এবারো বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা হচ্ছে না?

আগের সংবাদ

সময় এখন অসহায়ত্ব প্রকাশের নয়

পরের সংবাদ

নুসরাত হত্যা মামলার পরিণতি কি হবে?

প্রকাশিত হয়েছে: এপ্রিল ১২, ২০১৯ , ৮:২৪ অপরাহ্ণ | আপডেট: এপ্রিল ১২, ২০১৯, ৮:২৪ অপরাহ্ণ

বিভুরঞ্জন সরকার

সাংবাদিক ও কলাম লেখক

এখন সময় এসেছে আমাদের মোহমুক্ত হওয়ার। আবেগতাড়িত না হয়ে আমাদের যুক্তিবুদ্ধির চর্চা বাড়ানো উচিত। ধর্ম নিয়ে দিন দিন হিংস্রতা বাড়ছে, সংঘাত-সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ছে কিন্তু মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটছে না। আমরা যদি আমাদের মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটাতে না পারি তা হলে নুসরাতের এই করুণ মৃত্যুর দায় আমরা কেউ এড়াতে পারব না।

ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহানকে আগুনে পুড়িয়ে মারা হলো। তার শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেছিলেন মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা। বিষয় মেনে নিতে পারেনি নুসরাত। জানা যাচ্ছে, অধ্যক্ষ সিরাজ তার অফিস কক্ষটিকে একটি ছাত্রীনির্যাতন কেন্দ্রে পরিণত করেছিলেন। বিষয়টি অনেকেই জানেন। মাদ্রাসার পিয়ন একাধিকবার দেখেছেন সিরাজের অপকর্মের দৃশ্য। কিন্তু ভয়ে কেউ মুখ খোলেন না তার বিরুদ্ধে।

সিরাজের নাকি বিরাট প্রভাব-প্রতিপত্তি। তিনি বাহিনী পোষেন। তার এই শক্তিমত্তার উৎস কী? সাধারণত রাজনৈতিক দলের সঙ্গে থাকলেই মানুষ বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তবে সব দলের নেতাকর্মী সমান দাপট দেখাতে পারেন না। থানা-প্রশাসন সব দলের নেতাকে গোনায় ধরেন না, সবাইকেই সালাম দেন না।

সিপিবির একজন নেতা স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় হলেও তিনি কি দাপট দেখাতে পারেন? তাকে কি থানা-পুলিশ সেভাবে মান্য করে? শাসক দলের নেতা-পাতি নেতা হলেও তাদের তোয়াজ-তোষামোদ করতে হয়। তাদের খাজনা-ট্যাক্স দিয়ে চলতে হয়। সোনাগাজীর মাদ্রাসা অধ্যক্ষ সিরাজ আওয়ামী লীগ করেন না। তিনি একসময় জামায়াত করতেন। জামায়াত থেকে তিনি বহিষ্কৃত হয়েছেন ২০১৬ সালে।

জামায়াত এখন রাজনৈতিকভাবেই খুব নাজুক অবস্থানে আছে। জামায়াত করে কারো পক্ষে এখন বাড়তি দাপট, সাহস, প্রভাব দেখানো সম্ভব নয়। তা হলে সিরাজ কী করে সবার চোখের সামনে নানা ধরনের দুষ্কর্ম চালিয়ে যেতে পারছেন? তার প্রতি যারা অনুগত তারা কারা? তাকে যারা ভালো মানুষ মনে করেন তারা কি সেটা না জেনে করেন? সিরাজ কি এই মানুষগুলোকে কোনোভাবে উপকার করে থাকেন? তার কি অনেক টাকা-পয়সা? টাকা থাকলে নাকি মানুষ ধরাকে সরা জ্ঞান করে থাকে।

সিরাজ যদি তেমন টাকার গরমই দেখিয়ে থাকেন, তা হলে তার এই টাকার উৎস কী? তার ক্ষমতার যদি কোনো গোপন উৎস থেকে থাকে তা হলে তার বিরুদ্ধে যত ক্ষোভ-ধিক্কারই উচ্চারিত হোক না কেন, তার বিচার হবে না, বিচার হলেও শাস্তি হবে মামুলি। পুলিশ দুর্বল চার্জশিট দেবে। মামলা পরিচালনায় গড়িমসি করবে। সাক্ষ্য-প্রমাণ জোগাড় হলেও তা হবে ত্রুটিপূর্ণ। আর সিরাজ যদি কাগুজে বাঘ হয়ে থাকেন, তার পেছনে যদি ক্ষমতাবান কারো আশীর্বাদ না থাকে তা হলে হয়তো এবার তাকে বড় বিপদই মোকাবেলা করতে হবে।

নুসরাতের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মনোভাব কঠোর বলেই মনে হচ্ছে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ তিনি দিয়েছেন। কিন্তু তারপরও মানুষের মনে আস্থাহীনতা। সিরাজের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হবে, এটা অনেকেই বিশ্বাস করছেন না। মানুষের মধ্যে কেন এই বিশ্বাসহীনতা, আস্থাহীনতা? কারণ মানুষ দেখে আসছে যে অনেক চাঞ্চল্যকর এবং বহুল আলোচিত মামলাও হিমঘরে পড়ে আছে, দিনের পর দিন, বছরের পর বছর। নারায়ণগঞ্জের ত্বকী হত্যা, সাংবাদিক সাগর-রুনি হত্যা, কুমিল্লার তনু হত্যা, চট্টগ্রামের মিতু হত্যা- এসব হত্যাকাণ্ডই ছিল ব্যাপক আলোচিত। কিন্তু কী পরিণতি হয়েছে তার? তাই নুসরাত হত্যা মামলার পরিণতি নিয়ে মানুষের মনে সংশয়, সন্দেহের দোলাচল।

দুই.
নুসরাত জাহানের খাতা থেকে পুলিশ দুটি চিঠি উদ্ধার করেছে। তার দুই সহপাঠী বা বান্ধবীকে লেখা চিঠি। সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে চিঠি দুটিতে কী লিখেছে নুসরাত। তার ক্ষোভের কথা, মনোবেদনার কথা, অধ্যক্ষ সিরাজের প্রতি তার ঘৃণার কথা নুসরাত লিখেছে তার চিঠিতে। লজ্জায়-অপমানে নুসরাত হয়তো এক পর্যায়ে আত্মহত্যার কথাও ভেবেছিল।

একটি চিঠিতে নুসরাত লিখেছে: ‘আমি লড়বো শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত। আমি প্রথমে যে ভুলটা করেছি আত্মহত্যা করতে গিয়ে, সেই ভুলটা দ্বিতীয়বার করবো না। মরে যাওয়া মানেই তো হেরে যাওয়া। আমি মরবো না। আমি বাঁচবো। আমি তাকে শাস্তি দেবো, যে আমাকে কষ্ট দিয়েছে। আমি তাকে এমন শাস্তি দেবো যে, তাকে দেখে অন্যরা শিক্ষা নেবে।’ না, নুসরাত বাঁচতে পারল না। তাকে বাঁচতে দেয়া হলো না। মৃত্যু মানে হেরে যাওয়া। তাহলে কি নুসরাত হেরে গেল? কারো কাছে এটা মনে হতে পারে, নুসরাতকে মেরে ফেলে তাকে ‘কষ্ট’ দেয়া ব্যক্তি বুঝি বেঁচে গেল।

নুসরাতের মা যদি দুশ্চরিত্রের অধিকারী মাদ্রাসা অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মামলা না করতেন তা হলে হয়তো এভাবে মরতে হতো না নুসরাতকে। নুসরাতকে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেয়ার আগে দুর্বৃত্তরা তো মামলা প্রত্যাহারের চাপই দিয়েছিল। সে রাজি না হওয়াতেই এই চরম প্রতিশোধপরায়ণতা দেখিয়েছে সিরাজের পেটোয়া বাহিনী। কয়েকদিন হাসপাতালে জীবনমৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে মেয়েটি চলে গেছে না ফেরার দেশে।

নুসরাতের এই মর্মান্তিক মৃত্যু অনেক মানুষকে আবেগাপ্লুত করেছে। অনেকেই নানা উপায়ে এই বর্বরতার প্রতিবাদ করছেন। সিরাজসহ এ ঘটনায় জড়িত সবাই যাতে শাস্তি পায়, সেটাই এখন সবার চাওয়া। নুসরাত আর ফিরে আসবে না। তাকে আর জীবন দেয়া সম্ভব নয়। কিন্তু তার চাওয়া তাকে যে কষ্ট দিয়েছে তার শাস্তি নিশ্চিত করার দায়িত্ব এখন আমাদের সবার ওপর এসে বর্তেছে। আমরা কি পারব নুসরাতের হত্যাকারীদের শাস্তি বিধানে অবিচল থাকতে? নাকি আরেকটি এমন ঘটনা নুসরাতকে ঠেলে দেবে বিস্মৃতির অতলে!

তিন.
আমাদের দেশে নারী নির্যাতনের, নারী নিগ্রহের ঘটনা প্রতিদিনই ঘটছে। সম্ভবত ঘরে ঘরেই ঘটছে। নারীর প্রতি আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে এখনো সমস্যা রয়েছে। নারীকে সম্মান ও মর্যাদা দিতে এখনো অনেকের মধ্যেই জড়তা আছে। নারীকে সমান মানুষ ভাবতে পারি না অনেকেই। বাইরে বা মুখে নারী অধিকারের কথা বললেও ভেতরে পুষে রাখা হয় সাবেকি ধারণা। নারীকে হেয় করতে, বিদ্রুপ করতে দেখা যায় অনেককেই। নুসরাতকে একজন মাদ্রাসা শিক্ষক শ্লীলতাহানির চেষ্টা করছেন, ঘটনার বিচার চেয়ে তার পক্ষ থেকে থানায় মামলা করা হয়েছে- এই অপরাধে তাকে পুড়িয়ে মারা হলো। নুসরাতের ঘটনাটা প্রকাশ হয়ে পড়েছে।

গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পেয়েছে বলে এটা নিয়ে হৈচৈ হচ্ছে। কিন্তু আমি নিশ্চিত জানি এমন অনেক ঘটনা আরো ঘটছে, প্রতিদিন ঘটছে তবে সেগুলো ঘটে আড়ালে-নিভৃতে, তাই জানাজানি হচ্ছে না। সবাই জানছে না মানে অবশ্যই এটা নয় যে, ঘটনা ঘটছে না। নারীদের লাঞ্ছিত করে অনেক পুরুষই বিকৃত আনন্দ উপভোগ করে থাকেন। উপযুক্ত শিক্ষা ও পারিবারিক সুরুচিবোধ ও সুচিন্তার অভাব, পরিবেশ ইত্যাদি নারীর অধঃস্তন অবস্থানকে পাকাপোক্ত করে রেখেছে। নারীকে ঘরে রাখা, দাবিয়ে রাখা, অবদমিত রাখা এখন অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেভাবে সম্ভব হচ্ছে না। অনিচ্ছা সত্ত্বেও পুরুষ অনেক কিছু মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে, কিন্তু মনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছে না।

ফলে কোনো এক দুর্বল মুহূর্তে ভেতরের পশু বেরিয়ে পড়ছে, হামলে পড়ছে নারীর ওপর। কেউ কেউ বলে থাকেন পোশাকআশাকে শালীনতার অভাব নাকি নারী নির্যাতনের কারণ। আবার কেউ কেউ বলে থাকেন, ধর্মীয় শিক্ষার অভাবেও নারী নির্যাতন হয়ে থাকে। আসলে এগুলো যে কোনো নারী নির্যাতনের কারণ নয়, সেটা নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনা বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায়।

নুসরাতের ঘটনাই বা কী? সে তো ধর্মীয় শিক্ষাই গ্রহণ করছিল। পোশাকও ছিল শালীন। বোরকা, নেকাবই পরত। তা হলে তার প্রতি লালসার চোখ পড়ল কেন সিরাজের? সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি ঘটনা তো মাদ্রাসা শিক্ষার উপযোগিতাকেই ভীষণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। যেখানে ধর্ম ও নীতিনৈতিকতা শিক্ষা দেয়ার কথা সেখানেই তো চলছে নীতিহীনতার খেলা। মাদ্রাসা শিক্ষকদের চারিত্রিক অধঃপতনের যে খবর প্রকাশ পাচ্ছে তা রীতিমতো উদ্বেগজনক। তারা ছাত্রী ধর্ষণ করছে, শিশু বলাৎকার করছে, তারপর হত্যাও করছে। এরপরও কি আমাদের মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে মোহগ্রস্ত থাকতে হবে?

সিনিয়র সাংবাদিক মোজাম্মেল হোসেন মঞ্জু তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন : ‘মাদ্রাসায় দেয়া ধর্মীয় শিক্ষা ব্যক্তির নৈতিকতা নিশ্চিত করে না। সিরাজ উদদৌলা ওই শিক্ষায় উচ্চ শিক্ষিত এবং মাদ্রাসার শীর্ষ ব্যক্তি। তিনি নিজের রিপু ও যৌন লালসা দমন করতে পারেননি। ধর্ম থেকেও সংযম শিক্ষা নেননি। … যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের শিকার হওয়ার পেছনে মেয়েদের সাধারণ আরামদায়ক পোশাকের কোনোই ভূমিকা নেই। অথচ মাদ্রাসার হুজুররা ও ইসলামি রাজনীতির লোকরা হরহামেশা পোশাকের কথা তুলছেন।

সারাদেশে প্রতিনিয়ত ওয়াজ মাহফিলে পর্দা-বেপর্দার বিস্তারিত বয়ান চলছে। খোদ মাদ্রাসার ভেতরে হিজাব, বোরকা, নিকাবসহ পর্দাপুশিদায় থাকা নুসরাত কি রক্ষা পেল? প্রকৃতপক্ষে প্রচলিত ধর্মবিশ্বাস বা আচরিত ধর্মগুলোর সঙ্গে নৈতিকতার সম্পর্ক ক্ষীণ। নৈতিকতা মানুষের বিবেক ও ন্যায়-অন্যায় বোধজাত। …বিশ্বাসভিত্তিক ধর্মাচরণ নৈতিকতা উন্নত করতে পারে, নাও পারে।’

এখন সময় এসেছে আমাদের মোহমুক্ত হওয়ার। আবেগতাড়িত না হয়ে আমাদের যুক্তিবুদ্ধির চর্চা বাড়ানো উচিত। ধর্ম নিয়ে দিন দিন হিং¯্রতা বাড়ছে, সংঘাত-সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ছে কিন্তু মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটছে না। আমরা যদি আমাদের মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটাতে না পারি তা হলে নুসরাতের এই করুণ মৃত্যুর দায় আমরা কেউ এড়াতে পারব না।

বিভুরঞ্জন সরকার: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।