বিজিএমইএ ভবন ভাঙবে কে?

আগের সংবাদ

শঙ্কা বেড়েছে গেরুয়া শিবিরে

পরের সংবাদ

মাদ্রাসার অর্থ লোপাটই মূল উদ্দেশ্য

সিরাজের পৃষ্ঠপোষক রুহুল আমিন

প্রকাশিত হয়েছে: এপ্রিল ১৪, ২০১৯ , ১২:০১ অপরাহ্ণ | আপডেট: এপ্রিল ১৪, ২০১৯, ১২:০৫ অপরাহ্ণ

Avatar

ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যাকাণ্ডের ঘটনার মূল হোতা অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার সব অপকর্মের পৃষ্ঠপোষক উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মাদ্রাসার সহসভাপতি রুহুল আমিন। সিরাজের সব অপকর্ম উদ্দেশ্যমূলকভাবে ধামাচাপা দিতেন তিনি। আর রুহুল আমিন অধ্যক্ষের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হয়ে উঠার নেপথ্যে রয়েছে মূলত যোগসাজশে মাদ্রাসার অর্থ লোপাট। আর এ কাজে সহযোগিতার জন্য তারা (অধ্যক্ষ ও রুহুল আমিন) একটি সংঘবদ্ধ চক্র গড়ে তোলেন। মূলত তাদের দিয়েই একের পর এক গুরুতর অভিযোগ ধামাচাপা দেয়া হতো।
জানা যায়, সোনাগাজী পৌর শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসাটি উপজেলার সবচেয়ে বড় মাদ্রাসা। এমপিওভুক্ত এ মাদ্রাসার রয়েছে বড় একটি মার্কেট, পুকুর, জমিসহ কোটি কোটি টাকার সম্পদ। প্রাতিষ্ঠানিক ফি থেকে আয় ছাড়াও মাদ্রাসার সম্পদ থেকে মাসে আয় হয় লাখ লাখ টাকা। পরিচালনা কমিটির সঙ্গে আঁতাত করে সিরাজ উদদৌলা এসব

সম্পদের পুরো নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিলেন। আর অধ্যক্ষের অপকর্মগুলো টাকার বিনিময়ে ধামাচাপা দিতেন স্বশিক্ষিত রুহুল আমিন। ফলে যে কোনো ঘটনা ধামাচাপা দিতে যে অর্থ তিনি অধ্যক্ষের কাছ থেকে নিতেন, তার একটি বড় অংশ তিনি হাতিয়ে নিতেন।
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, ১২৫ শতক জমির ওপর নির্মিত মাদ্রাসার তিনতলা ভবনে মার্কেট, ব্যাংক, ইন্স্যুরেন্সসহ আছে অনেক কিছু। এখান থেকে মাসে ভাড়া আসে লাখ টাকার মতো। এ ছাড়া প্রায় দুই একর জমির ওপর খনন করা পুকুর, স্থানীয় কাশ্মীরবাজার এলাকার ২০ শতক জমিসহ বিভিন্ন স্থানে প্রায় পাঁচ একর জমিও আছে মাদ্রাসার। বিভিন্ন ধরনের দানের টাকাও আসে। সব সম্পদের আয় কৌশলে আত্মসাৎ করেন অধ্যক্ষ সিরাজ। গত বছরের বার্ষিক নিরীক্ষার সময় ৩৯ লাখ টাকার হিসাবে গরমিল পাওয়া যায়। হিসাব দিতে ব্যর্থ হন অধ্যক্ষ। অবশ্য ৩৯ লাখ টাকা লোপাটের অভিযোগ পরে ধামাচাপা দেন সিরাজ। এ ছাড়া নিরীক্ষায় ইসলামী ব্যাংকের ভাউচারে ২৮ হাজার টাকার একটি জালিয়াতি ধরা পড়ে। এসব কারণে মাদ্রাসার সর্বশেষ পরিচালনা কমিটি রেজুলেশন করে দুই হাজার টাকার বেশি খরচ করার ক্ষমতা কেড়ে নেয়া হয় সিরাজের। পরে গত ছয় মাস আগে নতুন কমিটি গঠিত হলে অধ্যক্ষ সেই রেজুলেশনই বাদ দিয়ে দেন। উল্লেখ্য, নতুন কমিটিতে সহসভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন রুহুল আমিন।
জানা যায়, গত ২৭ মার্চ নুসরাত জাহান রাফির শ্লীলতাহানির পর রুহুল আমিনসহ পরিচালনা কমিটির কোনো সদস্য রাফির পরিবারের পাশে না থেকে উল্টো অধ্যক্ষের পক্ষ নিয়ে রাফিসহ তার পরিবারকে নানাভাবে নাজেহাল করেছেন। এরপর রাফির মায়ের দায়ের করা মামলায় অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার করা হলে টাকার বিনিময়ে তাকে ছাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন রুহুল আমিন। এতে ব্যর্থ হয়ে পরে মামলা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টাও করেন। তার সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে অধ্যক্ষের মুক্তির দাবিতে থানার সামনে মানববন্ধন ও থানা ঘেরাও করা হয়। ওইদিন উপজেলা নির্বাচন উপলক্ষে সব ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ ছিল। এ ছাড়া তার প্রধান সহযোগী পৌর কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা মকসুদ আলমের মাধ্যমে মামলা তুলে নেয়ার জন্য রাফির পরিবারকে কয়েক দফায় হুমকি দেয়ার পাশাপাশি গণমাধ্যম কর্মীদেরও টাকার বিনিময়ে ম্যানেজ করার চেষ্টা করেন রুহুল আমিন ও তার সঙ্গীরা। অনুসন্ধান সূত্রে জানা যায়, রাফিকে আগুন দেয়ার আগের দিন মামলার এজাহারভুক্ত একাধিক আসামিকে নিয়ে ঘটনাস্থলের আশপাশের এলাকা রেকি করেন তিনি। তার একটি ছবিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। যা ঘটনার পর স্থানীয়দের ভেতরে ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি করে।
আশির দশকে ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনীতির মাধ্যমে জামায়াতের রাজনীতিতে সক্রিয় হন সিরাজ উদদৌলা। তিনি জামায়াতের রোকন ছিলেন। ২০১৬ সালের দিকেও তাকে জামায়াতের মিছিল-সমাবেশে দেখা গেছে। বছর দুয়েক আগে খোলস পাল্টে তিনি আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ আস্থাভাজন হয়ে উঠেন। খুব সতর্কভাবে বুকে টেনে নেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিনকে। একইভাবে মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটিকে হাত করার পাশাপাশি ‘বেয়াদব’ বলে পরিচিত অন্তত এক ডজন জ্যেষ্ঠ ছাত্রকে অনুসারী হিসেবে তৈরি করেছেন সিরাজ। তাদের ছাত্রাবাসে ফ্রি খাওয়ানো, ফরম পূরণ বাণিজ্য, নগদ টাকা দেয়া, ফ্রি গাইড বইসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিতেন তিনি। তবে সিরাজের সঙ্গে রুহুল আমিনের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে স্থানীয়দের ভেতরে নানা কুরুচিপূর্ণ বক্তব্যও পাওয়া যায়।
এদিকে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে রুহুল আমিনের সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পদটি হাতিয়ে নেয়ার পেছনেও রয়েছে নানা কাহিনী। জানা গেছে, সর্বশেষ ২০১৩ সালে উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে সভাপতি নির্বাচিত হন ফয়জুল কবীর। আর সহসভাপতি নির্বাচিত হন সাবেক সাংসদ রহিম উল্লাহ। আর রুহুল আমিনকে করা হয় ৪৪ নম্বর সদস্য। কিন্তু জেলা আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী নেতার টেন্ডারবাজি ও অনিয়ম দুর্নীতির বিরোধিতা করায় হঠাৎ রহিম উল্লাহকে বাদ দিয়ে ২০১৫ সালে এক নম্বর সহসভাপতি করা হয় রুহুল আমিনকে। এরপর ২০১৭ সালে ফয়জুল কবীর চিকিৎসাধীন থাকার সুযোগে প্রথমে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হন রুহুল আমিন। এরপর ২০১৮ সালে কোনো কাউন্সিল ও দলীয় রেজুলেশন ছাড়াই নিজেকে সভাপতি ঘোষণা দেন তিনি। আর এসবের নেপথ্যে ছিল জেলা আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী নেতা।
সিরাজ উদদৌলার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ও তার প্রধান পৃষ্ঠপোষক হয়ে বিভিন্ন ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে রুহুল আমিন বলেন, এই লোকটা (সিরাজ উদদৌলা) তো জামায়াতের, তার সঙ্গে আমার কি সম্পর্ক থাকতে পারে? তার বিরুদ্ধে আগেও অনেক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। কয়েক মাস আগে আরেক ছাত্রীকে যৌন হয়রানি করেছিল সে। পূর্বে সিরাজের বিরুদ্ধে আসা বিভিন্ন অভিযোগ পাওয়ার পরও আপনারা কেন তার বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেননি? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
সোনাগাজী পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ আব্দুল হালিম মামুন মাদ্রাসার আগের পরিচালনা কমিটির সদস্য ছিলেন। তিনি বলেন, ১২৫ শতক জমির ওপর মাদ্রাসার তিনতলা ভবনে মার্কেট, ব্যাংকসহ অনেক কিছু আছে। ভাড়া আসে লাখ টাকার মতো। বিভিন্ন ধরনের দানের টাকাও আসে। সব সম্পদের আয় তছরুপ করেন অধ্যক্ষ সিরাজ। গত বছর নিরীক্ষার সময় ৩৯ লাখ টাকার হিসাব দিতে পারেননি তিনি। আব্দুল হালিম মামুন আরো বলেন, কেউ মুখ খুলতে না চাইলেও গত বছরই আমরা চার-পাঁচটি মেয়ের কথা জেনেছি। যাদের বই দেবে, প্রশ্ন দেবে বা অন্য সুবিধা দেবে বলে রুমে ডেকে হয়রানি করেন সিরাজ। অভিযোগ উঠলেও মদদদাতাদের কারণে তদন্ত হয়নি। আগের কমিটি মাদ্রাসায় সিসি ক্যামেরা স্থাপনের সিদ্ধান্ত দিলেও নিজের অপকর্ম ধরা পড়বে বলে সিরাজ তা বসাতে রাজি হয়নি। তিনি আরো বলেন, সিনিয়র কিছু বেয়াদব টাইপের ছেলেকে সুবিধা দিয়ে পোষেণ সিরাজ। এরা ফরম পূরণ করায়। ফ্রি ছাত্রাবাসে খায়। টাকাও পায়। অধ্যক্ষের প্রধান মদদদাতাসহ এরা সবাই তাকে বাঁচাতে তার পক্ষে মাঠে নেমেছে। কাউন্সিলর মামুন আরো জানান, রাফির জানাজার আগে দেয়া বক্তব্যে রুহুল আমিনকে উদ্দেশ্য করে প্রধানমন্ত্রীর সাবেক প্রটোকল কর্মকর্তা আওয়ামী লীগ নেতা আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিম বলেছেন, জানাজার প্রথম কাতারেই রয়েছে রাফির খুনি।
এদিকে ফেনী পিবিআইর পরিদর্শক শাহ আলম জানান, জেলহাজতে থাকা অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাহসহ ৯ জনকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তারা হলেন, অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা, প্রভাষক আবছার উদ্দিন, আলিম পরীক্ষার্থী উম্মে সুলতানা পপি, আরিফুল ইসলাম, সাবেক ছাত্র কেফায়েত উল্লাহ জনি, আলাউদ্দিন, শহীদুল ইসলাম, নুর হোসেন হোনা ও জাবেদ হোসেন। এ ছাড়া পিবিআইয়ের হেফাজতে থাকা নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম ও কারাগারে থাকা সোনাগাজী পৌর কাউন্সিলর মকসুদ আলমকে আগামীকাল (আজ) রবিবার আদালতে হাজির করে রিমান্ড আবেদন করা হবে বলে জানায় পিবিআই।