে হবে তার হাতকে কারা শক্তিশালী করতে চায় আর কারা চায় না। সোহেল রানার আত্মার সদগতি বা শান্তি ও হবে যদি সেসব ভবন মালিকদের আইনের আওতায় সম্ভব হয়। যদি তাদের প্রাপ্য শাস্তি বিধান নিশ্চিত হয়। যদি প্রতিকার হয় দুর্ঘটনার। এই যদিগুলো কখনো আলোর মুখ দেখে না বলেই এত অশান্তি।

ঢাকা কিন্তু এখনো ঝুঁকির মুখে। শুধু কি তাই? দেখুন একের পর এক অগ্নিকাণ্ড ঘটে চলেছে দেশে। ঢাকার পর বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়া এই আগুন কিন্তু রাজনৈতিক আগুন মনে হলেও সে ধারণা এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব। কারণ মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে এখন যে এগুলো হয় পরিকল্পিত নয়তো ইন্ধনের আগুন। কারা তা করতে পারে? সে কথা দেশের বাহিনী বা সংস্থার লোকেরা খুব ভালো জানেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে সরকার কি এ বিষয়ে যথাযথ কাজ করে সমস্যার উত্তরণ ঘটাতে পারবে? আমরা কিন্তু ঘরপোড়া গরু। বঙ্গবন্ধুর আমল দেখেছি। সে আমলে কত আগুন আর কত ষড়যন্ত্র। সে আগুন নেভার আগেই আমরা হারিয়ে ফেলেছিলাম বঙ্গবন্ধু ও চার জাতীয় নেতাদের। এ সব ঘটনা আর কোনোদিন না ঘটুক সেটাই আমাদের চাওয়া।

সোহেল রানা যে কারণে জান দিয়ে গেলেন তার কথা মনে রেখেও যদি আমাদের সমাজ খানিকটা পাল্টায়, খানিকটা বদলে যায় তাতে সবার লাভ। আর তা না করে লোক দেখানো শোকের কোনো মানে নেই। এটা জানতে হবে সোহেল রানারা কোনো কিছুর জন্য প্রাণ দেয় না। তারা নিঃস্বার্থ বলিদানে অমর। আগুনের দাবানলে যারা এখনো সাম্প্রদায়িক উসকানি আর দেশবিরোধী সরকারবিরোধী প্ররোচনা দিচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিলে আগুনের আঁচ কমতে বাধ্য।

অজয় দাশগুপ্ত : কলাম লেখক।